#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১৪)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
শুভ্র বিহ্বল চোখে নৌমিকে দেখছে। নৌমির দুচোখ যেন শান্ত নদীর কূল। উদাস দুপুরের নীরবচারী, পরিশ্রান্ত এক ভেলা। কুটিল নদীর অগোছালো ঢেউয়ে খেলছে আপন চিন্তে। নৌমির আয়ত চোখে অনিয়ত শ্রাবণ, বাদলা দিনের একগুচ্ছ কদম ফুল। শুভ্র’র উষ্ণ হৃদয়ে আলোড়ন তোলা তরঙ্গময় এক বাহন।
শুভ্রর দৃষ্টি স্থির থাকলেও নৌমির দৃষ্টিতে অস্থিরতা। নৌমি চোখ ঘুরিয়ে একবার তাজের দিকে তাকাচ্ছে একবার শুভ্রকে দেখছে। তাজের তপ্ত দৃষ্টি নৌমির এলোমেলো চাউনিতে নিশ্চল। নৌমির পলকে পলকে ঘুর্নায়মান চাউনি অনুসরণ করায় যেন তাজের একমাত্র কাজ। চোখে- মুখে লেপটে আছে তীব্র বিরক্তির ভাব। উশখুশ মনের ভাবনা প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতা গিলে খাচ্ছে তাকে। আলগোছে তাজের ভ্রু কুঁচকে আসে। উজ্জ্বল মুখশ্রীর লাবণ্য ফিকে হয়ে গেছে।
নৌমি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দু’জনকে দেখছে। কপাল গুটিয়ে এমন ভাব করে আছে, মনে হচ্ছে সব জান্তা নৌমি আজ শুভ্র ও তাজের হৃদয়ের অন্তরালে লুকানো আবেগ খুঁড়ে খুঁড়ে বের করবে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন!
মিনিট কয়েক বাদে নৌমি হঠাৎই ফিক করে হেসে উঠল। ওমনি চেহারার গুরুগম্ভীর ভাব সরে গেল। আলগোছে কপালের ভাঁজও খুলে গেছে। নৌমির হাসির শব্দ প্রখর। এক মায়াবী কন্যার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখতে দুইজোড়া চোখের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে উপস্থিত আরও কয়েক জোড়া চোখের দৃষ্টি জোড়ালো হলো। তাজ গুরুভার কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
” এভাবে হাসছিল কেন? “
নৌমি মুখ চেপে হাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। শুভ্র র চোখে কৌতূহল। তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
” কি হয়েছে নৌমি?”
নৌমি আশেপাশে নজর বুলিয়ে সবাইকে এক নজর দেখে নিল। হাসির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এনে এক ঢোক জুস খেয়ে নিল। দ্বিতীয়বার নজর বুলালো চারপাশে। একহাতে নিজের ঠোঁট ঢেকে বিড়বিড় করে বলল,
” সর্বনাশ হয়ে গেছে! তামজিদ ভাইয়ার বিয়ের নামগন্ধ নেই অথচ শুভ্র ভাইয়ার দাঁড়ি পেকে যাচ্ছে। এখন কি হবে!”
অতর্কিতকে গালে হাত রাখল শুভ্র। ভ্রু গুটিয়ে নাকের গোড়ায় টেনে বলল, ” মানে?”
তাজ অকস্মাৎ শুভ্রর দিকে তাকাল। ঔৎসুক কণ্ঠে আওড়াল, ” দেখি!”
নৌমি আবারো হাসল। এবার আর কোনোদিকে তাকাল না। সহাস্যে বলে ওঠল,
“এখন তোমার কি হবে শুভ্র ভাইয়া? কে বিয়ে করবে তোমাকে?”
শুভ্র গালে হাত বুলিয়ে নির্দ্বিধায় জবাব দিল,
“কেউ না করলে তুই করবি!”
নৌমি ভেংচি কেটে তাজের দিকে তাকাল। ঘনঘন ভ্রু নাচিয়ে মজার ছলে বলল, ” তুমি কি কিছু বলতে চাও?”
তাজ অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
” আগে তুই কিছু বল! আমি বললে শুভ্র আবার বলবে, তোকে আমি শিখিয়ে দিচ্ছি!”
নৌমি মৃদুহেসে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে পরপর জানলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“একজনের সাথে বিয়ে ঠিক, একজন বউ না পেলে আমাকে বিয়ে করবে। ভার্সিটিতে কয়েকজন সিরিয়াল দিয়ে রেখেছে। আমার এইটুকু মন! আমি একা কতজনের হবো?”
ঝড়ের বেগে প্রশ্ন ছুড়ল তাজ, ” ভার্সিটির কে বিরক্ত করে তোকে?”
তাজের প্রশ্নের মাঝে শুভ্রও প্রশ্ন করল, ” কার সাথে বিয়ে ঠিক তোমার?”
নৌমি ঠোঁট বেঁকিয়ে দু’জনকে দেখে খানিক হেসে নিল। ওয়েটার আসতেই রেস্টুরেন্টের মেনুকার্ড দেখে কয়েকটা খাবার অর্ডার করল। ওয়েটার চলে যেতেই ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ছোট করে বলল, ” জানি না।”
তাজ শক্ত কণ্ঠে বলে ওঠল, ” ভার্সিটিতে কেউ তোকে বিরক্ত করে বলিস নি কেন আমাকে?”
” আমার সমস্যা আমি সমাধান করতে জানি তাই তোমাকে জানায় নি।”
” তা তো জানবিই৷ পারিস তো যার তার সঙ্গে মাইর করতে।”
” মাইর করলে করব! তবুও নিজেকে নিজে প্রটেক্ট করব। আজ বাদে কাল তুমি বিয়ে করবে! বউ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমি নৌমি তখন কোথায় যাব! তুমি আমাকে ভুলেই যাবে!”
“বলছে তোকে! আমি বিয়ে করি বা না করি আমার কাছে সবার আগে তোরা।”
” আহা! কি ভালোবাসা! নিলু আপু আসলে এই কথাটা আবার বলো, কেমন!”
“অবশ্যই বলব। একবার কেন, ১০ বার বলব। আমি তোর মতো না!”
“আমি আবার কি করেছি?”
” তুই সবসময় বলিস, আমি তোর বন্ধু অথচ কোনো কথায় আমাকে জানাস না। ভার্সিটিতে কত ঘটনা হয়, কিছুই বলিস না আমাকে। বিয়ে করার আগেই পর করে দিচ্ছিস। বিয়ে করলে কি হবে?”
শুভ্র মলিন হেসে বলল, “তুই একা কত দায়িত্ব নিবি, ভাই।”
“আমি দায়িত্ব না নিলে কে নিবে শুনি? তুই?”
“হ্যাঁ, নিলাম৷ সমস্যা আছে কোনো?”
তাজ আনমনে হেসে বলল,
” আমার সমস্যা নেই তবে ওর দায়িত্ব নেয়া এত সহজ না!”
“কেন?”
” আগেই বলেছি তোকে, দূরে থাকিস বলে বুঝতে পারছিস না। মাস কয়েক ওর রূপ দেখলে মনের সব রঙ ফিকে হয়ে যাবে। দায়িত্ব নেয়ার সাধও মিটে যাবে।”
শুভ্র নিষ্পলক চোখে নৌমিকে দেখছে। নৌমির মনোযোগ মেনুকার্ডে। তাজ আর শুভ্রর আজেবাজে কথা বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই তার। সেকেন্ড কয়েক পার হতেই তাজের ফোন বাজতে লাগল। ফোনের শব্দে নৌমির কুঁচকানো কপাল আরও বেশি কুঁচকে আসে। শুভ্র, নৌমি দু’জনেই তাজের দিকে তাকাল। নৌমি চোখের ইশারায় তাজ ফোনের দিকে ইশারা করে বলল,
” যাও যাও! তোমার ওনি চলে এসেছে।”
“আসুক।”
★
বিকেলের শেষ ভাগ। বসার ঘরে বৈঠক চলছে। তাজের আব্বু, শুভ্রর আব্বুরা সবাই চা খাচ্ছেন আর গল্প করছেন। শুভ্র ঘুম থেকে ওঠে কেবলই নিচে এসেছে। শুভ্রকে দেখে তাজের আম্মু এক কাপ চা দিয়ে গিয়েছেন। তাজ কিছুক্ষণ আগেই বাসায় ফিরেছে। রুমে ফ্রেশ হতে গিয়েছে। সচরাচর বাসায় সন্ধ্যার পর বড়োদের আড্ডা বসে। বিকেলের দিকে সবাই বাইরে হাটাহাটি করে। তাই নিশ্চিন্তমনে কোমরে ওড়না প্যাঁচিয়ে দু’হাতে দুইটা প্লেট নিয়ে বিদুৎ বেগে বাসায় ঢুকেছে নৌমি। উষ্কখুষ্ক চুল, গালে কপালে অল্পস্বল্প ময়দার দাগ লেগে আছে এখনও। বসার ঘরে এত মানুষ দেখে নৌমির পা থমকে গেছে। নিজের দিকে এক নজর তাকিয়ে লজ্জায় হাস ফাঁস করতে লাগল। মুখ লুকানোর মতো কোনো জায়গায় খুঁজে পাচ্ছে না। নৌমিকে দেখামাত্র শুভ্র সবার দিকে এক নজর দেখল। নৌমির কাছে যাবে কি না এটায় ভাবছে মনে মনে। তাজের আব্বু মিষ্টি হেসে ডাকল,
” আম্মু, এতক্ষণে এসেছো তুমি! কি নিয়ে এসেছো?”
” শুভ্র ভাইয়াদের জন্য পুডিং বানিয়েছিলাম সেটায় নিয়ে এসেছি।”
শুভ্রর আব্বু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ” আলাদা আলাদা প্লেটে কেন?”
তাজ চুল ঠিক করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। বসার ঘরে দাঁড়ানো নৌমির হাবভাব দেখে নিঃশব্দে হেসে ফেলল। তাজের আব্বুর নজর তাজের দিকে পড়তেই শান্ত গলায় বললেন, ” এভাবে না হেসে, প্লেটটা নাও ওর থেকে।”
আব্বুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সহসা ঢোক গিলে হাসি আটকালো। শুভ্র দু’ কদম এগিয়েও বড়ো চাচ্চুর কথা শুনে থমকে দাঁড়াল। তাজের আব্বু শুভ্রর আব্বুর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
” নৌমি আম্মু আমাদের জন্য যা নিয়ে আসে সবকিছুতেই দুইভাগ হয়। আমাদের সবার জন্য এক প্লেটে নিয়ে আসলেও তাজের জন্য সবসময় আলাদা নিয়ে আসে। এটা তাদের মধ্যেকার বিষয়, আমরা ঐ ব্যাপারে কিছু না বলি।”
শুভ্র গতকাল সন্ধ্যের কথাগুলো ভেবে ভাবুক চোখে নৌমিদের দিকে তাকাল। তাজ দুই প্লেট হাতে নিয়ে ফিসফিস করে নৌমিকে কি যেন বলছে আর দু’জনেই হাসছে। বিষয়টা খুব স্বাভাবিক হলেও শুভ্রর তেমন একটা ভালো লাগেনি। শুভ্রর আব্বু হেসে বললেন,
” কিন্তু আমি তো ভাবছি অন্য কথা!”
” কি কথা?”
“আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন দেখেছিলাম ওরা কেউ কাউকে সহ্যই করতে পারছে না। আলাদা প্লেটে খাবার আনা তো অনেক দূরের বিষয়। কয়েকবছরে ওদের মধ্যে এত পরিবর্তন কিভাবে এসেছে?”
” সময়ের সাথে সাথে সবই পরিবর্তন হয়ে যায়। ছোটবেলা ওদের দুজনের ঝগড়া দেখলে দুশ্চিন্তা হতো। এখন দুশ্চিন্তার আর কোনো কারণ নেই। এটায় আমার শান্তি।”
“কেন ভাইয়া?”
তাজের আব্বু সবার দিকে এক বার তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন,
” তোদের কাউকে না জানিয়ে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”
” কি সিদ্ধান্ত?”
” তাজ আর নৌমির বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি। এ ব্যাপারে বাসার কারো কেনো আপত্তি নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, তাজ আর নৌমি দুজনেই রাজি৷ শুধু তোদের আসার অপেক্ষায় ছিলাম।”
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৪