#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(০৭)
“তোমার মনের কোনে
যদি বাজে সাইরেন
প্রেম প্রেম খেলে নিতে চাই
চরবো সাইকেলে
কিংবা টয় ট্রেনে
এনে দেব যা বলবে তাই।”
নৌমি সকাল সকাল সোফায় হেলান দিয়ে বসে টিভিতে জোরে সাউন্ড দিয়ে গান শুনছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। তাজ ভেতরে এসে নৌমির মাথায় গাট্টা দিয়ে বলল,
“এগুলো ছেলেদের গান, তুই শুনছিস কোনো?”
নৌমি মাথায় ঘষতে ঘষতে তাজের দিকে তাকিয়ে জিভ বের করল। আশপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
” জানো, আমি না আজকে সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
তাজ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি স্বপ্ন?”
নৌমি আবারও আশেপাশে তাকালো। চোখ নামিয়ে লাজুক হেসে বলল,
” আমার বিয়ের।”
তাজ ফিক করে হেসে উঠল। রসিকতা করে বলল,
” জামাই কে ছিল?”
” জামাই এর মুখ দেখার আগেই আম্মু ডাক দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। “
” আহারে! বেচারা জামাই টা। “
আজ নৌমিদের বাড়িতে রান্নার ধুম লেগেছে। নৌমির বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি থেকে মেহমান আসবে। নৌমির আব্বু সব বাজার করে রেখে গেছেন তবুও কিছু কিছু জিনিস বাকি রয়ে গেছে। সেগুলো আনানোর জন্যই মূলত তাজকে ডাকা হয়েছে। তাজ ফুপ্পিকে ডেকে বলল,
” ফুপ্পি, কি কি আনতে হবে বলো।”
নৈামি উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
” তুমি মার্কেটে যাবে?”
” হ্যাঁ, কেনো?”
“আমাকে নিয়ে যাবে?”
“জ্বি না।”
“একটু নিয়ে যাও না, এমন করো কেনো?”
“তুই মার্কেটে গিয়ে কি করবি?”
” তেমন কিছু না। মার্কেটে চিংড়ি মাছ উঠেছে কি না দেখবো।”
তাজ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” তোর না এলার্জির সমস্যা! তাছাড়া চিংড়ি মাছ খাওয়া তো নিষেধ তোর।”
” হঠাৎ খেলে কি হয়?”
” কি হয় না হয় সেটা তুই অসুস্থ হলেই বুঝা যায়। অন্য কিছু লাগলে বল, আসার সময় নিয়ে আসবো।”
নৌমি খানিক ভেবে বলল,
” আমি কিছু জানি না। তোমার ইচ্ছেমতো কিছু নিয়ে এসো। “
“আচ্ছা।”
তাজ ব্যাগ নিয়ে বাজারে চলে গেছে, নৌমিও টিভি বন্ধ করে আম্মুর সাথে কাজে লেগে পড়েছে। আজ ভার্সিটিতে কিছু কাজ আছে সাথে নিলুর সাথে দেখাও করতে হবে তাই তাজ ঝটপট বাজার করে দিয়ে নিজের বাসায় চলে গেছে।
বেলা বাজে ১১ টা, মুখোমুখি নিলু আর তাজ। নিলু মাথা নিচু করে বসে আছে। তাজ কিছুক্ষণ নিরব থেকে গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইল,
“কি সমস্যা তোমার?”
নিলু মলিন হেসে বলল,
” আমার কোনো সমস্যা নেই।”
” এত বদলে গেলে কিভাবে?”
“পরিস্থিতির চাপে।”
তাজ মৃদু হেসে বলল,
“পরিস্থিতির চাপের দোহাই দিয়ে সত্যি মিথ্যা আড়াল করো না, নিলু৷ জীবনটা ছেলে খেলা নয়।”
“তোমাকে তিনমাস সময় দিয়েছিলাম। সেই সময় শেষ হতে চলল। চাকরি কি পেয়েছো?”
” চাকরি না পেলে কি চলে যাবে?”
“জানি না।”
” এখন যেমনভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছো সম্পর্কের শুরুতে কেনো এমনভাবে ভাবলে না! আমি কি তোমাকে জোর করেছিলাম?”
” আব্বু বাসায় প্রতিনিয়ত প্রেশার ক্রিয়েট করছে। “
” চলো।”
“কোথায়?”
“তোমার আব্বুর সাথে দেখা করবো। “
নিলু আঁতকে উঠে বলল,
” না।”
“কেনো?”
“আব্বু খুব রাগ করবে।”
তাজ দু-হাতে নিজের মাথা চেপে অত্যন্ত ধীর কন্ঠে শুধালো,
” আচ্ছা, তুমি চাও টা কি?”
” জানি না।”
তাজের মেজাজ অতিরিক্ত মাথায় খারাপ হয়ে গেছে। বসা থেকে উঠে চেয়ারে লা*ত্থি দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে চিৎকার করল,
” নিজের মনের থেকে উত্তর জেনে তবেই আমাকে বলতে এসো, বাই।”
তাজ রাগে কটমট করে ভার্সিটি থেকে বেড়িয়ে গেছে। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা করছে, রিক্সায় করে বাসায় ফিরছে। ফোনে বার বার বন্ধুদের কল আসছে, নিলুও দু একবার কল দিয়েছে। তাজ কল কেটে দিচ্ছে। কিছুদূর যেতেই নৌমির নাম্বার থেকে কল আসছে। রিসিভ করার ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও রিসিভ করল। নৌমি শান্ত গলায় জানতে চাইল,
” কোথায় তুমি?”
“বাসায় আসতেছি।”
” আচ্ছা, শুনো।”
” হুম, বল।”
“আসার সময় দই নিয়ে এসো। আর হে আমার জন্য পিচ্চি দেখে একটা আইসক্রিমও নিয়ে এসো। আইসক্রিম টা আম্মুকে দেখিয়ো না কেমন!”
তাজ আনমনে হেসে বলল,
” ঠিক আছে।”
“মনে থাকবে তো?”
“থাকবে, এখন রাখি।”
“শুনো”
“হু”
“আজকে দুপুরে আমাদের বাসায় তোমার দাওয়াত, মনে আছে তো?”
” আমার দাওয়াত লাগবে না”
“কেনো লাগবে না? আলবাত লাগবে। প্রয়োজনে তোমার জন্য দাওয়াতের স্পেশাল কার্ড পাঠাবো।”
“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা তো এক বাসার, আমাকে দাওয়াত দেয়ার কি প্রয়োজন? শুধু বলবি, আসো আমিও চলে আসবো।”
নৌমি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
” কি ব্যাপার বলো তো! তোমার কি কিছু হয়েছে?”
“কই না তো। আচ্ছা রাখ, দই আর আইসক্রিম নিয়ে আসছি।”
“হ্যাঁ, আসো আসো। আমিও দেখি তোমার কি হয়েছে!”
তাজ দই নিয়ে আসছে। ড্রয়িংরুমে নৌমি নেই। দই ফ্রিজে রেখে আইসক্রিম লুকিয়ে নৌমির রুমের সামনে হাজির হলো। দরজায় ঠোকা দিয়ে আস্তে করে ডাকল,
“নৌমি”
“ভেতরে আসো।”
তাজ ভেতরে ঢুকতেই চমকে উঠল। নৌমি বিছানার উপর ভেজা চুল এলোমেলো করে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার উপর ফুল স্প্রীডে ফ্যান চলছে। নৌমির চুল আর ফ্যানের দূরত্ব খুব বেশি না। তাজ সহসা আইসক্রিম রেখে নৌমির বাহুতে জোরে টান দিল। আচমকা টান পড়ায় নৌমি টাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে বিছানায় বসে পরেছে। তাজ কন্ঠে অগ্নি ঢেলে চিৎকার করল,
” এগুলো কি ধরনের বাচ্চামি?”
“উফফ, কোথায় বাচ্চামি করলাম?”
” ফ্যানের সাথে চুল লাগলে কত বড় এক্সিডেন্ট হবে ভাবতে পারছিস?”
” আরে আমার চুল এত লম্বা না। তুমি ভয় পেয়ো না, চুল লাগবে না। আমি সবসময়ই এমন করি।”
তাজ কন্ঠ দ্বিগুণ ভারী করে চেঁচাল,
” আজকের পর আর করবি না।”
“কি?”
“বলছি আজকের পর বিছানার উপর দাঁড়িয়ে চুল শুকাবি না।”
“কেনো?”
“আমি নিষেধ করছি তাই।”
“ভেজা চুল ঘাড়ে পড়ে থাকলে আমার মেজাজ খারাপ হয়।”
“এ মাসে টিউশনের টাকা পেলে তোকে একটা হেয়ার ড্রায়ার কিনে দিব। তবুও এমন পাগলামি করিস না।”
নৌমি প্রশস্ত আঁখিতে তাকিয়ে বলল,
” থাক ভাই, আমাকে হেয়ার ড্রায়ার কিনে দিতে হবে না। আমি না হয় বিছানায় বসে বসেই চুল শুকিয়ে নিব। তুমি বরং ভাবিকে একটা শাড়ি কিনে দিও, সেদিন দেখলাম মার্কেটে অনেক সুন্দর সুন্দর শাড়ি আসছে।”
” তোর শাড়ি লাগবে?”
নৌমি হেসে বলল,
” আমি শাড়ি দিয়ে কি করবো! পহেলা বৈশাখে কি অবস্থা হয়েছিলো দেখো নি? এসব শাড়ি আমার সাথে যায় না। তবে ভাবিকে শাড়িতে খুব সুন্দর লাগে।”
তাজ নৌমির কথায় তেমন পাত্তা দিল না। যেদিন থেকে নিলুর ব্যাপারে শুনেছে নৌমি সেদিন থেকেই নিলুর প্রতি আলাদা রকমের সফট কর্ণার তৈরি হয়ে গেছে। নিলুকে একবার আপু বললে পরপর তিনবার ভাবি বলে সম্বোধন করে। তাজ নিলুর সাথে রাগ করলে নৌমি তাদের রাগ ভাঙাতে উতলা হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নিলুর আর তাজের বর্তমান অবস্থার কথা জানতে পারলে নৌমি যে কি করবে কে জানে!
তাজ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আইসক্রিম টা খেয়ে নে। আমি আসি।”
নৌমি এখনও বিছানায় চুল এলোমেলো করে বসে আছে। তাজের কথার উত্তরে বলল,
” আইসক্রিম টা আমার হাতে দিয়ে যাও।”
” তোর লজ্জা লাগে না, বড় ভাইকে অর্ডার করছিস।”
” লজ্জা আবার কি?”
তাজ আইসক্রিম হাতে নিয়ে যেই ঘুরতে যাবে ওমনি নৌমির ফোন বেজে উঠল। না চাইতেও তাজের নজর বাটন ফোনের ছোট স্ক্রিনে পড়ল। যেখানে সুন্দর করে নাম ভেসে উঠেছে, শুভ্র ভাইয়া।
নৌমি জিজ্ঞেস করল,
“কে কল দিয়েছে?”
তাজ কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে ফোনটা হাতে নিল। নৌমির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” শুভ্রর সাথে কথা হয় তোর?”
“শুভ্র ভাইয়া কল দিয়েছে?”
” শুভ্র তোর নাম্বার কোথায় পেল?”
“আমি কি করে বলল? হঠাৎ একদিন বিদেশি নাম্বার থেকে কয়েকবার কল আসছে। আমি নরমাললি রিসিভ করেছি তারপর দেখি শুভ্র ভাইয়া।”
“ভালো, খুব ভালো।”
এরমধ্যে একবার কল বেজে শেষ হয়ে গেছে। মিনিটের মধ্যে শুভ্র আবারও কল দিল। নৌমি বলল,
“ফোনটা দাও, দেখি কি বলে।”
তাজ ফোন নৌমিকে না দিয়ে নিজেই রিসিভ করল। ওপাশ থেকে শুভ্র বলল,
” হ্যালো, মিস”
“হ্যালো।”
নৌমির ফোনে ছেলের কন্ঠ শুনে শুভ্র কিছুটা ভড়কে গেছে। চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,
” তাজ?”
“হ্যাঁ”
“নৌমি কোথায়?”
“ব্যস্ত। কেনো?”
“শপিং এ আসছিলাম। ভাবলাম ওর জন্য কিছু কিনি তাই কল দিয়েছিলাম।”
” ওর কিছু লাগবে না, রাখ ফোন।”
কল কাটতেই নৌমি বলল,
” কি বলছিল? লাগবে না বললে কেন? কানাডার জিনিসপত্র কত ইউনিক তুমি জানো?”
তাজ রাশভারি কন্ঠে বলল,
” দেশ ভালো না লাগলে চলে যা। দেশে পড়ে আছিস কেনো?”
“আমি এ কথা কখন বললাম!”
তাজ নৌমির সামনে আইসক্রিম আর ফোন রেখে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। নিলুর উপরের রাগ তাজ আজ নৌমি, শুভ্র সবার উপর দেখাচ্ছে। নিজেকে শান্ত করার কোনো উপায়ও খোঁজে পাচ্ছে না।
★
সপ্তাহ খানেক বাদে, বিকেল দিকে নৌমি আর আন্নি ঘুরতে বেড়িয়েছে। কিছু জিনিসপত্র কিনবে আর খাওয়াদাওয়া করবে। রাস্তার পাশের এক দোকানে দাঁড়িয়ে নৌমি আর আন্নি গল্প করতে করতে খাচ্ছিলো। তাজ টিউশন শেষ করে আসছিলো, নৌমি আর আন্নিকে দেখে রাস্তা পার হতে যাবে। অকস্মাৎ নজর পড়ল দুটা ছেলের দিকে৷ ছেলে দুটা রাস্তার অপর পাশে ছিল, নৌমি আর আন্নিকে দেখে ইচ্ছেকৃত ওদের পাশে গেছে। একটা ছেলে যেতে যেতে নৌমির সাথে প্রায় ধাক্কা লেগে যাচ্ছে। ছেলেটা ইচ্ছে করে কনুই দিয়ে নৌমির পিঠে গুতা দিয়েছে। রাস্তার সাধারণ মানুষ ভেবে নৌমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে সরে আরেকটু চেপে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। অকস্মাৎ খেয়াল করল কেউ একজন দৌড়াচ্ছে। নৌমি আর আন্নি দু’জনেই রাস্তার দিকে তাকালো। সামনে দুটা ছেলে দৌড়াচ্ছে, পেছনে তাজ ছুটছে। বেশ খানিকটা সামনে গিয়ে তাজ ছেলে দুটার কলার চেপে ধরেছে। রাস্তার মাঝখানে দুই ছেলেকে ফেলে এলোপাতাড়ি ঘু*ষি দিচ্ছে তাজ। দু’পাশে রিক্সা, অটো থেমে জ্যাম লেগে যাচ্ছে। তাজকে দেখেই নৌমি আর আন্নি ছুটে গেল। দু’বোন টেনে হিঁচড়ে তাজকে সরাতে চাইলো কিন্তু তাজের রাগ আর আক্রোশের কাছে তাদের চেষ্টা বৃথা গেল। রাস্তার পাশের কয়েকটা ছেলে এসে কোনোরকমে তাজকে থামিয়েছে। একটু ছাড় পেতেই ছেলে দুটা উঠে দৌড়াতে শুরু করেছে। তাজ ক্লান্ত হয়ে রাস্তার মাঝখানেই ধপ করে বসে পরেছে। নৌমি আর আন্নি তাজের কাছে গিয়ে ডাকল,
“ভাইয়া।”
“ঐ ভাইয়া।”
“কি হয়েছে তোমার? “
তাজ আন্নির দিকে এক পলক তাকিয়ে পরপর নৌমির দিকে তাকালো। নৌমি চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,
“ছেলেগুলোকে মারছিলে কেনো?”
তাজ মলিন হেসে জবাব দিল,
” জানি না।”
চলবে……
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে সূচনা পর্ব
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২২+বর্ধিতাংশ
-
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে গল্পের লিংক
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১