Golpo আমার আলাদিন আমার আলাদিন সিজন ২ কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন সিজন ২ পর্ব ৩


#আমার_আলাদিন 

#পরিচ্ছেদ২

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা৩

“মিসির? খেতে আসো।” 

ডাইনিং রুম থেকে সারিকার ডাক ভেসে আসতেই বেডরুমে বসে কাজ করতে থাকা মিসির মুখ তুলে তাকাল। বিছানায় ছড়ানো বিশাল আর্ট পেপার। এদিক সেদিক পড়ে আছে স্কেল, ক্যালকুলেটর, পেন্সিল আর রাবার। একটা নতুন ডিজাইনের কাজ করছিল সে।

“আসছি।”

পাল্টা জবাব দিয়ে দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখল মিসির। উঠে গেল বিছানা থেকে। ইদানিং ঢাকায়ও বেশ শীত জেঁকে বসেছে। চেয়ার থেকে সোয়েটার তুলে গায়ে জড়িয়ে ডাইনিং রুমে এলো সে। সারিকা টেবিল সাজিয়ে বসেছে। মিসির বসতেই স্বামীর প্লেটে চুপচাপ খাবার তুলে দিল। 

“উম! শীতের রাত আর বউয়ের হাতের গরম গরম খিচুড়ি! লা জওয়াব!” 

মিসিরের প্রশংসার বিপরীতে হালকা একটু হাসল সারিকা। তারপর আবার কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। অপরদিকে মিসির গপাগপ খাচ্ছে। খিচুড়ি তার ভীষণ পছন্দ। মাঝপথে থমকাল সে। সারিকাকে প্রতিদিনের তুলনায় অনেক বেশি গুরুগম্ভীর দেখাচ্ছে। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। প্লেটের কিছুই খাচ্ছেনা। চামচ দিয়ে আনমনে নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে। মিসির চেয়ার টেনে সারিকার আরেকটু কাছে সরে বসল। তারপর স্ত্রীর প্লেটটা নিয়ে খাবারটুকু নিজের প্লেটে ঢেলে সুন্দর করে মাখিয়ে নিল। সারিকা খেয়ালও করলনা। তার হুশ হলো যখন মিসির তার ঠোঁটে গ্রাস তুলে ধরল। চোখ পিটপিট করল সারিকা, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 

“কী করছো?” 

“আমার বউকে আদর করে খাইয়ে দিচ্ছি।”

এমন উত্তর শুনে সারিকা পাল্টা কিছু বলতে পারলনা। মিসিরের হাত থেকে খেয়ে নিল। নিজের পাশাপাশি মিসির সারিকাকেও খাইয়ে দিতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদে সে শুধাল,

“ব্যাপার কী? কী নিয়ে এত চিন্তিত বেগম সাহেবা?” 

সারিকা পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে আড়চোখে মিসিরের দিকে তাকাল। প্রথমটায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার ইচ্ছা হলো। যেমনটা আগে করতো। কিন্তু এখন তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কটায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। মিসিরকে নিজের জীবনে পরিপূর্ণভাবে মেনে নিতে শুরু করেছে সে। এই পরিবর্তন মধুর। মধুরতায় পুনরায় শীতলতা ঢালতে চায়না সারিকা। তাই শেষমেষ বলল, 

“মম। মমের অবস্থা ভালো না। না শারীরিক, না মানসিক।” 

মিসির মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল স্ত্রীর প্রতিটা কথা। সারিকা বলে গেল, 

“সবকিছু কেমন যেন হয়ে গিয়েছে, মিসির। আমাদের হাসিখুশি পরিবারটা একটা মেয়ের জন্য ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। আজ আমরা একেকজন পৃথিবীর একেক প্রান্তে। আমার মায়ের কাছে তার প্রিয় ছেলে নেই, আমার ভাইয়ের কাছে তার মা নেই। এত বছর যাকে আমি আমার আপনের চাইতেও আপন পরিবার ভেবে এসেছি, আমার ভাই, তাকেই আমার এখন পর মেনে নিতে হবে? আমি পারছি না! এই বাস্তবতা মানা যায়? ওই মেয়েটা…ওই মেয়েটা আমাদের সবাইকে শেষ করে দিয়েছে!” 

“ওই মেয়েটা তোমার আপন বড় বোন হয়।” 

অবশেষে উচ্চারণ করল মিসির। তার কণ্ঠে কোনো ঝাঁঝ নেই। একদম স্বাভাবিক, শান্ত। সারিকার ভ্রু কুঁচকে গেল। বিতৃষ্ণা নিয়ে সে তাকাল, ঝাঁঝাল গলায় বলে উঠল,

“খবরদার মিসির! আমার শুধু একটাই ভাই, সেটা সাই! আর কেউ না! আর কাউকে না আমি ভাই হিসাবে মানি, না বোন!” 

মিসির একটুও ঘাবড়াল না। বরং আরেক গ্রাস তুলে সারিকাকে খাইয়ে দিল। 

“কারো মানা না মানায় এখন আর কিছু যায় আসেনা, সারিকা। সত্য এটাই যে, ইরাম তোমার বড় বোন। আর তাকে তুমি নিজেদের পরিবার নষ্ট করার জন্য দায়ী করছো। আমি তোমাকে বুঝতে পারছি, তোমার এমন চিন্তা হওয়াটা অস্বাভাবিক না। তবে একবারও মুদ্রার অপর দিকটার কথা ভেবে দেখেছ?” 

স্বামীর কথায় থমকাল সারিকা। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। অস্ফুট কন্ঠে শুধাল,

“অপর দিক?”

মিসির তার মুখে শেষ গ্রাস তুলে দিয়ে বলল,

“ইরামের কথা ভেবে দেখো। জন্ম হতেই আপন বাবা মা পর করে দিল। যেখানে বড় হয়েছে, সেখানেও একটা সময়ে সুখ ফুরিয়ে এলো। রাস্তার এপাশে ওপাশে দুই বাড়ি। অথচ, কোনো সাহায্য পাওয়া গেলনা। বাবা মাকে দেখতো সে, নিজেদের সন্তানদের নিয়ে সুখে আছে। এমন এক পরিবার বানিয়েছে যে পরিবারে তার জায়গাই নেই। আমি বলছিনা, ইরাম যা করেছে তা জাস্টিফাইড। ও অন্যায় করেছে। কিন্তু ঠিক একইভাবে ওর সাথেও অন্যায় করা হয়েছে। ব্যাস, এতটুকু বোঝাটাই জরুরি।” 

সারিকা চুপ করে রইল। মিসিরের কথাগুলো যুক্তিযুক্ত। এর বিপরীতে কী বলা যায় সারিকার বোধগম্য হলোনা। মিসির চেয়ার ঠেলে উঠে পড়ল। খালি প্লেট হাতে নিয়ে অপর হাত সারিকার মাথায় বুলিয়ে বলল,

“আমি কালকে অফিসে যাওয়ার আগে তোমাকে বাড়িতে দিয়ে আসব। আম্মুর কাছে থেকো কিছুদিন, যত্ন নিও ওনার।” 

মিসির চলে গেল। সারিকা একা বসে রইল টেবিলে। তার চোখের মাঝে বিষণ্নতার ছায়া ফুটে উঠল। 

 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄

কিচেন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে সবজি কাটছে সুগন্ধা। তার চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ফাঁপা। কাজ করলেও কাজে বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে এক অবর্ণনীয় ব্যথায়। যে ব্যথার গভীরতা কখনো কেউ আন্দাজ করতে পারবেনা। 

“হাত দুটো একটু বেশি খালি খালি লাগছেনা?” 

পিছন থেকে ধ্বনিত হওয়া কন্ঠে সুগন্ধা আতঙ্কে লাফিয়ে উঠল। 

“হায় ভগবান!” 

অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে ঘুরে দাঁড়াতেই ওপাশে দাঁড়ানো ব্যক্তির চেহারায় দুষ্টু হাসির রেখা দেখতে পেল সে। আদিত্য চেয়ে আছে তার দিকে, চশমার অন্তরালে থাকা চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে জহরতের মতন। সুগন্ধার চোখ ছানাবড়া হলো। 

“আপনি? কখন এলেন?” 

আদিত্য মুচকি হেসে এগিয়ে এলো। 

“এইমাত্র। আর নো টেনশন, অলরেডি ম্যামের সাথে দেখা করে অনুমতি নিয়ে তবেই আমার হবু স্ত্রীকে দেখতে এসেছি।” 

সুগন্ধা বিব্রতবোধ করল। গলা খাঁকারি দিয়ে উল্টো ঘুরে পুনরায় সবজি কাটায় মনোযোগ দিল। আদিত্য তার পাশে এসে দাঁড়াল এবার। মাঝপথে সুগন্ধার বাহুতে হাত রেখে থামাল। তারপর নিজের হাত তুলে ধরল। তাতে একটা কাগজের প্যাকেট। সেটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো টুকটুকে লাল কাশ্মীরি চুড়ি। সুগন্ধা হতবিহ্বল হলো। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল আদিত্যর শ্যামলা মুখে। হাত বাড়িয়ে টিস্যু নিল আদিত্য। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সুগন্ধার সবজির রসে ভেজা হাত দুটো মুছে দিল। তারপর চুড়িগুলো গলিয়ে দিল কব্জিতে। সুগন্ধা মানা করলনা। প্রসারিত নয়নে চেয়ে রইল নিষ্পলক। তার ফর্সা ত্বকে টকটকে লাল রংটা দারুণ মানিয়েছে। হাত নাড়াতেই চুড়ির মিষ্টি ঝংকার চারপাশ ভরিয়ে তুলল। 

“হঠাৎ উপহার?”

চুড়ি দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল সুগন্ধা। আদিত্য মাথা কাত করে তার হাত দুটো দেখতে দেখতে বলল,

“সূচনা কোনো না কোনোভাবে করা প্রয়োজন ছিল। এবার অভ্যাস করে নাও, নামে বেনামে, কারণে অকারণে উপহার পাওয়ার।” 

সুগন্ধার দৃষ্টি আদিত্যর চেহারায় আটকে রইল। তার শ্যামলাভ গাল দুটোতে খয়েরী বর্ণের ছোট ছোট ফ্রেকেলস অনন্য এক সৌন্দর্যের প্রকাশ করছে। চোখ নামিয়ে ফেলল সুগন্ধা। অন্তর চেপে এলো যন্ত্রণায়। বুঝতে পারলনা কেমন অনুভব করবে সে। মনের ভেতর অনুভূতিগুলো তালগোল পাকিয়ে গেল। আদিত্য মৃদু হাসি নিয়ে জানাল, 

“যাও তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে নিয়ে একটু বের হব।”

সুগন্ধা চমকে উঠল।

“কেন? হঠাৎ কোথায়?” 

“গেলেই দেখতে পাবে।”

“কিন্তু আমার তো অনেক কাজ বাকি!”

“উফ, কাজ পরেও করতে পারবে। যাও যাও, জলদি রেডি হও।”

সুগন্ধাকে একপ্রকার ঠেলেই কিচেন থেকে বের করল আদিত্য। বাধ্য হয়েই তৈরি হতে যেতে হলো বেচারীকে। 

বেশ কিছুক্ষণ পর। 

আদিত্যর গাড়ি এসে থামল বিরাট এক শপিংমলের পার্কিং লটে। সুগন্ধা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চারপাশ দেখে বেশ অবাক হলো। না পারতে জিজ্ঞেস করল,

“এখানে কী করছি আমরা?” 

আদিত্য সিটবেল্ট খুলতে খুলতে নরম গলায় জবাব দিল,

“শপিং মলে মানুষ কী করতে আসে? নিশ্চয়ই বার্থ সার্টিফিকেট বানাতে নয়?” 

সুগন্ধার চোখজোড়া সরু হয়ে এলো। 

“সেটা আমি জানি। আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছেন সেটা জানতে চাচ্ছিলাম।” 

“খুব সোজা উত্তর। বিয়ের শপিং করতে।”

উত্তরে সুগন্ধা হতচকিত হলো। বিয়ে শব্দটার সঙ্গে তার জীবন বর্তমানে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেও মনে হয়, সে অভ্যস্থ হতে পারেনি। আদিত্য অবশ্য তাকে বিশেষ ভাবনার সুযোগ দিলনা। গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেল ভেতরে। শপিং মলে আদিত্যর সঙ্গে পাক্কা দুই ঘণ্টা ঘুরঘুর করল সুগন্ধা। আদিত্য কখনো তাকে শাড়ির দোকানে নিয়ে যাচ্ছে, কখনো বা মেকআপ সামগ্রীর দোকানে। শাড়ির দোকানে শাড়ির বহর থেকে হুশ হারিয়ে ফেলল সুগন্ধা। কত রং, কত কারুকার্য! দোকানদার একটার পর একটা বের করছে আর গুণগান বর্ণনা করছে। সুগন্ধা না পারতে আদিত্যর বাহু চেপে ধরে তার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আমার মাথা ঘুরছে। এত শাড়ি দিয়ে আমি কী করব? তাছাড়া আমি তেমন একটা শাড়ি পরিনা।”

আদিত্য পাল্টা মাথা কাত করে তার কানে ফিসফিস করল,

“বিয়ের পরে তো পরবে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তোমাকে নতুন নতুন শাড়িতে দেখার খুব সাধ আমার।”

“কেন? আপনার কি রং বদলানো গিরগিটি পছন্দ? প্রতিদিন রূপ পাল্টে সং সেজে বসে থাকব?” 

সুগন্ধার কাঠখোট্টা জবাবে হেসে ফেলল আদিত্য। মেয়েটার এই দিকটাই তার সবথেকে পছন্দের। ভীষণ প্রাণোচ্ছ্বল। আদিত্যর সাদাকালো জীবনটায় রঙের জোয়ার নিয়ে এসেছে সুগন্ধা। একাকীত্বের দ্বীপে সুগন্ধা নামক নৌকার বড্ড কদর আদিত্যর। আজকাল তো মনে হয়, সুগন্ধাকে ছাড়া তার অস্তিত্বই অসম্পূর্ণ। 

বেশকিছু জিনিস শপিং করার পরে আদিত্য সুগন্ধাকে জুয়েলারির দোকানে নিয়ে গেল। চারপাশের দেয়ালজুড়ে চকচকে আয়না। লম্বা কাঁচের বাক্সের ভেতরে ডিজাইনার গয়নাগাটি সাজানো। তারা প্রবেশ করতেই স্টাফ তাদের হাসিমুখে বরণ করে নিল। আদিত্য গলার হারের কথা বলতেই একে একে ডিজাইন ক্যাটালগ দেখাতে লাগল দোকানদার। আদিত্যকে মানা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে সুগন্ধা। ছেলেটাকে একটা জিনিস নিতে বারণ করলে সে দুটো জিনিস কেনে। তাই সুগন্ধা গয়নার দোকানে চুপচাপই থাকল। আনমনে ডিজাইন দেখতে লাগল সে। এমন সময়েই হঠাৎ আদিত্যর ফোন বেজে উঠল। 

“ইমারজেন্সি কল, আমি রিসিভ করে আসছি। তুমি দেখো কোনটা পছন্দ হয়।”

সুগন্ধাকে বলে ফোন কানে চেপে আদিত্য দোকান থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল, কথা বলার জন্য। সুগন্ধা বেছে বেছে দেখতে লাগল। একটা সিম্পল ডিজাইনের নেকলেস পছন্দ হলো তার। দোকানদারকে সে বলতেই যাবে এমন সময়ে পাশ থেকে হঠাৎ আরেকজন লোক এসে বলল, 

“আমার অর্ডারটা কি রেডি?” 

দোকানদার বিরাট হাসল। 

“আরে, অবশ্যই মিস্টার সিনহা। এই রিয়াজ, মিস্টার সিনহার অর্ডারটা নিয়ে এসো, জলদি। তারপর বলুন, কেমন আছেন? জুস আনাই?” 

“না না। আমি একদম ঠিক আছি। আপনি এত উতলা হবেন না।”

সুগন্ধা জমে গেল। অতি পরিচিত কন্ঠস্বরটা তার গোটা দুনিয়াকে থামিয়ে দিল বুঝি। সামনের আয়নার প্রতিফলনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মানুষটার মুখ। দাঁড়িয়ে আছে অনুরাগ। দোকানদার ইতোমধ্যে হাস্যরসাত্মক গল্প জুড়ে দিয়েছে। অনুরাগ নরম হাসি নিয়ে কথাবার্তা বলছে। সুগন্ধাকে সে খেয়াল করেনি এখনো। সুগন্ধার শ্বাস নিতে কষ্ট হলো হঠাৎ। দুহাত চেপে বসল ডিজাইনের ক্যাটালগের উপর। সে কি চলে যাবে? কিন্তু চলে যাবে কেন? সেটা তো বাস্তবতার সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়া হবে। সুগন্ধা কি পালানোর মতন কোনো কাজ করেছে? অবশ্যই নয়। 

“এইযে আপনার অর্ডার। দেখুন, কেমন হয়েছে?” 

দোকানদার একটা মখমলি বক্স মেলে ধরল। তাতে ভারী দুটো সোনার নূপুর। স্বর্ণালী বর্ণ ছড়িয়ে চকচক করছে আলোর নিচে। অনুরাগ মুগ্ধ নয়নে নূপুর দুটো হাতে তুলে পরখ করে দেখল। 

“ভীষণ সুন্দর হয়েছে। একদম যেমনটা চেয়েছি।” 

সুগন্ধা জানেনা কেন তার বুকের ব্যথাটা বাড়ল। নূপুর? কার জন্য? প্রশ্নটা অভিমানী মেঘ হয়ে দানা বাঁধল তার মনের আকাশে। অবশ্য যেই হোক, সুগন্ধার তাতে কী? অনুরাগের সঙ্গে দূর দূরান্তেও তার কোনো সংযোগ নেই। লোকটা স্রেফ তার আশ্রয়দাতা বাড়ির ছেলের বন্ধু। ব্যাস। এর বেশি কিছু নয়, এর কমও কিছু নয়। তবে বেহায়া মন কি আদৌ সম্পর্ক দেখে ফাঁসে? 

অনুরাগ বক্সটা বন্ধ করে দোকানদারকে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই হঠাৎ আয়নার চোখ পড়ল তার। এতক্ষণ অন্য চিন্তায় মগ্ন থাকায় সে খেয়ালই করেনি। মাত্র হাত দেড়েক দূরেই সুগন্ধা! ঝট করে পাশ ফিরল সে। না চাইতেও তার গভীর চোখজোড়া মেয়েটিকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। তার পরনে অফহোয়াইট সালোয়ার কামিজ। লম্বা চুলগুলো যথারীতি বিনুনী পাকিয়ে কাঁধের একপাশে ঝুলিয়ে রাখা। আলাদাই একটা জেল্লা খেলা করছে চোখেমুখে। অনুরাগের চোখ আটকাল সুগন্ধার কব্জিতে। লাল টকটকে চুড়ির বহর যেন হৃদয়কে ঘায়েল করল। অজান্তেই দ্রুত সুগন্ধার সিঁথির দিকে তাকাল অনুরাগ, উঁহু, অজান্তে নয় বরং হয়ত ইচ্ছাকৃত। কিন্তু মনের কাছে সেই সত্য স্বীকার সে কোনোদিন করবেনা। সুগন্ধার সিঁথি ফাঁকা দেখে কি অনুরাগ স্বস্তিবোধ করল? সেটা বলা দুষ্কর। হঠাৎ অনুভূত হওয়া অনুভূতিগুলো বেশ অচেনা লাগছে অনুরাগের। সুগন্ধা নিজের উপর তার দৃষ্টি ঠিকই খেয়াল করেছে। কিন্তু তাকাচ্ছে না। স্টাফের সাথে ডিজাইন নিয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন অনুরাগকে সে দেখেনি। অনুরাগ নিজে থেকেই বলল,

“কেমন আছো, সুগন্ধা?” 

সুগন্ধা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। যেন মাত্রই অনুরাগকে দেখেছে এমন ভঙ্গিতে মৃদু হাসল। 

“আরে দাদা আপনি? আমি খুব ভালো আছি।” 

“জেনে ভালো লাগল।”

অনুরাগ কেন যেন বেশ অস্বস্তিবোধ করল। সাইবান ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে তার আর যাওয়া হয়নি। সুগন্ধার সঙ্গেও দেখা হয়নি। তাই সবটা কেমন যেন লাগছে। অনুরাগের অর্ডার ততক্ষণে প্যাক হয়ে গিয়েছে। ব্যাগ হাতে নিয়ে এবার সে পুরোপুরি সুগন্ধার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। 

“আন্টি কেমন আছে?” 

সুগন্ধা মাথা কাত করে বলল,

“ক্যান? আপনের বন্ধু জানায় নাই? অবশ্য, হেয় কী জানাইবো? নিজে জানলেই না। আম্মাজান তার মতন আছে। এটুকু জানাই আপনার জন্য যথেষ্ট।” 

কথাগুলো কেমন যেন ধারাল শোনাল। অনুরাগের ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হলো। এক পা এগোল সে।

“তুমি কি আমার উপর অভিমান…”

“তোমার ডিজাইন দেখা শেষ?” 

অনুরাগ কথাটা শেষ করতে পারলনা। মাঝপথে ভিন্ন এক কন্ঠস্বর হস্তক্ষেপ করতেই সে থমকাল। ফোন পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সুগন্ধার পাশে এসে দাঁড়াল আদিত্য। তার পাশে একজন অচেনা পুরুষকে দেখে অনুরাগ কেমন অনুভব করল তা সে নিজেই বুঝলনা। শুধু ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল। আদিত্যও অনুরাগকে দেখে অবাক হয়েছে। সুগন্ধার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল সে। 

“সাইবান ভাইজানের ছোট বেলার বন্ধু।” 

সুগন্ধা পরিচয় করিয়ে দিল। আদিত্য মাথা দুলিয়ে নিজের হাত এগিয়ে দিল করমর্দনের উদ্দেশ্যে,

“হ্যালো ম্যান। আদিত্য দেবনাথ।” 

অনুরাগ নিষ্পলক চেয়ে রইল আদিত্যর হাতের দিকে। তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপল। তবুও সে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে আদিত্যর সঙ্গে করমর্দন করল। 

“অনুরাগ। অনুরাগ সিনহা।” 

করমর্দন শেষ হলেও আদিত্যর দিকে খানিকটা সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনুরাগ। সম্পর্কটা মিলিয়ে উঠতে পারছেনা সে। সুগন্ধা সামনে এলো। শুদ্ধ ভাষায় অনুরাগকে জানাল,

“উনি আমার ফিয়ন্সে। সামনের মাসে আমাদের বিয়ে। আম্মাজান নিজেই জানাবে বলেছিল। যেহেতু আজ দেখা হলো, তাই আমিই জানিয়ে দিলাম। সঙ্গে নিমন্ত্রণও। যদি মনে হয় নিমন্ত্রণ রক্ষা করা যায়, তাহলে আসবেন।” 

সুগন্ধার কথাগুলো অনুরাগের এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুই বুঝলনা সে। শুধু আহম্মকের মতো চেয়ে রইল। আদিত্যও অতঃপর হেসে হেসে তাকে কিছু কথা বলল, খুব সম্ভবত বিয়ের নিমন্ত্রণ নিয়েই। কিন্তু একটাও কথা অনুরাগের কান পর্যন্ত পৌঁছালনা। গোত্তা খেয়ে ফিরে গেল সকল অর্থহীন শব্দ। মনে হলো, পানির গভীরে বসে আছে সে। বাইরের সকল শব্দ গমগমে শোনাচ্ছে। কিসে মাথা দোলালো, কখন কীভাবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালনা অনুরাগ নিজেই জানেনা। আদিত্য আর সুগন্ধা বেশিক্ষণ দাঁড়ালও না। সুগন্ধার গয়নার বায়না দেয়া হয়ে গেলে দুজনেই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। অথচ অনুরাগ তখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। স্টাফ এসে তাকে কিছু লাগবে নাকি জিজ্ঞেস করার পরই শুধুমাত্র তার হুশ হলো। মাথা নেড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো সে। তখনো অদূরে সুগন্ধা আর আদিত্যকে দেখা যাচ্ছে। দুজনই এস্কেলেটরে দাঁড়িয়ে নিচে নামছে। আদিত্যর হাতে বেশ কতক শপিং ব্যাগ। হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সুগন্ধাকে কিছু বলে যাচ্ছে সে। সুগন্ধাও চুপচাপ শুনছে তার কথা। রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল অনুরাগ। অব্যক্ত নয়নে চেয়ে দেখল দৃশ্যটা। সত্যি বলতে, দুজনকে বেশ মানিয়েছে। আদিত্যর অভিব্যক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে সে সুগন্ধাকে বেশ পছন্দ করে। মেয়েটাকে সে ভালো রাখবে। অনুরাগ অবশেষে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। মেঝের দিকে তাকিয়ে চোখ বুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যে কথাটা সরাসরি সুগন্ধাকে বলতে পারেনি, সেটাই অস্ফুট আর্তনাদ হয়ে বেরোল তার কণ্ঠ বেয়ে,

“কংগ্র্যাচুলেশন, অকৃত্রিম ফুল।” 

 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄

আজ ইরামের অরণ্যর বিরুদ্ধে দায়ের করা পারিবারিক সহিংসতার মামলার দ্বিতীয় শুনানি ছিল। সংক্ষিপ্ত শুনানি হলেও বেশ শক্তপোক্ত একটা অবস্থানে আছে ইরাম। তার উকিল, তাবাসসুম এক জাঁদরেল মহিলা উকিল। নারী নির্যাতন বিষয়ক মামলায় তার অভিজ্ঞতা ব্যাপক। উপরন্তু কিছু স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সংস্থার সাহায্যের কারণে ইরাম মোটামুটি ভালো অবস্থানে আছে। এর জন্য তাকে কম কাঠখড় পোঁড়াতে হয়নি। এখানে সেখানে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে। সংস্থাগুলোর কাছে বারবার আবেদন করতে হয়েছে। অনেক পরিচিত, অপরিচিত মানুষের লিংক কাজে লাগিয়ে তবেই সে শক্ত একটা মামলা দাঁড় করাতে পেরেছে। তার বিপরীতে অরণ্যর সবটাই টাকার জোর। সেই জোর যে অনেকদূর পৌঁছাতে পারে তা ইরাম ভালোই জানে। তাই শক্ত অবস্থানে থাকলেও চিন্তিত সে। পরবর্তী শুনানির ভাবনা এখনি তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। উপরন্তু, ইযানের কাস্টাডি কেইসে এই বিষয়টা কীভাবে দেখা হবে, কীভাবে তার নিজের পক্ষে আনা যাবে সেটাও ভাবনার ব্যাপার। 

আদালত থেকে বেরিয়ে সড়ক ধরে হাঁটছে ইরাম। ইযান তার কোলে কুইকুই করছে। নিজের একটা গাড়ির খেলনা অযথাই কামড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ইহান হাঁটছে সামনে সামনে। আজ কিসের যেন একটা ধর্মঘট চলছে। বিধায় যানবাহনের অভাব। কোনো সি এন জি, ট্যাক্সি চোখে পড়ছেনা আশেপাশে। শৈত্যপ্রবাহের কারণে ঠান্ডাটা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। ইরাম নিজের শালটা টেনে ভালোমত ইযানকে সহ জড়িয়ে নিল। হঠাৎ তাদের পাশে একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়িটা চিনতে কারোরই বেগ পোহাতে হলোনা। ইহান তৎক্ষণাৎ বোনের সামনে ঢালের মতন দাঁড়িয়ে গেল। তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। গাড়ির কাঁচ নামতেই ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা অরণ্যর মুখটা পরিষ্কার হলো। চোখে চশমা। তার ভেতরে শকুনি দৃষ্টি। তীর্যক হাসল সে,

“লিফট লাগবে?” 

ইহান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। 

“নির্লজ্জ, বেহায়া, বেশরম, বেলাজা! তুই তো দেখছি সবকিছুর সংজ্ঞা ছাড়িয়ে গেছিস! লিফট তোকে আমি দিচ্ছি, সোজা জাহান্নামে ল্যান্ড করবি, আয়।” 

ইহান তেড়ে যেতে নিলে ইরাম পিছন থেকে ভাইয়ের শার্ট টেনে ধরল। ইশারায় বারণ করল। অরণ্য বেশ বিনোদিত মনে হচ্ছে। সে আয়েশ করে সিটে হেলান দিয়ে ইরামের দিকে তাকাল,

“ভাইকে নিজের হাতে মানুষ করেছ। এই শিক্ষা দিয়ে? বড়দেরকে কথায় কথায় তুই তুকারি করে?” 

“আহারে আমার বড় মানুষ! আপু, ছাড়ো! ওর ওই বেশি চলা মুখে আমি ইট ভাঙব!” 

“ইহান!” 

ইরামের চোখ রাঙানিতে শেষমেষ একটু নরম হলো ইহান। তবে বিষাক্ত দৃষ্টি ফেলা বন্ধ করলনা। অরণ্যর অবশ্য তার হম্বিতম্বিতে বিশেষ আগ্রহ নেই। সে হাত বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে দিয়ে সরাসরি ইরামের দিকে তাকাল,

“বসো। কথা আছে।” 

“তোর শ্বশুরবাড়ির আবদার? দারোগার প্যাদানি পাছায় পড়লে শ্বশুরবাড়ির আবদার মেটানো হয়ে যাবে। জল্লাদ!” 

ইহানের বারংবার হস্তক্ষেপে সংক্ষিপ্ত একটা শ্বাস ফেলল অরণ্য। ইরামের দিকে তাকাল,

“যদিও আজ কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার নেই, কিন্তু তোমার ছোট ভাই আমাকে সিরিয়াসলি ভিন্ন পন্থা ভাবতে বাধ্য করছে। আমি শুধু কথা বলতে চাই।” 

“কথা তোর পিছন দিয়ে ঢুকিয়ে….”

“ইহান, চুপ থাকতে বলেছি তোকে!”

ইরামের কড়া গলায় এবার সত্যিই থমকাল ইহান। অরণ্য স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠেকিয়ে ভাব নিল। তারপর বলল,

“ভয় পাচ্ছ নাকি আমাকে? ভয় পেলে থাক, গাড়িতে উঠতে হবেনা।” 

“ভয়? মনে হচ্ছে আপনি আমাকে পাচ্ছেন। তাই এভাবে নিজের এলাকায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। ব্যাপার না, আপনার এলাকায় ঢুকে আপনাকে মোকাবেলা করতে ইরামের দ্বিতীয়বার ভাবার প্রয়োজন নেই।”

ইযানকে ইহানের কোলে তুলে দিল ইরাম। তারপর ওড়না মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়ে নির্ভয়ে অরণ্যর গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসল। অরণ্য আর ইহান দুজনই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল রমণীর পানে। কেউই আশা করেনি এতটা নির্ভার প্রতিক্রিয়া দেখাবে ইরাম। গাড়ির দরজা আটকে যেতেই ভেতরের ছোট্ট দুনিয়াটা ইহানের সামনে বন্ধ হয়ে গেল। তবে চোখ সরালনা সে। তীক্ষ্ণ নজরে রাখল বোনকে। হেঁটে গিয়ে ফুটপাথের একটা বেঞ্চে পা ছড়িয়ে বসল। ইযান মামার কোলে বসে তার উরুতে গাড়ি চালানো শুরু করেছে। ইহান পা নাড়াতে নাড়াতে ভাগ্নেকে ব্যস্ত রেখে নিজের ফোন বের করে নিল। গাড়ির জানালা খোলাই। সেখানে ইরাম আর অরণ্যকে দেখা যাচ্ছে। দুজনই কথা বলছে। কী নিয়ে সেটা ইহান আর শুনতে পাচ্ছেনা। সে অদূর থেকে ফোনে দৃশ্যটার ছবি তুলে নিল। খুঁজে খুঁজে হোয়াটসঅ্যাপ কনট্যাক্ট থেকে কাঙ্ক্ষিত নামটা খুঁজে বের করল। 

অশনি। 

ছবিটা সেন্ড করে দিল ইহান। ঠিক দুই মিনিটের মাথায় ইহানের ফোনটা ভয়ানকভাবে ভাইব্রেট করে উঠল। ভ্রু কুঁচকে রিসিভ করল ইহান। এবার তাকে কিছু বলতে হলোনা। ওপাশ থেকে স্পষ্ট কঠোর কন্ঠ ভেসে এলো, 

“তুই কি শো পিস? নাকি রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট? ফা*কিং ব্লাস্ট দ্যা কার!”

পাল্টা ঝাঁঝাল গলায় জবাব দিল ইহান,

“অ্যাই চোপ! তোর কি মনে হয় আমি চেষ্টা করিনি? আর এত রাগ যখন তখন সামনে এসে দেখা! দূরে বসে হম্বিতম্বি করে নিজের কাপুরুষতা জাহির করার কোনো দরকার নেই। বুঝেছিস?” 

নীরবতা। ইহান অপরপ্রান্ত থেকে ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনল। রাগে ফুঁসছে কেউ। তারপরই হঠাৎ ঝরঝর করে কাঁচ ভেঙে পড়ার শব্দ। যেন ভাঙচুর চলছে কোথাও। ইহান কিছু বললনা। এক মিনিট বাদে শব্দগুলো নিজে থেকেই থেমে গেল। তারপর শোনা গেল ঘড়ঘড়ে কন্ঠটা, 

“যদি একটা চুলও বাঁকা হয়, ওকে আমি তড়পে তড়পে মা*রব, একবারে নয়।” 

ইহান একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎই ইযান তার শার্ট ধরে ছোট্ট পা দুখানা চেপে কোলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে ফোনের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।

“আম…মা…মা..মামা…বা..!” 

ইযানের গলা থেকে বের হওয়া শব্দগুলো ফোনের ওপাশে স্পষ্ট শোনা গেল। ইহান ভাগ্নের পিঠে হাত রেখে বুকে চাপল,

“এইযে, মামা এইখানেই আছে। কী হয়েছে বাবুটার?”

“মা…মা…বা?” 

ফোন থেকে কাঁপা কন্ঠ ভেসে এলো এবার, 

“ও তোর কাছে?” 

ইহান উত্তর করল,

“হ্যাঁ। ফোন নিতে চাইছে।”

“দে।”

এমন আদেশে ইহান অবাক হলেও অমান্য করলনা। সাবধানে গাড়ির দিকে তাকাল। অরণ্য কিছু একটা বলছে, ইরাম চুপ করে শুনছে। তার মুখাবয়ব দেখে বোঝা দুষ্কর কী কথা হচ্ছে দুজনের মাঝে। ইহান ইযানের দিকে ফিরল এবার। ফোনটা কানে ছুঁতেই ইযান অজান্তেই ডেকে উঠল, 

“বা…বাব্বা!”

ওপাশ থেকে পিনপতন নীরবতা। অতঃপর, ছোট্ট এক ফোঁপানোর শব্দ। তারপরই ধ্বনিত হলো আবেগে ভরাট কন্ঠস্বর, 

“হ্যাঁ আব্বু….বাবা বলছি।” 

ইহান সাবধানে ইযানের কানে ফোনটা চেপে রাখল। অপরদিকে সতর্ক চোখে গাড়ির দিকে খেয়াল রাখল। ইযান তার কোলের মাঝেই লাফিয়ে উঠল। খিলখিলিয়ে মাড়ি দেখিয়ে হাসল, তারপর একনাগাড়ে ডাকতে থাকল,

“বাব্বা! বাব্বা! বাব্বা!” 

ওপাশেও মৃদু আবেগী হাসির ধ্বনি শোনা গেল, 

“জি বাবা। বাবা মিস ইউ।” 

“মি…বা..বাব্বা মি।”

“বাবা খুব কাছে আছে, খুব কাছে। আর একটু অপেক্ষা করতে পারবে আব্বু?” 

“অ…বা.. আম আম বা..বাব্বা মি!” 

“বাবা তোমাকে সেদিন জড়িয়ে ধরতে পারেনি। বাবা অনেক সরি, খুব সরি। বাবা আসছে, তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে বাবা আসছে। খুব তাড়াতাড়ি।” 

ইযান কী বুঝল সেই জানে। সূর্যের ঝকঝকে আলোয় তার ছোট্ট মুখখানা তীব্র খুশির জোয়ারে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ইহান মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই নিষ্পাপ উথলিত মুখপানে চেয়ে রইল। 

                                       —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply