#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২১ এর প্রথমাংশ)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
হঠাৎ ভূকম্পনের মতো শুভ্র’র ফর্সা আদল ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই নৌমি কল কেটে দিল। ততক্ষণে তাজের কল কেটে গিয়েছে। সেকেন্ডের ব্যবধানে তাজ পুনরায় কল করল। নৌমি রিসিভ করে হাসিমাখা কণ্ঠে আওড়াল,
” কি ব্যাপার! এত তাড়াতাড়ি কল দিয়ে দিলে যে।”
তাজ কথার উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ল,
” কে কল দিয়েছিলো?”
” তোমাকে কেনো বলব! তুমি কেনো কল দিয়েছো সেটা বলো! সরি বলবে তাই না?”
” কে কল দিয়েছিল বল!”
নৌমির সরল জবাব,
” শুভ্র ভাইয়া।”
“শুভ্র এত কল দেয় কেনো তোকে?”
” আশ্চর্যজনক কথা বলো কেন! এত কল কখন দিল। সেই সকালে বিয়ে খেতে গেল অথচ একটু আগে আমাকে কল দিলো।”
” কেনো কল দিয়েছিল?”
” খোঁজ নেওয়ার জন্য। তুমি কেন কল দিয়েছো সেটা বলো এখন। “
” ছাঁদে আয় । বলছি।”
” এখন ছাদে যাব?”
তাজ কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” মনে হচ্ছে এ সময় আর কোনোদিন ছাঁদে উঠিস নি। বেশি ভাব না ধরে তাড়াতাড়ি ছাঁদে আয়।”
“আসছি।”
নৌমি চটজলদি ছাঁদের দিকে ছুটতে লাগল। ব্যালকনি পর্যন্ত যেতেই নৌমির আম্মুর সঙ্গে দেখা হলো৷ নৌমিকে ছুটতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
” কোথায় যাচ্ছিস?”
” ছাঁদে যাচ্ছি আম্মু। সময় নেই। “
” অসময়ে ছাঁদে কেনো?”
“তামজিদ ভাইয়া ডাকছে। তোমার সাথে পরে কথা বলছি..”
নৌমি এক মুহুর্ত দাঁড়াল না। ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি পেরিয়ে ছুটল ছাঁদের দিকে৷ এক দৌড়ে তাজের পেছনে গিয়ে থামল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
” তাড়াতাড়ি সরি বলো।”
” কিসের সরি?”
” বাহ রে! ডেকে আনলে কেনো?”
” এমনি৷ তোর সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। তারজন্য ডেকে এনেছি। সরি টরি আবার কি!”
“কি বললে? তুমি আজ সরি না বললে আমি তোমার কোনো কথা শুনবো না।”
তাজ মলিন গলায় ডাকল,
” মুসকান..”
নৌমি ফোঁস করে উঠল,
” আপনি আকুল কণ্ঠে যাকে ডাকছেন, সে এখন সরি শুনার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে।”
তাজ মুচকি হেসে বলল,
” সরি মিস। এক্সট্রিমলি সরি। কিন্তু কেনো সরি তা জানি না তারপরও সরি। অনেকগুলো সরি। সরির উপরে আবার সরি।”
নৌমি দাঁত কেলিয়ে তাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আমার ব্যাকুল মন এবার শান্ত হয়েছে। বলো কি বলবে!”
“ধৈর্য নিয়ে আমার কথাগুলো শুনবি। মাঝপথে চিৎকার করবি না কেমন!”
” হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই।”
তাজ আশপাশে নজর বুলালো। চোখের ইশারায় নৌমিকে বসতে বলল। নৌমি পাশে থাকা দোলনায় চুপ করে বসল। পূর্ণ মনোযোগের সহিত তাজকে দেখতে লাগল। পাশ থেকে চেয়ার টেনে তাজ এসে বসল। নৌমির নিষ্পলক চোখের চাউনি নজরে পড়তেই তাজ খানিক সোজা হলো। ভ্রু গুটিয়ে ফের নৌমির পানে চাইল। নৌমির এক হাত থুতনিতে, প্রশস্ত দুচোখ গোল করে প্রখর দৃষ্টিতে তাজকে দেখছে। নৌমির এমন আচরণে তাজ বিভ্রান্ত হলো। নৌমির কপাল বরাবর গাট্টা দিয়ে রাগী স্বরে বলল,
” এমন করিস না প্লিজ।”
নৌমির ভ্রু কুঁচকানো। থমথমে গলায় বলল,
” আমি ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি বলো।”
তাজ চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে ছোট করে বলল,
” আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
” কি?”
” আমি নিলুকে বিয়ে করব।”
” আলহামদুলিল্লাহ। এটা তো খুব ভালো সিদ্ধান্ত। কিভাবে কি করবে ভেবেছো কিছু?”
” না তারজন্যই তোকে ডেকে এনেছি। আজ নিলুর সঙ্গে কথা বলে এসেছি। আগামীকাল বিকেল নাগাদ আমি আংকেলের সাথে দেখা করে সরাসরি নিলুকে বিয়ের জন্য প্রপোজাল দিব। আংকেল যদি সহজে মেনে নেন তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি মেনে না নেন তবে..”
” দূর! নেগেটিভ কথা ভাবনাতেও আনবে না। রাজি হবে না কেনো বলো! আমার ভাইয়ের মধ্যে কোন গুণটা নেই! পড়াশোনায় ভালো, কর্মঠ, দায়িত্বশীল একজন ছেলে, পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়, ভালোবাসা কোনোদিককে অবহেলা করে না। আজ চাকরি নেই ইনশাআল্লাহ চাকরিও খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে৷ আর কি লাগবে তাদের!”
” জানি না। তারপরও ভয় হচ্ছে। নিলুর আব্বু যদি রাজি না হোন তবে আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারব না রে।”
” আজব তো! রাজি হবে কি হবে না সেটা ওনার ব্যাপার। তোমার মুখের কি সমস্যা? “
” তুই বুঝতেছিস না, আমার বন্ধু সার্কেলের কেউই নিলুকে পছন্দ করে না। একদম শুরু থেকে এখন পর্যন্ত। ওদের মনে হয় আমার সাথে নিলুকে মানায় না। নিলুর জন্য আমি বদলে গিয়েছি। বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর জন্য নিলু দায়ী। আমি নাকি নিলুর জন্য ডিপ্রেশনে আছি। আমার চাকরিও নাকি নিলুর জন্যই হচ্ছে না। নিলু আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো বাঁধা।”
” বললেই হলো। নিলু আপু বাঁধা হলে ভালো টা কে? তোমার বন্ধুরা?”
” আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের এক কাজিন আমাকে খুব পছন্দ করত। ওরা সবাই চেয়েছিল আমি তার সাথে রিলেশনে যাই। কিন্তু আমি রাজি হয় নি। উল্টো নিলুর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলাম। সেই থেকে ওদের রাগ। কিছু হলেই শুধু বলে, নিলু তোকে পাগল বানিয়ে ছেড়ে দিবে। তারপর দেখব কি করিস! সময় থাকতে সরে আয়!”
নৌমি মনমরা গলায় বলল,
” মানুষের ভাগ্য কি সুন্দর! কত মানুষের ভালোবাসা পায়৷ আর আমি এমন এক অভাগা। কারো ভালোবাসা পাওয়া তো দূর একটা মোবাইলই পেলাম না আজও।”
” কিসের মধ্যে কি বলিস!”
” সরি, মুখ ফস্কে বলে দিয়েছি। তারপর বলো তোমার বন্ধুরা আর কি কি বলে!”
তাজ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
” ওরা এখন চাই আব্বুর কথা মতো আমি যেন তোকে বিয়ে করে নেই।”
নৌমি আশ্চর্য নয়নে চেয়ে ভয়ানক গলায় চিৎকার করল,
” কি!”
“হুমম।”
” না না। এসব বলতে নেই ভাইয়া। তুমি নিলু আপুকে বিয়ে করার পরিকল্পনায় ফিরে আসো সেটাই ভালো। তোমার বন্ধুদের কথা আর শুনব না।”
” আমি ভাবছি নিলুর আব্বু কাল রাজি হলে রাতে বা পরশু আমি বাসায় কথা বলব। মানে আব্বুর সাথে নিলুর ব্যাপারে কথা বলব। আর সে সময় তুই আমার সাথে থাকবি এবং আব্বুকে যতটা বুঝানো সম্ভব সুন্দরভাবে বুঝাবি৷ আব্বুর মনে কোনোরকমের আঘাত যেনো না লাগে। বুঝতে পেরেছিস?”
” ওহ আচ্ছা। এই ছিল তোমার মনে?”
তাজ মৃদু হেসে বলল,
” আমার জন্য এটুকু করে দে প্লিজ।”
” বিনিময়ে আমি কি পাবো?”
” কি চাস তুই?”
” এখন কিছুই চাই না। তোমাদের বিয়ে হোক আগে তারপর বুঝে শুনে চাইবো।”
” আচ্ছা।”
নৌমি কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
” একটা প্রশ্ন করব?”
” হুমম বল “
” ভালোবাসা মানে কি?”
” মানে?”
” বলো না প্লিজ। তোমার দৃষ্টিতে ভালোবাসা কি?”
” মানসিক শান্তি।”
” নিলু আপু তোমার মানসিক শান্তি?”
তাজ একটু অবাক হলো। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে ছোট করে বলল,
” হয়তো।”
নৌমি এবার নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল,
” তবে আমার মানসিক শান্তি কে?”
তাজ চাপা স্বরে বলল,
” আমার মাথা।”
” কথাটা অবশ্য মন্দ বলো নি। তোমার মাথা খেলেই আমি মানসিক শান্তি পাই।”
“যা এখন। যেগুলো বলেছি মাথায় রাখিস। আব্বুকে কিভাবে ম্যানেজ করবি সেই চিন্তা কর গিয়ে।”
” এসব আমার কাছে কোনো বিষয়ই না। তুমি একদম চিন্তা করো না। রিলাক্সে একটা ঘুম দাও। তারপর বিয়ের প্ল্যান করো গিয়ে। আমি যাচ্ছি।”
” এই শুন।”
“বলো।”
“শুভ্র’র সাথে কথা একটু কম বলিস।”
” কেনো?”
“আমি বলছি তাই।”
” ঠিক আছে। “
ড্রয়িং রুমে নৌমির আব্বু চা খাচ্ছিলো। নৌমির আম্মু পাশের সোফায় বসে ধীর গতিতে বলতে শুরু করলেন,
” আপনার কি মনে হচ্ছে না নৌমি আর তাজের বিয়েটা দ্রুত দেওয়া দরকার।”
” কেনো? মেয়ে কি তোমার জন্য বোঝা হয়ে গিয়েছে নাকি?”
” তা কেনো হবে? মেয়েরা মায়ের কাছে কখনও বোঝা হয় না। বোঝা হলে হয় সমাজের চোখে, প্রতিবেশিদের নজরে।”
নৌমির আব্বু জানতে চাইলেন,
” এত দুশ্চিন্তা করছো কেনো? নৌমি তো এখনও অনেক ছোট।”
” আস্তে আস্তে বড়ো হবে সমস্যা কি! দূরে তো আর যাবে না। সারাক্ষণ চোখের সামনেই থাকবে। আপনি দেখছেন না, সর্বক্ষণ তাজের সাথে ঝগড়া করছে, আবার যখন খুশি ঘুরতে চলে যাচ্ছে। যখন যা ইচ্ছে তাই করতেছে। এভাবে চলতে থাকলে এই উড়নচণ্ডী স্বভাব আর কখনও ঠিক হবে না। তাই সময় থাকতে বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত।”
” আচ্ছা আমি দেখছি।”
চলবে……
#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
(২১ এর শেষাংশ)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
আঁধারে ঢাকা নিস্তব্ধ আকাশ। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে৷ মৃদুমন্দ শীতল বাতাস। শেষ রাতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। শুভ্র’র হাতে মোবাইল। ফোনের স্ক্রিনে নৌমির একটা ছবি জ্বলজ্বল করছে৷ কখনও বড়ো করে চোখ, নাক দেখছে। কখনও বা ছোট করে পুরো মুখের দিকে চেয়ে আছে। বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে। দুইটা সাউন্ডবক্সে অনবরত গান বাজছে অথচ শুভ্র বসে আছে বহুদূরে পুকুরের পাড়ে একটা কদম গাছের নিচে। মনের ভেতর কি পরিমাণ ঝড় চলছে তা কেবল শুভ্র’ই জানে৷ এই ঝড়ের বহিঃপ্রকাশ অসম্ভব। হঠাৎ নূপুরের শব্দ পেয়ে ফোন রেখে দিল। শান্ত দু’পা এসে থামল শুভ্র’র ঠিক পেছনে। শুভ্র’র বুঝতে বাকি নেই কে সে। তবুও অবুঝের মতো চুপটি করে বসে রইল। অকস্মাৎ শীতল কণ্ঠে ডাকল,
” শুভ্র ভাইয়া.. “
“হুম”
“এখানে কি করছো?”
” দেখছো না কি করছি?”
“বাড়িতে চলো।”
” আমাকে ডাকতে আসার কারণ? “
শুভ্র’র খালাতো বোন মিশু দাঁড়িয়ে আছে। মিশু এবার নিঃশ্বাস ছেড়ে ছোট করে বলল,
” রাত থেকে এখনও কিছু খাও নি তুমি!”
” আমার খাওয়ার দায়িত্ব কি কেউ তোমাকে দিয়েছে?”
” তা কেনো দিবে। কাজিন হয়ে কাজিনের খোঁজ কি নেওয়া যাই না? আর তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছো কেনো?”
” মিশু, তুমি বাড়ি যাও।”
” তুমি না এলে আমি যাব না।”
” মিশু!”
“ভয় দেখাচ্ছো আমাকে? দেখাও তাতে কোনো সমস্যা নেই আমার। তারপরও চলো। খালামনি তোমার জন্য চিন্তা করছে। বিয়ে খেতে এসে তুমি এত উদাস হয়ে আছো। ৫ মিনিট বাড়িতে বসছোও না। এটা কেমন হলো!”
” গান বাজনা ভালো লাগছে না তাই এখানে এসেছি।”
” তুমি চলো, আমি এক্ষুনি গান বন্ধ করে দিব।”
শুভ্র এবার বক্রদৃষ্টিতে মিশুর দিকে তাকালো। অন্ধকারে চেহারার ভাবমূর্তি কিছুই বুঝা গেল না। মিশু আদুরে কণ্ঠে ফের ডাকল,
” ভাইয়া চলো…”
শুভ্র আর কথা বাড়ালো না। বসা থেকে উঠে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ধীর গতিতে হাঁটতে শুরু করল। মিশু এক দু কদম হাঁটছে আবার থমকে দাঁড়াচ্ছে। এপাশে ওপাশে তাকিয়ে মৃদু হেসেই যাচ্ছে। শুভ্র গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল,
” কি হলো?”
” ভাইয়া, মনে আছে ঐ পুকুরটাতে আমি একবার ডুবে যাচ্ছিলাম। আমি চিৎকার করে ডাকছিলাম। তারপর তুমি এসে আমাকে টেনে তুলেছিলে।”
শুভ্র’র সরল জবাব,
” হ্যাঁ।”
” তারপর তুমি আমাকে কি বলেছিলে মনে আছে? “
” কি?”
” বলেছিলে, এই মুটকি একটু কম খেতে পারিস না? আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলাম, আমি আর কিছুই খাব না৷ “
শুভ্র মৃদুস্বরে বলল,
” মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছো।”
” তা দেইনি তবে আগের মতো মুটকিও কিন্তু নেই। তাই না?”
“হ্যাঁ। চলো এবার।”
মিশু হাঁটতে হাঁটতে আবারও প্রশ্ন করল,
” শুভ্র ভাইয়া, তোমার কি মন খারাপ? “
” না।”
” তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো। আমাকে সবকিছু শেয়ার করতে পারো। আমি কাউকে কিছুই বলব না। প্রমিজ।”
” আমার মনে এমন কোনো সিক্রেট নেই যা তোমাকে বন্ধু ভেবে শেয়ার করতে হবে। কথা না বাড়িয়ে বাড়িতে চলো। “
মিশু আর কথা বাড়ালো না। শুভ্রকে কয়েক কদম এগিয়ে যেতে দেখে দ্রুত পায়ে মিশুও এগিয়ে এলো৷ আলতো হাতে শুভ্র’র কনিষ্ঠা আঙুলে হাত রাখতেই কিঞ্চিৎ চমকাল শুভ্র। বক্র দৃষ্টিতে মিশুকে এক পলক দেখল। মেয়েটার চোখে- মুখে তৃপ্তির হাসি। মোবাইলের অল্প আলোতেও ঝলমল করছে। শুভ্র হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও করল না। বরং কণ্ঠস্বর ভারী করে বলল,
” তুমি কি সবার সাথেই এরকম আচরণ করো?”
“কিরকম আচরণ ?”
” এইযে এত রাতে আমাকে নিতে এতদূর চলে এলে। সবার জন্যই এমনটা করো?”
” সবার জন্য মানে? আর কে আছে যার জন্য আমি এমন করব?”
” রাহুল, জাহিদ, আলিফ সবাই আছে।”
” ওদের নিতে আমার বয়েই গেছে। তুমি স্পেশাল তাই নিতে এসেছি। ওরা জঙ্গলে পরে মরে থাকুক তাতে আমার কি!”
শুভ্র ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মজার ছলে প্রশ্ন করল,
” আমি স্পেশাল কেনো? ছোটোবেলা তোমাকে পানি থেকে বাঁচিয়েছিলাম বলে?”
” অনেক কারণেই তুমি স্পেশাল। যার ব্যাখ্যা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। “
একটু থেমে মিশু আবার ডাকল,
” শুভ্র ভাইয়া। “
” বলো।”
” তুমি কাল পাঞ্জাবি পড়বে না?”
” দেখি। “
” দেখি আবার কি? পান্জাবিই পড়বে কেমন?”
” কেনো?”
“আমি কাল শাড়ি পড়ব তাই।”
মেয়েটার চালচলন আন্দাজ করার বয়স শুভ্র’র হয়েছে। শুভ্র আর মিশুর বয়সের পার্থক্য আহামরি বেশি নয়। কিন্তু মেয়েটা অনেক বেশি চঞ্চল। দেশের বাইরে থাকাকালীন প্রায়ই শুভ্র’র আম্মুকে ভিডিও কল দিতো৷ শুভ্র’র সাথে কথা বলার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু শুভ্র ব্যস্ততার ভান করে এড়িয়ে যায় সবসময়। সেদিন শপিং এ গিয়েও এক বাজে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শপিং এর নাম করে মলে গেলেও এক পর্যায়ে শুভ্রকে টেনে নিয়ে যায় সিনেমা হলে। শুভ্র যত বারণ করছিল মেয়েটা সিনেমা দেখার জন্য ততই বায়না করছিলো। পরিস্থিতির চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে ৩ ঘন্টা সিনেমা হলে বসে থাকতে হয়েছিল। সেই রাগ এখনও কাটে নি পুরোপুরি৷
হয়তো এক্ষুনি প্রশ্ন করবে,
” কি কালার পাঞ্জাবি পড়বে?”
তারপরই শুরু হবে ম্যাচিং শাড়ি খোঁজার তোড়জোড়। এসব ঘটনা এড়াতে শুভ্র শান্ত কণ্ঠে শুধাল,
“আমি এখানে আছি তুমি জানলে কি করে? “
” সুমি বলল। অনেকক্ষণ যাবৎ তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খালামনিকে জিজ্ঞেস করলাম, খালামনিও জানেন না। রাতে খাও ও নি তুমি। তখন সুমি বলল তোমাকে এদিকে আসতে দেখেছে। আমি এক মিনিট সময় নষ্ট না করে তোমাকে নিতে ছুটে এসেছি।”
” ওহ।”
কথা বলার এক ফাঁকে শুভ্র মিশুর হাত থেকে নিজের আঙুল ছাড়িয়ে নিয়েছে। পকেটে হাত রেখে সামনে যেতে যেতে বলল,
” রাত অনেক হয়েছে। খাওয়া হলে চুপচাপ ঘুমাতে যাও।”
” কেনো? আমি আরও ভাবছিলাম গানের আসর বসবে, তুমি গান গাইবে।”
” আমি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগে।”
” কি জন্য?”
” ভালো লাগে না তারজন্য।”
★
ঘড়ির কাটা তিনটার ঘরে। তাজ নিলুদের বাসার সামনে এসে অটো থেকে নেমেছে। বাসায় আসার কথা নিলু কিছুই জানে না। আসার সময় কেবল নৌমিকে বলে এসেছে। বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতেই দেখল বাড়ি ভর্তি মানুষজন। পুরোদমে খাওয়াদাওয়া চলছে। অসময়ে এভাবে কারো বাড়িতে চলে আসায় ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ল ছেলেটা। হঠাৎ নজর পড়ল নিলুর দিকে। জলপাই রঙের একটা থ্রিপিস পড়নে। মাথায় ওড়না দেওয়া। খুব মনোযোগ দিয়ে খাওয়াচ্ছে। তাজ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে যেই মাত্র বের হতে যাবে ওমনি নিলুর আব্বু ডাকলেন,
” তাজ না!”
তাজ থমকে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল নিলু। হাতে থাকা বাটিটা টেবিলের উপরে রেখে দুপা পেছনে সরে দাঁড়াল। একে একে মনে পড়তে লাগল তাজের গতকালের বলা কথাগুলো। মনের ভেতর অশনি সংকেতেরা ঝড় তুলছে।
“তাজ কি তবে বিয়ের কথা বলতে এসেছে?”
নিলুর পা কাঁপছে থরথর করে। নিলুর আব্বু এগিয়ে এসে তাজের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। নিলু এক পা দুপা করে পেছাতে পেছাতে দ্রুত নিজের রুমে চলে গেল। সবার খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই নিলুর আব্বু সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। এখানে উপস্থিত সবাই নিলুর মামার বাড়ি, খালার বাড়ির মানুষজন। হয়তো কোনোকিছু উপলক্ষে নিলুদের বাসায় বেড়াতে এসেছে। তাজের নিজের উপর বড্ড রাগ হচ্ছে। এভাবে হুটহাট কারো বাসায় চলে আসাটা যে কত বড় বোকামি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিয়ের প্রস্তাব কি দিবে। নিজের পরিচয়টাই ঠিকমতো দিতে পারছে না। তাজকে চা – নাস্তা দেওয়া হলো৷ তাজ মনে মনে ভাবল,
“কোনো রকমে চা টা খেয়ে বিদায় হতে পারলেই বাঁচি।”
পরক্ষণেই নৌমির বলা কথাগুলো মনে পড়ল,
” শুনো, আজ যদি তুমি সবকিছু অসমাপ্ত রেখে ফিরে আসো তাহলে বুঝে নিবো তোমার মধ্যে অনেক বড়ো ভেজাল আছে। তোমার ভালোবাসা কোনোদিন পিউর ছিলোই না। যাই হয়ে যাক না কেনো, আজ তোমার মনের কথা জানিয়ে আসবে। “
নিলুর আব্বু প্রশ্ন করলেন,
” কি ব্যাপার তাজ, কোনো দরকারে এসেছিলে?”
তাজ আমতা আমতা করে বলল,
” আংকেল আপনার সাথে আমার দরকারী কথা ছিল।”
” কি কথা বলো।”
নিলু নিজের রুমের দরজার পাশে দেয়ালে
হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ বুকের ভেতরটা ধপধপ করছে। তাজ কি বলবে!
তাজ আশেপাশে নজর বুলিয়ে আস্তে করে বলল,
” সবার সামনে বলা ঠিক হবে না।”
” ওরা সবাই নিজের মানুষ। তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পারো।”
তাজ একটু ভাবল। নিলুর আব্বু ভুল কিছু বলেনি। আজ ওনাদের সামনে না বললেও কাল ওনারা ঠিকই শুনবে। তারথেকে সবার সামনে বলে দেওয়া অনেক বেশি ভালো। তাজ বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে নিজেকে আশ্বস্ত করল। অতঃপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
” আংকেল, আন্টি এবং উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে আমি একটা কথা বলতে চাই,
আমি নিলুকে পছন্দ করি এমনকি নিলুও আমাকে পছন্দ করে৷ আমাদের সম্পর্ক প্রায় ৩ বছরের। জানি না আপনারা বিষয়টাকে কিভাবে নিবেন। কিন্তু আমার মনে হলো, কথাটা আপনাদের জানানো দরকার। আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই সরাসরি বলছি, আপনাদের সম্মতি থাকলে আমি নিলুকে বিয়ে করতে চাই। “
চলবে……
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২০+এক্সট্রা
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮