#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (১১)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
নৌমির উজ্জ্বল মুখশ্রী দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ঔৎসুক দুচোখে আগুনের ফুলকির ন্যায় ঝলক দিচ্ছে৷ অধরের হাসি সরছেই না৷ শুভ্র নৌমির বাহু ছেড়ে আলতোভাবে দুগাল চেপে সহাস্যে বলল,
” হাই, কিউটি। কেমন আছ?”
নৌমির কৌতূহল যেন সরছেই না। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কোনমতে বলল,
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো৷ আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। হঠাৎ তুমি থেকে আপনি হয়ে গেলাম?”
” সরি, বুঝতে পারি নি। তুমি যে আসবে সেটা একবারের জন্যও বললে না কেন!”
“বললে কি সারপ্রাইজ থাকত?”
তাজ এগিয়ে আসতেই শুভ্র তাজকে জড়িয়ে ধরল। অল্পস্বল্প কুশল বিনিময় করতে লাগল। তাজ তপ্ত স্বরে শুধাল,
” বাকিরা কোথায়?”
“ছোট চাচ্চুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়েছে। আব্বুরা ঐখানেই গল্প শুরু করে দিয়েছে। আমার আর সহ্য হচ্ছিল না তাই ওঁদের রেখেই চলে এসেছি।”
নৌমি উত্তেজিত কন্ঠে শুধাল, “সুমিরাও এসেছে?”
” জি৷”
” আমি এক্ষুনি আসছি।”
শুভ্র তৎক্ষনাৎ বলল, ” এই নৌমি। ঐদিকে কোথায় যাচ্ছ? ওঁরা তো এদিকে আসতেছে।”
নৌমি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ” বাসায় যাচ্ছি। মুখ টা ধুয়ে এখনি চলে আসব।”
“মুখ ধুতে হবে কেন! এই সাজে তোমাকে মারাত্মক কিউট লাগছে। মুখ ধোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।”
নৌমি তাজের দিকে এক নজর দেখে দাঁত পিষে বলল, ” তোমার চোখে কিউট হলে কি হবে কারো চোখে আমাকে বান্দরনী লাগছে।”
শুভ্র সহসা তাজের দিকে তাকাল। তাজ মুখ ফুলিয়ে চোয়াল শক্ত করে নৌমিকে দেখছে। শুভ্র হেসে বলল,
” তুমি ওর কথাও ধরো নাকি? ওর যদি দেখার মতো চোখ আর বুঝার মতো মন থাকতো তাহলে তোমাকে একটা বাজে কথাও বলতে পারত না। ওর মন তো আছে আরেক জগতে। সেসব বাদ দাও, তোমার কোথাও যেতে হবে না। আমি বলছি, তোমাকে মাশাআল্লাহ অনেক কিউট লাগছে। তাজ ব্যতীত আর একটা মানুষ যদি তোমাকে খারাপ কথা বলে তখন তুমি মুখ ধুয়ে নিও। ওকে? এখন ভেতরে চলো।”
এরমধ্যে সুমিরাও চলে এসেছে। সুমি কাছাকাছি এসেই উঁচু গলায় ডাকল, ” নৌমি আপু। “
সহসা ছুটে এসে নৌমিকে জড়িয়ে ধরল। নৌমিও সব ভুলে সুমি, চাচীর সঙ্গে গল্প করতে শুরু করল। তাজ আর শুভ্র বাসার ভেতরে চলে গেছে। নৌমি, সুমিরাও পেছন পেছন ঢুকল। হঠাৎ শুভ্রদের দেখে বাড়ির সবাই ভীষণভাবে চমকাল। আলাপচারিতার মাঝখানে যখন জানতে পারল তাজ সবটা আগে থেকেই জানতো তখন সবাই আড়চোখে তাজের দিকে তাকাল। তাজ অন্যদিকে মুখ করে এমন ভাব নিল যেন সে কিছুই জানে না। তাজের নাম শুনেই নৌমি সবার মাঝখান থেকে উঠে এসে তাজের সামনে দাঁড়াল। তাজ তখনও অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। নৌমি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” আজ শুভ্র ভাইরা আসতেছে এটা আমাকে আগে বললে না কেন?”
তাজ মৃদুস্বরে বলল, “আমি জানতাম না।”
“আমার দিকে তাকিয়ে বলো।”
” এখন আমার মুড নেই।”
“এ মা! কিসের মুড নেই? আমাকে দেখার কথা বলিনি তোমাকে। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে বলো, তুমি আমার থেকে কথাটা লুকালে কেন?”
“সবাইকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। তোকে বললে তুই তো সবাইকে আগেই বলে দিতিস।”
” তাহলে বলছ কেন জানো না? তুমি ঐদিকে তাকিয়ে কি খুঁজতেছ? টিকটিকির ডিম?”
তাজ উত্তর দিচ্ছে না দেখে নৌমি তাজের চুলে হাত রাখতেই তাজ চ্যাঁচিয়ে ওঠল,
” এই ফাজিল, তুই আমার চুলগুলো নষ্ট করলি কেন? জেল দিয়ে কত সুন্দর করে স্টাইল করেছিলাম।”
” বাপ রে! তিন ইঞ্চির চুল নিয়ে আবার কত ঢং৷ একটু ছুঁয়েছি বলে এভাবে চ্যাঁচিয়ে ওঠবে? ওয়েট।”
নৌমি দুইহাতে তাজের সব চুল এলোমেলো করে এক দৌড়ে ডাইনিংএ চলে গেছে। শুভ্র এতক্ষণ তাজদেরকেই দেখছিল৷ নৌমিকে আসতে দেখে চোখ সরিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তারপর গল্প করব।”
তাজের আম্মু বললেন, ” তাড়াতাড়ি আসিস। আমি খাবার রেডি করছি।”
★
সন্ধ্যার আগে আগে ছোটরা সবাই ছাঁদে এসেছে। সুমি, নৌমি, আন্নি, রাফি,রাদ সবাই গল্প করছে। কিছুক্ষণ পরেই ওদের খুঁজতে শুভ্র আর তাজও এসেছে। শুভ্র শান্ত গলায় জানতে চাইল,
” নিচে যাচ্ছিস না কেন তোরা? সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে খেয়াল নেই?”
সুমি বলল, ” আমরা ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি।”
“কোথায়?”
“পাহাড় নয়তো সমুদ্র। তুমি কোথায় যেতে চাও বলো।”
শুভ্র তৎক্ষনাৎ জবাব দিল, ” পাহাড়।”
সুমি এক গাল হেসে বলল, ” দেখেছো নৌমি আপু, বলেছি না ভাইয়ার পাহাড় পছন্দ।”
শুভ্র জিজ্ঞেস করল, ” নৌমির কি পছন্দ?”
“পাহাড়।”
রাদ আর রাফির মধ্যে একজনের পাহাড় পছন্দ অন্যজনের সমুদ্র। সুমিরও সমুদ্র পছন্দ। শুভ্র তাজকে প্রশ্ন করল,
” তোর কি পছন্দ ভাই? পাহাড় নাকি সমুদ্র?
“আমার মরুভূমি পছন্দ। যাবি তোরা?”
” না। আমরা পাহাড়ে যাব। তুই যাবি?”
সুমি বলল, ” তুমি যেতে না চাইলে জোর করব না। আমি, নৌমি আপু, আন্নি, রাফি, রাদ সবাই যাব৷ শুভ্র ভাইয়া আমাদের নিয়ে যাবে। প্রয়োজনে বড়ো ভাইয়ারা কাউকেও নিয়ে যাব।”
তাজ জোরালো কন্ঠে জানাল, ” তোরা কত বছর পর দেশে এসেছিস। তোদের নিয়ে ঘুরাটা আমার দায়িত্ব। তাছাড়া আব্বু যদি শুনে আমি তোদের সঙ্গে যাচ্ছি না তাহলে খুব রাগ করবেন।”
” মরুভূমি?”
“মনটায় এখন মরুভূমি হয়ে গিয়েছে।”
নৌমি ঠাট্টার স্বরে বলল, ” তোমার মরুভূমির মন নিয়ে আমাদের সঙ্গে আর যেতে হবে না। যে শহরে বৃষ্টি এসে তোমার মরুভূমির মনকে ভিজিয়ে দিবে তুমি বরং সে শহরে যাও।”
সুমি, রাফিরা একসঙ্গে প্রশ্ন করল, ” কোন শহরে?”
আন্নি তৎক্ষনাৎ বলল, ” কক্সবাজার। “
সুমি জানতে চাইল, ” কক্সবাজার কেন?”
” আরে তুমি জানো না, কক্সবাজার কিছুদিন পর পর ঝড়ের মতো বৃষ্টি এসে সবকিছু ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আপু হয়তো এটায় বলেছে। তাই না আপু?”
নৌমি মিটিমিটি হাসছে। শুভ্র সন্দেহের দৃষ্টিতে নৌমিকে দেখছে। তাজ নৌমির কথাতে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে ফোনে কিছু একটা করছে। রাফি আন্নিকে থামিয়ে বলল, ” আরে এটা না। আপুর কথার মানে অন্য ছিল। আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি। “
সুমি জিজ্ঞেস করল, ” কি বুঝতে পেরেছিস?”
” জানি না। নৌমি আপুই জানে। আপু বলো। “
নৌমি অকস্মাৎ বলে ওঠল, ” এইযে মিস্টার, বলব নাকি?”
“কি বলবি?”
” তোমার জীবনের হঠাৎ বৃষ্টির কথা।”
তাজ রাগী স্বরে বলল, ” তোর কি মনে হচ্ছে না, তুই লিমিটের বাইরে কথা বলছিস?”
” ওহ আচ্ছা। আমার কথা বলায় কখনো লিমিট ছিল বুঝি! আমি তো জানতামই না৷ তা লিমিট টা কে দিয়েছিল আমাকে? তুমি? স্বপ্নে নাকি বাস্তবে?”
তাজ কিছু বলতে গেল। শুভ্র সহসা দু’জনকে থামিয়ে দিল। ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” তোদের ঝগড়া মনে হয় এ জীবনে শেষ হবে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে সবাই নিচে চলো।”
নৌমি চাপা স্বরে বলল, ” তোমরা যাও। আমি বাসায় চলে যাব।”
তাজ বক্রদৃষ্টিতে তাকিয়ে অকস্মাৎ হেসে ফেলল। কর্কশ গলায় বলল,
“তোর আবার কি হয়েছে?”
“কিছু হয় নি। বাসায় চলে যাব।”
“বুঝলাম না। ইদানীং তোর মধ্যে বিশেষ কিছু পরিবর্তন দেখছি। যেগুলো আগে কখনো দেখি নি। আমার মনে হচ্ছে তুই জোর করে অভিমান করা শিখতেছিস৷ কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, তোর সাথে অভিমান শব্দটা ঠিক যায় না। তুই যেমন ছিলি সবসময় এমনটায় থাকবি। তোকে সেভাবেই ভালো লাগে।”
শুভ্র ঝটপট বলল, ” তোর জ্ঞান দেয়া শেষ হলে নিচে যা।”
“কেন? তুই যাবি না?”
“নৌমির সঙ্গে কথা বলে আসতেছি। “
“ওর সঙ্গে তোর আবার কি কথা?”
শুভ্র রাগী স্বরে বলল,
“কি কথা সেটাও কি তোকে বলতে হবে? ছোট থেকে না চাইতেও নৌমির পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছিস। এখন কি নৌমির সাথে কথা বলতে গেলেও তোর থেকে অনুমতি নিয়ে বলতে হবে?”
চলবে……..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭