Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২১


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২১

সাইবান হন্তদন্ত হয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। পুরাতন ম্যাঁড়ম্যাড়ে কাঠগুলো অস্বাভাবিক শব্দ করছে। তবে আজ থামার কোনো বালাই নেই। আজ সে থেমে গেলে হয়ত জীবনটাই থমকে যাবে। মুন্সীবাড়িতে ইরামের ঘরটা দুই তলায়। একদম বারান্দা ঘেঁষে ছোট্ট একটা রুম। সাইবানের দমবন্ধকর জীবনের একটিমাত্র শান্তির আশ্রয়। ছুটতে ছুটতে সদ্য ১৮ তে পা দেয়া সাইবান গিয়ে পৌঁছল ইরামের রুমে।

রুমটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। লাইট জ্বালানো হয়নি বিধায় কেমন গুমোট হয়ে আছে। বাইরের রাস্তার লাইটের মৃদু আলো এসে ভেতরটাকে কেমন বিষন্ন করে তুলেছে। ঘরের সীমিত আসবাব এবং তৈজসপত্র পরিপাটি করে রাখা। কোথাও কোনো হেরফের নেই। পাগলা ঘোড়ার মত ছুটতে থাকা হৃদযন্ত্র সামলে সাইবান ভেতরে ঢুকল। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার পর দৃশ্যটা নজরে এলো তার। বিছানার উপর একটি ছায়ামূর্তি। এই গরমের মাঝেও গায়ে কাঁথা চড়িয়ে মরার মত পরে আছে। ওটা ইরামই, বুঝতে স্পর্শের প্রয়োজন নেই সাইবানের। ওই অস্তিত্বের ঘ্রাণটুকুও তার ভীষণ চেনা।

“ইরাম আপু!”

হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল সাইবান। ধীরপায়ে প্রবেশ করল ভেতরে। কোনো নড়চড় নেই। আরেক দফায় ডাকল সে।

“আপু?”

এবার সামান্য নড়াচড়া লক্ষ্য করা গেল। ইরাম উঠলনা। শুধু গায়ের কাঁথাটা আরেকটু উপরে টেনে তুলল। মৃদু গলায় উত্তর করল,

“তুমি কাল আসো, আলাদিন। আপু একটু রেস্ট নিচ্ছি।”

“আপু, আপনার সাথে আমার জরূরী কথা আছে, প্লীজ।”

সবসময় ইরামের কথা ভীষণভাবে মান্য করলেও আজ সাইবান কিছুই শুনলনা। আজ পিছিয়ে যাওয়া যাবেনা। কিছুতেই না। রুমের লাইট অন করে দিল সে। ইরাম কাঁথা সরিয়ে উঠে বসল। চোখমুখ কুঁচকে অনেকটা বিরক্তি এবং চাপা ক্ষোভ নিয়ে দেখল সাইবানকে। ছেলেটার মুখটা কেমন চুপসে আছে। হলদেটে চেহারায় কেমন উদ্ভ্রান্ত ভাব, আতঙ্কিত অভিব্যক্তি।

“আমায় একটু বলে দিন না, আমি এখন কি করব? আমার কিছুই ভালো লাগছেনা।”

ইরাম নিজের কপাল ঘষল। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেষমেষ বলল,

“সেই এক কাহিনী? আলাদিন, আর কতদিন গোলগোল ঘুরতে থাকবে তুমি? প্লীজ, আপু বলছি তো। তুমি যাও। আমি পরে তোমার সাথে কথা বলব।”

“না। আজকেই! আপু আপনাকে আজকে, এই মুহূর্তে আমার কথা শুনতেই হবে। আমি আপনার ভাই না? আমি আপনার কাছে রাহাত, ইহানের মত গুরুত্বপূর্ণ না? ওরা আসলেও কি আপনি একই কথা বলতেন? যে কালকে আসো?”

সাইবান হঠাৎ করে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠল। ইরামও ঝট করে রেগে গেল। এই ছেলেটা তার সঙ্গে এমন কেন করছে? বিছানা ছেড়ে সটান উঠে দাঁড়াল সে,

“কি বললে তুমি? ওদের সাথে নিজের তুলনা দিচ্ছ? কোনোদিন তোমাদের মধ্যে আমি পার্থক্য করেছি, আলাদিন? ইউ নো হোয়াট? ইয়েস! তুমি আমার ভাই না! তুমি আমার কাজিন! নাউ গেট লস্ট!”

ক্ষণিকের জন্য জমে গেল সাইবান। তার মায়াবী কালো চোখজোড়া টলটলে হয়ে উঠল অশ্রুতে। ইরাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় চোখে দেখতে পেলনা কিছুই। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল রমণী। একটা ফ্যাকাশে হলদেটে কামিজ পরনে, বোঝাই যাচ্ছে বহুদিন যাবৎ যত্ন সহকারে ব্যবহার করা হচ্ছে।

“আপু আপনি ভীষণ স্বার্থপর!”

একেবারে হঠাৎ করেই হুংকার দিয়ে উঠল সাইবান। তার কথার বিপরীতে সবসময় শান্তভাবে মোকাবেলা করলেও আজ ইরামও পাল্টা ঝাঁঝ নিয়ে বলল,

“হ্যাঁ! আমি স্বার্থপর! এটা আজকে বুঝেছ তুমি? আই অ্যাম সেলফিশ আলাদিন। টু মাচ সেলফিশ!”

“রাইট! আপনি শুধু সবসময় নিজের চিন্তাই করেন। নিজের ভাইদের চিন্তাই করেন। বাকি দুনিয়ার মানুষ গোল্লায় যাক, আপনার কিচ্ছু যায় আসেনা। ওরা সকলে আপনার আদরের, সকলে আপনার কাছের। শুধু আমি কোনোদিন আপনার আপন কেউ হতে পারলাম না। আমার জন্য কেউ ভাবে না! আপনিও না! ইউ আর….ফাকিং প্যাথেটিক!”

“অ্যান্ড ইউ আর অ্যান অ্যাটেনশন সিকিং ইমম্যাচিওর! তুমি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও, এক্ষুণি!”

“ইরাম আপু, প্লীজ একবার আমার কথাটা শুনুন!”

“চোখের সামনে থেকে দূর হতে বলেছি তোমাকে!”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

দেয়াল ঘেঁষে থাকা সোফায় বসে আছে সাইবান। তার হাত দুটো কপালে ঠেকানো, কনুই হাঁটুর উপর। চোখজোড়া বুঁজে আছে, দগদগে ঘা এর মতন লেপ্টে থাকা স্মৃতিগুলো আজ তাকে ভীষণ জ্বালাতন করছে। সেই দিনটির কথা স্মরণে আসছে। যে দিনটার পর সে আর কখনো ইরামের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়নি। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় সেদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আজ বোধ হয় সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল নতুনভাবে। সাইবানের একটুও ব্যথা লাগেনি। শারীরিক যন্ত্রণা বলতে কিছু তার অনুভূত হয়নি। শুধু অন্তরটা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। জগতের সবথেকে অসহায় হওয়ার অনুভূতিটা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। অতীতের বেড়ি বুঝি নতুন করে তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরতে চাইছে।

ঠিক এমন সময়েই নিজের কাঁধে একটি চিরচেনা স্পর্শ অনুভব করল সাইবান। সে একচুল নড়লনা। অথচ মমতাময়ী বাহুজোড়া তাকে টেনে নিজের বুকে ঠেকাল। অবশেষে হাল ছাড়ল সাইবান। একটি কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে জননীকে আঁকড়ে ধরল শক্তভাবে। কোনো কথা বললনা। শুধু সামিয়ার কাঁধে মাথা রেখে চুপটি করে বসে রইল। সামিয়া ছেলের পিঠে, মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিলেন। নিজের অস্তিত্ব দিয়ে শান্ত করতে চাইলেন। সাইবানের মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে নরম গলায় বললেন,

“কিছু মনে করিস না মাই চ্যাম্প। ইরামের আসলে মাথা ঠিক নেই। কোনো মা কি পারে নিজের সন্তানকে কষ্টে দেখতে? মেয়েটা ভীষণ মানসিক চাপে আছে রে। তুই রাগ করিস না। তোর সঙ্গে এমন কিছু হতে দেখলে আমিও সইতে পারবনা। ইচ্ছা হবে কিছু একটা ধ্বংস করে ফেলি। সেখানে ইযান তো ৪ মাসের নাজুক বাচ্চা!”

“মম, কথা বলো না প্লীজ। আমাকে একটু চুপটি করে তোমার বুকে মিশে থাকতে দাও।”

ফিসফিস করে বলল সাইবান। সামিয়া তৎক্ষণাৎ চুপ করে গেলেন। ছেলেকে আরও শক্তভাবে নিজের মাঝে আগলে নিলেন। সাইবান সামিয়ার কাঁধে মাথা গুঁজে চোখ বুঁজে চুপটি করে বসে থাকল। শুধু হাসপাতালের কেবিনের মেডিকেল যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জনে নীরবতার মাঝে অল্পবিস্তর ছেদ পড়ল।

জায়গাটা ইযানের প্রাইভেট কেবিন। বিছানায় শুয়ে আছে ছোট্ট শিশুটি। স্যালাইন বন্ধ করা হয়েছে আপাতত। পরে আবার দেয়া হবে। সময়টা এখন রাত। সামিয়া অনেক জোরাজুরি এবং রীতিমত যুদ্ধ করে সারিকার সাথে ইরামকে বাড়ি পাঠিয়েছেন দুই ঘণ্টার জন্য। ফ্রেশ হয়ে, পোশাক বদলে, খাওয়া দাওয়া করে আবার চলে আসবে। কিন্তু সামিয়া জানেন, ইরাম দুই দন্ডও শান্তিতে বাড়িতে থাকবেনা। হয়ত এর মধ্যেই আবার ফিরে আসছে। কে বলতে পারে কত সময় পেরিয়েছে? বর্তমানে তিনি এবং সাইবান বসে আছেন কেবিনের সোফায়।

নীরবতা ভেঙে সাইবান হঠাৎ বলে উঠল,

“সবকিছু আমার দোষ, তাইনা মম?”

সামিয়া জমে গেলেন। ছেলের মাথা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বললেন,

“কে বলেছে তোকে?”

“কেউ বলেনি। আমি জানি।”

“ভুল জানিস তুই।”

সামিয়া আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তবে পারলেন না। মৃদু ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো কেবিনজুড়ে। বিছানার উপর ইযানের ছোট্ট শরীরটা নড়েচড়ে উঠেছে। চোখমুখ কুঁচকে কান্নার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। ব্যান্ডেজ করা হাত তুলে নাড়ছে ভীষণভাবে। সাইবান মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজের ছাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ উঠে গেল। বিছানার কাছে গিয়ে ঝুঁকল। নিষ্পাপ শিশুটির ছটফটানি লক্ষ্য করে তার বুকে সুনামি বয়ে গেল। হাতটার দিকে যতবার চোখ যাচ্ছে, ততবার অপরাধবোধে তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। একটি আঙুল তুলে সে ইযানের গাল ছুঁয়ে দিল। নরম গলায় বলতে গেলে গলা কাঁপল তার,

“হে..হেই.. পোটলা। মিসড ইওর পার্টনার ইন ক্রাইম?”

স্বভাবসুলভ উৎফুল্ল কন্ঠে বলার চেষ্টা করলেও কেমন যেন বিষন্ন শোনাল সবটা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেলল সাইবান। ইযানের মাঝে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই আজ। অন্যান্য সময়ের মত চোখ মেলে তাকে দেখছেও না। শুধু ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কষ্ট হচ্ছে তার। সাইবানের চোখজোড়া চকচকে হয়ে উঠল। অনিশ্চিতভাবে হাত এদিক সেদিক বাড়ালেও সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলনা কি করবে। কি করলে ইযান শান্ত হবে।

“আপু…ইরাম আপুকে ডাকো। মম? মম আপুকে…”

“তুই পারবি।”

সাইবান বিহ্বল হয়ে বলছিল কিন্তু সামিয়া তার পিঠে হাত রেখে সেই কথা থামিয়ে দিলেন। আশ্বাসরূপ বললেন,

“তুই ওর বাবা সাইবান।”

—বাবা।

শব্দটা বুঝি গোত্তা খেল সাইবানের হৃদয়ের দুয়ারে। সামিয়া সবটাই লক্ষ্য করলেন। অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে তিনি পরিস্থিতি সামলাতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,

“তুই কখনো ওর সাথে স্কিন টু স্কিন ট্রাই করেছিস?”

সাইবানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“স্কিন টু স্কিন? সেটা কি?”

মৃদু হাসলেন সামিয়া। বিছানার কাছে গিয়ে বসলেন। অত্যন্ত সাবধানে ছটফট করতে থাকা ইযানকে সাবধানে তুলে নিতে নিতে ব্যক্ত করলেন,

“স্কিন টু স্কিন হলো বাচ্চার সঙ্গে বাবা মার বন্ডিংয়ের জন্য একটা দারুণ পদ্ধতি। একটা নির্দিষ্ট সময় সরাসরি ত্বকের সঙ্গে ত্বকের স্পর্শ। মানে, বাচ্চাকে বুকে ধরে রাখা, বা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকা। এতে বাচ্চার বডি টেম্পারেচার ঠিক থাকে। পাশাপাশি ওরা যেহেতু সেনসিটিভ হয়, স্কিন কন্ট্যাক্ট হলে ওরা সহজেই মানুষ চিনতে পারে। বিশেষ করে বাবা, মাকে। তোকে আমি শিখিয়ে দিচ্ছি, চেষ্টা কর।”

সাইবান সামিয়ার কথা অনুযায়ী কাজ করল। ধীরে ধীরে নিজের পরনের শার্টের বোতামগুলো খুলে বুক উন্মুক্ত করে নিল। সোফায় হেলান দিয়ে বসল সে। সামিয়া সাবধানে ইযানকে ধরে সরাসরি তার বুকের উপর রাখলেন। সাইবানের উষ্ণ ত্বকের ছোঁয়া পেতেই ইযানের ফোঁপানো ক্রমশ মিইয়ে এলো। তার বুকের উপর হাত পা ছড়িয়ে এলিয়ে রইল নিশ্চুপ হয়ে। সাইবান ভীষণ রকম অবাক হলো। এতটা সহজ ছিল এই ছেলেকে শান্ত করা? বিশ্বাস হতে চাইলনা তার। একটি হাত তুলে অতি সন্তপর্নে সে রাখল ইযানের পিঠের উপর।

“আ..উম।”

আরামবোধক এক গোঙানি তুলে চোখ বুঁজে ফেলল ইযান। সাইবানের চোখজোড়া প্রসারিত হলো, তাতে জ্বলজ্বল করে উঠল অব্যক্ত কিছু। পরক্ষণেই তার বিষন্ন চেহারায় এক মায়াবী হাসি ফুটল। সামিয়া অবধি অবাক হয়ে গেলেন। মনে হলো কত বছর যাবৎ ছেলেকে তিনি এভাবে হাসতে দেখেননি। সাইবান ইযানকে নিজের বুকে আরও ঠিকঠাকভাবে শুইয়ে আগলে ধরে রাখল। এক হাতে তার পিঠ আলতোভাবে চাপড়ে দিতে লাগল। সামিয়া একটি ঢোক গিললেন, তার চোখে কেন অশ্রু জমছে জানেন না। তাই দ্রুত বললেন,

“আমি একটি বাইরে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে আসছি। তুই থাক ওর সাথে।”

তিনি আর দাঁড়ালেন না। কেবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। সামিয়া চলে যেতেই গোটা কেবিনে শুধু সাইবান আর ইযান রয়ে গেল। সোফা থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল এবার সাইবান। তার বুকে লেপ্টে থাকা ছোট্ট মানুষটিকে জগতের সবথেকে মূল্যবান কিছু মনে হচ্ছে তার কাছে। একটু এদিক সেদিক হলেও বুঝি কাদামাটির ইমারতের মত ভেঙে পড়বে সবকিছু। ইযান গভীর শ্বাস টানছে। ঝুঁকে সাইবান গুণেও দেখল, সাধারণ প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের চাইতে অনেক বেশিবার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয় ছোট বাচ্চারা। চোখ দুটো আর বুঁজে নেই ইযান। চুপটি করে পিতার বুক ঘেঁষে বুঝি সে তার হৃদযন্ত্রের স্পন্দন শুনছে। সাইবান অজান্তেই ইযানকে দোলাতে লাগল।

“আমার পোটলা।”

“কুই!”

ইযান সঙ্গে সঙ্গে সাইবানের বুকে হাত ঠুকে প্রতিবাদ জানাল। ডাকটা চিনে গিয়েছে নাকি? মুচকি হাসল সাইবান। কিন্তু যখন ব্যান্ডেজ জড়ানো হাতটা দেখল, তখন আলতো করে আঙুলের ডগায় সেটি তুলে নিল। ঝুঁকে এসে সেই হাতের উপর নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে সে ফিসফিস করে বলল,

“বাবা খুব সরি।”

“আআ…?”

“উম হুম। পোটলার জন্য বাবার এত কষ্ট কেন হচ্ছে বল তো? সুস্থ হয়ে যাওয়া যায়না তাড়াতাড়ি?”

ইযানের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে রইল সাইবান। জানালা গলে আসা শীতল বাতাস ছুঁয়ে গেল উভয়কে। ছেলেকে বুকে আগলে রেখে সাইবান ধীরে বিছানার উপর আধশোয়া হয়ে বসল। বুকের উপর শুয়ে থাকা ইযানের পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে একদম অস্বাভাবিকভাবেই আলতো আঁচে সুরে সুরে সে গেয়ে উঠল,

“আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে শেখালে

তুমি জীবনের পথ চলা

নিজে না খেয়ে তুমি খাওয়ালে

শেখালে কথা বলা~

ইযানের চোখজোড়া ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে এলো। ছোট্ট একটা হাই তুলে সে লেপ্টে গেল সাইবানের বুকে। সমস্ত কেবিনজুড়ে মৃদু কণ্ঠের গুঞ্জরণ খেলে চলল, ঐন্দ্রজালিক মায়ার মতন,

“বাবা, তুমি আমার যত খুশির কারণ

বলো তোমার মতো করবে কে শাসন?”

সাইবান নরম গলায় গেয়ে গেল, যতক্ষণ না ইযানের ছোট শরীরটা তার বুকে সম্পূর্ণরূপে শিথিল হয়ে ঘুমের জগতে পাড়ি দিল।

কেবিনের বাইরে থেকে সমস্ত দৃশ্যটা চোখ মেলে নিঃশব্দে দেখে গেল ইরাম।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রাত ক্রমশ গভীর হলো। ইযান ঘুমে আচ্ছন্ন। ইরাম ছেলের পাশেই শুয়েছে। চুপটি করে চেয়ে আছে জানালা দিয়ে বাইরের তারাভরা আকাশের দিকে। সাইবান নিশ্চুপ বসে আছে সোফায়। কেউই কারো সাথে একটা কথাও বলছেনা। কিছুক্ষণ আগে বাসায় ফিরে গিয়েছেন সামিয়া। এখন ছেলের সাথে আছে শুধু ইরাম এবং সাইবান। কতক্ষণ গাঢ় নীরবতায় কাটল কেউই বলতে পারবেনা। অবশেষে মুখ খুলল সাইবান,

“অভিমান করেছেন?”

ইরামের তরফ থেকে জবাব এলোনা। আগের মতোই চুপটি করে শুয়ে আছে। তার পিঠ সাইবানের দিকে।

“দরকার হলে আরও একটা চড় মারুন, তবুও আমার সঙ্গে কথা বলুন, প্লীজ।”

সাইবান নীরব আর্জি জানাল বুঝি। ইরাম এবার আর শুয়ে থাকতে পারলনা। বিছানায় উঠে বসে পা ঝুলিয়ে তাকাল সামনের দিকে।

“তোমাকে চড় না, তোমাকে ধরে কাঁচা চিবিয়ে ফেলা উচিত।”

মুখ তুলে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে অপরাধী ভঙ্গিতে তাকাল সাইবান। ইরাম ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিত হয়ে বিছানা থেকে নেমে এলো। পায়ে পায়ে এগিয়ে সোফায় বসে থাকা সাইবানের মুখোমুখি দাঁড়াল।

“তুমি কি কোনোদিন শুধরাবে না, আলাদিন? তোমার কি মনে হয় তোমার থাপ্পড় দিয়ে আমি মজা পেয়েছি? আই ডোন্ট কেয়ার তুমি আগে কেমন ছিলে, কিন্তু এখন তুমি একা না সেই জিনিসটা তোমাকে বুঝতে হবে, নিজের দায়িত্ব উপলব্ধি করতে হবে। তোমার সঙ্গে তোমার স্ত্রী আর তার বাচ্চার জীবনটাও জড়িয়ে আছে তুমি জানো না? বোঝো না? সেখানে তুমি গিয়েছিলে এক ছাত্রনেতার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে? আমি বুদ্ধিহীন? আমি বুঝিনি ওইদিন কার সাথে মারামারি করে ফিরেছ তুমি?”

ইরামের সমস্ত বকুনি চুপচাপ হজম করে যেতে লাগল সাইবান। রমণী যথাসম্ভব নিজের কন্ঠ নিচু রাখার চেষ্টা করছে, তবুও মাঝে মাঝেই গলা চড়াও হয়ে উঠছে,

“রাজনীতি কি খারাপ জিনিস তুমি জানো না? দুধের বাচ্চা তো তুমি না। এই এক রাজনীতি মানুষের জীবন এক সেকেন্ডে ধ্বংস করে দিতে পারে। বখতিয়ার আজ তোমার স্ত্রী সন্তানের উপর হামলা করেছে, আগামীকাল রাস্তায় পেলে তোমার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যাবে। আমি, তোমার পরিবার কেউ কিচ্ছু করতে পারবেনা। একদিন দুইদিন আলোচনা হবে, ফলাও করে আসামী ধরাও হবে। বছর দুই বছর মামলা চলবে তারপর জোর খাটিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় লাগিয়ে খালাস দিয়ে দেয়া হবে। তাই চাও তুমি? হ্যাঁ?”

“বখতিয়ার?”

ইরাম এতকিছু বলেছে অথচ সাইবানের মাথায় ঢুকল শুধু ‘বখতিয়ার’ নামটা। সিলেটে খবর পাওয়ার সাথে সাথেই সে চলে এসেছে ঢাকায়। এসে থেকে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগও পায়নি কি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে। ইরামের মুখে নামটা শুনে সাইবানের চেহারা হঠাৎ করে আগ্রাসী বর্ণ ধারণ করল। ঝট করে তাকাল সে রমণীর মুখপানে। ইরামের মনে হলো, সে বুঝি সাইবানের চোখে আগুনের ফুলকি ভাসতে দেখেছে। সটান উঠে দাঁড়াল বান্দা,

“বখতিয়ার করেছে এসব? আপনি কীভাবে জানলেন?”

ইরাম খানিক ভ্যাবাচেকা খেয়ে ইহানের কথাটা খুলে বলল। সব শুনে সাইবানের হাতের মুঠো ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল। তারপর হঠাৎ করেই তার ঠোঁটজুড়ে ভয়ানক অশুভ এক হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সেকেন্ডের ভেতর একজন মর্মাহত পিতা থেকে এক অজানা দানবে রূপান্তরিত হয়ে গেল সে। নিজের মাথার চুল টেনে ধরল সাইবানের, পাগলের প্রলাপের মত হাসতে হাসতে বলে উঠল,

“ওহ মাই গড! বখতিয়ার! রাইট! মাদারফাকিং বাস্টার্ড! ওর কবরের ফলকে আমি এটাই খোদাই করব।”

ইরাম আঁতকে উঠল।

“না! আলাদিন! আমি না বলেছি!”

“হাহাহা…আপনার কথা আমি কেন শুনব? আমি শুধু বখতিয়ারের কথা শুনব। ওর গলা চেপে ধরে নর্দমার পানিতে ডুবিয়ে মা*রার সময় ও কেমন চিৎকার করে সেটা শোনার দারুণ ক্রেভিংস হচ্ছে আমার!”

“আলাদিন!”

“হুশ! একদম চুপ!”

অত্যন্ত রুক্ষভাবে ইরামের ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরল সাইবান। অতঃপর হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে বিছানায় ফেলে দিল। হতভম্ব অর্ধাঙ্গিনী তার বিস্তারিত নয়নে দেখল এক রুদ্রমূর্তিকে। সাইবান ঝুঁকে এসে ইরামের দুপাশে দুই হাত রেখে খড়খড়ে গলায় বলল,

“দুনিয়া চেনেন দুনিয়া? আপনারা আমার দুনিয়া! আর আমার দুনিয়ায় যারা হাত দেবে, তাদের আল্লাহর দুনিয়া থেকে সমূলে উপড়ে ফেলে দেব আমি।”

আরেকটু কাছে ঝুঁকে সে অশনি সংকেতের মতন ফিসফিস করে বলল,

“কালকে রাস্তায় আমার পেটে ছুরি মা*রতে আসার আগে ওদের বুকে ছুরি মা*রব আমি। আমি আপনার জেনারেশনের ভদ্র সুশীল স্বপ্নের পুরুষ না, আমি উত্তাল জেনারেশন জি। আই ডু ভায়োলেন্স, আই ইট ভায়োলেন্স, আই রিড ভায়োলেন্স অ্যান্ড আই লিভ ফর ভায়োলেন্স!”

আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালনা সাইবান। হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেল কেবিনের বাইরে। পিছনে বিছানায় পরে থাকা হতবিহ্বল ইরাম নিজের বুক চেপে ধরল। তীব্র ক্রোধ এবং হতাশায় সমস্ত মুখ লাল হয়ে উঠল তার।

কেবিনের বাইরে বেরিয়েই লম্বা পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল করল সাইবান। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই গুরুগম্ভীর গলায় আদেশ ছুঁড়ে দিল,

“সবাইকে খবর দে অনুরাগ, নামরদটাকে রাতের আকাশে সূর্য দেখাব আমি। এলাকায় হয় পঙ্গু শরীর থাকবে ওর, নাহলে কবর! রাজনীতির আব্বাকে চেনে ও, আজকে বোঝাব ওই আব্বার চেহারা দেখতে আমার মতন!”

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply