কাছেআসারমৌসুম_(৬৯.২)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
কান ঝাঝিয়ে ওঠা অনুভূতি, বিস্ময়ে স্তব্ধ হওয়া শরীর আর চোখে অবিশ্বাস নিয়ে সার্থর পানে চেয়ে রইল তুশি। প্রখর গাঢ় অভিভূতি সমেত, থেমে থেমে বলল,
“ ক-কী কী বললেন?”
সার্থ নির্লিপ্ত ভীষণ। শান্ত চোখে এক পল চেয়ে দেখল ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা গ্লাসের টুকরো,আর সরল রেখার মতো ছুটতে থাকা পানির গতি। তবে তুশির কথার জবাব দিলো না। দুম করে উঠে বেরিয়ে গেল হঠাৎ। কোথায় গেল কে জানে! তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে রইল তুশি। টের পেলো সমস্ত শরীরে ভূমিকম্পের তুখোড় স্রোত বইছে। বুকের ভেতর সুনামি নেমেছে যেন। এর একটু পরই ঘরে এলো আসমা। হাতে বেলচা,ঝাড়ু! হাহুতাশ করে বলল,
“ আহারে আপা গ্লাসটা ভাইঙ্গা গেল!”
আরো কত বকবক করতে করতে মেঝে পরিষ্কার করতে বসল সে। অথচ একটা কথাও বলতে পারল না তুশি। কানেই এলো না কিছু। থরথর করা বুক নিয়ে বিছানায় বসল ও। শরীরের কাঁপুনি থামাতে শক্ত করে মুঠোয় খামচে রাখল চাদরটা। চোখের কোণে এক প্রস্থ টলমল করে উঠল তখন। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে ভাসলো যেন। সার্থ ,ভালোবাসি বলল? এক্ষুনি? সত্যি এটা?
তুশির ঘুম ভাঙল দরজার খটখট শব্দে। টেনেহিঁচড়ে দুটো চোখ মেলে চাইল সে। জিজ্ঞেস করল ভাঙা গলায়,
“ কে?”
“ আমি,খোল।”
দাদির গলা শুনে ওপাশ থেকে এপাশ ফিরল তুশি। চমকে উঠল অমনি। সার্থ ঘুমিয়ে আছে। অমনি তড়াক করে উঠে বসল মেয়েটা। চোখের পাতা ঝাপটে ভাবল – উনি,উনি কখন এলেন?
কাল রাতে সার্থ সেই যে বের হয়েছিল,আর ঘরে আসেনি। পাক্কা চার ঘন্টা বসে বসে দরজার পানে চেয়েছিল তুশি। দেখেইনি আসতে। তাহলে এলো কখন,পাশেই বা শুলো কখন? হলদে ফরসা,ট্রিম করা দাঁড়ি ভর্তি চিবুকের এক পাশ দেখে পরপর লাজুক ভঙ্গিতে ঠোঁট টিপল তুশি। বুকের কোণে কোণে ফের বেজে উঠল গতকাল রাতের কথা। কানের পাশে সার্থর দরাজ স্বরের মতো একটা কণ্ঠ এসে গাইল,
“ অ্যাই চোর,আই লাভ ইউ!”
তুশি কুণ্ঠায় রাঙা হতে পারল না,হাসনা জোরালো হাতে ধাক্কা দিলেন আবার। অধৈর্য হয়ে বললেন,
“ কী হইল, খোল,ও তুশি!”
“ আসছি দাদি আসছি।”
তুশি দ্রুত পায়ে নেমে এলো। উশকো খুশকো চুল হাতে প্যাঁচিয়ে খোপা করল পেছনে। দরজা টানতেই হাসনা কোমরে হাত দিয়ে বললেন,
“ কয়টা বাজে, ছেরি? শউর বাড়িত এত্ত বেলা কইরা কেউ গুমায়?”
“ শ্বশুর বাড়ি! এটা তো আমারো বাড়ি দাদি।”
“ হ,কিন্তু তোর শউর শাউড়ি আছে না এইহানে? ঘুম তে উইঠা হেগো চা -পানি দেওন লাগে না? সক্কাল সক্কাল উইট্টা নাস্তা বানাবি,হেগো খাইতে ডাকপি। শউরের হাতে চা দিবি। তাইলেই না পোলার বউ পাইয়া হেরা গদগদ হইব। সুনাম কইব তোর। হেডি থুইয়া গুমাইতাছস গোরুর নাহান! তুই থাকতে তোর শাউরি নাস্তা বানাইতেছে ক্যান? এইটা কি কুনো ভালো বউগো কাম?”
তুশি চেয়ে দেখল সাতটা দশ বাজে ঘড়িতে। হাই তুলে বলল,
“ আসলে রাতে একটুও ঘুম হয়নি। শেষ রাতে চোখ বুজেছি জানো!”
হাসনা কথাগুলো নিজের মতো ভেবে নিলেন। চাপা হেসে বললেন,
“ প্রথম প্রথম এমনই হইব। যাউক গা, যা কইলাম শুনছস? যা,রান্দাগরে যাইয়া শাউরিরে কবি, মা আমারে দেন আমি নাস্তা বানাই।”
তুশি ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। যেতে নিয়েও বলল,
“ কিন্তু আমি তো রান্নাবান্না পারি না। ওইবার রুটি বেলতে গেলাম পিড়িটাই উলটে আসমার পায়ের ওপর পড়ল। বড়ো মা তো আমাকে কিছু করতেই দেবে না। বের করে দেবে।”
“ হেইডা তো হেয় ভালা মানুষ হেইল্লাইজ্ঞা দেয়। কিন্তু তুই আইজকা বাইর হবিই না। কসম দিয়া খাড়াইয়া থাকপি। অহন রান্তে যা। নাইলে সব মনে মনে কইব, এই হাসনা তোরে শিক্কা দিক্কা দেয়নাই।”
“ আচ্ছা!”
তুশি পাশ কাটাতে গেলেই, হাসনা আর্তনাদ করে বললেন,
“ ও কী, এমনে কই যাস?”
ভড়কে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটা,
“ কেন, রান্নাঘরে।”
হাসনা ফিসফিস করে বললেন,
“ তুই কি ছেরি পাগল? যা, গুসোল দিয়া আয়।”
তুশি অবাক হয়ে বলল,
“ ওমা,এই সাতটা বাজে গোসল করব কেন? দুপুরে করব।”
“ আরে ছেরি কয় কী! গোসল না কইরা এক পাও বাইর হবি না।”
“ কেন,গোসলের মধ্যে বিশেষত্ব কী?”
হাসনা কটমট করে উঠলেন,
“ তোরে আমি মাইরাই ফালামু সিদা ছেরি। তুই কি বাতাসে বড়ো হইছস?”
তুশি মাথা চুলকাল।
হাসনা কপাল চাপড়ালেন এই মেয়ের বোকামি দেখে। পরপর ভাবলেন,ব্যাপারটা স্বাভাবিক! তুশি জীবনে একটা প্রেম করেনি। চাল চলন-পোশাক-আশাক সব ছিল পুরুষদের মতো। কুস্তিও শিখল সেজন্যে। ছেলেপেলে ওকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়া তো দূর,দূর থেকে শীষ বাজালেও গিয়ে চুল টেনে দিতো।
সেই মেয়ের সংসার সম্পর্কে ধারণা থাকবে কীভাবে? কেই বা বোঝাবে এসব?
হাসনা এক পল উঁকি দিলেন খাটের দিকে। সার্থ ঘুমোচ্ছে।
বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,
“ আইচ্ছা একটা কতা কই, তোরা যে আলেদা ফেলাডে ছিলি এক রাইত, বাইরে ছিলি, না এক রুমে ছিলি?”
“ বাইরে থাকব কেন? এক রুমেই ছিলাম।”
“ সকালে গুসল দিসিলি?”
তুশি ঘাড় নাড়ল,
“ হ্যাঁ।”
হাসনা ওর মাথায় থাপ্পড় মেরে বললেন,
“ তাইলে আবার অবুজের বান করশ ক্যা? জলদি যা।”
“ না, এখন হবেই না। , সারারাত এসি চলেছে। ঠান্ডায় জমেছিলাম আমি। এখন গোসল করলে আমার শীত করবে।”
হাসনা চোখ রাঙিয়ে বললেন,
“ তুশি,তক্ক করিস না। গুসল করতে হইব।”
তুশি ত্যারামি শুরু করল,
“ করব না। সরো!”
ও যেতে নিলে হাসনা কনুই টেনে ধরলেন। কপাল চাপড়ে বললেন,
“ আল্লাহ গো আল্লাহ এইডারে কোন পিছা দিয়া বাইড়াইলে এইডায় বুঝব?”
তুশি নাক ফুলিয়ে বলল,
“ দাদি, আমার কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। আমাকে সম্মান দাও বলে দিলাম।”
“ ওরে রঙ্গের কতা রে, সম্মান বুজেন আর গোসলের কতা বুজেন না!”
“ ধুরো,সরো তুমি।”
“ তোরে আমি লাশ বানামু তাও এমনে বাইর হইতে দিমু না।”
তুশি যেতে নেয়,হাসনা টেনে ধরে।
দুজনের তর্কাতর্কির ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলল কিছুক্ষণ। এর মাঝেই সার্থর ঘুম ভেঙে গেল। বিরক্ত হয়ে চোখ মেলে চাইল ও। দরজায় হাসনা-তুশির অমন টানাহেঁচড়া দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠে বসল।
খুব আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ কী হচ্ছে এখানে?”
তুরন্ত থেমে গেল দুজনে। তুশি শক্ত হয়ে মাথা নুইয়ে ফেলল। ফিরল না পেছনে। হাসনা জোর করে হেসে বললেন,
“ কিছু না ভাই, এমনে আইছি!”
সার্থ নিজেও কথা বাড়াল না। ঘুম ভেঙেছে যখন উঠে ফ্রেশ হতে এগোলো। হাসনা তুশিকে চাপা কণ্ঠে বললেন,
“ জামাই টয়লেটে যাইতাছে। তুই আগে যা। গুসল দিয়া আয় নাইলে দেরি হইব।”
তুশিও কণ্ঠ ঠেসে বলল,
“ আমি কেন গোসল করব?আমার গায়ে কি ময়লা?”
“ ওরে ছেরিরে,তোরে আমি কী দিয়া পিডামু!”
সার্থ এইবার বুঝল ব্যাপারটা। হাসল ঠোঁট চেপে। যেতে যেতে বলল,
“ গোসলের দরকার নেই, এরকম কিছু হয়নি।!
ও ওয়াশরুমে ঢুকলেও, লজ্জায় থতমত খেয়ে গেলেন হাসনা। দুম করে তুশির পিঠে কিল বসিয়ে বললেন,
“ বেশরম ছেরি, তোর লইজ্ঞা আমার মান ইজ্জতডা গেল গা। নাতজামাই কী মনে করছে আল্লাহ গো!”
“ এতে মনে করার কী আছে?”
হাসনা দাত খিঁচলেন,
খপ করে ওর কনুই ধরে বললেন,
“ ল ছেরি,তোরে সব হাতে কলমে শিখাইতে হইব। চুরি করতে শিখছে। আদব কায়দা শিখেনাই।”
তুশি এতটা নির্বোধ মনে হয় না কোনোদিনও হয়েছে। ও চোখ ঝাপটে ঝাপটে বলল,
“ গোসলের সাথে আদব কায়দারও সম্পর্ক আছে? চোর হওয়া কত সহজ! চোর থেকে ভালো হওয়া অনেক কষ্টের দাদি! ”
হাসনা জোরসে এক ধমক দিলেন,
“ চোওঅঅপপ!”
শওকত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ তাহলে তোমরা যাচ্ছোই?”
রোকসানার চেহারায় বিরক্তি। খুব তেজ নিয়ে বললেন,
“ হ্যাঁ। আর থেকে কী করব? যে ছেলের জন্যে স্বামীর সাথে তর্ক করলাম,রাগারাগি করলাম সে তো আমার মেয়েটাকে ওইভাবে ঠকাল।”
শওকতের মুখটা আরো কালো হয়। উত্তর দিতে পারেন না। জয়নব বললেন,
“ ঠকাল বলা যায় না। তুমিই তো বিয়ে দেবে না বলে ঘোষণা করলে। সেটা না করা অবস্থায় যদি সার্থ এরকম কিছু ঘটাতো তখন আমরা ওকে দোষ দিতে পারতাম। বিয়ে তো ভেঙেই দিয়েছিলে তুমি রোকসানা।”
“ কেন দিয়েছিলাম তাতো আর তোমার অজানা নয়, মা। আমার মেয়েকে যে পানিতে ঠেলে ফেলল,তার কোনো জবাবদিহি চেয়েছ ওর কাছে?”
সাইফুল মুখ খুললেন এবার। তবে কণ্ঠের নম্রতা কমেনি,বললেন,
“ রোকসানা,
তাহলে তো অনেক কথাই বলতে হয়। ক্লাবের ম্যানেজমেন্টের সাথে আমার কিন্তু কথা হয়েছিল, ওখানকার সিসি ফুটেজে দেখা গিয়েছে আগে আইরিন তুশিকে ঠেলে পানিতে ফেলে দিয়েছিল। জবাবদিহি তাহলে ওর কাছেও চাওয়া উচিত না?”
সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। হতবাক হয়ে মুখ দেখল একে অন্যের। রেহণূমা তাজ্জব হয়ে বললেন,
“ তুমি জানলে কী করে?”
“ তুশি যে সেদিন ওইভাবে পুলে পড়ে গেল,আমি কি ব্যাপারটা এত ক্যাজিয়ুলি নিয়েছি? পরে যোগাযোগ করেছিলাম ওনাদের সাথে। তখন শুনলাম এসব।”
রোকসানা অবাক হয়ে বললেন,
“ কী? আমার মেয়ে এই কাজ করেছে৷ অসম্ভম!”
“ করেছে। কিন্তু আমি অশান্তি চাইনি বলে,কাউকে জানাইনি। তবে নাসীর কিন্তু জানতো কথাটা। ও আমার সাথেই ছিল।
সেজন্যেই না ক্যান্সেল করে দেয়া বিয়েতে আবার নতুন করে বিয়েতে মত দিয়েছিল!”
আইরিন মাথা নুইয়ে ঢোক গিলল।
বুঝতে পারল সবার চোখ ওর ওপর। এই তীব্র অস্বস্তি না বাড়াতে কাউকে কিছু না বলেই,লাগেজ টেনে তড়বড় করে বেরিয়ে গেল সে। রোকসানার তেজি কণ্ঠ নেমে এলো এবার,
“ আসলে ও তুশিকে পছন্দ করে না তো! আবার পার্টিতে কথা ছিল ওর একার হোয়াইট গাউন পরার,সেখানে তুশি পরে এসে থিম নষ্ট করাতে মনে হয় ওর মাথা ঠিক ছিল না।”
কেউ আর কথা বাড়ালেন না। তবে বিরক্তি সবার মুখে। রোকসানা ফের সুর বদলে বললেন,
“ সে যাই হোক,সেজন্যে তো সার্থ আমার মেয়ের সাথে কমিটেড থেকে আরেকজনকে বিয়ে করতে পারে না ভাইজান।”
শওকত বললেন,
“ এখন কী করব বলো? মারব ওকে ধরে? ছোটো থাকলে মারতাম, বকতাম। কিন্তু সে এখন যা তৈরি হয়েছে কথা শোনানো তো দূর,উল্টে আমি দুটো কথা শুনে ফেরত আসি। নিজে ইনকাম করছে,সাবলম্বী হয়েছে যা ভালো বুঝছে তাই করছে। অন্য কোনো মেয়ে হলে বলতাম, ওর বউ ওর দায়িত্ব! কিন্তু মেয়েটা আমাদের, দুজনের কাউকেই তো ফেলে দিতে পারব না।”
সাইফুল বললেন,
“ সার্থ তো, ছেলে মানুষ! কিন্তু তুই ওর ফুপি সানা। এভাবে রাগ করলে হয়? সন্তানরা তো ভুল করবেই।”
“ হ্যাঁ ভাইজান, তুমিতো এই কথা বলবেই। তোমার মেয়েকে বিয়ে করেছে না?। তোমার ঐ মূর্খ মেয়ে নিয়ে ভাইজানের ডাক্তার আর পুলিশ ছেলেতে যে যুদ্ধ লেগেছে, দিন তো তোমারই।”
সাইফুলের মুখটা থমথমে হয়ে গেল।
জয়নব ধমকে বললেন,
“ এসব কী কথা? বড়ো ভাইকে সম্মান করতে জানো না?”
“ আমি আর কিছু জানতে চাই না,আম্মা। তোমাদের জ্বালাতেও চাই না। আমি আর আমার মেয়ে চলে যাচ্ছি,তোমরা থাকো তোমাদের নাতি নাতনি নিয়ে।”
“ তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে সার্থ কে মেয়ে জামাই না বানাতে পেরে খুব দুঃখ পাচ্ছো! অথচ ওর একটা ফাঁকফোকর পেলে তুমিইত সবার আগে লাফিয়ে ওঠো মা!”
লিভিংরুমে তর্কাতর্কি চলছে।
আইরিনের এসব ভালো লাগছিল না। লাগেজ টানতে টানতে সোজা লনে এসে দাঁড়াল ও।
ঠোঁট ফুলিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলো কিছু পল। চোখটা জলে ভেসে গেল অমনি। গুমড়ে উঠল সার্থর জন্যে। মানুষটা কেন ওকে ভালোবাসল না? কেন ওকে অন্য চোখে দেখতে পারল না? হয়ত ও ভুল পথ নিয়েছিল,কিন্তু ভালোবাসায় তো ভুল ছিল না! যেখানে তুশি একটা গণ্ডমূর্খ, বস্তি থেকে উঠে এসেও সব জিতে নিলো,সেখানে ছোট্ট থেকে সবার প্রিন্সেস হয়ে শূণ্য রয়ে গেল আইরিন!
মেয়েটার ধ্যান ছুটল হর্নের শব্দে। অনেকক্ষণ ধরে প্যাপু আওয়াজটা বাজছে পেছনে। বিরক্ত হয়ে ফিরে চাইল আইরিন। জামিল জানলা থেকে মাথা বের করে বলল,
“ সরুন। নাকি ওপর দিয়েই চালাব?”
আইরিনের মন ভালো না। অন্য সময় তুমুল ঝগড়া করতে পারতো, কিন্তু আজ চুপচাপ সরে গেল এক পাশে। এতেই ভ্রু দুটো বেঁকে গেল ওর। তৎক্ষনাৎ গাড়ির ইঞ্জিন অফ করে নেমে এলো জামিল। একদম সামনে এসে বলল,
“ মিস আয়োডিন,কাঁদছেন কেন? কে মেরেছে?”
আইরিন হতভম্ব হয়ে বলল,
“ মারতে যাবে কেন?”
“ তাহলে চোখ ভাসিয়ে ফেলেছেন কেন? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুবই বিষণ্ণ এবং মনঃক্ষুন্ন নারী!”
আইরিন নাক কুঁচকে বলল,
“ কীহ? এই সোজা করে বলুন। আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি, এত কঠিন বাংলা বুঝি না।”
“ বাংলা -ইংলিশ ছাড়ুন। আপনাকে প্রথম বার কাঁদতে দেখে আমার হজম হচ্ছে না।”
আইরিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কেন?”
“ কেমন কুমিরের কান্না মনে হচ্ছে!”
আইরিন এসব বাগধারা বোঝে না। চোখ পিটপিট করে বলল,
“ কুমিরও কাঁদে?”
জামিল হাসিটা চাপা দিয়ে বলল,
“ আপনার কী হয়েছে বলা যাবে?”
“ ঢং করছেন,যেন জানেন না?”
“ আমি আসলেই কিছু জানি না।”
“ সার্থ ভাই যে বিয়ে করেছে আপনি জানেন না?”
“ হ্যাঁ তা জানি। বিয়ে করেছে, এখন তো সারাজীবন ও কাঁদবে তাই না। ওর জায়গায় আপনি কাঁদছেন কেন?”
আইরিন খিটমিট করে বলল,
“ ফাজলামো করছেন? মজা নিচ্ছেন তাইনা? ওনার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল,আর উনি তুশিকে বিয়ে করল। এখন আমি কাঁদব না, তো কি আপনার গলা ধরে নাচব?”
সবেগে মাথা ঝাঁকাল জামিল,
“ নোপ,নো চান্স। আপনি খুব খারাপ নাচেন। আমি আর কখনো আপনার সাথে নাচতে চাচ্ছি না।”
আইরিন মেজাজ খারাপ করে বলল
“ আচ্ছা ইলম্যানার্ড তো আপনি। এই আপনি নেমেছেন কেন? যান,নিজের কাজে যান।”
সাথে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল মেয়েটা।
জামিল ফোস করে শ্বাস ফেলে, পকেট থেকে রুমাল নিয়ে বাড়িয়ে দিলো ওর সামনে। আইরিন থমথমে গলায় বলল,
“ নো থ্যাংক্স!”
“ কাজল ঘেটে গেছে।”
“ মিথ্যে বলার জায়গা পান না? কাজল দিয়েছি আমি?”
“ ওহ, দেননি? আচ্ছা থাক,বাড়িয়েছি যখন নিন।”
আইরিন নিলো থাবা মেরে। ব্যস্ত হাতে মুছল চোখটা। আবার ফেরত দিলো!
জামিল বলল,
“ নিজেকে শক্ত করুন মিস আয়োডিন। “
“ আইরিন!”
“ আচ্ছা যাই হোক, শুরুতে আ-তো আছে। আপনি আমার কথা শুনুন,সার্থর জন্যে দুঃখ পাবেন না। বরং আনন্দ পান ওই ত্যাড়া ঘাড়ের ছেলেটা আপনার কপালে না জোটার জন্যে।”
“ সান্ত্বনা দিতে এলে ভালো করে দিন। উল্টোপাল্টা কথা বলছেন কেন?”
“ কী যে বলব! আসলে এই মূহুর্তে আপনার জন্যে আমার অনেক মায়া লাগছে।”
আইরিন ভেংচি কেটে বলল,
“ হুহ,মিথ্যুক! আমি আপনাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। সেদিন ডান্স ফ্লোরে সার্থর সাথে তুশিকে নাচানোর জন্যেই তো আমাকে আটকে রেখেছিলেন।”
ধরা পড়ায় জিভ কাটল জামিল। মাথা চুলকে বলল,
“ ইয়ে, তাতে কী? তখন ওকে সাহায্য করেছি, এরপর আপনাকে করব। আমি তো খুব পরোপকারি মানুষ।”
“ চাই না সাহায্য।”
“ আমি আপনার শত্রু নই। বরং এক দিক থেকে আমাদের অসীম মিল। মনে মনে আমরা আত্মীয়!”
আইরিন কপাল গুছিয়ে বলল,
“ আত্মীয়!”
“ ইয়েস, যেমন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই,তেমন ছ্যাকায় ছ্যাকায় ছ্যাকাতো ভাই। অল্প হোক বা বেশি, ছ্যাকা তো আমরা দুজনেই খেয়েছি। তাই আমরা আত্মীয়!”
আইরিন তব্দা খেয়ে চেয়ে রইল। দাঁত বের করে হাসল জামিল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ সুন্দর কথা বলেছি না? চাইলে দার্শনিক হতে পারতাম।”
“ আপনি কি আসলেই ইঞ্জিনিয়ার?”
“ জি,কেন?”
“ এত লেইম ইঞ্জিনিয়ার আমি আমার জন্মে দেখিনি।”
জামিলের হাসিটা দপ করে মুছে গেল অমনি। কিছু বলার আগেই রোকসানা হাজির হলেন সেখানে। ওকে দেখে বললেন,
“ আরে বেটা,তুমি?”
জামিল সালাম দিয়ে বলল,
“ সার্থ ডাকল আন্টি। আছে বাসায়?”
সহসা মুখ কালো করে ফেললেন তিনি। ঝামটা মেরে বললেন,
“ জানি না। চলো কিউটি!”
মেয়ের হাতটা টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠে গেলেন রোকসানা। জামিল একটু অবাক হলো। হাসিহাসি নারী,হঠাৎ রেগেমেগে পাড়ি দিচ্ছে গাড়ি? কেন? ততক্ষণে ওদের গাড়ি গেইট
পেরিয়ে যাচ্ছে। সেসময় আইরিন খোলা জানলা থেকে একবার পাশ ফিরে চাইল। অমনি জামিল হাত নেড়ে বলল,
“ বাই বাই!”
ভেংচি কেটে মুখটা আবার ফিরিয়ে নিলো আইরিন। জামিল ভড়কে যায়। বিড়বিড় করে বলে,
“ এরা বিটিভির অ্যান্টেনা নাকি? যখন তখন ঝিরঝির করে কেন?
সার্থ তৈরি হচ্ছে। ওইভাবেই কয়েকবার দোরের পথটা দেখল সে। অপেক্ষা করল, বসন্তের শীতল হাওয়ার মতো কারো আগমনের জন্যে। তুশি এলো তখনই। বাইরে পায়ের শব্দ পেয়ে তুরন্ত নজর সরিয়ে পাথর হলো সার্থ। মনোযোগ ফেলল আয়নায়।
তুশির গতি থামল চৌকাঠে এসে। চুপটি করে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। জিভে ঠোঁট চুবিয়ে মাথা নুইয়ে রইল, পা দিয়ে খুটল মেঝের টাইলসটা। সময় কাটে,অথচ একটা কথাও বলে না ওরা। তুশি একবার চাইল প্রশ্ন করবে। সোজাসুজি জিজ্ঞেস করবে- কালকের কথা। কিন্তু মনে হলো,সেটা বড্ড বেহায়াপনা হবে। তাই আর বলল না কিছু। এর মাঝে মিন্তু এলো,জানাল – জামিল এসছে।
সার্থ বেরিয়ে যেতে নেয়,তুশি নড়েচড়ে ওঠে। যেন বলতে চায় কিছু! হঠাৎ কী ভেবে থামল সার্থ। ফিরে চাইল না তবে। ওইভাবেই বলল,
“ ফিরতে রাত হবে।”
ইউশার দিন আজকেও ভালো কাটেনি। ঘুম থেকে উঠে দেখেনি অয়নকে। ফোনও ধরছে না আজ। মানুষটা এত ভেঙে পড়বে জানলে ইউশা কখনো এরকম পাকামো করতে যেত না। যখন প্রথম অয়ন বলেছিল,ও তুশিকে ভালোবাসে, ইউশার উচিত ছিল সেদিনই সত্যি বলে দেয়া। এই অনুতাপ, আফসোস এখন প্রতিদিন ওকে কুড়েকুড়ে খাবে না?
মেয়েটা পোড়া শ্বাস ফেলে বসার ঘরে এলো। অমনি মুখোমুখি হলো জামিলের সাথে। ঠোঁট টেনে হাসল ছেলেটা। ছোটো শব্দে বলল,
“ হাই।”
ইউশাও হাসল একটু। সালাম দিলো পরিবর্তে।
জামিল শুধায়,
“ এক্সাম চলছে?”
“ হ্যাঁ। আজকে থেকে শুরু।”
“ প্রিপারেশান কেমন?”
“ ওই আরকি। আপনি কখন এলেন?”
“ এইত সবে। তুমি দিন দিন এত শুকিয়ে যাচ্ছো কেন ইউশা? খাওয়াদাওয়া করো না?”
ইউশা মলিন চোখে হাসল।
কথা পালটে বলল,
“ আপনি থাকুন জামিল ভাই,আমার একটু তাড়া আছে। প্রথম পরীক্ষা, আগেভাগে যাওয়া দরকার। আমি আসি?”
জামিলের মন খারাপ হলো বোধ হয়। মুখের হাসিও কমল একটু। মাথা নেড়ে বলল,
“ যাও।”
ইউশা বেরিয়ে গেল। মেয়েটার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল সে। তক্ষুনি পাশে এসে দাঁড়াল সার্থ। পারফিউমের গন্ধেই জামিল বুঝল,কে! সেই আগের মতো উচ্ছ্বল হেসে তাকাল ও। বলল,
“ ডাকলি,চলে এলাম।”
“ বের হয়ে কথা বলি।”
দুজন যেতে নিলেই তনিমা ও ঘর থেকে উদ্বেগ নিয়ে বললেন,
“ কীরে, কই যাচ্ছিস? খাবি না?”
“ বাইরে খেয়ে নেব।”
“ আর জামিল? ওর নাস্তা দিলাম তো।”
“ আমিও বাইরেই খাব আন্টি। এদেশের পুলিশদের তো চেনেন,কথা না মানলে জেলে ভরে দেয়।”
তনিমা হেসে ফেললেন। সার্থ ওর কলার ধরে টান মারল। হোচট খেতে খেতে আসামীর মত এগোলো ছেলেটা ।
শওকত সবে খেয়ে উঠেছেন। রাত তখন অনেক! হাত ধুচ্ছিলেন বেসিনে। ঘাড় ফিরিয়ে বললেন,
“ আর কতক্ষণ বসে থাকবে? খেয়ে নাও।”
তনিমা ঘড়ি দেখে বললেন,
“ দেখি আরেকটু। দুটো ছেলের কেউই এলো না।”
“ তোমার মেজো ছেলের কথা জানি না,তবে অয়ন নিশ্চয়ই ব্যস্ত। নাহলে ও এত রাত করে ফেরার লোক নয়!”
রেহণূমাও বসে আছেন না খেয়ে। জা-কে ছাড়া খান না তিনি। বললেন,
“ আমারো তাই মনে হয়, আপা। সার্থ তো প্রায়ই বাড়ি ফিরতো না। কিন্তু অয়ন খুব কাজ না থাকলে দেরি করার ছেলে নয়।”
তনিমার চিন্তা কমল না তাও। তিনি তো জানেন,ছেলের মনের কী অবস্থা এখনো! বাড়ি থেকেই না সন্ন্যাস নিয়ে নেয়। শুধু ছোটো কণ্ঠে বললেন,
“ ফোনও তো ধরছে না।”
রেহণূমা মেয়েদের দিকে দেখলেন একবার। তুশি,ইউশা যেন দুটো পুতুল পাশাপাশি বসে আছে। কারো মুখে কথা নেই, তবে এক রাশ চিন্তায় ওরা! উনি কপাল কুঁচকে বললেন,
“ কী রে,ইউশা,তুশি নাহয় সার্থর জন্যে খাচ্ছে না। তুই বসে আছিস কেন?”
দরজায় লেগে থাকা ইউশার উদগ্রীব নজর তটস্থ হয়ে ফিরল। নড়েচড়ে বলল,
“ আমি তো মা,ওই… তোমরা খাওনি কেউ, আমি খেলে কেমন দেখায় তাই বসে আছি।”
সাইফুল বললেন,
“ কাউকেই আর বসতে হবে না। টেবিলে চলে এসো। ইউশা,তোমার কাল পরীক্ষা নেই?”
“ না, আব্বু। আবার চার দিন পর। আরেকটু বসি, ভাইয়ারা আসুক।”
এদিকে তুশি মহাচিন্তায় পড়েছে। এক দিকে অয়ন, ওর জন্যেও খারাপ লাগছে বৈকি! কাল অত কঠিন কঠিন কথা শোনাল এ নিয়ে আবার কিছু হলো না তো? কিন্তু না বলেও উপায় ছিল না। একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হচ্ছিল যে।
অন্যদিকে সার্থর চিন্তাও কিছু কম নেই। লোকটা হঠাৎ এমন পাথর হলো কেন? কাল থেকেই ওর সাথে ঠিকঠাক কোনো কথা বলছে না। কিছু উল্টোপাল্টা শুনিয়ে জ্বালাচ্ছেও না।
তক্ষুনি বাইকের হর্ন শোনা গেল। দারোয়ান মোটা গেইট টেনে সরালেন। ওই ঝনঝন শব্দে তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়াল তুশি। চোখেমুখে সীমাশূন্য উদ্বেগ ছুটে এলো সাথে। তনিমা একটু হাসলেন। পরপর ডুব দিলেন আরেক ছেলের অপেক্ষায়! সার্থ বাড়ি ঢুকল। বসার ঘরের সবাইকে ছাপিয়ে,কথাবার্তা না বলে সোজা রওনা করল ঘরে। তুশি ওরনার সুতোতে হাত প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে দাদির দিকে চাইল। হাসনা সঙ্গে সঙ্গে চোখের ইশারায় বোঝালেন,
“ যা।”
তুরন্ত ছুটল তুশি। সেই সকালের মতো দরজার এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। সার্থ ইউনিফর্ম ছাড়ল, ওয়াশরুমে গেল,চোখেমুখে পানি দিয়ে আবার বেরিয়েও এলো অথচ একটা কথাও বলল না। তুশির মেজাজ এইবার গরম হয়ে যায়। কী ভাব নিচ্ছে দেখো! কাল তো ঠিকই ইনিয়েবিনিয়ে চুমু খেয়ে ফেলল। নিজের সব ঝাল তুশির ঠোঁটের ওপর দিয়ে মিটিয়েছে। থুত্নি সুদ্ধ সারারাত জ্বলেছে ওর। কিন্তু তাও ও কিছু বলেছিল? বলেনি। কোনো দোষও করেনি। তবে এত ঠাটবাট কীসের?
তুশি আর দাঁড়াল না। কথা না বললে নেই, কাল আর পরশু অবধি দেখবে,ওর অত কথা বলারও শখ নেই।
তুশি একা একা ভেংচি কাটে। আসমা ওপরে এলো তখনই। সামনে ওকে পেয়ে বলল,
“ আপা,ভাইজানের ভাত বাড়ছে।”
“ আমাকে বলছো কেন? যারটা তাকে বলো যাও।”
তুশির চেহারা দেখে আসমা একটু মিইয়ে গেল। আয়হায়,এত হাসিখুশি মানুষটা চটলো কেন হঠাৎ?
তুশি ফের নিচে যখন এলো,তখন নারীপক্ষ টেবিলে বসেছে। কারণ,এতক্ষণে কল ধরেছে অয়ন। জানিয়েছে, কাছাকাছি আছে। আসছে প্রায়। জয়নবকে ওষুধ খেতে হয় বলে, রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খান। এতক্ষণে ঘুমের পথে পাড়িও দিয়েছেন তিনি। তুশি সোফায় বসল বোম হয়ে। রেহণূমা বললেন,
“ কী রে,ওখানে বসলি কেন? খেতে আয়।”
“ খাব না।”
“ আবার কী হলো? এইত বিকেলে কত আদর টাদর করলাম।”
“ আমি তোমার ওপর রেগে নেই।”
“ তাহলে?”
তুশি জবাব দিলো না। ঠোঁট গোজ করে রইল। সার্থ হাজির হলো সেসময়। চেয়ারে টান দিতেই তনিমা বললেন,
“ তুশির কী হয়েছে? কিছু বলেছিস তুই?”
ও পালটা প্রশ্ন করল,
“ আমি সারাদিন বাসায় ছিলাম?”
তুশির ব্রক্ষ্মতালু পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কী নাটক রে! নিজে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ঢং করছে?
তক্ষুনি খোলা দোর দিয়ে বাড়ি ঢুকল অয়ন। ইউশা তড়িৎ সোজা হয়ে বসল। কিছু বলবে,পূর্বেই মুখ খুললেন তনিমা। বললেন,
“ এসেছিস? ফ্রেশ হয়ে আয়, যা। খাবার দিই।”
অয়ন গোটা ঘরে দেখল একবার। সবাই আছে এখানে। শওকতও বসেছিলেন ছেলের জন্যে। সকালের পত্রিকা ছিল হাতে। ভোর ভোর কাজে বের হওয়ায় পড়া হয়নি। ওকে দেখেই
বললেন,
“ এত দেরি করলে যে? আচ্ছা থাক,এসব পরে হবে। যাও, আগে হাতমুখ ধোও। সবাই তোমার জন্যে বসেছিল!”
তারপর উঠে ঘরের দিকেই যাচ্ছিলেন তিনি,
অয়ন ডাকল আস্তে করে,
“ বাবা,শোনো।”
থামলেন ভদ্রলোক। ভেতরে গাঢ় অস্বস্তিটা চাপা দিয়ে সোজাসুজি তাকালেন। ইস, ছেলেটার চেহারায় অবস্থা শোচনীয়। কেমন মরা মরা চোখদুটো! অয়নের জন্যে শওকতের ভীষণ মায়া লাগে! কেন যে তুশির সাথে বিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। এখন প্রতিদিন মরবে ছেলেটা! আর বাবা হয়ে তিনি কিছুই করতে পারলেন না। মোলায়েম স্বরে শুধালেন,
“ কিছু বলবে?”
অয়ন এপ্রোন আর হাতের স্থেটোস্কোপ নামিয়ে রাখল টেবিলের ওপর।
আরেকবার সবাইকে দেখে বলল,
“ কথাটা বাড়ির সবার উদ্দেশ্যেই বলব। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলে ভালো হয়!”
সার্থ বাদে, তৎপর হয়ে চেয়ে রইল সকলে। তুশি শুধু মেঝের দিকে তাকিয়ে কচলে গেল আঙুল। তনিমা এগিয়ে এলেন। সাইফুলও এসে দাঁড়ালেন কাছে।
“ কী হয়েছে রে?”
অয়ন জিভে ঠোঁট ভেজাল, বলল,
“ লাস্ট মান্থ আমি একটা ফেলোশীপের চান্স পেয়েছিলাম না ইউ-কেতে?”
“ হ্যাঁ, বলেছিলে আমাকে। বাড়ি ছেড়ে যাবে না বলে হোল্ড করেছিলে।”
“ আমি ওখানে আবার মেইল করেছিলাম। আজকে সন্ধ্যে নাগাদ ওদের রিপ্লাই এসেছে। সীট খালি থাকায় ওরা আমাকে এক্সেপ্ট করেছে।”
শওকতের ভ্রু কুঁচকে এলো,
“ মানে!”
অয়ন শ্বাস নেয়। একবার এক সেকেন্ডের জন্যে দেখে নেয় তুশির নতজানু মুখটা। ঘোষণা দেয় বিষণ্ণ সুরে,
“ কাল আমার ফ্লাইট! আমি
বরাবরের মতো দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বসার ঘরে বিস্ফোরণ হলো। চমকে উঠল সকলে। খাওয়া ছেড়ে তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেল সার্থ। আর ইউশা! ঐ এক কথায় পৃথিবীটা কেঁপে উঠল ওর। চোখে ঝাপসা দেখল সব কিছু!
চলবে….
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭ ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮
-
সমুদ্রকথন পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯