#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯৫]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
“পাপা, আজ স্কুলে যাচ্ছি না। তুমি প্লিজ জোর করো না!”
শিশুসুলভ আবদারে পরিপূর্ণ আফরিদ এহসানের কণ্ঠস্বর ভেসে উঠতেই প্রশস্ত অধরে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল মুস্তাক এহসানের। ধীর পদক্ষেপে ছেলের সন্নিকটে এগিয়ে এসে তিনি কোমল স্বরে উচ্চারণ করলেন,
“ওকে, ফাইন! আজ তাহলে আমাদের লিটল চ্যাম্পকে আর স্কুলে যেতে হবে না। কিন্তু একটা শর্ত আছে! তোমার ফ্রেন্ডদের ইনভাইট করতে হবে। আজ যে আমাদের প্রিন্সের বার্থডে!”
বাবার কথায় মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল আফরিদের চেহারা। চকিতে পাশের টেবিল থেকে টেলিফোনটা তুলে নিয়ে একে একে নিজের নিকটতম বন্ধুদের কল করতে শুরু করল সে। কণ্ঠে ছিল অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস, হৃদয়ে অনাবিল আনন্দের ঢেউ।
স্পেনের ঐতিহ্যবাহী শহর বার্সেলোনা সেই শহরের সুপরিচিত ও প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের তালিকায় অন্যতম নাম মুস্তাক এহসান। তাঁর অসামান্য মেধা, গবেষণা ও আবিষ্কার তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি। অথচ ব্যক্তিজীবনের ক্ষেত্রে তিনি চরম সংযমী ও নির্লিপ্ত। পরিবারকে কখনোই প্রচারের আলোকবৃত্তে আনতে পছন্দ করেন না তিনি।
শহরের অভিজাত প্রান্তে অবস্থিত এহসান প্যালেস যেন শুভ্রতার এক নান্দনিক স্থাপত্যকাব্য। প্রাসাদের চারপাশজুড়ে সুবিস্তৃত গার্ডেন, সুগন্ধি ফুলের সারি, সুপরিকল্পিত পথরেখা আর মার্বেলের নির্মিত রাজকীয় অবয়ব সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটি যেন রূপকথার কোনো প্রাসাদ। মুস্তাক এহসানের প্রিয় রঙ সাদা। সেই অনুরাগ থেকেই সমগ্র প্রাসাদটিকে তিনি শুভ্রতার আবরণে আবৃত করেছেন। দূর থেকে তাকালেই মনে হয়, ধবধবে মেঘপুঞ্জ নেমে এসে স্থির হয়ে আছে পৃথিবীর বুকে।
সকাল হতেই পুরো এহসান প্যালেস উৎসবমুখর আয়োজনে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। আজ এহসান পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য আফরিদ এহসানের জন্মদিন। চারদিকে ব্যস্ততা, কর্মচাঞ্চল্য আর উল্লাসের মৃদু গুঞ্জন।
রঙ-বেরঙের লাইটিংয়ে আলোকিত হয়ে উঠছে প্রতিটি প্রাচীর। স্ফটিক ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছে সুবিশাল হলরুম। ডেকোরেশনের কাজও প্রায় সমাপ্তির পথে। সাদা গোলাপ, অর্কিড আর নীলাভ লাইটের সংমিশ্রণে পুরো পরিবেশে তৈরি হয়েছে এক স্বপ্নিল পৃথিবী।
চারপাশে নিবিড় দৃষ্টি বুলিয়ে মাইমুনা এহসান মৃদু হাসলেন। অতঃপর স্বামীর উদ্দেশ্যে প্রশংসাসূচক ভঙ্গিতে বললেন,
“সায়েন্টিস্ট সাহেবের রুচিবোধ যে সত্যিই অসাধারণ, সেটা মানতেই হবে!”
স্ত্রীর প্রশংসাবাক্যে তৃপ্তির মিহি হাসি ফুটে উঠল মুস্তাক এহসানের মুখাবয়বে। স্বতঃস্ফূর্ত সুরে তিনি বললেন,
“এই সায়েন্টিস্ট যখন তোমার মতো একজনকে পছন্দ করেছে, তখন তো তার চয়েস নিঃসন্দেহে এক্সকুইজিট!”
স্বামীর এমন রসিকতাপূর্ণ উক্তিতে অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন মাইমুনা এহসান। সেই হাসির রেশ মিলিয়ে যেতেই মুস্তাক এহসান ভেতরের রুমে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ পর হাতে একটি সুদৃশ্য গিফট বক্স নিয়ে ফিরে এলেন তিনি।
স্ত্রীর দিকে বাক্সটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“এটা ওপেন করো তো! আর বলো, আমাদের সনের পছন্দ হবে কি-না!”
কৌতূহলী ভঙ্গিতে মাইমুনা এহসান বাক্সটির আবরণ সরাতেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বাক্সের ভেতর সুপরিপাটি করে রাখা রয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতির এক কালো ল’ইয়ার স্যুট, সঙ্গে আফরিদের ছোটবেলায় অ্যাডভোকেট সেজে তোলা অসংখ্য ছবির ফ্রেম।
দৃশ্যটা দেখামাত্র তাঁর চোখজোড়া বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
আফরিদ এহসানের স্বপ্ন ‘ল’ নিয়ে পড়াশোনা করা। সে একদিন বার্সেলোনার অন্যতম খ্যাতিমান অ্যাডভোকেট হতে চায়। ছোটবেলা থেকেই আদালত, বিচারব্যবস্থা আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি তার এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করে।
স্ত্রীর বিমুগ্ধ নীরবতা লক্ষ্য করে মুস্তাক এহসান মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন,
“কেমন? পছন্দ হয়েছে?”
মাইমুনা এহসান আবেগাপ্লুত দৃষ্টিতে প্রতিটি ফ্রেমে হাত বুলিয়ে বললেন,
“অসম্ভব সুন্দর, সুইটহার্ট! এগুলো দেখলে আফরিদ ভীষণ খুশি হবে!”
মুহূর্তেই মুস্তাক এহসান আলতোভাবে স্ত্রীকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলেন। অতঃপর স্ত্রীর কপালে স্নিগ্ধ ওষ্ঠস্পর্শ রেখে ধীর কণ্ঠে বললেন,
“সুইটহার্ট, আমি চাই আমার ছেলের প্রতিটা ড্রিম পূর্ণতা পাক। আমি থাকি কিংবা না-থাকি, ওর কোনো স্বপ্ন যেন অপূর্ণ না থাকে।”
স্বামীর কণ্ঠে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য অনুভব করতেই মাইমুনা এহসানের হৃদয় হালকা কেঁপে উঠল। চাপা অভিমান মিশ্রিত স্বরে তিনি বললেন,
“ডার্লিং, প্লিজ! আজকের দিনে অন্তত এসব কথা বোলো না। আই রিয়েলি ডোন্ট লাইক ইট!”
মুস্তাক এহসান শুধু মৃদু হাসলেন।
***************
মিখাইল! নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার করিডোরগুলোতে যেন নেমে আসে এক শীতল স্তব্ধতা! অবৈধ অ’স্ত্র চোরাচালান, গোপন বাণিজ্যচক্র, রাজনৈতিক চুক্তি প্রতিটি অদৃশ্য সাম্রাজ্যের পেছনে ছিল এই একজন মানুষের নিঃশব্দ নিয়ন্ত্রণ। কেউ তাকে সরাসরি দেখেনি বললেই চলে, অথচ তার নির্দেশে রাতারাতি বদলে যায় বহু দেশের ভাগ্য!
বর্তমানে রাশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তারই একচ্ছত্র আধিপত্য! ক্ষমতা, বুদ্ধি আর নিষ্ঠুরতার এক ভয়ংকর সংমিশ্রণ এই মানুষটি। যে একবার তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তার অস্তিত্ব পর্যন্ত ইতিহাস থেকে মুছে যায়!
আর সেই মিখাইল আজ হঠাৎ করেই স্পেনে এসেছে।
মাদ্রিদের অভিজাত বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালে ব্যক্তিগত জেট অবতরণ করার পর মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে কালো পোশাকধারী বডিগার্ডদের কড়া নিরাপত্তা বলয়। প্রথমে নামল কয়েকজন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। তারপর ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে জেটের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল মিখাইল!
লম্বা সুঠাম দেহ। গাঢ় কালো কোট। ধূসরাভ চোখজোড়ায় অদ্ভুত হিমশীতল দৃষ্টি! মুখে কোনো আবেগ নেই, অথচ তার উপস্থিতিই যেন চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
স্পেনে আসার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র একটি এক জরুরি বৈঠক!
কিন্তু বৈঠকের অপরপ্রান্তে যে ব্যক্তি রয়েছে, সে এত সহজ নয়। বরং সে এমন একজন, যে ইতোমধ্যেই মিখাইলের বহু কোটি ডলারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে!
এবং এই ঘটনাই বর্তমানে মিখাইলের অহংকারে আঘাত করেছে সবচেয়ে বেশি।
তার ডানহাত ভিক্টর গাড়ির দরজা খুলে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে মাথা নত করল।
“স্যার, লোকটা এখনো রাজি হয়নি।”
মিখাইলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে নিচু, কর্কশ কণ্ঠে বলল,
“এই পৃথিবীতে সবাই নত হয়, ভিক্টর! কেউ অর্থের কাছে, কেউ ভয়ের কাছে! আর যে কোনো কিছুর কাছেই নত হতে চায় না তাকে আমি ভেঙে ফেলি!”
তার কণ্ঠে কোনো উচ্চস্বরে রাগ ছিল না। বরং ছিল এমন এক শীতলতা, যা মানুষের শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!
***********
স্পেনের অপরপ্রান্তে,
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি গবেষণাগারে তখন গভীর মনোযোগে কাজ করছিলেন মুস্তাক এহসান।
বিশাল ল্যাবরুম জুড়ে সারিবদ্ধ কাঁচের চেম্বার, নীলাভ আলো বিচ্ছুরণকারী ডিজিটাল মনিটর, আর রাসায়নিক বিক্রিয়ার সূক্ষ্ম গন্ধ যেন পুরো পরিবেশকে রহস্যময় করে তুলেছে।
দেয়ালের একপাশে বড় অক্ষরে লেখা,
Confidential Research Zone
সাদা ল্যাবকোট পরিহিত মুস্তাক এহসান অত্যন্ত সতর্কভাবে একটি স্বচ্ছ তরল পরীক্ষা করছিলেন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও তার দৃষ্টিতে ছিল তীব্র মনোযোগ।
আজ সন্ধ্যায় তার ছেলে আফরিদের জন্মদিন।
ছেলেটি তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়। স্ত্রী এবং এই ছোট্ট শিশুটিকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন তিনি। তাই আজকের দিনটা কোনোভাবেই মিস করতে চান না।
হঠাৎই পিছন থেকে ভেসে এলো এক ভারী পুরুষালি কণ্ঠ,
“এ কি মুস্তাক! তুমি এখনো এখানে?”
মুস্তাক ধীরে ঘুরে তাকালেন। মিস্টার আলবার্ট! খ্রিস্টান ভদ্রলোকটি এই গবেষণাগারের অন্যতম একজন বিজ্ঞানী। মুখভর্তি হালকা ধূসর দাড়ি, চোখেমুখে আন্তরিকতার ছাপ। তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে মারুফুল হক ল্যাবের তরুণ সহকারী।
আলবার্ট ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন।
“আজ তো আফরিদের জন্মদিন! তুমি এখনো ল্যাবে কি করছো?”
মুস্তাকের ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্লান্ত অথচ কোমল হাসি।
“সামান্য কিছু কাজ বাকি ছিল, আলবার্ট। ভাবলাম শেষ করেই যাই।”
আলবার্ট মৃদু বিরক্তির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
“দিস ইজ নট ফেয়ার, মুস্তাক! আজকের দিনেও তুমি কাজ নিয়ে বসে আছো? আফরিদ কিন্তু সারাদিন তোমার অপেক্ষায় থাকবে!”
মুহূর্তেই মুস্তাকের চোখে ফুটে উঠল পিতৃত্বের কোমলতা। তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন।
“জানি, তাই তো তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করছি।”
এরপর হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই দ্রুত বলে উঠলেন,
“আচ্ছা শুনো, তোমরা কিন্তু আজ বিকেলে আসছো! আফরিদ বিশেষ করে বলে দিয়েছে আঙ্কেলরা যেন অবশ্যই আসে!”
আলবার্ট এবার হেসে উঠলেন।
“অবশ্যই আসব! আমাদের ছোট্ট চ্যাম্পিয়নের জন্মদিন মিস করা যায় নাকি?”
মারুফুল হক হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“স্যার, এখনই বের হওয়া উচিত। অলরেডি দুপুর দুটো বাজে।”
মুস্তাক আচমকা চমকে উঠলেন।
“হোয়াট! এতো দেরি হয়ে গেছে?”
তারপর হঠাৎই মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল চোখেমুখে ভেসে উঠল উৎকণ্ঠা।
“ফর্মুলার ফাইলটা কোথায়?”
প্রশ্নটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন পুরো পরিবেশের আবহ বদলে গেল। কারণ সেই ফাইলটি সাধারণ কোনো গবেষণাপত্র নয়! বহু বছরের গোপন গবেষণা, অসংখ্য ব্যর্থতা, শত শত রিস্টার্ট এবং কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে এই ফর্মুলা।
এই একটি আবিষ্কার বদলে দিতে পারে পুরো পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য!
আর ঠিক এই কারণেই মিখাইল স্পেনে এসেছে!
মারুফুল হক ধীর কন্ঠে বলল,
“এটা আমি ড্রয়ারেই রেখেছি স্যার।”
মারুফুল ফর্মুলার ফাইলটা এনে মুস্তাকের হাতে দিলো! ফাইলটা হাতে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি। বড্ড শান্তি লাগছে উনার! এত বছরের কষ্টের ফল এটা! কতশত রাতের নিদ্রা বিসর্জন দেওয়ার ফল!
**********************
“আফরিদ, খালামণিকে কল করো। বলো, দ্রুত উপস্থিত হতে। আমরা প্রতীক্ষার প্রহর গুণছি।”
মাইমুনা এহসানের কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হলেও তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করতে দেখা গেল না আফরিদকে। বরং সে নিমগ্ন রয়েছে গেইমিং জোনে, প্রিয় গেইমের ভার্চুয়াল জগতে।
কিছুক্ষণ পূর্বেই তার জন্মোৎসব উপলক্ষে সুবিশাল এক কেক এসে পৌঁছেছে; যেটি সুদক্ষ স্টাফরা অত্যন্ত সতর্কতায় নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করছে।
পুত্রের এমন নির্লিপ্ততা প্রত্যক্ষ করে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন মাইমুনা এহসান। ধীর অথচ সুশোভিত পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে গেলেন গেইমিং জোনের দিকে।
“কী হয়েছে আমার সোনা? মন এত বিষণ্ন কেন?”
আফরিদ মলিন মুখাবয়বে মৃদুস্বরে বলল,
“পাপা আজও ল্যাবে কেন গিয়েছে বলো তো, মাম্মা? কিছুই ভালো লাগছে না।”
‘পাপা’ শব্দটির প্রতিই যেন ছেলেটার দুর্বলতা প্রবল। জীবনের এই ক্ষুদ্র দশ বছরে মুস্তাক এহসানই হয়ে উঠেছেন তার পরম নির্ভরতা, শ্রেষ্ঠ বন্ধু, এক অনিবার্য আশ্রয়স্থল। শৈশব থেকে সীমাহীন স্নেহ ও মমতায় মানুষ করেছেন তিনি আফরিদকে। মনের অগোচর গোপন কথাগুলোও সে অকপটে ভাগ করে নেয় বাবার সাথেই।
পুত্রের অভিমানমাখা মুখাবয়ব দেখে স্নিগ্ধ হাসলেন মাইমুনা এহসান। স্নেহভরা স্পর্শে এলোমেলো দীর্ঘ কেশে আঙুল বুলিয়ে বললেন,
“তোমার পাপা কিছুক্ষণ আগেই আমাকে কল করেছিল। বলেছে, এই তো চলে আসছে।”
“আসছে না, এসে গেছি।”
গম্ভীর অথচ প্রশান্ত কণ্ঠস্বরটি উচ্চারিত হতেই কক্ষে প্রবেশ করলেন মুস্তাক এহসান। তাকে দেখে বিস্ময়ে চোখ বড়ো হয়ে গেল আফরিদের।
“পাপা!”
মুস্তাক এহসান মুহূর্তেই অনুধাবন করলেন পুত্রের ভারাক্রান্ত মনোভাব। অতঃপর স্ত্রীর দিকে রহস্যময় দৃষ্টিতে ইঙ্গিত করলেন। স্বামীর সংকেত বুঝতে বিলম্ব হলো না মাইমুনা এহসানের। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ছেলের জন্য আনা উপহারের বাক্সটি তুলে আনলেন।
অতঃপর স্বহস্তে সেটি আফরিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন,
“আমার চ্যাম্পিয়নের জন্য বিশেষ উপহার। দেখো তো, পছন্দ হয় কি না!”
প্রতিটি জন্মদিনেই আফরিদ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে তার বাবার উপহারের জন্য। কারণ, প্রতি বছরই মুস্তাক এহসান নিঃশব্দে পূরণ করে দেন ছেলের অলিখিত আকাঙ্ক্ষাগুলো। এবারও ব্যতিক্রম নয় সে জানতে চায়, এবার কোন স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটতে চলেছে।
আফরিদ তৎক্ষণাৎ গেইমিং জোন ত্যাগ করে দৌড়ে এসে বাক্সটি হাতে নিল। উচ্ছ্বাসে দীপ্ত কণ্ঠে বলল,
“এর ভেতরে কী আছে, পাপা?””
“খুললেই দেখতে পাবে।”
ভীষণ উৎকণ্ঠা ও উচ্ছ্বাস নিয়ে বাক্সটি উন্মুক্ত করতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তার স্বপ্নের লয়ারের স্যুট। মুহূর্তেই আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল আফরিদ। শৈশব থেকে মিথ্যে মিথ্যে উকিল সেজে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি যেন এক নিমেষে ভেসে উঠল তার চোখে।
“ওয়াও, পাপা! এটা… এটা সত্যিই আমার জন্য?”
উচ্ছ্বাসে দীপ্ত আফরিদ ঝাঁপিয়ে পড়ল মুস্তাক এহসানের বুকে।
“থ্যাংক ইউ সো মাচ, পাপা! আমি সত্যিই ভীষণ খুশি হয়েছি।”
মুস্তাক স্নেহভরে পুত্রের কপালে চুম্বন এঁকে দিয়ে বললেন,
“তুমি বড় হয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে, আফরিদ। বার্সেলোনার একজন খ্যাতিমান অ্যাডভোকেট হবে। ইউ ক্যান ডু ইট।”
আফরিদও বাবার গালে চুম্বন এঁকে দৃঢ়স্বরে বলল,
“ইয়েস, পাপা। আই ক্যান ডু ইট।”
*******************
মিসেস ইসাবেলা আলবার্ট দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। তার পরণে শোভা পাচ্ছে মনোরম পিংক বর্ণের এক অভিজাত ড্রেস। গলায় ক্ষুদ্র , নান্দনিক নেকলেস, কানে সূক্ষ্ম নকশার ইয়াররিং সব মিলিয়ে অপার্থিব সৌন্দর্যের আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে তার সমগ্র ব্যক্তিত্বে।
শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে নিরীক্ষণ করলেন তিনি।
কেউ কি কল্পনাও করতে পারবে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা? মাত্র তিন মাসের মাতৃত্ব যেন তার সৌন্দর্যে আরো স্নিগ্ধতা যুক্ত করেছে।
নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন ইসাবেলা। ঠিক তখনই তার দেবরের স্ত্রী রোসা এসে হাতে পার্সটি তুলে দিয়ে বলল,
“ভাইয়া অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন, ইসাবেলা।”
সমবয়সী হওয়ার সুবাদে রোসা ও ইসাবেলার সম্পর্কটা বেশ আন্তরিক; একে অপরকে নাম ধরেই সম্বোধন করে তারা। রোসার দুই বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে ইভেলিনা।
“তুমিও তো আমাদের সঙ্গে যেতে পারো, রোসা।”
মৃদু বিষণ্নতায় প্রশ্ন করলেন ইসাবেলা।
রোসা ক্ষীণ হেসে উত্তর দিল,
“ইটস ওকে। এমনিতেই ইভেলিনা অসুস্থ। এই অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয়। তোমরাই বরং ঘুরে এসো।”
ইসাবেলা আর কিছু বললেন না। শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে অবলোকন করে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন। বাইরে মিস্টার আলবার্ট বহুক্ষণ যাবৎ অধীর প্রতীক্ষায় রয়েছেন তার স্ত্রীর জন্য। ইসাবেলা উপস্থিত হতেই স্ত্রীর কপালে চুম্বন এঁকে দিলেন মিস্টার আলবার্ট। অতঃপর ওষ্ঠোপুটে কোমল হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“যাওয়া যাক?”
ইসাবেলা একই ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
চলবে………..।
(গত পর্বে একটা মিস্টেক করেছি, আফরিদের দশতম নয়,বারো তম জন্মদিন ছিলো।)
( চুপিচুপি একটা কথা বলি? ন্যান্সি ইসাবেলার পেটে থাকা অবস্থায় আফরিদের জন্মদিনে গিয়েছে।)
(গল্প তো আর বেশি বাকি নেই পাঠক মহল। হাতে গোনা পাঁচ ছয় পর্ব। তাই যদি গল্পের কোথাও ত্রুটি থাকে বা কোনো দৃশ্যে সমস্যা থাকে বা আমি স্কিপ করে যাই তাহলে একটু মন্তব্য করবেন।)
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা [ পর্ব ৫৭] প্রথম অর্ধেক
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ১৬
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩০+বোনাস
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬৩+৬৪
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৯
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৮
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৩
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৩