Golpo romantic golpo প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২৪ এর প্রথমাংশ)

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

মিশু আশ্চর্য নয়নে শুভ্রকে দেখছে। ভেবেছিল তার প্রতি শুভ্র’র বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই৷ কিন্তু যেই শুভ্র লিপস্টিকের সঠিক রঙ বলে দিল, ওমনি মিশুর মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল। মেয়েটা বয়সে খুব বেশি বড় না। অল্প বয়সে মাথায় আজেবাজে ভাবনার মতো শুভ্রও তার মস্তিষ্কে জায়গা করে নিয়েছে৷ এই জায়গা চিরস্থায়ী নাকি ক্ষনিকের তা আজও বুঝতে পারছে না। তবে শুভ্রকে দেখতে মিশুর অন্যরকম শান্তি লাগে। শুভ্রর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, পিছু ঘুরতে ভালো লাগে। শুভ্র’র যত্ন নেওয়াটা মিশুর কাছে দায়িত্বের অনুরূপ। মিশু এক গাল হেসে মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে বলল,

” তুমি খেয়াল করেছো?”

“এখানে খেয়াল করার মতো কিছুই নেই । আজ বিয়ে বাড়ির ৯০% মেয়েই এক রঙের লিপস্টিক দিয়েছে। তাই নিসন্দেহে বলতে পারি তুমিও তাই দিয়েছো।”

“কি! তুমি সবার সাথে আমাকে তুলনা করলে? আমি আরও ভাবলাম!”

“তুমি তো সবার মতোই । ভিন্ন কোথায় হলে!”

মিশু মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

” ঠিক আছে। চলে যাচ্ছি।”

শুভ্র মলিন কণ্ঠে বলল,

” আচ্ছা। “

“আটকাবে না?”

” তুমি নিজে থেকে এসেছিলে। নিজেই কথা বললে। এখন নিজেই চলে যাবে বলছো। আমি আর কি বলব!”

“তোমার কিছুই বলতে হবে না। “

মিশু রেগেমেগে উঠে চলে যেতে লাগল। শুভ্র আড়চোখে মিশুকে একবার দেখে পুনরায় ফোনে মনোযোগ দিল। নৌমির নাম্বার বের করে কল করল। এবারও কল বাজছে কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না।

নৌমি তাজের রুমের দরজায় এসে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তাজ চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে। নৌমি গলা ঝেড়ে আস্তে করে বলল,

” আমি কি আসতে পারি?”

তাজ চোখ মেলে চাইল একবার। নৌমিকে দরজায় দাঁড়ানো দেখে আর কিছুই বলল না। নৌমি কয়েক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে থেকে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

” আমি কিন্তু নিজ দায়িত্বে রুমে চলে এসেছি। কেউ যেনো বকা না দেয় আমাকে।”

তাজ নিশ্চুপ। নৌমি তাজের সামনে চেয়ার টেনে বসল। তাজের মনমরা চেহারা দেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

” কি হয়েছে ভাইয়া?”

“কিছু হয় নি। তুই কেনো এসেছিস?”

” কেনো আসছি মানে? তুমি হুট করে এসে মামার কাছে মাফ চাওয়া শুরু করলে। বিষয়টা অবিশ্বাস্য না! আমাকে গতকাল থেকে কতবার বললে, মামাকে ম্যানেজ করার জন্য। আমিও সেভাবেই কথাবার্তা বলে সব ম্যানেজ করতেছিলাম। মাঝখান থেকে তুমি এসে এই কাজ করলে। মামা- মামি তো এখন আমাকে সন্দেহ করছে।”

“তোকে কেনো সন্দেহ করবে?”

নৌমি মুখ গোমড়া করে বলল,

” ওনাদের দৃষ্টিতে ওনাদের ছেলে মানে তোমার জীবনে আমি ছাড়া কারো অস্তিত্ব নেই। কোনোদিন কোনো মেয়ে ছিলই না। আগে আমার সাথে প্রকাশ্যে ঝগড়া করতে। বিয়ের কথা হওয়ার পর থেকে সেটাও করছ না। তারমানে কি বুঝা যাচ্ছে!”

“কি?”

“তুমি আমাকে পছন্দ করো। আমাদের বিয়ে তুমি মন থেকে মেনে নিয়েছো। তুমি চাকরির জন্য সময় নিচ্ছো। কারণ তুমি আমাকে বেকারের বউ বলে পরিচয় করাতে চাও না। তারজন্য মামারাও তোমাকে জোর করছে না। কিন্তু আজ কি হলো! আমি দুই ঘন্টা যাবৎ মামার সাথে কথা বলছি। একদম সিরিয়াস মুডে। কোনো প্রকার ফাজলামো করি নি। তারপর তুমি আবার এসে মাফ চাইলে। এখন ওনারা ধরেই নিয়েছেন, আমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়েছে। তোমার কিছু হয়েছে, নয়তো আমার। মামা খুব সিরিয়াস হয়ে গেছেন। আমাদের বিয়ে বোধহয় এবার দিয়েই ছাড়বেন।”

নৌমির কথা শেষ করার আগেই তাজ চিৎকার করল,

” কানের কাছে বিয়ে বিয়ে করবি না, প্লিজ।”

” আচ্ছা, করব না। বিয়ে বিয়ে করার কোনো শখ আমার নেই। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল বোন হিসেবে তোমার সমস্যা জানার অধিকার আমার আছে। তাই না?”

তাজ গুরুভার কণ্ঠে বলল,

” জানানোর মতো কিছু হলে অবশ্যই জানাতাম। কিছু নেই বলার।”

নৌমি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

” তুমি নিলু আপুদের বাসায় যাও নি?”

” তুই যা এখন। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।”

” এটা কিন্তু কথা ছিল না। তুমি বলেছিলে আজ সবকিছু ঠিক করে আসবে। “

” যেতে বললাম তোকে।”

নৌমি মাথা নিচু করে যেতে যেতে আবারও থামল। ঘাড় ফিরিয়ে তাজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

” মামা জিজ্ঞেস করলে কি বলব?”

” তোর যা ইচ্ছে।”

নৌমি কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইল। তাজের কিছু একটা হয়েছে এটা বেশ বুঝতে পারছে। কিন্তু কি হয়েছে! তাজ এখন কিছুই বলবে না। হাজার জোর করলেও বলবে না। রাগ কমলে ঠিকই কল দিবে। মনের কথাগুলো শেয়ার করবে। নৌমি নিজেকে সান্ত্বনা দিতে দিতে নিচে নেমে আসলো।

তাজের আব্বু এখানে নেই। নামাজ পড়তে চলে গেছেন। নৌমিকে দেখামাত্র তাজের আম্মু ডাকলেন,

” এই নৌমি, শুন “

“বলো মামি।”

নৌমি চেহারার মলিন ভাব সরিয়ে হাস্যোজ্জল কণ্ঠে বলল।

তাজের আম্মুর চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। চিন্তিত গলায় জানতে চাইলেন,

” তাজ কিছু বলল?”

” কি বলবে?”

” হঠাৎ কি হলো ওর? কথা নেই বার্তা নেই আব্বুর কাছে মাফ চাইল৷ কিছু হয়েছে কি?”

” হুমমম৷ হয়েছে তো৷ মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা ভর করেছে৷ ঠিক তোমার মতো। তুমি যেমন সারাদিন ভাইয়াকে নিয়ে চিন্তা করো তেমনি ভাইয়াও তোমাদের নিয়ে চিন্তা করে। কিন্তু কখনও প্রকাশ করতে পারে না। ছেলে মানুষ তো তাই! কিন্তু আজ হঠাৎ মন চাইলো, তাই মন খারাপের কারণ বলে দিল।”

“তাই বলে মাফ চাইবে!”

“আশ্চর্য! তুমি জানো আমি আম্মু, আব্বুর সাথে যখন যেভাবে খুশি কথা বলি, চিৎকার করি। তারপর যখন পড়তে বসি তখন মাথায় ঘুরে আমি যে আম্মুকে এই কথাটা বললাম এটা একদমই ঠিক হয়নি। আমার এক্ষুনি মাফ চাইতে হবে। তখন পড়া রেখে দৌড়ে যাই মাফ চাইতে৷ কখনো কখনো দিনে ১০-১৫ বারও মাফ চাই। আব্বুর ক্ষেত্রে একটু কম৷ সেটা সপ্তাহে ৩-৪ বার হয়। আমি যদি দিনে ১০ বার মাফ চাইতে পারি তাহলে ভাইয়া কি ৬ মাসে একবার মাফ চাইতে পারে না?”

তাজের আম্মু বিরক্তির স্বরে বললেন,

” তোর সাথে কথায় পারা যাবে না। “

নৌমি এক গাল হেসে বলল,

” আমি এখন যাই। আম্মু চিন্তা করবে। “

” নৌমি, শুন।”

“বলো”

” তাজকে ভাইয়া বলাটা এখন বন্ধ কর।”

“ওমা কেনো?”

“এটা তোর অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। দেখা যাবে বিয়ের পরও ভাইয়া ভাইয়া করছিস। মানুষের সামনে আমাদের মানসম্মান থাকবে না।”

“এখানেও আমি তোমাদের দোষই দেখি, মামি।”

“আমরা আবার কি দোষ করলাম?”

নৌমি আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দু’কদম এগিয়ে গেল। তারপর ধীরস্থির কণ্ঠে বলতে শুরু করল,

” তোমাদের ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দিবে সেই কথা কি আমাদের জন্মের পর বলা যেত না? তাহলে জন্ম থেকে ও গো- হে গো বলে বলে অভ্যাস করে ফেলতাম। কষ্ট করে ভাইয়া বলা শিখতে হতো না! সব দোষ তোমাদের। সময় থাকতে নিজের দোষ স্বীকার করো৷”

তাজের আম্মু ধমকে উঠলেন,

” তোর মুখে কি কোনো কথা আটকায় না?”

” আমার মুখে কোনো ছাঁকনি নেই মামি, কথা কোথায় আটকাবে?”

“আমার মাথা গরম না করে চুপচাপ বাসায় যা।”

নৌমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,

” দেখলে, আমার দুটা কথায় তোমার সহ্য হয় না। সেই তুমি আবার আমাকে বাড়ির বউ বানাতে চাও। জানি জানি, বিয়ের পর সকাল বিকাল আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। সবই জানি আমি। “

তাজের আম্মু চোখ রাঙাতেই নৌমি এক ছুটে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

হাত-মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল শুভ্র অনেকগুলো কল দিয়েছে। নৌমি চটজলদি শুভ্র’র নাম্বারে কল দিল। শুভ্র কল রিসিভ করেই বলল,

” তোমার মনে কি মায়া-দয়া বলতে কিছু আছে?”

“কেনো ভাইয়া, কি হয়েছে?”

“কতগুলো কল দিয়েছি তোমাকে!”

“আমি বাসায় ছিলাম না।”

” কোথায় ছিলে?”

“তোমাদের বাসায়।”

“আমি বাসায় থাকলে তোমাকে একবারও যেতে দেখি না৷ কারণ কি?”

” আমি দরকার ছাড়া তেমন যাই না৷ আজ একটু দরকার ছিল।”

” কি দরকার বলো আমাকে।”

নৌমি বলতে গিয়েও থেমে গেল। আস্তে করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

” আমার আবার কি দরকার! এমনি বললাম। তোমার কি অবস্থা বলো। বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে?”

” হ্যাঁ। মোটামুটি শেষ। “

“তোমার আসবে কবে ভাইয়া?”

“আগামীকাল বিকেল নাগাদ চলে আসব, ইনশাআল্লাহ।”

নৌমি আদুরে কণ্ঠে বলল,

” তোমাদের ছাড়া বাড়িটা এখন ফাঁকা ফাঁকা লাগে৷ তোমরা চলে গেলে আমার একদম ভালো লাগবে না।”

#চলবে…

#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

(২৪ এর শেষাংশ)

শুভ্র মৃদু হেসে বলল,

” আমিও তোমাকে অনেক মিস করব।”

“শুধু আমাকে মিস করবে? আর কাউকে করবে না? তামজিদ ভাইয়া, রাফি, আন্নি কাউকে না?”

“করব। সবাইকেই মিস করব। এমন না হয় দেখো, তোমাদের মিস করতে করতে সব ছেড়ে ছুঁড়ে তোমাদের কাছে চলে আসি।”

“মানে?”

“তেমন কিছু না। তাজের কি অবস্থা বলো। কল দিলে রিসিভ করে না। মেসেজ দিলে রেসপন্স করে না। সমস্যা কি?”

” অনেক সমস্যা আছে৷ তুমি আসলে বলব। “

“নিলুর সাথে কোনো ঝামেলা? “

“তা আমি বলতে পারব না। তুমি এসো আগে তারপর সব বলব।”

“ঠিক আছে। আজকের রাত টা শুধু অপেক্ষা করো। আগামীকালই চলে আসবো, ইনশাআল্লাহ। “

নৌমি কল কেটে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। তাজের রুমের জানলার পর্দাগুলো এক পাশে সরানো। তাজকে সরাসরি দেখা যাচ্ছে। উদাসীন ভাবে বসে আছে। দৃষ্টিতে শূন্যতা। নৌমি পরপর দুবার ডাকল। কিন্তু তাজের মধ্যে কোনো নড়চড় দেখা গেল না। নৌমি রুম থেকে বের হতে যাবে ওমনি নৌমির আম্মু এসে দরজায় দাঁড়াল। নৌমিকে বের হতে দেখে জিজ্ঞেস করল,

” কোথায় যাচ্ছিস?”

“তামজিদ ভাইয়াদের বাসায়।”

“এতো রাতে ওদের বাসায় কি কাজ?”

” ভাইয়ার সাথে একটু দরকার আছে।”

নৌমির আম্মু নৌমির মাথায় আস্তে করে গাট্টা মেরে বলল,

” তোর মধ্যে একটু পরিবর্তনও কি আসে না?”

“কিসের পরিবর্তন আসবে? আমার মাথায় কি শিং গজাবে? “

“তাজের সাথে তোর বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে। অথচ তোর মধ্যে বিন্দু মাত্র পরিবর্তন নজরে আসে না। আগে ওদের বাসায় বার বার যেতিস তাতে আমি কিছু বলি নি। কিন্তু এখনও তাই করছিস। কেনো? লজ্জা বলতে কি কিছুই নেই তোর মধ্যে? তোর আব্বু কিন্তু এসব একদম পছন্দ করে না।”

” তারমানে কি বলতে চাচ্ছো? আমি এখন ঐ বাড়িতে যাব না? মামা- মামি আর তামজিদ ভাইয়াকে দেখে লজ্জা পাওয়ার ভান করব?”

“হ্যাঁ। প্রয়োজনে তাই করবি। “

নৌমি ওড়না টেনে মাথায় দিয়ে লাজুক ভাব নিয়ে বলল,

” এখন ঠিক আছে?”

” আমার সামনে ভাব নিচ্ছিস কেনো?”

” তোমার সামনে প্র্যাক্টিস করছি। ঐ বাড়িতেও এখন থেকে এভাবে চলব। হবে না?”

নৌমির আম্মু শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। অল্প বিস্তর রাগটুকু কণ্ঠে এনে বলল,

” তোকে মানুষ করতে আমি ব্যর্থ। সত্যিই ব্যর্থ।”

নৌমি মিষ্টি হেসে বলল,

” তোমার ব্যর্থ মেয়ে একদিন কারো মানসিক শান্তি হবে। দেখে নিও। এখন আমাকে যেতে দাও।”

“এত রাতে কোথাও যাবি না তুই। তোর আব্বু নিচে ডাকছে তোকে। তাড়াতাড়ি আয়।”

নৌমি আর কথা বাড়াল না। আম্মুর আগেই হনহন করে হাঁটতে লাগল। একটু যেতেই আন্নি সামনে পড়ল। আন্নিও তাকে ডাকতে এসেছিল। নৌমিকে যেতে দেখে আন্নি বলল,

” আপু, তোমাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম। দেখে যাও আব্বু কি নিয়ে এসেছে। “

“কি এনেছে?”

” চলো আগে।”

নৌমি নিচে নামতেই দেখল ড্রয়িং রুমে মোবাইলের বক্স, নতুন ফোন, চার্জার, কাভার সব পড়ে আছে। নৌমি কৌতুহলী কণ্ঠে আওড়াল,

” আব্বু, এটা কি আমার মোবাইল?”

নৌমির আব্বু ফোন হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন,

” না। তোমার আম্মুর জন্য এনেছি। কেমন হয়েছে দেখো।”

নৌমির হাসিখুশি চেহারায় আঁধার নামল। মনমরা হয়ে আম্মুর দিকে একবার তাকাল। উদাস গলায় বলল,

” আমি কতদিন যাবৎ ফোন চাইতেছি। তোমরা আমাকে একটা ফোন কিনে দিচ্ছো না। অথচ আম্মুর একটা থাকা সত্ত্বেও আরেকটা কিনে দিলে।”

” তোর আম্মুর ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তারজন্যই নতুন কিনে এনেছি। তোমাকে তো দিতামই। গতকালই তাজকে বলছিলাম। ফোন যেহেতু কিনবোই একসঙ্গে দুইটা কিনে ফেলি। তাজ সঙ্গে সঙ্গে নিষেধ করল। বলল ওর ফোনটা নাকি কিছুদিন পর তোমাকে দিয়ে দিবে। আমি যেন অযথা টাকা নষ্ট না করি।”

“কি বললে! ভাইয়া এ কথা বলেছে? আমাকে একটা ফোন কিনে দিলে তোমাদের অনেক টাকা নষ্ট হয়ে যাবে? লোকে ঠিকই বলে। তোমরা আসলে আমাকে একটুও ভালোবাসো না। একটা এন্ড্রয়েড ফোনের আশায় থাকতে থাকতে আমরার চেহারার ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে গেল। এখন আমি ঠিকমতো খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না৷ বাবা -মা হয়ে তোমরা এগুলো দেখো না। কোথাকার এক ছেলে তার পুরাতন, ব্যবহার করা ভাঙা ফোন আমাকে দিবে বলেছে এতেই তোমরা খুশি হয়ে গেলে!”

নৌমির আব্বু, আম্মু দু’জনেই হা হয়ে আছেন। মাঝখান থেকে আন্নি বলে উঠল,

” আসলেই, আপু ঠিকই বলেছে। আপু একদম কিছুই খেতে পারে না। মাঝরাতে ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম খেতে খেতে বক্স ফাঁকা করে ফেলে। রান্নাঘরে তন্নতন্ন করে খাবার খুঁজে। বাসায় পেট ভরে ভাত খেয়ে একটু বাদেই রেস্টুরেন্টে গিয়ে এক প্লেট কাচ্চি দিব্যি শেষ করে ফেলে। এমনিতে কিন্তু কিছুই খেতে পারে না। “

কথাগুলো বলার মাঝেই নৌমি আন্নির মুখ চেপে ধরল। রাগে কটমট করে বলল,

” আমি ফোন কিনতে পারলে তোকেও মাঝেমধ্যে দিব।”

আন্নি মুখ থেকে হাত সরিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

” আব্বু, আপুর ফোনটা সত্যিই খুব দরকার। কিনে দাও না প্লিজ।”

নৌমির আব্বু মৃদু হেসে বললেন,

” আচ্ছা, আমি দেখছি কি করা যাই।”

নৌমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল,

” এবার মনে হয় ফোনটা পেয়েই যাব। এখন শুধু ফোন হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।”

নৌমির আব্বু ফের বললেন,

” আন্নি, মা আমার। তাজকে ডেকে নিয়ে আসো তো। ফোনের সেটিংসটাও করে দিয়ে যাবে আর নৌমির ফোনের ব্যাপারেও কথা বলব নে।”

নৌমির মেজাজ গরম হয়ে গেল। রাগে কটমট করে বলল,

” আবার এই ছেলে! তোমরা একটা সহজ বিষয় বুঝতেই চাও না। তামজিদ ভাইয়া আমাকে ফোন কিনে দিতে রাজি হবে না। কেনো বুঝতে চাও না তোমরা? আমি তোমাদের মেয়ে তোমরা চাইলে আজ এক্ষুনি আমাকে ফোন দিতে পারো। কিন্তু না তোমরা ঐ ছেলের অনুমতির আশায় থাকো। কেনো কেনো কেনো?”

নৌমির আম্মু এগিয়ে এসে নৌমির কাছে দাঁড়ালেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন,

” আজ বাদে কাল তুই তাজের বউ হবি। তাজের কথায় চলতে হবে। আমাদের মেয়ে বলে তখন আমরা যা খুশি অনুমতি দিতে পারব না। তাই তোর ভালো মন্দ তাজকেই বুঝে নিতে দে।”

নৌমি রাগে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগল,

” সারাদিন শুধু বিয়ে বিয়ে আর বিয়ে। জীবনে শান্তি বলতে কিছুই নেই।”

নৌমি গজগজ করে নিজের রুমে চলে গেল।

আন্নি তাজকে ডাকতে গেল। তাজ এখন কারো সাথে কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। একটু পর পর নিলু কল করছে। হাজারখানেক মেসেজ পাঠিয়েছে। সরি’র পর সরি বলছে। তারপরও তাজের মেজাজ ঠাণ্ডা হচ্ছে না। আন্নির কথা শুনে বাধ্য হয়ে বলল,

” তুই যা, আমি আসছি।”

কোনোমতে চোখে-মুখে পানি দিয়ে উঠে গেল। ফোনের সেটিংস ঠিক করতে করতে ফুপ্পির মুখে নৌমির সব কথা শুনল। কাজ শেষে ধীর গলায় বলল,

” নৌমির সাথে দেখা করে আসছি।”

নৌমির আম্মু বারণ করতে চাইল। কিন্তু তাজ তার আগেই সিঁড়ি পেরিয়ে ছুটল। নৌমির আব্বু মুচকি হেসে নৌমির আম্মুর দিকে চাইলেন। নৌমির আম্মুও মলিন হাসলেন ।তাজ নৌমির রুমের সামনে এসে গলা ঝেড়ে ডাকল,

” মুসকান। “

ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। তাজ শ্বাস টেনে আবারও ডাকল,

“এই মুসকান..”

“কে?”

“আমি।”

নৌমি অভিমানী স্বরে বলল,

” তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। চলেও যাও।”

“তোকে না দেখে আমি যাব না। দরজাটা খুল।”

“আমি দরজা খুলব না।”

“তাহলে আমি যাবও না। এইযে আমি বসলাম।”

নৌমি আর কিছু বলল না। নীরবতায় ৫-৭ মিনিট কাটল। কেউ কোনো কথা বলছে না। কিছুক্ষণ বাদে নৌমি আস্তে করে দরজাটা খুলল। খুলেই চমকে উঠল। তাজ সত্যি সত্যি দরজার সামনে বসে আছে। নৌমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

” আমাকে দেখে যাওয়ার কি আছে?”

তাজ মুচকি হেসে জবাব দিল,

” তুই আমার মানসিক শান্তি। হাজার রাগ- অভিমানের পরেও তোর সাথে কথা বললে শান্তি লাগে। তোকে দেখলে মন ভালো হয়ে যাই।”

নৌমি আশেপাশে নজর বুলিয়ে আস্তে করে বলল,

” যা বলেছো বলেছো। আম্মুর সামনে ভুলেও মানসিক শান্তির কথা বলিও না। তাহলে দেখবে কালই তোমার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিবে।”

তাজ মৃদু হেসে বলল,

” আজ আসি রে। মনটা খুব খারাপ। এসব বিষয়ে অন্যদিন কথা হবে। ফোনের বিষয়েও কথা বলব পরে। তোকে একটা কথা বলে যাই, ফুফা আর ফুপ্পির সাথে অযথা রাগ দেখাবি না। যার প্রভাব আমার উপর পড়ে।”

” হুমমম।”

শুভ্ররা আজই ফেরার কথা৷ তাই নৌমি আগেভাগেই বাসায় এসে অপেক্ষা করছে। তাজের আব্বু এতক্ষণ রুমে ছিলেন। ড্রয়িং রুমে নৌমির কণ্ঠ শুনে ওনিও বেড়িয়ে এসেছেন। নৌমি মামার সাথে গল্প করছে। তাজের আম্মুও মাঝে মাঝে দুই একটা কথা বলছেন। হঠাৎ তাজকে নামতে দেখে সবার নজর পড়ল সেদিকে। চেহারায় গুরুগম্ভীর ভাব। তাজের আম্মু জিজ্ঞেস করলেন,

” কিরে তাজ, কোথায় যাচ্ছিস?”

“সামনে।”

“কিছু হয়েছে কি? “

“না। তেমন কিছু না। “

তাজ কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেড়িয়ে গেল। তাজের আম্মু নৌমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

” তাজের কি হয়েছে? “

“আমি কি জানি।”

“তুই পার্মানেন্টলি আমাদের বাড়িতে চলে আয়। তাহলে সব জানতে পারবি। তুই না আসা পর্যন্ত আমার চিন্তা শেষ হবে না মনে হয়।”

নৌমি এক গাল হেসে বলল,

” তুমি এখন নিশ্চিন্তে থাকো। আমি এই বাড়িতে আসলে তোমার চিন্তা শুরু হবে। তখন রাত-দিন এক করে চিন্তা করো কেমন!”

” কেনো?”

” সাধারণত শ্বাশুড়িরা ঘরে ছেলের বউ আনে নিজের চিন্তা কমানোর জন্য। অথচ তুমি আমার মতো আস্ত একটা দুশ্চিন্তার গোডাউন ঘরে আনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছো। তাই এ কয়টা দিন একটু রেস্টে থাকো। আমি আসলে তো চিন্তা করতেই হবে।”

#চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply