#জাহানারা
#জান্নাত_মুন
পর্ব :৯৫(প্রথমাংশ)
ক’পি করা নিষিদ্ধ
সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
বর্ষপঞ্জির পাতায় আজ অক্টোবরের নবম দিন। নতুন মাসের ছোঁয়ায় কাশ্মীর যেন তার রূপের জাদুকরি ঝাঁপি খুলে বসেছে। এখন দিনের বেলা আকাশ একদম মেঘমুক্ত, গাঢ় এবং নিটোল কাঁচের মতো নীল। সেই নীল আকাশের ব্যাকড্রপে দাঁড়িয়ে আছে পাইন ও দেওদার বনের সবুজ শাড়িতে মোড়া একদল মৌনী পাহাড়ের প্রাচীর। পাহাড়ের একদম ওপরের চূড়াগুলোও এখন হালকা তুষারপাতের কারণে ধবধবে সাদা বরফের মুকুট পরে রেখেছে। সেই পাহাড়গুলোর বুক চিরে নুপুরের নিক্বণ তুলে নেমে আসছে চঞ্চলা ঝরনার স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের ধারা। যেন কোনো পাহাড়ি কুমারী আপনখেয়ালে ছুটে চলেছে। অন্যপ্রান্তে, উপত্যকার বুক চিরে ধেয়ে চলা শালিশাঙ্গা নদীর অবাধ্য, চপল স্রোত আর সেই পাহাড়ি ঝরনার মিতালিতে চারপাশের প্রগাঢ় বাতাস যেন এক অপার্থিব জলতরঙ্গের সুরে মুখরিত হয়ে উঠছে।
শালিশাঙ্গার ঠিক তীর ঘেঁষেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে পাহাড়-বেষ্টিত এক টুকরো সমতল ভূমি বুদগাম। বিস্তীর্ণ সবুজ এই উপত্যকায় অক্টোবরের হেমন্তি হাওয়া লাগতেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা চিনার গাছের সবুজ পাতাগুলো স্বর্ণালি রঙ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে পুরো উপত্যকা জুড়ে যেন এক অলৌকিক লাবণ্যের আ’গুন লেগেছে! আবার খোলা দিগন্তের নিচে বিছিয়ে আছে মখমলের মতো ছাঁটা ঘাসের বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ। সেখানে স্থানীয় রাখাল ও গুজ্জরদের শত শত তুলতুলে ভেড়ার পাল শান্তিতে চরে বেড়াচ্ছে। ডানাভাঙা বাতাসের মতো মাঝে মাঝে দু-একটি ঘোড়া আপনমনে ছুটে চলেছে। ঠিক যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো তৈলচিত্র।
বুদগামের এই মাটির সাথে এখানকার মানুষের নাড়ির টান বহু পুরোনো, পুরুষানুক্রমিক। তাই প্রকৃতির এই শান্ত কোলের বুক জুড়েই সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বড় বড় ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি কোঠি ও বাংলো। বেলা শেষের ম্লান আলোয় উপত্যকায় এখন বিকেলের ছায়া নেমেছে। সেই সথে ঘরে ঘরে উনুন জ্বলে ওঠার চিরচেনা ব্যস্ততা। তাই কিছু কোঠির চিমনি থেকে এখন হালকা নীলচে ধোঁয়া ডানা মেলেছে আর পরক্ষণেই তা মিশে যাচ্ছে নীল আকাশের অনন্ত শূন্যতায়।
এই বুদগামেই শিকড় গেঁথে আছে সুরেহা বিবির পৈত্রিক বংশের। তার বাবার প্রয়াণের পর, তাদের বিশাল হস্তশিল্প সহ বেশ কয়েকটি ঐত্যবাহী ব্যবসার হাল এখন তাদের নতুন প্রজন্মের হাতে। এখানে সবাই একান্নবর্তী পরিবারের মতো মিলেমিশে বসবাস করছে। শালিশাঙ্গা নদীর খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি দেবদারু, পাইন কাঠ এবং বিশেষ লাল ইটের নান্দনিক গাঁথুনিতে দিয়ে তৈরি কোঠিগুলো। আরিফের শ্বশুর শাহাবুদ্দিন মেয়ের জামাইকে তাদের কোঠির পাশেই চমৎকার একটি দৃষ্টিনন্দন ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি দোতলা কোঠি তৈরি করে দিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে আরিফ তার ছেলে বউ নিয়ে এখানেই থাকছে।
—
অফিসের ব্যস্ততা চুকিয়ে আজ একটু জলদিই বাসায় ফিরেছিল আরিফ। বিকাল হতেই ছেলেকে নিয়ে খোলা বারান্দায় এসে খুনশুঁটিতে মেতেছে। কাঠের তৈরি এই বারান্দা থেকে পুরো বুদগামের উপত্যকা যেন এক মায়াবী ক্যানভাসে পাখির চোখের মতো ধরা দেয়। আর তাই তো প্রকৃতির এই নৈসর্গিক রূপ সুধা পানের জন্য বারান্দায় পেতে রাখা হয়েছে নান্দনিক কারুকাজের কাঠের চেয়ার-টেবিল। আরিফ আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। বাড়ির পিছনের দিকে খুব সন্নিকটই মাইলের পর মাইল জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিফের শ্বশুরের সুবিশাল জাফরান বাগান। শরতের ছোঁয়ায় পুরো ক্ষেত এখন বেগুনি ফুলের এক জীবন্ত গালিচায় রূপ নিয়েছে। সেই বেগুনি চাদর ভেদ করেই হিমেল বাতাসে ভেসে আসছে জাফরানের মাদকতাময় মিষ্টি সুবাস। আরিফ চোখ বুজে, বুক ভরে সেই মনমাতানো সুগন্ধ নিজের অস্তিত্বে টেনে নিচ্ছে।
চারপাশে হালকা চাদর বিছিয়ে বইছে হিমেল হাওয়া। কাশ্মীরের এই উঁচু উপত্যকায় দিনের বেলা আবহাওয়া কিছুটা নরম থাকলেও, সূর্য পাটে বসতেই যেন শীতের কামড় শুরু হয়। আর রাতের বেলা তো নেমে আসে কনকনে শীতের রাজত্ব। অবশ্য ঘরের ভেতর আধুনিক হিটারের ওমে সেই তীব্রতা টের পাওয়া দায়, নাহলে এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বুদগামবাসীর রক্ষে ছিল না! ঠান্ডার এই প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতেই মখমলে উষ্ণ ওলের কাপড় পরিধান করে পাশের চেয়ারে বসে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে কাব্য।
আরিফ চায়ের কাপ হাতে নিয়েই বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল। বারান্দার কাঠের রেলিং ধরে দূরের ধূসর মেঠোপথের দিকে তাকাতেই তার চোখ স্থবির হয়ে গেল। সেখানে দূর থেকে হেঁটে আসছে তার একমাত্র প্রেয়সী। যে কিনা বাজার সেরে হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকেই ফিরছে। বাড়ির দোরগোড়ায় আসতেই মাকে তার সখের মেষগুলোকে খোয়াড়ে ঢুকাতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। অতঃপর পিছনে খেদিয়ে দিয়ে মায়ের কাজে সাহায্য করল।
আরিফ মুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগল অর্ধাঙ্গিনীকে। নাদিয়ার পরনে জাফরানি রঙা কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী ঢিলেঢালা পোষাক ফেরান। মাথায় সযত্নে জড়ানো লাল স্কার্ফ আর অঙ্গে শোভা পাচ্ছে রুপালি কারুকাজের বেশ কিছু নজরকাড়া ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি গহনা। মেয়েটা বড্ড সহজ-সরল, বুকের ভেতর একরাশ চপলতা পুষে রাখা এক চঞ্চলা হরিণী। অথচ সংসারের আঙিনায় সে ভীষণ মনোযোগী, পুরোদস্তুর ঘরোয়া। স্ত্রীকে দেখতে দেখতে আরিফের স্মৃতির পাতাগুলো যেন একে একে উল্টাতে লাগল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরোনো সেই দিনগুলো, কিভাবে ভারতে এসে অল্প বয়সে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে। তারপর…!
হঠাৎ করেই আরিফ কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে খেলতে থাকা সন্তানকে দেখতে দেখতে গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেল। আরিফের ঘোর ভাঙে নাদিয়ার ডাকে,
–“হে গো, ঘুম ভেঙেছে তোমার?”
চকিতে চোখের পলক ফেলল আরিফ। ছেলের কোমল বদনখানি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। মনের ভেতর জমা হওয়া একরাশ অবাধ্য মেঘকে আড়ালে চাপা দিয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে নাদিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। অতঃপর নাদিয়াকে শুধাল,
–“কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”
নাদিয়া হাফ ছাড়ল। বাসা থেকে খুব একটা দূরে নয় গ্রাম্য বাজার। তবুও মেয়েটা হাঁপিয়ে ওঠেছে। শ্বেতশুভ্র চেহারা তার বাইরের হিমেল হাওয়া লেগে এখন গোলাপি ঠেকছে। ভারী মিষ্টি দেখতে মেয়েটা। তার তীক্ষ্ণ নাক, টানা চোখ, উজ্জ্বল ফর্সা থেকে গমগমে গায়ের রঙ, এবং ডিম্বাকৃতি চেহারার গড়ন বলতেই হয় কাশ্মীরি মেয়েরা জাতে সুন্দরী। খাটি প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের অধিকারিনী।
নাদিয়া হাতের বাজারের ব্যাগ মেঝেতে রেখে দিল। তারপর হাত চালল মাথার রেশমি স্কার্ফটি খুলার জন্য। আরিফের প্রশ্নের প্রতুত্তরে বলল,“আর বলো না গো। চিনিসহ আরও কিছু সদাই-পাতি শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাতে রান্না করতে হবে তাই গিয়ে নিয়ে আসলাম।”
আরিফ ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেলল। শান্ত গলায় বলল,“এই জন্য তুমি যাবে হাঁটে? তুমি আমায় ডেকে দিলে না কেন?”
রমণী সরল হেসে বলল,“অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে একটুখানি চোখ বুজেছিলে, তাই আর ডাক দিয়ে তোমার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। তাছাড়া ভেবেছিলাম ঐ বাড়ি থেকে নিয়ে আসব। পরে লোক ল’জ্জা’য় আর যায়নি। যখন-তখন বাপের ঘর থেকে জিনিসপত্র আনা কেমন দেখায়। তোমার সম্মানের কথা ভেবেই আর যায়নি। বরং নিজেই গিয়ে কিনে নিয়ে আসছি।”
নাদিয়ার এমন সমঝদার কথা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করল আরিফ। নাদিয়ার গাল টেনে সহাস্যে বলল,“সুবুদ্ধি তবে হচ্ছে তোমার।”
নাদিয়াও হাসল। তখনই বাইরে থেকে রাশভারী, পুরুষালি গলা ভেসে এলো। কাব্য খেলাধুলা ফেলে রুমের ভেতর ছুটে যেতে যেতে ডেকে উঠল,“নানাভাই এসেছ..!”
শাহাবুদ্দিন নাতিকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসলেন। বিশাল লম্বাচওড়া গড়নের মানুষ। লোকটার পরনে ঐতিহ্যবাহী খান-ড্রেস ও মাথায় কারাকুল টুপি। নাতিকে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে তার কোমল গালে স্নেহের অসংখ্য চুমু এঁকে দিচ্ছেন তিনি। অতঃপর মেয়েকে ধমক দিয়ে কাশ্মীরি ভাষায় বললেন,
–“কিয়া ছু কুর, কুরি বাজার গ্যশুন কিস হমতস? তুহুন্দ বাও কিয়া মুর্থ গ্যশ?” (কিরে মেয়ে, তুই বাজার করতে গেলি কোন সাহসে? তোর বাপ কি মরে গেছে নাকি?)
নাদিয়া কিছু বলতে পারল না বাবার মুখের উপর। আরিফ সহাস্যে কোমল গলায় বলে উঠলো,“ব্রাও নাহ মানিও আব্বা, তুহ্য ছিও আসান খাতির বহত কনেহ করুন। মে ছু নাহ কুনেহ কনেহ করুণ দিওয়ান ঘর খাতির। ইয়ি আসল ছু কিয়া নিশান দিওয়ান?” (কিছু মনে করবেন না আব্বা, আপনারা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেন। আমাকে তো সংসারের জন্য কিছুই করতে দেন না। এটা আসলে কেমন দেখায়?)
কথা সম্পূর্ণ করার সুযোগ হয়ে ওঠল না আরিফের। পথিমধ্যেই আরিফকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন শাহাবুদ্দিন,“কিয়া ছু সুহ দিখান? তুহ্য ছিভ মে হুন্দ পগর, পর কিয়া? ইয়থ দোহ তাম ছুস জিন্দ, তুহুন্দ সারি জিম্মেদারি ছু মে হুন্দ। তুহুন্দ জিম্মেদারি ছু বাস মে কুরিস তেহ নেহরিস ঠিকঠাক দেখ রাখুন।” (কেমন দেখায় মানে কী? তুমি আমার পোলা। পর নাকি? যতদিন বেঁচে আছি তোমাদের সব দায়িত্ব আমার। তোমার দায়িত্ব খালি আমার মেয়ে আর নাতির ঠিকঠাক দেখাশোনা করা।)
–“মগর!” (কিন্তু!)
আরিফ কিছু বলতে গেলে ফের থামিয়ে দিলেন শাহাবুদ্দিন। আরিফের বাহু চাপড়ে শান্ত গলায় হেসে বললেন,“তুহ্য ছিও নাহ অথ কথ সোচান, বেটা। বহ ছুস না ইয়িথ?” (তুমি এতকিছু ভাবতে যেও না বেটা। আমি আছি তো।)
আরিফ আর কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না। নাদিয়া হেসে হাতে বাজারের ব্যাগ তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার আগে বলল,“আব্বা জান, তুহ্য বসিভ, বহ চায় বানাওয়িথ আন্দিস।” (আব্বাজান, আপনারা বসেন, আমি চা করে আনছি।)
শাহাবুদ্দিন চেয়ারে বসতে বসতে শুধালেন,“মে জাহান আম্মাজান কুথ ছি?” (আমার জাহান আম্মাজান কই?)
আরিফ এক মূহুর্ত ভেবে বলল,“রুমস মাঞ্জে আসুন গ্যশি, বহ গ্যশিথ দাওয়াস আন্ন।” (রুমেই থাকার কথা। আমি গিয়ে ডেকে আসছি।)
__________
“ওগো নাগর আমার নিঠুর বরও
মন ও বোঝে না,
আমার ভাঙ্গা খাঁচা পড়ে আছে
সে তো আসে না ,
পোড়া মনে ভালবাসা,বাসা বাধে না…!!”
–“জাহান!”
অতিপরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই চুপ হয়ে গেল জাহানারা। রুদ্ধ হয়ে গেল ওষ্ঠাধরে গুনগুন করে তোলা তার বেখেয়ালি সুরের ধারা। আরিফ রুমের ভেতরে এসে দেখল বেলকনির দরজার কাছে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে জাহানারা। পরম মমতায়, আপনমনে অনাগত সন্তানের জন্য সুই-সুতো দিয়ে একটি নকশিকাঁথা বুনে চলেছে সে। আরিফের উপস্থিত ঠাহর করেও সেদিকে না তাকিয়ে ছলছল অক্ষিপল্লব লুকাল রমণী। গোধূলির এই হিমেল লগ্নে, শরীরের এই নাজুক অবস্থায় জাহানারাকে এমন অবহেলায় ফ্লোরে বসে থাকতে দেখে আরিফের মুখাবয়ব শক্ত হয়ে উঠল। আপাতত সে জাহানারার বন্ধু কম, গার্ডিয়ান বেশি। তাই তার দায়িত্ব মেয়েটাকে ঠিকঠাক দেখেশুনে রাখা।
আরিফ জাহানারা সন্নিদ্ধে এগিয়ে আসল। পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্বের সুকুমার ও স্নিগ্ধ ছাপ এখন রমণীর সর্বাঙ্গে স্পষ্ট ও প্রস্ফুটিত। ভারী শরীর নিয়ে সে এখন খুব বেশি একটা নড়াচড়া করতে পারে না। ডেলিভারির ডেইট আর দিন দুয়েক পরেই। তাই এই নিভৃত দিনগুলো মেয়েটি কাটাচ্ছে তার অনাগত সন্তানের জন্য নিজ হাতে হরেক রকমের নকশিকাঁথা আর ছোট্ট ছোট্ট ওলের পশমি জামাকাপড় বুনে। সামনেই ধেয়ে আসছে কনকনে শীতকাল, তখন কাশ্মীর মুড়ে যাবে শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে, প্রতিনিয়ত চলবে তুষারপাত। প্রকৃতির সেই বৈরী ও নি’ষ্ঠু’র আবহাওয়ার হাত থেকে নিজের বুকের মানিককে পরম উষ্ণতায় আগলে রাখার জন্যই তার এই সুই-সুতোর নিরলস বুণন।
কিন্তু এমন সংকটকালেও মেয়েটা নিজের প্রতি বড্ড বেখেয়ালি, এক অদ্ভুত উদাসীনতায় আচ্ছন্ন। এই যেমন, এখানে দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকায় বিকেলের জাঁকিয়ে বসা হিমেল হাওয়ার ঝাপটায় তার পদ্মফুলের মতো নিখুঁত, উজ্জ্বল ফর্সা মুখশ্রীখানা এখন র’ক্তি’ম হয়ে উঠেছে। নিজের অযত্ন আর বিনিদ্র রাত জাগার ফলে চোখের নিচে কালি পড়েছে। আরিফ মাঝেমধ্যে বাকহারা হয়ে পড়ে। মেয়েটা যে কি বলে সান্ত্বনা দিবে তার ভাষাটুকু খুঁজে পায় না। সচক্ষে দেখেছে এই রমণীর সাথে অতীতে কি কি ঘটে গেছে। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েও মনকে সুস্থির করতে পারে না বেচারা। অগত্যা মনের ভেতরের তপ্তশ্বাস আড়ালে চেপে সে জাহানারার মাথায় ভরসার হাত রাখল। কোমল গলায় বলল,
–“গর্ভবতী অবস্থায় এভাবে ফ্লোরে এতক্ষণ ধরে কেউ কি বসে থাকে? ঠান্ডা লাগবে তো। আব্বা এসেছেন, বাইরে আয় আমার সাথে। সকলে মিলেমিশে গল্প করলে ভালো লাগবে তোর।”
জাহানারা কোনো জবাব দিল না। কেবল ম্লান মুখে না-সূচক মাথা নাড়ল। আরিফ কয়েকবার জোর করলেও রমণী নিজ স্থানে অটুট রইল। হার মেনে আরিফ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জাহানারা নিজ হাতে সেলাই করা ছোট্ট নকশিকাঁথাটা চোখের সামনে তুলে ধরল। ছলছল নেত্রে এক মূহুর্ত সেটিকে দেখে তা বুকে চেপে ধরে চোখ বুঁজল, নাক টেনে কান্নাটা সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাল। অতঃপর যত্ন করে ভাজ করে রাখল। সুই-সুতো গুটিয়ে যখন পাশে রাখা বক্সটিতে রাখতে যাবে, অমনি নজরে পড়ল শ্বেতশুভ্র কাগজটির উপরে।
সুই সুতা রেখে জাহানারা কাগজটি হাতে তুলে নিল। গত বাইশে আগস্ট, তার জন্মদিন উপলক্ষে একটি বেনামি পার্সেল এসেছিল তার কাছে। সেখানে একটা ফাইলের সাথে এই একটুকরো শ্বেতপত্রটি ছিল। ফেলে আসা সেই দৌর্মনস্য দিনগুলো থেকে এখন অব্ধি কতবার যে এই অপ্রত্যাশিত চিঠিটা পড়ল, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখন আবারও কাগজটা খুলে নিস্প্রভ চোখ বুলাল চিঠির গোটাগোটা অক্ষরগুলোতে,
“আমার বুলবুলি, আমার আঁধার জীবনের পূর্ণিমার চাঁদ। স্বপ্ন কি তা আমার জানা ছিল না। আর না আমার এই গন্তব্যহী, ছন্নছাড়া জীবনে কোনো স্বপ্নের অস্তিত্ব ছিল। আমি প্রলয়ঙ্কারী খরস্রোতা নদীর মতো বয়ে চলছিলাম উদ্দেশ্যহীন কোনো এক অবিদিত তেপান্তরে। তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত আগমনে থমকাল আমার সেই অধ্রুব জীবনের গতিপথ। আমি সেদিন থেকেই এক দুর্বোধ্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। মানুষ জীবনে স্বপ্ন দেখে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আরও কত কি হতে! আর আমি? আমি আমার জীবনে প্রথম আর শেষ একটাই স্বপ্ন দেখেছিলাম, তোমাকে আমার করে নেওয়ার।
আমার স্বপ্নের রাণী, তোমার রবের দরবারে একদিন দু’হাত তুলে খুব করে প্রার্থনা করেছিলাম, তোমাকে আর তোমার গর্ভে আমার র’ক্তকে যেন রক্ষা করেন। তিনি বোধহয় আমার প্রার্থনা সেদিন শুনেছিলেন। সেইজন্যই হয়তো তোমাদের সুস্থভাবে আবারও ফিরে পেয়েছি। সেদিন তোমার রবের উপর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমি মনে মনে মানত করেছিলাম, আমার হালাল উপার্জনে তোমাদের নামে একটি মসজিদ, মাদ্রাসা আর একটি অনাথ আশ্রম দিব। তাই আজকের মতো একটা চমৎকার দিনে তোমার জন্য আমার থেকে এই ছোট্ট উপহার।
আমার এক জীবনের পূর্ণতা, আমি যে সর্বদা মৃ’ত্যু নিয়ে খেলা করি। তাই আমার এই অনিশ্চিত জীবনের হতে পারে এটিই আমার তরফ থেকে আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ উপহার কিংবা আপনার শেষ গন্তব্যস্থল। কখনো খুব বেশি ক্লান্ত অনুভব করলে সেখান থেকে ঘুরে আইসেন।
হোয়াট এভার! হ্যাপি বার্থডে, ম্যাডাম। এই অধমের দোয়া আবারও আপনার রব কবুল করবে কিনা জানা নেই। তবুও প্রার্থনা করি সবসময় আপনি আর আপনার অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠতে থাকা প্রাণটা সুস্থ থাকেন। আমার এই নশ্বর জীবনের অবশিষ্ট সবটুকু আয়ুষ্কাল আপনাদের হোক। তবুও আপনারা দীর্ঘজীবী হন।”
ইতি
আপনার স্বামী কিংবা আসামি!
জাহানারা নিস্পন্দ হয়ে খানিকটা সময় ওই শ্বেতপত্রের পানে পরিশ্রান্ত নয়নে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এক সময় সমস্ত বাঁধ ভেঙে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রুকণা, তা টুপ করে ঝরে পড়ল চিঠির শ্বেতশুভ্র বুকে। অবাধ্য এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। বুকের ভেতরটা যেন এক নিরেট পাথরের চাঁইয়ে চাপা পড়ে আছে, যেখানে দম নেওয়াটাই দায়। এই গোধূলিলগ্নে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া তার যেন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা গলিয়ে, ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সিক্ত কণ্ঠে অস্ফুটে বিড়বিড় করে উঠল জাহানারা,
“চাই না আপনার কোনো উপহার। লাগবে না আপনার থেকে কিছুই।
মিথ্যাবাদী লোক, কথা দিয়ে কথার খেলাপ করলেন। বলেছিলেন আমাকে ছেড়ে যাবেন না। এখন ঠিকই পালিয়েছেন।
আপনি কেন করলেন এইটা? কেন করলেন আমার সাথে এমন চৌধুরী সাহেব? একবারও কি আপনার বুক কাঁপল না, সেদিন নিজেকে শেষ করে দিতে? আমার কথা বাদই দিলাম, একবার কি আমার পেটে বেড়ে উঠতে থাকা আপনার অংশের কথা মাথায় এলো না? কেন ওরে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই এতিম করে দিলেন? ওর কি অপরাধ ছিল? আমারেই বা কেন এভাবে সারাজীবনের জন্য এক জীবন্ত অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন? এখন কি জবাব দিব আমি তাকে, যখন আপনাকে বাঁচাতে পারি নি কেন সেই অভিযোগ তুলবে?
আপনি কি জানতেন না চৌধুরী সাহেব, এই আমি ভেতর থেকে কতটা র’ক্তা’ক্ত? আপনি তো খুব ভালো করেই জানতেন আমার অবুজ হৃদয়টা কতটা ক্ষ’তবিক্ষ’ত! তবে কেন বুঝলেন না আমায়? তবে এটা কিসের শাস্তি দিলেন?”
পথিমধ্যে থমকাল রমণী। শুষ্ক অধরকোণে ভেসে উঠল তাচ্ছিল্যের বিষাদমাখা হাসি। নিজের ভাগ্যকে বিদ্রুপ করে ফের বলে উঠল,“যান আপনার এই শাস্তি আমি মাথা পেতে নিলাম। একাই নাহয় বয়ে বেড়াব সব অপরাধ, অপবাদ আর য’ন্ত্রণা। সব যাতনা নাহয় আমারই থাক। হবে না আমারে আর বুঝতে। আমিতো নিজেরেই নিজে বুঝতে পারলাম না আজও। পারলে কি আর পাপকে চরম ঘৃ’ণা করা সত্ত্বেও, আপনার মতো পাপীর মোহে জড়াতাম! আর নাতো…”
বাক্য সম্পূর্ণ করলো না জাহানারা। সহসা চোখ বুজে বিমর্ষ হাসল। নিস্তেজ ভঙ্গিতে মাথা ঠেকাল দুয়ারের পাল্লায়। তারপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলে উঠল,“কিছু কথা না বলায় শ্রেয়। থাক না অন্তরালে। বললে কি আর আপনি ফিরে আসবেন! আসবেন না তো। তবে সেই না বলা কথাগুলো আপনার আর জানারও অধিকার নেই।”
_______________
রাতের ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথেই পুরো কাশ্মীর উপত্যকা যেন এক আদিম নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। চারপাশের সব কোলাহল স্তব্ধ, মানুষ এখন ঘোর নিদ্রামগ্ন। মেঘহীন আকাশে এখন একচ্ছত্র রাজত্ব করছে এক রূপবতী পূর্ণিমার চাঁদ। সেই অপার্থিব রুপালি আলোয় আধো-অন্ধকারে আবছা দৃশ্যমান হয়ে আছে চারপাশের হিমশীতল প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য। দেয়াল ঘড়ির কাটা রাত তিনটা নাগাদ। সারা রুম অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জাহানারা। গায়ে চাদর টেনে না রাখায় কনকনে ঠান্ডায় তার মোমের মতো কোমল দেহখানা জমে আসার উপক্রম।
হঠাৎ করেই ঘুমের ঘোরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করল রমণীকে। এক অজানা আ’তঙ্কে চোখ-মুখ খিঁচে দুহাতে ম’রণকামড়ের মতো মুঠো করে ধরল বিছানার চাদর। মুহূর্তের মধ্যে এই তীব্র শীতেও ঘামে জুবুথুবু হয়ে উঠল তার সারা শরীর। অবচেতনের সেই অতল গহীনে সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল, কে যেন অতি সন্তর্পণে তার শাড়ির আবরণ সরিয়ে, তার স্ফীত উদরে এক জোড়া উষ্ণ ঠোঁটের গভীর স্পর্শ এঁকে দিচ্ছে! অতঃপর কানের কাছে কেউ সমস্ত পুরুষালি গলার মাদকতা ঢেলে হিসহিসিয়ে ডাকছে,
–“বুলবুলি, আমার বুলবুলি।”
ছটপট করতে করতে এই পর্যায়ে শুয়া থেকে অকস্মাৎ চোখ মেলে ওঠে বসল জাহানারা। কপাল বয়ে ঘাম ছুটছে তার। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন কামারের নেহাইয়ের মতো পিটছে, জোরে জোরে হাঁপাতে হাঁপাতে সে অন্ধকার ঘরে চারদিকে চকিত দৃষ্টি বুলাল। তখনই তার চোখে পড়ল, বারান্দার রেশমি পর্দাটা হিমেল বাতাসে অবাধ্যের মতো উড়ছে। আর সেই পর্দার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে এক ফালি ধারালো, ত’লো’য়ারের মতো জোছনার আলো আর কুয়াশার হিমকণা। জাহানারা একরাশ উদ্বেগ আর আ’তঙ্ক মেশানো চেহারায় উন্মত্তের মতো ঘরের প্রতিটি কোণায় কাউকে খুঁজতে লাগল। সে কাঁপন্ত গলায়, রুদ্ধশ্বাসে ঘরের অন্ধকারের উদ্দেশেই বলে উঠল,
–“আমি জানি তুমি এসেছ। কোথায় লুকিয়ে পড়লে তুমি? বেরিয়ে এসো বলছি।”
কিন্তু পুরো ঘর জুড়ে কেবল শ্মশানের নৈঃশব্দ্যের নি’ষ্ঠুর দখলদারি। কারো কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আর একটা মুহূর্তও সময় অপচয় করল না রমণী। ভারী শরীর নিয়েই বিছানা ছেড়ে প্রায় ছুটে গেল বারান্দার দিকে। জাহানারার মন বারবার চিৎকার করে বলছে, তার এই নিভৃত কক্ষে কেউ একজন নিশ্চয়ই এসেছিল! আবার মনের এক কোণে তীব্র বিশ্বাস জাগল, এইতো কিছুক্ষণ আগেও বুঝি বারান্দায় কেউ ছিল। কিন্তু না, সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সব উধাও। হিমেল হাওয়া ছাড়া আর কারো কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পেল না সে।
কোঠির চারপাশটা সুউচ্চ পাথুরে প্রাচীরে ঘেরা। এই সুরক্ষিত দুর্গের মতো ঘেরাটোপের ভেতর কোনো মানুষের অবয়ব বা সামান্য ছায়াও নজরে না আসায় ভীষণ ত্রস্ত হয়ে পড়ল জাহানারা। বারান্দার রেলিং গলে নিচের অন্ধকারের দিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টি রাখতেই শুধু ব্রুনোকে দেখতে পেল সে। কোঠির দেয়াল ঘেঁষে ডালপালা মেলে সগৌরবে বেড়ে ওঠা এক বুড়ো আপেল গাছের নিবিড় ছায়াতলে এক বুক ক্লান্তি নিয়ে ঝিমোচ্ছে সে। তার ঠিক পাশেই পড়ে আছে আধখাওয়া এক ফালি লাল টকটকে আপেল। ক্ষুধার জ্বা’লায় বেচারা হয়তো ওটাকেই কুটকুট করে কামড়ে খেয়েছে।
ইফানের মৃ’ত্যুর পর থেকেই ব্রুনো ছায়ার মতো এই রমণীর পিছু নিয়েছে। জাহানারা অভিমানে কতবার যে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে এই বোবা প্রাণীটাকে। কিন্তু ব্রুনো যেন নাচড়বান্দা প্রেমিকের মতো কিছুতেই পিছু ছাড়তে নারাজ। এমনকি জাহানারা কাশ্মীর আসার পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখে ব্রুনো সমস্ত ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে, বাংলাদেশ পাড়ি দিয়ে ঠিকই এখানেও এসে হাজির হয়ে গেছে। কিন্তু কি করে এলো এই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর নেই রমণীর কাছে। যে ব্রুনো একসময় রাজকীয় আভিজাত্যে আর বিলাসে বেড়ে উঠেছিল, আজ সে এত অবহেলা আর অবজ্ঞা সয়ে এক আশ্রয়হীনের মতো বাড়ির নিচের ওই খোলা উঠোনে কোনোমতে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছে।
বাইরের হিমেল হাওয়ায় চারপাশে শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে। একটুকরো উষ্ণতার অভাবে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে ব্রুনো। আগের মতো সেবা-যত্ন না পেয়ে দেহ তার আগের চেয়ে নেতিয়ে পড়েছে। জাহানারার বুক কেঁপে উঠল। ভিজে উঠল নেত্রযুগল। আজকাল সে নিজের অজান্তেই বড্ড খিটখিটে হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্রুনোর ওপর কারণে-অকারণে রা’গ ঝেড়ে অবুঝ জীবটাকে দূরে ঠেলে দেয় সে। আবার মেজাজ একটু ভালো হলে নিজেই তাকে বুকে টেনে আদর করতে করতে আড়ালে চোখের জল ফেলে। এই মূহুর্তে ব্রুনোর করুন দশা দেখে সহ্য করতে পারল এই দৃশ্য। সে উদভ্রান্তের মতো ছুটে ঘরের ভেতর ফিরে এলো। বিছানা থেকে টেনে নিল একখানা উষ্ণ চাদর। যেই ঘর থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে এগোবে, অমনি এক তীব্র বজ্রপাতের মতো রমণীর তলপেটে এক বিষ ব্যথার আবির্ভাব ঘটল! আচমকা তল পেটের য’ন্ত্রণায় থমকে গেল রমণীর দুই পা। হাতের চাদর ফেলে দু’হাত বাড়ন্ত উদরে ধরে আ’র্ত’নাদ করে উঠল।
পাশের রুমেই ঘুমে বিভোর ছিল আরিফ আর নাদিয়া। কারো আ’র্ত’নাদ পেয়ে ধরফরিয়ে ঘুম ছুটল তাদের। অতঃপর কোনো কিছু না ভেবেই তারা বিছানা ছেড়ে এক ছুটে বেরিয়ে এলো। জাহানারার ঘরে প্রবেশ করেই আরিফ দেয়ালের সুইচে চাপ দিতেই পুরো কক্ষ তীব্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সেখানে মেঝেতে দুই হাতে পেট চেপে ধরে প্রসব য’ন্ত্রণায় জাহানারাকে ছটফট করতে দেখে মুহূর্তের জন্য নাদিয়ার পিলে চমকে উঠল। জাহানারা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই নাদিয়া প্রতি রাতে বেশ কয়েকবার এসে তাকে সযত্নে পর্যবেক্ষণ করে যায়। এই তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেও সে দেখে গিয়েছিল সব ঠিকঠাক আছে! নাদিয়া জাহানারাকে আগলে ধরে কান্না করে উঠল। ভেজা গলায় আরিফকে বলে উঠল,
–“এই আমি তো একটু আগেও ওকে দেখে গেলাম। এইটুকু সময়ে কি হয়ে গেল?”
আরিফ তটস্থ গলায় বলে উঠল,“মনে হচ্ছে লেবার পেইন।”
কন্দনরত গলায় নাদিয়া বলে উঠলো,“কিন্তু ডেলিভারিত ডেইট তো আরও দুদিন পর ছিল!”
জাহানারার এহেন বেগতিক অবস্থা দেখে আরিফ আর সময় অপচয় না করে দ্রুত সবাইকে কল করল। পাশের কোঠিগুলো থেকে তৎক্ষনাৎ ছুটে আসল নাদিয়ার পুরো পরিবার। মূহুর্তেই হুলুস্থুল আর কান্নার রোল পড়ে গেল সারা বাড়িতে। অতঃপর সবাই মিলে ধরাধরি করে জাহানারাকে গাড়িতে তুলল এবং কালবিলম্ব না করে কনকনে অন্ধকার মধ্যরাত চিরেই গাড়ি নিয়ে ছুটে চলল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। কেউ আর খেয়াল করলো না এক অবলা প্রাণীকে। জাহানারার প্রসব বেদনার আ’র্ত’নাদ কর্ণগোচর হতোই ব্রুনোও প্রায় দিশেহারা। তাই তো, এই কুয়াশাচ্ছন্ন আঁধার রাতে ব্রুনোও আ’র্ত’নাদ করে কাঁদতে কাঁদতে উন্মাদের মতো গাড়ির পিছু ছুটতে লাগল।
_____________
হাসপাতালের সুনসান করিডোরে এখন উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই। জাহানারাকে নরমাল ডেলিভারির জন্য লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্য সাধারণ গর্ভবতীদের মতো জাহানারা প্রসব বেদনায় খুব একটা আ’র্ত’নাদ করছে না। বরং দাঁত দাঁত পিষে নিজেকে শক্ত রাখার বৃথা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এই রমণী। কিন্তু পেটের ভেতরের সেই চা’বুক মা’রা অসহ্য য’ন্ত্রণা যখনই সহ্যের সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখনই তার অবাধ্য কণ্ঠ চিরে এক-আধটা অসহনীয় আ’র্ত’নাদ বেড়িয়ে আসছে। আর সেই তখন থেকে বাইরে করিডোরে অপেক্ষারত ব্রুনো অস্থিরতায় ছটফট করছে। কে বলে বোবা প্রাণীরা নির্বোধ হয়? এই তো অসহায়, বিশ্বস্ত ব্রুনো তার প্রয়াত মনিবের একমাত্র প্রেয়সীর ভেতরের সেই তীব্র য’ন্ত্রণা অনুধাবন করতে পেরে মানুষের মতোই ডুকরে কাঁদছে। তার গণ্ডদেশ বেয়ে টপটপ করে ঝরছে নোনা অশ্রুধারা। কখনো সে অ’স্থির হয়ে বন্ধ দরজায় থা’বা বসাচ্ছে, চাইছে দরজাটা কোনোমতে ঠেলে ভেতরে ঢুকে জাহানারার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে।
এই অবলা বোবা প্রাণীটার প্রতি এ ক’মাসে সকলের অনেক মায়া জন্মেছে। আরিফ এগিয়ে এসে লেবার রুমের সামনে থেকে বেশ কয়েকবার ব্রুনোকে টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু বেচারা যখনই মাতৃতুল্যা মনিবের আ’র্ত’নাদ শুনে তখনই সইতে না পেরে বারবার ছুটে আসছে। আরিফ আবারও এসে টেনে নিয়ে গেল ব্রুনোকে। চেয়ারে বসে ব্রুনোর চোখের অশ্রু মুছে দিল। ব্রুনোর মাথাসহ তুলতুলে গ্রীবাদেশে আদুরে পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
–“আরে বেক্কল ছেলে! তুই না মাফিয়া বসের বেটা, হুম? তাহলে এভাবে বোকার মতো কাঁদছিস কেন? শান্ত হ ব্রুনো। কিচ্ছু হবে না তর মালকিনের। আমরা সবাই আছি তো রে বাবা।”
ব্রুনো আরিফের কোলে মুখ গুঁজে মৃদু সরে গোঙিয়ে কাঁদতে লাগল। নাদিয়া নিজের চোখের পানি মুছে ব্রুনোর পশমঘেরা শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,“কাঁদে না ব্রুনো সোনা। তোমার মা’র কিছু হবে না। এই তো কিছুক্ষণ পর তোমার ভাইবোন আসবে এই পৃথিবীতে। আর তোমাকে একলা একলা খেলাধুলা করতে হবে না। আশেপাশের মানুষকেও বিরক্ত করতে হবে না খেলার জন্য। এখন থেকে ব্রুনো সোনা তার ভাই বোনের সাথেই খেলতে পারবে।”
লেবার রুমের বন্ধ দুয়ার চিরে ফের জাহানারার প্রসব বেদনার আ’র্ত’নাদ ভেসে এলো। কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই ব্রুনো আরিফের কোল থেকে ঝটকা দিয়ে মুখ তুলে ফের দরজার পানে চেয়ে ‘ভাউ ভাউ’ করে এক ব্যাকুল ডাক ছেড়ে উঠল। শাহাবুদ্দিন ব্রুনোর গলার বেল্ট ধরে স্নেহে টেনে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে। অতঃপর আলতো করে ব্রুনোর পাছা চাপড়ে, হেসে রসাত্মকভাবে কাশ্মীরি ভাষায় বলে উঠলেন,
–“ওরে শা’লা, আজ নাহ রোভ! আজ ছু তুহুন্দ খুশি হুন্দ দোহ। তুহুন্দ ভাই তেহ বোজ আসান ইয়িওয়ান। তেহ তুহুন্দ খেলি খাতির মে জুতা চোর করুণ নাহ পাওয়ান। তেহ জুতা চোর করুণুক জুরমস মে হাথান দোড়ুন নাহ পাওয়ান। হা হা হা!” (ওরে শা’লা, আজ আর কাঁদিস না! আজ তো তোর খুশির দিন। তোর ভাই-বোন আসতে চলেছে। আর তোর খেলার জন্য আমার জুতা চু’রি করতে হবে না। আর জুতা চু’রির অপরাধে আমার হাতে দৌড়ানিও খেতে হবে না। হা হা হা!)
শাহাবুদ্দিনের এই স্বভাবসুলভ কৌতুক আর প্রফুল্লতায় করিডোরের দমবন্ধ করা উৎকণ্ঠার মধ্যেও সকলে হেসে উঠল। লেবার রুমে উপস্থিত আছেন একজন প্রথিতযশা গাইনোকোলজিস্ট, একজন দক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞ এবং দুজন ব্যস্ত নার্স। বেশ কিছুক্ষণ আগে জাহানারাকে প্রসব ব্যথা বাড়ানোর সেলাইন দেওয়া হয়েছে। জাহানারা এখন প্রসব বেদনায় দ্বিগুন অস্থির হয়ে ওঠেছে। আর নিজেকে নিজের কাঠিন্যের খোলসে ধরে রাখতে পারছে না। ব্য’থার তী’ব্রতায় দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রমণী অনুভব করতে পারছে মা হওয়া মুখের কথা নয়! একজন জন্মদাত্রীকে কতটা ম’রণ য’ন্ত্রণা সহ্য করতে হয় সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য। তবে জননীর মন এও জানে, সন্তান জন্মের পর যখন প্রথমবারের মতো সেই নিষ্পাপ মুখখানি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন একজন মায়ের নিকট এই য’ন্ত্রণাটুকু বড় তুচ্ছ মনে হয়, আর তা এক নিমিষেই লাঘব হয়ে যায়।
একজন চিকিৎসক অতি সতর্কতায় নবজাতকের হৃদস্পন্দন মেপে নিচ্ছেন, অপর গাইনোকোলজিস্ট পরীক্ষা করছেন বাচ্চার চূড়ান্ত পজিশন। জাহানারা অবচেতন মন বুঝতে পারছে তার নাড়িছেঁড়া ধন এই বুঝি জঠরের অন্ধকার ভেদ করে পৃথিবীর আলোয় আছড়ে পড়বে! সেই সন্ধিক্ষণে তার ঝাপসা অস্থির নয়ন দরজার পানে আঁটকে গেল। সে দেখতে পেল আচমকা দরজাটি কোনো এক অত্যুগ্র অশরীরী টানে খুলে গেল। আর সেই মরীচিকার আধার পুড়ে, কংক্রিত ধূম্রজালের অভ্যন্তরে একাকী শুনশান দাঁড়িয়ে আছে এক কালোয় মুড়ানো বিশালদেহী অবয়ব। সেই দৈত্যকার ছায়ামূর্তি ধীর পায়ে কিছুটা এগিয়ে আসতেই কুজ্ঝটিকার মায়াজাল লঘু হয়ে ভেসে উঠল একজোড়া ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল। যা নিগূঢ়, অনুরক্তিমাখা দৃষ্টিতে রমণীর দিকেই নিস্পৃহভাবে তাকিয়ে আছে।
জাহানারা ডুকরে কেঁদে উঠল। তার অবশ হয়ে আসা হাতখানা শূন্যে বাড়িয়ে দিল সেই ছায়ামূর্তি তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি ধরবে সেই একরক্তি অলীক আশায়। সে ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু অবরুদ্ধ কণ্ঠনালী চিরে কেবল কান্না ছাড়া কিছুই বের হলো না। সে দেখল একজোড়া খড়খড়ে বাদামী অধরকোণের মুচকি হাসি। কী চমৎকার, মনভোলানো আর সম্মোহনী সেই হাসি! এক নিমেষেই যে কাউকে বিমোহিত করে নিজের মায়াজালে বন্দি করে ফেলতে পারে। জাহানারাও যেন অবলীলায় পা দিল সেই অতিপ্রাকৃত ফাঁদে। সে নিমিষেই যেন ভুলে যেতে লাগল তার সকল যন্ত্রণা। কিন্তু পরক্ষণেই ঠিক যেভাবে অবয়বটা উদয় হয়েছিল ঠিক একইভাবে কুহেলিকার এক কুহকী ইন্দ্রজালে ধীরে ধীরে পিছনের দিকে তলিয়ে যেতে লাগল। অশরীরির ন্যায় অশুভরঙা ছায়ামূর্তিটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগেই প্রসব বেদনার শেষ আ’র্ত’নাদকে ছাপিয়ে চিৎকার করে ডেকে উঠল জাহানারা,
–“ইফান….যেও না।”
মিলিয়ে এলো রমণীর কণ্ঠস্বর। খসে পড়ল শূন্যে তুলে ধরা হাত। ধুম্রজালে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেল সেই অশুভ রঙা দানবীয় অবয়ব। আর ঠিক তখনই, হাসপাতালের চারপাশের জানালা গলে সূদুর থেকে ভেসে এলো ফজরের আজানের সুমধুর, সুরেলা ধ্বনি। চেতনা হারানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে, সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার আগ অব্দি জাহানারার কানে বাজতে লাগল ভোরের সেই পবিত্র আজানের সুরের সাথে মিশে একাকার হয়ে চরাচরে ভেসে বেড়ানো এক নবজাতক শিশুর পৃথিবীর বুকে প্রথম কান্নার তীব্র আওয়াজ!
চলবে,,,,,,,,,
আসলে আমি একটু অসুস্থ ছিলাম। চাইলেই গতকাল পর্বটি দিতে পারতাম। কিন্তু অসুস্থতার জন্য ডিপ্রেসড থাকায় এডিট করতে হিমশিম খেয়েছি, তাই দেওয়া হয়নি। কিন্তু আজ অনেক বড় করে পর্ব দিয়েছি কিন্তু, চার হাজার প্লাস শব্দের। যাক গিয়ে নেক্সট পর্বটি লেখার জন্য আমি ভীষণ এক্সাইটেড।
সো যারা পড়েছ সকলে রিয়েক্ট কমেন্ট করো কিন্তু। তোমাদের রেসপন্স দেখলে আমার লেখার আগ্রহ বেড়ে যায়। হ্যাপি রিডিং।
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৬
-
জাহানারা পর্ব ৪৩+৪৪
-
জাহানারা পর্ব ১৫+১৬
-
জাহানারা পর্ব ৭৬
-
জাহানারা পর্ব ৮৪
-
জাহানারা পর্ব ৬৭+৬৮
-
জাহানারা পর্ব ৯০(প্রথমাংশ)
-
জাহানারা পর্ব ৭
-
জাহানারা পর্ব ৭০
-
জাহানারা পর্ব ১