অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৩৬
রিদি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল, শুভ্র একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চে উল্টো দিক হয়ে বসে আছে। ওর কাঁধের ওপর দিয়ে গিটারের গ্রিবাটা দেখা যাচ্ছে। শুভ্র নিবিষ্ট মনে গিটারের তারে আঙুল চালাচ্ছে। রিদি একদম নিঃশব্দে এক পা দু পা করে এগিয়ে এসে শুভ্রের ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। ও চেয়েছিল শুভ্র যেন টের না পায় যে ও ফিরে এসেছে। কিন্তু রিদি পিছনে দাঁড়াতেই শুভ্র হুট করে গিটারের রিদমটা বদলে দিল। এবার এক অন্যরকম দোলা দেওয়া সুরে শুভ্র গেয়ে উঠল।
~তুমি আমার কাছে ফুটফুটে ওই রাতের শুকতারা~
~তাই রাত জাগিয়া মনের সুখে দেই যে পাহারা~
রিদি থমকে গেল। গানের কথাগুলো যেন একদম ওর জন্যই লেখা। শুভ্র ওর দিকে না তাকিয়েই সুরের জালে ওকে আটকে ফেলছে। শুভ্র আবার ধরল।
~তুমি আমার কাছে শিশির ভেজা সোনালী সকাল~
~তোমায় এক নজর দেখিয়া আমি হয়ে যাই মাতাল~
~তুমি আমার কাছে যুদ্ধে জয়ী সাত রাজ্যের ধন~
~শত বাধা ডিঙ্গায় পাইছি তোমায় মনের মতো মন~
গানের প্রতিটি লাইনে শুভ্রের ভরাট কণ্ঠস্বর রাতের নির্জনতাকে আরও মায়াবী করে তুলল। রিদি মুগ্ধ হয়ে শুনছে। ওর জেদ, অভিমান সব যেন এই সুরের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। শুভ্র এবার একটু জোর দিয়ে গাইল।
~আমার মনের জোছনা আমি কাউকে দেব না~
~তোমায় গাঁইথা রাখছি মনের মাঝে নিজেও জানো না~
~যতই করো বাহানা তোমায় যেতে দেব না~
~আমি পাগল হয়ে ঘুরব তবু পিছু ছাড়ব না~
শেষ লাইনটা গাওয়ার পর হুট করে শুভ্রের আঙুল থেমে গেল। গিটারের টুংটাং শব্দটা থেমে যেতেই চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুভ্রের ঠোঁটের কোণে একটা বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। রিদি অবাক হয়ে ভাবল, গানটা থামিয়ে দিল কেন? শুনতে তো বেশ ভালোই লাগছিল! রিদি যখন নিজের ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে, ঠিক তখনই শুভ্র একদম শান্ত গলায় বলল।
“আপনি যাননি?”
রিদি চমকে উঠল। ও তো একদম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল, তবে শুভ্র বুঝল কী করে? ও কি পিছনেও চোখ নিয়ে জন্মেছে? নিজের ধরা পড়ে যাওয়া ঢাকতে রিদি একটু আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল।
“আ আমি তো যাচ্ছিলামই, হঠাৎ মনে হলো এই পচা গানটা কে গাইছে একটু দেখে যাই। তাই দাঁড়িয়েছিলাম।”
শুভ্র এবার বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। খুব ধীর পায়ে হেঁটে ও রিদির একদম সামনে এসে থামল। দুই হাতের দূরত্ব নেই বললেই চলে। শুভ্রের দীর্ঘ ছায়াটা রিদির ওপর আছড়ে পড়েছে। ও খুব গম্ভীর গলায় বলল।
“মনে হচ্ছে না আপনি আমার সাথে লুকোচুরি খেলছেন? সত্যি বলছি ম্যাডাম, খেলাটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না।”
রিদি এবার আর দৃষ্টি সরাল না। বুক চিতিয়ে শুভ্রের চোখের ওপর চোখ রেখে বলল।
“আমি কেন আপনার সাথে লুকোচুরি খেলতে যাব? আমি তো বরং চাইছি আপনাকে ভুলে যেতে। কারণ আপনাকে মনে রাখা আমার জন্য বড় কষ্টদায়ক। তাই প্রতিটা মুহূর্তে চেষ্টা করছি, যদি কোনোভাবে আপনাকে মন থেকে মুছে ফেলা যায়।”
শুভ্র এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। ওর চোখের সেই ধারাল চাউনিটা কিছুটা নরম হয়ে এল। ও খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“এত রাগ আমার ওপর?”
রিদি একটা শুকনো হাসল। চোখের কোণে তখন অজান্তেই পানি চিকচিক করছে। ও ধরা গলায় বলল।
“কারও প্রতি কোনো রাগ নেই আমার। আচ্ছা থাকেন আপনি, আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। গুড নাইট।”
এই বলে রিদি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ও জানে আর কিছুক্ষণ থাকলে ও কেঁদে ফেলবে। ও দ্রুত পায়ে ছাদের দরজার দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু দুই পা এগোতেই আচমকা ওর ওড়নাটা টান লাগল। শুভ্র পিছন থেকে রিদির ওড়নার আঁচলটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে ফেলেছে। হঠাৎ টানে রিদি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ওর বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ধুক করে উঠল। এই লোকটা কেন এমন করে? কেন বারবার ওর পালানোর পথ আটকে দেয়? রিদি এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ আর অভিমানে ফেটে পড়ল। সরাসরি শুভ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে ঝিলিক দিয়ে ওঠা গলায় বলল।
“কী চান আপনি? কী পেলে খুশি হবেন? আমি একদম হারিয়ে যাই, এটাই তো চান?”
রিদির কণ্ঠের সেই হাহাকার মেশানো প্রশ্নটা শুনে শুভ্রের বুকের ভেতরটা যেন বি-ষ-ম খেল। এক মুহূর্তের জন্য ওর পাথুরে হৃদয়েও কম্পন সৃষ্টি হলো। সে আর নিজেকে সামলে রাখল না। হাতের মুঠোয় থাকা ওড়নাটা আঙুলে পেঁচিয়ে এক হ্যাঁচকা টান দিল।
আচমকা টানে রিদি সামলাতে না পেরে ছিটকে এসে সরাসরি শুভ্রের শক্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ওর কপালটা শুভ্রের চিবুকে ঠেকেছে। মুহূর্তেই রিদির হার্টবিট পাগলা ঘোড়ার মতো লাফালাফি শুরু করে দিল। বুকের ভেতরটা এমন শব্দ করছে যে, রিদির মনে হলো শুভ্রও হয়তো সেই শব্দের তাল স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। শুভ্র এবার ওর বাঁ হাত দিয়ে রিদির কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, যেন এক চিলতে ফাঁকাও ও রাখতে চায় না। রিদিকে নিজের আত্মার সাথে মিশিয়ে ফেলার এক আদিম আকুলতায় সে ওকে আরও কাছে টেনে নিল।
শুভ্র রিদির কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস রিদির গলার খাঁজে আছড়ে পড়ছে, যা রিদির সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দিচ্ছে। শুভ্র হঠাৎ কোনো সুরহারা মানুষের যন্ত্রণার মতো কাতর স্বরে গেয়ে উঠল।
~সইতে পারব না হারানোর ব্যথা~
~বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা~
গানের প্রতিটি শব্দ রিদির শিরায় শিরায় আছড়ে পড়ল। কোমরে শুভ্রের সেই জোরালো স্পর্শে ও যেন ক্রমেই অবশ হয়ে যাচ্ছে। ও কাঁপাকাঁপা চোখে ঝাপসা অন্ধকারে শুভ্রের দিকে তাকাল। দেখল, শুভ্র পলকহীন চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। নিস্তব্ধ ছাদে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দুজনের দ্রুততর নিঃশ্বাসের শব্দ। কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে যাওয়ার পর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে শুভ্র খুব গাঢ় স্বরে বলল।
“আপনি কি আমার চোখের ভাষা বুঝতে পারেন না? আমি ঠিক কী চাই, সেটা কি সত্যিই আপনার অজানা? শুধু আমার রাগটাই আপনার চোখে পড়ে? কিন্তু এই বুকের ভেতরটা যে কতটা ছটফট করে, সেইটা কি আপনি কোনোদিনও বোঝেন না?”
রিদি এবার যেন বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল। ও যতটা না শুভ্রের কথায় অবাক হয়েছে, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে শুভ্রের ‘আপনি’ সম্বোধনে। এই নবাব তো ওকে তুই ছাড়া সম্বোধন করে না, আজ হঠাৎ এই দূরত্ব কেন? রিদি বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাল। তারপর অভিমানে ঠোঁট উল্টে বলল।
“না, আমি বুঝি না। আমি একটা অবুঝ মেয়ে, আমি অতশত বুঝি না। চোখের ভাষার চেয়ে আমি মুখের ভাষায় বেশি বিশ্বাসী। যা বলার সোজাসুজি মুখে বললেই তো হয়, এত হেঁয়ালির কী আছে? হুহ!”
শুভ্র রিদির চোখের মণির দিকে আরও গভীরভাবে তাকিয়ে একদম নিচু, গাঢ় স্বরে প্রশ্ন করল।
“সত্যি কি অবুঝ? নাকি সবটা বুঝেও এই অবুঝের মতো ভান করেন?”
রিদি এক মুহূর্তের জন্য শুভ্রের ওই সম্মোহনী দৃষ্টিতে থমকে গেল। ওর বুকের ভেতরটা তখন রীতিমতো ড্রাম বাজাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ত্যাড়ামি করে জবাব দিল।
“সেরকম মেয়ে আমি নই। ভান করার মতো সস্তা স্বভাব আমার নেই, যা মনে থাকে তাই মুখে বলি।”
শুভ্র এক বুক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওর বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন এক নিমেষেই বাইরের নিস্তব্ধতায় মিশে গেল। ও খুব ধীরলয়ে রিদির কোমর থেকে নিজের হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। তারপর একদম ভাবলেশহীন গলায় বলল।
“রুমে চলে যা।”
বলেই সে রিদিকে ছেড়ে দিয়ে আবার ছাদের রেলিংয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল। রিদিও এবার দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও চলে যেতে যেতে হুট করে থমকে দাঁড়াল। ওর ভেতর জমে থাকা একরাশ হাহাকার আর জমানো অভিমান এবার আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফেটে পড়ল। ও শুভ্রের পিঠের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ মেশানো গলায় বলে উঠল।
“মাঝে মাঝে ভাবি, আল্লাহ কেন যে আপনার মতো এক শক্ত পাথরের মনের মানুষের প্রতি আমাকে আসক্ত করল? যার মনের ভেতর ভালোবাসা বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, তা নিয়ে আজও আমার ঘোর সন্দেহ হয়। বিশ্বাস করেন শুভ্র, আপনাকে ভালোবেসে আমি প্রতিটা সেকেন্ড বিষণ্নতায় কাটছি, ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি। ভালোবাসা সত্যি সুখের হয় না, অন্তত আপনার ক্ষেত্রে তো নয়ই! আপনি এই আমাকে গভীর মায়ায় ধরছেন, আবার পরক্ষণেই অবহেলায় ছুড়ে ফেলছেন কেন এমন করছেন তাও আমি জানি না।”
শুভ্র নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে। রিদি থামল না, ওর দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ও ধরা গলায় আবার বলল।
“শুধু একটা কথা বলে রাখছি আমি এমনিতেই অনেকটা ভেঙে পড়েছি। দয়া করে আমাকে আর নতুন করে ভাঙবেন না। নাহলে আমি সত্যিই কাঁচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে যাব। তখন আপনি শুধু চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ওই ভাঙা কাঁচের ধারটুকুই পাবেন, সেই পুরনো আস্ত রিদিকে আর কোনোদিনও জোড়া লাগাতে পারবেন না।”
কথাগুলো শেষ করে রিদি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর শক্তি পেল না। হাতের উল্টো পিঠে চোখের জলটুকু মুছে প্রায় দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে গেল ও।
শুভ্র পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিদির শেষ কথাগুলো বিশেষ করে ওই ‘ভাঙা কাঁচের’ উপমাটা ওর কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ওর ভেতরের সেই দম্ভের দেয়ালটা যেন মুহূর্তেই ধসে পড়ল। সে কি সত্যিই তার ‘মনোমোহিনী’কে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলছে? রিদিকে হারানোর চিন্তাটা মাথায় আসতেই শুভ্রের বুকের বাঁ দিকটায় একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য ওর দম বন্ধ হয়ে এল। না, সে আর কাউকে সহ্য করতে পারবে না, তার মনোমোহিনীকে সে কোনোভাবেই হারাতে পারবে না।
শুভ্র ঠোঁট গোল করে কয়েকবার বড় বড় শ্বাস নিল নিজেকে শান্ত করতে। হঠাৎ ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হাসি ফুটে উঠল। ও পকেট থেকে ফোনটা বের করল। নবাব এবার আর দেরি করবে না। ও এবার হার মানবে, তবে সেই হার হবে তার মনোমোহিনীর ভালোবাসার কাছে। ও দ্রুত google সার্চ বাটনে টাইপ করতে শুরু করল।
“Union, নতুন কিছু প্রপোজ করার টিপস।”
সকালবেলা বাড়ির সামনে একটা ব্যস্ততা। রাসেল সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে, উদ্দেশ্য আজই সে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। ওর বাবা কয়েকবার ফোন দিয়েছেন, বিশেষ প্রয়োজনে ওকে এখনই যেতে হবে। রাসেল একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিদির সামনে এসে দাঁড়াল। হাসি মুখে বলল।
“রিদি, তুমি তো আমাদের বাসায় অনেক দিন ধরে যাও না। এবার কিন্তু খালার সাথে অবশ্যই যাবে, মনে থাকে যেন?”
রিদি একটু ম্লান হেসে বলল।
“যাবনি এক সময় ভাইয়া, সুযোগ করে চলে আসব।”
রাসেল নাছোড়বান্দার মতো বলল।
“এক সময় কেন? এইবারই যাবে কিন্তু! কোনো অজুহাত শুনব না।”
বলেই সে রাবেয়া এহসানের দিকে তাকিয়ে আবদারের সুরে বলল।
“কী খালা, এবার আমাদের বাসায় যাচ্ছো তো তোমরা?”
রাবেয়া এহসান রাসেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন।
“ঠিক আছে রে বাবা, এবার অবশ্যই যাব।”
রাসেল যেন নিশ্চিত হতে চাইল।
“প্রমিস করো?”
রাবেয়া এহসান হেসে উত্তর দিলেন।
“হ্যাঁ রে পাগল, প্রমিস।”
রাসেল এবার দারুণ খুশি হয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলল।
“আসি তাহলে? দেখা হচ্ছে খুব দ্রুতই, বড়জোর দুই দিনের মধ্যে।”
রিদি হালকা একটা হাসি দিল। ঠিক তখনই সাহেরা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন।
“সেকি! শুভ্র তো এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। ওর সাথে দেখা না করেই চলে যাবে?”
রাসেল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল।
“ব্রো তো এখনো ঘুমে বিভোর! ডাকলে আবার যদি খেপে যায়?”
সাহেরা চৌধুরী সাথে সাথে রিদির দিকে তাকিয়ে বললেন।
“যা তো মা, গিয়ে একটু শুভ্রকে ডেকে নিয়ে আয়। আমরাও তো কাল-পরশু চলে যাব, আবার কবে আসা হবে তার তো ঠিক নেই।”
রিদির বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। কাল রাতের সেই ছাদের ঘটনা মনে পড়তেই ও কেমন কুঁকড়ে গেল। ওর সামনে যাওয়ার মতো সাহস এই মুহূর্তে একদমই খুঁজে পাচ্ছে না রিদি। কিন্তু সবার সামনে এখন ‘না’ বললেও কেমন দেখায়! এসব ভেবে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে রিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভারী পায়ে শুভ্রের রুমের সামনে চলে আসলো।
রুমে ঢুকে রিদি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শুভ্র একটা কোলবালিশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, চাদরে নাক ঢেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উপরে ফ্যান ঘুরছে, আর সেই বাতাসে ওর কপালের ওপর কয়েকটা চুল এলোমেলোভাবে উড়ছে। রিদি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কেন জানি মনে হলো, এই প্রথম ও শুভ্রকে এত শান্ত আর ঘুমন্ত অবস্থায় দেখছে।
রিদি মনে মনে ভাবল, “ইস! ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষটাকে কী কিউট লাগছে! অথচ জেগে থাকলে যেন একটা আগ্নেয়গিরি!” ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক পা এক পা করে শুভ্রের বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। রাতের সেই ‘পাথর মনের’ মানুষটা এখন একদম এক অবুঝ শিশুর মতো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। চেনা মানুষটাকেও এই মুহূর্তে রিদির খুব অচেনা আর অদ্ভুত মায়াবী মনে হতে লাগল।
রিদির হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো শুভ্রের গালে আলতো করে একটা চু-মু খেতে। কেন জানি আজ এই পাষাণ লোকটাকে একদম দুধের বাচ্চার মতো নিষ্পাপ লাগছে। রিদি দ্বিধায় পড়ে গেল কী করবে ও? একদিকে মনটা চু-মু খাওয়ার জন্য ছটফট করছে, অন্যদিকে ধরা পড়ার ভয়। পরক্ষণেই ভাবল, “ধুর! ও তো অঘোরে ঘুমাচ্ছে, বুঝবে কীভাবে? একটা ছোট্ট করে দিয়ে একদম স্বাভাবিক হয়ে যাব, যেন কিছুই হয়নি।”
এই ভেবে রিদি বুক ঢিপঢিপানি নিয়ে সাহস করে মুখটা নিচু করল। তারপর অতি সন্তর্পণে শুভ্রের নরম গালে একটা আলতো পরশ দিয়ে ফেলল। চুমু খেয়েই চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল ও, নিজের হার্টবিট যেন কান ফেটে বেরুচ্ছে! নিজেকে স্বাভাবিক করতে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ডেকে উঠল।
“শুভ্র ভাই? শুনছেন?”
কিন্তু শুভ্রের কোনো নাড়াচাড়া নেই, ও যেন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে। রিদি এবার একটু গলা চড়িয়ে জোরে ডাকল।
“শুভ্র ভাইইইইই! শুনছেন? আর কত ঘুমাবেন?”
শুভ্র এবার একটু নড়েচড়ে উঠল। কাঁচা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় ওর বিরক্তিমাখা কপাল কুঁচকে গেল। চোখ না খুলেই ঘুমের ঘোরে ফিসফিস করে বলল।
“ডাকিস না… ঘুমাতে দে। যা এখান থেকে।”
রিদি এবার কোমরে হাত দিয়ে জেদ নিয়ে বলল।
“আপনাকে ডাকতে আমার বয়েই গেছে! ! মামি পাঠালো তাই এসেছি। রাসেল ভাইয়া চলে যাচ্ছে ডাকছে আপনাকে।”
‘রাসেল’ নামটা কানে যাওয়ার সাথে সাথেই শুভ্রের ঘুমটা যেন ম্যাজিকের মতো উবে গেল। ও ঝট করে চোখ খুলে আড়মোড়া ভেঙে রিদির দিকে তাকাল। শুভ্র নির্লিপ্ত গলায় বলল।
“ওহ, তাহলে আপদ বিদায় হচ্ছে অবশেষে?”
রিদি ভ্রু কুঁচকে রেগে গিয়ে বলল।
“কিসের আপদ?”
শুভ্র এবার রিদির কথার কোনো উত্তর দিল না। ও পাশ ফিরে উল্টো দিক হয়ে শুলো, কোলবালিশটা আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওপাশ থেকেই গুঙিয়ে বলল।
“অনেক কিছু বুঝবি না তুই। যা এখন এখান থেকে, ঘুমাতে দে,ডাকবি না একদম, ডাকলে মেরে দাঁত ফেলে দিবো।”
রিদি রেগে মেজাজ হারিয়ে বলল।
“দাঁত কি আপনার বাপের সম্পত্তি যে কথায় কথায় বলেন মেরে দাঁত ফেলে দেব? হাড়কিপ্টে লোক একটা!”
শুভ্র এবার কোনো উত্তর দিল না। ও পাশ ফিরে গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। রিদির এটা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। কী শান্তিতে ঘুমাচ্ছে লোকটা! অথচ কাল রাতে এই লোকটার দেওয়া যন্ত্রণায় রিদি চোখের দুটো পাতা এক করতে পারেনি। আর এখন অপরাধী লোকটা অঘোরে ঘুমাচ্ছে আর সে জেগে মরছে? না, শুভ্রের এই ঘুমের বারোটা বাজাতেই হবে।
কী করবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ওর মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। নোনালি পাতা! এই পাতার গন্ধ শুভ্র একদম সহ্য করতে পারে না। এক ফোঁটা গন্ধ নাকে গেলেই ওর ব-মি চলে আসে। যেই ভাব সেই কাজ। রিদি দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এল। তাকে দেখে সাহেরা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন।
“কিরে, ও ওঠেনি? আমি যাব গিয়ে ডাকতে?”
রিদি মনে মনে হাসল, মুখে বলল।
“না না মামি, তুমি দাঁড়াও। আমি এমন ব্যবস্থা করছি যে ও নিজেই দৌড়ে উঠে আসবে।”
বলেই বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা পুকুরপাড়ের দিকে দৌড় দিল। পুকুরপাড়ে আসতেই দেখল ঈশান, শুভ্রা, তুর্য, রিফাত আর পাখি গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। রিদি পুকুরের একদম কোণের দিকে যেতে লাগল, যেখানে নোনালি গাছটা আছে। হঠাৎ ঈশানের চোখ পড়ল রিদির ওপর। সে দূর থেকেই হাঁক ছেড়ে বলল।
“কী হয়েছে রিদি? ওই দিকে কোথায় যাচ্ছ? কিছু খুঁজছ নাকি?”
রিদি থমকে দাঁড়িয়ে একটু আমতা আমতা করে বলল।
“হ্যাঁ ভাইয়া, দুটো নোনালি পাতা লাগবে। মামি চাইল তো, ওগুলোই তুলতে এসেছি।”
ঈশান গাছটার দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। গাছটা একদম পুকুরের পাড় ঘেঁষে, মাটিও ভেজা। তুলতে গেলে পিছলে পুকুরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। ঈশান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলল।
“কিন্তু ওটা তো একদম কিনারে রিদি। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দরকার নেই তোমার যাওয়ার।”
রিদি জেদ ধরে বলল।
“না না ভাইয়া, আমি ঠিক পারব। সমস্যা হবে না।”
ঈশান হাসল, তারপর বলল।
“জেদ করো না তো। দাঁড়াও, আমিই পেরে দিচ্ছি।”
ঈশান প্যান্টের ভাঁজটা হাঁটু সমান করে তুলে নিল, যাতে কাদা না লাগে। সে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে গাছটার দিকে এগিয়ে গেল। পুকুরপাড়ের ওই দিকটা বেশ পিচ্ছিল আর কর্দমাক্ত। ঈশানের একটু খিনখিনেও লাগছে আর ভয়ও হচ্ছে একটু এদিক-সেদিক হলেই সোজা কাদা-জলে একাকার হয়ে পুকুরে পড়তে হবে।
অনেক কসরত করে সে ডালটা টেনে ধরল। নোনালি পাতার সেই উৎকট গন্ধ নাকে আসতেই ঈশানেরও ব-মিব-মি ভাব শুরু হয়ে গেল। তবুও কষ্ট করে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সে পাড়ে উঠে এল। পাতাগুলো রিদির হাতে দিয়ে সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল।
“এই নাও তোমার পাতা। যা গন্ধ রে বাবা!”
রিদি এক গাল হেসে বলল।
“ধন্যবাদ ভাইয়া! অনেক বড় উপকার করলেন।”
বলেই রিদি আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। এক প্রকার দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। পা টিপে টিপে চোরের মতো শুভ্রের রুমে প্রবেশ করল ও। শুভ্র এখনো ঠিক আগের মতোই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। রিদি খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে পাতা শুভ্রের নাকের একদম ডগায় সাজিয়ে রাখল। শুভ্রের প্রশ্বাসের বাতাসে হালকা পাতাগুলো উড়ে যেতে চাইল, তা দেখে রিদি চট করে টেবিল থেকে একটা ভারী পানির বোতল এনে পাতার এক কোণে চাপা দিয়ে রাখল যাতে পাতাগুলো নড়াচড়া করতে না পারে আর গন্ধটা সরাসরি ওর নাকের ভেতর হানা দেয়। কাজ শেষ করে রিদি দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে উত্তেজনায়। ও এক চোখ দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল। এবার এই ঘুমন্ত নবাবের কী দশা হয়! রিদি মনে মনে কুটিল হাসি হেসে ভাবল।
“এবার বোঝো মজা! কাল রাতে আমার ঘুম হারাম করেছ না? এবার দেখো নোনালি পাতার ঠেলা!”
রানিং…!
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৯(সমাপ্ত)
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২২