#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৬)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
নৌমি তড়িৎ বেগে নামতে নিল। নামতে নামতে তাজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” দুই মিনিটের মধ্যে তুমি না নামলে আমরাই চলে যাব ঘুরতে।”
তাজ আস্তে করে বলল,
” যা, আসছি।”
নৌমি উত্তর শোনার জন্য দাঁড়াল না। এমনকি পেছন ফিরে তাকালও না। ঝড়ের গতিতে নিচে চলে গেল। তাজ অতি ধীরে দু’কদম এগিয়ে কোমল গলায় বলল,
” আমরা বের হচ্ছি। তুই কি যাবি আমাদের সাথে?”
” কে কে যাচ্ছিস?”
” আমি, মুসকান, সুমি, আন্নি সকলেই। তুই গেলে চল।”
তাজের কথায় শুভ্র কিঞ্চিৎ ক্রুদ্ধ হলো। বিরক্তির ভাব ফুটে ওঠল চেহারায়। তবে বুঝতে না দিয়ে মলিন হেসে আওড়াল,
” আমি না গেলে তোর জন্য সুবিধা হবে তাই না?”
” এভাবে বলছিস কেন? গেলে চল।”
“তুই যেভাবে বলছিস, গেলে চল। এতে মনে হচ্ছে না গেলেই ভালো হবে।”
” ইদানিং দেখা যাচ্ছে তুই বড্ড বেশি প্যাঁচালো হয়ে গেছিস। যা বলি সবেতেই কথা প্যাচাচ্ছিস। ঠিক আছে, রেডি হয়ে আয় আমরা নিচে অপেক্ষা করছি।”
” আমার জন্য অপেক্ষা করে শুধু শুধু সময় নষ্ট কেন করবি! চলে যা তোরা। “
” কি সমস্যা বল তো। হয়েছে কি?”
শুভ্র গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠল,
” তোরা সবকিছু আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখিস। কোথায় যাবি, কি করবি, কি খাবি সবকিছুর প্ল্যান থাকে। আমি কিছুই জানি না। আমাকে আগে থেকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করিস না।”
শুভ্রর কথা শুনে তাজের ঠোঁটে-মুখে হাসির রেশ দেখা গেল। তাজ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিল একবার। আরও কয়েক কদম এগিয়ে শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
” তুই যা ভাবছিস তার সবই ভুল। কারণ ঘুরতে যাওয়ার কোনো প্ল্যান আমার ছিল না। আর না এখন আছে। মুসকান, আন্নিরা রেডি হয়ে বাসায় এসেছে। তারউপর আমাদের বাসার গুলো তো ঘুরতে যেতে এক পায়ে রেডি। মুসকান আসতেই ওরাও পাগলামি শুরু করেছে। আব্বু- চাচ্চুর আদেশ, ‘ওদের নিয়ে ঘুরে আসো।’ আমার কি বলার আছে!”
শুভ্র ব্যগ্র কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
“আমি একটা বিষয় বুঝতে পারি না, এই বাড়ির সব নিয়মকানুন কবে পরিবর্তন হলো? এতদিন শুনেছি সন্ধ্যার পর এই বাড়ির কোনো মেয়ে বাসার বাইরে বের হয় না। এমনকি ছেলেরাও প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যায় না। সব নিয়মকানুন হুট করে পরিবর্তন হয়ে গেল। কিন্তু কিভাবে?”
” মুসকান যবে থেকে ইন্টার পাশ করেছে তবে থেকে রাজনীতির গুটি পাল্টে গেছে। আব্বুকে, ছোট চাচ্চুকে এমনভাবে কনভিন্স করে তুই যদি একবার দেখতি! সাথে তাল দেয়ার জন্য আন্নি, রাদ তো সবসময় রেডি৷ আমি একা কিছুই বলতে পারি না। আমি বারণ করতে গেলেই আব্বু বলেন, ‘তুমি কি চাও মেয়েরা একা বের হোক?’ এই প্রশ্ন শোনার পর আমার আর কিছুই বলার থাকে না৷ বাধ্য হয়ে নিয়ে যেতে হয়।”
নিচ থেকে নৌমির চিৎকারের শব্দ আসছে। তাজ যেইমাত্র নৌমিকে কিছু বলতে যাবে শুভ্র ওমনি বলল,
” আজ তোর যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি ওদের সাথে। “
শুভ্র একটু চমকাল। মুখে আসা কথাটা গিলে নিল সহসা। শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল,
” তুই যাবি?”
“কেন তুই চাস না আমি যাই?”
” ইসস। চাইবো না কেন। অবশ্যই চাই। কিন্তু বলতেছিলাম ওদের এত এত বায়না তুই মেটাতে পারবি না৷ শুনেছি মেলা চলছে, সবগুলো বেড়িয়েই বলবে মেলায় যাবে। তারউপর তুই নিজেই ঠিকমতো কিছু চিনিস না। যদি কোনো সমস্যা হয়!”
শুভ্র মৃদু হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“তোর নিলুকে পেতে হবে ভাই। তুই রুমে গিয়ে পড়তে বস। আমি সব সামলে নিব।”
তাজ ঠাট্টার স্বরে বলল,
” ওদের অত্যাচারে অর্ধেক রাস্তায় গিয়ে আমাকে কল দিস না বলে দিলাম।”
“ঠিক আছে।”
★
মিনিট দশেকের মধ্যে রেডি হয়ে নামল শুভ্র। নৌমিরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। শুভ্রকে দেখামাত্রই আন্নি বলল,
” শুভ্র ভাইয়া, তোমার রেডি হতে এত সময় লাগে?”
রাদও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
” ভাইয়া রেডি হতে হতে আমি পুরো শহর দুইবার ঘুরে আসতে পারব।”
আন্নি আর রাদের মুখে ভাইয়ের ব্যাপারে অতি সামান্য কথাটাও সুমি সহ্য করতে পারল না। তাদের দিকে তাকিয়ে রুষ্ট গলায় বলল,
” মোটেই না। ভাইয়া অনেক দ্রুত রেডি হয়।”
রাদ মজার ছলে বলল,
“সেটা তো আমরা দেখলামই। তাই না আন্নি আপু।”
“হুম।”
নৌমি কপালে ভাঁজ ফেলে রাগী স্বরে বলল,
” থামবি তোরা?”
সবাই সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। নৌমি শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আবারও প্রশ্ন করল,
” তামজিদ ভাইয়া কোথায়?”
“ও যাবে না।”
সবাই একসঙ্গে বলে ওঠল,
” কিন্তু কেন?”
” কাজ আছে ওর। তোদের মতো অকর্মা নাকি! পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাত বিরাতে ঘুরতে বের হচ্ছিস।”
“মেলায় গেলে রাতের বেলাতেই যেতে হয়। দিনের বেলায় আমাদের মতো অকর্মারাও ব্যস্ত থাকে।”
“কথা না বাড়িয়ে চলো এখন।”
সবাই এগিয়ে গেলেও নৌমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্র কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থামল। নৌমির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
” কি হলো নৌমি, চলো।”
নৌমি মুখ গোমড়া করে বলল,
” তামজিদ ভাইয়া আসছে না কেম এখনও?”
” যাবে না।”
” তামজিদ ভাইয়া না গেলে আমিও যাব না।”
” তাজ ব্যস্ত৷ তুমি চলো। সবাই অটোতে উঠে পড়ছে।”
” ভাইয়া তোমরা ঘুরে এসো। আমি অন্য কোনোদিন যাব।”
“এটা কেমন কথা। তুমি না বললে সন্ধ্যার পর সবাই মিলে ঘুরতে যাবে। যাচ্ছি তো সবাই। চলো।”
” সবাই কোথায়? তামজিদ ভাইয়া ছাড়া সবাই কিভাবে হয়! ভাইয়া না গেলে আমিও যাব না। এখন তুমি ভেবে দেখো ভাইয়াকে ডেকে আনবে নাকি আমাকে ছাড়া যাবে।”
অজানা অভিমানে শুভ্রর দুচোখ জ্বলছে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আন্নিদের দিকে এক নজর তাকিয়ে দেখল। সহসা নৌমির হাতটা শক্ত করে ধরে গুরুভার কণ্ঠে বলল,
” চলো।”
শুভ্রর শক্ত হাতের টানে নৌমি হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিল। যত্রতত্র নিজেকে সামলে পা বাড়ালো সামনের দিকে। শুভ্রর শক্ত হাতের বাঁধন দ্বিগুণ শক্ত হলো। নৌমি কেবল হতভম্ব হয়ে রইল। কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। অটোরিকশার কাছে এসে শুভ্র বলল,
” উঠে বসো।”
নৌমি কপাল কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল,
” তুমি যা বলবে আমার কি তাই করতে হবে?”
পাশ থেকে আন্নি জিজ্ঞেস করল,
” কি হয়েছে আপু?”
শুভ্র কণ্ঠস্বর নরম করে বলল,
” প্লিজ, কথা না বাড়িয়ে চলো।”
“আগে তুমি বলো, তুমি যা বলবে আমার কি তাই করতে হবে?”
“আমি আসলে সেভাবে বলতে চাই নি।”
নৌমি নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে শুভ্রর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,
” তোমরা ঘুরে এসো, আমি যাব না।”
“এই নৌমি, কি হয়েছে তোমার? সরি, প্লিজ চলো।”
” কেউ যদি মনে করে আমার সাথে জোর খাটালে সে সব পেয়ে যাবে তাহলে আমি বলব সে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা মানুষ। আর যাই হোক, নৌমি কারো চোখ রাঙানোকে ভয় পায় না।”
নৌমি নিজেদের বাসায় চলে যাচ্ছে। আন্নি কিছু সময় নির্বাক চোখে তাকিয়ে সুমিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” আপু না গেলে আমিও যাব না।”
সঙ্গে সঙ্গে রাদও বলল,
” তাহলে আমিও যাব না।”
সুমি শুভ্রর মলিন চেহারার পানে চেয়ে আছে। অটোরিকশা চালকের বয়স অল্প। পরিস্থিতি এলোমেলো বুঝতে পেরে সে এতক্ষণ কিছু বলে নি। হঠাৎ পেছন ফিরে সুমিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আফা, আপনের ভাইরে বলেন আপনেরা না গেলেও আমার অর্ধেক ভাড়া দেওন লাগব। আপনেরার লাইগা আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতাছি।”
ছেলেটার মুখে ” আপনেরা না গেলেও” কথাটা শুভ্রর মস্তিষ্কে আঘাত করল। মনে পড়ে গেল তাজের বলা কথাটা। তাজ বলেছিল, ‘ওদের অত্যাচারে অর্ধেক রাস্তায় গিয়ে আমাকে কল দিস না বলে দিলাম।’ অথচ ওদের নিয়ে বাসা থেকে বেরই হতে পারছে না। দিশাবিশা না পেয়ে রাগে গজগজ করে তাজকে কল করল। তাজ কল রিসিভ করে ঠাট্টার স্বরে বলল,
” কিরে এত তাড়াতাড়ি বিপদে পড়ে গেলি? কোন পর্যন্ত গিয়েছিস? অর্ধেক রাস্তা পেরিয়েছিস?”
শুভ্র রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
” এখনও বাসার বাইরে।”
“কি?”
“হুম।”
“কেন?”
“নৌমি রাগ করে বাসায় চলে গেছে। বাকিরা বলছে নৌমি না গেলে তারাও যাবে না। এখন আমি কি করব বুঝতে পারছি না।”
তাজ মুচকি হেসে বলল,
” ঠিক আছে তুই ওদের নিয়ে রওনা দে। আমি মুসকানকে নিয়ে আসছি।”
শুভ্র সহসা বারণ করতে গেল। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেটাও পারল না। রাগ হজম করে চুপচাপ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা করল।
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে সূচনা পর্ব
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫