তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব -১২)
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
টপ অফ ইউরোপ’ এ দাঁড়িয়ে বরফের শুভ্রতা আর পাহাড়ের বিশালতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল নব দম্পতি। হিমশীতল বাতাসের তোড়ে মনটা প্রশান্তিতে ছেয়ে ছিল তাদের। কিন্তু সেই প্রশান্তি যে মুহূর্তের ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে, তা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
শেহজাদ অবজারভেটরির রেলিং ধরে দূরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার পকেটে থাকা ফোনটি পরপর কয়েকবার কেঁপে উঠল। ভাইব্রেশনের শব্দে শেহজাদ পকেট থেকে ফোন বের করল। হোয়াটসঅ্যাপে একটি আননোন নাম্বার থেকে কয়েকটি ভিডিও ফাইল এসেছে। সাথে একটি মেসেজ,
-আপনার স্ত্রীর আসল রূপটা দেখে নিন, মিস্টার শেহজাদ রহমান।
শেহজাদ ভ্রু কুঁচকে ভিডিওটি প্লে করল। কয়েক সেকেন্ড দেখার পর তার পুরো শরীর আল্পসের বরফের মতো জমে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাতের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা এই দৃশ্যটি দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়াবহ।
ভিডিওটিতে সামাইরার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ ভিডিও নয়। কারো সাথে কাটানো অত্যন্ত ব্যক্তিগত ন*গ্ন ভিডিও।
শেহজাদ ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে দিল সাথে সাথে। দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল। তার গোটা শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। সে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল নিজেকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু অভ্যন্তরীণ
অগ্নিকুণ্ড তাতে নিভল না। সে ধীর পায়ে সামাইরার দিকে এগিয়ে গেল।
সামাইরা তখন পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের প্রতিফলন দেখে বিমোহিত। শেহজাদকে কাছে আসতে দেখে সে হেসে বলল,
- আপনি ঠিক বলেছিলেন। আইগার নর্থ ফেসটা এখান থেকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে!
শেহজাদ হাসল না। তার চোখের সেই শীতল চাহনি দেখে সামাইরার হাসিমুখটাও মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। শেহজাদ একদম সামাইরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাড়কাঁপানো স্বরে প্রশ্ন করল,
-সামাইরা, তোমার কি আগে কারো সাথে রিলেশন ছিল? কারো সাথে ফিজিকাল হয়েছো?
সামাইরা আকাশ থেকে পড়ল। এমন স্বর্গীয় পরিবেশে হুট করে এমন অদ্ভুত প্রশ্নে সে থতমত খেয়ে গেল।অবাক হয়ে জানতে চাইল,
-মানে? এসব কেমন প্রশ্ন?
শেহজাদ তার প্রশ্ন থামাল না। আরও একধাপ এগিয়ে এল সে।
-আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও। কারো সাথে কোনো শত্রুতা আছে তোমার? বা এমন কেউ আছে যাকে তুমি তোমার খুব কাছে যেতে দিয়েছিলে?
সামাইরার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
-আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আপনি আমাকে ঘুরতে নিয়ে এসে আমার অতীত নিয়ে জেরা করছেন? এসব হাবিজাবি প্রশ্ন কেন করছেন?
শেহজাদ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পেছন থেকে সামাইরা চিৎকার করে বলল,
-কোথায় যাচ্ছেন? আমাদের না লাউটারব্রুনেন যাওয়ার কথা? ওই যে ৭২টা জলপ্রপাত দেখতে যাওয়ার প্ল্যান ছিল?
শেহজাদ না থেমেই রুক্ষ স্বরে বলল,
-মুড নেই। আমরা এখনই শ্যলে-তে ফিরে যাচ্ছি।
সামাইরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেহজাদের সেই ‘পুরানো অসুখ’ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে? কোনো উত্তর না পেয়ে সামাইরাও গজগজ করতে করতে শেহজাদের পিছু নিল।
পুরো ফিরতি পথে শেহজাদ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। ট্রেনের সেই ভিআইপি কেবিনে কাটানো পুরোটা সময় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ফ্লোরে।
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড টার্মিনালে পৌঁছানোর পরেই ড্রাইভার দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে তাদের শ্যলে-তে পৌঁছে দিল।
শ্যলে-তে পৌঁছানোর পর শেহজাদ সোজা বারান্দায় চলে গেল। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা বাতাস সেখানে রাজত্ব করছে, কিন্তু শেহজাদের যেন কোনো হুঁশ নেই। সে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে। ধোঁয়ার কুন্ডলীগুলো বাতাসে মিশে যাওয়ার আগেই সে নতুন আরেকটি সিগারেট ধরাচ্ছে। গোটা দিন না খেয়ে দেয়ে সে এভাবেই পার করে ফেলল।
সামাইরা ঘরের ভেতর থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল। শেহজাদের কুঞ্চিত ভ্রু আর শক্ত হয়ে থাকা পিঠ বলে দিচ্ছে কিছু একটা মারাত্মক খারাপ ঘটেছে। সে কি বিজনেস ডিল নিয়ে চিন্তিত? নাকি রাইসার কোনো বিষয় নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে আছে?
হঠাৎ বারান্দা থেকে শেহজাদের প্রচণ্ড কাশির শব্দ ভেসে এল। ঠান্ডা বাতাসে একটানা সিগারেট খাওয়ার ফলে তার দম আটকে আসার উপক্রম। মানবতার খাতিরেই সামাইরা আর স্থির থাকতে পারল না। সে দ্রুত ফ্লাক্স থেকে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি নিয়ে বারান্দায় দৌঁড়ে গেল।
-এই নিন পানি। যেভাবে সিগারেট খাচ্ছেন! দেবদাসও এভাবে ম*দ পান করেন নি। রাইসার বুঝি অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?
সামাইরা পানির গ্লাসটা শেহজাদের দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু শেহজাদ সেই গ্লাস স্পর্শও করল না। সে লাল হয়ে থাকা চোখে সামাইরার দিকে একবার তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা ছিল নাকি তীব্র যন্ত্রণা তা সামাইরা বুঝতে পারল না।
-কি হয়েছে বলবেন তো? চাইলে শেয়ার করতে পারেন। হালকা লাগবে।
শেহজাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-জাস্ট গো এন্ড হ্যাভ সাম স্লিপ, সামাইরা। আমাকে একা থাকতে দাও।
সামাইরা এবার সত্যিই রেগে গেল। সে পানির গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে রাখল। কিছু পানি উপচে পড়ল চারিপাশে। সামাইরা ভ্রুক্ষেপহীন গটগট করে ভেতরে চলে এল। যাবার আগে বলে গেল,
-থাকুন আপনার থার্ড ক্লাস মেইল ইগো নিয়ে। আমার কি!
সামাইরা বেডরুমে গিয়ে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। কাজেই অভ্যাসবশত ফেসবুক স্ক্রল করতে শুরু করল সে।
হঠাৎ একটি ব্রেকিং নিউজের হেডলাইন দেখে সামাইরার হাতের আঙুলগুলো স্থির হয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
“দেশের স্বনামধন্য বিজনেস টাইকুন শেহজাদ রহমানের স্ত্রীর ন*গ্ন ভিডিও ভাইরাল!”
নিউজ থাম্বনেইলে একটি ঝাপসা স্ক্রিনশট দেওয়া। কিন্তু সামাইরা চিনতে পারল, ওটা তারই মুখ! ভিডিওটির লিংক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেটে। কমেন্ট সেকশনে মানুষের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আর বিদ্রূপের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
সামাইরা এক লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘটনার আকস্মিকতায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তার মনে হলো পায়ের নিচের মেঝেটা সরে যাচ্ছে।
সে বুঝতে পারল শেহজাদ কেন পাহাড়ে ওমন আচরণ করেছিল। কেন সে এখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নিকোটিনের মাঝে পুড়িয়ে ফেলছে।
মানুষের জীবনে কি এমন মুহূর্তও আসে? কয়েক মিনিট আগেও সুইজারল্যান্ডের যে আকাশটা তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল, সেই আকাশটাই যেন ভেঙে তার মাথার ওপর পড়ল!
সামাইরা হন্যে হয়ে ইন্টারনেটে নিজের ওই ভিডিওটা খুঁজতে লাগল। সে কাঁপাকাঁপা আঙুলে সার্চ বারে নিজের নাম লিখছে, ভিডিওর টাইটেল দিয়ে খুঁজছে। তার ভেতরের সত্তাটা তখন আকুপাকু করছে সত্যটা জানার জন্য। সে দেখতে চায়, কোন সাহসে কে তার মতো একজন মেয়ের জীবন নিয়ে এমন নোংরা খেলায় মেতেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নিউজ পোর্টালগুলোতে খবরটা দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়লেও ভিডিওর মূল সোর্স বা ভিডিওটি সে ফেসবুকের কোথাও খুঁজে পেল না। লিংকগুলোতে ক্লিক করলে বারবার ‘এরর’ দেখাচ্ছে।
সামাইরার মনে হল অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ওই ভিডিওটা নিজের চোখে দেখা। সে বিছানা ছেড়ে উঠল। টলমল ভঙ্গিতে বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
বারান্দায় পৌঁছাতেই সে দেখল শেহজাদ তখনও একইভাবে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ের কাছে চার পাঁচটা সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। শেহজাদের পুরো অবয়বটা এখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। সামাইরা কাঁদতে কাঁদতে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ভাঙ্গা গলায় আর্তনাদ করে বলল,
-ভিডিওটা আমাকে দেখান!
শেহজাদ একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। সে খুব নিচু আর বিষাক্ত স্বরে বলল,
-তোমাকে না বলেছি ঘুমাতে যেতে? জাস্ট গেট দ্য হেল আউট অফ হেয়ার , সামাইরা। আমাকে প্লিজ একা থাকতে দাও। নয়ত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শেষ ক্ষমতাটুকুও আমি হারিয়ে ফেলব।
সামাইরা এবার চিৎকার করে উঠল। তার বুক ফেটে কান্না আসছে। সে শেহজাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কঠিন স্বরে বলল,
-আমি কেন যাব? আমার চরিত্রের ওপর কালি লেপে দেওয়া হয়েছে আর আমি ঘরে গিয়ে ঘুমাব? আমার জীবনে কোনো প্রেমিক ছিল না, আমি কারো সাথে কোনোদিন অন্তরঙ্গ হইনি! আপনি কিসের ভিত্তিতে আমার দিকে ওই সন্দেহের দৃষ্টি ছুড়ে দিচ্ছেন? আমার দেখা প্রয়োজন কোন ভিডিওর ভিত্তিতে এমন নিউজ করা হচ্ছে। আমাকে ফোনটা দিন!
শেহজাদের হাতের মুষ্টি আরও শক্ত হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-সামাইরা, শেষবারের মতো বলছি… এখান থেকে যাও। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না।
সামাইরা এক পা-ও নড়ল না। সে তার অশ্রুসিক্ত চোখে তেজি দৃষ্টি ফুটিয়ে তুলল। গলার স্বর আরো চড়িয়ে বলল,
-আমি যাব না! আপনার আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমি জানি না কে এই ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু আমি নির্দোষ। আমার জন্য আপনার সম্মান ক্ষুন্ন হোক, আপনার মতো একজন বিজনেস টাইকুনের মাথা নিচু হোক, তা আমি চাই না।
শেহজাদ এবার হোহো করে হেসে উঠল। সেই হাসিটা স্বাভাবিক ছিল না। সেই হাসির প্রতিটি শব্দে ছিল অবজ্ঞা আর তিক্ততা। সে হাসতেই থাকল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মজার কৌতুকটি সে আজ সামাইরার মুখে শুনেছে!
শেহজাদের এই অট্টহাসি সামাইরার সহ্য হলো না। সে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে শেহজাদের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল।
-দিন আমাকে ফোনটা! আমাকে দেখতেই হবে ওই ভিডিওটা!
শেহজাদ রাগের মাথায় সামাইরাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সামাইরা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। কনুইয়ে প্রচণ্ড আঘাত পেল সে। কিন্তু সে পুনরায় উঠে দাঁড়াল এবং পশুর মতো আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করল।
সে শেহজাদের ওপর আক্ষরিক অর্থেই ঝাঁপিয়ে পড়ল এবার। তার দুহাত দিয়ে শেহজাদের বুকে, কাঁধে, মুখে যত্রতত্র চড়-থাপ্পড় আর আঁচড় দিতে শুরু করল। তার নখগুলো শেহজাদের চামড়া ছিঁড়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সামাইরার কোনো হুঁশ ছিল না। সে কেবল চিৎকার করছিল,
-ফোন দিন আমাকে! দেখান ভিডিওটা!
শেহজাদ প্রথম দিকে কেবল তার হাতগুলো আটকে ধরার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সামাইরা তখন উন্মাদ। তার প্রতিটি আঘাতের সাথে বেরোচ্ছিল তার দীর্ঘদিনের জমা করা ক্ষোভ আর অপমানের যন্ত্রণা। এক পর্যায়ে শেহজাদ আর সহ্য করতে পারল না। সে সামাইরার দুই হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিজের বুকের মাঝে সজোরে চেপে ধরল।
সামাইরা ছটফট করতে লাগল। বের হওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু শেহজাদের পেশীবহুল হাতের বাঁধন তাকে স্থির করে দিল একেবারে।
-শান্ত হও সামাইরা! স্টপ ইট! জাস্ট শাট আপ অ্যান্ড কাম ডাউন!
শেহজাদ তার কানের কাছে গর্জে উঠল।
সামাইরাও কিছুটা নিস্তেজ হয়ে এল। শেহজাদের বুকের উত্তাপ পেয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শেহজাদের জামা খামচে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের শান্ত আকাশটা যেন বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল!
সে বারবার বলতে লাগল,
-ওই ভিডিও অবশ্যই মিথ্যা… বিশ্বাস করুন। আমি কোনোদিন কারো সাথে…
সামাইরা কথা শেষ করতে পারল না। কান্নায় তার গলা বুজে এল। শেহজাদ তাকে ছাড়ল না। তার নিজেরও নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। সামাইরাকে ওভাবেই নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে সে বারান্দার সেই সোফাটায় ধপাস করে বসে পড়ল। তার নিজের শরীরটাও যেন এখন শক্তিহীন।
শেহজাদ শূন্য দৃষ্টিতে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। সামাইরার কান্না এখন মৃদু হিক্কায় পরিণত হয়েছে।
শেহজাদ এক গভীর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছিল তখন। কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা? তবে আপাতত তার সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো এই স্ক্যান্ডাল সামলানো। ডিজিটাল যুগে এসব স্ক্যান্ডাল বিলীন করে দেওয়া যে কতটা কঠিন তা কারোই অজানা নয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, তার পাশে বসে থাকা এই মেয়েটি কি আসলেই সেই পবিত্রা সামাইরা, নাকি সবটাই অভিনয়?
পুরো শ্যলে-তে তখন কেবল ফায়ারপ্লেসের চটচট শব্দ আর বাইরে বইতে থাকা হিমেল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছিল। সামাইরার কান্নার বেগ এখন কমে এসেছে, শুধু তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।
সহসা, শেহজাদ সামাইরাকে নিজের বুক থেকে সামান্য দূরে সরিয়ে নিল। কিছু একটা পরীক্ষা করে দেখতে চায় সে।
শেহজাদ সামাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর স্বরে বলল,
-সামাইরা, ডু ইউ ট্রাস্ট মি?
সামাইরা অবাক হয়ে শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল। প্রত্যুত্তরে কি বলবে বোধগম্য হল না। নিশ্চুপ সামাইরার মুখের পানে তাকিয়ে শেহজাদ আবার বলল,
-আমি এখন যা করব তাতে আমায় বাধা দিবে না। ক্লিয়ার?
শেহজাদের গলার স্বর এতটাই ভারী ছিল যে, প্রশ্ন করার সাহসটুকুও সামাইরা পেল না। সে সজল চোখে কেবল অবাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে এক ধরণের অজানা ভয় আর অস্বস্তি কাজ করলেও, শেহজাদের চোখের গভীরে এক অদ্ভুত নির্ভরতা খুঁজে পেল সে। কাজেই, অদম্য জেদ থেকে সে চুপ করে রইল।
শেহজাদ খুব ধীরস্থিরভাবে তার হাত বাড়িয়ে সামাইরার ওভারকোটের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। তার হাত কোটের ভেতরে দিয়ে সামাইরার গলার নিচের অংশ দিয়ে বুকের ওপরের কাপড়টা আলতো করে সরাল। হালকা উঁচু করে ধরল স্ফীত স্তনযুগলের ওপরের অংশটুকু।
কনকনে ঠান্ডা বাতাসে নিজের শরীরের অনাবৃত অংশে শেহজাদের হাতের উত্তপ্ত স্পর্শ পেয়ে সামাইরা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। তার ভেতরে তীব্র অস্বস্তির ঢেউ খেলে গেল। তবুও সামাইরা এক চুলও নড়ল না।
শেহজাদ নিজেও শুধুমাত্র এক পলক সামাইরার সেই নগ্ন শুভ্র স্ফীত বুকের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কামনার লেশমাত্র নেই, বরং এক নিপুণ পরীক্ষকের তীক্ষ্ণতা। কয়েক সেকেন্ড পর সে কাপড়টা টেনে দিয়ে ,কোটের বোতামগুলো লাগিয়ে দিয়ে, সামাইরাকে ছেড়ে দিল।
শেহজাদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো সামাইরা। এখন আর কোনো কথা নয়।
সামাইরা তখনও সোফায় বসে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। সে ধরা গলায় আবার আবদার করল,
-না! আমাকে আগে ভিডিওটা দেখান। আমি না দেখে কোথাও যাব না। আমি জানতে চাই কে আমার মুখ ব্যবহার করে এমন জঘন্য কাজ করেছে।
শেহজাদ এবার সামাইরার দিকে ফিরে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন সেই আগের রুক্ষতা নেই।
-প্রয়োজন নেই সামাইরা। বললাম তো, ঘুমাতে যাও।
তবুও সামাইরা জেদ ধরল।
-দেখুন আমার দেখা উচিত। আপনি আমাকে…
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই শেহজাদ নিচু হয়ে তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। সামাইরা চমকে গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল। শেহজাদ কোনো কথা না বলে তাকে নিয়ে বেডরুমের দিকে হাঁটা দিল।
বিছানায় পরম মমতায় শুইয়ে দিয়ে সে সামাইরার গায়ের ওপর কম্বলটা টেনে দিল। সামাইরা তখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল। শেহজাদ তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব নিচু স্বরে বলল,
-অনেক হয়েছে। আর চিন্তা করো না। আমি আছি তো। এখন চোখ বন্ধ করো আর ঘুমিয়ে যাও।
শেহজাদের হাতের সেই নরম স্পর্শে সামাইরার দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর আজকের এই মানসিক ধকল যেন একাকার হয়ে গেল। ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সামাইরার ঘুম নিশ্চিত হওয়ার পর শেহজাদ আবার বারান্দায় বেরিয়ে এল। সে তার আইফোনটা বের করে ভিডিওটি পুনরায় প্লে করল। এবার সে খুব সূক্ষ্মভাবে ভিডিওর প্রতিটি ফ্রেম লক্ষ্য করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড পরেই ভিডিওর মেয়েটি যখন একটি বিশেষ ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল, শেহজাদের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল।
সে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই সামাইরার শরীরে যা দেখে এসেছে, ভিডিওর মেয়েটির ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। সামাইরার বাম বুকের ঠিক ওপরে বেশ বড়সড় একটি তিল আছে। কিন্তু ভিডিওর এই মেয়েটির শরীরে সেই তিলের কোনো অস্তিত্ব নেই। শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা নামিয়ে রাখল। সে নিশ্চিত হয়ে গেল। এটি অত্যন্ত উন্নত মানের ‘ডিপফেইক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
শেহজাদের চোখের মণি এখন ক্ষিপ্র শিকারির মতো সরু হয়ে এসেছে। সে মেসেঞ্জারে গিয়ে একটি বিশেষ প্রোফাইলে ঢুকল। সেখানে কোনো নাম বা ছবি নেই। সে কিপ্যাডে দ্রুত হাতে একটি কোডেড টেক্সট টাইপ করল। যা কেবল তার নেটওয়ার্কের বিশেষ মানুষরাই বুঝতে পারবে।
‘Find the criminal now’
(চলবে…)
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৪
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৮
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৯