#আমার_আলাদিন
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৬৭ (প্রথমাংশ)
ছয় মাস অতীত:
সামিয়ার বেডরুমে বসে আছে ইরাম। তার কোলে তিন মাসের ছোট্ট ইযান। বাচ্চাটা মাত্রই ঘুমিয়েছে। অথচ ইরামের চোখে কোনো ঘুম নেই। নেই ক্লান্তি, শান্তি। বুকের ভেতর অশান্তির ঝড়। শেষ ভরসার খুঁটিটাও আর রইলনা তার। ভাইয়ের দুয়ার থেকেও ফিরে আসতে হলো। এখন কি করবে ইরাম? এই অথৈ সাগরে এইটুকুন বাচ্চা বুকে নিয়ে কোথায় যাবে? কে তাকে আশ্রয় দেবে? আশ্রয় পাওয়াটা অবশ্য মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো অরণ্য মির্জা সওদাগরের হাত থেকে বেঁচে থাকা। ওই লোকটা রীতিমত আল্টিমেটাম দিয়েছে তাকে! ইরামকে তার কাছে নাকি ফিরতেই হবে। ভিক্ষা চাইতেই হবে। এই তিন মাসে সমাজের যে বাস্তবতা ইরাম দেখেছে, তাতে সে নিশ্চিত, শীঘ্রই কিছু করতে না পারলে হয়ত অরণ্যর দ্বারস্থই তাকে হতে হবে। সেটা সে মনে প্রাণে চাইছে না। আর যাই হোক, ওই লোকের সামনে মাথা নিচু কোনোদিন করবেনা সে। অরণ্য যদি এমন একটা সময়ে ইযানের কাস্টাডির দাবী করে বসে? তখনি বা কী হবে? ইযান ছোট বলে হয়ত আদালতের রায় অনেকটাই ইরামের পক্ষে আসবে। তবে ভরণ পোষণ আর পিতৃত্বের অধিকার থেকে অরণ্যকে হটানো যাবে না। তাছাড়া ইরামের এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, হাতে পর্যাপ্ত টাকা পয়সা নেই। আদালতের চক্কর, উকিলের ফিস এসব কীভাবে বহন করবে? তার নাজুক অবস্থাও আদালতে বিবেচিত হবে। এখন তার হাতে দুটো উপায় আছে। এক, রাহাতের কাছে মায়ের বাড়ির সম্পত্তির দাবী করা। সেই কাজ করতে গেলে অবশ্য কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে শুধু টাকাই পাবে ইরাম, বাদবাকি সব পথ তাকে ইযানকে নিয়ে একলাই চলতে হবে। দুই নাম্বার উপায়টা একটু স্বার্থপর। একটু না, পুরোটাই স্বার্থপর। সামিয়ার কাছে সাহায্য চাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আশ্রয় পাওয়া যাবে, টাকা পয়সাও পাওয়া যাবে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা?
ইরামের শক্ত কোনো খুঁটি নেই। সামাজিক ভিত্তি নেই। সবার কাছে সে যা পাবে তা হবে শুধুমাত্র আশ্রয় এবং সাহায্য। সব করুণা, অধিকার নয়! আর সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। ইরাম চাইলে এখন কষ্ট করতে পারে। দুধের শিশুকে অন্যের ভরসায় রেখে জুতার তলা ক্ষয় করে চাকরি খুঁজতে হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে পারে। কিন্ত আর কত? তার মন যে আর মানতে চাইছেনা। ১৭ বছর থেকে যে সংগ্রাম সে করে এসেছে, মা হওয়ার পরে বাচ্চার সঙ্গে কিছু ভালো মুহূর্ত কাটানো ছাড়া কোনো লড়াইয়ের ইচ্ছা তার হচ্ছে না। তাছাড়া ইযানের কী হবে? তার ভবিষ্যত কেমন হবে? কী হিসাবে বড় হয়ে উঠবে তার ছেলে? একটা ভাঙাচোরা পরিবারের সন্তান? যাকে নিয়ে বাবা মায়ের মাঝেই দ্বন্দ্ব? ডিভোর্সি বাবা মা, সিঙ্গেল মাদার মা। কোনো পরিবার নেই, মাথা গোঁজার মতন গুরুজনের ঠাঁই নেই, একটা সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ নেই। হয়ত ইযান ছোট থেকে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তার কাছে এসব স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু যখন স্কুল কলেজে যেতে শুরু করবে, যখন আর পাঁচটা বাচ্চার সাধারণ জীবনযাপন দেখবে তখন? তখন মন খারাপ না করে সে থাকতে পারবে? তার বন্ধুরা কী তাকে জিজ্ঞেস করবে না তার পরিবারের কথা? বাবা মায়ের কথা? বাড়ির কথা? ভাবতেই ইরামের বুকটা হুহু করে উঠল।
ইরাম কৈশোরে পিতাকে হারিয়েছে। সেই শোকে মা পাগলপ্রায়। দুই ভাই, মায়ের পরিবার থাকা সত্ত্বেও বাবা নেই শুনলে মানুষ এমন করুণা করে তাকাত এবং এখনো তাকায় যে ইরামের মাঝে মাঝে মনে হয় বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে একটা পরিপূর্ণ পরিবার না পেয়ে। উপরি করুণার কোনো অভাব নেই। অথচ মন থেকে মানুষ যা দেয় তা হলো শুধু বদদোয়া। স্কুলের চাকরি করার সময় কলিগদের কাছ থেকে এমন সব কু প্রস্তাব সে পেয়েছে যা মুখে আনাও দুষ্কর। সবাই শুধু তার রুটিনমাফিক জীবন দেখেছে। ভাইদের মানুষ করা দেখেছে, উপার্জন করা দেখেছে। দেখেনি শুধু এই দিনগুলোর প্রত্যেকটা মিনিট, প্রত্যেকটা সেকেন্ড কতশত প্রশ্ন, কুনজর, উদ্ভট ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরামকে যেতে হয়েছে। একটা শক্তপোক্ত পরিবার না থাকলে মানুষ সরকারি সম্পত্তি মনে করে। উপরন্তু সে মেয়ে। এতদিন তাও অবিবাহিত মেয়ে ছিল। এখন এক বাচ্চার মা, ডিভোর্সি। সমাজে পা রাখতে গেলেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে একদল হায়েনা। ইরাম এসব মোকাবেলা করতে করতে ক্লান্ত। আর চায়না সে।
ঘুমন্ত ছেলেকে একটা চাদর বিছিয়ে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিল ইরাম। তার মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। চিন্তায় চিন্তায় শরীর অসাড় হয়ে আসছে অথচ কোনো সমাধান মিলছে না। কোন পথে গেলে সে আর তার ছেলে দুজনই ভালো থাকতে পারবে? কোন পথে গেলে তার দিকে সামাজিক কোনো প্রশ্ন উঠবে না? কেউ তাকে সরকারি সম্পত্তি ভেবে হেলাফেলা করবে না? জানেনা ইরাম। একনাগাড়ে নিষ্পাপ বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়ে রইল সে। বড় হয়ে যদি কোনোদিন এই ছেলে তাকে প্রশ্ন করে, ‘যদি ভালো জীবন দেয়ার সামর্থ্যই না থাকে তবে আমায় পৃথিবীতে এনেছিলে কেন?’ কী জবাব দেবে ইরাম? হয়ত ইযান তেমন করবে না। তাকে সেভাবে মানুষ হতে দেবে না ইরাম। তবুও, তার জন্য ছেলের জীবনটা অনিশ্চয়তায় ফেলবে সে? ঝুঁকে গেল ইরাম। নরম আঙুলে ছুঁয়ে দিল ইযানের গাল, ফিসফিস করে বলল,
“কুচুপু, আম্মু তোমাকে অনেক ভালোবাসি, জানো তো? তোমার জন্য আম্মু সব করতে পারে।”
ইযান সামান্য শব্দ করে উঠে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল। ইরাম মৃদু হাসল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোল তার। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই বেডরুমের দেয়ালে টাঙানো কিছু ফটোফ্রেমের দিকে নজর পড়ল তার।
উঠে গেল ইরাম। দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বুকে দুবাহু ভাঁজ করে অপলক পর্যবেক্ষণ করল ফটোফ্রেমগুলো। একটাতে পারিবারিক ছবি, আহমদ, সামিয়া, সারিকা আর আরেকটা বাউন্ডুলে ছেলে। হালফ্যাশনের বেশভূষা। পাশেই আরেকটা ফটোফ্রেমে তার সিঙ্গেল ছবি। সুদর্শন যুবকের চোখে চকচকে দৃষ্টি, জিভ বের করেছে ভ্যাঙানোর ভঙ্গিতে। হাতের তর্জনী আর কড়ে আঙুল তুলে ইয়ো ইয়ো সাইন দেখাচ্ছে। ভ্রুতে চিকচিক করছে একটা ছোট্ট সিলভার রিংয়ের মতন। ইরামের চিনতে কষ্ট হলেও একেবারে অপরিচিত লাগলনা। আপনমনে বিড়বিড় করল সে,
“আলাদিন।”
হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ফটো ফ্রেমের মুখটা ছুঁয়ে দিল সে। করলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ। মাথায় হুট করে ভয়ানক এক পরিকল্পনা এলো তার। এমন এক পরিকল্পনা যা হয় তার আশেপাশের সবকিছু ধ্বংস করে দেবে, নাহয় তাকে ধ্বংস করে দেবে। তবে সুরক্ষিত থাকবে একটাই মানুষ। তার ছেলে, ইযান।
এমন সময়ে মৃদু পদশব্দ ভেসে এলো। রুমে ঢুকলেন সামিয়া। হাতে একটা ট্রে। তাতে খাবার আর জুস। ট্রেটা নাইটস্ট্যান্ডে রেখে অতি সাবধানে ঘুমন্ত ইযানের পাশে বসলেন তিনি। ইরামকে বললেন,
“কিছু খেয়ে নে।”
ইরাম ফিরে তাকালনা। তখনো সাইবানের ছবিটা দেখে যাচ্ছে সে। তারপর হুট করে শুধাল,
“তোমার ছেলে?”
সামিয়া খানিকটা চমকালেন। ইরামকে সাইবানের ছবির দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বললেন,
“হুম।”
“বদলে গিয়েছে অনেকটা। শুরুতে চিনতেই পারিনি।”
“হয়ত।”
“বয়স কত ওর? ২৬ হয়েছে?”
“২৫ এর বেশি, কিন্তু ২৬ হয়নি। কেন বল তো?”
ইরাম উত্তর করলনা। নিঃশব্দে বিছানার এক কোণায় বসল। জুসের গ্লাসটা তুলে চুমুক দিল। সামিয়া ইরামকে পর্যবেক্ষণ করলেন। মেয়েটার মুখটা কি মলিন! চোয়ালের দিকটা চেপে গেছে, অথচ আগে গাল দুটো ছিল ফোলা ফোলা, চাপলে নরম বালিশের মতন লাগত। উজ্জ্বল চোখে ক্লান্তির ছায়া। যেন জীবনের ভার বইতে বইতে হাঁপিয়ে যাওয়া এক পথিক। সামিয়া হাতের মুঠো শক্ত করে ফেললেন। বুকের ভেতরটায় ভাঙচুর হলো তার। অথচ কিছুই করার নেই। তিনি বললেন,
“খুব কি সমস্যায় ছিলি? আগে জানালি না কেন? আমি আর তোর খালু কেউ না কেউ কিছু অন্তত করার চেষ্টা করতাম।”
ইরামের ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটল। পরিহাসের হাসি। জুসের গ্লাসটা রেখে দিতে দিতে সে আচমকা বলে বসল,
“জন্মের আগেই যারা পর করে দিয়েছে তাদের কাছে আবার কিসের আবদার?”
চমকালেন সামিয়া। এতটা প্রকটভাবে যে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শরীর কাঁপল তার। দুহাত মুঠো হয়ে গেল। বুকের ভেতর অক্সিজেন পাওয়াটাও যেন দুষ্কর। বিপরীতে ইরাম অতীব শান্ত। ধীরে ধীরে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে।
“তু…তুই…সব…জানিস?”
ইরাম উত্তর করলনা। ফিরেও দেখলনা। সামিয়া ধপাস করে হাঁটু মুড়ে তার পাশে বসে পড়লেন। জোর করে ইরামের একটা হাত তুলে নিজের দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন,
“কবে থেকে? কে বলেছে তোকে?”
“কারো বলতে হয়না। বুদ্ধি থাকলে বোঝা যায়।”
সত্যিকার কাহিনীটা সামিয়াকে জানালনা সে। আজকের কথা নয়, বরং আরও অনেক বছর আগে থেকেই সে জানে, যে বাড়িতে থাকছে, যাদের মানুষ করছে তারা আসলে ইরামের পরিবার নয়। সত্যিটা সে জেনেছে ১৫ বছর বয়সে, কিবরিয়া সাহেব আর লামিয়ার কথোপকথন ভুলক্রমে শুনে ফেলার মাধ্যমে। কেউ জানে না, একটা কাকপক্ষীও জানেনা সেই কথা। এতগুলো বছর বুকে পাথর চাপা দিয়ে সেই সত্য চেপে রেখেছে সে। কারণ, ওই মুহূর্তে তার কিছু যায় আসেনি আর। যে পরিবার তাকে জন্মের সময়ই ত্যাগ করেছে, সেই পরিবারের প্রতি কিসের টান অনুভব করবে সে? রাহাত আর ইহানই তার আপন ভাই, হ্যাঁ, ওরাই ইরামের র*ক্তের বন্ধন, অন্য কেউ নয়, হতে পারেনা!
সামিয়ার চোখজোড়া টলটলে হলো ইরামের উত্তর শুনে। দুহাত বাড়িয়ে মেয়ের মুখটা ধরতে চাইলেও ইরাম তার কব্জি ধরে ফেলল। দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
“আমার মতের বিরুদ্ধে আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছিল, খালামণি? যদি বিলিয়ে দেয়ারই ছিল, তবে জন্ম কেন দিয়েছিলে? সত্যি বলতে, আই ডোন্ট কেয়ার। যারা জন্ম থেকে এতগুলো বছর পরোয়াহীন কাটিয়ে দিয়েছে তাদের কাছে আমার আর কোনো অধিকারের দাবী নেই।”
“না। ইরাম, মা আমার…আমরা অমনটা চাইনি। তোর আব্বু, আহমদের কোনো দোষ নেই। শুধু আমিই…”
“শুধু তুমিই। ঠিকই বলেছ। শুধু তুমিই ছিলে, আর তোমার পাশে ছিল তোমার স্বামী। ওই বাড়িতে পরে থাকা সন্তানকে আপন মনে হয়নি তোমাদের, আপন করে নিয়েছ বাইরের কোনো র*ক্তকে।”
সামিয়া এবার বুঝি বজ্রাহত হলেন। মুখে হাতচাপা দিলেন। ইযান ঘুমে না থাকলে তিনি নির্ঘাত চিৎকার করে বসতেন। থেকে থেকে কাঁপতে লাগল শরীর তার। ইরাম আজ নির্দয়। ভ্রু কুঁচকে সে বলল,
“এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাত বছর ছিল আমার যখন তোমার বাড়িতে ছেলে এসেছে। এতটাও অবুঝ ছিলাম না। সত্য কখনো চাপা থাকে না। বের হওয়ার হলে ঠিকই বেরিয়ে যায়, যেকোনো উপায়ে।”
সামিয়ার পুরাতন স্মৃতিগুলো মনে পড়ল। যেদিন ছেলে সাইবানকে প্রথম ঘরে এনেছিলেন, সেদিন মুন্সীবাড়ির সবাই দেখতে এসেছিল। মুন্সীবাড়ি বলতে শুধু কিবরিয়া সাহেব, তার বোন লামিয়া, ইরাম আর রাহাত। ইহানের তখনো জন্ম হয়নি। রাহাতও একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু। সেদিনই পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সাইবানকে দত্তক নেয়ার কথা কোনোদিন দুই কান করা হবেনা। সে বেড়ে উঠবে এই পরিবারের অংশ হিসাবেই। ঠিক যেমনভাবে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল বহু বছর আগে আরেক সত্য, যে ইরাম আসলে সামিয়া আর আহমদের সন্তান। পাড়া প্রতিবেশীদের থেকে বহু ছলচাতুরী করে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল ভয়ংকর দুই সত্যকে।
কিন্তু সেই সব সত্য ইরাম জানে? কীভাবে জানল? কখন? লামিয়া বলেছে? নাকি কিবরিয়া সাহেব? সামিয়ার মাথায় ঢুকলনা। বুকে প্রচন্ড উৎকণ্ঠা ভর করল। মেয়ের হাত আঁকড়ে ধরলেন তিনি করুণ আবেগে,
“প্লীজ। সাইবানকে বলিস না। ম*রে যাবে আমার ছেলেটা!”
নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ইরাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরক্ষণে সূক্ষ্ম হাসল।
“তোমার ছেলে। সে বাঁচল কি ম*রল তাতে আমার কী আসে যায়? তোমাদের তো কোনোদিন আমার জন্য যায় আসেনি।”
সামিয়ার চোখ বেয়ে একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মেয়ের লতানো হাতটা তিনি কপালে ঠেকালেন, ফুঁপিয়ে বললেন,
“সব আমার পাপের ফল, সব আমার পাপের শাস্তি। তোকে নিজের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করেছি, সেই জঘণ্য কর্মের প্রতিফল। যা করার আমাকে কর, যা দোষ দেয়ার আমায় দে। কিন্তু আমার ছেলেটা যে নিষ্পাপ। ওকে কোনোদিন সত্যিটা জানতে দেয়া যাবে না। যদি জানে, আমার ছেলেটা ধ্বংস হয়ে যাবে রে। একটু দয়া কর এই অধম মাকে? একটু?”
ইরামের মায়া হলো। আর তাতে সে নিজের উপর যারপরনাই বিরক্ত হলো। মায়া! আবেগ! এই অনুভূতিগুলোই তো তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুয়ারে। তাই মায়া করতে গিয়েও করতে পারলনা সে। ইযানের মুখটা নজরে এলো। নিষ্পাপ তো তার নিজের ছেলেটাও। তার কি অধিকার নেই সুন্দরভাবে বাঁচার? যদি এই মানুষগুলো তাকে পরিত্যাগ না করতো, তবে হয়ত তারও একটা চমৎকার জীবন হতো। বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব হলো। আবেগ আর বাস্তবতার দ্বন্দ্বে জয়ী হলো বাস্তবতা। ইরাম ঝুঁকে এসে সামিয়ার মুখটা ধরে নিজের দিকে ফেরাল। ঠান্ডা কন্ঠে শুধাল,
“যদি বিনিময়ে কিছু চাই, তবে কী আমি স্বার্থপর সন্তান হয়ে যাব?”
সামিয়া চোখ মুছে জোরে জোরে ডানে বামে মাথা নাড়লেন। আর্তনাদ তুলে বললেন,
“একদম না! বল তোর কী চাই? তোর উপর আমি আর একফোঁটা কষ্টের আঁচ আসতে দেবনা। তোকে আমি সুখে সুখে মুড়িয়ে রাখব। তোকে, আমার নাতিকে আমি এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখব যে আর কোনোদিন যন্ত্রণা খুঁজে পাবেনা তোদের। বল, আর কী চাই তোর?”
ইরামের চেহারায় নিরেট ছায়া নেমে এলো। গভীর গলায় সে জানাল,
“তোমার ছেলেকে চাই।”
─────────────────────────────
একটা দিন। কয়েকটা ঘন্টা। এই তুচ্ছ সময়টুকুরই দরকার ছিল সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে দিতে, এমন সব সত্যকে উদঘাটন করতে যাদের ক*বর খুদা হয়েছিল বহু বছর আগে। অবিশ্বাস, বিশ্বাস, ভরসা, বিশ্বাসঘাতকতা এই সবগুলো শব্দ যেন আজ নিজেদের অর্থ হারিয়েছে। কে আপন? আর কেই বা পর? বোঝা বড়ই মুশকিল। এজন্যই হয়ত বাউলরা গেয়েছিলেন, আপন মানুষ চেনা বড়ই দায় রে~ আপন মানুষ চেনা বড়ই দায়।
ইরাম বসে আছে সোফায়। উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের দৃষ্টি তার উপর আবদ্ধ। বাকরুদ্ধ তারা। এই একটা দিন এই বাড়ির মানুষগুলোর ভাগ্যে আর কত কষ্ট লিখে রেখেছে সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। ইরামের শরীর পাথরের মতন স্থির। চেহারায় হালকা অপরাধবোধ। দুহাত কোলের উপর রেখে কলের পুতুলের মতন বসে আছে সে। কেউ তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করছে না, সেও আর কিছু বলছে না। তবে বেহায়া চোখ দুটো ঠিকই ফিরে ফিরে যাচ্ছে সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো স্বামীর দিকে। সাইবান দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতন। চেহারাটা দেখাচ্ছে খাতার সাদা পৃষ্ঠার ন্যায়। চোখ দুটো নিভু নিভু তারা যেন। ঠোঁটজোড়ায় এক ইঞ্চি অবিশ্বাসের ফাঁক। যেন জেগে জেগে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। ইরামের বুকের ভেতর তোলপাড় হলো। অথচ সে আজ নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলনা। অনেক হয়েছে। আজ হয় এসপার নয় ওসপার।
সকলের দীর্ঘ নিস্তব্ধতা ভাঙল ইরামই। কোলের উপর রাখা হাতদুটো মুঠো পাকিয়ে জানাল,
“তুমি যেদিন গভীর রাতে বাইরে গিয়ে তিতলির জন্য মা*রামা*রি করে এসেছিলে, সেদিন তোমাকে বকলেও আমি মনে মনে খুশি হয়েছিলাম।”
সাইবানের মধ্যে পরিবর্তন এলোনা। ইরামের দিকে তাকিয়ে নেই সে। তবে সে যে সবটাই শুনছে এটা পরিষ্কার। তাই ইরাম বলে গেল,
“আমি এমন একজনকে চেয়েছিলাম যে আমার আর ইযানের জন্য অরণ্যর সাথে লড়াই করতে পারে। যে শক্ত খুঁটি হয়ে আমাদের আগলে রাখতে পারে। যে ওই লোকটার মুখোমুখি হওয়ার দুঃসাহস রাখে। আমি জানি, অরণ্যর সাথে তোমার অনেক আগেই বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল। আর প্রত্যেকবার তুমি আমার কাছ থেকে সেসব লুকিয়ে গিয়েছ যেন আমি ভয় না পাই।”
“আর কী কী জানেন আপনি?”
সাইবানের কন্ঠ ভেসে এলো। বড্ড নিষ্প্রাণ তা। ইরাম ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল, বলল,
“এমন অনেক কিছুই যা তুমি আমার কাছ থেকে লুকিয়েছ। আমি প্রশ্ন করিনি, তার অর্থ এই না যে আমি কিছু বুঝতে পারিনা। আমার আব্বু আম্মুও মনে করতো, আমি খুব অবুঝ। চেহারাটা বড্ড নির্মল আর নিষ্পাপ কিনা! তবে সদ্য কৈশোরে পদার্পণ করেই আমি শিখেছিলাম, যত চুপ থাকা যায়, যত অবুঝ থাকা যায়, ততই মঙ্গল। মানুষ যখন তোমাকে গুটি হিসাবে ব্যবহার করে, সে তখন বুঝতেই পারেনা তুমি আসলে খেলোয়াড়।”
সাইবান এবার আর কোনো কথা বললনা। মিসিরের বুকে মাথা গুঁজে রাখা সারিকা এবার তেঁতে উঠল বেশ। আর কত সহ্য করা যায়? প্রথমে সামিয়া, এবার ইরাম! দুজন মিলে তাদের গোটা বংশকে নাচিয়ে ছেড়েছে! হতে পারে তারা তার আপনজন, মা আর মায়ের পেটের বোন! তাতে কী? সারিকার কিচ্ছু যায় আসে না! আঙুল তুলে ইরামকে শাসাল সে,
“আপনি একটা পাষাণ মহিলা! যবে থেকে আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন, তবে থেকে আমাদের পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এখন আমি বুঝতে পারছি, ড্যাড কেন নিজের মেয়েকেই দেখতে পারেনা! একদম ঠিক করেছে ড্যাড আর মম আপনাকে ওই বাড়িতে ফেলে দিয়ে! আপনি একটা আবর্জনা! স্বার্থপর কোথাকার!”
ইরাম প্রত্যুত্তর করলনা। ওভাবেই বসে রইল। তার মাঝে কোনোপ্রকার অনুভূতিও দেখা গেলনা।
“সরি, আমার আর যাত্রাপালা দেখার মুড নেই।”
বাক্যটা ভেসে এলো আহমদের পক্ষ থেকে। কারো দিকেই তিনি আর তাকালেন না। হেঁটে হেঁটে গায়েব হয়ে গেলেন অন্দরমহলে। অপরদিকে মিসির এগিয়ে সারিকার কাঁধে হাত চেপে ইশারায় স্ত্রীকে শান্ত থাকতে বলল। সামিয়াও একদম শূণ্য হয়ে পড়েছেন। মূর্তিমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক কোণায়। ক্ষণে ক্ষণে তার জ্বলজ্বলে চোখজোড়া খুঁজে খুঁজে দেখছে সাইবান আর ইরামকে। দীর্ঘ সময় কেউ কোনো কথা বললনা।
হুট করে নড়ে উঠল সাইবান। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তার উপর আপতিত হলো। কোনোদিকে না চেয়ে সাইবান ধীরে ধীরে হেঁটে এগোল সোফার দিকে। ঠিক যেখানে ইরাম বসমান। কাছে পৌঁছে সে আস্তে করে হাঁটু মুড়ে সামনের কার্পেটে বসল। মুখ তুলে শুষ্ক চোখে তাকাল অর্ধাঙ্গিনীর নয়ন বরাবর। প্রশান্ত গলায় বলল,
“আপনি আমাকে ব্যবহার করেছেন।”
ইরাম চোখ সরিয়ে নিল। বুকের ভেতর উথাল পাথাল ঢেউ উঠল। সাইবান দ্বিতীয় দফায় বলল,
“আপনার আমার উপর চাপা ক্ষোভ ছিল। এই পরিবার আপনার হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত আমার হয়ে গেছে। আমি সেই সবকিছু পেয়েছি যা আপনার পাওয়ার কথা ছিল।”
সাইবানের ইচ্ছা হলো ইরাম অস্বীকার করুক, অন্তত কিছু একটা বলুক প্রতিবাদস্বরূপ। অথচ ইরামের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল। কোলের দিকে চেয়ে সে জানাল,
“কারেক্ট। আমি যা পাইনি তুমি তা পাবে কেন?”
“এজন্য আপনি আমাকে তুরুপের তাসের মতন ব্যবহার করেছেন। যখন আমি ভাবছিলাম দাবা খেলাটা হচ্ছিল আমার আর আপনার অতীতের ভেতর, তখন পর্দার আড়াল থেকে দাবার গুটিটা আপনি চালছিলেন।”
“হ্যাঁ। দাবা খেলায় আমি বরাবরই ভালো ছিলাম। অস্বীকার করতে পারো?”
সাইবান জানেনা কেমন অনুভব করল সে। অনুভূতিরাও মূল্য হারিয়েছে সম্পূর্ণ। তবুও ঝুঁকে এলো সে। শেষ একটা ক্ষীণ আশার আলো আঁকড়ে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করল,
“অ্যাট লিস্ট….ডিড ইউ লাভ মি?”
ইরামের চোখের দৃষ্টি এবার বদলালো। ঘোলাটে হলো। মুখ তুলে সাইবানের নয়ন বরাবর তাকাল। সাইবান আবারও ফিসফিসাল,
“ডিড ইউ?”
“নো।”
দ্বিধাহীন উত্তর করল ইরাম। পুনরায় বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না, আলাদিন।”
—চলবে—
[ বি দ্রঃ সাইবানকে সামিয়া ফর্মুলা মিল্ক খাইয়ে বড় করেছেন। আর আজকের পর্বে ক্লিয়ারলি বলা আছে সামিয়া ইরামকে বুকের দুধ পর্যন্ত পান করতে দেননি। তাই ইরাম কিংবা সাইবান কেউ দুধ ভাইবোন নয়। আশা করি কনফিউশন দূর করতে পেরেছি। থ্যাংক ইউ।
]
#আমার_আলাদিন
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৬৭ (শেষাংশ)
“আমি শুরুতেই বলেছিলাম, এই সম্পর্ক শুধুমাত্র একটা প্রয়োজন। সেখানে তুমি যদি নিজেকে অনুভূতির বেড়াজালে বেঁধে ফেল সেই দায় তো আমার নয়, রাইট?”
চোখের সামনে এ কোন ইরাম বসে আছে? সাইবান আজ একটুও চিনতে পারছেনা। চিনতে পারছে না এতকাল যাবৎ জন্মদাত্রী ভেবে আসা মাকে, চিনতে পারছেনা ভালোবাসার মানুষটাকে। এই দুনিয়া এত স্বার্থপর কেন? সাইবানের মাঝে রাগ, দুঃখ, অভিমান, কষ্ট, যন্ত্রণা কোনো অনুভূতিই আর হচ্ছে না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। রূপ বদলানো মানুষগুলোকে দেখছে যাদের সে আপনের চাইতেও আপন ভেবে এসেছে। ইরামের চেহারা অতীব শান্ত। ওই চেহারায় কোনো আক্ষেপ, মায়া, করুণা কিছুই নেই। অচেনা এক রমণী। যার সম্পর্কে সাইবানের কোনো ধারণাই নেই। ইরাম স্বামীর মায়াবী মুখটার দিকে তাকাল। সেখানে এখনো বিশাল অবিশ্বাস। সাইবান কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে তার কোলের উপর রাখা হাতটা ধরতে চাইল, কিন্ত শেষমেষ ধরলনা। মাথা নিচু করে পথ হারানো শিশুর মতন আতঙ্ক নিয়ে ফিসফিস করল,
“আপনি শুধু একটিবার বলুন সবকিছু মিথ্যা। আমি এক বাক্যে আপনাকে বিশ্বাস করে নেব।”
“এত বোকা কেন তুমি?”
নির্দয়ভাবে বলল ইরাম। ঝুঁকে এসে সাইবানের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘোরাল। বলল,
“তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমি জানি। তবে একটা সত্যি কথা বলি? তুমি আমি মানুষটাকে ভালোবাসো, আমার পরিচয়গুলোকে নয়। ডিভোর্সি, পরপুরুষের বাচ্চার মা, এগুলোই আমার স্বতন্ত্র পরিচয়। তুমি ভালোবাসো সেই ইরামকে, যে ইরাম এককালে তোমার কমফোর্ট জোন ছিল। অকলুষিত ছিল। যাকে তুমি মনের কথা সব খুলে বলতে পারতে বিনা দ্বিধায়। যার সামনে তোমাকে মুখোশ পরে চলতে হতনা। তুমি ব্যক্তি ইরামকে ভালোবেসেছ। মা ইরামকে ভালোবাসতে পারোনি। ডিভোর্সি ইরামকে ভালোবাসতে পারোনি। নাহলে যখন সত্যিটা জানলে, তখন তোমার প্রথম প্রশ্নই নিজের মেয়ে বলে ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মাকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছ? এটা হতো না আলাদিন।”
সাইবান কিছু বলতে পারলনা। বাক্যহারা সে। মস্তিষ্ক কোনোকিছুর তাল মেলাতে পারছে না। ইরাম অপর হাতটাও সাইবানের গালে ঠেকাল। দু হাতের আজলায় তার মুখটা তুলে বলে গেল,
“এজন্য আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আমাদের সমাজটাই এমন। এই সমাজের জীব আমরা, তাই আমাদের মানসিকতাটা জন্মগত। চাইলেই আমরা সেটাকে উপেক্ষা করতে পারিনা। দিনশেষে সত্য এটাই যে এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার কারো অনুভূতি নিয়ে আর কিছু যায় আসেনা। এই বিয়েটা আমি আমার ছেলের স্বার্থে করেছিলাম। সেই স্বার্থ অনেকটাই হাসিল করে ফেলেছি। তবে আমি চাইনি, সত্যটা এভাবে তোমার সামনে খোলাসা হোক।”
সাইবান নিগূঢ় নয়নে তাকাল ইরামের দিকে। তার চোখ দুটো টলটল করে উঠল। শেষ একবার অতি আবেগঘন কণ্ঠে সে শুধাল,
“যদি…যদি এসব না হতো…যদি আমি কিছুই জানতে না পারতাম…তবে…তবে কি কোনো একদিন আপনি আমাকে নিজে থেকে সত্য বলতেন?”
ইরাম কয়েক সেকেন্ড গভীর দৃষ্টিতে সাইবানের মুখের পানে চেয়ে রইল। তারপর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে জানাল,
“না। কোনোদিন জানতে দিতাম না।”
এটুকুই। উঠে পড়ল ইরাম। সকলকে এড়িয়ে চলে গেল সিঁড়ির দিকে। দপদপ পা ফেলে উপরে উঠে আড়াল হয়ে গেল বেডরুমে। অপরদিকে তখনো সেখানে ঠাঁয় বসে রইল সাইবান। চোখে একফোঁটা অশ্রুও আর নেই তার। পিছনে তখনো সারিকা, সামিয়া এবং মিসির দন্ডায়মান। অথচ কেউ কিছু বলতে পারলনা। কী বলবে? শান্তনা দেয়ার মতন কিছুও তো আর বাকি নেই। অপরদিকে সামিয়া ভয়ে আছেন। তিনি কাছে গেলেই যদি তার ছেলে উত্তেজিত হয়ে পড়ে? যদি ঘৃণার চোখে তাকে দেখে? সেই দৃষ্টি তিনি সইতে পারবেন না।
অথচ সকলকে হতবাক করে দিয়ে বাড়ির সবথেকে দুষ্টু, বদমেজাজী, রগচটা আর বেপরোয়া ছেলেটা আজ কিছুই করলনা। না কোনো চিৎকার, না কোনো ভাঙচুর, না কোনো অতিপ্রাকৃত উপস্থাপন। ইরাম চলে যেতেই সেও মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। কারো দিকে তাকাল না। একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। আজ কেউ তাকে আটকাল না, পিছু ডাকল না। যেন এই বাড়ির মায়ার সম্পর্কটা তার জন্য ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
─────────────────────────────
বিশাল বিছানায় শরীর এলিয়ে বেশ শান্তি অনুভূত হলো অরণ্যর। বুকটা একটু হালকা লাগছে তার। আজ রাতে ভালো ঘুম হবে। মনে মনে ভাবলেও হৃদয়ের এক কোণে জমা হওয়া একটা খচখচে অনুভূতিকে সে কিছুতেই দূর করতে পারছেনা। বারবার ক্যাসেটের মতন চোখে ভাসছে আদালতের সেই দৃশ্যটা। সাইবান আর তার বুকে ইযান। অরণ্যর এবার বেশ রাগ হলো। বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল সে। এক হাতে চুল খামচে ধরল সে।
“যাহ শালা!”
দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে ইয়োগার আসনে বসে নিজেকে শান্ত করতে চাইল অরণ্য। অনেকটা সফলও হলো। তবে তার ধ্যান ভাঙল ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে। হাত বাড়িয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে সেটা নিয়ে অচেনা নাম্বার দেখে মেজাজ আবারও বিগড়ে গেল অরণ্যর। ইচ্ছা হলো ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে। কিন্তু শেষমেশ কি মনে করে যেন রিসিভ করল,
“হ্যালো?”
“পার্টি করছেন?”
ওপাশের কন্ঠটা শুনে জমে গেল অরণ্য। কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রত্যুত্তর করতে পারলনা। বিশ্বাসই হতে চাইলনা তার। বারবার ফোনের স্ক্রিন দেখল অবিশ্বাস নিয়ে। যখন বুঝল, না, স্বপ্ন নয়, তখন তার চেহারায় বিরাট হাসি ফুটল। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ফোন কানে চেপে নতুন প্রেমে পড়া প্রেমিকের মতন ঢং করে বলল,
“অবশ্যই মিসেস মির্জা সওদাগর। ওয়ানা জয়েন?”
ওপাশ থেকে ইরামের ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ ভেসে এলো। এক সেকেন্ডের জন্য অরণ্যর মনে হলো, মেয়েটা বুঝি কাঁদছে। অথচ পরক্ষণেই তাকে অবাক করে দিয়ে ইরামের দৃপ্ত কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
“জি। পার্টি তো এবার আমি করব আপনার সঙ্গে।”
“গাড়ি পাঠাব? না না, আমি নিজেই আসছি। কোন ক্লাবে যাবে বলো?”
“কবরস্থান।”
অরণ্য হতচকিত হলো। পরক্ষণেই রুম কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসতে লাগল। শুষ্ক ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল,
“ওহ মাই ফেইস্টি কিটেন! তোমার সাথে শুধু কবরস্থান কেন? কবরে যেতেও রাজী আছি। খুঁড়তে বলব একটা? একসাথে ঘর বাঁধব দুজন।”
কয়েক মুহূর্ত ইরাম কোনো কথা বললনা। অরণ্য ভাবল ফোন কেটে দিয়েছে বুঝি। তাই সে ডেকে উঠল,
“হ্যালো? বলতে বলতে স্বপ্ন দেখাও শুরু করে দিয়েছ নাকি?”
“আপনি আজ অনেক খুশি, তাইনা অরণ্য? কারণ আপনার খুশি আমার কষ্টের সমানুপাতিক।”
অরণ্য এক সেকেন্ডের জন্য থমকাল। ইরামের কন্ঠটা অন্যরকম শোনাচ্ছে। ঠিক রাগী নয় আবার দুঃখীও নয়। কেমন যেন, ঘোলাটে, ভরাট, অদ্ভুতুড়ে। ইরামকে এভাবে কথা বলতে সে আগে শোনেনি। সে চুপ করে গেলেও ইরাম থেমে নেই,
“আমি কি ভেবেছিলাম জানেন? ভেবেছিলাম আপনাকে এড়িয়ে যাওয়াটাই আসল আত্মরক্ষা। ভেবেছিলাম যদি আমি দূরে সরে যাই, চুপ থাকি, ভালো থাকি, নিজের মতন থাকি তাহলে আপনি আমার জীবনে দখলদারিত্ব করতে আসবেন না। সেটা আমার প্রথম ভুল ছিল। আর আমার দ্বিতীয় ভুল হলো আপনার বিরুদ্ধে অন্য কাউকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা। আমি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম, আমার ছেলেটাকে সকল কলুষতা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম, অন্যকে ঢাল বানিয়ে নিজের হাত সাফ রাখতে চেয়েছিলাম। বুঝতে পারিনি, ছু*রি দিয়ে ডাব কাটা যায়না, তার জন্য দা কে মাঠে নামতে হয়।”
এবার সত্যিই কেমন যেন লাগল অরণ্যর। চেহারাটা কঠিন হয়ে উঠল তার। এই মেয়ে কি কোনোভাবে তাকে হুমকি দিচ্ছে? সেই সাহস তো তার ভালোবাসার ইরামের কস্মিনকালেও ছিলনা! অরণ্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আমাকে ছাড়া থাকতে থাকতে তুমি দিশেহারা হয়ে পড়েছ। তোমাকে তো বলেছিলামই কবিতা, আমার দুয়ারে তোমাকে ফিরতেই হবে। এইযে, দুয়ার খোলাই আছে, পায়ে পায়ে চুপটি করে চলে এসো। আমি তোমাকে এমন সুখ দেব যা তোমাকে অতীতের অরণ্য মির্জা সওদাগরও দিতে পারেনি।”
“সুখ তো আমি আপনাকে দেব, মরণের সুখ।”
অরণ্যর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। কিন্তু সে পাল্টা কিছু বলার আগেই ইরাম পুনরায় বলল,
“আপনি এবার খুব ভয়ানক জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছেন। আপনি হাত দেয়ার আগে বুঝতে পারিনি, জায়গাটা আসলেই কতটা ভয়ানক হয়ে উঠেছে আমার জন্য। ইযানের গায়ে এক লোক এ*সিড মা*রতে চেয়েছিল, সোজা দা ঢু*কিয়ে দিয়েছি তার পিঠে। তাহলে আমি আপনার সঙ্গে কি করব মিস্টার মির্জা? ভাবতে থাকুন আর প্রস্তুত থাকুন। কারণ ইরাম কিবরিয়া অসহায়, ভীতু হলেও ইযানের মা ভয়ংকর দুঃসাহসী, স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর!”
ফোনটা কেটে গেল। অরণ্য বাকরুদ্ধ বসে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে।
─────────────────────────────
অনুরাগের বাবা মা আজ বাড়িতে নেই। গিয়েছেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। দুদিন সেখানেই থাকবেন তাই বাড়িটা পুরোপুরি ফাঁকা। সেই ফাঁকা বাড়ির ভেতরে বসেছে বন্ধুদের আসর। তবে আজকের আসরে কোনো আনন্দ নেই, হাসি ঠাট্টা নেই, একে অপরের সঙ্গে মজা করার বালাই নেই। শুধু খাঁ খাঁ শূন্যতা। বাতাসটা কেমন যেন ভারী। টেবিলের উপর বরফের বাকেটে দুটো বোতল। চারপাশে গ্লাস। আফনান আর নীরব হালকা পাতলা চুমুক দিলেও অনুরাগ এক ফোঁটা ঠোঁটে ছোঁয়ায়নি। বসে আছে সে বন্ধুর পাশে। সাইবান টেবিলের উপর মাথা রেখে চুপটি করে চোখ বুঁজে আছে। তার মাথার কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে দুটো ক্যান। কয়েকটা ফাঁকা গ্লাস। একটা গ্লাসের নিচে এখনো খানিকটা স্বর্ণালী তরল ভাসছে। সাইবানের অন্য হাতে জ্বলছে সিগারেট। একসঙ্গে দুটো ধরিয়েছে সে। ক্ষণে ক্ষণে অলসভাবে ঠোঁটে দিচ্ছে। বন্ধুদের এমন আড্ডা আগে প্রচুর হলেও সাইবানের বিয়ের পর থেকে একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সিগারেট, ড্রিংকিং ছাঁটাই করে ফেলেছিল ছেলেটা পুরোপুরি। ড্রিংকসের প্রতি আগেও খুব একটা নেশা ছিল না, সিগারেটই যা আসক্তি ছিল। ইরাম আর ইযান জীবনে আসায় সেই আসক্তি ত্যাগ করেছিল সে। অথচ আজ, বুদ হয়েছে আবারও। অনুরাগের বিষয়টা পছন্দ হচ্ছে না। উপরন্তু আফনান আর নীরবের ভূমিকাও ভালো লাগছে না। বন্ধুদের ইশারা করল সে সাইবানকে বোঝাতে, তবে কেউই বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারাও রেগে আছে। তাদের বন্ধুর সাথে এমনটা কেন হবে?
কিছুক্ষণ পর সাইবান নড়েচড়ে উঠল। ঘুম থেকে জেগেছে যেন। হাতের সিগারেট দুটো ফেলে দিয়ে বাকেটের নতুন আরেকটা বোতলের দিকে হাত বাড়াল। সমস্ত মুখ তার লালচে হয়ে গিয়েছে, নেশার ঘোরে একটু টলছেও। নাক টানছে, চোখ দুটোতে যেন হাজার রাত্রির জমানো ঘুম বাসা বেঁধেছে। বোতলটা সাইবান ধরতে পারলনা। এর আগেই অনুরাগ খপ করে তার হাত ধরে বলল,
“আর না। এবার বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে।”
সাইবানের ভ্রু কুঁচকে এলো।
“তোর…টাকায় কিনেছি…শালা?!”
থাপড়ে অনুরাগের হাতটা সরিয়ে বোতলটা তুলে নিল সাইবান। তার জিভ জড়িয়ে গিয়েছে, কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে। তবুও ক্ষান্ত দিলনা সে। কামড়ে ক্যাপ খুলে বোতলে সরাসরি চুমুক দিল। গ্লাসে ঢেলে পানি বা সোডা মেশানোরও প্রয়োজনবোধ করলনা। ঢকঢক করে পান করতে লাগল যেন তরল পানি গলায় ঢালছে। খানিকটা ঠোঁটের কোণ বেয়ে তার গলা বেয়ে গড়িয়ে নেমে গেল বুক অব্দি। পরোয়াও করলনা। অনুরাগ বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল, শক্ত গলায় বলল,
“নিজেকে সামলা সাইবান। এখন পাগলামি করার সময় না। তোর একটা গোটা পরিবার আছে, কত দায়িত্ব মাথায় আছে। জানি তোর কষ্ট হচ্ছে, তবুও। প্লীজ। গেট আ হোল্ড অব ইওরসেল্ফ। তুই পুরুষ মানুষ।”
বোতল থেকে মুখ সরিয়ে খানিক কাশল সাইবান। তারপর বুক চেপে আচমকা বলে উঠল,
“কেন? পুরুষ মানুষ বলে কি বুকের ভেতর মন বলে কিছু নেই? পুরুষ মানুষ বলে কি আমার খারাপ লাগে না? সামলাবো? কীভাবে সামলাবো আমি? ২৫ টা বছর যাকে মা বলে ডেকেছি, সে নাকি আমার মা না! এতগুলো দিন যাকে ভালোবেসে এসেছি, সে নাকি আমায় ভালোবাসে না! কীভাবে বিশ্বাস করব আমি? কীভাবে মানতে বলিস আমাকে? ২৫ বছরের হিসাব আমি একদিনে কীভাবে হজম করব?”
সাইবানের আঁখিজোড়া টলটলে হলো। অথচ এক ফোঁটা অশ্রুও সে গড়াতে দিলনা। চোখ বুঁজে বোতলে আবারও চুমুক দিল। যতটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকুও শেষ করে ফেলল।
“সরি টু সে বাট, এই বিয়ে নিয়ে আমার আগেই খটকা লেগেছিল। সামিয়া আন্টির জোরাজুরি, তোর চাইতে বয়সে বড় একজন মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য করা, একটুখানি সন্দেহ তো হবেই। নেহায়েত বন্ধু বলে তখন মুখ ফুটে কিছু বলিনি। তাছাড়া তুই ওদের জন্য যা করেছিস, এরপর আর বলার মুখ ছিল না আমার। তোকে এভাবে ঠকাবে আমিও ভাবতে পারিনি।”
ধীরস্থিরভাবে বলল নীরব। টেবিলে আঙুল ঘষছে সে আনমনে। সাইবান বন্ধুর কথা শুনলেও কিছু বললনা। মজে রইল পানীয়ে। অনুরাগ নীরবকে ধমক দিল,
“এই চুপ! তোকে কেউ কারো চরিত্রের বিশ্লেষক বানিয়েছে? কেইস লড়তে লড়তে মাথাটা গেছে একদম। আগুন লেগেছে, কোথায় দমকল বাহিনী হয়ে পানি ঢালবি তা না পেট্রোল ছেটাচ্ছিস।”
ভ্রু কুঁচকে এবার খানিকটা গম্ভীর হলো অনুরাগ,
“তাছাড়া কোনো মানুষকে কখনো একপাক্ষিক বিচার করা উচিত না। সবাই এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়না।”
“কিন্তু তুই কি অস্বীকার করতে পারিস সাইবানের সঙ্গে ওদের গোটা গুষ্টি মিলে অন্যায় করেনি?”
নীরবের যুক্তির পিছনে এবার চুপ করে গেল অনুরাগ। মাথা থেকে ওসব চিন্তা ঝেড়ে বন্ধুর দিকে মনোযোগ দিল। আফনান একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে। তাই সে হঠাৎ নিজের গ্লাস উঁচিয়ে জোর গলায় বলে বসল,
“সব ওই বুড়ি মহিলার দোষ! ডিভোর্সি ভাম কোথাকার! স্বামীর একটু আদর সোহাগ পেয়েছে তো তাই মাথায় উঠে গিয়েছে। ওটাকে পায়ের নিচে তিনবেলা উত্তম মধ্যমের উপর রাখার দরকার ছিল। ৩২ বছরের আন্টি, বুড়ির সাথে বুইড়া দাদু বিয়ে না বসে ফাঁসিয়েছে আমার আলাভোলা জুয়ান বন্ধুটাকে। সাংঘাতিক লোভী মহিলা! ঠকবাজ! জোচ্চর!”
প্রথমটায় চারদিকে পিনপতন নীরবতা রইল। কেউই কিছু বললনা। অতঃপর টলতে টলতে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সাইবান। ঘুরে আফনানের কাঁধে হাত রাখল। উঠিয়ে দাঁড় করাল। আফনানও চোখে খানিক ঝাপসা দেখছে বিধায় কিছু বুঝতে পারলনা। সরলভাবে বন্ধুর সামনে দাঁড়াতেই আচমকা সাইবানের শক্তিশালী ঘুষি আছড়ে পড়ল তার চোয়াল বরাবর। ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল আফনান। কুঁকড়ে গেল ব্যথায়। কান্ড দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল বাকিরা। সাইবান ঝুঁকে আফনানের কলার ধরে সপাসপ দুই গালে দুটো থাপ্পড় দিল। দাঁত কিড়মিড় করে হিংস্র কন্ঠে বলল,
“হুশ করে কথা বলবি! পরেরবার মাটিতে পুঁতে ফেলব, হারামজাদা!”
অনুরাগ আর নীরব দৌঁড়ে এসে তাদের ছাড়াল। আফনান বেকায়দায় পড়ে গিয়েছে। বন্ধুর কাছে এমন আগ্রাসী আচরণ আশা করেনি। নীরব তাকে সোফায় বসিয়ে পানি দিল। অপরদিকে অনুরাগ সাইবানকে টেনে পিছিয়ে নিল।
“মাথা ঠাণ্ডা কর। পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই?”
ঝটকা দিয়ে অনুরাগের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সাইবান। সামান্য টললেও টেবিল ধরে নিজেকে সামলে ফেলল। হাতের উল্টোপিঠে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছল। তারপর কারো দিকে না তাকিয়েই বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে। সবাই প্রথমটায় তাজ্জব বনে গেল। অনুরাগ নীরবকে বলল,
“তুই আফনানকে নিয়ে এখানেই থাক। আমি ওকে বাড়ি দিয়ে আসি।”
নীরব সায় জানাল। অনুরাগ বাবার গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেল। মাঝরাতের দিকে সাইবানকে বাড়িতে পৌঁছে দিল সে। সারা রাস্তা অনেক কিছু বোঝাল। তবে সাইবান কোনো উত্তর করলনা। চুপচাপ বসে থাকল সিটে। বাড়ি আসতেই নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল গাড়ি থেকে। অনুরাগের দিকে ফিরেও তাকালনা। ড্রাইভিং সিটে বসে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে পারল অনুরাগ। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে বসল তার আঙুল। বন্ধুর জন্য আপাতত সে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা বাদে আর কিছুই করতে পারবেনা।
সাইবানের শারীরিক দুলুনি কমেছে। নেশার ঘোর কমে এসেছে। একদম সাধারণভাবেই সে বাড়িতে ঢুকল যেন কিছুই হয়নি। সমস্ত হলরুম ফাঁকা। শুধুমাত্র দূরে সোফার এক কোণায় একটা ছায়ামূর্তি বসমান। সাইবান জানে ওটা সামিয়া। তবে তার দিকে এগোলনা সে। পুরোপুরি উপেক্ষা করে সুনসান বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল দুই তলায়। নিজের রুমে পৌঁছাল। ওহ, নিজের রুম আবার কী? এই বাড়িটাই তো তার হক নয়, সেখানে আর রুম! তবুও হালকা চাপানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। প্রথমটায় অস্বচ্ছ দেখতে পেল। চোখ পিটপিট করতেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হলো। সময়টা মাঝরাত হলেও এখনো জাগ্রত ইরাম। বিছানার পাশে ক্রিবে যথারীতি ঘুমে আচ্ছন্ন ইযান। ইরাম দাঁড়িয়ে নিজের বেশকিছু শাড়ি ভাঁজ ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখছে। তার চেহারাটা শান্ত। অথচ চোখ দুটো কেমন যেন ফোলা ফোলা। লালচে হয়ে আছে। মুখেও ফোলা ভাব। অন্য কোনো সময় হলে সাইবান প্রশ্নবাণে জর্জরিত করত তাকে। আজ কিছুই বললনা। নিঃশব্দে ঢুকে বিছানার এক কোণায় বসে পড়ল।
ইরাম নিজের কাজ থামিয়ে একনজর স্বামীকে দেখল। তারপর পুনরায় কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে কাজ জারি রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ড্রিংক করেছ কেন?”
সাইবান নড়ল না, কোনো উত্তর দিলনা। ঠাঁয় বসে রইল ওভাবেই। ইরাম শাড়ি শেষ করে এবার কামিজগুলো ভাঁজ করতে লাগল। ইযানের কাপড় চোপড় ইতোমধ্যে গোছানো হয়ে গিয়েছে তার। অনেকটা সময় দুজনের মাঝেই অদ্ভুতুড়ে নীরবতা রইল। তারপর একদম হঠাৎ করেই মুখ খুলল সাইবান। জড়ানো খসখসে গলায় বলল,
“আপনি বলেছিলেন যদি আমি না চাই তাহলে আপনি আর আপনার ছেলে আমার জীবন থেকে চলে যাবেন।”
“বলেছিলাম।”
স্বীকার করে নিল ইরাম। কাজ থামিয়ে এবার নাইটস্ট্যান্ড থেকে পানির বোতল তুলে নিল। গ্লাসে ঢেলে ধীরপায়ে এগিয়ে স্বামীর সামনে দাঁড়াল। হাতে দিলনা। নিজের ধরল ঠোঁটের সামনে। সাইবানও আপত্তি করলনা। চুমুক দিয়ে পান করে নিল। ঘোলাটে চোখে দেখল ইরামকে। পানি পান শেষ হতেই ইরাম গ্লাসটা সরিয়ে রাখল। সাইবান হাতের উল্টোপিঠে মুখ মুছে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার ডিলটা এখনো বহাল আছে?”
“হুম।”
সাইবান দীর্ঘ এক মিনিট ইরামের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর গলায় বলল,
“দ্যান লেটস্ গেট ডিভোর্সড।”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ২৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৩৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭০ অন্তিম পর্ব (প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২