অসম্ভবরকমভালোবাসি_তোমায়
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ২১
🚫অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ🚫
অন্ধকারের ঝাপসা আলোয় চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শুভ্রকে দেখে রিদির কলিজাটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শুভ্রের সারা শরীরে চাবুক আর লাঠির নিষ্ঠুর দাগ, একদম নিস্তেজ হয়ে চেয়ারে বসে আছে সে। চিরকাল যে লোকটা রাগী, গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ স্মার্ট গেটআপ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত, আজ সেই লোকটাই অগোছালো চুলে মাথা নিচু করে মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। এ কোন শুভ্রকে দেখছে রিদি!রিদির পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে, ঠোঁট জোড়া যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। অস্ফুট স্বরে বুক চেরা এক করুণ আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
“শু-শুভ্র ভা-ভাইয়া!”
রিদির সেই ভাঙা কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই শুভ্র খুব ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। রিদির চোখের দিকে তাকাতেই শুভ্রের সেই লাল হয়ে যাওয়া ফোলা চোখ দুটোতে ফুটে উঠল এক তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতা। যেন এই একটা মুখ দেখার জন্য তার আত্মাটা গত ২০ দিন ধরে মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। শুভ্র কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু অপলক দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া মুখ আর কুঁচকে যাওয়া চামড়া বলে দিচ্ছে, কতটা অমানবিক অনাহার আর অত্যাচারের ওপর দিয়ে সে যাচ্ছে।
শুভ্রের এই বীভৎস অবস্থা দেখে রিদি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে দৌড়ে শুভ্রের কাছে যেতে চাইল, তার ক্ষতবিক্ষত শরীরটা আগলে ধরতে চাইল। কিন্তু নিয়তি তার সহায় হলো না। মাত্র দুই পা এগোতেই এক হ্যাঁচকা টানে তাকে থামিয়ে দিল নির্ভান। লোহার মতো শক্ত মুঠোয় রিদির হাতটা মুচড়ে ধরল সে। রিদিকে নিজের একদম কাছে টেনে নিয়ে এসে নির্ভান তার কানে কানে শীতল আর বিষাক্ত গলায় বলল।
“কেমন দিলাম সারপ্রাইজটা মায়াবী? এই সারপ্রাইজটা দেখা পর্যন্তই তোমার দৌড়, কিন্তু ছোঁয়া পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। আমার অনুমতি ছাড়া ওর ছায়াও মাড়াতে পারবে না তুমি!
রিদি ঘৃণায় আর রাগে অন্ধ হয়ে নির্ভানের দিকে তাকাল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে। সে চিৎকার করে বলল।
“আপনি কি আদৌ কোনো মানুষ? একটা মানুষকে এভাবে পশুর মতো মারতে আপনার হাত কি একটুও কাঁপলো না? আপনার কি দয়ামায়া বলতে কিচ্ছু নেই!”
নির্ভান রিদির চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত কিন্তু নিষ্ঠুর গলায় বলল।
“দয়ামায়া দিয়ে দুনিয়া চলে না রিদি। কিছু জিনিসকে নিজের করে নিতে গেলে এমন একটু-আধটু শাস্তি দিতেই হয়। এটা তো মাত্র শুরু।”
রিদি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল।
“শাস্তি? শুভ্র ভাইয়া এমন কী করেছে আপনার যে তাকে জানোয়ারের মতো এভাবে মেরেছেন?।”
নির্ভানের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে যাচ্ছে। সে রিদির হাতটা আরও জোরে চেপে ধরে বলল।
“দেখো রিদি, এত কথা শোনার বা বলার সময় আমার নেই। আমার একমাত্র লক্ষ্য তোমাকে বিয়ে করা। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমি যেকোনো মূল্য দিতে পারি, যেকোনো পথ বেছে নিতে পারি।”
রিদি শিউরে উঠে অস্ফুট স্বরে বলল।
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”
নির্ভান এবার তার শিকারি দৃষ্টি সরিয়ে শুভ্রের দিকে তাকাল। শুভ্র তখনো আধবোজা চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে। নির্ভান এক পৈশাচিক শয়তানি হাসি দিয়ে বলল।
“মানে খুব সহজ। এই যে সামনে বসে আছে তোমার প্রিয় শুভ্র ভাই, তাকে যদি কালকের সূর্য দেখতে দিতে চাও, তাকে যদি জীবিত দেখতে চাও—তবে কাল সুন্দর করে আমার জন্য বউ সেজে তৈরি হয়ে থাকবে। আর যদি না চাও…”
নির্ভান একটু থেমে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে খুনের নেশায় মত্ত হয়ে বলল।
“তবে শুভ্রের জানাজা দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলো। সিদ্ধান্ত তোমার রিদি আমার বাসর ঘর, নাকি ওর কবর?”
রিদির রাগে সারা শরীর রি রি করে জ্বলে উঠল। অপমানে আর ঘৃণায় সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এক ঝটকায় নির্ভানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল সে, তারপর সর্বশক্তি দিয়ে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল নির্ভানের গালে। থাপ্পড়ের শব্দে পুরো ঘরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। রিদি চিৎকার করে বলল।
“আপনি ভাবেন কী করে যে আপনার মতো একটা পশুকে আমি বিয়ে করবো? মরে যাবো, জীবন দিয়ে দেবো, তবুও আপনাকে আমি কোনোদিন বিয়ে করবো না!”
থাপ্পড় খেয়ে নির্ভান একটুও রাগল না, বরং এক পৈশাচিক শান্ত ভাব বজায় রাখল। সে নিজের গালে হাত বুলিয়ে সেই হাতে একটা গভীর চুমু খেল। নেশাতুর চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল।
“উফফ! কী টেস্ট তোমার স্পর্শের! প্রিয়, তুমি শুধু একবার আমার হয়ে যাও… আই প্রমিস, তোমার হাতের এমন থাপ্পড় আমি সারাজীবন খেতে রাজি আছি।”
বলেই নির্ভান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। রিদি রাগে ফুঁসছে, তার বুকটা ধড়ফড় করছে। নির্ভান হঠাৎ হাসি থামিয়ে রিদির সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন খুনের নেশা। সে শীতল গলায় বলল।
“তুমি জানো এখন আমি কী করবো?”
রিদি ভ্রু কুঁচকে ভয়ার্ত চোখে তাকাল। নির্ভান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে শীষ দিল। সাথে সাথে দরজায় দুজন গার্ড এসে হাজির হলো। নির্ভান তাদের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে শুভ্রকে দেখিয়ে বলল।
“শুভ্রকে আবারও লাঠি দিয়ে একটু ‘আদর’ করে দে। রিদি একটু দেখুক, ওর প্রিয় শুভ্র ভাইকে আমরা কীভাবে আদর-সোহাগ করতে পারি।”
কথাটা শোনামাত্রই রিদি পাগলের মতো না-সূচক মাথা নাড়তে লাগল। সে আর্তনাদ করে শুভ্রের দিকে এগোতে চাইল, ওমনি নির্ভান লোহার মতো শক্ত করে ওর হাত ধরে ফেলল। রিদি ছটফট করছে, কিন্তু নির্ভানের মুঠি থেকে বের হতে পারছে না। চোখের সামনেই গার্ডরা সোজা শুভ্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শুভ্রর সেই ক্ষতবিক্ষত শরীরের ওপর আবারও লাঠির অমানবিক আঘাত পড়তে শুরু করল।
শুভ্র ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল। যতই সে শক্তিশালী হোক, তার শরীরটাও তো রক্ত-মাংসেরই তৈরি। কত মাইর আর সহ্য করবে সে? শুভ্রের সেই বুক চেরা চিৎকার যেন তীরের মতো গিয়ে রিদির কলিজায় বিঁধছে। রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না, সে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“আল্লাহর দোহাই লাগে থামেন! এইভাবে পাষাণ হয়ে মারবেন না ওকে! প্লিজ থামেন… ও মরে যাবে… দয়া করে থামেন!”
রিদির আর্তচিৎকার গার্ডদের কানে পৌঁছাচ্ছে না, তারা যন্ত্রের মতো নির্ভানের আদেশ পালন করে যাচ্ছে। একের পর এক লাঠির আঘাত শুভ্রর রক্তাক্ত শরীরে আছড়ে পড়ছে। রিদি পাগলের মতো চিৎকার করছে, ছটফট করছে; তার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে যদি সে শুভ্রকে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারত, তবেই বোধহয় কলিজার এই দহন শান্ত হতো। উপায় না দেখে রিদি হঠাৎ জানোয়ারের মতো নির্ভানের হাতে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল।
নির্ভান যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে রিদির হাত ছেড়ে দিল। সেই সুযোগে রিদি ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে শুভ্রকে চেয়ারসহ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের শরীর দিয়ে শুভ্রকে আড়াল করে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। গার্ডদের চালানো লাঠির দুটো প্রচণ্ড আঘাত শুভ্রর বদলে রিদির পিঠে গিয়ে পড়ল। রিদির মুখ দিয়ে ব্যথায় একটা গোঙানি বেরিয়ে আসতেই শুভ্র যেন তার শেষ শক্তি ফিরে পেল। সে জানোয়ারের মতো গর্জন করে চিৎকার করে উঠল।
“আরে খা*নকির পোলা থাম! আর একটা আঘাত যদি ওর গায়ে লাগে, তবে তোর কলিজা আমি জ্যান্ত টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!”
শুভ্রর সেই ভয়ংকর আওয়াজে গার্ডরা মুহূর্তেই থমকে গেল। রিদি তখনো শুভ্রকে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদছে। নির্ভান নিজের কামড়ানো হাতের ক্ষত দেখে আর এই দৃশ্য দেখে হিংসায় জ্বলে উঠল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এগিয়ে এসে শুভ্রের কাছ থেকে রিদিকে হ্যাঁচকা টানে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল।
“খুব ভালো ব্যবহার করেছি দেখে তুই আমার মাথার উপরে উঠতে চাস? আমার চোখের সামনেই তুই অন্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরিস! এত বড় সাহস তোর!”
রিদি এবার ভয়ডর সব বিসর্জন দিয়ে শুভ্রকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরল। সে বুক ফাটা চিৎকারে পুরো ঘর কাঁপিয়ে বলল।
“অন্য পুরুষ না, ও আমার ভালোবাসার মানুষ! ভালোবাসি ওকে আমি! শুনেছেন? নাকি আরও হাজারবার বলতে হবে? যদি মারতেই হয়, তবে আমাদের দুজনকে একসাথেই মারেন। কিন্তু আমি এক চুলও ওকে ছাড়বো না!”
নির্ভানের চোখ দুটো তখন লাল হয়ে উঠেছে, যেন রক্তপিপাসু কোনো পিশাচ ভর করেছে তার ওপর। সে দাঁতে দাঁত চেপে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল।
“রিদি, আমাকে আর খারাপ হতে বাধ্য করো না। আমার ধৈর্য কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে।”
শুভ্র যন্ত্রণায় কাতর হয়েও নিজের দিকে তাকাল না। সে খুব ক্ষীণ আর দুর্বল গলায় নির্ভানের দিকে তাকিয়ে বলল।
“তোর যত ক্ষোভ আছে আমার ওপর মেটা। যত খুশি আঘাত কর, কিন্তু রিদির গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে।”
নির্ভান একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল।
“বাহ! দুজনের প্রেম দেখি সাগরের অতলে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এই প্রেম আমি বেশিক্ষণ টিকতে দেবো না।”
বলেই নির্ভান পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে শুভ্রের ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। রিদির কলিজা যেন শুকিয়ে এল। নির্ভান ছুরিটা শুভ্রের ঘাড়ের কাছে ধরে ঠান্ডা গলায় বলল।
“এখন যদি তুমি ওকে না ছাড়ো রিদি, তবে এই ধারালো ছুরিটা সরাসরি ওর পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। ছাড়ো বলছি!”
রিদি ভয়ার্ত চোখে সেই চকচকে ছুরির দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই শুভ্র রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল।
“রিদি, আমার কথা শোন। আমি আমার জীবনের পরোয়া করছি না। তুই যদি সতি আমায় ভালোবেসে থাকিস, তবে ছেড়ে দে আমায়। এভাবে নিজের বিপদ ডেকে আনিস না।”
রিদি তবুও একগুঁয়ে হয়ে শুভ্রকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিল। নির্ভান এবার ছুরিটা ধীরে ধীরে শুভ্রের চামড়ায় বিঁধিয়ে দিতে শুরু করল। যখনই রক্ত ঝরার উপক্রম হলো, রিদি পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।
“নাহ! নাহ! থামেন আপনি! আমি ছাড়ছি ওকে, দয়া করে কিছু করবেন না। আমি ছেড়ে দিচ্ছি!”
বলেই রিদি শুভ্রকে ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল। সাথে সাথে নির্ভান ইশারা করতেই দুজন গার্ড এসে রিদির দুই হাত লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরল। রিদি ছটফট করছে, কিন্তু নড়ার ক্ষমতা নেই।
নির্ভান যেন এবার তার আসল ভয়ংকর রূপটা দেখাল। সে মাটিতে পড়ে থাকা মোটা লাঠিটা তুলে নিল। রিদির দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল।
“যতক্ষণ তুমি আমাকে বিয়ে করার কথা স্বীকার করছো না, ততক্ষণ আমার শরীরের সব রাগ ওর ওপর ঝরবে। দেখো আমি কতটা শয়তান হতে পারি! যেখানে খুন করা আমার কাছে হাতের খেলা, সেখানে এই লাঠিপেটা করা তো স্রেফ প্র্যাকটিস!”
বলেই নির্ভান পূর্ণ শক্তিতে লাঠিটা উঁচিয়ে শুভ্রের পিঠে সজোরে আঘাত করল। ‘ঠা শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। শুভ্র যন্ত্রণায় নুইয়ে পড়ছে।রিদি আবারো পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। তার বুক ফেটে কান্না আসছে, নিজের চোখের সামনে শুভ্রর ওপর এমন পাশবিক অত্যাচার সে আর সহ্য করতে পারছে না। প্রতিটা আঘাত যেন শুভ্রর গায়ে নয়, সরাসরি রিদির কলিজায় গিয়ে লাগছে। সে চিৎকার করে বলল।
“প্লিজ, এইভাবে মারবেন না! থামুন! দয়া করুন, ও মরে যাবে! আল্লাহর দোহাই লাগে থামুন!”
কিন্তু নির্ভানের হাতে থাকা লাঠিটা থামার কোনো লক্ষণ নেই। সে যেন এক উন্মত্ত নেশায় মেতে উঠেছে। রিদি বুঝতে পারল সে এখন পুরোপুরি হেরে গেছে। শুভ্রকে এই মরণ যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে হলে তাকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেই হবে। সবটুকু শক্তি দিয়ে রিদি চিৎকার করে উঠল।
“আমি রাজি! বিয়ে করবো আপনাকে! ছেড়ে দিন ওকে, আর মারবেন না!”
মুহূর্তেই নির্ভান থেমে গেল। লাঠিটা হাত থেকে সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল। শুভ্র তখন চেয়ারে একদম জ্ঞান হারানোর মতো নেতিয়ে পড়েছে, তার নিশ্বাস দ্রুত আর ক্ষীণ হয়ে আসছে। নির্ভানের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক আর বিজয়ী হাসি। সে ধীরপায়ে রিদির দিকে এগিয়ে এল। রিদির অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল।
“এই তো সোনা, লাইনে এসেছো। এই ‘হ্যাঁ’ কথাটা আগে বললে কী হতো? অহেতুক তোমার শুভ্র ভাই এতটা আঘাত পেত না। ছিঃ! এই তোমার ভালোবাসা? নিজের জেদ ধরে রাখতে গিয়ে বেচারাকে আধমরা করে ছাড়লে!”
রিদি কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুরোধের সুরে নির্ভানকে বলল।
“আমি রাজি, বিয়ে করবো আপনাকে! প্লিজ শুভ্র ভাইকে ছেড়ে দিন। ওর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ, এখনি ডাক্তার দেখানো দরকার। ওকে দয়া করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”
নির্ভান এক নিষ্ঠুর বিজয়ী হাসি দিয়ে জবাব দিল।
“উঁহু! তুমি আমাকে বিয়ে করার সম্মতি দিয়েছো বলে ওর জীবনটা আপাতত বেঁচে গেল ঠিকই, কিন্তু মুক্তি সে এখনো পায়নি। মুক্তি সে তখনই পাবে, যখন সে আমার বোন নেহাকে বিয়ে করবে।”
রাত একটা। নিস্তব্ধ ঘরে রিদি একলা বসে চোখের জল ফেলছে। কিছুক্ষণ আগে গার্ড খাবারের প্লেট দিয়ে গেছে, কিন্তু সেই খাবারে হাত দেওয়ার শক্তিটুকুও তার নেই। যাকে গত ছয়টি বছর ধরে নিজের মনের গভীরতম কোণে লালন করেছে, যাকে নিয়ে প্রতিটি স্বপ্ন বুনেছে সেই শুভ্র ভাই এখন নির্ভানের পৈশাচিক অত্যাচারে আধমরা হয়ে আছে। আর কাল সকালে রিদিকে অন্য কারো বউ হতে হবে। চিরতরে হারিয়ে যাবে তার সবটুকু আশ্রয়।রিদি আর সইতে পারল না, বালিশে মুখ গুঁজে শব্দ করে কেঁদে উঠল। তার অস্ফুট আর্তনাদ যেন দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।
“শুভ্র ভাই,আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না ভি-ভিষন কষ্ট হচ্ছে আমার।”
রিদির ডুকরে ওঠা কান্নার মাঝে হঠাৎ একটা চিন্তা তীরের মতো তার বুকে বিঁধল শুভ্র ভাই! মানুষটা একটা দানা দানাপানি মুখে দেয়নি। একটু আগে যখন ও শুভ্রকে দেখছিল, ওর ফ্যাকাশে আর শুকিয়ে যাওয়া মুখটা মনে পড়তেই রিদির কলিজাটা যেন কেউ খামচে ধরল। রিদি এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল, তারপর হেঁচকি তুলে চোখের পানি মুছে সিনা টান করে দাঁড়াল। তাকে এখন লড়তেই হবে।
সে দরজার কাছে গিয়ে খুব সন্তর্পণে ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। দেখল একটা গার্ড বাইরে ভারী বুটের শব্দ তুলে পায়চারি করছে। রিদির মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে পাশে রাখা ভারী মাটির ফুলের টবটা তুলে নিল, তারপর পুরো শক্তি দিয়ে সেটা মেঝেতে আছাড় মারল। ‘ঝনঝন’ শব্দে টবটা চুরমার হওয়ার সাথে সাথেই রিদি ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠার এক নিখুঁত অভিনয় করল— “আহ্! মরে গেলাম!”
সেই আর্তনাদ শুনে গার্ডটা হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই রিদি এক হিংস্র বাঘিনীর মতো ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। গলার ওড়নাটা পেঁচিয়ে ধরে সজোরে গার্ডের মুখ চেপে ধরল সে। অতর্কিত এই আক্রমণে গার্ডটা টাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে গেল। চিৎকার করার কোনো সুযোগই পেল না সে। রিদি গার্ডটার বুকের ওপর চড়ে বসে ওড়না দিয়ে মুখটা এমনভাবে পেঁচিয়ে দিল যে লোকটার নিশ্বাস নেওয়া দায়। এরপর লোকটার দুই হাত মুচড়ে ধরে হেঁচকা টানে নিয়ে গেল খাটের কাছে। সেখানে পড়ে থাকা একটা পুরোনো রশি দিয়ে গার্ডের হাত দুটো খাটের পায়ের সাথে কষে গিঁট দিয়ে দিল রিদি।বাঁধন শেষ করে রিদি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে গার্ডটার দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে ফিসফিস করে বলল।
“পড়ে থাক এইভাবে সারা রাত! এবার বোঝ অবলা একটা মেয়েকে খাঁচায় বন্দি করে রাখার মজা কেমন!”
বলেই রিদি আরেকটা সাদা ওড়নাটা মাথায় ভালো করে জড়িয়ে নিজের মুখটা আড়াল করল। খাবারের প্লেটটা শক্ত করে হাতে নিয়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে রুম থেকে বের হলো সে। করিডোর দিয়ে ভয়ে বুক দুরুদুরু অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে শুভ্রকে রাখা সেই অন্ধকার ঘরটার সামনে আসতেই রিদি অন্য একটা গার্ডের মুখোমুখি হয়ে গেল। গার্ডটাকে দেখামাত্রই রিদির আত্মা কেঁপে উঠল। লোকটা কুঁচকানো চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এখুনি গর্জে উঠবে। মুহূর্তের মধ্যে রিদি কোনো উপায় না দেখে খাবারের প্লেটটা একপাশে রেখে গার্ডের পা দুটো জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে একদম কলিজা নিংড়ানো আকুতি জানিয়ে বলল।
“মামু, আপনি তো আমার বাবার সমান! মামা তো বাবার মতোই হয়, তাহলে আমি তো আপনার মেয়ের মতো। দোহাই আপনার, কাউকে ডাকবেন না! আমাকে শুধু একটা বার শুভ্র ভাইয়ার কাছে যেতে দিন। আমি শুধু ওকে এই খাবারটুকু খাইয়ে দিয়ে চলে আসবো, প্রমিস করছি কেউ কিচ্ছু টের পাবে না। জানেন তো লোকটা এক ঢোক পানিও খায়নি? একটা মানুষ না খেয়ে কতক্ষণ বাঁচে মামু? ওরও তো একটা জীবন আছে! আপনি তো মানুষ, খিদের জ্বালা তো আপনিও বোঝেন! তাহলে প্লিজ… পাষাণের মতো আমার এই শেষ আশাটা ভেঙে দেবেন না!”
রিদির কথা শুনে গার্ডটা থতমত খেয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে রিদির হাত ধরে তাকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল। রিদির চোখেমুখে তখনো রাজ্যের বিস্ময়। গার্ডটা চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল।
“আরে আরে, করছো কী! পা ধরছো কেন? আমি তো জানতামই যে তুমি কোনো না কোনোভাবে ঠিকই আসবে।”
বলেই লোকটা তার পকেট থেকে কয়েকটা ওষুধের প্যাকেট বের করে রিদির হাতে গুঁজে দিল। রিদি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। গার্ডটা ফিসফিস করে বলল।
“এই নাও, এখানে ব্যথার আর জ্বরের ওষুধ আছে। খাবার খাওয়ানোর পর এই ওষুধগুলো স্যারকে খাইয়ে দিও। তাহলে শরীরটা একটু টান পাবে।”
রিদি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ঘোর লাগা চোখে সে গার্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা রিদির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে চোখের ইশারায় একটু হাসল। তারপর বলল।
“অবাক হচ্ছো? হওয়ারই কথা। কিন্তু এখন এসব অবাক হওয়ার বা কিছু বলার সময় নেই। তুমি জলদি ভেতরে যাও, আমি এখানে পাহারা দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, তোমার সব প্রশ্নের উত্তর সময় হলে ঠিকই পেয়ে যাবে। এখন আর এক সেকেন্ডও দেরি করো না, তাড়াতাড়ি যাও! নাহলে বস একবার ঘুম থেকে উঠে পড়লে সব শেষ হয়ে যাবে।”
রিদি আর কথা বাড়াল না। মুহূর্তের মধ্যে খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বিড়ালের মতো চুপিচুপি সেই অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটাতে ঢুকে পড়ল। ভেতরে পা রাখতেই রিদির কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সামনেই সেই পুরোনো চেয়ারটাতে শুভ্র বসে আছে। তার চোখ দুটো বোজা, শরীরটা তেরছা হয়ে একদিকে হেলে পড়েছে। সারা শরীরের ওপর নির্ভানের সেই পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন—প্রতিটা জায়গা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, নীলচে হয়ে আছে কালশিটে।
রিদির চোখের বাঁধ যেন ভেঙে গেল। ঝাপসা দৃষ্টিতে শুভ্রর সেই বিধ্বস্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে সে খুব ক্ষীণ আর কাঁপাকাঁপা গলায় ডাক দিল।
“শু-শুভ্র ভাই…।”
রানিং…!
নোট: এখন অনেকে প্রশ্ন করতে পারো, কেন নায়ক-নায়িকাকে এত কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। তোমাদের প্রশ্নের উত্তরে বলবো, এখানে আসলে নায়ক-নায়িকার ভালোবাসা কতটা গভীর, তারা একে অপরকে কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে সেটাই বোঝানো হচ্ছে। সব গল্পের নায়ক যদি শুধু শাস্তিই দিয়ে যায়, তাহলে আমার গল্পের নায়ক না হয় ভালোবাসার জন্যই কষ্ট সহ্য করুক, মার খাক, তবুও নিজের ভালোবাসাকে সত্যি প্রমাণ করুক।
আর সবাই যে বলছো, তাঁদের মিলিয়ে দিতে তাহলে শুনো, আমি হ্যাপি এন্ডিং পছন্দ করি। নায়ক-নায়িকাকে আলাদা করে দেওয়া আমার স্বভাবে নেই। তাই ইনশাআল্লাহ, তাঁদের বিয়েও হবে, মিলও হবে।
এখন তোমাদের কাজ শুধু গল্পটা মন দিয়ে পড়া, আর সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করে পাশে থাকা। সমাপ্তির শেষে কী হয়, সেটা জানার জন্য একটু ধৈর্য ধরো। আশা করি, আমার কথাগুলো তোমরা বুঝতে পেরেছো।
আর একটা কথা, অনেক মাথাব্যথা করছে। আরও কিছু প্লট লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মাথাব্যথার কারণে আর লিখতে পারছি না। তাই আজ এখানেই থামলাম। বাকিটা পরের অংশে।
Share On:
TAGS: অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায়, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৯
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫