Golpo romantic golpo মিস্টার মাংকিম্যান

মিস্টার মাংকিম্যান পর্ব ৭


পর্ব ৭

লেখিকাঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা

মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মচমচে শব্দে মুখরিত হল নিয়তিদের বাড়ির উঠোন। শাহরিয়ার সাহেব গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করলেন। উনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছেন। স্ত্রী-কে ড্রাইভিং সীটের পাশে বসিয়ে গাড়ি চালাতে বেশ আনন্দ পান তিনি।

নীলা ভিডিও কলে কথা বলছেন স্বপ্নিলের বড় বোন অর্নি-র সাথে। অর্নি সপরিবারে কানাডায় থাকে। কানাডার সময়ের সাথে বাংলাদেশের সময়ের বিস্তর তফাত। তবুও আজ ছোট ভাইয়ের কনে দেখার এই বিশেষ মূহূর্তে অর্নি ভিডিও কলে যুক্ত না হয়ে পারল না। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তার প্রাণোচ্ছল কণ্ঠ ভেসে এলো,

-স্বপ্নিলের বিয়ের তারিখটা জাস্ট ফাইনাল হতে দাও মা, আমি জিসান আর বাচ্চাদের নিয়ে নেক্সট ফ্লাইটের টিকিট কেটে ফেলব। এক সপ্তাহ আগেই চলে আসব বাংলাদেশে। তা বানরটা কোথায়? মুখখানা একটু দেখাও দেখি?

-এই দেখ!

নীলা মৃদু হেসে ফোনের ব্যাক ক্যামেরাটা পেছনের সিটে তাক করলেন। সাথে সাথে স্বপ্নিল দু হাত দিয়ে নিজের মুখটা একদম লাজুক মেয়েদের মত ঢেকে ফেলল। কাঁধ দুটো সামান্য ঝাঁকিয়ে মেয়েদের মতো ন্যাকামি করে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

-নাআআ… আমার শরম করে!

-নাটক বন্ধ কর, বানর জানি কোথাকার!
অর্নি ওপার থেকে ছোট ভাইয়ের কাণ্ড দেখে হেসে কুটিকুটি!

স্বপ্নিল এবার মায়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মুখের সামনে ধরল। অর্নি স্ক্রিনে ভাইয়ের পরিপাটি সাজ দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-ওরে বাবা! বানর আজ নায়ক সেজেছে দেখি। তা ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছিস নাকি? বুক ধুকপুক করছে?
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে? দেখিস কনে দেখার আসর ফেলে আবার পালিয়ে আসিস না।

স্বপ্নিল এক মুহূর্তের জন্য গলার স্বর গম্ভীর করে মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে বলল,

-হুহ! আরিয়ান স্বপ্নিল চৌধুরী পালায় না।

অর্নি ওপার থেকে কুঞ্চিত ভ্রুঁ নিয়ে বলল,

-ডায়লগটা কই যেনো শুনেছিলাম!

আসিফ এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। এবার সে স্বপ্নিলের গায়ের ওপর সামান্য ঝুঁকে ক্যামেরার দিকে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,

-আপু, শেখ হাসি…

আসিফের কথা শেষ হবার আগেই স্বপ্নিল ওর জল্লাদের মতো শক্ত হাত দিয়ে আসিফের মুখটা চেপে ধরল। অর্নিকে বলল,

-আরে আপু! এটা আমার আইডলের বিশ্বসেরা ডায়লগ। কপিরাইট ফ্রি!

অর্নি আরও ক্ষণিককাল হাসল। পরমুহূর্তেই উপদেশ দেবার মত করে বলল,

-শোন স্বপ্নিল, পাত্রীপক্ষের সামনে একদম ভদ্র হয়ে থাকবি। মেয়েটার সাথে খুব নরমভাবে কথা বলবি। কোনো ধরনের পার্সোনাল প্রশ্ন ভুলেও জিজ্ঞেস করবি না। পাস্ট নিয়ে তো অবশ্যই না! কোনো প্রকারের বান্দ্রামি করবি না কিন্তু বলে দিলাম..

স্বপ্নিল মাথা চুলকে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই আসিফ স্বপ্নিলের হাতের নিচ থেকে মুখটা কোনোমতে বের করে আবার বলে উঠল,

-কী যে বলো না অর্নি আপু! স্বপ্নিল তো এসবে একদম এক্সপার্ট! পুরো লেডি কিলার রোমিও! পাক্কা প্লে বয় রোমিও! ফ্লার্টিং মাস্টার রোমিও।

স্বপ্নিল এবার আর সহ্য করতে পারল না। আসিফের পিঠের ওপর একটা জম্পেশ কিল বসিয়ে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল,

-থেকে থেকে এফ এম রেডিওর মতো বেজে উঠছিস কেন, হারামি? চুপ কর না!

সামনের সিট থেকে শাহরিয়ার ওসমান চৌধুরী এবার বেশ ভারী গলায় বললেন,

  • এসব কি ভাষা স্বপ্লিল? আর এখন ফোন রাখো।আসলাম সাহেব এদিকেই আসছেন।

স্বপ্নিল অর্নিকে চোখ টিপ মেরে বলল,

  • কোর্ট অর্ডার এসেছে আপু, রাখি তাহলে। পরে কথা হবে।

ভিডিও কল কেটে ফোনটা মায়ের হাতে ফেরত দিয়ে দিল সে। শাহরিয়ার সাহেব ইতোমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে গেছেন। এই মাত্র নীলাও নেমে গেলেন। আসলাম সাহেবের সাথে এখন তাদের কুশলাদি চলছে।

স্বপ্নিল গাড়ি থেকে নামার ঠিক আগ মূহূর্তে আসিফের দিকে তাকাল। খুবই বিনয়ের সুরে বলল,

-বন্ধু একটু শুন না!

আসিফও আগ্রহভরে কিছুটা ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,

-কি? বল না!

স্বপ্নিল এক মুহুর্ত দেরী করল না। খপ করে আসিফের ঘাড় ধরে মাথা টেনে নিজের দিকে নিয়ে আসল। ওর ঠিক নাক বরাবর বড় করে ‘হা’ করল। মুহুর্তের মধ্যে স্বপ্নিলের মুখের গরম বাতাস আছড়ে
পড়ল আসিফের মুখে।

আসিফ দাঁত মুখ খিচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

  • এই শালা, কি করতেছিস এসব?

স্বপ্নিল ভ্রুঁ কুঁচকে জানতে চাইল,

-মুখে গন্ধ আছে?

  • কেন রে হারা*মী? পাত্রীকে আজকেই কিস করবি না-কি?
  • আরে বল না!
  • না, নেই। ঘাড় ছাড় আমার। ছাড় বলছি!

স্বপ্নিল কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল,

-ক্লোজ’আপ দিয়ে দাঁত মেজে এসেছি। দুর্গন্ধ বেরুলে কাছে আসার গল্প অসমাপ্ত হবে।

আসিফ হাত দিয়ে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,

-তুই জীবনেও শুধরাবি না, স্বপ্নিল।

গাড়ির দরজাটা খুলতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল স্বপ্নিল।
আসিফকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

-ওই! ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি রে? গাড়িটা কেমন যেন কাঁপছে মনে হলো!

আসিফ স্বপ্নিলের এই অপ্রস্তুত দশা দেখে হো হো করে হাসতে লাগল।

-কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে না। তোর নিজের হাটু কাঁপতেছে!

স্বপ্নিল ঝেড়ে মুছে মাথা নেড়ে আসিফের কথা অস্বীকার করল। মুখের চতুর হাসিটা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,

-মোটেও না!

পরক্ষণেই আবার সামান্য চিন্তিত স্বরে বলল,

-একটু নার্ভাস অবশ্য লাগছে। প্রথমবার পাত্রী দেখতে যাচ্ছি তো!

আসিফ স্বপ্নিলকে একটা চাপড় মেরে মুরুব্বিদের ন্যায় বলল,

  • আরে, একবার বিয়ে টা করে ফেল, দেখবি নার্ভাসনেস পালিয়ে যাবে।

স্বপ্নিল মাথাটা জোরে ঝাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে বলল,

-একবার বিয়ে করবে তোর নানা!

আসিফ বোকার মতো মাথা চুলকে বলল,

-আমার নানা তো একবারই বিয়ে করছিল। নানি ছাড়া তার জীবনে আর কেউ ছিল না।

স্বপ্নিল এবার পাঞ্জাবিটা ঠিক করতে করতে দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল,

-শোন, কিছু কিছু মানুষ সুন্নাহও পূরণ করে। আমিও করব। চার বিয়ে! ওই যে মাছনা, সালাসা, রুবাআ নি কিসব আছে না? চার চারটা বউয়ের একমাত্র জামাই হব আমি। ভাবা যায়? একজন পা টিপে দিবে, আরেকজন হাত টিপবে, অপরজন খাইয়ে দিবে আর চতুর্থজন….

স্বপ্নিলের কথা শেষ হবার আগেই আসিফ এক ভ্রুঁ উঁচু করে বলল,

-ওরে মাথামোটা, আগে নিজের এই হাঁটু কাঁপা থামিয়ে প্রথমটা পার করে দেখা, চার নম্বর তো দূরের কথা!

  • ওকে! চল চল!

স্বপ্নিল পাজেরোর দরজাটা খুলে বাইরের তপ্ত বাতাসে পা রাখল। মনে মনে ভাবল, বিয়ে রিলেটেড সব জিনিসই মারাত্বক মানসিক চাপের। এর চেয়ে কেস সলভ করা সহজ।

_ ★★★★★ _

বৈঠকখানা তখন জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক আলাপে মগ্ন। শাহরিয়ার ওসমান চৌধুরী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন। সাম্প্রতিক ক্ষমতা বদল, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দেশের বিচার ব্যবস্থা সবকিছু মিলিয়ে আসলাম সাহেবের সাথে তার আলোচনাটা বেশ জমে উঠেছে।

আসলাম সাহেবও উনার দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থেকে ভেতরের সমীকরণগুলো মেলাচ্ছেন। প্রতিটি কথা আদান প্রদানের পর দুজনের একই অভিব্যক্তি।

“দেশটা রসাতলে যাচ্ছে!”

দুই প্রবীণের এই গুরুগম্ভীর আলাপের মাঝে স্বপ্নিল আর আসিফ চুপচাপ সোফার এক কোণে বসে শ্রোতার ভূমিকা পালন করছিল।

এমন সময় দরজার ওপাশের ভারী পর্দাটা আলতো করে সরে গেল। বৈঠকখানায় প্রবেশ করল নিয়তি। তার দু-হাতে ধরা একটি বড় কাঠের ট্রে। তাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর কয়েক পদের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি সাজানো।

স্বপ্নিল চায়ের কাপের দিকে তাকানোর উদ্দেশ্যে চোখ তুলল। কিন্তু তার দৃষ্টি থমকে গেল নিয়তির ওপর।

বেশ ছোটখাটো, ছিপছিপে গড়নের একটি মেয়ে। মুখে কোনো প্রসাধনীর ছোঁয়া নেই। গোটা মুখ স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে! এই শহরের চটকদার কৃত্রিমতার মাঝে নিয়তির এই অনাড়ম্বর রূপটা স্বপ্নিলের বেশ মনে ধরল।

নিয়তি উপস্থিত সকলের হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিচ্ছিল। আসিফ তার মুখটা স্বপ্নিলের কানের দিকে এলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,

-ওই কিরে! ওই কিরে! ‘না হওয়া ভাবি’র দোয়া দেখি আসমানে ডিরেক্ট কবুল হয়ে গেছে!

আসিফের কথা শুনে তীব্র বিরক্তিতে স্বপ্নিল ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। তড়িৎ গতিতে ধড়াম করে আসিফের পিঠে ঘুষি মারল। আরও কয়েকটা ধুপধাপ দেওয়ার তীব্র ইচ্ছে ছিল মনে। তার সুযোগ আর হল না।

সেই ‘ধড়াম’ শব্দের তীব্রতায় বৈঠকখানার প্রতিটি দেয়াল যেন কেঁপে উঠল। সোফায় বসা শাহরিয়ার সাহেব আর আসলাম সাহেব কুঞ্চিত ভ্রুঁ নিয়ে ওদের দিকে তাকালেন। নিয়তিও আকস্মিক শব্দে সামান্য চমকে উঠল। চায়ের কাপ উপচে সামান্য তরল ট্রেতে গড়িয়ে পড়ল। সোজা স্বপ্নিলের চোখের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হল।

আসিফের মুখে ব্যাথার তীব্রতায় তখন লাল-নীল-বেগুনী রঙের খেলা চলছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সে ভেতরের চিৎকারটা আগেই গিলে ফেলেছে।

স্বপ্নিল আর আসিফ দুজনেই বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বসে রইল। যেন ওদের মাঝে কিছুই হয় নি!
উপস্থিত সকলে শব্দের উৎসটা বুঝতে চাইল, তবে দুই বন্ধুর নিখুঁত অভিনয়ের সামনে কেউ আর সেই রহস্য উন্মোচন করতে পারল না।

নিয়তি পুনরায় সবাইকে চা ও মিষ্টি এগিয়ে দেওয়ার কাজ করতে লাগল। সবাইকে পরিবেশন শেষ করে সে ধীর পায়ে রেহানার পাশের খালি সোফাটায় গিয়ে বসল।

নীলা অত্যন্ত আন্তরিক গলায় প্রশ্ন করল,

  • চা-টা কি তুমি বানিয়েছো, মা?

নিয়তি হ্যা সূচক মাথা নাড়ল।

-খুব মজা হয়েছে। আর তোমাকে দেখতেও ভীষণ মিষ্টি লাগছে।

নিয়তি মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই মৃদু হাসল। নরম স্বরে বলল,

-থ্যাংক ইউ, আন্টি।

নীলা নিয়তিকে অহেতুক কোনো প্রশ্ন করলেন না। বরং রেহানার সাথেই গল্পে মেতে উঠলেন। প্রবীণ দুই নারীর আলাপন দ্রুতই তাদের নিজেদের যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে গেল। তাদের বিয়ের সময় শাশুড়িরা কীভাবে মেয়ে দেখতেন, পুরোনো দিনের এসব হাস্যকর রীতিনীতি নিয়ে গল্প শুরু হলো।

নীলা হেসে বললেন,

-জানেন আপা? আমাকে যেদিন দেখতে আসে সেদিন স্বপ্নিলের বড় ফুপু সরাসরি আমার হাত টেনে নখগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন! ওনার মতে হাতের নখ কুঁকড়ানো হলে নাকি মেয়ে অলক্ষ্মী হয়।

রেহানাও উনার সাথে সুর মিলিয়ে বললেন,

-নিয়তির দাদী তো সকলের সামনে আমায় দিয়ে বলতে গেলে ক্যাটওয়াক করিয়েছিলেন! এভাবে হাঁটো, ওভাবে হাঁটো! জোরে হাঁটো, আস্তে হাঁটো!

নীলা আরোও উৎসাহ নিয়ে বললেন,

-আমাদের আমলের কাহিনী তো তাও মানা যায়। এই তো বছর কয়েক আগের কথা, আমার বড় মেয়ে অর্নিকে প্রথম যে পাত্রপক্ষ দেখতে এলো, ওনারা কিসব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করলেন! পাত্রের চাচা এসে অর্নিকে বললেন তুমি ইংরেজিতে অনার্স করেছো দেখলাম।
তা এই ইংরেজি পত্রিকা রিডিং পড়ে শোনাতে পারবে?
মেয়ে তো আমার রেগে আগুন! আমরা তো হেসেই কূল পাচ্ছিলাম না। পরে অবশ্য ওনাদের ভদ্রভাবে বিদায় করে দিয়েছি। অথচ ছেলের পরিবার কিন্তু উচ্চ শিক্ষিত!
ভাবেন একবার!

শাহরিয়ার সাহেব চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে আসলাম সাহেবের দিকে তাকালেন। বললেন,

-আমাদের যুগের মত সেই কনে দেখার দিন তো আর নেই, কি বলিস আসলাম?

আসলাম সাহেবও নিজের অভিমত যোগ করলেন,

-যা বলেছিস! এখনকার ছেলে-মেয়েরা অনেক এডভান্স।ওদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের একটা ব্যাপার রয়েছে। বিয়ের আগেই ব্যাপারগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলে নেয়। বিষয়টা অবশ্য আমি এপ্রিশিয়েট করি।

শাহরিয়ার সাহেব সামান্য তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

  • এডভান্স তো বটেই! মন চাইলো তো বিয়ে করছে। মন চাইলো তো ডিভোর্সও দিয়ে দিচ্ছে।

নীলা স্বামীকে মৃদু ধমক দিলেন,

-আজকের দিনেই তোমার এসব নিয়ে কথা বলতে হবে? থামো না!

এরপর তিনি আসলাম সাহেবের দিকে মনযোগী হলেন। বললেন,

-ভাই, ছেলে-মেয়ে দুটোকে বড়দের এই আড্ডার মাঝে আমরা বসিয়ে না রাখি? ওরা আলাদা করে একটু কথা বলুক। কী বলেন?

আসলাম সাহেব এবং রেহানার মাঝে চোখাচোখি হল। নীরবতার মাঝেই দুজন দুজনের মনের ভাষা ঠিক পড়তে পারলেন। দুজনেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
রেহানা নিয়তিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

-স্বপ্নিলকে নিয়ে পাশের ছোট বারান্দাটায় যাও, মা। ওখানে বসে তোমরা গল্প করো।

যাও বাবা, ওর সাথে যাও।

নিয়তি কোনো কথা না বলে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নীল শাড়ির আঁচলটা হাতের মুঠোয় পুরে ছোট বারান্দাটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

আসিফ পেছন থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে গলা খাকারি দিল বেশ কয়েকবার। স্বপ্নিল পেছন ফিরে আসিফকে চোখ দিয়ে ভালোভাবে শাসিয়ে নিল। এরপর নিয়তির পিছু পিছু এগোতে লাগল।

★★★★★

“আপনি পেডোফাইলের অর্থ জানেন?”

এই প্রশ্নটা শুনে যেকোনো সাধারণ মেয়ের চক্ষুদ্বয় সোজা কপালে গিয়ে ঠেকত। কিন্তু নিয়তি সত্যিই এই শব্দটির অর্থ জানে না। কাজেই সে তার স্বভাবসুলভ নিস্তরঙ্গ চোখ দুটো স্বপ্নিলের ওপর স্থির রেখে না-সূচক মাথা নাড়ল।

নিয়তির এই ঘোরতর অজ্ঞানতা দেখে স্বপ্নিল ভেতরে ভেতরে একটি দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। পরক্ষণেই আবার নড়েচড়ে দাঁড়াল সে।

ইংরেজি শব্দটা জানে না ঠিক আছে। মেয়েটা মনে মনে কোন না কোন বাংলা শব্দে তো আখ্যায়িত করছে ওকে? কোন শব্দ? শিশুকা*মী? আস্তাগফিরুল্লাহ!

স্বপ্নিল নিজে মনেই অত্যন্ত নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

  • এইজ ইজ জাস্ট এ নাম্বার! এন্ড জেইল ইজ জাস্ট আ রুম!

স্বপ্নিলের এই অস্ফুট স্বগতোক্তি নিয়তির কানে অতি সামান্য পৌঁছাল। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

-কিছু বললেন?

‘না, না! কিছু না’

স্বপ্নিল ঝটপট নিজেকে সামলে নিয়ে আবার নিয়তির দিকে ঘুরল। চোখেমুখে সৌজন্য ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-ইয়ে… আপনার পুরো নামটা ভুলে গেছি।

  • নাযাহ ইসলাম’

নিয়তি খুব নিচু স্বরে উত্তর দিল। তারপর এক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে পুনরায় যোগ করল,

  • ডাকনাম নিয়তি।
  • আমি স্বপ্নিল। আরিয়ান স্বপ্নিল চৌধুরী।

নিজের পরিচয়টা বেশ দম্ভভরেই দিল সে। নিয়তি মুচকি হেসে আবার মাথাটা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। শাড়ির আঁচলটা এখনো তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা।

দেখতে দেখতে অনেকটুকু সময় পার হয়ে গেল। কিন্তু দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলল না। মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খাওয়া বারান্দার গাছগুলোর ঝিরিঝিরি শব্দ আর ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা প্রবীণদের হাসির আওয়াজ, নীরবতাটাকে অস্বস্তিকর হওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা করল!

এপর্যায়ে স্বপ্নিল মনে মনে বেশ অস্থির হয়ে উঠল। নীরবতা ভাঙার সামান্য প্রচেষ্টা করল সে।

-অকওয়ার্ড! ভীষণ অকওয়ার্ড! তাই না?

নিয়তি মাথাটা সামান্য ওপরে তুলল। তার চোখে একজোড়া প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

স্বপ্নিল হাসিমুখে বলল,

-এই যে কোনো কথা নেই, বার্তা নেই, দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে ঠেলে-ঠুলে কথা বলতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে! কেন? কারণ ওনাদের ধারণা আমরা পাঁচ মিনিটেই একে অপরকে চিনে ফেলব! এসবের কোনো মানে হয়?

নিয়তির ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। স্বপ্নিল আঙুল দিয়ে নিজের সামনের চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল,

-আসলে, কনে দেখার প্রথা আমার পছন্দ নয়। সত্যি বলতে আমার স্ত্রী যিনি হবেন তার পড়াশোনা, চাকরি জীবন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা ট্যুর – এসব নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি বেশ মডার্ন মাইন্ডেড মানুষ। মানে একদম চিল টাইপ। শুধু একটা বিষয় নিয়ে কনসার্ন!

নিয়তির চোখে এবার ভয় সুস্পষ্ট। কোন বিষয়ে কনসার্ন? হবু স্ত্রীর ভার্জিনিটি? কিন্তু নিয়তিকে হতভম্ব করে দিয়ে স্বপ্নিল একেবারে ভিন্ন কিছু বলল।

  • আমার কাছে লয়ালিটি ম্যাটার করে। ভীষণভাবে ম্যাটার করে। আমি সবকিছু মেনে নিতে পারি। প্রায় সমস্ত ছোটখাট ভুলের মাফ তার জন্য বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু লয়াল হতে হবে। দ্যাটস ইট!

স্বপ্নিল কোনো রাখঢাক করল না। তার জীবনের ফিলোসফিটা এক নিঃশ্বাসে উগরে দিল। কিন্তু নিয়তি এবারও চুপ। প্রত্যুত্তরে কিছুই বলল না।

স্বপ্নিল এবার সত্যিই কিছুটা ইতস্তত করতে লাগল। তার মনের ভেতর দ্বিধা তৈরি হতে শুরু করল। মেয়েটা অস্বাভাবিক রকমের চুপচাপ। যা তার মতোন ছটফটে, বাউণ্ডুলে, বানর প্রজাতির পুরুষের জন্য একটা বড়সড় লাল সংকেত।

স্বপ্নিল কপালটা সামান্য কুঁচকে শেষবারের মতো জানতে চাইল,

-আপনার আমার সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে, কিংবা নিজের কোনো ডিমান্ড থাকলে সরাসরি বলতে পারেন। প্রশ্ন করতে পারেন। আই ওন্ট মাইন্ড অর জাজ।

নিয়তি স্বপ্নিলের চোখের দিকে তাকিয়ে অতলান্ত চোখ দুটো তুলে সহজভাবে বলল,

-আমার কোনো প্রশ্ন নেই।

স্বপ্নিল এবার পুরোপুরি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল। মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে গেল। সে ধরেই নিল মেয়েটার তাকে বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। কিংবা মেয়েটা হয়ত স্বভাবতই অতিরিক্ত চুপচাপ। অহেতুক কথা বলে না।

আর উক্ত দুটি সংকেতই তাদের এই সম্ভাব্য সম্পর্কের জন্য চরম নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বপ্নিল তবুও গালে হাসি ঝুলিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,

-তাহলে আর কি! চলেন ড্রইংরুমে ফিরে যাই?

নিয়তি সম্মতি জানিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করল। স্বপ্নিল নিয়তিকে অনুসরণ করতে করতে সৃষ্টিকর্তার সাথে একপাক্ষিক কথপোকথনে লিপ্ত হল,

-ডিয়ার গড! কেন আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছ? হোয়ার দ্য হেল ইজ মাই পাজড়ের হাড় ওয়ালা বউ?
করলাম কাউন্টডাউন শুরু..
তাড়াতাড়ি বউ দাও না গুরু!

[গল্পের হিসাবে গড়মিল হয়েছে। বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ ৬ বছর পর থেকে হচ্ছে আমি ৭ লিখেছিলাম- আমি ইডিট দ্বিতীয়ত , এত এত রেস্পন্সের জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা লক্ষ্মীরা ❤️। পরবর্তী পর্ব আগামীকাল এরকম সময়ে আসবে 🥹]

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply