Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ৭০ অন্তিম পর্ব (প্রথমাংশ+শেষাংশ) 


#আমার_আলাদিন 

#জাবিন_ফোরকান 

#পর্বসংখ্যা৭০

#অন্তিম_পর্ব (প্রথমাংশ) 

পেরিয়েছে গোটা এক সপ্তাহ। একটা সময় যাদের ছাড়া জীবন চলবেনা মনে হতো, এখন তাদের ছাড়া দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে। সময় কারো জন্য থামে না। জীবন কাউকে করুণা করেনা। উভয়ে বয়ে চলে আপন মর্জিতে। সেই মর্জিতে কারো জবরদস্তি চলে না। 

রান্নাঘরের মেঝেতে বটি নিয়ে বসে লাউ কুটছে ইরাম। ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা তার ম্যাকবুক। স্ক্রিনে লোডিং আইকন ভাসছে। গতকাল সারারাত জেগে করা প্রজেক্টের কাজটা অন্তিম পর্যায়ে আছে। এই সাত দিনে ইরাম কত ঘন্টা ঘুমিয়েছে তা হাতের আঙুলে গোণা সম্ভব। চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে। নিচে জন্মেছে ডার্ক সার্কেল। গাল দুটো ফুলেছে অস্বাভাবিকভাবে। ঘুম, বিশ্রামের অভাব এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে চেহারা ভেঙে আসতে শুরু করেছে। তাতে বিশেষ পরোয়া নেই ইরামের। রূপ লাবণ্য তাকে আর জীবিকা এনে দিতে পারবেনা। আগে ফ্রিল্যান্সিংয়ের যে কাজগুলো কম পারিশ্রমিকের কারণে নিত না, এখন সেগুলোর কাজও সে নেয়। কত টাকা পায় বাছবিচারের সুযোগ নেই। শুধু টাকা পেলেই হলো। এজন্য তার কাজের পরিমাণ বেড়েছে অত্যধিক। সারাদিন সারারাত ল্যাপটপেই কাটাতে হয়। যে কয়েক ঘণ্টা কাজ করে না, সেই কয়েক ঘণ্টা সে ঘরের কাজ করে, ইযানকে সময় দেয়। আজকাল ছেলের সঙ্গে খেলার সময়টাও তাকে জীবিকার পিছনে দিতে হচ্ছে। এক হাতে যখন ছেলেকে বল ছুঁড়ে দেয়, অন্য হাত তখন কি বোর্ডে ঘুরতে থাকে। এই নিয়ে ইযান নারাজ। মাঝে মাঝে তার সাথে খেলতে চায়না। মুখ ঘুরিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। তার মা কেন অন্য কিছুতে সময় দেবে? কই? আগে তো এমন করত না! ছেলের জন্য বুকটা হাহাকারে ফেটে যায় ইরামের। কিন্তু কিছু করার নেই। ইযান প্রায়শঃই রাতে ঘুমের মাঝে ‘বাব্বা, বাব্বা’ করে ডাকতে থাকে। কিন্তু ছেলের সকল ইচ্ছা পূরণের সামর্থ্য ইরাম আর ধারণ করেনা।

এর মধ্যেই হাত মুঠ করে ফেলেছে সে। ইযানের জন্য অতি দরকারী খরচ ছাড়া অন্য কোনো খরচই সে করে না। তার নিজের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। কায়সানের পাশাপাশি আরও দুটো ইউটিউব চ্যানেল আর ইনস্টাগ্রাম আইডির কাজ সে নিয়েছে। আগে সেগুলো ছোট আর মজুরি কম বিধায় নিতে চায়নি। এখন সবটাই করা হয়। না করলে সঞ্চয় জমবে কীভাবে? ভাতটুকুও সে আজকাল টিম মিটিংয়ে থাকতে থাকতে চুপিচুপি খেয়ে নেয়। রাতে প্রায়শই লোড শেডিং হয়। তখন কোলে ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় ঘুমন্ত ছেলেকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে ইরাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অক্লান্তভাবে। সাইবানদের বাড়িতে নিজস্ব জেনারেটর আর আই পি এস দুটোই ছিল। যার দরুণ লোডশেডিং বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব বোঝা যায়নি কখনোই। বাইরে তেমনটা নয়। এখানেও অবশ্য রাবিয়ার রুমে ছোট্ট আই পি এস আছে। তাতে একটা লাইট জ্বলে, ফ্যান আর ওয়াইফাই চলে। ইরামকে দেখে দেখে মাত্র সাত দিনেই রাবিয়া অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে। সেদিন রাতে তো এসেই গিয়েছিল, বাচ্চাকে নিতে। ইযানকে নিয়ে নিজের রুমে ফ্যানের নিচে শুইয়ে দেবে সে। ইরাম মৃদু হেসে মানা করে দিয়েছে। রাবিয়া নিজের ঘুম কত রাত নষ্ট করবে? 

ইহান একদিন পরপরই ইরাম আর ইযানকে দেখতে আসে। যখনই আসে, কিছু না কিছু নিয়েই আসে। সেটা নাস্তা হোক বা সংসারের টুকিটাকি সরঞ্জাম। ছোট ভাই এই টাকা কোথা থেকে পায় জেরা করলে ইহান একটা সত্যি স্বীকার করে। সে নাকি বন্ধুর মায়ের হোমমেড ফুড বিজনেসে ইভিনিং শিফটের ডেলিভারির কাজ করে। এটা কবে থেকে ধরেছে সেটা হাজার জিজ্ঞেস করেও জানা যায়নি। ইহানের খরচ সাধারণত রাহাতই বহন করে। তাই ছোট ভাই বেপরোয়া ভাবেই চলে। ইহান যে কাজটা শুধু ইরামের জন্যই নিয়েছে, সেটা বুঝতে বোনের বিশেষ বাকি থাকেনি। আচ্ছা, যদি ইহান জানতো সে মানুষ হিসাবে কতটা ব্যর্থ, তাহলে কী এভাবে ভালোবাসতো? ইরামের ভয় হয়। অনেকগুলো সম্পর্ক সে হারিয়ে ফেলেছে। গুটিকতক যারা এখনো আছে, তাদের নতুন করে সে হারাতে চায়না। 

ইযান বিছানার সামনে ম্যাটে বসে নিজে নিজে খেলছে। এই ফাঁকে ইরাম রান্নার কাজটা সেরে নিচ্ছে। ছেলের জন্য পাতলা খিচুড়ি করবে। নিজের আর কী? একমুঠো ভাত আর লাউ হলেই চলে যাবে। রান্নায় যত কম সময় দেয়া যায় ততই মঙ্গল। এর মধ্যেই রাবিয়ার চিৎকার চেঁচামেচি কানে এলো। ফোনে কারো সঙ্গে উচ্চবাচ্য করছে সে। কিছুক্ষণ বাদে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো হতাশমুখে। ইরাম একমুঠো চাল ধুয়ে চুলায় বসাতে বসাতে জিজ্ঞেস করল, 

“কী হয়েছে রাবিয়া?” 

থপথপ করে পা ফেলে এসে রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল রাবিয়া। ভ্রু কুঁচকে জানাল, 

“আর বলো না আপু। আমার রান্নার খালাটা, সে নাকি আর আসতে পারবেনা। স্বামীর নাকি অসুখ, হাসপাতালে ভর্তি। বলি, তা হলে তো কাজ আরো বেশি দরকার, নাহলে হাসপাতালের খরচ দেবে কীভাবে? আমি শিওর, অন্য জায়গায় বেশি টাকায় কাজ পেয়েছে। সোজাসাপ্টা বললেই হয়। এত বাহানা করলে চলে? এখন আমি অর্ধেক মাসে রান্নার লোক কোথায় খুঁজব? এমনিতেও এই শহরে কাজের লোক পাওয়া যে কঠিন!” 

রাবিয়ার কথা শুনে ইরাম থমকাল। তারপর পাতিলে আরও কিছুটা বাড়তি চাল তুলে দিয়ে বলল, 

“তোমার আর রান্নার লোক খুঁজতে হবেনা। আমিই করব।” 

রাবিয়া অবাক হলো। বলতে নিল, 

“না না আপু! তুমি কেন? তুমি নিজের বাচ্চা, কাজ নিয়েই হিমশিম খাও আর…”

“ফ্রিতে দিচ্ছিনা। রান্নার লোক যেহেতু লাগবেই, সেহেতু আমি করলে ক্ষতি কী? তুমি একটা মানুষ, কাজই বা কতটুকু?” 

“কিন্তু…তবুও…” 

“বিনিময়ে আমার রুম ভাড়াটা যদি আরেকটু কমিয়ে রাখো তাহলে সুবিধা হয় আমার।”

রাবিয়ার চোখ দুটোতে অস্বাভাবিক একটা বেদনা ফুটে উঠল। দ্রুত কয়েক কদমে কাছে পৌঁছে সে হুট করেই ইরামকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ইরাম সেখানে জমে গেল। রাবিয়া হঠাৎ বলল,

“আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। এই কারণে অনেক আদরে বড় হলেও একাকীত্বে ভুগতাম। আমার যদি কোনো বোন থাকত, তাহলে সে কেমন হতো? তোমাকে দেখে আমার একটা না থাকা বোনের শখ মিটে গিয়েছে। এই ঘরটা তোমারই ইরাম আপু। তুমি যা মন চায় করো, আমার কোনো আপত্তি নেই। ভাড়া নিয়ে এত চিন্তা করতে হবে না। তোমার হাতের রান্না প্রতিদিন খেতে পারলে তো সোনায় সোহাগা! তবে হ্যাঁ, বাজারটা কিন্তু আমি মনের মতন করব। এই লাউ ঝাউ আমার পছন্দ না। তুমি শুধু রান্না করবে আর আমার সাথে খাবে। কেমন?” 

ইরাম একটা নিঃশ্বাস ফেলল। কিছু কিছু মানুষ এত স্বার্থহীন হয়! একটুখানি আদরের জন্য কতকিছু করতে পারে! কী সরল তাদের বিশ্বাস! তার স্বামীটাও তো তাকে এভাবেই বিশ্বাস করেছিল। একটুখানি আদর চেয়েছিল। অথচ ইরাম কী স্বার্থপর হয়ে গেল! ইরামের লালচে চোখে অশ্রু জমলনা। অনুভূতিরা নিজেদের শুধরে নিতে শুরু করেছে। দরজার আড়াল ছাড়া আর কোথাও ঝরেনা। 

ঠিক এমন সময়েই কলিং বেলের আওয়াজ। রাবিয়া দরজা খুলতে গেল। কিছুক্ষণ বাদে এসে আবার রান্নাঘরে উঁকি দিল,

“আপু, তোমার একটা পার্সেল এসেছে।” 

ইরাম অপর চুলায় ডিম ভুনা বসিয়েছে। যেহেতু রাবিয়াও খাবে আজ। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে সে এগোল। পার্সেল? এই বাসায়? কিন্তু তার এই নতুন ঠিকানা কেউ তো জানেনা। সামিয়া কিছু পাঠিয়েছেন? তাকে সে আর ইযান ঠিক আছে এমন একটা টেক্সট মেসেজ পাঠানো ছাড়া আর যোগাযোগ করেনি ইরাম। পার্সেলের লোক একটা ছোট বক্স তার হাতে ধরিয়ে ওটিপি নিয়ে ডেলিভারি কনফার্ম করে চলে গেল। রাবিয়া তখন গিয়েছে ইযানের কাছে। খেলছে। দুজনের হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছে রুম থেকে। ইরাম টেবিলের উপর বক্সটা রাখল। কোনো প্রেরক ঠিকানা নেই। অদ্ভুত তো! ছু*রি এনে কে*টে বক্সটা খুলল সে। ভেতর থেকে এক টুকরো মখমল কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট একটা জিনিস বেরিয়ে এলো। সেটা হাতে নিতেই ইরামের চক্ষু চড়কগাছ। একটা ক্রেডিট কার্ড! মাস্টারকার্ড, প্রিমিয়াম! প্রথম কয়েক সেকেন্ড ইরাম ঠাওর করতে পারলনা কিছু। তারপর বক্সের দিকে তাকাতেই অন্য একটা জিনিস নজরে এলো। একটা চিরকুট। সেটা খুলতেই রমণীর সমস্ত শরীর তীব্র ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠল। হাতের প্যাঁচানো লিখা চিনতে একটুও ভুল হলোনা। 

‘শুনলাম, সেপারেশনে আছো? আ ভেরি গুড ডিসিশন মাই সুইটহার্ট! কিন্তু তোমার আগুনে আমার ছেলেটাকে আবার জ্বালিয়ে ফেলনা। তুমি আমাকে চাও বা না চাও, আমার দরজা যেমন তোমার জন্য খোলা, তেমনি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও। আবারও গরীব দুঃখীর জীবনে অভ্যস্থ হওয়ার দরকার নেই। কার্ড লিমিট ৪০ লাখ। স্পেন্ড অ্যায মাচ অ্যায ইউ ক্যান বিফোর আই সেন্ড আ সেকেন্ড ওয়ান, কবিতা। আফটার অল, আমি তোমার মাথা গরম স্বামীর মতন পাষাণ না।’ 

চিরকুটটা হাতের মাঝেই মুচড়ে ফেলল ইরাম। ইচ্ছা হলো কার্ড আর চিরকুট দুটোকেই আগুনে জ্বালিয়ে দিতে। কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে দমাল সে। চেয়ারে বসে জোরে জোরে শ্বাস টানল। হাত কাঁপছে তার। মিনিট দশেক প্রয়োজন হলো তার নিজেকে শান্ত করতে। তারপর হুট করেই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। চটজলদি উঠে নিজের ফোন এনে কার্ড আর চিরকুট দুটোরই ভিডিও এবং ছবি তুলে নিল সে। তারপর সুন্দরভাবে বক্সে ভরে যত্ন করে লুকিয়ে রাখল। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। ফোন থেকে অরণ্যর নাম্বারটা খুঁজে বের করল সে। রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় ভাত নেড়ে দিতে দিতে মেসেজ পাঠাল,

—কার্ড শুধু আপনার একার আছে বলে মনে করেন, মির্জা সাহেব? 

এক লহমা থেমে ইরাম দীর্ঘ দম নিয়ে দ্বিতীয় এবং অন্তিম মেসেজ দিল, 

—ভিকটিম কার্ড, সিমপ্যাথি কার্ড, ওমেন কার্ড, মাদার কার্ড, ডিভোর্সি কার্ড…. আই উইল প্লে এভ্রি ড্যাম কার্ড আই ওউন! আপনার প্রতিপক্ষ এবার আলাদিন না, ইযানের মা। কথা দিচ্ছি, খুব জলদিই আফসোস করবেন মিস্টার মির্জা।

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

দুপুরের কড়া রোদ রুমে এসে পড়লেও ঘুম ভাঙেনি এখানকার বাসিন্দার। এমন না যে সে রাতে ঘুমায়নি। বরং সারাদিন সারারাত সে এখানেই পড়ে থাকে। কিছু করে না। শুধু জোর করে খাওয়ানো হলে যা একটু মুখে তোলে। ছেলেকে নিয়ে বেজায় চিন্তিত আহমদ। আজও যখন বাসায় ফিরে দেখলেন সাইবান রুম থেকে বেরোয়নি, তখন তিনি হতাশাবোধ করলেন। হাতঘড়ি দেখলেন, তিনটা বেজে এসেছে প্রায়। বিকালের মধ্যে তাদের এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরোতে হবে। এইমাত্র ওই বাড়ি থেকে এসেছেন আহমদ। সাথে এনেছেন সাইবানের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আর ফেরেনি সাইবান। এই ফ্ল্যাটেই থাকে সে, আহমদের সাথে। 

ওভেনে খাবার গরম করতে দিয়ে আহমদ শার্টের হাতা গুটিয়ে ঢুকলেন বেডরুমে। পর্দা সকালেই সরিয়ে দিয়েছিলেন। উজ্জ্বল সোনালী রোদে সমস্ত ঘর উপচে পড়ছে এখন। এত ঝকঝকে আলোতেও বিছানায় দিব্যি ঘুমুচ্ছে সাইবান। সুদর্শন চেহারাটায় মলিনতার ছাপ পড়েছে। অতি শখের শরীরজুড়ে অযত্নের ছড়াছড়ি। চিবুকে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চুলগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে। শরীরে কোনো কাপড় নেই। শুধু একটা কালো ট্রাউজার পরনে। বিছানায় কম্বলের নিচে শুয়ে আছে সে। বুকে একটা খেলনা জড়িয়ে ধরে রাখা। আহমদ এগোলেন। সূর্যের আলোয় স্পষ্ট দেখলেন সবুজাভ ডায়নোসর প্লাশি। বাচ্চারা যেমন খেলনা জড়িয়ে ঘুমায়, সাইবানও তেমনি সেটাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা আহমদের শুষ্ক চোখে কেন জলের উদ্রেক ঘটাল বুঝতে পারলেন না তিনি। অশ্রু গড়ানোর আগেই দ্রুত মুছে ফেললেন তা হাতের পিঠে। বিছানার কোণায় বসে ঘুমন্ত ছেলের মাথায় হাত বোলালেন,

“চ্যাম্প? এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে? রেডি হতে হবে। উঠবি না?” 

প্রথম কিছুক্ষণ সাইবান কোনো প্রতিক্রিয়া করলনা। অতঃপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। আহমদ ছেলেকে জেগে উঠতে দেখে মৃদু হাসলেন। উঠে গিয়ে অর্ধেক গোছানো লাগেজটা টেনে এনে বাকি জিনিসগুলো ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন,

“জলদি ওঠ। ওভেনে খাবার গরম দিয়েছি। গোসল করে খেয়ে নে। তাড়াতাড়ি!” 

সাইবান উঠে বসে রইল। চোখ পিটপিট করতে করতে শূণ্য দৃষ্টিতে পিতাকে দেখে গেল। আহমদ হঠাৎ মাঝপথে কাজ থামিয়ে দৌঁড়ে কোথায় গায়েব হলেন। আবার ফিরে এলেন শেভিং ক্রিম, তোয়ালে আর রেজর হাতে। অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ছেলের সামনে বসে পটু হাতে চিবুকে শেভিং ক্রিম মাখিয়ে শেভ করে দিতে লাগলেন তিনি। সাইবান বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেললেও তিনি ছাড়লেন না। বড়জোর কয়েক মিনিট লাগল তার। তারপরই তোয়ালেতে সাইবানের মুখটা মুছে দিয়ে একগাল হেসে তিনি বললেন,

“যা। এবার গোসল করে নে।”

এবার আর গাইগুই না করে সাইবান উঠে ধীরপায়ে বাথরুমের দিকে গেল। বিছানায় তার ফেলে যাওয়া ডায়নোসর প্লাশিটার দিকে একপলক চেয়ে সেটা হাতে নিয়ে লাগেজে ঢুকিয়ে দিলেন আহমদ। 

বাথরুমে ঢুকে কিছুক্ষণ অযথাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল সাইবান। নিজেকে চিনতে বেগ পোহাল সে। এই কয়েকদিনেই শরীরে যেন আমূল পরিবর্তন এসেছে। মাথা নামিয়ে রোবটের মতন নিজের ফোনের দিকে তাকাল সে। কাউন্টারের উপর রাখা সেটা। ভাইব্রেট করে যাচ্ছে। ফ্রেন্ডগ্রুপে একের পর এক মেসেজ আসছে। অনুরাগ, নীরব, আফনান সবাই অস্থির হয়ে গেছে। অথচ সাইবান না কারো মেসেজ দেখল, না কারো রিপ্লাই করল। ফোনটার সুইচড অফ করে উল্টোভাবে ফেলে রাখল আবার। কাজটা করতে গিয়েই হঠাৎ নিজের হাতের উপর দৃষ্টি গেল তার। বাম হাতের অনামিকায় এখনো জ্বলজ্বল করছে সিলভারের আংটি। মৃদু দ্যুতি ছড়াচ্ছে ছোট্ট সবুজাভ পাথর। সাইবান সহস্র চেষ্টা করেছে। আংটিটা খুলে ছুঁড়ে ফেলেছে দেয়ালে, মেঝেতে। তার মিনিটখানেক বাদেই আবার কুড়িয়ে এনে আঙুলে পড়েছে। আংটিটা তাকে অদৃশ্য বলে টানে। সেই টানের এতই জোর যে সাইবান আলাদিন নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি। সেই আংটিটার দিকে স্থির চেয়ে থেকে শাওয়ার অন করে দিল সে। সমস্ত শরীর ভিজে টইটুম্বুর হলো। আর সে দাঁড়িয়ে দেখে যেতে লাগল আংটিটাকে। 

গোসল সেরে নিজে থেকেই তৈরি হয়ে নিল সাইবান। কালো হুডি আর এর উপর ওভারকোট পরে নিল সে। আহমদ এখনো শেষ মুহূর্তের গোছগাছ করছেন তাই তাকে বিরক্ত না করে নিজে থেকেই কিচেনে গেল। ওভেন থেকে খাবার বের করে প্লেটে নিয়ে চামচ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খেতে লাগল। ঠিক এমন সময় হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজ। সাইবান অবাক হলো। আহমদের এই বাসায় তো কেউ আসেনা! সারিকা আসতে চেয়েছিল, আহমদ ফোন করে মেয়েকে মানা করেছেন। তবে? খানিকটা কৌতূহল নিয়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলল সাইবান। ওপাশে দাঁড়ানো অপ্রত্যাশিত মানুষটা তাকে জমিয়ে দিল। টপ আর স্কার্ট পরনে এক সুদর্শনা দাঁড়িয়ে। পরিচিত মুখখানায় নির্মল ভাব। আগের তীক্ষ্ণতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সাইবানকে দেখে মিষ্টি হাসল সে, 

“ভেতরে আসতে পারি, জিনি?” 

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

চারটা নাগাদ কাজকর্ম সেরে লম্বা একটা গোসল দিয়ে ছাদে এসেছে ইরাম। ইযানকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছে। রাবিয়া তার রুমে বসেই ল্যাপটপে কাজ করছে তাই চিন্তা নেই। ভেজা কাপড়গুলো ধীরে ধীরে দঁড়িতে মেলে দিতে লাগল সে। চুলের গামছা খুলে মুছে নিয়ে সেটাও মেলে দিয়ে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়াল সে। বাতাস বইছে। সারাদিনের উদ্ভট গরমটা কমে এসেছে। দিগন্তে ছুঁয়ে যাচ্ছে কমলা রেখা। দৃশ্যটার দিকে একনাগাড়ে চেয়ে রইল ইরাম। দূরে পাখির দল উড়ে যাচ্ছে। নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি। ঢোক গিলল ইরাম। ওই পাখিরও আপন নীড় আছে। সেখানে ইরাম আজীবন বানভাসীই থেকে গেল। আজ এখানে, কাল সেখানে। তার নিজের বলতে শুধু কবরটাই কপালে রয়ে গেছে। 

“কী ভাবছ?” 

কন্ঠস্বরটা কানে গেলেও ইরাম চমকালনা। খুব সহজেই এর মালিককে চিনে ফেলল। পিছন ঘুরে তাকানোর প্রয়োজন পড়লনা। 

“পাখিদের দেখছি। দিনশেষে বাড়ি ফিরছে ওরা, আপনজনের কাছে।” 

ইরামের পাশে এসে দাঁড়াল কায়সান। পরনে নীলচে স্যুট তার। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। একটা সেমিনার ছিল। সেখানে সে আমন্ত্রিত অতিথি এবং কম্পিটিশনের বিচারক ছিল। এখানে আসতেই রাবিয়া জানাল ইরাম ছাদে, তাই ছাদে চলে এসেছে। 

“পাখি একটা চমৎকার প্রাণী। তবে ওদের যে দেখতে এসেছ, কিছু খেয়ে এসেছ? মানুষের সন্ধ্যার নাস্তা করার সময় ঘনিয়ে এলো, তুমি দুপুরের খাবারটা অন্তত পেটে দিয়েছ?” 

কায়সানের চিন্তায় মৃদু হাসল ইরাম। মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে কপালে। আঙুলের সাহায্যে সেগুলো ছড়িয়ে নিয়ে বলল, 

“আজকাল খেতে ইচ্ছা হয়না। নেহায়েত শরীরের জন্য দরকার। নাহলে এই প্রকৃতির হাওয়াই অধিক সুস্বাদু।” 

কায়সান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার কপালের বলিরেখায় প্রকাশ পেল জবাবটা পছন্দ হয়নি। ইরামের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে নিজের হাতটা রেলিংয়ের হয়ে রাখল কায়সান। আকাশের দিকে তাকাতেই তার চশমার ফ্রেমে নীলচে গগন প্রতিফলিত হলো। 

“অনেকের বাঁচতে ইচ্ছা হয়না। তবুও তারা বাঁচে। অনেকের মরতে ইচ্ছা হয়না। তবুও তারা মরে। এটা জগতের নিয়ম। যে নিয়ম লঙ্ঘন করার সাধ্য তোমার আমার মতন তুচ্ছ মানুষদের হয়না।” 

ইরাম চুপ করে রইল। কায়সান তার দিকে ফিরল। ভেঙে আসা চেহারাটা দেখে নরম গলায় বলল,

“নিজেকে ভেঙে যদি ভালো থাকা যেত, তাহলে এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ ভালো থাকত। ভালো থাকা বলে আদতে কিছু হয়না। তুমি ভাবছ সকলের কাছে তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। অথচ একটা জীবন তোমাকে আঁকড়েই বেঁচে আছে। হয়ত কখনো চোখের বদলে মনের দুয়ার খুলে দেখোনি, নাহলে তোমার প্রয়োজন নিয়েই কাউকে না কাউকে বেঁচে থাকতে দেখতে।”

এবার আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে সরাসরি কায়সানের দিকে তাকাল ইরাম। চশমার ওপাশে থাকা গাঢ় অনুভূতিসম্পন্ন চোখজোড়ার সাথে তার দৃষ্টি মিলিত হলো। 

“তুমি আমাকে পছন্দ করো, কায়সান?” 

কায়সানের চেহারা থেকে নমনীয়তাটুকু এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। বিব্রত দেখাল বেশ। চোখজোড়া কাঁপল আতঙ্কে। মুখ ফিরিয়ে নিল সে অন্যদিকে। এমন সরাসরি প্রশ্ন আশা করেনি। রেলিংয়ের উপর আঙুলগুলো চেপে বসল। ইরাম প্রত্যেকটা প্রতিক্রিয়াই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। শেষমেষ কায়সান অস্বীকার করলনা। 

“যদি বলি করি, তবে কী খুব ভুল হবে?” 

ইরাম সন্তুষ্ট হলো। সৎ জবাব দিয়েছে, এটা ভালো ব্যাপার। চোখ ফিরিয়ে পুনরায় আকাশের দিকে তাকাল ইরাম, 

“উহু। আগে বলোনি কেন?” 

“আগে বললে তুমি কী আমার হতে?” 

“দেখা যেত।”

“ওয়েল…দেখা যায়নি। খুব বেশি দেরী করে ফেলেছি। নিজেকে তোমার যোগ্য হিসাবে গড়ে তুলতে তুলতে অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছিল।” 

ইরাম কিছু বললনা আর। দুজনের নীরবতার মাঝে শনশনে হাওয়া খেলে গেল। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। কায়সান একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে হঠাৎ বলে উঠল,

“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?” 

“করো।”

“তোমার কী মনে হয়? সত্যিই অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে? জানি, অনেক কঠিন। তবুও যদি বলি, আরেকটাবার নতুন শুরু করা যায়?” 

কায়সানের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে। অনেক ভয়ে আছে, চেহারায় নীলচে ছাপ পড়েছে। ইরাম মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তারপর হঠাৎ করে মুচকি হাসল। এমন গুরুতর মুহূর্তে ইরামের হাসিটা বেমানান লাগল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল কায়সান,

“হাসছ কেন?” 

“হাসছি আমার নসিব দেখে। তোমরা আমার মতন জোড়াতালি দেয়া মানুষের মাঝে কী পাও বলো তো?”

“আবারও দেরী হয়ে গিয়েছে?” 

“অনেকটা।” 

ঢোক গিলল কায়সান। ইরাম তার চোখে চোখ রেখে উদাসী গলায় জানাল, 

“তোমার দেরী হওয়া না হওয়ায় আমার কিছু আসে যায়না, কায়সান। কারণ এই মনটা আমি বোঝার আগেই একজনের নামে লিখিত হয়ে গেছে।” 

“তুমি কাউকে ভালোবাসো?” 

এবার কায়সানের উপর থেকে চোখ সরিয়ে দিগন্তে চেয়ে ইরাম বলল, 

“আমি বাসিনা। আমার অন্তর বাসে। তাই সরি, এই এক অন্তরে আর কোনোদিন নতুন সূচনা হবেনা। ইরামের জীবনপন্যাস বিচ্ছেদের অধ্যায়েই সমাপ্ত।” 

                                     —চলবে—

(অন্তিম পর্ব অনেক বড়, তাই দুই ভাগ করে দিচ্ছি। শেষ ভাগ কাল বা পরশুদিন পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। ♥️)

#আমার_আলাদিন 

#জাবিন_ফোরকান 

#পর্বসংখ্যা৭০ 

#অন্তিম_পর্ব (শেষাংশ) 

গাঢ় নিস্তব্ধতা। শুধু ঘড়ির কাঁটার ঘূর্ণনের শব্দ তাতে ছেদ ঘটাচ্ছে। সোফায় চুপটি করে বসে আছে সাইবান। তার পাশে বসার বদলে তিতলি বসে আছে বিপরীত দিকের সোফায়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে সাইবানকে যার মুখে কোনো রা নেই। তিতলির দিকে তাকাচ্ছেও না সে। চেয়ে আছে শূন্যপানে। 

“কেমন আছিস?” 

অবশেষে নীরবতা ভাঙল তিতলি। সাইবান তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। শুধু একটু হেলান দিয়ে বসে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে জানাল, 

“যেমন থাকার কথা।” 

“কেমন থাকার কথা?” 

“তুই কি আমাকে দরদ দেখাতে এসেছিস তিতলি? যদি তাই হয়, তবে আই ডোন্ট নিড ইওর সিমপ্যাথি রাইট নাউ।” 

তিতলিকে কিছুটা মনমরা দেখালো। পরক্ষণেই সে চেহারার মলিনতা ঝেড়ে ফেলল। মৃদু হেসে শুধাল, 

“তোর কি মনে হয়? আমি নতুন করে সুযোগ খুঁজতে এসেছি?” 

সাইবান উত্তর করলনা। তিতলি নিজের বাম হাতটা তুলে দেখাল। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটা হীরের আংটি। 

“আ’ম এঙ্গেজড, জিনি। আজ আমি তোর কাছে এসেছি শুধু একজন পুরোনো বন্ধু হিসাবে, আর কিছু নয়।” 

এবার সত্যিই সাইবানের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। মাথা নামিয়ে সে তিতলির হাতের দিকে তাকাল। বাগদান কবে হলো এই মেয়ের? সাইবান তো শোনেনি! বাকিরাও কিছু বলেনি। অবশ্য, বরিশাল থেকে ফেরার পর থেকে তিতলি তাদের ফ্রেন্ডগ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল পুরোপুরি। তাই বলে এত বড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে? সাইবানকে থ হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে তিতলি নিজের হাতটা সরিয়ে কোলের উপর গুটিয়ে রাখল। নরম গলায় বলল, 

“জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, এটা বুঝতে আমার একটু বেশিই সময় লেগে গেল। হ্যাঁ, তোকে পেলে হয়ত জীবনটা অন্যরকম হতো, তবে আমি মানিয়ে নিয়েছি। খুব বেশি খারাপ তো নেই। ওই মানুষটাও অনেক ভালো। আমার ভীষণ যত্ন নেয়।” 

তিতলির শেষ বাক্যটা কেন যেন সাইবানের বিবেকবোধে লাগল। যত্ন নেয়? যে যত্নের যোগ্য তিতলি, সে যত্ন অবশেষে মেয়েটা পাচ্ছে। দুহাত মুঠো পাকিয়ে ফেলল সাইবান। নিজের কোলের দিকে চেয়ে নতমুখে বসে রইল। তিতলি বন্ধুকে দেখল মনোযোগ দিয়ে। তারপর বলে উঠল, 

“তুই কি দেখতে পাচ্ছিস, কতটা বদলে গিয়েছিস? যে ছেলেটার হাসি দেখলে বাকিরা এমনিতেই হেসে ফেলত, যে সবসময় মানুষের মাঝে খুশির খোড়াক বিলিয়ে যেত, সে কেমন রংহীন ধূসর হয়ে গিয়েছে। তোকে কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে আমি বহুবার দেখেছি। তবে সেই কষ্টের একটা মাত্রা ছিল। আজ তোকে কেমন দেখাচ্ছে জানিস? বাঁচার থেকে মরে যাওয়াকে বেশি ভালো মনে করবি এমন।”

“হয়ত তাই। বেঁচে থেকে আর কী লাভ? আমার জীবনটা পঁচিশেই আটকে গেছে।” 

তিতলির ইচ্ছা হলো উঠে গিয়ে সাইবানের পাশে বসে। পুরাতন দিনের মতন তার কাঁধে হাত রাখে, জড়িয়ে ধরে, শান্তনা দেয়। তবে কোনোটাই সে করলনা। নিজের সোফাতেই বসে রইল। আবারও এক নীরবতা। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে তিতলি বলল, 

“অনুদের কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। তোর জীবন, তোর সিদ্ধান্ত। সেই নিয়ে আমি বাইরের মানুষ কী বলব? তবে একজন বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে বলি, নিজেকে এভাবে হারিয়ে ফেলিস না। ইউ আর সাইবান আলাদিন, ডি জে আলাদিন! জীবনে কত চড়াই উৎরাই পেরিয়েছিস ভুলে গিয়েছিস? হ্যাঁ, এখন তোর ডাউনফল চলছে। তাই বলে আর কোনোদিন যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবিনা সেটার গ্যারান্টি কোথায়? তোকে কেউ কিছুই নতুনভাবে শুরু করতে বলছে না। কিন্তু অন্তত, নিজেকে হারাতে দিসনা জিনি। এইযে, জিনি বলে ডাকি, কেন জানিস? কারণ তুই আমার কাছে আলাদিনের দৈত্যের মতোই। যে তার আশেপাশের মানুষের সব সমস্যা হেসে খেলেই দূর করে দিত। তুই মানুষের ভরসার পাত্র, স্বপ্নের প্রতীক। তুই বহু আগেই দেখিয়ে দিয়েছিস কীভাবে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়! নিজেকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিস যার হকদার একমাত্র তুই। আজ তুই যা কিছু, তোর যা যা আছে, তার সবটার অবদানই একান্ত তোর। নিজের সাফল্য আর অর্জন কোনোদিন ভুলিস না। আর তুই চাইলে ঠিক কী কী করতে পারিস সেটাও মনে রাখিস। এটুকুই বলার ছিল তোকে।” 

তিতলি থেমে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর সোফা থেকে খুব ধীরে উঠে দাঁড়াল। স্কার্টটা হাত চেপে ঠিকঠাক করে নিয়ে বলল, 

“তুই হয়ত আমাদের কেউ না। তোর পরিবারেরও কেউ না। কিন্তু এটুকু জেনে রাখ, তুই আমাদের সবার আপনজন। এমন একটা মানুষ, যার কাছে গেলে আমরা নিশ্চিন্ত হই। তোর উপর নির্ভর করে কত মানুষ নিজেদের হাসি খুঁজে পেয়েছে, জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে! তুই হয়ত সেসব বুঝিসও না। তাই তোর কাছে নিজের জীবনটা এখন অর্থহীন লাগছে। অথচ গভীরভাবে ভাবলে দেখবি, তোর আশেপাশের প্রত্যেকটা মানুষের জীবনই তোকে কেন্দ্র করে ঘোরে। সামিয়া আন্টি, আহমদ আংকেল, সারিকা আপু, অনুরাগ, নীরব, আফনান, এমনকি সুগন্ধাও। সবার সাথে নিজের সম্পর্কের কথাটা চিন্তা করে দেখিস। কত যত্নে আগলে রাখলে তোর ২৫ টা বছরেও সন্দেহ হলোনা তুই ওই বাড়ির কেউ না? এটুকু ভাবলেই নিজের অস্তিত্বের অনেক উত্তর পেয়ে যাবি। আসি রে, যেখানেই থাকিস না কেন, ভালো থাকার চেষ্টা করিস।” 

তিতলি দরজার দিকে পা বাড়াল। দরজা খুলেও ফেলল। তবে শেষ মুহূর্তে পিছন থেকে ডাক ভেসে এলো, 

“তিতলি?” 

ফিসফিসে একটা চাপা কন্ঠ। তিতলি থমকে পিছন ফিরল। সোফায় তখনো একইভাবে বসে আছে সাইবান। মাথাটা আরও ঝুঁকে আছে। পায়ে পায়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল তিতলি। 

“কিছু বলবি?” 

সাইবান এক মুহূর্ত কোনো কথা বললনা। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“তোর সাথে আমি বুঝে হোক বা না বুঝে, অনেক অন্যায় করেছি। অনুভূতি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলনা। আমি জানতাম না এতটা যন্ত্রণা হয়, অনুভূতি দগদগে ঘা হয়ে বুকের মাঝে রয়ে যায়। তোর কষ্টটা অনুধাবন করার পর্যায়ে এসেছি আমি। এখন জানি, তুই যাকে ভালোবাসিস সে তোকে ভালো না বাসলে কেমন লাগে। এই মরম বেদনায় আমি তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছি। তুই এতদিন কীভাবে বেঁচে ছিলি? তাই বলি, তুই আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী রে। অনেক বেশি।”

তিতলির চোখজোড়া ছলছলে হলো। ইচ্ছা করল সাইবানের মুখ তুলে নিজের দিকে ঘোরায়। কিন্তু সেটা না করে সে নিজের ডান হাতটা আলতো করে সাইবানের মাথায় রাখল, জানাল, 

“আমরা দুজনই অবুঝ ছিলাম। ভালোবাসা, প্রেম, অনুভূতি সবকিছু ছেলেখেলা মনে হত। নিজেদের জালে নিজেরাই ফেঁসেছি। তাছাড়া আমার দোষ কম ছিলনা। তোকে পাওয়ার তীব্র বাসনায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেটা আমার ভাগ্যে লিখা হয়নি, সেটা পেতেই মরিয়া হয়ে গিয়েছিলাম। সেটাই আমার ডাউনফলের কারণ।” 

“তোর সাথে আমি অনুভূতি নিয়ে অন্যায় করেছি। আমাকে মাফ করে দিস।” 

“মাফ করলাম। তুইও আমাকে মাফ করিস তোর জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য।” 

“আচ্ছা। মাফ করলাম।” 

এরপর আসলেই আর বলার কিছু থাকেনা। তিতলি একটা ঢোক গিলে সাইবানের কাঁধে অন্তিম চাপড় দিয়ে বলল, 

“ভালো থাকিস। আবারও পুরাতন সাইবান আলাদিন হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসিস। আমরা অপেক্ষায় থাকব।” 

সাইবান আর কিছু বললনা। মাথা নুইয়ে বসে রইল। তিতলি শেষ একনজর তাকে দেখে উল্টো ঘুরে হেঁটে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে। দরজাটা তার পিছনে মৃদু শব্দ তুলে আটকাল। তিতলি চলে যেতেই মুখ তুলে সোফায় এলিয়ে পড়ল সাইবান। ভারী বুকটা কিছুটা হলেও হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, বিবেকের আদালতে চেপে রাখা একটা বোঝা নেমে গেছে। একটু হলেও ভালো লাগছে তার। 

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

ক্ষণে ক্ষণে ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসছে। মেঝেতে বসে পা গুটিয়ে চোখেমুখে ওড়না চেপে কাঁদছে সুগন্ধা। সামিয়া আরামকেদারায় বসে দুলছেন। শারীরিক অবস্থা তার বিধ্বস্তপ্রায়। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। চোখে ঘুমের অভাবে রক্তিম দৃষ্টি। চেয়ে আছেন সিলিংয়ের দিকে। সুগন্ধা তার পায়ের কাছেই মেঝেতে বসে আছে। মেয়েটার কান্নার শব্দে সামিয়ার শীতল অন্তরে অনুভূতির জোয়ার উঠল। আর কেউ বাকি নেই তার, শুধু এই সন্তান বাদে। অজান্তেই কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে সুগন্ধার মাথায় রাখলেন তিনি। বসে যাওয়া গলায় প্রশ্ন করলেন,

“কাঁদছিস কেন পাগলী?” 

সুগন্ধা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, 

“কানমু না? আপনে এমন ক্যান আম্মাজান? যেমনে আমারে কইলেন, তেমনে সবাইরে কইয়া দেন। সবাই আপনারে ভুল বুঝতেছে। সবার সামনে আপনি অপরাধী।” 

মলিন হাসলেন সামিয়া। 

“আমিই তো সবকিছুর মূল রে সুগন্ধা। এটা তো মিথ্যা নয়। আমার জন্যই শুরু হয়েছে যেহেতু, শেষটাও আমার মধ্য দিয়ে হোক?” 

জোরে জোরে মাথা নাড়ল সুগন্ধা। 

“না। আপনারও তো কোনো উপায় ছিলনা। এমন করেন ক্যান সবাই? কেমন ভাইঙা গেল এই পরিবারটা। কিছু করেন না আম্মাজান! আমার কষ্ট হইতেসে।”

হাত বাড়িয়ে সুগন্ধাকে আগলে নিলেন সামিয়া। তার কোলে মাথা রেখে ডুকরে কাঁদতে লাগল সুগন্ধা। সামিয়া তার মাথায় আর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,

“তুই তো আছিসই আমার কাছে। তাতেই নাহয় চলে যাবে আমার।” 

একটু থামলেন তিনি। তারপর ভাঙা গলায় পুনরায় বললেন,

“আমি চাইনা এই অভিশাপ আমার সন্তানদের মতন তোর উপরেও পড়ুক, মা। তোর জীবনটা সাজিয়ে দিয়ে যেতে পারলেই এখন আমার চিরমুক্তি।” 

“না। এমনে কইবেন না, আম্মাজান। কই যাইবেন, আপনি?” 

সুগন্ধার ক্রন্দনধ্বনি আরও বাড়ল। সামিয়ার নিজের চোখের অশ্রু জমল। টপটপ করে পড়ল ঠিক সুগন্ধার মাথার উপর। ঝুঁকে একটা চুমু খেলেন তিনি। বললেন, 

“সবাইকেই তো একদিন না একদিন চলে যেতে হয় সৃষ্টিকর্তার কাছে। আমি নশ্বর মানুষ। সব তো ধ্বসিয়েই দিয়েছি। আমার জন্য তুই আর নিজেকে নষ্ট করিস না।” 

“আপনি যা বলবেন, আমি তাই করমু আম্মা!” 

সামিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে হাহাকার তুলল সুগন্ধা, 

“আপনি যারে বলবেন, তারেই বিয়া করমু! যেভাবে বলবেন, অমনে চলমু। শুধু আপনি কোথাও যাইয়েন না।” 

এত নিবেদনের বিপরীতে সামিয়ার আর কিছু বলা হলোনা। নীরবে সুগন্ধার পিঠ চাপড়ে দিলেন তিনি। 

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

বিমানবন্দরের পরিবেশে রোজকারের ব্যস্ততা। পদচারণা যাত্রী এবং নিরাপত্তারক্ষী সদস্যদের। কোলাহল, মাইক্রোফোনে কিছুক্ষণ পরপর ফ্লাইটের ঘোষণা। সাইবান হাঁটছে আহমদের পিছু পিছু। লাগেজ দুটো টেনে নিয়ে যাচ্ছেন আহমদই। তাদের গন্তব্য চেকিংয়ের দিকে। কিছু ঘণ্টা বাদেই এই দেশ ছেড়ে উড়াল দেবে পিতা এবং পুত্র। এখনো ইমিগ্রেশনের কিছু সময় বাকি আছে। তাই তারা ওয়েটিং চেয়ারে বসল। আহমদ কফি কিনে নিয়ে এলেন। নীরবে সেটায় চুমুক দিল সাইবান। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সে। অদূরে একটি পরিবার দেখা যাচ্ছে। বাবা, মা এবং তাদের ছোট এক ছেলে সন্তান। ছেলেটার বয়স চার কি পাঁচ! একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে বাবার সাথে খুনসুঁটিতে লিপ্ত। ছেলেকে কোলে বসিয়ে অসংখ্য চুমু খাচ্ছেন বাবা। অপরদিকে মা নিজের ফোনে পারিবারিক মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করে রাখছে। দৃশ্যটার দিকে নিগূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সাইবান। নিষ্পলক, দীর্ঘ সময়জুড়ে। 

কাঁধে আহমদের স্পর্শে মনোযোগ ভাঙল তার। 

“চল, সময় প্রায় হয়ে গেল।” 

মাথা দোলালো সাইবান। উঠে দাঁড়াল। অন্তিম একবার তাকাল হাসিখুশি পরিবারটার দিকে। তারপর হাঁটতে শুরু করল পিতার পিছু পিছু। ইমিগ্রেশনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ, 

—বাব্বা! 

জমে গেল সাইবান। সমস্ত শরীরে তরঙ্গ খেলে গেল বুঝি। পায়ের তলায় শিকড় গজাল। জগৎটা চোখের সামনে বুঝি দুলতে লাগল। ঝট করে পিছনে ফিরে তাকাল সাইবান। অথচ তার বুকের ভেতর জমা হওয়া ক্ষীণ আশার আলোটুকু দপ করে নিভে গেল। আশেপাশে কেউ নেই। সবাই নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। তবে ডাকটা কোথা থেকে এলো? সাইবানের অবাধ্য অন্তরের কল্পনা। এছাড়া কিছু নয়। হাত মুঠো করে ফেলল সে, আঙুলে আংটির অস্তিত্ব অনুভূত হলো। ঘুরে দাঁড়াল সে, তখনি আবারও কানে ভেসে এলো ওই ডাক, 

—বাব্বা! বাব্বা! 

এবার আর পারলনা সাইবান। উল্টো ঘুরে দিল দৌঁড়। আশেপাশে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল কিছু একটা। মানুষজন তাকে অবাক চোখে দেখল। আহমদও ছেলের কান্ডে হতচকিত হয়ে গেলেন। দ্রুত কাছে এলেন। কিন্তু সাইবান হুশে নেই। সে মানুষের ভিড়ে খুঁজে চলেছে কাউকে। অবশেষে পেয়েও গেল। অনেকটা দূরে, টার্মিনালের কাছে লাগেজ নিয়ে হেঁটে আসছে চারজনের একটা পরিবার। বছর পাঁচ ছয়ের একটা মেয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। পাশেই বাবা, আর তার কোলে এক শিশুকন্যা। সেই শিশুটিই ‘বাবা বাবা’ করে পিতাকে ডাকছে। মুচকি হেসে তার ডাকের জবাব দিচ্ছে পিতা। সাইবান থমকাল। বুকটা ভেসে গেল জলোচ্ছ্বাসে। আহমদ পিছন থেকে এসে ছেলেকে ধরলেন। 

“কী হয়েছে?” 

“কিছুনা।” 

অস্ফুট জবাব সাইবানের। আহমদ মায়াভরা চোখে সন্তানকে দেখলেন। তারপর কাছে ঘেঁষে বললেন,

“জানি। কষ্ট হচ্ছে। তবুও নিজেকে শক্ত কর। সময় সব ঠিক করে দেবে। আয়।”

এবার আর পিতার বিপরীতে কিছু বললনা সাইবান। দীর্ঘ এক প্রশ্বাস টানল। মনে হলো, যত টান তাকে এই দেশের মাটিতে বেঁধে রেখেছে, সব টানই একটু একটু করে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এক পা এক পা করে এগোল সে, এক এক করে ছিঁড়ল সম্পর্কের সুতো। একটা সময় আর পিছুটান রইল না। কল্পনার কোনো বাবা ডাক তাকে থামাতে পারলনা। পিতার পাশাপাশি হেঁটে ইমিগ্রেশনের দিকে চলে গেল সাইবান। পাড়ি জমালো এক নতুন জগতে। 

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

সময়ের পরিক্রমায় হাজির নতুন একটি দিন। নতুন এক সূচনা। এক মাসের জীবনযুদ্ধে এখনো লড়ে যাচ্ছে এক মা। আজ তার মহাযুদ্ধ। সন্তানের অধিকারের যুদ্ধ। সুন্দর ভবিষ্যতের যুদ্ধ। 

আজ আদালতের চতুর্থ শুনানি। 

সকাল থেকেই ব্যস্ত ইরাম। এমনিতেই সে সারাদিন ব্যস্তই থাকে। আজ একটু বেশিই। রাতে দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে মোটে। ফজরের আজানের সাথে সাথে উঠে নামাজ আদায় করে রান্নাবান্না আর ঘরের কাজকর্ম সেরে ফেলেছে। রাবিয়ার রান্না ছাড়াও টুকটাক কাজ ইরামই করে দেয়। এই যেমন সমস্ত ঘর ঝাড়ু দেয়া, আসবাব মোছা, শুকনো কাপড় ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি। রাবিয়া এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। মেয়েটা দেরীতে ওঠে। কারণ সারারাত কাজ এবং পড়াশোনা করে। নিশাচর সে, রাতের পাখি। দিনে নাকি ঘুমাতেই আরাম। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এমন রাত্রিপ্রিয়তা বেশি কেন ইরাম বোঝেনা। দুপুরের খাবার রান্না করে সব ঠিকঠাক করে রেখেছে ইরাম। রাবিয়া উঠলে নিজে থেকে খেয়ে নিতে পারবে। ইযানকেও গোসল করিয়ে জামা পড়িয়ে তৈরি করে নিয়েছে সে। বাচ্চাকে রেখে যাওয়ার মতন ভরসাযোগ্য স্থান নেই। রাবিয়া মুখে যতই বলুক, মেয়েটা ছোট আর ইরাম হুট করে সারাদিন তাকে বাচ্চার দেখভাল করতে দিতে পারেনা। সুবিধা অসুবিধার ব্যাপার আছে। তাই ইযানকে নিয়েই যাওয়া হবে। আটটার মধ্যেই সমস্ত কাজকর্ম শেষ ইরামের। নিজে জলদি একটা গোসল দিয়ে এসে আলমারির সামনে দাঁড়াল। হৃদয় থমকাল তার ক্ষণিকের জন্য। 

ওই বাড়ির কারো সঙ্গেই ইরামের আর যোগাযোগ হয়না। একমাত্র একজন বাদে। সুগন্ধা। সপ্তাহে একবার ইরাম নিজে থেকে সুগন্ধাকে ফোন করে, খবরাখবর নেয়। সামিয়ার শরীরটা নাকি বিশেষ ভালো যাচ্ছেনা। হাসপাতাল থেকে লম্বা ছুটি নিয়েছেন তিনি। বাসাতেই থাকেন। মায়ের দেখভালের জন্য সারিকা গত সপ্তাহে গিয়েছে ওই বাড়িতে। তারও আগে আরেকটা খবর জেনেছে ইরাম। প্রায় সপ্তাহ তিনেক আগে আহমদ আর সাইবান দুজন বাংলাদেশ ছেড়েছেন। কোন দেশে গিয়েছে, কেউ জানেনা। সুগন্ধাও বিস্তারিত বলতে পারেনি। কারণ বিস্তারিত কেউই জানেনা। সাইবান চলে গিয়েছে, বহু দূরে, ঠিক যেমনটা ইরাম চেয়েছে। বুকের ভেতরের শূন্যতাটা কী দিয়ে মাপা যায়? অজান্তেই আলমারির হাতল শক্ত করে ধরল ইরাম। আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হলো তার। শেষমেষ সত্যিই সব বন্ধন ছিন্ন করে তার আলাদিন চলে গিয়েছে। ইরামের খুশি হওয়া উচিত। ছেলেটা যদি দূরে গিয়ে ভালো থাকে, নিজের মতন নতুনভাবে জীবন সাজাতে পারে, তবে ইরামের অপরাধবোধের বোঝা কমবে। কিন্তু বুকে এমন হাহাকারের অর্থ কী? প্রায় রাতেই সে স্বপ্নে দেখে সাইবানকে। ঠিক সেই মুহূর্তগুলো তার চোখে ভাসে যখন তারা সুখী ছিল। যখন ছেলেটা দুষ্টু মিষ্টি নিবেদনে তার জীবন রাঙিয়ে তুলেছিল। ছেলের জন্য সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটালেও কবে যে সাইবান আলাদিন নামক রগচটা, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষটার হৃদয়ের বাঁধনে ইরাম জড়িয়ে গিয়েছে নিজেও আজকাল ভেবে পায়না। আচ্ছা? এই অনুভূতির শুরু কবে হয়েছিল? যে রাতে সে সাইবানের ভয়াল অতীত জানতে পেরেছিল? নাকি যেদিন ছেলেটা তাকে ভালোবাসি বলতে বলতে পাগল করে তুলেছিল? কোন সময়ে ইরামের স্বার্থান্বেষী অন্তরটা স্বার্থ ভুলে একটুখানি কাছে আসতে চেয়েছিল? ভালোবাসা অনুভব করতে চেয়েছিল? ইরাম বলতে পারেনা। গেঞ্জি গেঞ্জি করতে করতে কবে সে গেঞ্জির প্রেমে পরে গিয়েছে সেটা এক অদ্ভুত রহস্য বটে। প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা ঘণ্টা আর প্রতিটা দিনে ওই ছেলেটার তীব্র অভাববোধ করে সে। গভীর রাতে একলা বসে ছোট্ট ইযানকে নির্ঘুম চোখে ঘুমাতে দেখে। তখন তার মনে হয়, এই বুঝি অন্ধকার থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে সাইবান। নিজের সহজাত দুষ্টুমির হাসি মেখে বলে উঠবে, ‘ঘুমাননি, মাই প্রেশিয়াস? আমার বুকে আসুন। আমি আপনার চোখে ঘুম নামিয়ে আনব।’ কিন্তু সেই কল্পনা কখনো বাস্তব হয়না। সেসব রাতে ইরাম গোপনে লাগেজ থেকে বের করে নেয় একটা পোশাক। কালো ট্যাংক টপ। যেটা গায়ে জড়িয়ে সবসময় ঘুরঘুর করত ছেলেটা। যেটা গায়ে দিয়ে তাকে বডি দেখিয়ে আকর্ষণ করতে গিয়ে আছাড় খেয়ে কপাল ফুলিয়েছিল স্বামী তার। স্মৃতি মনে করে মুচকি মুচকি হাসে ইরাম। তারপর সেই গেঞ্জি ছেলেটার গেঞ্জি বুকে জড়িয়েই চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়ে। মনে হয়, তার বুকের মাঝেই আছে সে। তার সমস্ত অস্তিত্বে মিশে গিয়েছে ওই মানুষটার নাম।

সাইবান আলাদিন। ইরামের আলাদিন।

ইরাম মাথা ঝাঁকাল। জোরপূর্বক চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরাতে চাইল। স্মৃতিগুলো তাকে বড্ড জ্বালায়। কখনো হাসায়, কখনো বা কাঁদায়। সে শুধু একটাই প্রার্থনা করে। ওই মায়াবী বাউন্ডুলে ছেলেটা যেখানেই থাকুক না কেন, যেন ভালো থাকে। অবশেষে আলমারি খুলে ভেতর থেকে একটা গোলাপী রঙের জামদানি শাড়ি বের করে নিল ইরাম। ইযান ইতোমধ্যেই তৈরি। বিছানায় বসে খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলছে। ইরাম ছেলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে শাড়িটা দেখাল। ঠোঁটে মোলায়েম হাসি নিয়ে বলল, 

“এই শাড়িটা তোমার বাবার দেয়া প্রথম উপহার। কী মনে হয় কুচুপু? আমরা জিতবোই আজ, তাইনা?” 

“বাব্বা… আম আম!” 

উত্তেজিত হয়ে দুহাত নাড়ল ইযান। যেন সহমত জানাচ্ছে মায়ের কথায়। ইরাম শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল মুগ্ধভরে। নাহ, ওই মানুষটার ছোঁয়া যখন তার সাথে আছে, তখন সে পারবেই। আজ তাকে পারতেই হবে। 

তৈরি হতে হতে বিল্ডিংয়ের নিচে সি এন জি নিয়ে চলে এলো ইহান। আজ কোর্টে সেই ইরামের সাথে যাচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে নিচে নামল ইরাম। একটু আগেভাগেই যাচ্ছে কারণ আরেক উকিলের সাথে তার আলোচনা আছে। নয়টার আগেই আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছে গেল তারা। বেশ সকাল হলেও চারপাশে ইতোমধ্যে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। ইতিউতি ফাইল হাতে দৌঁড়াচ্ছে কেউ। উকিলদের সাথে কথা বলছে অনেকে। আবার জুনিয়র উকিলরা চাওয়ালার পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে আলাপ আলোচনা করছে। ইহান সামনে সামনে, তার ঠিক পিছনে ইরাম। আশেপাশে বিশেষ নজর নেই রমণী, সে ছেলেকে বুকে চেপে ধীরপায়ে হাঁটছে। হুট করে ঝড়ো একটা হাওয়া বয়ে গেল। শুকনো বালি বাতাসে উড়তে লাগল। সেই ঝাঁপটা থেকে বাঁচাতে ইযানকে নিজের বুকে চেপে আড়াল করে নিল ইরাম। তার খোলা চুলগুলো উড়ল বাতাসে, ছড়িয়ে পড়ল কপালে, আড়াল করে ফেলল চোখের দৃষ্টি। সেই ঝাপসা নয়নে হঠাৎ একটা ছায়া নজরে এলো বুঝি। অবয়বটা পরিচিত। শুকনো মাটিতে কালো ছায়ামূর্তি। খুব কাছে এক নিগূঢ় অস্তিত্ব যেন। বাতাসে চিরচেনা সুঘ্রাণ। কয়েক লহমার জন্য ইরাম সম্পূর্ণ জমে গেল। বুকের ভেতর হৃদপিন্ডের তেজ কেন বাড়ল বুঝতে পারলনা। মায়ের অস্থিরতা টের পেয়ে ইযান তার বুকে নড়চড় শুরু করল। দিগ্বিদিক ভুলে ঝট করে ঘুরে চাইল ইরাম। তার চোখজোড়া হন্যে হয়ে খুঁজল আশেপাশে। কিন্তু সেই ছায়ামূর্তির দেখা মিললনা। যেন ঝোড়ো বাতাসের সাথেই মিলিয়ে গিয়েছে তার অস্তিত্ব। ইরাম ছুটে গেল আশেপাশে, অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করল প্রতিটা চেহারা, প্রতিটা মানুষ। তবে তাকে আশাহত হতে হলো। না, নেই সে। নিশ্চয়ই ইরামের কল্পনা। 

“আপু? কী ব্যাপার?” 

পিছন থেকে ইহান এগিয়ে এলো চিন্তিতমুখে। হাত বাড়িয়ে বোনের শাড়ির ভাঁজে আটকে যাওয়া ধূলিকণা ঝেড়ে দিল। মাথা দোলালো ইরাম, আস্তে করে জানাল, 

“কিছুনা। মনে হলো…কাউকে বুঝি দেখলাম।”

“কাকে দেখেছ? কী না কী কল্পনা করো! সত্যি করে বলো তো, গতকাল রাতে ঘুমিয়েছ?” 

ইরাম এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। অলীক কল্পনা! নিজের বোকামিতে নিজের মৃদু হাসল সে। তারপর পা বাড়াল কোর্টের দিকে। ইহান এগোল পিছুপিছু। ইযান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠল, 

“আম!” 

ইরাম ছেলেকে আঁকড়ে তার গালে চুমু দিয়ে বলল, 

“তোমার আম্মু লড়বে সোনা। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি কুচুপুর আম্মু তার আপনজনদের জন্য লড়ে যাবে।” 

ঝোড়ো বাতাস বয়ে গেল আবারও। তবে এবার আর ইরাম পিছু ফিরলনা। চোখে দৃপ্ত দৃষ্টি ফুটল তার। এখন থেকে তার আর পিছুটান নেই, পিছুপথ নেই। সে এগোবে, ছেলেকে সাথে নিয়ে শুধুই সামনে এগোবে। 

⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─⁠─

আজ কোর্টের জন্য বের হতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছে অরণ্যর। একে তো ঘুমটা ভেঙেছে দেরীতে, উপরন্তু রান্নার লোক রাঁধতে গিয়ে করেছে আরেক ঝামেলা। শেষমেষ অরণ্য সাড়ে নয়টার দিকে দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। হাতঘড়ি লাগাতে লাগাতে লম্বা পায়ে এগোল বাইরের দিকে। গাড়ি অপেক্ষা করছে তার। 

“স্যার?”

কেয়ারটেকারের ডাকে অরণ্য থমকাতে বাধ্য হলো। গলা চড়িয়ে একটা ধমক দিল, 

“কী সমস্যা? যাত্রার সময় পিছু ডাকিস কেন? গর্ধব!”

কেয়ারটেকার শুকনো ঢোক গিলে কাছে এলো। একটা খাম বাড়িয়ে দিল অরণ্যর দিকে। জানাল, 

“কাইল দুফুরে আপনার জন্য এইটা আইসিলো।”

ভ্রু কুঁচকে ফেলল অরণ্য। 

“কাল এসেছে, আজ দিচ্ছিস? শালা! একটাও কাজের না!” 

“আপনে তো বাইত ছিলেন না। রাইতে আইসেন।”

“তো রাতে দিবিনা?” 

“ভুইলা গেছিলাম।”

“ভোল! ভুলে বসে থাক। সর এখন চোখের সামনে থেকে। পরে এসে দেখব।” 

বলেই অরণ্য পা চালিয়ে চলে যাচ্ছিল কিন্তু কেয়ারটেকার ডেকে উঠল,

“আদালত থেইকা আইসে!” 

অরণ্যর পা হড়কাল। দরজার ফ্রেম ধরে নিজেকে ধাতস্থ করল সে। তারপর উল্টো ঘুরে হনহনিয়ে হেঁটে গিয়ে কেয়ারটেকারের হাত থেকে খাম ছিনিয়ে নিল। দ্রুতহাতে খুলল। ভেতরের কাগজের কালো কালিতে টাইপ করাটা তার টানা টানা দু চোখে ভাসল অভিশাপের মতন। এমন এক অভিশাপ, যা পথ ঘুরে তার দুয়ারেই ফিরে এসেছে। 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০

মামলা/ আবেদন নং: ১৩৯/২০২৭

ইরাম কিবরিয়া- আবেদনকারী 

                  বনাম

অরণ্য মির্জা সওদাগর- প্রতিপক্ষ

                            কারণ দর্শানোর নোটিশ

                                  ॥ অর্ধসমাপ্ত ॥

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply