#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯৩]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
বাড়ির অবশিষ্ট প্রতিটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিশ্চিহ্ন।
কোথাও কোনো চিহ্ন নেই, কোনো ত্রুটি নেই, কোনো অসাবধানতার দাগ পর্যন্ত নয়। যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া নিখুঁত পরিকল্পনায় গিলে খেয়েছে সমস্ত প্রমাণ।
সে নারী কেবল ভয়ংকর নয় সে এক শীতল মস্তিষ্কের বিভীষিকা।
যে নারী মাফিয়ার দুর্গসম এহসান মঞ্জিলের বুক চিরে, আফরিদ এহসানের নাকের ডগা দিয়ে তার র’,ক্ত-মাংসের অংশকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে! এই অপমান কেউ মেনে নিতে পারছে না।
চারদিকে লোক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরের প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি সীমানা তল্লাশির আওতায়।
কারণ আয়াশ এহসানকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
দুধের সেই নিষ্পাপ শিশুটি এই মুহূর্তে কোথায়? কার হাতে? কতটা আতঙ্কে আছে সে?
ভাবনাটুকুই আফরিদের বুকের ভেতর ধারালো কাঁচের মতো বিঁধছে। ন্যান্সি প্রলাপের মতো কাঁদছে।
তার কান্না আর্তনাদ হয়ে আছড়ে পড়ছে দেয়ালে দেয়ালে। উন্মাদের ন্যায় একের পর এক আ’ঘাত হানছে আফরিদের বুকে।
“আপনার জন্য! শুধুমাত্র আপনার জন্য আজ আমার সন্তান আমার কোলে নেই! আফরিদ, আমার আয়াশকে এনে দিন! ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না আমি মরে যাব!
অসহায় আফরিদ এহসান। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অন্ধকার জগতের রাজত্ব সবকিছু আজ অর্থহীন।
কারণ হারিয়ে গেছে তার কলিজার টুকরো।
যে শিশুর হাসিতে প্রতিটি সকাল আলোকিত হতো, যার ক্ষুদ্র আঙুল আঁকড়ে ধরেই সে নিজেকে মানুষ ভাবতো সেই আয়াশ নেই!
ন্যান্সির চোখ র’ক্তিম হয়ে উঠেছে ক্রোধে, শোকে, উন্মত্ত আতঙ্কে।
“আপনার এই অন্ধকার দুনিয়ার জন্যই আজ আমার সন্তান আমার কাছে নেই! আপনি কেন স্মাইলিকে বলছেন না আমার বাচ্চাকে ফিরিয়ে দিতে?”
হঠাৎই সে ঝাঁপিয়ে পড়লো স্মাইলির দিকে।
দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় মিনতি করলো,
“আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও প্লিজ স্মাইলি ফিরিয়ে দাও ওকে।”
স্মাইলি হুহু করে কেঁদে উঠলো। তার কণ্ঠে অসহায়ত্বের কাঁপন।
“বিশ্বাস করো, ইলহাম আমি সত্যিই জানি না আয়াশ কোথায়!”
কিন্তু ন্যান্সির বিবেক তখন ভেঙে চুরমার।
শোক মানুষকে কখনো কখনো হিংস্র করে তোলে।
সে চিৎকার করে উঠলো,
“তোমরা সবাই মিলে আমার সন্তানকে সরিয়ে দিয়েছো! মা আপনিই করেছেন, তাই না? আমি নীলাদ্রিকে শেষ করেছি বলেই প্রতিশোধ নিচ্ছেন? আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে?”
কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন মাইমুনা এহসান।
চোখেমুখে বিস্ময়ের ছায়া।
“কি বলছো তুমি, ইলহাম? ও আমার আফরিদের ছেলে!তোমার মাথা ঠিক আছে? ওর জন্য আমার মন কাঁদছে ইলহাম। আমি নিষ্ঠুর, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারিনা কিন্তু আয়াশ?আয়াশ আমাদের র’ক্ত!”
মাইমুনা এহসান ফুঁপিয়ে উঠলেন। চোখের কোণ থেকে এক প্রস্থ অশ্রু গড়িয়ে গেল।
ন্যান্সি ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো। ভেঙে পড়া মানুষ যেমন শেষ আশ্রয় খোঁজে, ঠিক তেমন করেই ফুঁপিয়ে উঠলো সে।
“আমার আয়াশকে এনে দিন,,, দোহাই লাগে আপনাদের,,,
আফরিদের বুকের ভেতর কাঁপন উঠছে।সে তৎক্ষণাৎ ন্যান্সিকে বুকের মাঝে আগলে নিলো।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“কিচ্ছু হবে না ওর। আমি নিয়ে আসবো আমাদের ছেলেকে। তুই প্লিজ নিজেকে সামলা।”
ঠিক তখনই নিস্তব্ধ, ভারী পরিবেশটাকে চিরে ভেসে এলো তীক্ষ্ণ তালি দেওয়ার শব্দ।
টক টক টক। সকলের দৃষ্টি সিঁড়ির দিকে ঘুরে গেল।
ধীর পায়ে নিচে নামছে কল্পনা। তার ঠোঁটে বিকৃত হাসি। হাসতে হাসতে যেন দম ফুরিয়ে যাচ্ছে তার।
আর সেই হাসির শব্দে পুরো এহসান মঞ্জিলের বাতাস হিম হয়ে গেল।
আফরিদ, ন্যান্সি, মাইমুনা এহসান, স্মাইলি,তিতলি।
“কষ্ট হচ্ছে ইলহাম? খুব কষ্ট হচ্ছে তাইনা? আপন কেউ হারিয়ে গেলে খুব কষ্ট হয় তাইনা?”
স্তব্ধ ন্যান্সি! কল্পনার দিকে অগ্নিদগ্ধ নয়নে তাকালো আফরিদ! দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“কল্পনা!”
কল্পনাকে অদ্ভুত রকম অসুস্থ দেখাচ্ছে! ক্ষণে ক্ষণে হেসে উঠছে মেয়েটা,
“নিজের ছেলেকে হারিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে ইলহাম?”
ছেলের কথা বলতেই টনক নড়ে ওঠে ন্যান্সির! শুষ্ক ঢোক গিলল সে। বিস্মিত কন্ঠে বলল,
“আয়াশ? আমার আয়াশ কোথায়?”
কল্পনা ফের একচোট হেসে বলল,
“জানিনা! যেখানেই থাকুক না কেন ,আমি চাই ওকে যেন তুমি কখনো না পাও!
ন্যান্সি নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে কল্পনার কথায়! দ্বিকবিদিক কিচ্ছুটি না ভেবে কষিয়ে একটা চড় বসালো কল্পনার গালে! দু’হাতে চেপে ধরল ওর গলা,
“কি বললি তুই? আমি আমার ছেলেকে যেনো না পাই? তোকে মে রে ফেলব আমি!”
ন্যান্সির কাছ থেকে মাইমুনা এহসান ছাড়ানোর প্রয়াস চালায় কল্পনাকে!
ন্যান্সি উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। হাতের দৃঢ়তা এতটাই কঠোর যে কল্পনার চোখ উল্টে আসছে রীতিমতো!
আফরিদ জোরপূর্বক ন্যান্সিকে ছাড়িয়ে বুকের সাথে চেপে ধরল,
“জান,জান আমার জান প্লিজ থাম।”
খুক খুক করে কেশে ধপ করে বসে পড়ল কল্পনা।
আফরিদ রক্তিম চোখে দৃষ্টি ফেলল কল্পনার দিকে অনমনীয় দৃঢ়তা নিয়ে বলল,
“কল্পনা, আমি একবার জিজ্ঞেস করব। কোথায় আয়াশ?”
কল্পনা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো আফরিদের মুখপানে! শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“আমি জানিনা কোথায় কিন্তু আমি এটা জানি ওকে কে নিয়ে গেছে!”
কল্পনার কথায় সকলে স্তব্ধ! মাইমুনা এহসান তেড়ে গেলেন পুত্রবধূর নিকটে! শক্ত করে বাহু চেপে বলল,
“কে নিয়ে গেছে বলো!বলো আয়াশ কোথায়?না হলে আমি মাইমুনা এহসান তোমাকে ছাড়বো না কল্পনা!”
কল্পনা আগের ন্যায় বলল,
“সাব্বির! ওই আমাকে বলেছে ন্যান্সির উপর প্রতিশোধ নিতে চায়। ন্যান্সি নীলাদ্রিকে শেষ করে দিয়েছে অথচ তার পরেও আফরিদ এহসান চুপ। সেই চুপ থাকাটা সহ্য করতে পারেনি সাব্বির! উন্মত্ত হয়ে উঠেছে সে। সে-ই আমাকে বলেছে ন্যান্সির এই গোপন সত্যি যা লুকিয়ে ছিলো এতদিন!”
এতক্ষন যাবত আফরিদ এটাই ভাবছিল বাইরের কারোর এতটা সাহস নেই এই বাড়িতে পা রাখার। সিসি ক্যামেরা অফ করে দেওয়ার মতো পরিকল্পনা বাড়ির ভেতরেই কেউ করে চলেছে!
আফরিদ তৎক্ষণাৎ হাক ছেড়ে ঈশানকে ডাকল! ঈশান তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলো, কন্ঠস্বর জুড়ে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“ইয়েস বস।”
আফরিদ তীব্র ক্ষোভ নিয়ে আদেশ ছুঁড়ে,
“আমার সাব্বিরকে চাই। যেখানে থেকে হোক ওকে টেনে বের করে নিয়ে আয়।”
ঈশান কিঞ্চিৎ ভড়কালো তবে তা প্রকাশ করল না,
“ওকে বস।”
ব্ল্যাক ফোর্সকে ইনর্ফোরম করা হলো! কৃষ্ণবর্ণে আবৃত সেই ব্ল্যাক ফোর্স চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল!
মাইমুনা এহসান দুর্বল শরীরটা নিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। চোখের সামনে নিজের একের পর এক সন্তানকে ধুলিসাৎ হতে দেখলেন তিনি! এই ধ্বংসের শেষ কোথায়?
********************
দুর্বলতার চূড়ান্ত অভিঘাতে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে ন্যান্সি। শোক, আতঙ্ক আর মাতৃত্বের নিঃশেষ আর্তনাদে তার সমগ্র অস্তিত্ব যেনো ভেতর থেকে মোচড় খাচ্ছে নিরন্তর। বুকের ধনকে হারানোর আশ’ঙ্কা কোনো মায়ের হৃদয় কখনোই নির্বিকার হয়ে সহ্য করতে পারে না আর তাই ন্যান্সি যেমন স্থির থাকতে পারছে না, তেমনি অস্থিরতায় ভেঙে পড়েছে আফরিদও।
এহসান বাড়ির প্রতিটি দেয়াল আজ উৎকণ্ঠায় ভারী। চার মাসের ছোট্ট আয়াশ এহসানকে ঘিরে যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আছে সবার। কারো ঠোঁটে শব্দ নেই, অথচ প্রতিটি চোখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।
একজন পিতার বুকের ভেতরও যে এভাবে ভাঙনের শব্দ ওঠে, তা আজ অনুভব করছে আফরিদ এহসান। ন্যান্সির জন্য সে উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সন্তানের জন্য তার অন্তরটা যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। চোখদুটো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, অথচ অসহায় পুরুষটি কিছুই করতে পারছে না।
ঘুমন্ত ন্যান্সির বিবর্ণ মুখপানে তাকিয়ে গভীর অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছে আফরিদ। সে তো সত্যিই সব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল পরিচিত শহর, সম্পর্ক, ব্যস্ততা, সমস্ত অতীতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ছাড়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিল। দূর অচেনা কোনো দেশে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতো তারা। যেখানে ন্যান্সি নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারতো, নিজের ইচ্ছে মতো বাঁচতে পারতো।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধ পরিবেশ চিরে তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠলো কলিংবেল।
চমকে উঠলো সবাই। স্মাইলি প্রায় দৌড়ে ছুটে গেল সদর দরজার দিকে। এত রাতে কে এসেছে, সেই কৌতূহল আর অজানা আশঙ্কা একসাথে টেনে নিয়ে গেল তাকে।
শব্দ শুনে নিচে নেমে এলো বাড়ির বাকিরাও।মাইমুনা এহসান অবশ্য প্রথম থেকেই ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। মুখাবয়ব কঠোর।
স্মাইলি দরজা খুলে কাউকেই দেখতে পেলো না, শুধুমাত্র একটা বক্স রাখা দেখল!
বক্সটি দেখা মাত্রই ইদ্রান তার দিকে এখানে গিয়ে বলল,
“ডোন্ট টাচ, প্রিন্সেস!”
স্মাইলি থমকে গেল! ইদ্রান নিজে গিয়ে বক্সটা নিয়ে এলো! সকলের মুখে অদ্ভুত এক কৌতুহল প্রকাশ পাচ্ছে!
ঈশানকে কিছু একটা ইশারা করতেই সে ছুটে গেল বাইরে। উঁহু কেউ নেই আশেপাশে!
সেন্টার টেবিলের উপর রাখা কৃষ্ণবর্ণ বাক্সটির দিকে তাকাতেই আফরিদ এহসানের ভ্রুযুগল গাঢ়ভাবে কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। বুকের গভীরে অজানা এক অশুভ আশঙ্কা ধীরে ধীরে বিষাক্ত লতার মতো বিস্তার লাভ করতে লাগলো।
চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে।
অবশেষে ধীর, কাঁপা আঙুলে বাক্সটির ঢাকনা উন্মোচন করতেই সমস্ত পৃথিবী যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সময় থমকে দাঁড়ালো।
নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল উপস্থিত প্রতিটি প্রাণ।
ভেতরে পড়ে আছে রক্তসিক্ত একটি ক্ষুদ্র শিশুগেঞ্জি যার প্রতিটি ভাঁজে লেপ্টে আছে নির্মমতার বিভীষিকা।
তার পাশেই সেই ছোট্ট তোয়ালেটি, যেটার উষ্ণ ভাঁজে জড়িয়ে রাখা হতো চার মাসের আয়াশ এহসানকে।
আর ঠিক তার সন্নিকটে কিছু ক্ষুদ্র হাড়।
অপরিণত, কোমল মাংসখণ্ড। যেখানে এখনো কোথাও কোথাও ছিন্নভিন্ন মাংসের অংশ লেগে রয়েছে।
স্পষ্ট প্রতীয়মান কোনো হিংস্র নিষ্ঠুরতা সেগুলোকে খুবলে খুবলে গ্রাস করেছে। আফরিদের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে এলো।
পায়ের নিচের জমিন যেন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেললো।
মাইমুনা এহসান স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠোঁট কাঁপছে, অথচ বাক্য উচ্চারণের শক্তিটুকুও যেন বিলীন হয়ে গেছে।
তিতলি ও স্মাইলি দু’জনেই টলমল হয়ে পড়লো র’ক্তমাখা কাপড়গুলোর দৃশ্য দেখে।
বাক্সের এক কোণায় নিঃশব্দ সাক্ষীর মতো পড়ে আছে একটি মেমোরি কার্ড। আফরিদ সেটি হাতে তুলতেই উপরতলা থেকে ধীর, ভগ্ন পদচারণার শব্দ ভেসে এলো।
ন্যান্সি। অবসন্ন, রুগ্ণ শরীর নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সে। মুখশ্রী বিবর্ণ, চোখদুটি গভীর শূন্যতায় নিমজ্জিত। তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো র’ক্তা’ক্ত তোয়ালে আর ক্ষুদ্র গেঞ্জিটির উপর।
কয়েক মুহূর্ত সে নিথর দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হচ্ছিল, বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে।
অতঃপর কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করলো,
“এ,,, এগুলো,,,
আফরিদের অন্তঃস্থল যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। তবুও সে চোখ তুলে তাকাতে পারলো না ন্যান্সির দিকে।
ন্যান্সি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে কাপড়গুলো গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।
হয়তো সে মরিয়া হয়ে নিজেকেই বোঝাতে চাইছিল এগুলো তার আয়াশের নয়। এটা কোনো বিভ্রম।
একটি নিষ্ঠুর প্রহসন। ঠোঁটের কোণে বিকৃত এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
ভাঙা কণ্ঠে বললো,
“এগুলো,,, আয়াশের নয় তাই না আফরিদ?”
নিস্তব্ধতা। আর সেই নিস্তব্ধতাই যেন সবচেয়ে নির্মম স্বীকারোক্তি হয়ে উঠলো।
ন্যান্সি আচমকাই কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
র’ক্তসিক্ত বস্তুগুলোর দিকে তাকাতেও যেন তার আত্মা বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। তিতলি ফুঁপিয়ে উঠলো।
স্মাইলি দ্রুত এগিয়ে এসে ন্যান্সির বাহু স্পর্শ করতে চাইলে সে নিজেকে সরিয়ে নিল।
তারপর আচমকাই ভেঙে পড়া কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো,
“আপনি চুপ কেন, আফরিদ?আপনি তো বলেছিলেন আমার আয়াশকে ফিরিয়ে আনবেন! আমার সন্তান কোথায়? এই র’ক্তমাখা বিভীষিকা কেন?”
আফরিদের শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, ভয়ঙ্কর পরিচয় সবকিছু আজ নিষ্প্রভ।
মাফিয়া আফরিদ এহসান আজ কেবল এক ব্যর্থ পিতা। ন্যান্সির দৃষ্টি পুনরায় গিয়ে স্থির হলো ক্ষুদ্র গেঞ্জিটার উপর।
পরমুহূর্তেই তার বুকচেরা আর্তনাদে কেঁপে উঠলো সমগ্র এহসান মঞ্জিল।
“আমার বাচ্চা, আমার আয়াশ,আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন।”
ন্যান্সির ক্রন্দনের প্রতিধ্বনি দেয়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো চারদিকে। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ইট-পাথর পর্যন্ত শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে।
আর সেই আর্তনাদের ভেতর ন্যান্সির কর্ণকুহরে যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শিশুটির হাসি। ক্ষুদ্র হাত-পা নাড়ার শব্দ। মায়ের বুকের গন্ধ খুঁজে কেঁদে ওঠার শব্দ। প্রতিটি স্মৃতি আজ শাণিত ফলকের ন্যায় বিদ্ধ করছে তার অন্তর।
তার এই কষ্ট দেখে হেসে উঠলো কল্পনা। মাইমুনা এহসান আর সহ্য করতে পারলেন না।
অশ্রুসিক্ত নয়নে এগিয়ে এসে কষে এক চড় বসালেন কল্পনার গালে। লুটিয়ে পড়ল মেয়েটা। নিজেও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেও ভেঙে পড়ল। কারণ সেও তো হারিয়েছেন নিজের রক্তের উত্তরাধিকার। ন্যান্সি সিঁড়ির ধাপে ভেঙে পড়লো।
দু’হাতে মুখ আচ্ছাদিত করে হাহাকারে কাঁদতে লাগলো। আফরিদ ধীরপায়ে এগিয়ে এলো।
র’ক্তসিক্ত কাপড়গুলো বুকে আঁকড়ে নিয়েই বসে পড়লো ন্যান্সির পাশে।
সঙ্গে সঙ্গে ন্যান্সি উন্মাদের ন্যায় তার বুকে আঘাত করতে লাগলো।
“আপনি কাপুরুষ! নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে পারলেন না। কেমন পিতা আপনি?”
আফরিদ নির্বাক। অশ্রুহীন সেই দৃষ্টি যেন মৃ’ত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। এই একত্রিশ বছরের জীবনে তার সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল মাত্র দু’জন
ন্যান্সি আর আয়াশ এহসান। আজ সেই ক্ষুদ্র প্রাণটুকুও তার নাগালের বাইরে। ন্যান্সি দু’হাতে র’ক্তমাখা গেঞ্জিটি আর ওই হাড়গুলো বুকে চেপে ধরে বিলাপ করে উঠলো,
“আমার সন্তানটার খুব কষ্ট হয়েছিল, তাই না?
কেন ওকে এত যন্ত্রণা সহ্য করতে হলো?আমার আয়াশ!”
তার আর্তচিৎকারে ঈশান ও ইদ্রানের চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। সেই রাত প্রমাণ করেছিল একজন মায়ের ক্রন্দন শুধু একটি ঘর নয়, সমগ্র পৃথিবীর নীরবতাকেও বিদীর্ণ করে দিতে পারে।!
চলবে…………।
Share On:
TAGS: অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা, ফারহানা নিঝুম
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫৫ শেষ অর্ধেক
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫০
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫১
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৩৭
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ২৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৪৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৭৫
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৫২
-
অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৯৬