Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৩


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;১৩

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

–” সেগুড়ে বালি হবে কেন? আমাকে তোর ভাই ভাবিস না রুমা?”

তরঙ্গের ক্লান্ত কন্ঠে দু’জনে একসাথে দরজার দিকে তাকালো। ঘর্মাক্ত শার্ট পরিহিত তরঙ্গ ঘরে প্রবেশ করলো। এগিয়ে এসে রকিং চেয়ারে বসে পড়লো সে।

–” কি করছিস দুটোতে মিলে?”

–” আপু ব্লাউজের বোতাম সেলাই করছে। আমি কথা বলছি।”

–” এক গ্লাস পানি খাওয়াবি রুমু।”

–” আনছি বসো।”

রুমা পানি আনতে উঠে গেলো। সে সরে যেতেই সুযোগ বুঝে তরঙ্গ ধীরে চেয়ার টেনে তরীর কাছে এসে বসল।
তরী বিষয়টা লক্ষ্য করলে ও, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। যেন কিছুই ঘটেনি, এমন ভাব করে সে নির্লিপ্ত ভাবে সামনে তাকিয়ে রইলো।
তরঙ্গ হালকা করে গলা ঝেড়ে শান্ত স্বরে বললো—

–” কিছু কথা বলছি। দয়া করে একটু কথা গুলো রাখবেন মিস।”

তরী ধীরে মুখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। দাঁতে আলতো করে সুতো কেটে ব্লাউজটা পাশে সরিয়ে রাখলো সে। তরঙ্গ এক ঝলক সেদিকে তাকিয়ে নিলো, তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে শান্ত স্বরে বলতে শুরু করলো—

–” সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর মা বা চাচি যদি তোকে ডাকে। তবে তুই যাবি না। যদি কেউ মরে ও যায়। তবুও ঘর থেকে বের হবি না।”

–” আপনার কথা শুনতে যাবো কোন দুঃখে? আমার এতো খারাপ দিন পড়েনি মিস্টার দেওয়ান।”

–” দেখ তর….”

–” কিচেন থেকে পানি আনতে গিয়ে দেরী হয়ে গেছে। ভাইয়া নাও তোমার পানি।”

তরঙ্গ বাকি কথা বলার আগেই রুমা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ফিরে এলো। তাকে দেখেই তরঙ্গ থেমে গেলো, বাকি কথা গুলো গলায় আটকে রইলো তার। এক মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে পাশ ফিরে হালকা করে মুচকি হাসলো, তারপর রুমার এগিয়ে ধরা গ্লাসটা তুলে নিলো হাতে।

–” সমস্যা নেই, দে।”

রুমা আবার নিজের জায়গায় এসে বসে পড়লো। তরীর দিকে একবার তাকিয়ে ব্লাউজটা হাতে তুলে নিলো সে। তা উল্টে পাল্টে দেখতেই রুমার ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। কিছুক্ষণ পর ব্লাউজটা গুছিয়ে ভাঁজ করে সে উঠে দাঁড়ালো। আলমারিতে রেখে দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।

ততক্ষণে, তরঙ্গ তিন চুমুকে গ্লাসের পানি শেষ করে নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। তরী তার পিছু তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো, তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ালো। অনেকক্ষণ ধরে তিন্নিকে দেখা যাচ্ছে না— রাত ও বেশ হয়ে এসেছে। এখন ওকে খাইয়ে, পোশাক পাল্টে শুইয়ে দেওয়া দরকার। সেই ভেবেই ঘর থেকে বেরোলো তরী।


সারা বাড়িজুড়ে ঝলমলে বাতির আলো ঠিকরে পড়ছে। বাতির সোনালি আবরণে চেয়ে গেছে চারপাশ। রঙিন আলোর ঝিলিক দেয়াল পেরিয়ে উঠোন পর্যন্ত গড়িয়ে পড়েছে, তৈরি করেছে এক মায়াবী আবহ।

বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই তরীর দৃষ্টি থেমে গেলো উঠোনের মাঝে। সেখানে বাচ্চাদের ভিড়ে হাসি খুশিতে মেতে আছে তিন্নি। এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে সেই দৃশ্যটুকু উপভোগ করলো তরী। তারপর ধীর, পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সে। তার চলার ভঙ্গিতে ছিলো মায়াময় প্রশান্তি। তরঙ্গ যদি সেই ভঙ্গি দেখতো, তবে আবার প্রেমে পড়তো তার তরী জানের। উঠোনে পৌঁছে নরম স্বরে ডাক দিলো সে;-

–” এদিকে আয় তিন্নি।”

বোনের ডাকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো তিন্নি। পর পর ছুটে বোনের নিকট এসে থামলো সে।

–” বলো?”

–” আর খেলা করা লাগবে না। ঘরে আয় জামা পাল্টে খাইয়ে দিবো তোকে।”

–” এখন খাবো না আপু।”

–” আগে হাত মুখ ধুবি চল।”

বিনা বাক্যে বোনের পিছু পিছু চলে এলো তিন্নি। রুমার ঘরে এসে ব্যাগ থেকে তিন্নির জন্য কালো ফ্রগ আর মেচিং সেলোয়ার বের করলো সে।

–” ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি জামা বের করে দিচ্ছি।”

বড় বোনের কথা মতো, ব্যাটারি চালিত পুতুলের অনুরূপ নিঃশব্দে গিয়ে হাত – মুখ ধুয়ে এলো তিন্নি। অতঃপর ধীরে সুস্থে পরনের ফ্রক আর সেলোয়ার বদলে নিলো। জামা পাল্টে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব টা একবার দেখলো, তারপর হালকা ঘুরে আবার দেখলো তিন্নি। তার ছোটো ছোটো চোখ দুটোতে কৌতূহলেরা খেলা করছে। দেখা শেষ হতেই মৃদু স্বরে বলে উঠলো সে—

–” আপু আজ থেকে আমার নাম কালো টিকটিকি।”

বোনের মুখে এমন কথা শুনে চকিত তরী সামনে দাঁড়ানো তিন্নির দিকে তাকালো।

–” কে দিয়েছে তোকে এমন নাম? তরঙ্গ?”

মূহুর্তে গম্ভীর হয়ে উঠলো তিন্নির মুখ।

–” না, আমি দিয়েছি। নামটা আমার খুব মনে ধরেছে। ও নাম ছাড়া ডাকলে আমি জবাব দিবো না।”

অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে ধাক্কা খেলো তরী।

–” কি আবোল তাবোল বকছিস তিন্নি? তুই কালো নাকি? আমার চাঁদের মতো ফুটফুটে সুন্দর বোন। তোকে ওমন নামে ডাকবো কেন!”

–” যা ইচ্ছে বলো। কিন্তু কালো টিকটিকি বলেই আমাকে ডাকবে। না হলে আমি জবাব দিবো না।”

ফোস করে শ্বাস ছাড়লো তরী। ভাই – বোন দুটো তাকে একে বারে নাকাল করে ছাড়বে। তাদের একের পর এক অদ্ভুত আবদার সামলাতে সামলাতে কখন যে সে নিজেই বিরক্ত হয়ে ওঠে, আর কখন যে অবাক হয়। তাও বুঝে উঠতে পারে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, এভাবে চলতে থাকলে সে একদিন সত্যিই পাগল হয়ে যাবে।

–” বাজে বকা বাদ দিয়ে নিচে চল তানু। খাইয়ে দিবো তোকে।”

–” আগে কালো টিকটিকি ডাকো!”

–” পারবো না।”

–” ডাকো বলছি!”

ফুঁপিয়ে উঠলো তিন্নি। তার জেদের সাথে না পেরে গমগমে কন্ঠে তরী বললো;-

–” কালো টিকটিকি চল। তোকে ভাত খাইয়ে দিবো।”


গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।

বাড়ির চারপাশে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। সবাই ঘুমিয়ে আছে। শুধু ঘুমায়নি তরী আর রুমা। দুজনে পাশাপাশি শুয়ে ধীর স্বরে গল্পে মেতে আছে। ড্রিম লাইটের নীলচে আলোয় তরীর মুখ অস্পষ্ট। আলো – ছায়ার মাঝে মিশে আছে তার মুখশ্রী। রুমা বসে থাকায় তার মুখশ্রী আধো অন্ধকারে আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছে।

ওদের কথোপকথনের মাঝে। সহসা, দরজায় হালকা টোকা পড়লো। শব্দটা নীরবতার ভেতর বেশ জোরেই কানে এলো। চমকে উঠলো দুজনেই। তরী উঠে দরজার দিকে যেতে চাইতেই, রুমা দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিলো।

–” তুমি বসো আপু।”

তরীকে থামিয়ে, বসা থেকেই হাঁক ছাড়লো রুমা।

–” কে?”

–” আমি রুমু। দরজা খোল।”

দরজার ওপাশ থেকে সাহনারার কণ্ঠ ভেসে এলো। কণ্ঠটা চিনতেই রুমা আর দেরি করলো না। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে নেমে সাদা বাতিটা জ্বালালো। তারপর দরজার ছিটকিনি খুলে দিলো। রুমাকে ঢেলে সাহনারা ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঘরের ভেতর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি। তারপর সোজা এগিয়ে এসে শুয়ে থাকা তরীর পাশে থামলেন। ঠোঁটে হাসি টেনে, যতোটা সম্ভব নিজের গলার স্বর নরম করার চেষ্টা চালালেন তিনি।

–” একটু উঠবি তরু মা।”

চাচির কথায় বজ্রাহত মানুষের মতো চমকে উঠলো তরী। না চাইতেও ধীরে ধীরে উঠে বসে পড়লো সে।

–” কেনো চাচি?”

মিষ্টি হাসলেন সাহনারা,

–” কাছারি ঘর থেকে চাচি কে দুটো বালিশ এনে দিতে পারবি?”

সাহনারার কথায় বিস্ময় নিয়ে রুমা সুধালো;-

–” কাছারি ঘরে বালিশ নেই ফুফি। তোমার বালিশ লাগলে আম্মুর কাছ থেকে নাও।”

–” তখন ঝুমু আর তিন্নি নিয়ে গিয়ে ছিলো। তোর মায়ের কাছে বাড়তি বালিশ আর নেই।”

–” ওহ, তুমি বসো তাহলে। আমি এনে দিচ্ছি। তরী আপুর যাওয়া লাগবে না।”

বাধ সাধলেন সাহানারা,

–” তুই যাস না। নতুন বউদের এমন রাত বিরাতে বেরোতে নেই। তেনাদের নজর পড়তে পারে। তরী তুই যাবি মা? আমার কোমরের ব্যথায় হাঁটতে পারছি না।”

তরী ততক্ষণে মেঝেতে নেমে দাঁড়িয়েছে। চাচির কথা শেষ হতেই তরী বলে উঠলো।

–” আমি এনে দিচ্ছি।”

বিশ্ব জয়ের মতো এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো সাহনারার মুখে। তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। মাথায় ওড়না জড়িয়ে তরী ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে নেমে দাঁড়ালো সে। এদিকটা আলোয় ভরা হলে ও, কাছারি ঘরের দিকটা ডুবে আছে ঘন অন্ধকারে। একবার তাকিয়ে নিয়ে ঠোঁটের কোণে আস্তে করে উচ্চারণ করলো, “বিসমিল্লাহ”— তারপরই পা বাড়ালো সেদিকে। কাছারি ঘরের সামনে এসে দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই সেটা কট করে খুলে গেলো।

ছোট ছোট পায়ে ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকাতে লাগলো তরী, অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজতে লাগলো লাইটের সুইচ। ঘরের মাঝে চকিতে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। সেই বাতির আলো পুরো ঘর আলোকিত করতে ব্যস্ত। হঠাৎ খট করে একটা শব্দ হলো। শব্দটা পেছন দিক থেকে আসতেই ঘুরে তাকালো সে—আর তাকাতেই থমকে গেলো। টিনের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে নাকি কেউ বন্ধ করে দিয়েছে। তা না বুঝে, তড়িঘড়ি করে দরজার দিকে এগোতে যেতেই পা হড়কে গেলো তার। হঠাৎ, এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত তাকে টেনে নিলো কাছে—বেড়ার সঙ্গে চেপে ধরলো শক্ত করে।

কোমরে বাঁধা পেতেই হাঁস ফাঁস করে উঠলো তরী। এলো মেলো ভাবে হাত ছুঁড়তে লাগলো সে। তার হাত দুটো এক হাতের মুঠোতে বন্দি করে নিলো পুরুষটি। নিস্তব্ধতা চাপিয়ে ভেসে এলো গম্ভীর এক স্বর।

–” তোকে বলে ছিলাম না! রাতের অন্ধকারে বেরোবি না রুম থেকে। বেরোলি কেন? এখন যা ঘটবে, তার জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবি না।”

অতর্কিতে হামলায় তরী বেশ ভয় পেয়েছে। বাতির মৃদ্যু আলোয় তোতলাতে তোতলাতে তরী প্রশ্ন করলো;-

–” কি…কি কর…বেন আপনি?”

কোনো ভণিতা ছাড়া তরীকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরলো তরঙ্গ। ভয়ের তীব্রতায় তরীর ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। একই সঙ্গে ঘেমে গেছে তার শিরদাঁড়া। ভয়ের মধ্যেই, হিতাহিত বোধ শূন্য হয়ে, তরী অচেতন মনে তরঙ্গের পিঠ আঁকড়ে ধরলো। তরঙ্গ মুখ এগিয়ে নিলো তরীর কানের কাছে। কানের লতিতে ছোটো চুমু খেয়ে সুধালো সে।

–” তোর সর্বনাশ আর আমার পৃথিবী জয়।”

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,
আজ মন্তব্য না জানালে আমি আর সামনে পর্ব দিবো না। আপনাদের নির্লিপ্ততা আমাকে বরাবর ই হতাশ করে। এখন বলবেন না, যে দেরী করে গল্প দেওয়াতে এমন হচ্ছে। এটা ভুল, জলদি গল্প দিলে ও আপনারা এমন ই করেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply