#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (০৯)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
শুভ্র ব্যালকনিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবছে। কিছুদিন যাবৎ নৌমির সাথে একদমই কথা হচ্ছে না। কল দিলে কলও রিসিভ করছে না। তাজকে নৌমির কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর তো দেয়ই না উল্টো দশটা কথা শুনায়। শুভ্রর আম্মু হঠাৎই শুভ্রর পাশে এসে দাঁড়ালেন। কোমল কন্ঠে শুধালেন,
“কি ভাবছিস, শুভ্র?”
শুভ্র মলিন হেসে জানাল,
“তেমন কিছু না।”
“কিছু হয়েছে?”
“না, আম্মু।”
“ভুলে যাস না, আমি তোর মা হয়। সুমি বলছিল, কিছুদিন ধরে সারারাত তোর রুমের আলো জ্বলে। কি হয়েছে বাবা? বল আমাকে!”
“লাস্ট সেমিস্টার চলছে তাই একটু চাপে আছি। আর কিছুই না। আমরা বাসায় কবে যাচ্ছি, আম্মু?”
“পরশুদিন।”
“বাসায় জানিয়ে দিয়েছো?”
” সুমি না করল তাই জানায় নি।”
” ঠিক আছে।”
” তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়িস কেমন?”
” আচ্ছা। “
” আর যদি কিছু বলার থাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারিস। তুই আমাদের একমাত্র ছেলে। তোর ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। “
” আমাকে কিছুদিন সময় দেও। আমি একটু বুঝি তারপর অবশ্যই তোমাদের জানাব।”
“তোর যা ভালো মনে হয়।”
নৌমি মনোযোগ দিয়ে পড়তেছিল। টেবিলের পাশে জানালার থাইগ্লাসটা খোলা। নৌমির পড়ার টেবিল থেকে তাজের রুম সরাসরি দেখা যায়। আচমকা তাজের ব্যালকনিতে নজর পড়ল। সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ হলো। আবছা আলোতে কিছু একটা অবয়ব দেখে নৌমি চমকাল। সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবিষ্কার করল তাজ ব্যালকনিতে পায়চারি করছে। নৌমি কিয়ৎক্ষণ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থেকে ওঠে গেল ব্যালকনিতে। উঁচু গলায় ডাকল,
” ঐ। “
তাজের পাশ থেকে কোনো জবাব আসে নি। নৌমি আবারো ডাকল,
” তামজিদ ভাইয়া। “
“কি?”
“ব্যালকনিতে কি কর?”
“কিছু না। তুই এ সময় এখানে কি করিস?”
“আমার রুম, আমার ব্যালকনি। আমি যখন ইচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। তোমার কোন আপত্তি আছে?”
“এটাও আমার রুমের একমাত্র ব্যালকনি। আমি চাই যা খুশি করতে পারি।”
” রেগে আছো কেন?”
“রেগে নেই৷ তুই রুমে যা নয়তো চুপ যা।”
“কেন? আমি আবার কি করেছি?”
” যেভাবে চিৎকার করে কথা বলছিস। সবাই ভাববে না জানি কি হয়েছে আমার। কথা বলতে ইচ্ছে হলে বাসায় এসে বলিস। তবুও এভাবে চিৎকার করিস না। গলার রগ ছিঁড়ে যাবে।”
” এখন বাসায় আসবো না। ছাঁদে যাবে?”
” না। আমার কাজ আছে।”
নৌমি রাগী স্বরে বলল,
” তোমার কাজ তো সবসময়ই থাকে। আমি ছাঁদে যাচ্ছি তুমি তাড়াতাড়ি এসো।”
তাজ বলতে নিল,
“আমি যাব না।”
কিন্তু তার আগেই নৌমি রুমে চলে গিয়েছে। তাজ সঙ্গে সঙ্গে নৌমির ফোনে কল দিল কিন্তু তাতেও বিশেষ কোনো লাভ হলো না। নৌমি এক দৌড়ে ছাঁদে চলে গিয়েছে। বাসা করার সময়ই এমন সিস্টেমে করেছিল যেন ছাঁদ দিয়েও খুব সহজে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যাতায়াত করা যায়। তাজদের বাসার ছাঁদে একটা স্টিলের দোলনা আছে। নৌমি ঐটাতে বসে গুনগুন করে গান গাইতেছে। ৫ মিনিট পর তাজ আসছে। পড়নে কালো টিশার্ট আর লুঙ্গি। চুল এলোমেলো, চেহারা বিধ্বস্ত প্রায়। আশপাশে নজর বুলাতেই নৌমি পাশ থেকে ডাকল,
“আমি এখানে।”
“তোকে বারণ করেছিলাম তারপরও কেন এসেছিস?”
” রাতের আকাশ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু আন্নি সন্ধ্যার পর ভয়ে ছাঁদে আসতেই চাই না। তাই তো তুমিই আমার শেষ ভরসা।”
তাজ ছাঁদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে শুধাল
” রাতের বেলা আর কি কি করতে ইচ্ছে করে তোর?”
” গভীর রাতে হেঁটে হেঁটে শহর ঘুরার খুব ইচ্ছে আমার। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আকাশ দেখে রাত কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছে। নিশীথে ভূতের সিনেমা দেখার ইচ্ছে। ভূত সেজে মানুষকে ভয়ও দেখানোর ইচ্ছে। আরও অনেক ইচ্ছে আছে।”
“আমি মাঝে মাঝে ভাবি, তোর এসব পাগলামি কে সহ্য করবে!”
” ওয়ান পিস নৌমিকে পেতে চাইলে আমার পাগলামি সহ্য করতেই হবে।”
” মানুষকে পাগল না বানিয়ে নিজে ম্যাচিউর হবার চেষ্টা কর।”
” কেন? আমি কি অবুঝ নাকি? রাতে ছাঁদে আসা যদি অবুঝ ইচ্ছে হয় তাহলে আমি অবুঝই। তোমাকে ডেকে এনেছি বলে এরকম বলছ তো। ঠিক আছে। দেখে নিও, এমন একদিন আসবে যখন মাঝরাতে একায় ছাঁদে বসে থাকব। তোমাকে একবারের জন্যও বলব না।”
” আমি কখন বললাম, আমাকে ডেকেছিস বলে এসব বলেছি!’
“সব কথা মুখে বলতে হয় না। আমি সবই বুঝি। তোমাকে তো আগেই বলেছি, নিলু ভাবিকে বউ করে আনলে ভুলেও তোমাকে বিরক্ত করব না। বিয়ের আগ পর্যন্ত তুমি আমার ভাই আর বিয়ের পর নিলু ভাবির হাসব্যান্ড।”
তাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” তোকে আমি এসবের কিছুই বলি নি। নিজেই নিজের মতো ভেবে নিচ্ছিস। ঠিক আছে। বেঁচে থাকলে আমিও দেখব কে তোর এসব আবোলতাবোল পাগলামি সহ্য করে। “
” হুম। সময় হলে দেখে নিও।”
নৌমি নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে৷ নৌমি মন দিয়ে আকাশ দেখছে। তাজ নৌমির দিকে তাকিয়ে আছে। পূর্ণিমার আলোতে নৌমির লাবণ্যময় চেহারা ঝলঝল করছে। তাজ কিয়ৎক্ষণ চেয়ে থেকে ক্ষীণ হেসে শুধাল, ” রাগ করেছিস?”
” না।”
“মনে হচ্ছে করেছিস!”
” রাগ, অভিমান সব হবু জামাইয়ের জন্য রেখে দিয়েছি। আবদার গুলোও জমা করে রাখব। তবুও তোমরা ভালো থেকো।”
” বাহ! কি এমন হয়েছে যে ভালো থেকো বলে একদম বিদায় নিয়ে নিচ্ছিস।”
“কিছু হয় নি। তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।”
” আচ্ছা, সরি। আমি কি এমন বলেছি জানি না তবুও সরি।”
“সরি বলতে হবে না।”
” তাহলে তোকে নিয়ে রাতের শহরে ঘুরব। ওকে?”
” কোনো প্রয়োজন নেই। আমার ইচ্ছে আমি পূরণ করতে পারব। তুমি যাও। না থাক, আমিই চলে যাচ্ছি।”
তাজ তপ্ত স্বরে ডাকল, ” এই মুসকান।”
নৌমি ছাঁদ থেকে নেমে গেছে। তাজ কতক্ষণ হা হয়ে রইল। নৌমি রুমে ঢুকতেই ফোনের শব্দ শুনতে পেল। শুভ্র কল দিচ্ছে। নৌমি রিসিভ করতেই শুভ্র মৃদুস্বরে বলল, ” কল দিচ্ছিলাম রিসিভ করছিলে না কেন?”
“ছাঁদে গিয়েছিলাম।”
“এত রাতে?”
“হুম”
“তোমারও কি রাতে আকাশ দেখার শখ আছে?”
“হুম। কেন?”
“আমারও খুব ভালো লাগে।”
“ভালো।”
শুভ্রর সাথে কথা বলার মাঝখানে তাজ বার বার কল দিচ্ছে। নৌমি বিরক্ত হয়ে শুভ্রর কল কেটে তাজের কল রিসিভ করল। তাজ স্বাভাবিক কন্ঠে শুধাল,
“কার সাথে কথা বলছিলি?”
” আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। তোমার কোনো সমস্যা আছে ? “
” অবশ্যই সমস্যা আছে।”
” কি সমস্যা?”
” আমি তোকে কি এমন বলেছিলাম যে রাগ দেখিয়ে চলে গেলি? তারউপর বার বার কল কেটে দিচ্ছিস। কে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যার জন্য তুই আমার কল কেটে দিচ্ছিলি!”
” বললাম তো বয়ফ্রেন্ড কল দিয়েছিল।”
তাজ তপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল, “কে সে?”
” আছে কেউ একজন। রাখছি এখন।”
“এই শুন।”
“হুম।”
” অবুঝের মতো যার তার সাথে কথা বলিস না। কে তোর ভালো চায় আর কে খারাপ চায় এগুলো বুঝে তারপর কথা বলিস।”
” আপনার অসাধারণ বক্তৃতার জন্য একটা উপহার পাওনা রইল। বাই “
নৌমি কল কেটে ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিয়েছে। কারো সাথে কোনো কথা না বলেই চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছে। তাজ আজ নির্বাক। একদিকে নিলুর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে অন্যদিকে নৌমির অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে আছে।
খাবার টেবিলে তাজ, রাফি আর রাদ একসঙ্গে খাবার খাচ্ছিল৷ রাফি হঠাৎই ডাকল,
” তাজ ভাইয়া।”
“বল”
“আজ নৌমি আপুর সাথে কথা হয়েছে তোমার?”
” হয়েছে।”
” বাসায় কখন এসেছিল? দেখলাম না তো!”
“বাসায় আসেনি। কেন? ওরে দিয়ে তোর কি কাজ?”
” আমার কোনো কাজ নেই। শুনেছি আপু আজ এক্সিডেন্ট করেছিল।”
” কি? কখন? কিভাবে?”
” আমি বিস্তারিত জানি না। আমার ফ্রেন্ড আমাকে বলেছিল। অটো আর রিক্সার ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। নৌমি আপু নাকি রিক্সায় ছিল।আমি সন্ধ্যায় নৌমি আপুকে দেখতে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ডেকেছি কিন্তু রুমের দরজা খুলেনি। ফুপ্পি জানে কি না এই ভেবে ফুপ্পিকে কিছুই বলি নি।”
তাজ ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করল, ” ফাজিল মেয়ে। সবসময় সব কথা সবার আগে বলতে পারে অথচ এক্সিডেন্ট করেছে এই কথাটা একবারও বলতে পারল না।”
তাজ দ্রুত খাওয়া শেষ করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। রাফি ডাকল,
” কোথায় যাচ্ছ, ভাইয়া?”
” নৌমিকে দেখে আসি।”
” দাঁড়াও, আমিও যাব।”
রিদ ওঠে বলল, ” আমিও যাব।”
“সবাই একসঙ্গে গেলে ফুপ্পি বুঝে যাবে। আমি গিয়ে দেখে আসি।”
নৌমির আব্বু, আম্মু আর আন্নি খেতে বসেছে। তাজ দরজায় ডাকতেই আন্নি ওঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল৷ তাজ ফুপ্পি আর ফুফাকে শুনানোর জন্য উঁচু গলায় বলল,
” আজ পড়তে যাস নি কেন?”
” বিকেলে রাদ বলল তুমি বাসায় নেই। “
” সন্ধ্যার পর তো বাসায় ছিলাম। ফাঁকিবাজি না করে পড়াশোনায় মনোযোগ দে।”
” আচ্ছা, ভাইয়া।”
নৌমির আব্বু বললেন, ” তাজ, খাবে এসো।”
” না ফুফা। মাত্রই খেয়ে এসেছি। আপনারা খান।”
“তোমার আব্বুর শরীর কেমন এখন?”
” আলহামদুলিল্লাহ এখন অনেকটা সুস্থ।”
“আলহামদুলিল্লাহ। “
নৌমির আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, ” আন্নিকে পড়াতে এসেছিস?”
“না। নৌমির কাছে একটু দরকার ছিল৷ নৌমি কোথায়?”
“ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। বেশি দরকার?”
” হ্যাঁ। একটু।”
” ঠিক আছে। যা “
নৌমির রুমের দরজা বন্ধ। কয়েকবার ডাকার পর নৌমি ঘুমঘুম চোখে দরজা খুলে দিল। তাজকে দেখে চমকে উঠে বলল, ” তুমি?”
“তুই নাকি আজ এক্সিডেন্ট করেছিলি?”
নৌমি চোখ কচলে ডাইনিংএ নজর বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
” আস্তে বলো। আব্বু আম্মুর কানে গেলে খবর আছে।”
“কোথায় ব্যথা পেয়েছিস? দেখি!”
” বেশি ব্যথা পাই নি। এক হাতের কব্জিতে ব্যথা পেয়েছি৷ আরেক হাতের কনুই ছিলে গেছে। “
“আগে বলিস নি কেন আমাকে?”
” ছাঁদে গিয়েছিলাম বলতে কিন্তু তুমি তো পাত্তায় দিলে না আমাকে। আমি অবুঝ, পাগল আরও কতকি বললে।”
“আচ্ছা, সরি।”
নৌমি মৃদু হেসে বলল, ” কোনো ব্যাপার না।”
” ঔষধ খেয়েছিস? “
“হুমম।”
” ফুপ্পিরা জানে?”
” না।”
” রাস্তায় সাবধানে চলাফেরা করিস।”
আচ্ছা৷ তুমি এখন যাও। আমি ঘুমাব।”
“সরি, কিছু মনে করিস না প্লিজ।”
“ওকে ওকে। মনে করলাম না কিছু্।”
চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৬
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে সূচনা পর্ব
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৪