Golpo romantic golpo অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ২৫


অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ২৫

🚫[বালের অনুমতি দিমু হাজার বার বলার পরও অনেক পেইজ কপি করে। লজ্জা সরম কিচ্ছু করে না তাঁদের, কিছু কমু না আমি, কেউ কিছু মনে কইরো না রাগ ওঠে পড়ছে তাই বলে ফেলছি, আসলে কষ্ট তো আমি করি তাই আমি বুঝি]🚫

সময় কারোর জন্যই থেমে থাকে না। ঘড়ির কাঁটা তার আপন গতিতে ঘুরে চলে। পেছনে ফেলে যায় ধুলো জমা একরাশ স্মৃতি আর কিছু দগদগে ক্ষত। ভালো মন্দের মিশেলে গড়া সেই অতীতকে সঙ্গী করেই মানুষ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

নেহা মারা গিয়েছে আজ প্রায় দুই মাস। এই অল্প কটা দিনেই ওলটপালট হয়ে গিয়েছে অনেক সমীকরণ। ড্রয়িংরুমের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়টা এখন কেবল কিছু মানুষের মনের কোণে বন্দি। শুভ্র আর রিদির বিয়ের খবরটা বাইরের দুনিয়া এখনো জানে না। শুভ্র খুব কড়াভাবে পুলিশ প্রশাসনকে শাসিয়ে রেখেছে এই বিয়ের খবর যেন কোনোভাবেই জানাজানি না হয়। রিদিও মুখ খোলেনি কারো কাছে। সে এখন তার বাবা মায়ের সাথে নিজের বাড়িতেই থাকছে। কলেজ আর বাসা এইটুকুর মধ্যেই তার জগত সীমাবদ্ধ। লোকচক্ষুর অন্তরালে সে যেন এক বিষাদময়ী রাজকুমারী।

শুভ্র দেড় মাস ধরে দেশের বাইরে। নেহার মৃত্যুটা মিডিয়া কোনোভাবেই চেপে রাখেনি। চারদিকে চাউর হয়ে গিয়েছিল প্রেমের টানে জীবন দিল নেহা। আর সেই প্রেমের অন্য প্রান্তে যার নাম জড়িয়েছে। সে আর কেউ নয়। স্বয়ং সাইফান শুভ্র চৌধুরী। মিডিয়া তো তিলকে তাল করতে ওস্তাদ। হাজারো আলতু ফালতু প্রশ্ন আর নোংরা কাঁদা ছোড়াছুড়ি এড়াতেই শুভ্র দেশ ছেড়েছে। সে চায় না এই মুহূর্তে কারো মুখোমুখি হতে।

এদিকে নির্ভানের ঠাঁই হয়েছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। আদালত তাকে ১২ বছরের জেল দিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো। দুর্ধর্ষ সেই নির্ভান পালানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। অপরাধবোধ নাকি বোনের শোক কোনটা তাকে গ্রাস করেছে তা জানা নেই। জেলের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে সে। মাঝে মাঝে গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জল কি প্রতিশোধের আগুনে পোড়া কোনো প্রতিহিংসা। নাকি কৃতকর্মের অনুশোচনা? তার উত্তর কেবল ওই চার দেয়ালই জানে।

রিদি এই কয়টা দিন একরকম ঘোরের মধ্য দিয়েই কাটিয়েছে। রোজা শুরু হয়েছে। দেখতে দেখতে রমজান মাসটাও বিদায় নিল। আজ শেষ রোজা। কাল ঈদ। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে শুভ্র একবারের জন্যও রিদির কোনো খোঁজ নেয়নি। রিদি তাকে প্রতিটা মুহূর্তে হন্যে হয়ে মিস করে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু নিজ থেকে ফোন দিয়ে তাকে বিরক্ত করতে চায় না। পাছে সে ভাবে রিদি তাকে খুব জ্বালাতন করছে। শুভ্রর ফেসবুক আইডিতে রিদি আগে থেকেই অ্যাড ছিল। রিদি মাঝে মাঝে চাতক পাখির মতো চেয়ে দেখে শুভ্র অনলাইনে আসে। হয়তো কারো সাথে কাজ সারে। কিন্তু রিদির ইনবক্সে একটা মেসেজ আসার আগেই সে আবার অফলাইন হয়ে যায়।

আজ শেষ রোজার সন্ধ্যায় ইফতার শেষ করে। নামাজ আর কিছুক্ষণ কোরআন তিলাওয়াত করে রিদি ছাদে আসলো। কিছুক্ষণ ছাদে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। চারপাশটা আজ কেমন জানি স্তব্ধ। বিকেলের তপ্ত রোদের পর রাতের এই হিমেল বাতাসে তার অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছে। হঠাৎ করেই নেহার সেই রক্তাক্ত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। নেহা আপুর কথা আজ বড্ড মনে পড়ছে রিদির। সে আকাশের সবচাইতে উজ্জ্বল তারাটার দিকে অপলক তাকিয়ে ধরা গলায় বিড়বিড় করে উঠল।

“নেহা আপু? দেখতে পাচ্ছো আমাকে? দেখো? যাকে তুমি শেষ নিশ্বাসে আমার হাতে দিয়ে গেলে। আজ সে বহুদূরে প্রবাসে। জানো আপু? মানুষটা বড্ড পাষাণ। একটা বারও কি তার মনে হলো না যে এদেশে তার একটা পাগল প্রেমিকা অপেক্ষায় আছে? একটা খোঁজও তো নিল না। তুমি তো বলেছিলে মানুষটা নাকি আমায় ভালোবাসে। তবে যাকে ভালোবাসে তাকে ছাড়া সে থাকে কী করে? তার হৃদয় কি একটুও কাঁদে না আমার জন্য? মন কি একটুও বলে না যে রিদির সাথে অন্তত একবার কথা বলি?”

বলতে বলতে রিদির দুচোখ বেয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে গলার স্বর আরও নামিয়ে ধরা গলায় বলল।

“তুমি তো অবহেলার যন্ত্রণা সইতে না পেরে অভিমান করে তার বুকেই শেষ নিশ্বাস ছেড়ে চলে গেলে। কিন্তু আমি? আমিও তো তাকে ভীষণ ভালোবাসি আপু। এই অসহ্য নীরবতা তো আমিও সইতে পারছি না। এখন কি তবে আমাকেও তোমার মতো ওই আকাশে একা তারা হয়ে যেতে হবে? তবেই কি সে আমার মূল্য বুঝবে?”

বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় একদম পাথরের মতো ভারী হয়ে এলো রিদির। ঠিক সেই মুহূর্তে তার বাঁ হাতে থাকা ফোনটা তীব্র কম্পনে বেজে উঠল। রিদি চোখের জল না মুছেই। স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল।

“আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। শুধু কারো খুব পরিচিত আর ভারী নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই নিশ্বাসের প্রতিটি শব্দ যেন রিদির চেনা হৃদস্পন্দনের মতো তার কানে আছড়ে পড়ছে। রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা অজান্তেই দড়ফড় করে কাঁপতে লাগল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় আবার বলল।

“হ্যালো? কথা বলছেন না কেন? কে আপনি?”

ওপাশ থেকে এখনো কোনো শব্দ নেই। শুধু সেই দীর্ঘ আর তপ্ত নিশ্বাসটা রিদির কানে আছড়ে পড়ছে। রিদির কেন জানি মনে হলো। এই নিশ্বাসটা তার খুব চেনা। এই নিঃশব্দ উপস্থিতিও যেন অনেক না বলা কথার জানান দিচ্ছে। যেন ওপাশের মানুষটা কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু গলার কাছে সব শব্দ পাথর হয়ে আটকে আছে। কিছুক্ষণ দুজনেই ওপাশে নিস্তব্ধ হয়ে রইল। রিদির মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে। সে শুধু ওপাশের ভারী নিশ্বাসের শব্দটুকু বুকের ভেতর অনুভব করছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই লাইনটা কেটে গেল। রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা কেন জানি হাহাকার করে উঠল তার। মনে হলো খুব কাছের কেউ এসেও আবার মাঝপথ থেকে ফিরে গেল।

কিন্তু ঠিক দুমিনিট পর আবারও ফোনটা বেজে উঠল। রিদি এবার কিছুটা বিরক্ত হয়েই স্ক্রিনের দিকে তাকাল। দেখল এবার শুভ্রা কল দিয়েছে। রিদি কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুভ্রা চড়া গলায় বলতে শুরু করল।

“কই তুই? তাড়াতাড়ি রেডি হ। আমি তোদের বাসার সামনে আসছি। সাথে আব্বু আম্মুও আছে।”

রিদি অবাক হয়ে বলল।

“কেন? কোথাও যাচ্ছিস নাকি?”

শুভ্রা উত্তেজিত গলায় বলল।

“হুম রে। ভাইয়া আসছে। তাই এয়ারপোর্টে যাচ্ছি। আসার সময় মার্কেটেও যাব। আমার ঈদের জন্য আরও কিছু জিনিস কেনার বাকি আছে। এখন কথা না বাড়িয়ে জলদি রেডি হ।”

শুভ্রার কথাগুলো শোনা মাত্রই রিদির বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল। সারা শরীরে যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। শুভ্র। শুভ্র আসছে। দেড় মাস পর মানুষটা ফিরছে। রিদি আমতা আমতা করে বলল।

“শুভ্রা। তুই যা না রে। আমার আজ অনেক কাজ আছে। প্লিজ।”

শুভ্রা এবার ধমক দিয়ে বলল।

“উহু। কোনো বাহানা চলবে না। আমরা অলরেডি তোদের বাড়ির রাস্তায় ঢুকে গেছি। তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ রেডি হয়ে নে। নাহলে আমি নিজে এসে তোকে টেনে হিঁচড়ে গরুর মতো রেডি করাব।”

রিদি জানত শুভ্রা ঠিক তার ভাইয়ের মতোই জেদি। একবার যেহেতু বলেছে তাকে নিয়ে যাবে। তার মানে সে যুদ্ধ করে হলেও রিদিকে ঘর থেকে বের করবে। রিদি এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।

“আচ্ছা ঠিক আছে।”

রিদি নিজের রুমে এসে একটা নেভি ব্লু রঙের থ্রি পিস পরে নিল। সাথে ম্যাচিং কালো রঙের হিজাবটা নিখুঁত করে বেঁধে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বটা দেখে সে নিজেই শিউরে উঠল। বুকের ভেতরটা এখনো অবাধ্যের মতো ধকধক করছে। দেড় মাস। দীর্ঘ দেড়টা মাস পর সে আজ শুভ্রর মুখোমুখি হবে। ভাবতেই কেমন জানি হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তার। এক অদ্ভুত শিহরণ সারা শরীরে খেলে যাচ্ছে। সে দ্রুত রেডি হয়ে নিচে নামতেই বাবা ইকবাল এহসান তাকে দেখে বললেন।

“শুভ্রা কল দিয়েছিল। তোকে নাকি সাথে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে ওরা?”

রিদি ধীর গলায় উত্তর দিল।

“হুম বাবা। আমি রেডি হয়েছি।”

পাশ থেকে ছোট ভাই ইমন লাফিয়ে উঠে বলল।

“আপু। আমিও যাব কিন্তু তোমাদের সাথে।”

রিদি কিছু একটা বলতে যাবে। তার আগেই বাইরে থেকে পরিচিত এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হ।”

দরজার দিকে তাকিয়ে সবাই দেখল সোহান চৌধুরী। সাহেরা চৌধুরী আর পেছনে চঞ্চল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রা। ইকবাল এহসান সাথে সাথে দাঁড়িয়ে সোহান চৌধুরীকে দেখে পরম আপ্যায়নের সুরে বললেন।

“আরে ভাইসাব যে। আসুন আসুন। বসুন এখানে।”

সবাই ড্রয়িংরুমে বসল। শুভ্রর ফ্লাইট এখনো ল্যান্ড করেনি। হাতে কিছুটা সময় আছে। তাই দুই পরিবার মিলে হালকা নাস্তা আর আড্ডায় মেতে উঠল। বড়দের জমানো গল্পের মাঝে রিদি চুপচাপ এক কোণে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর ইমন রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে চলে এল। শুভ্রা রিদির হাত ধরে টেনে তুলল।

“চল এবার। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভাইয়া নামার আগেই আমাদের পৌঁছাতে হবে।”


সবাই মিলে এয়ারপোর্টে এসে থামল। তারপর শুরু হলো এক দীর্ঘ আর উৎকণ্ঠাময় অপেক্ষা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রানওয়েতে চাকা ছুঁলো বিশাল এক বিমান। আর যাত্রীদের ভিড় ঠেলে ধীরপায়ে বের হয়ে এল শুভ্র। শুভ্রকে দেখামাত্রই শুভ্রা উল্লাসে চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। শুভ্রও এক হাত দিয়ে পরম মমতায় বোনকে আগলে নিল। রিদি একপাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আড়চোখে দেখছে মানুষটাকে। দেড় মাস প্রবাসে কাটিয়ে লোকটা যেন আজ মারাত্মক হ্যান্ডসাম হয়ে ফিরেছে। পরনে কুচকুচে কালো শার্ট। কালো প্যান্ট। বাঁ হাতে ব্র্যান্ডের দামী স্মার্ট ওয়াচ আর চোখে ডার্ক সানগ্লাস এক কথায় সিনেমার হিরো। রিদি বিষণ্ণ মনে ভাবল। এই লোকটা কি কালো আর সাদা রঙ ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু চেনে না?

শুভ্র এগিয়ে গিয়ে সোহান চৌধুরী আর সাহেরা চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল। তাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল। কুশল বিনিময় করল। কিন্তু রিদি ঠিক চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও শুভ্র একবারের জন্যও তার দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। যেন রিদি সেখানে স্রেফ একটা অস্তিত্বহীন ছায়া। কথা শেষ করে শুভ্র গটগট করে এগিয়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসল। ইতিমধ্যে ঈশানও শুভ্রর গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে। শুভ্রা জেদ ধরল সে ভাইয়ের গাড়ি দিয়েই যাবে। এতে ইমনও বায়না ধরল ও ও যাবে। রিদি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শুভ্রাকে বলল।

“তোরা দুজন যা। আমি মামা মামির গাড়ি দিয়ে আসছি।”

শুভ্রা সাথে সাথে রিদির হাত চেপে ধরে জেদ ধরল।

“উহু। চলবে না। আমি গেলে তোকে নিয়েই যাব। আমার সাথে তুই ই যাবি।”

এই বলে শুভ্রা একপ্রকার জোর করেই রিদিকে টেনে পেছনের সিটে বসাল। নিজেও বসল আর পাশে ইমনকেও বসাল। সামনে ঈশান আর ড্রাইভিং সিটে স্বয়ং শুভ্র। শুভ্র কারো দিকে না তাকিয়েই ইঞ্জিনে গর্জন তুলে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়িটা তীব্র গতিতে এয়ারপোর্ট ছেড়ে হাইওয়ের দিকে ছুটতে লাগল। স্টিয়ারিংয়ে শুভ্রর শক্ত হাতের মুঠো আর আয়নায় বারবার আছড়ে পড়া তার নির্লিপ্ত চাউনি রিদির বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড় তুলে দিচ্ছে। এত কাছে থেকেও মানুষটা আজ যেন যোজন যোজন দূরের কোনো অচেনা পথিকের মতো গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।

গাড়ি এসে থামল শহরের নামকরা এক দামী শপিং মলের সামনে। গাড়ি থেকে নামার আগেই শুভ্র ফোন বের করে সোহান চৌধুরীকে জানিয়ে দিল তারা যেন সরাসরি বাসায় চলে যান। সে শুভ্রাকে নিয়ে কেনাকাটা শেষ করে পরে ফিরবে। শপিং মলের উজ্জ্বল আলোর নিচে পাঁচজন ভেতরে ঢুকল। সামনে চঞ্চল পায়ে শুভ্রা। রিদি আর ইমন। আর তাদের ঠিক পেছনে একরাশ আভিজাত্য নিয়ে হাঁটছে ঈশান আর শুভ্র। শুভ্রর ব্যক্তিত্ব আর গম্ভীর চলন দেখে শপিং মলের কর্মীরা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এল। বিনয়ের সাথে মাথা নুয়ে তারা জানতে চাইল।

“হ্যালো স্যার। আপনাদের জন্য কী লাগবে বলুন?”

শুভ্রা এক মুহূর্ত দেরি না করে একটা নামী শোরুমে ঢুকল। সেখানে থরে থরে সাজানো দামী সব পোশাক। শুভ্রা প্রথমেই নিখুঁত কারুকাজ করা চমৎকার এক পিস থ্রি পিস দেখল। তারপর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা রিদির দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ গলায় বলল।

“চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থেকে দেখ কোনটা পছন্দ হয়।”

রিদি একবুক অস্বস্তি নিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে শুভ্রার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।

“শুভ্রা। মনে হচ্ছে তুই আজ আমাদের ঈদের মার্কেট করিয়ে দিচ্ছিস। আমি এখানে কেন?”

শুভ্রা রিদির হাত চেপে ধরে ফুরফুরে মেজাজে উত্তর দিল।

“আরে ইয়ার। ভাইয়া আছে তো। কী নিবি নে। সব ভাইয়া পে করবে। আজ কোনো কৃপণতা চলবে না।”

রিদি তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে দৃঢ় স্বরে বলল।

“অসম্ভব। আমি কিছু নেব না।”

শুভ্রা অনেক জোর করল। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু রিদি তার সিদ্ধান্তে অনড়। ভেতরে কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে সে শুভ্রাকে ওয়াশরুমের কথা বলে ওই শোরুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল। রিদি ওয়াশরুমের কথা বলে শোরুম থেকে বেরিয়ে এলো তো ঠিকই। কিন্তু শপিং মলের চাকচিক্যের মাঝে এসে মেয়েদের মন কি আর অত সহজে মানে? কিছুতেই না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রিদির চোখ আটকে গেল ওপরের তাকে ভাঁজ করে রাখা একটা চমৎকার অ্যাশ রঙের থ্রি পিসের দিকে। ছাই রঙের ওপর সূক্ষ্ম আর নিখুঁত কাজ করা ড্রেসটা দেখে রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সেলসম্যানকে ডেকে ওটা নামাতে বলল।

হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল রিদি। কাপড়টা যেমন মোলায়েম। কাজটাও তেমন রাজকীয়। মনে মনে ভাবল। ঈদের দিন এটা পরলে তাকে বেশ মানাবে। পছন্দটা একদম মনে ধরে গেল তার। এবার একটু ইতস্তত করে প্রাইজটা জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার একগাল হেসে বলল।

“ম্যাম। এটা একদম নতুন কালেকশন। এই বছরেই এসেছে। ডিজাইনটা একদম ইউনিক। আমরা এমনিতে এটা চার হাজার টাকায় বিক্রি করছি। কিন্তু আপনার জন্য স্পেশাল ডিসকাউন্টে মাত্র তিন হাজার পাঁচশ টাকা রাখব।”

কথাটা শোনা মাত্রই রিদির চোখ তো চড়কগাছ। নিজের অজান্তেই তার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে মনে মনে হিসেব মেলাল বাবার কাছ থেকে ঈদি বাবদ মাত্র পনেরোশ টাকা পেয়েছে সে। যেটা এখন তার ব্যাগে ভাঁজ করা আছে। আর এই সাধারণ একটা থ্রি পিসের দাম কিনা সাড়ে তিন হাজার টাকা। রিদি এক মুহূর্ত থমকে থেকে পরক্ষণেই কোমরে হাত দিয়ে মুখটা বাঁকিয়ে বলল।

“অ্যাঁ। কী বললেন? ৩৫০০ টাকা? আমাকে কি একদম বোকা পেয়েছেন শুনি? এই সামান্য ত্যানার দাম এত। শুনুন ভাইজান। অত পটর পটর না করে সোজাসুজি কথা বলি। গুনে গুনে পাঁচশ টাকা দিব। দিলে দেন নাহলে এই ড্রেস নিয়ে সোজা গুল্লায় যান। আমার পনেরোশ টাকার বাজেট। তার ওপর আপনি আবার ডাকাতি করতে এসেছেন?”

রিদির এমন আজব দরদাম শুনে দোকানদার বেচারা একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। যেন সে জীবনেও এমন ‘বিপজ্জনক’ কাস্টমার দেখেনি। লোকটার অমন বোকা বনে যাওয়া দেখে রিদি ভ্রু কুঁচকে কোমরে হাত দিয়ে তড়পড়িয়ে বলে উঠল।

“কী ব্যাপার। হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? মাছি ঢুকে যাবে তো মুখে। মুখ বন্ধ করেন।”

দোকানদার এবার একটু থতমত খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীত সুরে বলল।

“না মানে ম্যাম। আপনি প্লিজ ড্রেসটা আর একবার ভালো করে দেখেন। কাপড় থেকে শুরু করে ডিজাইন সবই একদম ইউনিক। সাড়ে তিন হাজারের নিচে এটা দেওয়াই সম্ভব না।”

রিদি এক মুহূর্ত দেরি না করে গাল ফুলিয়ে জেদি গলায় বলল।

“দেখেন ভাইজান। আমার দেখা হয়ে গেছে। যা বোঝার বুঝে নিয়েছি। পাঁচশ টাকা দিলে দেন নাহলে আমি যাচ্ছি। আমার আবার সময় খুব দামী।”

দোকানদার এবার করুণ স্বরে কিছু একটা বলতে চাইল।

“কিন্তু ম্যাম। পাঁচশ টাকায় তো এটার।”

বেচারার কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে একজনের অত্যন্ত গম্ভীর আর ভারিক্কি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“প্যাক ইট আপ।”

রিদি চমকে উঠে পেছনে তাকিয়ে দেখে শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে। সে দুই হাত পকেটে গুঁজে শান্ত ভঙ্গিতে নিজের সানগ্লাসটা খুলে ফেলেছে। শুভ্রকে একদম কাছে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদির বুকের ভেতরটা আবারও অবাধ্যের মতো কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ অভিমান এসে সেই কাঁপুনিকে চাপা দিয়ে দিল। সে নিজেকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। শুভ্র দোকানদারের দিকে তাকিয়ে পুনরায় গম্ভীর গলায় বলল।

“ফাস্ট প্যাক ইট।”

দোকানদার এবার আর দেরি করল না। চটজলদি ড্রেসটা প্যাক করে শুভ্রর হাতে তুলে দিতে নিলে। যা দেখে রিদি আর চুপ থাকতে পারল না। সে শুভ্রর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলল।

“আরে ভাই। আপনি এই ত্যানাটা এতগুলো টাকা দিয়ে কিনলেন? আরে এই ত্যানার দাম কোনোভাবেই পাঁচশ টাকার উপরে হবে না। শুধু শুধু লস খাচ্ছেন তো।”

শুভ্র এক মুহূর্ত চুপ থেকে হঠাৎ কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠল।

“শাট আপ ইডিয়ট।”

শুভ্রর সেই বজ্রকঠিন ধমক খেয়ে রিদি একদম চুপসে গেল। তার মুখটা মুহূর্তেই ছোট হয়ে এল। শুভ্র কাউন্টার থেকে শপিং ব্যাগটা ছোঁ মেরে তুলে নিল এবং সেটা রিদির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীতল গলায় বলল।

“হোল্ড দিস।”

রিদি থতমত খেয়ে ব্যাগটা হাতে নিতেই শুভ্র তার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল।

“নেক্সট টাইম যদি আবার দেখি কোনো দোকানে এসে এমন ফালতু সিন ক্রিয়েট করছিস। তবে তোর এই দুই পা কেটে বাড়িতে বসিয়ে রাখতে আমার একদমই সময় লাগবে না। আন্ডারস্ট্যান্ড?”

বলেই রিদির হাত শক্ত করে চেপে ধরে টানতে টানতে শুভ্রার কাছে এনে দাঁড় করিয়ে দিল শুভ্র। রিদি ব্যথায় উঁহ করে উঠল। কিন্তু শুভ্রর পাথুরে চাউনি দেখে শব্দ করার সাহস পেল না। তাকে শুভ্রার জিম্মায় ছেড়ে দিয়েই শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট করে শোরুমের বাইরে চলে গেল।

শুভ্রা রিদির লাল হয়ে থাকা মুখ আর গাল ফুলানো দশা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কিরে। কী হয়েছে? এমন গাল ফুলিয়ে আছিস কেন? ভাইয়া কিছু বলেছে নাকি?”

রিদি এক বুক অভিমান চেপে রেখে কোনোমতে মাথা নিচু করে বলল।

“কিছু না রে। এমনি। মাথাটা একটু ধরেছে মনে হয়।”

শুভ্রা আর কথা বাড়াল না। সে মনের সুখে ঈদের যা যা দরকার সব কেনাকাটা শেষ করে নিল। কেনাকাটার বিশাল সব ব্যাগ ঈশানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তারা সবাই মিলে মলের ভেতরেই একটা দামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকল। রিদি। শুভ্রা। ইমন। ঈশান আর শুভ্র। সবাই মিলে একটা বড় টেবিল দখল করে বসল।

ওয়েটার এসে মেনু কার্ড দিয়ে গেল। সবাই যখন খাবার অর্ডারে ব্যস্ত। ঠিক তখনই শুভ্রা হঠাৎ টেবিলের অন্য পাশে বসা ঈশানের দিকে তাকিয়ে একটু কৌতূহলী গলায় বলল।

“ঈশান ভাইয়া। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

ঈশান মেনু কার্ড থেকে চোখ সরিয়ে মৃদু হেসে বলল।

“হুম বলো। কী বলবে?”

শুভ্রা বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে চিবুকে হাত দিয়ে বলল।

“আচ্ছা ভাইয়া। হিন্দুদের কি ঈদ নেই? তারা কি আমাদের মতো আনন্দ করে ঈদ করতে পারে না?”

শুভ্রার এমন অদ্ভুত আর শিশুতোষ প্রশ্নে টেবিলের সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। এমনকি গম্ভীর হয়ে ফোনে মগ্ন থাকা শুভ্রও একবার মাথা তুলে শুভ্রার দিকে তাকাল। রিদি অবাক হয়ে ভাবল। হঠাৎ শুভ্রার মাথায় এই চিন্তা কেন এলো। ঈশান কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল। যেন এই প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর তার জানা নেই। শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় সে বলতে শুরু করল।

“দেখ শুভ্রা। ঈদ শব্দটার অর্থ হলো আনন্দ বা বারবার ফিরে আসা উৎসব। ইসলাম ধর্মে ঈদ হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য নির্ধারিত দুটি বিশেষ পুরস্কারের দিন ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা। এটা নিছক কোনো সামাজিক উৎসব নয়। বরং এর সাথে ইবাদত আর বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমরা ঈদুল ফিতর পালন করি।”

শুভ্র এক মুহূর্ত থেমে রিদি আর শুভ্রার উৎসুক চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে লাগল।

“এখন তোর প্রশ্নে আসি। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী। ঈদ মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট ইবাদতের অংশ। তাই অন্য ধর্মের মানুষদের জন্য ইসলামিকভাবে ‘ঈদ’ পালন করার কোনো বিধান নেই। যেমন আমাদের জন্য তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করার সুযোগ নেই। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো আনন্দের দিনে আমরা প্রতিবেশী বা পরিচিত অমুসলিমদের সাথে সৌজন্য বিনিময় করতে পারি। তাদের খাবার খাওয়াতে পারি। কিন্তু উৎসবের যে মূল চেতনা বা ধর্মীয় ইবাদত। সেটা একান্তই মুসলিমদের। তাই তারা সামাজিকভাবে আমাদের আনন্দে শামিল হতে পারলেও। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের কোনো ‘ঈদ’ নেই।”

শুভ্রর এই স্পষ্ট আর যুক্তিপূর্ণ উত্তর শুনে টেবিলের সবাই একদম চুপ হয়ে গেল। এমনকি রিদিও অবাক হয়ে ভাবল। মানুষটা সবকিছুর এত গভীর জ্ঞান রাখে অথচ তার মনের খবরটা আজও রাখতে পারল না। শুভ্রার মনটা মুহূর্তেই কেন জানি বিষণ্ণ হয়ে গেল। তার এই হঠাৎ মন খারাপের কারণটা সে ছাড়া এই টেবিলের আর কারো জানা নেই। সবার এই গম্ভীর নীরবতার মাঝে হঠাৎ ইমন চটপটে গলায় ঈশানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।

“ব্রো। আমাদের বাসায় কিন্তু কাল তোমার দাওয়াত। কাল অনেক আয়োজন হবে। সবাই মিলে অনেক মজা করে খাব। তুমি হিন্দু হয়েছ তো কী হয়েছে? ঈদ তো খুশির দিন। আর আনন্দ সবার জন্য। আল্লাহ প্রদত্ত কোনো উৎসব তাঁর সৃষ্টি বা বান্দারা মিলেমিশে পালন করলে তিনি নিশ্চয়ই বিরক্ত হন না। কারণ তুমি হিন্দু হলেও স্বয়ং আল্লাহই তো তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তাই না? তাহলে তুমিও তো তাঁরই সৃষ্টি। তাঁরই বান্দা। তাঁর দেওয়া উৎসবে শামিল হতে তোমার বাধা কোথায়?”

ইমনের এমন সোজাসাপ্টা আর আবেগী কথা শুনে ঈশান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের চুলে হাত বুলাল। সে ম্লান হাসল ঠিকই। কিন্তু মুখ ফুটে কোনো উত্তর দিল না। টেবিলের চারপাশটা হঠাৎ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। শুভ্রও একদম চুপচাপ। সে মনে মনে খুব ভালো করেই জানে। ঈশানকে হাজারবার বললেও সে সহজে তাদের বাসায় যাবে না। এর আগেও অসংখ্যবার দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। পীড়াপীড়ি করা হয়েছে। কিন্তু ঈশান সবসময়ই খুব বিনয়ের সাথে এড়িয়ে গেছে।

তবে শুভ্রও দমবার পাত্র নয়। নিজের জেদ আর বন্ধুর প্রতি টান থেকে সে নাছোড়বান্দা হয়ে থাকে। ঈদের দিন পুরোটা সময় ঈশানকে নিজের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোটা শুভ্রর কাছে এখন এক মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।


বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বেজে গেল। শুভ্র তার সেই চিরচেনা গম্ভীর মেজাজে রিদি আর ইমনকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েই এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল। বাড়ির ভেতর পা রাখতেই ইমন আর রিদি দেখল শোবার ঘরে এলাহি কাণ্ড চলছে। ইকবাল এহসান আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে তাড়া দিয়ে বললেন।

“এসেছিস তোরা? যাক বাবা। যা তো। গিয়ে তাড়াতাড়ি তোদের দরকারি কাপড় চোপড়গুলো গুছিয়ে নে।”

ইমন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কেন আব্বু? হঠাৎ গোছগাছ কেন? আমরা কোথাও যাচ্ছি নাকি?”

রাবেয়া এহসান তখন একটা বড় ট্রাঙ্ক গোছাতে ব্যস্ত। তিনি মুখ তুলে মুচকি হেসে বললেন।

“হ্যাঁ রে পাগল। আমরা সবাই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। ইচ্ছা ছিল এবার শহরে ঈদ করব। কিন্তু তোদের মামা হঠাৎ মত ঘুরিয়ে ফেললেন। তিনি চাইছেন এবার আমরা সবাই মিলে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে গিয়েই ঈদটা করি। তোদের বড় মামাও ওখানেই থাকবেন।”

মায়ের মুখে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা শোনা মাত্রই ইমন খুশিতে চিল চিৎকার দিয়ে উঠল।

“ইয়ে। দারুণ হবে। কতদিন পর গ্রামে যাব। বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা আর ঘোরাঘুরি হবে। উফ। ভাবতেই জাস্ট জমে যাবে।”

রিদির মনের কোণেও যেন খুশির ঢেউ আছড়ে পড়ল। অনেক দিন হলো নানুর বাড়িতে যাওয়া হয় না। সেই মেঠো পথ। পুকুর ঘাট আর গাছগাছালিতে ঘেরা শান্ত গ্রামটা রিদির খুব প্রিয়। আর এবার তো ঈদে সবাই একসাথে থাকবে। আড্ডা আর হুল্লোড়ে গ্রামটা মেতে উঠবে ভাবতেই রিদির সারা দিনের ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই উবে গেল। সে আর এক সেকেন্ড দেরি না করে নিজের রুমে ছুটে গেল। আলমারি খুলে ঝটপট তার প্রিয় জামাকাপড়গুলো বের করতে শুরু করল। কিছুদিন আগে কেনা নতুন ঈদের ড্রেসগুলো সযত্নে ব্যাগে গুছিয়ে নিল সে। একটা অদ্ভুত শিহরণ কাজ করছে তার মনে। গ্রামের সেই মুক্ত বাতাস আর প্রিয়জনদের ভিড়ে এবারের ঈদটা নিশ্চয়ই অন্যরকম কাটবে।


এদিকে শুভ্র আর শুভ্রা বাড়িতে পা রাখতেই সোহান চৌধুরী আর সাহেরা চৌধুরীর মুখে একই খবর শুনতে পেল। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় দেখে শুভ্র যখন আবার উল্টো পথে বাড়ির বাইরে বের হতে চাইল। তখনই সোহান চৌধুরী গম্ভীর গলায় ডাক দিলেন।

“এই রাতে আবার কোথায় যাচ্ছিস? যা। গ্রামে যাওয়ার জন্য যা যা কাপড় লাগবে কাজের মেয়েদের বলে দে। ওরা গুছিয়ে দেবে।”

শুভ্র শান্ত স্বরে উত্তর দিল।

“দরকার নেই। আমি নিজেরটা নিজেই গুছিয়ে নিতে পারব। আর হ্যাঁ। যেহেতু গ্রামে যাওয়া হচ্ছে। তাই আমার সাথে আমি ঈশানকেও নিয়ে যাব।”

ছেলের মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে সোহান চৌধুরী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বললেন।

“তুই কি পাগল হয়ে গেলি শুভ্র? সামনে ঈদ। মুসলমানদের উৎসব। আর আমাদের গ্রামের বাড়িতে আমরা সবাই মুসলমান। তার মধ্যে তুই ওই হিন্দু ছেলেটাকে নিয়ে যেতে চাস? লোকে বলবে কী।”

বাবার এমন সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা শুনে শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

“হিন্দু ছেলে না বলে ‘ভাই’ বলেন আব্বু। ও আমার ভাই লাগে। আর ও হিন্দু হয়েছে তো কী হয়েছে? ও কি মানুষ না? ও কি আমাদের সাথে বসে একই টেবিলে খেতে পারবে না? ও নামাজ পড়তে না পারলেও আমাদের সাথে আনন্দ তো করতে পারবে। খুশিতে শামিল হতে তো ধর্মের বাধা থাকার কথা নয়।”

ছেলের মুখে এমন যুক্তি শুনে সোহান চৌধুরী বেশ বিরক্ত হলেন। তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না এই ঈশানের মাঝে এমন কী জাদু আছে যে। শুভ্র ওই ছেলেটাকে নিয়ে এত বেশি কেয়ার করে। তিনি আবার কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তার আগেই শুভ্র সাফ জানিয়ে দিল।

“আব্বু। আমি সরাসরি বলে দিচ্ছি। আমি যদি গ্রামে যাই। তবে ঈশানকে নিয়েই যাব। আর ও যদি না যায়। তবে আপনারা যেতে পারেন। আমি যাব না।”

শুভ্রর এমন একরোখা জেদ দেখে সাহেরা চৌধুরী পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে এলেন। তিনি সোহান চৌধুরীর হাত ধরে নিচু স্বরে বললেন।

“থাক না গো। ছেলেটা যখন এত করে চাইছে আর ঈশানও তো ভালো ছেলে। নিয়ে যাক না সাথে।”

সোহান চৌধুরী আর কিছু বললেন না ঠিকই। কিন্তু তার গুমোট মুখ দেখে বোঝা গেল ছেলের এই সিদ্ধান্তে তিনি মোটেও খুশি নন। ওদিকে শুভ্রর মনে তখন অন্য চিন্তা। ঈশানকে রাজি করানোই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। শুভ্র বাড়ির বাইরে এসেই ফোনটা বের করে সরাসরি ঈশানকে কল দিল। রিং হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মাথাতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো। শুভ্র কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি আদেশ দেওয়ার মতো করে বলল।

“ঈশান। তোমার প্রয়োজনীয় যা যা কাপড় লাগে সব এখনই ব্যাগে গুছিয়ে নাও।”

ঈশান ওপাশ থেকে বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।

“কেন বস? হঠাৎ কাপড় গোছাতে বলছেন কেন?”

শুভ্রর গলায় একবিন্দু নমনীয়তা নেই। সে গম্ভীরভাবে উত্তর দিল।

“ঈশান। আমি এসবের উত্তর দেওয়াটা এখন প্রয়োজন মনে করছি না। তোমাকে যা বলছি ঠিক ততটাই করো। তাড়াতাড়ি কাপড় গুছিয়ে আমাদের বাসার গেটের সামনে এসে দাঁড়াবে। আর যদি না আসো। তবে আমাকে পাবে তোমার বাসার সামনে।”

বলেই শুভ্র কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে খট করে ফোনটা কেটে দিল। সে খুব ভালো করেই জানে। ঈশানকে এই মুহূর্তে সুযোগ দিলে সে হাজারটা অজুহাত দাঁড় করাবে। ফোন পকেটে রেখে শুভ্র নিজের ঘরে ফিরে এল। আলমারি খুলে সে নিজেই নিজের প্রয়োজনীয় শার্ট। প্যান্ট আর পাঞ্জাবিগুলো গুছিয়ে নিতে লাগল। গোছানোর এক পর্যায়ে আলমারির এক কোণ থেকে কাপড়ের ভাঁজ করা স্তূপের মাঝ থেকে একটা ছবি আলতো করে মেঝেতে পড়ে গেল। শুভ্র নিচু হয়ে ছবিটা হাতে তুলে নিল। ছবিটার দিকে তাকাতেই তার পাথরের মতো শক্ত চেহারায় যেন বসন্তের হাওয়া বয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক চঞ্চলা কিশোর মেয়েকে। যার হাসিতে যেন এক পৃথিবী মায়া মিশে আছে। শুভ্র আলতো করে ছবিটার ওপর হাত বুলিয়ে আবার সাবধানে সেটা ব্যাগের চেইন দেওয়া পকেটে লুকিয়ে রাখল।

সবাই রেডি হয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। শুভ্র সদর দরজা দিয়ে বের হতেই দেখল। গেটের সামনে ঈশান বাধ্য ছেলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে একটা ছোট ট্রাভেল ব্যাগ। ঈশানকে দেখা মাত্রই শুভ্রর গম্ভীর মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। যদিও সে সেটা প্রকাশ করল না। সে ঈশানের সামনে এসে সোজাসাপ্টা গলায় বলল।

“গাড়িতে ওঠো।”

ঈশান আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে ভেবেছিল হয়তো বসের কোনো জরুরি কাজ আছে। তাই এত রাতে ডাক পড়েছে। সে চুপচাপ সামনের সিটে গিয়ে বসল। কিন্তু ঈশানের সব ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে। হঠাৎ দৌড়ে এসে পেছনের সিটে ধপাস করে বসে পড়ল শুভ্রা। ওর মুখে চওড়া হাসি। পেছনের আরেকটা গাড়িতে সোহান চৌধুরী আর সাহেরা চৌধুরী উঠে পড়লেন। সব কিছু যেন ঈশানের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। শুভ্র কোনো কথা না বলে স্টার্ট দিল। গাড়ি যখন হাইওয়েতে দাপিয়ে চলছে। ঈশান তখন আর থাকতে না পেরে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল।

“বস। কোথায় যাচ্ছি আমরা? আর শুভ্রা কেন আমাদের সাথে?”

পেছন থেকে শুভ্রা খিলখিল করে হেসে উঠল। দুষ্টুমি করে বলল।

“আরে ঈশান ভাইয়া। আপনাকে আমরা মারতে নিয়ে যাচ্ছি। সামনে পদ্মা সেতু আসছে না? ওখানে নিয়ে আপনাকে ব্রিজ থেকে টুপ করে ফেলে দেব।”

ঈশান মোটেও মজার ভঙ্গিতে নেই। ওর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সে ঘাড় ঘুরিয়ে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বলল।

“শুভ্রা। আমি মজা করছি না। বস। আমরা ঠিক কোথায় যাচ্ছি?”

শুভ্র তখনো একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতেই খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল।

“গ্রামে।”

ঈশান আকাশ থেকে পড়ল। অবাক হয়ে বলল।

“গ্রামে। গ্রামে মানে?”

শুভ্রা পেছন থেকে আবার ফোড়ন কাটল।

“আরে হ্যাঁ। আমরা সবাই আমাদের দাদুর বাড়ি যাচ্ছি। আর সাথে আপনাকেও নিয়ে যাচ্ছি ঈদ করতে।”

ঈশান যেন হাবা বনে গেল। সব কিছু বুঝতে ওর কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। যখন পুরোপুরি বুঝল। তখনই সে ছটফট করে শুভ্রকে বলল।

“বস। গাড়ি থামান। আমি যাব না।”

শুভ্র ওর স্বভাবজাত ঘাড়ত্যাড়া উত্তর দিল।

“আমি তো তোমার কাছে জানতে চাইনি যে তুমি যাবে কি যাবে না। আমি জানি। তুমি এখন আমাদের সাথে যাচ্ছ। দ্যাটস ইট।”

ঈশান মরিয়া হয়ে উঠল।

“বস। তা হয় না। আপনি বিষয়টা বুঝতে পারছেন না। প্লিজ গাড়িটা থামান।”

শুভ্র এক চুলও নড়ল না ওর সিদ্ধান্ত থেকে। সে স্টিয়ারিংয়ে শক্ত মুঠো রেখে বলল।

“আমার কিছু বোঝার দরকার নেই। ঈশান। গাড়ি চলছে। গাড়ি তার ঠিকানাতেই থামবে। যদি তোমার খুব তাড়া থাকে। তবে চলন্ত গাড়ি থেকেই ঝাঁপ দাও। তবুও এই গাড়ি থামছে না।”

ঈশান অনেক জোরাজোরি করল। কিন্তু ওই পাথরের মতো একরোখা শুভ্রর সামনে কোনো কাজ হলো না। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে সে একদম অসহায় মুখ করে সিটে হেলান দিয়ে বসে রইল। গাড়ি যখন হাইওয়ের একটা বড় মোড়ের কাছে এল। ঠিক তখনই ওপাশের রাস্তা দিয়ে আরেকটা পরিচিত গাড়ি ধীরগতিতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সেটা দেখা মাত্রই পেছনের সিট থেকে শুভ্রা চিৎকার করে উঠল।

“ভাইয়া। গাড়ি থামাও। জলদি থামাও।”

শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে সামনের গাড়িটার গতিরোধ করে নিজের গাড়িটা ব্রেক কষে থামিয়ে দিল। তবে তার চাতুরি দেখল ঈশান। গাড়ি থামানোর সাথে সাথেই শুভ্র খট করে ঈশানের পাশের ডোর লক করে দিল। যাতে সে কোনোভাবেই নেমে পালাতে না পারে। শুভ্রা এক লাফে গাড়ি থেকে নেমে সামনের গাড়িটার কাছে দৌড়ে গেল। সেই গাড়িতে ছিল রিদিরা। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্রা তাকে একরকম জোর করে টেনে গাড়ি থেকে বের করে আনল। রিদি অবাক হয়ে বলল।

“আরে শুভ্রা। কী করছিস? আমরা তো আমাদের গাড়িতেই যাচ্ছিলাম।”

কিন্তু শুভ্রা কার কথা শোনে? সে রিদির হাত ধরে টেনে এনে নিজেদের গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দিল এবং নিজেও তড়িৎগতিতে উঠে বসল। শুভ্র আয়নায় একবার রিদির দিকে তাকাল। কিন্তু চোখে চোখ পড়তেই আবার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি এখন হুহু করে গ্রামের মেঠো পথের দিকে এগিয়ে চলছে। চারপাশটা নিঝুম। কেবল ইঞ্জিনের হালকা আওয়াজ। রিদি একদম চুপচাপ জানালার বাইরের দ্রুত সরে যাওয়া গাছপালার দিকে তাকিয়ে রইল। নিস্তব্ধতা ভাঙতে শুভ্রা হঠাৎ শুভ্রর উদ্দেশ্যে আবদার করে বসল।

“ভাইয়া। ভোর হচ্ছি। একটা দারুণ গান দাও তো। সবাই মিলে একসাথে গাই।”

শুভ্র কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশব্দে হাতের রিমোটটা চেপে মিউজিক প্লেয়ারে একটা পরিচিত সুর ছেড়ে দিল। রাতের কুয়াশাভেজা মেঠো পথের বুক চিরে গাড়ির ভেতর তখন অরিজিৎ সিংয়ের সেই দরদী কণ্ঠটা মায়াবী এক পরিবেশ তৈরি করল।

গাড়ির স্পিকারে বেজে উঠল।

~জনম জনম জনম~
~সাথ চলনা যুহি~

শুভ্রা কোনো দ্বিধা ছাড়াই গানের তালের সাথে সুর মেলাতে শুরু করল। সে নিজের মনেই গেয়ে চলেছে। যেন এই ভোরের আনন্দটা সে পুরোপুরি শুষে নিতে চায়।

~কসম তুমে কসম~
~আকে মিলনা ইহি~

গানের কথাগুলো যখন গাড়ির বদ্ধ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রিদি আড়চোখে একবার সামনের আয়নার দিকে তাকাল। দেখল শুভ্র একমনে স্টিয়ারিং ধরে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। কিন্তু গানের প্রতিটা কথা যেন রিদির বুকের ভেতরটা উথালপাথাল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ‘জনম জনম’ শব্দটা কানে আসতেই সে দ্রুত চোখ সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। ঈশানও চুপচাপ। সে এই অদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একপাশে শুভ্রার উচ্ছল গান। অন্যপাশে শুভ্রর গম্ভীর স্তব্ধতা। সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ অথচ মধুর পরিবেশ। শুভ্রা হঠাৎ রিদির হাতে একটা ঠেলা দিয়ে বলল।

“কিরে রিদি। তুইও গা। আমার সাথে সাথে সুর মিলা। এত সুন্দর গান। দেখিস সামনে যখন সূর্য উঠবে তখন আরও ভালো লাগবে।”

রিদি মৃদু হাসল ঠিকই। কিন্তু গাইতে পারল না। হঠাৎ মাঝপথে আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির শব্দের এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হলো। সেই শীতল হাওয়ায় আর গাড়ির দুলুনিতে ঈশান কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল টেরই পেল না। কিছুক্ষণ পর শুভ্রাও রিদির কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল।

পুরো গাড়িতে এখন শুধু শুভ্র আর রিদি জেগে। শুভ্র পাথরের মতো স্থির হয়ে ড্রাইভ করছে। আর রিদি জানালার বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা দেখছে। ওর চোখে ঘুম নেই। বরং মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা। গাড়িটা যখন জামালপুর শহর ছাড়িয়ে গ্রামের মেঠো রাস্তায় ঢুকল। ঠিক তখনই বিপত্তিটা ঘটল। কর্দমাক্ত মাটির রাস্তায় চাকাটা আচমকা একটা গর্তে পড়ে কাদায় ডেবে গেল। ইঞ্জিন গর্জে উঠছে ঠিকই। কিন্তু গাড়ি এক চুলও সামনে এগোচ্ছে না।

শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিংয়ে একটা ঘুষি মারল। বাইরে মষলধারে বৃষ্টি। এর মধ্যে গাড়ি থেকে নামা মানেই ভিজে একাকার হওয়া। রিদি অবাক হয়ে শুভ্রর দিকে তাকাল। পরক্ষণেই দেখল। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে শুভ্র ঝাপটানি বৃষ্টির মধ্যেই দরজা খুলে নেমে গেল। রিদি জানালার কাঁচ একটু নামিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।

“কী হয়েছে ভাইয়া? এই বৃষ্টির মধ্যে আপনি রাস্তায় কেন নামলেন?”

শুভ্রর মেজাজ তখন তুঙ্গে। কাদা আর বৃষ্টির ঝাপটায় সে বিরক্তিতে ফেটে পড়ে চেঁচিয়ে উত্তর দিল।

“বৃষ্টির মধ্যে নাচতে নেমেছি।”

রিদি মুহূর্তেই চুপসে গেল। শুভ্রর এমন রুক্ষ উত্তরে তার বুকের ভেতরটা অভিমানে টনটন করে উঠল। সে দেখল শুভ্র গাড়ির পেছনে গিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জলে তার কালো শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। কাদা ছিটকে আসছে গায়ে। গাড়ির নড়াচড়া দেখে রিদি বুঝতে পারল। চাকাটা বেশ ভালোভাবেই আটকে গেছে। একা শুভ্রর পক্ষে এটা তোলা প্রায় অসম্ভব। রিদি আর এক মুহূর্ত ভাবল না। নিজের জেদ বা শুভ্রর বকুনি। কোনো কিছুর পরোয়া না করে সেও হুট করে দরজা খুলে ওই মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেই নেমে পড়ল। কাদা মাখা রাস্তায় পা রাখতেই তার পায়ের স্যান্ডেলটা দেবে গেল। কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে সোজা গিয়ে শুভ্রর পাশে দাঁড়াল।

রিদিকে এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নামতে দেখে শুভ্র রীতিমতো গর্জে উঠল। বৃষ্টির শব্দের ওপর দিয়ে তার ধমক শোনা গেল।

“তোর সাহস তো কম না। এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নামলি কেন? অসুখ বাধাতে চাস?”

রিদি বৃষ্টির ঝাপটায় চোখ পিটপিট করতে করতে জেদি গলায় উত্তর দিল।
“গাড়িতে বসে থেকে আমার ভালো লাগছে না। তার চেয়ে দুজন মিলে ধাক্কা দিলে তাড়াতাড়ি গাড়িটা গর্ত থেকে উঠবে আর আমরা এখান থেকে যেতে পারব। কথা না বলে ধাক্কা দিন তো।”

শুভ্র আর কথা বাড়াল না। সময়ের গুরুত্ব বুঝে সে আর রিদি দুজনে মিলে সর্বশক্তি দিয়ে গাড়িটা পেছনের দিক থেকে ঠেলতে শুরু করল। কর্দমাক্ত পিচ্ছিল রাস্তায় কয়েকবার চাকা ঘুরল। কাদা ছিটকে এল দুজনের গায়েই। অবশেষে এক প্রবল ঝাকুনি দিয়ে গাড়িটা গর্ত থেকে উঠে এল।

দুজনেই ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছে। শুভ্রর কালো শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। কপাল বেয়ে বৃষ্টির জল নামছে। রিদির অবস্থাও তথৈবচ। তার থ্রি পিস আর হিজাব ভিজে একদম গায়ের সাথে সেঁটে গেছে। রিদি যখন হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়িতে ওঠার জন্য এক পা বাড়াতে গেল। ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। কাদার ওপর পা পিছলে সে ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়ে যেতে লাগল।

শুভ্র বিদ্যুৎবেগে হাত বাড়িয়ে রিদিকে ধরে ফেলল। কিন্তু রিদির ভিজে শরীরের স্পর্শ যেন এক মুহূর্তের জন্য শুভ্রর স্নায়ুতে তীব্র এক বৈদ্যতিক ঝটকা দিল। এই আকস্মিক শিহরণে শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে অবচেতনভাবেই হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। ফল যা হওয়ার তাই হলো। দুজনেই ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে কাদা মাখা রাস্তার ওপর পড়ে গেল।

কাদায় মাখামাখি হয়ে দুজনেরই কোমর আর পিঠে বেশ চোট লাগল। রিদি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে কোনোমতে কাদা মাখা হাত দিয়ে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করল। ঠিক একই সময়ে শুভ্রও টাল সামলাতে সামলাতে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে আর পিছল রাস্তায় শরীরের নিয়ন্ত্রণ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। মাথা ঘুরিয়ে সোজা হতেই রিদি আবার পিছলে গেল এবং এবার সে সরাসরি গিয়ে পড়ল শুভ্রর ওপরে। মুহূর্তের ব্যবধানে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। রিদির নিয়ন্ত্রণহীন শরীরটা শুভ্রর বুকের ওপর আছড়ে পড়ল আর তার ঠোঁট দুটো গিয়ে সরাসরি স্পর্শ করল শুভ্রর ঠোঁটে।

স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। বৃষ্টির অঝোর শব্দ যেন এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেল। রিদির সারা শরীর দিয়ে যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ বয়ে গেল। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝেও তার শরীরটা পাথরের মতো শক্ত আর গরম হয়ে উঠল। শুভ্রর চোখ দুটো বিস্ফারিত। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তার সাথে ঠিক কী ঘটে গেল। কাদা। বৃষ্টি আর আবছা আলোয় সিক্ত দুটি শরীর এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় স্থির হয়ে রইল।

বৃষ্টির অঝোর ধারা আর কর্দমাক্ত রাস্তার সেই নির্জনতায় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। কথা আছে। পুরুষ যতই গম্ভীর বা পাথরের মতো শক্ত হৃদয়ের হোক না কেন। প্রিয় নারীকে এতটা নিবিড়ভাবে কাছে পেলে তার সব নিয়ন্ত্রণ ধুলোয় মিশে যায়। শুভ্রর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। তার সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। রাগ আর শাসনের দেয়াল এক মুহূর্তের স্পর্শে চুরমার হয়ে গেল।

শুভ্র নিজেও জানে না সে এই মুহূর্তে কী করছে। কিন্তু অবচেতন মনে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রিদির ভিজে শরীরের উষ্ণতা আর ঠোঁটের সেই নরম ছোঁয়া শুভ্রর ভেতরের সুপ্ত আবেগগুলোকে জাগিয়ে তুলল। সে আলতো করে অথচ দৃঢ়ভাবে রিদির কাদা মাখা কোমরটা দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। এক অদ্ভুত উন্মাদনায় সে রিদির ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল। এ যেন এক তৃষ্ণার্তের জল পাওয়া। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অব্যক্ত সব অনুভূতি এই একটি চুম্বনে মিশে গেল। এই প্রতিটি ছোঁয়া। প্রতিটি নিঃশ্বাস তাদের জন্য পবিত্র এবং একান্তই নিজেদের অধিকার। এদিকে রিদির অবস্থা শোচনীয়। সে যেন আস্ত একটা জ্যান্ত পাথর হয়ে গেছে। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সারা শরীরে বইছে এক প্রলয়ঙ্কারী কম্পন। বৃষ্টির ঠান্ডা জল তার গায়ে লাগছে ঠিকই। কিন্তু শুভ্রর শরীরের উত্তাপ আর এই আকস্মিক সোহাগে সে যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেছে। সে শুভ্রকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি নিজের হাত দুটো নড়াচড়া করার কথা তার মাথাতেই আসছে না।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশটা ঝাপসা হয়ে আসছে। আর কাদার ওপর পড়ে থাকা দুটি শরীর এক অলিখিত চুক্তিতে একে অপরের গহীনে মিশে যাচ্ছে। এই মুহূর্তটি যেন তাদের জীবনের সব দূরত্ব আর অভিমান এক নিমিষেই ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল।

কতক্ষণ সময় যে তারা ওইভাবে কাদা মাখা রাস্তার ওপর বৃষ্টির তোড়ে মিশে ছিল। তার কোনো হিসেব নেই। চারপাশের পৃথিবীটা যেন ওই কয়েক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির তীব্র শব্দে শুভ্রের হুঁশ ফিরল। নিজের করা কাজটার গভীরতা বুঝতে পেরে সে নিজেই নিজের ওপর চমকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে এ কী করল। শুভ্র তড়িৎগতিতে এক ধাক্কায় রিদিকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে সোজাসাপ্টা দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। উত্তেজনায়। নাকি অপরাধবোধে। সেটা বোঝা দায়। কাঁপা কাঁপা গলায় রিদির দিকে আঙুল উঁচিয়ে সে ধমকের সুরে বলে উঠল।

“তুই। তুই। তুই একটা সাংঘাতিক মেয়ে।”

বলেই শুভ্র আর এক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়াল না। কাদা মাখা শরীর নিয়ে ল্যাপটপ বা অন্য কিছুর পরোয়া না করে দ্রুত গিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। ওদিকে রিদি তখনো রাস্তার ওই কাদার ওপর পাথরের মতো বসে আছে। বৃষ্টির জল তার গায়ের কাদা ধুয়ে দিচ্ছে ঠিকই। কিন্তু মনের ভেতর যে তোলপাড় শুরু হয়েছে তা থামানোর সাধ্য কারো নেই। তার সারা শরীরে এখনো শুভ্রের সেই বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ লেগে আছে। আর ঠোঁটে লেগে আছে সেই প্রথম সোহাগের উষ্ণতা। লজ্জায় তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।

ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন গ্রামের নিস্তব্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। ঠিক তখনই শুভ্রর গাড়িটা কাদা মাখা অবস্থায় গ্রামের বাড়ির সদর দরজায় এসে থামল। বৃষ্টির ঝাপটা তখনো কমেনি। গাড়ির শব্দে ঈশানের ঘুম ভাঙল। সে চটপট শুভ্রাকে ডেকে তুলল। সবাই মিলে একরকম দৌড়ে বাড়ির বারান্দায় গিয়ে উঠল। একতলা বিশাল পুরনো ধাঁচের বাড়ি। ভিতরে ঢুকতেই সামনে পড়লেন সোহান চৌধুরী। শুভ্র আর রিদির আপাদমস্তক কাদা আর পানিতে চপচপে ভেজা অবস্থা দেখে তিনি আঁতকে উঠলেন।

“একি। তোরা এই মাঝরাস্তায় এভাবে ভিজলি কীভাবে? রিদির এই অবস্থা কেন?”

শুভ্র তখনো অস্বস্তিতে কুঁকড়ে আছে। সে একবারও রিদির দিকে না তাকিয়ে নাক টানতে টানতে জবাব দিল।

“রাস্তায় গাড়ির চাকা গর্তে দেবে গিয়েছিল আব্বু। ওটা তুলতে গিয়েই এই দশা।”

সাহেরা চৌধুরী ভেতর থেকে তোয়ালে হাতে বেরিয়ে এলেন। ছেলের অবস্থা দেখে চিন্তিত মুখে বললেন।

“তোর তো আবার একটু ভিজলেই সর্দি গরম লেগে যায়। তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে গোসল করে নে। আমি এখনই তোদের সবার জন্য আদা দিয়ে গরম গরম চা বানাচ্ছি। যা। দেরি করিস না।”

বাড়ির বাকি আত্মীয় স্বজনরা তখন গভীর ঘুমে বিভোর। তাই কেউ আর বাড়তি কোনো শোরগোল করল না। শুধু রিদির বড় মামি বিলকিস চৌধুরী ঘুম থেকে উঠেছেন। শুভ্র আর ঈশান তাদের জন্য বরাদ্দ করা রুমে ঢুকে পড়ল। শুভ্রর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে কোনো কথা না বলে ব্যাগ থেকে একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার টেনে নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল।

ভেতর থেকে দরজা আটকে ঝরনার ঠান্ডা পানিটা ছেড়ে দিল সে। পানির ঝাপটা মাথায় লাগতেই বন্ধ চোখের পাতায় বারবার ভেসে উঠতে লাগল রাস্তার সেই দৃশ্যটা। কাদা। বৃষ্টি আর রিদির সেই ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ। শুভ্র দুই হাত বাথরুমের দেওয়ালে ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের ওপর তীব্র ঘৃণা আর বিরক্তি কাজ করছে তার। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল।

“প্রথমে আমার মনটা কেড়ে নিল। আর এখন আমার শরীরটাও হার মানল? আমি কি এতটাই দুর্বল? আমি কেন নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে পারলাম না? ছ্যাঃ। ড্যাম ইট। আই লস্ট মাই কন্ট্রোল।”


এদিকে রিদি আর শুভ্রা পা টিপে টিপে রুমে ঢুকল। কাজিনরা তখন অঘোর ঘুমে মগ্ন। তাই কেউ আর বাড়তি কোনো শোরগোল করল না। রিদি কোনোমতে ঝটপট গোসল সেরে ভেজা কাপড় পাল্টে পাখির পাশেই শুয়ে পড়ল। শুভ্রাও সারারাতের জার্নির ক্লান্তিতে শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুমে তলিয়ে গেল।

কিন্তু রিদির চোখে এক বিন্দু ঘুম নেই। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকলেই বারবার চোখের সামনে সেই কাদা মাখা রাস্তা আর বৃষ্টির ঝাপটার মাঝে শুভ্রর সেই পাগল করা স্পর্শটা ভেসে উঠছে। লজ্জায় রিদির গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে উঠছে বারবার। সে বালিশে মুখ গুঁজে ভাবছে। শুভ্র ভাইয়া এসব কী করে ফেলল? ছিঃ। এখন কাল সকালে সবার সামনে উনার সামনে যাব কীভাবে? ভাবনার সাগরে যখন রিদি হাবুডুবু খাচ্ছে। ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরে তার বালিশের পাশে রাখা ফোনটা টুন টুন করে বেজে উঠল। এই শেষ রাতে আবার কে মেসেজ দিল? রিদি অবাক হয়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার কলিজা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মেসেজটা এসেছে শুভ্রর আইডি থেকে। বুক ধকফকানি নিয়ে রিদি কাঁপাকাঁপা আঙুলে ইনবক্সটা খুলল। দেখল শুভ্র লিখেছে।

“আজকে যা যা হয়েছে সব তোর জন্য হয়েছে। এর শাস্তি হিসেবে কাল সবার কাছ থেকে যা সালামি পাবি। সব আমাকে দিবি। মনে থাকে যেন।”

মেসেজটা পড়ে রিদির যেন আকাশ থেকে পড়ার দশা। সে একদম থ হয়ে গেল। মনে মনে গজগজ করতে লাগল। আমি কি ইচ্ছে করে পড়েছি? কাদা তো পিচ্ছিল ছিল। আমি তো আছাড় খেয়েছি আর ভুল করে উনার ওপর পড়েছি। কিন্তু ওইটা তো উনি নিজে করেছেন। তাহলে আমাকে কেন দোষ দিচ্ছেন? এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিদির মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। অপমানে আর লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজে সে ছটফট করতে লাগল।

এদিকে শুভ্রর অবস্থাও তথৈবচ। চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। রুমের স্বল্পতার কারণে একই বিছানায় পাশে শুয়েছে ঈশান। শুভ্র বারবার এপাশ ওপাশ করছে। বিছানায় ছটফটানি দেখে ঈশান কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসল। অন্ধকারেই সে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“বস। আপনি ঠিক আছেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”

শুভ্র অপ্রস্তুত হয়ে তড়িৎগতিতে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করল। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল।

“হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি একদম ঠিক আছি। তুমি ঘুমাও।”

ঈশান শুভ্রর এই অস্থিরতা দেখে মনে মনে মুচকি হাসল। সে শুভ্রর অনেক দিনের সঙ্গী। তাই বসকে বুঝতে তার সময় লাগল না। সে একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল।

“আচ্ছা বস। একটা প্রশ্ন করি? রিদি আর আপনার বিয়েটা গোপন রয়েছে মানলাম। কিন্তু আপনার তো অধিকার আছে। আপনি চাইলে তো রিদির সাথে গোপনে এক রুমে থাকতে পারেন। তাহলেই তো এমন ছটফট করতে হয় না আপনাকে।”

কথাটা শুনে শুভ্রর বুকটা যেন ধক করে উঠল। ধরা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। তবুও নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখতে সে শক্ত গলায় জবাব দিল।

“বাজে কথা বলবে না তো ঈশান। আমি এখনই ওর সাথে বেড শেয়ার করতে চাইছি না। যেদিন ওকে পুরোপুরি সসম্মানে নিজের বাড়ি নিয়ে তুলব। ঠিক সেদিনই আমি ওর সাথে এক রুমে থাকব। কিন্তু তার আগে না।”

ঈশান আর কোনো কথা বাড়াল না। একটা লম্বা হাই তুলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল সে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর নাসিকা গর্জনে বোঝা গেল সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। কিন্তু বেচারা শুভ্র। তার দুচোখের পাতা এক হওয়া তো দূরের কথা। মনের ভেতরে তখনো এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে বালিশে মুখ গুঁজে নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু করল। এক অদ্ভুত নেশালো। ভারী আর ভাঙা গলায় সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।

“তোর জন্য আজ আমার এই দশা। এক ফোঁটা চোখের পাতা এক করতে পারছি না। আমার ঘুমের যে বারোটা বাজালি তুই। এর শোধ আমি ঠিক সময়মতো শুধে আসলে তুলে নেব। প্রতিটি মুহূর্তের হিসেব নেব তোর থেকে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি। দেখিস তুই।”

রানিং…!

দাও দিয়ে দিলাম ইয়া ধারনার বাইরে বড় একটা পর্ব কেমন হয়ছে জানিও 🐸🤧

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply