Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.৩


কাছেআসারমৌসুম__(৬৮.৩)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

গরমে ঘেমে-নেয়ে বাইরে থেকে মাত্রই বাড়ি ঢুকল ইউশা। পরপর তিনটা ক্লাস ছিল আজ। ক্লান্তি সাড়তে সোফায় মাথা হেলে বসল ও। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
“ মা,এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দাও!”
রেহণূমা নিচে নেই। উত্তরও এলো না। তবে ক মিনিট বাদেই,মুখের সামনে একটা পানির গ্লাস হাজির হলো। চোখ ঘুরিয়ে ফিরল ইউশা। তুশি মুচকি হাসল। সঙ্গে সঙ্গে ইউশার চেহারা তলিয়ে গেল আঁধারে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল একটু। মাথা নত করে গ্লাসটা হাতে ধরল সে।
খেলো না, মুঠোয় ধরেই রাখল শুধু। তুশি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু না, ইউশা মুখে কুঁলুপ এঁটেছে। পানিটাও তো খাচ্ছে না। তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে যেতে নেয়,চট করে হাতটা ধরে ফেলল ইউশা।
“ তুশিই!”
ও থামল,ফিরল আবার।
ইউশা মাথা নুইয়ে বলল,
“ চলে যাচ্ছো কেন?”
“ তুমি তো থাকতে বলোনি।”
ইউশা অনুনয় করে,
“ একটু বসবে আমার পাশে?”
খুব স্বাভাবিক হাসি ঠোঁটে নিয়েই, হেঁটে এসে বসল তুশি। ইউশার কানের পাশ বেয়ে ঘাম নেমেছে। ও যত্ন নিয়ে ওরনা দিয়ে মুছে দিলো সেটুকু। জিজ্ঞেস করল,
“ বাইরে কি অনেক রোদ? মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে!”
ইউশার বুক মুচড়ে উঠল,কান্না পেলো। ঠোঁট ভেঙে গেল সেই দুঃখের তোড়ে।
ধড়ফড় করে তুশির হাতদুটো ধরে বলল,
“ আমাকে মাফ করে দাও তুশি। আমার ভুল হয়ে গেছে!”
তুশি তাজ্জব হয়ে বলল,
“ তুমি কেন মাফ চাইছ? তোমার দোষ কী?”
“ আমিই, আমিইত সব করলাম। আমি যদি তোমাকে ইমোশনালি ব্লাকমেইল না করতাম,তুমিত বিয়েতে রাজি হতে না। এত প্রেশার পড়তোই না তোমার ওপর। কিচ্ছু হতো না এসব। আমার জন্যেই তুমি পালিয়ে যাচ্ছিলে। আমার একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্যে। কিন্তু বিশ্বাস করো,আমি তোমার ভালোর জন্যে করতে চেয়েছিলাম। যখন দেখলাম, মেজো ভাইয়া দিনের পর দিন তোমায় কাঁদাচ্ছে,অবহেলা করছে,তোমার সামনে দিয়ে আইরিনকে বিয়ে করতে চাইছে, আর অন্যদিকে অয়ন ভাই ভালোবাসার ঝুরি নিয়ে বসে আছে তোমার জন্যে, তখন আমি আর কোনো উপায় পাইনি। আমার মনে হয়েছিল,তুমি কেন কাঁদবে? তুমিও তো ভালো থাকা ডিজার্ভ করো,সুখ পাওনা তোমার। আর সেই সুখ অয়ন ভাই হলে তো ক্ষতি নেই। কিন্তু কোত্থেকে যে কী ঘটে গেল!
কাল যখন মা তোমাকে মারল,ওই চড়টা তোমার চেয়েও বেশি আমার গায়ে লেগেছে তুশি। আমি তখন চেয়েও বলতে পারিনি,এর পেছনে আমি দ্বায়ী। তখন অয়ন ভাই যা পাগলামি করছিল,যদি জানতো আমার কথায় তুমি বিয়েতে রাজি হয়েছিলে,ভাবতো আমি ওকে করুণা করেছি। তারপর যে কী করতো কে জানে! হয়ত জেদের বশে নিজের ক্ষতিই করে দিত! সব মিলিয়ে আমি নিজেই এত এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম। আমি চেয়েও কিছু করতে পারলাম না। সব শুধু দর্শক বনে দেখলাম,শুনলাম। কত বড়ো অপরাধ আমার আল্লাহ,আমি তো ক্ষমারও অযোগ্য! আর সেজন্যে কাল হাজারবার চেয়েও আমি তোমার সামনে এসে দাঁড়াতে পারিনি। কোন মুখে আসব? কোন মুখে!”
ইউশা দুহাতে মুখ চেপে হুহু করে উঠল। তুশি ব্যাতিব্যস্ত হয়ে বলল,
“ ইউশা,আমি- আমি সব ভুলে গেছি। তোমার ওপর আমার কোনো রাগ নেই। এগুলো আমার ভাগ্যে লেখা ছিল। আর যা লেখা তাতো হবেই।”
“ তুমি আমার ওপর রেগে নেই?”
“ প্রশ্নটা আমার করা উচিত। তুমি রেগে নেই?”
“ আমি রাগ করব? কোন যুক্তিতে? কী যুক্তিতে?”
“ তাহলে এসব কথা বাদ দাও। আমরা আমাদের কথা বলি। শেষ কতদিন ওই দুইভাই ছাড়া আমাদের কথা হয়নি ইউশা। আমাদের দুবোনের কী আলাদা কোনো কথা নেই?”
ইউশা চেয়ে রইল ভেজা চোখে। পরপর আকুল হয়ে বলল,
“ একবার জড়িয়ে ধরব তোমায়? মনে হচ্ছে আমরা একে অপরকে অনেকদিন জড়িয়ে ধরিনি।”
তুশি হাসল। নিজেই ধরল হাত বাড়িয়ে। সময় কাটল কিছুক্ষণ। ইউশা চোখ মুছল, সহজ হলো। ভুলে গেল গত দুদিনের সব কলহদের।
বরং মৃদূ হেসে বলল,
“ নাকফুল পরায় তোমায় কেমন অন্যরকম লাগছে! নববিবাহিতা সুন্দরী নারী। ভাইয়া কিনে দিয়েছে?”
তুশি চিবুক নুইয়ে মাথা নাড়ল। মনে মনে বলল,
“ শুধু কি কিনে দেয়া? পরিয়েও দিয়েছে।”
ইউশা বলল,
“ আমি এমন দোটানায় আছি নিজেকে নিয়ে। এক দিকে অয়ন ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ে না হওয়ায় কষ্ট হচ্ছে,আরেকদিকে মেজো ভাইয়ার সাথে সব মিটে যাওয়ায় আনন্দ হচ্ছে। কোন দিকে যাব বুঝতে পারছি না।
অয়ন ভাই খুব ভেঙে পড়েছে জানো,তুশি!”
তুশি ছোট জবাব দিলো,
“ জানি।”
“ আচ্ছা, তুমি পালিয়ে গেছিলে কেন? মা বাবা বা বড়ো মাকে বললেই তো বিয়ে ভেঙে দিত। সবাই তো তোমাকে খুব ভালোবাসে!”
তুশি আর রাখ-ঢাক রাখল না। সরাসরি বলল,
“ ভেবেছিলাম আমাকে না পেয়ে বাড়ির মান-সম্মান বাঁচাতে সবাই অয়ন ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দেবে।”
ইউশা নিস্তব্ধ হয়ে বলল,
“ কীহ?
তুশি, আর ইউ ইনসেইন! তোমার মাথায় এমন গার্বেজ বুদ্ধি এলো কী করে? এরকম হয় কখনো?”
“ হয়তো,সিনেমায় কত দেখেছি।”
ইউশা চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ তুশি জীবনটা সিনেমা নয়! বাস্তবে এসবের কোনো ভিত্তি নেই।”

“ তাহলে যে আমার সাথে হলো। এক তুশি পালিয়ে যাওয়াতেই তো আরেক তুশি আটকা পড়ল সেখানে। আর, আর আমাদের বস্তিতেও হয়েছিলো একবার,দাদিকে জিজ্ঞেস করে দেখো৷ দাদি জানে।”
ইউশা কাষ্ঠ হেসে বলল,
“ সবাই এক না তুশি। সবার পরিস্থিতি,সবার চিন্তাভাবনাও এক না। অয়ন ভাইকে তুমি চেনোইনি। ভাইয়া কোনোদিনও জোরাজোরির কবলে পড়ে আমায় বিয়ে করত না। আর সত্যি বলতে অমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমিও করতাম না। ভিক্ষা করে ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে না পাওয়া অনেক ভালো।”
তুশি নিজের বোকামির কথা জানে,মানেও। তাই আর যুক্তি দিতে গেল না। শুধু ইউশার হাতের পিঠে হাত রেখে বলল,
“ অয়ন ভাইকে একটু সামলে নিও, ইউশা। আমি ওনাকে এতটা কষ্ট দিতে চাইনি। ভেবেছিলাম আমাকে না পেলেও,তুমি তো ওনার থাকবে। অথচ সেসব তো হলোই না,উলটে কী থেকে যে কী করে ফেললাম!”
ইউশা মলিন হেসে ভাবল,
“ আমি সামলাব? আমার কি আর সে ক্ষমতা আছে?”
মুখে বলল,
“ আচ্ছা, ছাড়ো এসব। তুমি তোমার কথা বলো। ভাইয়ার সাথে সংসার কেমন কাটছে? মিটল সব? ভাইয়া নিশ্চয়ই এখন খুব ভালোবাসে তোমায়! কাল তো দেখলাম অয়ন ভাইকে হাতও ধরতে দিচ্ছিল না। কত্ত পজেসিভ বাবাহ!”
তুশি হেসে ফেলল। কেমন রোবটিক হাসি! বলল নিস্তেজ স্বরে,
“ ওই আরকি….”
পরপরই তুশির সকালের কথা মনে পড়ল। উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ আচ্ছা ইউশা,আই- ওয়ান্ট না না আই ব্যাডলি ওয়ান্ট টু টেস্ট ইয়র লিপ্স,এটার মানে কী?”
ইউশা হতভম্ব হয়ে বলল,
“ এ্যাহ?”
“ মানে কী এটার? মানে এই কথার মানে কি আমার অপরাধ মার্জনা করুন?”
ইউশা তব্দা খেয়ে বলল,
“ এটা কে বলল?”
“ বলো না মানে কী?”
ইউশার মুখ লাল হয়ে গেল! এক নজর এদিক ওদিক চেয়ে ভালো করে দেখল কেউ শুনছে কিনা। ঠোঁট এগিয়ে ফিসফিস করে কানে কানে বলল মানে কী!
তুশি যেন আকাশ ভেঙে ধপ করে মাটিতে পড়ল অমনি। লজ্জায় কান গরম হলো,ধোঁয়া ছুটল মাথা থেকে৷ বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে রইল দু পল। এত বড়ো একটা বেহায়াপনা সার্থ ওকে দিয়ে করিয়ে নিলো আজ? এজন্যেই, এজন্যেই তখন ঠোঁট এগোনো হচ্ছিল! কত্ত বড়ো খারাপ! বিটকেলের ঘরের বিটকেল, চুমু খাওয়ার ধান্দা। ওই সময়ের কথা মনে পড়তেই,মেয়েটা কুণ্ঠায় ঝাপসা দেখল চোখে। কিছুক্ষণ থমকে থেকে নিজের দুকান দুইহাত দিয়ে চেপে ধরল তুশি। আর্তনাদ করে বলল,
“ নায়ায়ায়ায়ায়া,এই কথা বলার আগে আমার মরণ কেন হলো না! আল্লাহ,আল্লাহ আমি এখন মুখ দেখাব কী করে?”
ইউশা অবাক হয়ে বলল,
“ কেন, কাকে বলেছ এটা? ওয়েট,মেজো ভাইয়াকে না তো?”
তুশি কাঁদোকাঁদো মুখ করে ঘাড় নাড়ল। বোঝাল-হ্যাঁ। ইউশা হাসি চেপে রাখতে চেয়েছিল,হলো না! খিকখিক করে হেসে উঠল অমনি। হাসতে হাসতে পেট চেপে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল সোফায়।
তুশির মাথা জ্বলে গেল। কটমট করে ভাবল,
“ আজ আসুক বিটকেলটা!
একটা শোধ যদি না তুলেছি,আমি তুশি ভুষি খেয়ে মরব।”


তুশি ঘর থেকে ওর মাথার বালিশটা নিতে ভুলে গিয়েছিল। আসমাও দিয়ে যায়নি। এই বালিশটা উঁচু, দুটো বালিশের সমান। উঁচু বালিশ ছাড়া তুশি ঘুমোতে পারে না। তাই নেয়ার জন্যে নেমেছিল নিচে। রেহণূমা সামনে পড়লেন সেসময়। কাজবাজ শেষ করে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। চাইলেন, মেয়ের সাথে কথা বলতে-কিন্তু তুশি দাঁড়ালই না। দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেল! ভদ্রমহিলা আক্ষেপের শ্বাস ফেললেন। ভাবলেন,পরে ঠিক আদর করে মান ভাঙিয়ে নেবেন। তক্ষুনি ঘর থেকে বের হলেন রোকসানা। ওনাকে দেখেই ব্যস্ত গলায় বললেন,
“ টেবিলে খাবার দিয়েছ ছোটো ভাবি? আমার কিউটি খাবে। কত কষ্টে যে একটু খাওয়াতে রাজি করলাম! সার্থর বিয়ের শোকে বেচারি খুব ভেঙে পড়েছে।”
রেহণূমারও খারাপ লাগল। বললেন,
“ আমি সব বেড়ে রেখেছি। তুমি যা লাগবে ওকে খাইয়ে দিও।”
“ ঠিক আছে। কই কিউটি, এসো?”
রেহণূমা দাঁড়ালেন না। নিজের কক্ষে চলে গেলেন। ওদিকে তুশি বড়োসড়ো মোটা বালিশটা বাহুর তলায় চেপে মাত্রই আসছিল,আইরিন আর ও মুখোমুখি পড়ে গেল অমনি। মেয়েটার হাতে বালিশ দেখে আইরিন থেমে যায়। এক দু-বার,বারবার চেয়ে চেয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। রোকসানা বিড়বিড় করে বললেন,
“ এই মেয়ের এখনই সামনে পড়তে হলো!”
তুশি কপাল কুঁচকে বলল,
“ কী? সামনে খাম্বার মত দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাব সরো।”
আইরিন বালিশটাকে আবার দেখল। মাথায় ঘুরছে কিছু দিন আগে ওর সেই স্বপ্নের কথা। সেই যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্বিবাস্বপ্ন দেখেছিল সেদিন,তুশি বালিশ-কাঁথা নিয়ে কোথাও একটা যাচ্ছে! আর আইরিন ‘কোথায় যাচ্ছ’’ প্রশ্ন করতেই খুব ভাব নিয়ে বলল, আমার স্বামীর ঘরে! ভেতর ভেতর আঁতকে উঠল বেচারি।
ঢোক গিলে বলল,
“ বালিশ নিয়ে কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
তুশি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো,
“ আমার স্বামীর ঘরে।”
আইরিনের মাথায় বাজ পড়ল। চোখটা খিচে নিলেন রোকসানা। দিয়েছে,এত বুঝিয়ে শুনিয়ে মেয়েকে খেতে বার করার পুরো গোষ্ঠি উদ্ধার করে দিয়েছে !
কিন্তু তুশি আর থামেনি। সানন্দে আইরিনের পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠে গেল।
আইরিন পাথর হয়ে রইল তখনো। রোকসানা রয়েসয়ে কাঁধে হাত রাখলেন,
“ কিউটি,খাবে চলো!”
রোষে-কান্নায় ফেটে পড়ল আইরিন। মায়ের হাত সরিয়ে দিল এক ঝটকায়। চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ খাব না আমি। খাব না, খাব না, খাব না।”
তারপর হাওয়ার মত ছূটতে ছুটতে ঢুকে গেল ঘরে।

অয়নের বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হলো। মধ্যরাত তখন! এত প্রেসার গিয়েছে আজ! সেই সাথে মানসিক বিধ্বস্ততা তো আছেই।
এমন প্রখর দ্বিধাদন্দ্বে হয়ত এর আগে পৃথিবীর আর কেউ পড়েনি। যে পরিস্থিতি আজ অয়নের যাচ্ছে। মন-মস্তিষ্কের এক বিরাট লড়াই লেগেছে সেথায়। মত-বিরোধে ফেটে চৌচির ওরা। মস্তিষ্ক বলছে তুশির বিয়ে হয়েছে,এবার সত্যিই ও বড়ো ভাইয়ের বউ! ওই বিয়ে অবৈধ হলেও,এই বিয়ে শতগুণ বৈধ অয়ন। এবার থামা উচিত।
আর মন? সে বলছে ভিন্ন কথা। বলছে, এসব মিথ্যে। তুশির সাথে ওর বিয়ের কথা ছিল। তুশির তবে ওরই হওয়া উচিত। সার্থ জোর করেছে বলেই তো তুশি আলাদা হয়েছে। জোর না করলে এমন কিচ্ছু হতো না। এ বিয়ে কোনো বিয়েই হতে পারে না।
অয়ন মস্তিষ্ক ছাপিয়ে মনকে দমাতে পারছে না। এটা বড্ড বেপরোয়া! আর সেই বেপরোয়া চিত্ত নিয়েই ফের স্টোর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটা। দরজা তখন ঠা করে খোলা। সোজাসুজি ভেতরটা দেখেই চমকে গেল অয়ন।
তুশির বিছানার তোশক ভাঁজ করে রাখা। ঘরে ফার্নিচার ছাড়া একটা জিনিসও নেই। না আছে পড়ার টেবিলে ওর বইখাতা,আলনার জামাকাপড়, ড্রেসিং টেবিলে সাজগোজের জিনিস আর না আছে বিছানায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো তুশির তুলতুলে বালিশটাও। কিছুপল মূর্তির মতো চেয়ে রইল অয়ন। পরপর উদ্ভ্রান্তের ন্যায় কোথাও একটা যেতে নিলেই,
সামনে পড়ল আসমা। জিজ্ঞেস করল
“ বাইজান বাত দিমু?”
অয়ন শশকের ন্যায় ব্যস্ত গলায় বলল,
“তুশি কোথায় জানো?”
“ হে তো হের ঘরে।”
“ ঘর যে ফাঁকা।”
“ আপায় তো ভাইজানের ঘরে।”
অয়নের পায়ের জমিন সরে গেল। শরীরটা পিছিয়ে এলো আস্তে। বাকরুদ্ধ হয়ে রইল দু পল। আসমা ওর দিকে তাকাল না। বাড়ির কাণ্ডকারখানা ওর তো আর অজানা কিছু না। সবই জানে, দেখছে সবই! অস্বস্তিতে চুর হওয়া মুখ নিয়ে চুপচাপ মাথা নুইয়ে নিজের কামড়ায় চলে গেল আসমা। অয়ন দাঁড়িয়ে রইল জড়ের ন্যায়। বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে৷ ছারখার হয়ে পড়ছে চারিধার! সবাই
যেন হাঁসফাঁস করে বলল,
“ এমন তো কথা ছিল না তুশি!”


সার্থ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল তুশি আদুরে বাচ্চার মতো বিছানায় বসে আছে। পা দুটো সামনে ছড়ানো,কোমর অবধি ব্লাঙ্কেটে ঢাকা। হাতে চিপস। মিন্তু দিয়ে গেছে। ওগুলো চিবোতে চিবোতে খুব মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছে মেয়েটা। কুড়মুড়ে শব্দতে ভরে গেছে ঘর। ও অবাক হলো কিছু। যখন ঘরে ঢুকেছিল, তুশি ছিল না এখানে। এর মধ্যে এলো কখন? তার চেয়েও বিস্ময়ের ব্যাপার এত সহজে বিছানায় চলে গেল? বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁকা হাসল সার্থ। সকালের ডোজ তবে কাজে দিয়েছে? তোয়ালে দিয়ে ভেজা মাথা মুছতে মুছতে বলল,
“ সুবিদ্ধি এসছে তাহলে?”
তুশি তাকাল না। গোমড়ামুখে বলল,
“ আমি মেঝেতে ঘুমোতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দিদুন বলেছে এখন থেকে এটাই আমার ঘর। আমার ঘরে আমি মেঝেতে কেন শোব? আমি খাটেই ঘুমোবো। তবে আমাদের মাঝখানে অবশ্যই আমার কোলবালিশটা থাকবে।”
“ আচ্ছা? কিন্তু মাঝরাতে যদি ঘুম ভেঙে দেখো তোমার কোলবালিশ নিচে, আর আমি ওপরে। তখন?”
তুশি বলল,
“ আপনি তো বিছানাতেই শোবেন। আপনাকে আমি মেঝেতে শুতে বলিনি।”
“ আমি ওই ওপরে বোঝাইওনি।”
“ তাহলে কীসের ওপরে?”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল ,
“ আহাম্মক!”
তুশি কান সজাগ রাখলেও শুনতে পেলো না। তবে ওর আগ্রহ আপাতত অন্য কোথাও। সার্থ সকালে ওকে জব্বর বোকা বানিয়ে গিয়েছে।
এরকম বলদ তুশি ওর এই বিশ বছরে কোনোদিনও হয়নি। এর শোধ না নিলে ওর নাম খারাপ হবে না? তুশি নিজের পরাজয় মেনে বসেও থাকতে পারছে না, আবার ভাবতে ভাবতে মাথা খারাপ করেও মাথায় কিছু আসছে না। এদিকে সার্থ দেখল তুশি মেঝেতে চিপ্স ফেলেছে, টানটান বিছানার চাঁদরেও পড়েছে কিছু। এমনকি ওর সামনেই খালি প্যাকেট দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে মারল মেঝেতে। চ্যাটচ্যাটে হাতটা মুছে ফেলল নিজের ওরনায়। এসব দৃশ্যে নাক কুঁচকে হতাশ শ্বাস ফেলল ছেলেটা। এটাকে মানুষ বানাতে এখনো অনেক কাঠ পোড়াতে হবে! কিন্তু তাও ও কিচ্ছু বলল না। এই যে ওর ঝকঝকে ঘরটা তুশি একদিনেই আউলেঝাউলে ফেলল,এ নিয়েও টু শব্দ সে করেনি। চুপচাপ কাবার্ড থেকে টি শার্ট নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে সময় আড়চোখে চাইল তুশি। নজর পড়ল সার্থর নগ্ন পিঠে লেগে থাকা পানির ফোঁটার ওপর। ফরসা পিঠ ছুঁয়ে একেকটা পানির রেখা লাইন বেয়ে গড়িয়ে ট্রাউজারে গিয়ে লাগছে। তুশি ঢোক গিলে চট করে চোখ সরিয়ে আনল৷
সার্থ টিশার্ট গায়ে চড়াতে চড়াতে বলল,
“ কফি পাব?”
তুশির চেহারা ঝলকে উঠল অমনি। এইত পেয়েছে,দারুণ সুযোগ! এক কথাতেই নেমে গেল মেয়েটা। ‘আনছি’ বলে চপল পায়ে ছুটল নিচের পথে। সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল ,
“ এত ভদ্র হলো কবে?”

তুশি সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে,আচমকা হাতের কনুই ধরে টান মারল কেউ একজন। হঠাৎ কাণ্ডে আঁতকে উঠল মেয়েটা। অয়ন হাত টেনে একদম আলাদা এক পাশে নিয়ে গেল। চেনা মুখটা দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল তুশি। আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ আপনি? এভাবে,এভাবে টেনে আনলেন কেন?”
অয়নের চেহারা লাল। কণ্ঠে ঝাঁঝের পাহাড় নিয়ে বলল,
“ তুশি, হোয়াটস রং উইথ ইউ? চাইছো কী তুমি? কেন করছো এরকম? তুমি এক দিনের মধ্যে ভাইয়ার ঘরে শিফট হয়ে কী বোঝাতে চাইছ? আমাকে দেখাতে এরকম করছো তাই না? বোঝাতে চাইছ যে তোমাদের মধ্যে সব ঠিক আছে! আমাকে বোকা মনে হয় তুশি? এত বোকা আমি!”
তুশির এইবার মাথা গরম হয়ে গেল। আর চুপ থাকা হলো না। এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে এনে বলল,
“ অয়ন ভাই,নিজের সীমায় থাকার চেষ্টা করুন। আমি নিজের অপরাধবোধের জন্যে আপনার সাথে কঠোর হতে পারছিলাম না! কিন্তু এর মানে এই না যে সামনেও হব না। আপনি নিজের ব্যাবহার সংযত করুন। কেমন আচরণ এসব? কীরকম অসভ্যতা এটা?”
“ অসভ্যতা? তুশি আমি…”
তুশি হাত তুলে বলল,
“ আমি কিছু শুনতে চাই না। আপনি আর কক্ষনো আমার সাথে এভাবে কথা বলবেন না। আমি আপনার বড়ো ভাইয়ের স্ত্রী। পারলে, সম্মান করবেন নাহলে কথা বন্ধ রাখবেন।
আদব না জানলে বলবেন,শিখিয়ে দেবো। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো অভদ্রতা করলে আমি ভুলে যাব আপনি বয়সে আমার বড়ো। তখন ঠিক যেভাবে আপনি আপনার বড়ো ভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছিলেন,সেই ভাবে আমার হাতটাও না উঠে যায়!”
অয়ন বিস্মিত,স্তব্ধ। তুশি কঠোর গলায় বলল,
“ আর আমি আমার স্বামীর থেকে আলাদা থাকি,না তার সাথে থাকি,আমার আর ওনার মধ্যে সব ঠিক আছে, না নেই, সেটা আমাদের ব্যাপার। আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি বাইরের মানুষ এর মাঝে ঢুকবেন না। আমাদের যা সমস্যা আমরা মিটিয়ে নেব। আপনাকে এত না ভাবলেও চলবে। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, আশা রাখছি আমার কথাগুলো অল্পতে বুঝবেন!”

অয়ন হতবাক,বিমুঢ়! মূকের ন্যায় চেয়ে রইল কেবল। তুশি কপাল কুঁচকে পেছন ফিরতেই,দেখল সার্থ দাঁড়িয়ে আছে। একদম সাবলীল,শক্ত একটা চিবুক নিয়ে। কথাগুলো শুনেছে কিনা বোঝার উপায় নেই। তুশি একটু থামে, বিব্রত হয়। উনি কি শুনে ফেলেছেন? ও জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজের ছুঁতোয় নেমে গেল নিচে।

এইবার এক ছটা গর্বের হাসি হাসল সার্থ। দম্ভ নিয়ে তার পাতলা ঠোঁট উঠে গেল এক পাশে। ঐ হাসিতেই যেন প্রমাণ রেখে গেল,আজ এই মূহুর্তে কিছু একটা জিতে গেছে সার্থ। তারপর অয়নের দিকে ফিরল সে। এখনো যেন প্রস্তর ছেলেটা। ভাঙাচোরা, বিধ্বস্ত অনেক!
সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ এবার অন্তত বোঝ অয়ন,তুশি তোর নেই। এ্যাজ অলওয়েজ,শী ইজ মাইন!”
অয়ন প্রহৃত চোখে বলল,
“ কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিচ্ছ?”
“ না,বোঝাচ্ছি। তুই একটা ভালো ডাক্তার। তোকে এসব মানায় না। “
“ আমার কোনো জ্ঞান চাই না।”
“ আমার জ্ঞান এত সস্তাও নয়!
আমি শুধু বললাম শোনা না শোনা তোর ব্যাপার। এখনই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করলে পরে যখন চাচা হবি,তখন কষ্ট আরো বাড়বে।”
হতবুদ্ধি হয়ে চাইল অয়ন,
“ চাচা!”
“ আমার ছেলেমেয়ে হলে তোকে চাচা ডাকবে না? ও সরি,তুইত সম্পর্কে তুশির কাজিন,ওর ভাইয়ের মতো। আমাদের বাচ্চারা তো তোকে মামাও ডাকবে। ”
সার্থ এত স্বাভাবিক ভাবে বলল,অথচ অয়নের মাথা সুদ্ধ ফাঁকা হয়ে যায়। কানদুটোও ক্ষয়ে পড়ে কোথাও। তুশির বাচ্চা ওকে মামা ডাকবে?
যার বাচ্চার বাবা হতে চেয়েছিল,তার বাচ্চার মামা হবে ও? এ কেমন নিষ্ঠুরতা! এ কেমন নিয়ম পৃথিবীর!

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply