Golpo romantic golpo প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে

প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫


#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৫)

#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী

নিস্পন্দ পরিবেশ। নিশ্চুপ সকলে অথচ শুভ্রর দুচোখে উপচে পড়া বিস্ময়। অনুভূতিরা কাঁটাতারের বেড়ায় আঁটকা পড়েছে৷ নিঃশ্বাস নেওয়ার জো নেই। নৌমির মৌন দৃষ্টি তাজের পানে। তাজের গতিবিধি স্বাভাবিক। অতি মনোযোগে খাচ্ছে সে যেন কিছুই শুনেনি। শুভ্রর আব্বু এক নজর তাজদের দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই বড়ো ভাইয়ের অভিমুখে চেয়ে বললেন,

” এটা তো আনন্দের সংবাদ। মিষ্টি ছাড়া এই খবর সত্যিই বেমানান।”

শুভ্রর আম্মুর দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জল কণ্ঠে বললেন,

” কই গো শুভ্রর আম্মু, সবার জন্য মিষ্টি নিয়ে এসো।”

শুভ্রর আম্মু সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাজের আব্বু মৃদু হেসে বললেন,

” তোদের আগে জানায়নি বলে রাগ করিস নি তো?”

“রাগ কেন করব? বিয়ের আলোচনায় তো করেছো। ছেলের বিয়ে তো আর করাও নি।”

” তোদেরকে আগেই জানাব ভেবেছিলাম তারপর ভাবলাম সামনাসামনি বললে ভালো হবে।”

” নৌমির সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে ভালোই করেছো। ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকবে কোনো চিন্তায় করতে হবে না৷ ভাবছি তাজদের বিয়ের পরপর শুভ্রকেও বিয়ে করাব। ভালো মেয়ের সন্ধান থাকলে জানিয়ো।”

এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তাজ অথচ তার পূর্ণ মনোযোগ খাওয়ায়। একবারের জন্য আব্বু চাচ্চুর দিকে তাকাচ্ছেও না। নৌমি দাঁতে দাঁত পিষে বলতে শুরু করল,

” তোমার মতো বেহায়া এই শহরে আর একটাও নেই।”

তাজ খেতে খেতে কোনমতে বলল,

” আমি আবার কি করলাম?”

” তোমার বিয়ের কথা হচ্ছে আর তুমি নির্লজ্জের মতো খাচ্ছো। আবার জিজ্ঞেস করছো কি করেছো? লজ্জা নেই তোমার?”

“বিয়ের কথা হচ্ছে হোক। এতে আমার করণীয় কি? বউ হবি তুই। লজ্জা পাওয়ার দরকার তোর জিজ্ঞেস করছিস আমাকে!”

” আমি কেন লজ্জা পাবো? আমি কি বাইরে বয়ফ্রেন্ড রেখে এসেছি নাকি?”

তাজ অকস্মাৎ নৌমির দিকে তাকাল। তপ্ত স্বরে বলল, “একদম চুপ৷ কেউ শুনলে খবর আছে!”

নৌমি ভ্রু গুটিয়ে তাজের হাত থেকে এক ঝটকায় পুডিং এর প্লেট নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

” আমাকে হুটহাট ধমক দিতে এসো না।”

তাজ তাজ্জব বনে চেয়ে কোমল কণ্ঠে বলে উঠল,

” আমার পুডিং….”

শুভ্রর অসাড় দৃষ্টি তাজদের পানে। দুচোখে হতাশার চিহ্ন৷ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আছে। আব্বু চাচ্চুর কথাগুলো এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেড়িয়ে গেলেও তাজ-নৌমির চালচলন হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে। অকস্মাৎ শুভ্রর আব্বু ডাকলেন,

” কিরে শুভ্র, কিছু বলছিস না যে!”

শুভ্র থতমত খেয়ে আব্বুর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। ইতস্তত হয়ে বলল,

” আমি কি বলব?”

” তাজ আর নৌমির বিয়ের ব্যাপারে কিছু বল।”

শুভ্র বামহাতে কপালের ঘাম মুছে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল,

” এ ব্যাপারে আমার কি বলার আছে!”

“তাজ না তোর বন্ধু। তোকে কিছু জানায় নি আগে?”

“না।”

শুভ্র আর কিছু না বলেই রুমের দিকে হাঁটা শুরু করল। শুভ্রর আম্মু ডাকলেন,

” মিষ্টি খেয়ে যা, বাবা।”

” মিষ্টি খাওয়ার মতো কোনো সুখবর আমি শুনিনি আম্মু৷ তোমাদের মিষ্টি তোমরায় খাও।”

শুভ্র আর তাজ একই রুমে থাকে। শুভ্র রুমে ঢুকে বিছানার উপর ফোনটা ছুঁড়ে মারল। সুবিশাল রুমটায় পায়চারি করছে আর মনে মনে বিড়বিড় করছে। মিনিট পাঁচেক হাঁটাহাটি করে হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খানিক দেখল। ধীরগতিতে আয়নার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিষ্পলক চোখে কিছুসময় স্থির চেয়ে রইল। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে৷ রুমের আলো কমে আসছে সেই সঙ্গে শুভ্রর নজর প্রখর হচ্ছে। কণ্ঠে ধীরতা এনে গুরুতর ভঙ্গিতে শুধাল,

” সবসময় সবকিছুতে তুই কেন জিতে যাস, তাজ? পৃথিবীর সব ভাল কেন তোকে ঘিরেই থাকে? আমি যেদিকে হাত বাড়ায় সবটায় কেন তোর আয়ত্তে থাকে?”

দরজায় শব্দ হওয়া মাত্র শুভ্র চুপ করে গেল। তাজ রুমে ঢুকতে ঢুকতে আওড়াল,

” একা একা বিড়বিড় করে কি বলিস?”

শুভ্রর গম্ভীর জবাব,

” কিছু না।”

” আমাকে অভিশাপ দিচ্ছিস নাকি?”

শুভ্র মলিন হেসে বলল,

” আমার অভিশাপে তোর কিছু হবে না কখনও।”

” কেন?”

” কারণ আমার নামের মতো মনটাও শুভ্র। “

” তারমানে তোর মন কুৎসিত হলে সকাল-সন্ধ্যা অভিশাপ দিতিস আমাকে?”

” হয়তো দিতাম নয়তো না।”

তাজ মুচকি হেসে প্রশ্ন করল,

” কোনো বিষয়ে আপসেট তুই?”

” নিচে যা শুনলাম সব কি সত্যি?”

“আমার আব্বু কখনও মিথ্যা বলবে বলে মনে হয় তোর?”

“তুই নৌমিকে বিয়ে করছিস?”

“হ্যাঁ। আগামীকাল গায়ে হলুদ, পরশু বিয়ে। তোর দাওয়াত। কি খাবি বল? কাচ্চি, রোস্ট, তেহারি, খাসির রেজালা, জর্দা, টিকিয়া নাকি ছ্যাকা?”

“মানে?”

তাজ বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। সিলিং ফ্যানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল,

“নৌমিকে আমি কোনোদিন এমন নজরে দেখিই না।”

শুভ্র ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,

” একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোকে?”

” হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বল কি জানতে চাস। “

“নিলুর সঙ্গে কি সত্যিই তোর কোনো সম্পর্ক আছে?”

“কেন? তোর হঠাৎ এই কথা কেন মনে হলো?”

“বাসায় আসার পর থেকে তোর মুখে নিলুর কথা একবারও শুনিনি। না কথা বলিস আর না আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করিস। তোদের মধ্যে কি কোনো ঝামেলা চলছে?”

” তেমন না আবার বলাও যায়। ছেলেদের পায়ের নিচের মাটি যতক্ষণ না শক্ত হচ্ছে ততক্ষণ ছেলেরা দূর্বল থাকে৷”

“তুই নিজেকে দূর্বল মনে করিস?”

“অবশ্যই।”

শুভ্র মলিন হেসে আওড়াল,

” তবে সবকিছুতেই তুই কেমন করে জিতে যাস বল তো!”

“আমি কোথায় জিতে গেলাম? তোর কি হয়েছে বল তো। তোকে পুডিং খেতে দেয় নি বলে রাগ করেছিস নাকি?”

“না। আমার মিষ্টি খুব বেশি পছন্দ নয়।”

শুভ্র ঝুঁকে বিছানা থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। দরজা পর্যন্ত যেতেই তাজ প্রশ্ন করল,

“কোথায় যাচ্ছিস?”

” ছাঁদে যাব।”

আকাশ জুড়ে আঁধার নেমেছে। অদূরে দুই একটা ল্যামপোস্টের ক্ষুদ্র আলো দেখা যাচ্ছে। শুভ্র আকাশের পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। হঠাৎ মুঠোফোন বাজতে শুরু করেছে৷ অপরিচিত নাম্বার দেখে কল রিসিভ করতেই মেয়েলী কণ্ঠে কেউ একজন বলে ওঠল,

” কোথায় আছো তুমি? “

শুভ্র’র সরল জবাব,

” ছাঁদে।”

“আমি জিজ্ঞেস করেছি কোন দেশে আছো?”

“বাংলাদেশে। কিন্তু আপনি কে?”

“কি অসাধারণ ব্যাপার! দেশে থেকেই দেশের মানুষদের চিনতে পারছো না ৷ বাইরে থাকলে কি করবে শুনি”

” মিশু?”

“কি মনে হচ্ছে?”

শুভ্র মলিন গলায় বলল,

” তুমি হঠাৎ এতদিন পর!”

“শুনলাম বাসায় এসেছো। তাই ভাবলাম যোগাযোগ করি।”

“আমার নাম্বার কোথায় পেলে?”

” খালামনি কল দিয়েছিল। ওনার থেকে নাম্বার নিয়েই তোমাকে কল দিলাম। আগামীকাল ফ্রী আছো?”

” হ্যাঁ, কেনো?”

” আমি শপিংএ যাব। তোমাকেও নিয়ে যাব যদি তুমি যেতে চাও।”

” কোথায় আছো তুমি?”

” ধরে নাও তোমার খুব কাছে।”

” মানে?”

” একই শহরে আছি। আগামীকাল দেখা করো। এখন রাখছি।”

” এই শুনো…”

ওপাশ থেকে কল কেটে গেল৷ অকস্মাৎ পেছন থেকে নৌমি গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠল,

” কি ব্যাপার? গার্লফ্রেন্ডের কল?”

শুভ্র অপ্রত্যাশিত ভঙ্গিতে পেছনে ঘুরল। কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই নৌমি বলে উঠল,

” কোনো ব্যাপার না। আমি কাউকে কিছু বলব না। নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।”

শুভ্র কিঞ্চিৎ হেসে বিড়বিড় করল,

“বেশি বুঝতে বুঝতে মেয়েরা কেন সবসময় ভুলটায় আগে বুঝে?”

নৌমির পেছন পেছন তাজও এসে ছাঁদের দরজায় দাঁড়াল। ধমকের স্বরে বলল,

” এত সময় লাগে তোর?”

নৌমি মনমরা হয়ে বলল,

” আমি কি করব। শুভ্র ভাইয়া ফোনে কথা বলছিল।”

” আর তুই কান পেতে তার কথা শুনছিলি?”

“কান কোথায় পাতলাম। দেখছো না, আমি ছাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।”

শুভ্র উঠে এসে বিরক্তির স্বরে বলল,

” থামবি তোরা! বিরক্ত লাগছে আমার।”

নৌমি রাগী স্বরে বলল,

” আশ্চর্য! আমরা তোমার কি ক্ষতি করেছি? ঘুরতে যাবে কি না বলতে এসেছি। গেলে চলো না গেলে প্রেম করো।”

চলবে……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply