#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(৩১)
শান্ত পরিবেশ। কারো মুখে শব্দ নেই। তাজ মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। নৌমি আড়চোখে বারবার তাজের দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না৷ তাজের আব্বু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
” আমি তোমাদের দু’জনকে শেষবারের মতো কিছু কথা বলতে চাই। তোমরা এখনও ছোট। কি ভাবো, কি করো বা করতে চাও সেসব নিজেরাও বুঝো না। কিন্তু আমার বিশ্বাস তোমরা এতটাও ছোট না যে নিজের ভালোমন্দ বুঝবে না। তারজন্য আমি এতদিন সময় দিয়েছি তোমাদের। আমি বার বার চেয়েছি তোমরা নিজেদের সময় দাও, বুঝো। তোমরা নিজেরা বিয়ের জন্য আগ্রহ দেখাও। কিন্তু না তোমরা আমার কথা কানেও তুলো নি। আজ আমি আমার শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে চাই।”
তাজ এবার মাথা তুলে তাকাল। আব্বুর মলিন চেহারার পানে তাকিয়ে চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ল। বক্রদৃষ্টিতে একবার নৌমিকেও দেখে নিল। নৌমির চোখে-মুখে আতঙ্ক। তাজ ধীর গলায় বলল,
” আব্বু, আপনার সিদ্ধান্ত জানানোর আগে আমি কিছু বলতে চাই।”
নৌমির বুক কাঁপছে৷ তাজ কি নিলুর কথা বলে দিবে! তারপর কি হবে? নৌমির শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। তাজের আব্বু সময় নিয়ে বললেন,
” বলো।”
তাজ সময় নিল না। ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে নরম স্বরে বলল,
” আমার চাকরি হয়েছে।”
“কি বলছো! সত্যি? “
” জি আব্বু। আমি চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। এই কয়েকদিনে বেশ কিছু পরীক্ষা দিয়েছি। সেখান থেকে এই চাকরিটা পেয়েছি। স্যালারিও ভালো। সাথে থাকা, খাওয়ার বিশেষ সুবিধা আছে।”
” থাকা খাওয়ার সুবিধা মানে! চাকরি কোথায় হয়েছে তোমার? “
” নয়ারহাট।”
” কি বলছো! এত দূর গিয়ে চাকরি করবে?”
নৌমি, তাজের আম্মু সহ বাকিরা নিশ্চুপ। তাজ মুচকি হেসে জবাব দিল,
” চাকরিটা আমার জন্য খুব দরকার। এভাবে টিউশন পরিয়ে আর পারছিলাম না৷ তাছাড়া আমাদের শহরে সুবিধাজনক চাকরি নেই বললেই চলে। আমি অনেকদিন যাবৎ চেষ্টা করেছি কিন্তু পাচ্ছি না। তাই যা পেয়েছি আমি তাতেই খুশি।”
” এভাবে বাড়ি ছেড়ে দূরে গিয়ে কিভাবে থাকবে?”
” ওখানে হোস্টেল আছে। খাবারের মানও বেশ ভালো৷ তেমন সমস্যা হবে না। তাছাড়া আমি যাচাই করার জন্য ওখানে ২ দিন থেকেও এসেছি।”
” তাজ, তুমি কি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছো?”
” জি আব্বু, আমি সময় নিয়ে ভেবেছি তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী সপ্তাহে যেতে হবে আমাকে।”
তাজের আম্মু আর্তনাদ করে উঠলেন, ” আগামী সপ্তাহেই চলে যাবি?”
” হ্যাঁ আম্মু। আমার কিছু কাগজপত্র নেওয়ার দরকার ছিল সেগুলো নিতেই এসেছি।”
রাফি বলল, ” ভাইয়া, তুমি দূরে চলে গেলে খুব মিস করব তোমাকে।”
তাজও বলল, ” আমিও তোদের খুব মিস করব।”
একে একে সবাই নিজেদের আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করছে। অথচ নৌমি পাথর বনে গেছে৷ সে মূর্তির মতো বসে আছে৷ এখন আর তাজের দিকে তাকাতেও পারছে না। তাজের আব্বু নৌমিকে কিছুক্ষণ পরখ করে মৃদুস্বরে বললেন,
” বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভাবছো আপাতত? “
” না আব্বু। নতুন চাকরি, নতুন পরিবেশ । সবকিছু বুঝার জন্য হলেও আমার কয়েক মাস সময় লাগবে। নিজেকে গুছিয়ে নেই। তারপর বিয়ে নিয়ে ভাবব।”
” ঠিক আছে। তোমার যা ভালো মনে হয়। তারপরও এক সপ্তাহের মধ্যে যদি তোমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। বিয়ে বা এনগেজমেন্ট কিছু করতে চাও তাহলে জানিয়ো। বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব আমি অবশ্যই পালন করব।”
” জি আব্বু।”
তাজ আর কথা বাড়াল না। কোনোরূপ শব্দ না করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এদিকে নৌমির গলা শুকিয়ে আসছে। তাজের রাশভারি কণ্ঠের কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। নৌমির দৃষ্টি এবার তাজের পানে। অকস্মাৎ তাজের আব্বু ডাকলেন,
” নৌমি।”
” জি মামা।”
” তুমি চাইলে তাজের সাথে একটু কথা বলতে পারো। তাজকে দেখে খুব একটা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সাথে হয়তো অনেককিছুই শেয়ার করবে না। তোমাকে বলতে পারে।”
” ঠিক আছে।”
নৌমির বুকে চিনচিন ব্যথা করছে। সবসময় স্পষ্ট করে কথা বলা মেয়েটাও আজ কথা গুলিয়ে ফেলছে। কণ্ঠস্বর কাঁপছে। এ যাবৎ কালে তাজের দিক থেকে এরকম অবহেলা কখনও পায়নি। তবে আজ হঠাৎ কি হলো! নৌমির ইচ্ছে করছে সবার মাঝখান থেকে উঠে এক ছুটে তাজের কাছে যেতে। তাজকে জিজ্ঞেস করতে,
” এই অবহেলার কারণ কি!”
কিন্তু না এটা সম্ভব না। নৌমি সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। তারপর ক্লাসের ভান করে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নৌমি যথারীতি ক্লাসে চলে যায়। আজ যদিও ক্লাসে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বাসায় থাকলেই বারবার তাজের কথা মনে পড়বে। কথা বলতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু তাজ তো দূরত্ব রেখে চলছে। ক্লাস থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশ থেকে ঝালমুড়ি কিনেছে। মুড়ি খেয়ে খেয়ে একাকী হাঁটছিল। কিছুদূর যেতেই টং টর দোকানে তাজকে দেখতে পেল। সাথে আরও ২-৩ জন বন্ধু। নৌমি তাজকে দেখেই হাসল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে উৎসুক কণ্ঠে আওড়াল,
” তামজিদ ভাইয়া, ঝালমুড়ি খাবে?”
তাজ চোখ ঘুরিয়ে নৌমিকে দেখে কোমল গলায় উত্তর দিল,
” খাব না।। তুই বাড়ি যা।”
” অনেক মজা হয়েছে। খেয়ে দেখো না!”
তাজ তপ্ত স্বরে বলে,
” খাব না বললাম তো।”
” না খেলে নাই। আমার দায়িত্ব সাধা তাই সেধেছি। পরে যেন বলতে না পারো, তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাই অথচ একবারও জিজ্ঞেস করি না।”
তাজ নিশ্চুপ। আনমনে নৌমির পানে চেয়ে আছে। নৌমির কথা শুনলো কি না তাও বুঝা গেল না। নৌমি আবার বলল,
” তুমি সকালে আমার সাথে যে আচরণটা করলে সেটা তোমার থেকে আশা করিনি। এর শাস্তি তোমাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।”
তাজ কোনোমতে বলল শুধু,
” বাড়ি যা।”
নৌমি মৃদু হেসে বলল,
” যাচ্ছি। এতবার বলতে হবে না। এখান থেকে এখানে। আমি হারিয়ে যাব না।”
নৌমি চলে গেল। তাজ মাথা হালকা এলিয়ে নৌমির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ তাজের বন্ধু শান্ত বলে ওঠল,
” তোর জীবনে নৌমির মতো একটা মেয়ের খুব দরকার। যে তোকে বুঝবে, তোকে প্রায়োরিটি দিবে। কত সুন্দর করে সাধছিল। দেখেও ভালো লাগছিল। তুই ভাই সেরা। নিলু চলে গেলেও তোর কোনো দুঃখ নেই। নিলু নেই নৌমি তো আছে৷ তারউপর নৌমির সাথে তোর বিয়েও ঠিক। আজ বললে আজই বিয়ে দিয়ে দিবে। এদিকে আমাদের কপালে একটায় ঠিকঠাক মতো জুটে না। “
শান্তকে থামিয়ে দিয়ে সাদ বলল,
” তাজ তুই বরং একটা কাজ কর। নিলুর বিয়ের তারিখের সাথে মিল রেখে তোর বিয়ের তারিখ ধর। তুই নৌমিকে বিয়ে করে নে। নিলুকে জানিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।”
তাজ রাগে কটমট করছে। কণ্ঠে আগুন ঢেলে হুঙ্কার দিল,
” তোরা বন্ধু নামে কলঙ্ক। বন্ধু কখনো এমন হতে পারে না। আমি নৌমিকে বোনের চোখে দেখি আর তোরা এটা খুব ভালো করে জানিস৷ নৌমিকে বিয়ে করার হলে আমি অনেক আগেই করতে পারতাম৷ কিন্তু আমি সেই কাজ করিনি। কারণ আমি নিলুর ব্যাপারে খুব সিরিয়াস৷ এই কয়দিনে নিজের সব ইগো বিসর্জন দিয়েও নিলুকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। পরিবারের বাইরে গিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়েছি। তারপরও নিলুর মন পাই নি। নিলু কি চাচ্ছে আমি সত্যিই জানি না। সে বলছে আমাকে ভালোবাসে আবার বিয়ে করতে পারবে না। আমার হয়ে তার পরিবারকে কিছু বলতে পারবে না। তার বাবার কথার অবাধ্য হতে পারবে না। আবার আমাকে ছাড়তেও পারবে না। এ কেমন ভালোবাসা আমি জানি না। সত্যিই জানি না। এদিকে বাসায় বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। আমার ছন্নছাড়া আচরণ আব্বু-আম্মুর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৌমি সত্যিটা জানে, ও আমাকে সাপোর্ট করে। নৌমি বুঝলেও আমার বাবা-মা বুঝতে পারেনা৷ তাঁদের বুঝানোর সাধ্যও আমার নেই।”
শান্ত মৃদু হেসে বলল,
” তাজ, তুই জীবনে খুব কম মেয়েদের সাথে মিশেছিস। তাই মেয়েদের চালচলন, কথাবার্তা সম্পর্কে তোর আইডিয়া খুব কম। তুই যাকে বোন বোন বলে দাবি করছিস সে আদোও তোকে ভাই ভাবছে কি না সে ব্যাপারে সত্যিই সন্দেহ আছে৷ তোর চোখে নৌমি বোন হতে পারে কারণ তুই অন্য কারো সাথে কমিটেড। কিন্তু নৌমি মনে মনে ঠিকই তোকে পছন্দ করে। আমার কথাগুলো এখন তোর কাছে তিতা মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই সত্যি৷ একদিন তুই ঠিকই টের পাবি। লাস্ট ৬ মাসে আমি যতবারই তোকে আর নৌমিকে একসাথে দেখেছি ততবারই মনে হয়েছে নৌমি তোকে ভালোবাসে আর খুব ভালবাসে। এটা ওর চোখেমুখে ভাসে। ও মনেপ্রাণে তোকে চাই। হয়তো পরিস্থিতির চাপে তোকে কিছু বলতে পারছে না। “
” বাজে কথা বলিস না। নৌমি আমাকে নিয়ে এসব কিছুই ভাবে না। বরং ও নিলুর ব্যাপারে খুব সিরিয়াস৷ ও চাই আমি আর নিলু যেন গোপনে বিয়ে করে ফেলি। বাসায় ম্যানেজ করার দায়িত্বও সে নিয়েছে।”
” আমি আমার মনোভাব প্রকাশ করেছি। এখন বিশ্বাস করবি কি না সেটা তোর ব্যাপার। ইচ্ছে হলে তুই নৌমিকে পরীক্ষাও করতে পারিস।”
” তোদের সাথে বাজে কথা বলার সময় আমার নেই। আমার কিছু কেনাকাটা করতে হবে। এমনিতেও সামনের সপ্তাহে চলেই যাচ্ছি।”
” এলাকা ছেড়ে যা কিংবা দেশ। আমার কথাগুলো একটু মন দিয়ে ভেবে দেখিস।”
” আচ্ছা। আজ আসি।”
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২১(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৩
-
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)