Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ৫৬


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা৫৬

পরবর্তী এক ঘণ্টার ভেতর সাইবান পাঁচবার বমি করার পর ইরাম আর বসে থাকতে পারলনা। কুয়াকাটার সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। কিন্ত সেখানে ডাক্তার নেই। বাজে ব্যবস্থা নিয়ে খানিক হম্বিতম্বি করে লাভ হলনা। ইরামও অন্যান্যদের উপর ভরসা করতে পারলনা। কুয়াকাটার যাত্রার সেখানেই সমাপ্তি টেনে সাইবানকে নিয়ে যাওয়া হলো বরিশালের শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ইতোমধ্যে সামিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি ঢাকা থেকে শেরে বাংলায় কর্মরত পরিচিত এক এক্স কলিগকে ফোন দিয়ে আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছিলেন বিধায় সবকিছু প্রস্তুত ছিল। তাকে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার এসে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলেন। সাইবান কি কি খেয়েছে, কি কি করেছে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রক্তচাপ মেপে দেখলেন।
পাশেই চিন্তিত মুখে দন্ডায়মান অনুরাগ এবং সুগন্ধা। বন্ধুর অবস্থা সত্যিই বেগতিক দেখে অনুরাগের উৎফুল্লতা দূর হয়েছে। ভ্রুজোড়ায় হালকা আতঙ্কের ভাঁজ। ইরামের কোলে বাচ্চা থাকায় তাকে বসতে চেয়ার দেয়া হয়েছে। বিছানায় শোয়া সাইবানকে ভালোমত পরীক্ষা করা শেষে ডাক্তার একটি নিঃশ্বাস ফেলে জানালেন,
“আপাতত বদ হজমই মনে হচ্ছে। স্ট্রেস, অতিরিক্ত পরিশ্রম, খাবারে অনিয়ম এবং শারীরিক চাপের কারণে শরীরে ইফেক্ট পড়েছে।”
“গুরুতর কিছু নয়তো?”
অনুরাগের প্রশ্নে মাথা দোলালেন ডাক্তার।
“স্যালাইন দেয়ার পর আরেক দফায় পরীক্ষা করে এরপর নিশ্চিতভাবে বলতে পারব।”
কেউ আর তর্ক করলনা। ডাক্তার নার্সদের নির্দেশনা দিয়ে বিদায় নিলেন। একজন নার্স সবকিছু ঠিকঠাক করতে লাগল, অন্যজন সাইবানের হাতে ক্যানোলা লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিল। ইরাম চেয়ারে বসে বিষাদ দিয়ে দৃশ্যটা দেখল। তার বুকে লেপ্টে থেকে ইযান ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে আছে সামনে।
“অনুরাগ? কি যেন বলছিলি তুই একটু আগে?”
হুট করে সাইবানের দূর্বল কন্ঠস্বর ভেসে এলো। তাতে অনুরাগ ঘাবড়ে গেল। ঘাড়ে হাত রেখে সে শুধাল,
“ক…কই? কখন? কি বলেছি?”
“যখন বাথরুমে ছিলাম। তুই এলি এরপর…?”
অনুরাগ ঢোক গিলে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। দাঁতে জিভ কামড়ে ধরল। সাইবান দূর্বল অবস্থায়ও কটমটে চাহুনি নিক্ষেপ করতে ভুললনা।
“ঢাকায় ফিরে তোকে সাইজ করছি আমি, দাঁড়া।”
“হইছে হইছে, এত প্যাচাল পারেন ক্যান? এক পা কবরে গেছে গা এখনো চোপার জোর কমে না, ঠ্যাংড়া পুরুষ মানুষ!”
সুগন্ধা টিপ্পনী কাটতেই সাইবান রীতিমত বিছানা থেকেই উঠে পড়ছিল, কিন্তু মাথা ঘুরে ওঠায় পুনরায় শুয়ে পড়তে বাধ্য হলো। তবে তার মুখ থামলনা।
“জরিনার আম্মা, দোয়া কর আমার এক পা যেন কবরেই থাকে। কবর থেকে ভুলেও যদি দুই পা বেরিয়ে যায়, শ্মশানঘাটে তোর নামের একটা চিতা রেডি করে রাখিস।”
“অ্যাই চুপ! ভুল কি বলেছে সুগন্ধা? শরীরের বারোটা বাজিয়ে এখন লম্বা লম্বা কথা। চুপ! একদম চুপ!”
হঠাৎ ধমকে উঠল ইরাম। এতক্ষণ যাবৎ কেউ দমাতে না পারলেও অর্ধাঙ্গিনীর কঠোর শাসনে মুহূর্তেই মুখে খিল আঁটলো সাইবান। কাচুমাচু চেহারায় করুণ দৃষ্টিতে তাকাল। বিপরীতে শুধু ইরামের চোখ রাঙানি লাভ করল। নার্স ততক্ষণে ক্যানোলা প্রস্তুত করে ফেলেছে। সুঁচালো প্রান্তটা হাতের পিঠে প্রবেশ করতেই হালকা ব্যথায় হিসিয়ে উঠল সাইবান। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রাখল যেন আর কোনো প্রতিক্রিয়া না বেরোয়। কারোরই খেয়ালে রইলনা সেখানে উপস্থিত অন্য একজনের সম্পূর্ণ দৃশ্যের উপর তীক্ষ্ণ নজর।
ইরামের কোলে বসে থাকা ইযান নিষ্পলক চেয়ে আছে সাইবানের দিকে। নার্স ক্যানোলা লাগানোর পরপরই ছেলেটার ভ্রুজোড়া সামান্য কুঞ্চিত হয়েছে সেটা সে দেখেছে। ঠিক তখনি চিৎকার করে তীক্ষ্ণ গলায় কেঁদে উঠল সে। হাত পা ছুঁড়ে এমনভাবে কাঁদতে লাগল যে তার চেহারা টকটকে লাল হয়ে উঠল। সেই কান্নার ধ্বনি প্রতিফলিত হলো দেয়ালে দেয়ালে। সবাই হতচকিত হয়ে ফিরে দেখল ইযানকে। তাকে এমন ছটফট করতে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল ইরাম। বুকে চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা চালাল,
“এইতো, আব্বু। আম্মু এইখানে, এইযে। না না, আমার সোনা মানিকটা, কাঁদেনা, কাঁদেনা।”
“উআআ! উয়াআ!”
অথচ ইযানের কান্না থামলনা কিছুতেই। সাইবানের দিকে চেয়ে সমানে কেঁদে যাচ্ছে সে। বেড থেকে দৃশ্যটা খেয়াল করে সাইবান মৃদু হেসে নিজের অন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ওকে আমার বুকে দিন।”
ইরাম প্রথমটায় অবাক হলো। তবে পরবর্তীতে মাথা দুলিয়ে এগিয়ে গেল। ক্রন্দনরত ছটফটে ইযানকে আস্তে করে সাবধানে সাইবানের বুকের উপর রাখল। ক্যানোলা সামলে সাইবান ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে আনল,
“আব্বু, এই যে বাবা। বাবার কিছু হয়নি, বাবা একদম ফিট আছে। কাঁদেনা আমার আব্বুটা।”
“উউমম।”
ইযানের ছটফটানি কমে এলো। ছোট্ট ছোট্ট হাত দুখানায় সাইবানের টি শার্ট মুঠো পাকিয়ে ধরে মুখ গুঁজে রইল সে। ইরাম এবং বাকিরা মুগ্ধ চোখে দৃশ্যটা দেখল। তবে বাবার কষ্ট হচ্ছে ভেবেই কাঁদছিল ইযান? ইরামের চোখজোড়া হালকা সিক্ত হলো কেন যেন। এতটা বুঝতে শিখল কবে ইযান? চোখের পলকেই কেমন বড় হয়ে গেল!
সাইবানকে বিশ্রাম দিতে বাকিরা কেবিন থেকে বিদায় নিল। রয়ে গেল শুধু ইরাম আর ইযান। সবাই চলে যেতেই চেয়ারটা বিছানার কাছে টেনে বসল ইরাম। চোখ তুলে দেখল স্যালাইনের ব্যাগ। পরক্ষণে দৃষ্টি নামিয়ে দেখল স্বামী এবং তার বুকে চুপটি করে ফোঁপাতে থাকা সন্তানকে। রমণী হাত বাড়িয়ে সন্তানের মাথা আলতোভাবে ছুঁয়ে দিল। তাতে লজ্জাবতীর ন্যায় আরও নেতিয়ে গেল ইযান। দৃশ্যটা এতটাই মোহনীয় যে চোখ ফেরানো গেলনা।
“কেমন বাবা গো তুমি? ছেলেকে পর্যন্ত চিন্তায় ফেলে দিলে? এটা কেমন বিচার হলো?”
সাইবানের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মাথা সামান্য কাত করে ইযানের মাথায় চুমু এঁকে পরক্ষণে ইরামের চোখের দিকে চেয়ে বলল,
“এর জন্য আপনিই তো দায়ী।”
ইরাম ভ্রু উঁচু করল।
“আমি? আমি আবার কি করলাম?”
“আপনার অতিরিক্ত ভালোবাসায় বদহজম হয়ে গেল। এমন বদহজম আমার বারবার হোক।”
এবার ইরামের চেহারা খানিক রেঙে উঠল। দুহাত গুটিয়ে সে বলল,
“সুগন্ধা ঠিকই বলেছে। দুনিয়া উল্টে যাবে কিন্তু তোমার কথার জোর কমবেনা।”
“জরিনা সকিনাদের কথা বাদ দিন। এদিকে আসুন। নিজের কৃতকর্মের শাস্তি না পেয়ে যাচ্ছেন কোথায়?”
নিজের ভালো হাতটা উঠিয়ে সটান ইরামের ঘার চেপে জোরে টেনে নামিয়ে আনল সাইবান। তারপরই অর্ধাঙ্গিনীর ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিল। ইরাম জোর করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টাও করলনা, যদি স্বামী ব্যথা পায়? প্রতিক্রিয়া করতে বাধ্য হলো সে। দীর্ঘক্ষণ চলল আদুরে ভালোবাসার বিনিময়। অতঃপর ইযানের হালকা ফোঁপানোর শব্দে ইরামকে ছাড়ল সাইবান, তবে দূরে সরতে দিলনা। কপালে কপাল ঠেকিয়ে চকচকে ঠোঁটে হাসি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমার জন্য কাঁদার আর একটা মানুষ বেড়ে গেল।”
“একটা নয়, দুটো।”
পাল্টা বলল ইরাম। সাইবান গভীর নয়নে অর্ধাঙ্গিনীকে দেখল। তারপর শব্দহীন মুচকি হেসে আরেক দফায় তার ঠোঁটে শুষ্ক এক চুমু খেয়ে ছেলের দিকে ফিরল। হাত বাড়িয়ে ইযানের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে সে বলল,
“এমনিতে তো বাপকে দুই চোখে সহ্য করতে পারিসনা। খালি শত্রুতামি, ভন্ডামি, লাত্থি আর সাইরেনগিরি। আজকে এত আলগা পিরিত দেখানোর কারণ কি রে পোটলা? বাপের প্রেমে পড়েছিস? পড়তেই হবে মামা, আমি তোর বিনা শ্রমে হওয়া বাপ, নাউ উইথ লাইসেন্স ফ্রম ইওর আম্মা!”
“গুউম!”
গুঙিয়ে উঠল ইযান। তাতে চেহারা নরম হয়ে এলো সাইবানের। ছেলের নিষ্পাপ মুখমন্ডলে চেয়ে মনের অজান্তেই সে গুণগুণ করে গেয়ে উঠল,
~ভালো তোর সাথে থাক, জেনে রাখ জেনে রাখ
পাশেই কেউ তো আছে, হাতটি ধরে
ভূবন ডাঙায় থাক আলোয় ভরে~
সুরের মূর্ছনায় ছেয়ে গেল চারপাশ। ইরামের মনে পড়ে গেল হাতে অ্যা*সিড লাগার পরে ইযানের হাসপাতালের দিনের কথা। সেদিনও এভাবেই ছেলেকে বুকে চেপে গান শুনিয়েছিল সাইবান। আর ইযান শান্ত হয়ে চুপটি করে শুনে যাচ্ছিল। কোনো ব্যতিক্রম আজও হলোনা। বাবার কন্ঠ কানে যেতেই ইযানের ফোঁপানি বন্ধ হয়ে গেল। জ্বলজ্বলে চোখে অদূরপানে চেয়ে নীরবে শুনে যেতে লাগল বাচ্চাটা। একইভাবে ইরামও।
~মানুষ হয়ে থাক সততা সাহসে
নামীদামি কেউ তোকে হতে হবে না~
এই পর্যায়ে নিজেকে আর রুখতে পারলনা ইরাম। ঝুঁকে আলতো করে সাইবানের বুকের অপর পাশে মাথা রাখল। স্বামীর বিচরণ করা হাত সন্তান এবং অর্ধাঙ্গিনী উভয়কেই ছুঁয়ে গেল। জানালার বাইরে উজ্জ্বল সূর্য স্বর্ণের কিরণ ঢেলে দিল। বাতাসে ভাসল ফুলের ঘ্রাণ। পাখিরা কিচির মিচির করে ডেকে উঠল। সঙ্গে বইলো সাইবানের সুরেলা আবেদন, যা শুধু সন্তানের মাঝে আবদ্ধ নেই, ছুঁয়ে গেল স্ত্রীকেও। যেন জানান দিল নব্য সূচনার।
~বুকের কোথায়? তোকে রাখি বলনা
মায়াপাখিটা আমার শুধু বলনা~
─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──⁠─⁠─⁠──⁠──⁠──
অতিক্রান্ত হয়েছে দীর্ঘ তিন মাস।
ইরামের জীবনে বুঝি সবটুকু সুখ এসে ধরা দিয়েছে। আর কোনোকিছুর কমতি নেই। ইযানের বয়স এখন নয় মাস প্রায়। নিজে নিজে বসা আর হামাগুড়ি দেয়ার চেষ্টা করতে সে এখন ওস্তাদ। বেশ কয়েকটা দাঁতও গজিয়েছে। সঙ্গে বেড়েছে দুষ্টুমির উৎপাত। সমস্ত বাড়িটাকে মাথায় তুলতে একখানা ইযান যথেষ্ট। সামিয়া আর সুগন্ধা তো ইযান বলতে অজ্ঞান। মুন্সীবাড়ি থেকে ইহান প্রায়ই আসে শুধুমাত্র ইরামের সঙ্গে কথা বলতে আর ভাগিনাকে দেখতে। রাহাত আর মিথিলার সঙ্গেও সম্পর্কটা বর্তমানে সহনশীল। কারণ ইরামের মুন্সীবাড়িতে থাকা অংশের সমপরিমাণ অর্থ তারা পরিশোধ করে দিয়েছে। তাই বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়ায়নি ইরাম।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের কোর্স ইতোমধ্যে শেষ করেছে ইরাম। সে বর্তমানে একজন পুরোদস্তুর ফ্রিল্যান্সার। তবে, এখনো সেই অনুপাতে কাজের পরিমাণ বাড়েনি। এখনো নিজের স্কিল ঝালাই করতে ব্যস্ত সময় পার করে সে। তাছাড়া এখন একটা চাকরিও আছে তার। কায়সানের টেকনিক্যাল টিমের একজন সদস্য সে। সিনিয়রদের থেকে কাজ শিখতে আর করতে বেশ ভালো লাগে তার। মাস শেষে একটা সম্মানী পাওয়া যায়। আহামরি কিছু নয়। তবে ইরামকে খুশি করতে যথেষ্ট। ইচ্ছা হলে নিজের টাকায় একটা জামা নেয়া যায়, জুতো নেয়া যায়, কখনো বা ছেলের জন্য টুকটাক খেলনা কেনা যায়। যদিও সাইবান নিজের বহু আগে বলা কথার মতন প্রতি মাসে ক্লোজেটের ড্রয়ারে ইরামের খরচের জন্য ওয়ালেট ভরে রাখে, তবুও নিজের উপার্জনের খুশিটা তো ভিন্ন হবেই। সাইবানের টাকা খরচ করতেও বর্তমানে সে দ্বিধাহীন। গত মাসেই একটা দামী জামদানী কিনল। স্বামীর সঙ্গে তার মোটামুটি সকল প্রকারের সংকোচই দূর হয়েছে। এই বন্ধন এখন ভরসার, আবেগের। যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ইযান। আজকাল সব কাজ, পরিবার সামলেও ইরাম নিজের শখ নিয়ে ভাবে। ফ্রি থাকলেই স্পিকার অন করে রুমের মাঝে কত্থক করে। মুদ্রাগুলো ভুল হলে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে নেয়। নাচ নিয়ে এগোনোর কোনো ইচ্ছা তার নেই, তবে নিজের একান্ত সময়টাকে মুখর করে তুলতে এর জুড়ি মেলা ভার। মা যখন স্রোতস্বিনীর তরঙ্গ হয়ে নাচে, তখন ইযান বিছানায় বসে মুগ্ধ চোখে দেখে আর খিলখিল করে হাসে। কখনো বা হাততালি দেয়ার চেষ্টা করে। মায়ের শিল্পের একনিষ্ঠ দর্শক সে। ছেলের চেহারায় ফুটে ওঠা বিরাট মুগ্ধতাটুকুই ইরামকে উষ্ণতায় জড়িয়ে ফেলে। কখনো সখনো সাইবান এসে লুকিয়ে দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। তার নাচ দেখে নিঃশব্দে। বেশিরভাগ সময় কোনো মন্তব্য করে না। তার অনুভূতির টের পাওয়া যায় সেই দিনগুলোর রাতে।
সাধারণ এক দিনের শুরু। ইযান নিজের দাদীর কোলে আছে। নাতিকে নাস্তা খাওয়াতে ব্যস্ত এবং উপভোগ্য সময় পার করছেন সামিয়া। ইরাম নিজেদের বেডরুমে। কিছুক্ষণ আগে টিমের একটা অনলাইন মিটিং ছিল। সেটা সমাপ্ত করে সে অগোছালো হয়ে থাকা কাপড়গুলো ভাঁজ করে গুছিয়ে নিচ্ছে। সাইবান রুমের একেকদিকে একেকটা জিনিস ফেলে রাখে তাড়াহুড়োর সময়। স্বামীর শার্ট, টি শার্ট, জিন্স ভাঁজ করতে আজকাল ইরামের ভালোই লাগে। ফরমাল খুব কমই আছে সাইবানের কাছে। রংচঙে হুডি, টি শার্ট, রিপড জিন্স, সিলভার ব্রেসলেট, নেকলেস ইত্যাদির সংগ্রহই বেশি। একটা সুর গুণগুণ করতে করতে সে তার কাপড় গুছিয়ে নিতে নিতে ইরাম ভাবতে লাগল, পরেরবার শপিংয়ে গেলে ছেলেটাকে টেনে হিঁচড়ে হলেও স্যুট বুট কেনাবে।
“বেবি!”
প্রফুল্ল একটা চিৎকারে ইরাম ভয়ে লাফিয়ে উঠল। হাতের আধভাঁজ করা টি শার্ট মেঝেতেই লুটিয়ে পড়ল। ঝট করে ফিরে তাকাল সে। বেডরুমের দরজায় দাঁড়ানো সাইবান। সে আজ খুব ভোরেই বাইরে চলে গিয়েছিল কিছু কাজের উদ্দেশ্যে। বর্তমানে তাকে দেখাচ্ছে একইসঙ্গে আতঙ্কিত আর অতিরিক্ত খুশি। ইরাম বুকে হাত চেপে বলল,
“এভাবে কেউ ভয় পাওয়ায়? তোমার বউটা যদি হার্টফেল করত?”
সাইবান বিরাট হেসে এগিয়ে এসে সটান ইরামের কোমর জড়িয়ে কোলে তুলে ফেলল। তারপর মেঝেতে দাঁড়িয়ে বনবন করে ঘুরতে লাগল। হতবিহ্বল ইরাম তার কাঁধ আঁকড়ে ধরল পতন ঠেকাতে। সাইবান হাসতে হাসতে চিৎকার করে বলল,
“বেবি! বেবি! বেবি!”
“বলো, বেবি বেবি বেবি!”
স্বামীর মতন করেই হেসে জবাব দিল ইরাম। তৎক্ষণাৎ তাকে বিছানায় ফেলে উপরে উঠে এলো সাইবান। ঝুঁকে সারা মুখে চুমু দিতে লাগল। ইরাম এবার কাতুকুতু অনুভব করল, খিলখিল করে হাসল। পোষা প্রাণী খুশি হয়ে গেলে যেমন করে লাফায়, সাইবান ঠিক তেমনি করছে বর্তমানে।
“এত খুশির কারণ জানতে পারি জনাব?”
সাইবান ইরামের নাক আলতো করে কামড়ে দিয়ে উত্তর করল,
“আমার লাকি চার্ম! আমি ওভারসি শো পেয়েছি!”
ইরাম ভ্রু কুঁচকে ফেলল। বিষয়টা বুঝতে পারেনি স্ত্রী টের পেয়ে সাইবান হেসে ব্যাখ্যা করল,
“এই প্রথমবার আমি দেশের বাইরে ডি জে কনসার্টের ডাক পেয়েছি। মালয়েশিয়ায়!”
এবার ইরামের ঠোঁটেও প্রফুল্লতা ছড়িয়ে পড়ল। দুহাতে সাইবানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“সত্যি? এটা তো দারুণ খবর। ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে রিকগনেশন!”
“অল থ্যাংকস টু ইউ।”
“আমি আবার কি করলাম?”
“বা রে, আপনিই তো আমার লাকি ভিডিওটা রেকর্ড করেছেন।”
চোখ টিপ দিল সাইবান। স্মৃতিতে হারাল ইরাম। দুই মাস আগে এক লং ড্রাইভে গিয়েছিল তারা। সেখানে একটা সুন্দর জায়গার পাশে গাড়ি থামিয়ে সাইবান নিজের ইনস্টাগ্রামে দেয়ার জন্য একটা নাচের ভিডিও করেছিল। ইরামকে ফোন দিতেই সে আহাম্মকের মতন দাঁড়িয়ে থেকে শুধু তাকিয়েছিল ফোন ধরে, গানের তালে তালে হিপহপ নাচছিল সাইবান। সুগন্ধাও গিয়েছিল তাদের সাথে ইযানকে রাখার জন্য। সাইবানের প্রলয়ংকরী নাচ দেখে মেয়েটা ইরামের কানে ফিসফিসিয়ে বলেছিল,
“শুকনা বিচুটি পাতা প্যান্টে ঘইষা রাখলে এমন নাচন কোদন বাইরায়!”
ইরাম ফিক করে হেসে ফেলেছিল, পরক্ষণে মাথা নেড়ে বলেছিল,
“কই? সুন্দর নাচছে তো।”
সাইবান সেদিন ইরামের প্রশংসায় বেশ লজ্জা পেয়েছিল। কারণ সেটা এমন দূর্লভ কিছু মুহূর্ত ছিল যে সময়ে ইরাম এই জেনারেশনের কিছু জিনিসের সমালোচনা করার বদলে প্রশংসা করেছে।
সেই নাচের ভিডিওটা কোনোভাবে ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। সাইবানের ফলোয়ার কয়েকদিনের মাথায় দুই মিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছিল। অতঃপর সে একটা ইংরেজি গানের ডি জে রিমিক্স বানিয়ে ভিডিও আপলোড করতেই ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। তখন থেকেই মূলত দেশের পাশাপাশি বিদেশী দর্শক যুক্ত হয় ডি জে আলাদিনের সঙ্গে। যার পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের দিনটার আগমন।
ধীরে ধীরে উৎসবের রেশ বাড়ির সবার মাঝেও ছড়িয়ে পড়ল। সাইবান নিজের টিম নিয়ে একদিন বাদেই মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে বলে ঠিক হলো। ইরাম আর ইযানকে সাথে নেয়ার টালবাহানা সাজালেও হুট করে ছেলেকে নিয়ে সোজা দেশের বাইরে চলে যাওয়াটা অনেক বড় ব্যাপার। তাছাড়া আগে থেকে প্রস্তুতির দরকার হয়। পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদিরও ঝামেলা আছে। সাইবান যেহেতু আমন্ত্রণ পেয়ে যাচ্ছে তাই তার টিমের ভিসার ইস্যু নেই। ওদিক থেকেই সবটা ম্যানেজ করা হয়েছে। স্ত্রী সন্তানকে একলা ফেলে যেতে নারাজ হলেও শেষমেষ পরিবারের সকলের নিশ্চয়তায় সে মেনে নিতে বাধ্য হলো।
আজ সাইবান মালয়েশিয়ায় চলে যাচ্ছে। বিয়ের পর সে শো এর জন্য সিলেটে গিয়েছিল, দেশের ভেতরেই। এই প্রথমবার এতদূরে কোথাও যাচ্ছে তাই ইরামের একটু মন কেমন করছে। তবে উপরে নিজেকে শান্তই দেখাল সে। এয়ারপোর্টে সাইবানকে সি অফ করতে গেল ইরাম, ইযান আর সামিয়া। খবর পেয়ে ভাইকে বিদায় জানাতে সরাসরি এসেছে সারিকাও। সাইবানের টিমের ছেলেগুলো যখন ব্যাগপত্র নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে যাচ্ছে, তখন সাইবান অন্তিম বারের মতন পরিবারের দিকে ঘুরে তাকাল। কাছে এসে ইরামের কোল থেকে ইযানকে নিয়ে গাঢ় একটা চুমু খেল ছেলের গালে।
“আম্মুকে একদম বিরক্ত করবিনা পোটলা। যদি ফিরে আম্মুর গায়ে একটাও কামড়ের দাগ দেখেছি তো তোকে এবার সত্যিই জানালা দিয়ে ফালাব। উড়তে না পারিস, হামাগুড়ি ঠিকই দিতে পারবি!”
“গু…বা!”
অন্তিম মুহূর্তেও পিতার থুতনি বরাবর একটা শক্তিশালী লাথি হাঁকিয়ে দিল ইযান। হেসে ফেলল সবাই। সাইবান নিজের মায়ের দিকে ফিরল, জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তোমার ভরসায় রেখে গেলাম মম, প্লীজ, দেখে রেখো।”
“মম আছে তো। চিন্তা কিসের? তুই বিন্দাস যা ব্রো, আর ফাটিয়ে দিয়ে আয়। আমার ছেলেকে আমি বড় পর্দায় দেখব আর গলা ফাটিয়ে চিয়ার করব। ইও ব্রো!”
“ইও ব্রো!”
মায়ের সঙ্গে খুনসুঁটি শেষ করে উদাস মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সারিকার কপালে টোকা মেরে সাইবান বলল,
“তোর মতন শাকচুন্নিকে মুখ দেখাতে কে বলেছে? বিদায়ের সময় এমন অলক্ষ্মী দর্শন! প্লেন ক্র্যাশ হলে অভিশপ্ত আত্মা হয়ে দুলাভাইয়ের ঘাড়ে চড়ে বসব বললাম!”
“আরে যাহ যাহ, ষোলো আনার ভাই চার আনা! তোকে দেখতে এসেছে কে? যেই না থোবরা নাম রেখেছে আমড়া!”
মুখে বললেও সারিকার চোখে আবেগটুকু ঠিক ধরা পড়ল। হেসে বোনকেও একদফা জড়িয়ে ধরে সবশেষে ইরামের দিকে ফিরল সাইবান। তৎক্ষণাৎ মুখভঙ্গি বদলে গেল তার। ঝুঁকে কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধু স্ত্রী শুনতে পায় এমন করে ফিসফিসিয়ে সে বলল,
“আপনার সঙ্গে অনেক ইনিংসের হিসাব বাকি আছে আমার। যতদিন বাইরে থাকব, ততটা করে ম্যাচ যুক্ত হবে হিসাবের খাতায়। সো, প্রে দ্যাট আই রিটার্ন সুন, মাই প্রেশিয়াস!”
ইরামের উজ্জ্বল শ্যামলা চেহারা লালচে হয়ে উঠল। কিন্তু সবার সামনে লজ্জাবোধ করার অনুভূতিটুকু সে দেখাতে পারলনা। তার কানের লতি আলতো করে কামড়ে দিয়ে সাইবান সরে দাঁড়াল। শেষ একবার স্ত্রী, সন্তান, বোন, মা সকলের উদ্দেশ্যে চেয়ে হাসিমুখে স্যালুট ঠুকে উল্টো ঘুরে গেল সে। এগোল ইমিগ্রেশনের উদ্দেশ্যে। সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানালেও নিজের জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে নিষ্পলক দেখে গেল ইরাম। সাইবানের পিঠে আবদ্ধ রইল দৃষ্টি তার। প্রথম দূরত্ব সুখকর ছিল না। এই দূরত্ব কি সুখকর হবে? নাকি ঘটবে কোনো অঘটন।
না না! মাথা ঝাঁকাল ইরাম। তার দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা সব অতীত। একটা গোটা পরিবার আছে তার পাশে। আছে সাইবান আলাদিন নামের এক শক্ত ভিত্তি। এই জীবনে আর ভয় কিসের? ইরামের সুখ আর নষ্ট হবে না। তাইনা?
সেই দৃঢ় বিশ্বাস আঁকড়েই সুস্থির ছিল ইরাম। শুধুমাত্র দুই দিন অব্দিই। তার সকল স্বপ্ন, বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক স্নিগ্ধ সকালে। যখন সুগন্ধা এসে রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে জানাল,
“ভাবীজান, আপনার লগে একজন দেখা করতে আসছে।”
ইরাম ল্যাপটপে কাজ করছিল। সেখান থেকে মুখ তুলে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এই সকালে? কে? তুমি চেনো না?”
“না, আমি আগে দেখিনাই। নাম জিগাইছি।”
“কি নাম?”
সুগন্ধা জবাব দিল,
“নাম কইল….অরণ্য মির্জা সওদাগর।”
—চলবে—
Cover credit: Nusrat Jahan Anika
See less

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply