#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে (২৩)
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
চারপাশে নিস্তব্ধতা। নৌমি অবাক দৃষ্টিতে তাজকে দেখছে। তাজের কথা শুনে তাজের আব্বুও আশ্চর্য বনে গেলেন৷ এরমধ্যে তাজের আম্মু এসেছেন। তাজকে এ অবস্থায় দেখে সত্বর এগিয়ে এলেন৷ নৌমির কাছাকাছি এসে থমথমে কণ্ঠে বললেন,
” কিরে তাজ, কি হলো তোর?”
আম্মুর প্রশ্নে তাজের নড়চড় দেখা গেল না৷ তাজের আব্বু কপালে ভাঁজ ফেলে ছেলেকে দেখতে লাগলেন। তাজ এলোমেলো শ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলে,
” আব্বু, প্লিজ তুমি আমাকে মাফ করে দাও।”
তাজের আব্বু তাজের চুলে হাত বুলিয়ে আস্তে করে বললেন,
” তোমার কি হয়েছে, আব্বু?”
“কিছু হয় নি। তুমি প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।”
“তুমি তো কোনো ভুল করো নি তাহলে মাফ চাচ্ছো কেনো?”
” আমি ভুল করেছি, আব্বু৷ অনেক বড় ভুল করেছি। যেই ভুলের মাশুল আমি সারাজীবন দিয়েও শেষ করতে পারব না। “
তাজের আব্বু, আম্মু দু’জনেই বিস্মিত। নৌমির দৃষ্টিতে আতঙ্ক। কি হয়েছে না হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছে না। তাজকে যে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে সুযোগও নেই। তাজের আম্মু তাজের কাছে এগিয়ে গেলেন। তাজের হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকতে লাগলেন,
” বাবা, কি হয়েছে তোর? কি ভুল করেছিস তুই? বল আমাদের।”
মামা- মামির চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখে নৌমি ঝটপট বলল,
” মামা, তুমি ভাইয়াকে মাফ করে দাও।”
তাজের আব্বু আড়চোখে নৌমির দিকে তাকিয়ে বললেন,
” তাজ করেছে কি এটায় তো বুঝতে পারছি না। ওর হয়ে তুইও মাফ চাচ্ছিস। সমস্যা কি? “
নৌমি আমতা আমতা করে বলল,
” না মানে, ছেলেটা এত করে মাফ চাচ্ছে তাই বললাম মাফ করে দাও। তোমার ছেলে কেনো মাফ চাচ্ছে আমি কি করে বলব!”
তাজের আব্বু তাজকে উদ্দেশ্য করে গুরুভার কণ্ঠে বললেন,
” হয়েছে হয়েছে, উঠো এখন। “
তাজ ফ্লোর থেকে উঠে আব্বুর পাশের সোফায় নৌমির মুখোমুখি বসলো। তাজের আব্বু পুনরায় বললেন,
“তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ আমার নেই। আমার চোখে আমার ছেলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছেলে৷ ভাগ্য করে তোমার মতো একজন ছেলে পেয়েছিলাম। আমার জীবনে অপ্রাপ্তি বলতে এখন আর কিছুই নেই। জীবনের সেরা প্রাপ্তি তোমার মায়ের মতো একজন মানুষ পাওয়া । যে বিপদে আপদে সবসময় আমাকে সাপোর্ট করেছে। তোমাদের মানুষ করার গুরু দায়িত্ব তোমাদের আম্মু একা হাতে সামলেছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি মন থেকে বলতে পারি, আমার ছেলে মেয়েরা আমার মনের মতো হয়েছে৷ বাবা হিসেবে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। তোমার বোনকে নিয়ে আমার আর কোনো চিন্তা নেই। তোমাকে নিয়ে একটু আধটু চিন্তা ছিল। তবে নৌমি মা আমাকে যেভাবে সাহস দিয়েছে, যেভাবে বুঝিয়েছে, এরপর তোমাকে নিয়েও আমার আর কোনো চিন্তা নেই। এখন শুধু একটাই ইচ্ছে তোমাদের দু’জনের বিয়েটা যত দ্রুত সম্ভব দিয়ে দিতে পারলেই খুশি।”
তাজ খুব মনোযোগের সহিত আব্বুর কথা শুনছে। আব্বুর মুখে নিজের প্রশংসা শুনে কিঞ্চিৎ হাসার চেষ্টা করল। তাজের আম্মু তাজের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে জানতে চাইলেন,
” তুই কি কোনো ভুল করেছিস বাবা?”
” ভুল করিনি আম্মু তবে অনেক বড় ভুল করতে যাচ্ছিলাম। হয়তো আল্লাহ নিজের হাতে ধরে বাঁচিয়ে দিয়েছেন আমাকে।”
” কি হয়েছে? একটু বুঝিয়ে বল।”
তাজ মৃদুস্বরে বলল,
” কিছু হয় নি আম্মু। তোমরা চিন্তা করো না। আসছি আমি।”
তাজ চুপচাপ নিজের রুমে চলে যাচ্ছে। নৌমি নিশ্চুপ। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না৷ কেবল তাজের হাঁটার দিকে চেয়ে আছে৷
তাজের আব্বু নৌমিকে জিজ্ঞেস করলেন,
” কিরে মা, তাজের কি হয়েছে?”
“আমি কি বলব! তোমাদের ছেলে কি আমাকে কিছু বলেছে নাকি?”
“তুই জিজ্ঞেস করবি না! তোকে না বললে আর কাকে বলবে! আজ নয়তো কাল তুই ওর বউ হয়ে এই বাড়িতে আসবি। তাজের পুরো দায়িত্ব তো তোকেই নিতে হবে।”
নৌমি মুচকি হাসলো। অতঃপর দু্ষ্টামির স্বরে বলল,
” আমি মনে হয় তোমাদের ছেলের বউ হতে পারব না।”
“কেনো?”
“না মানে এমনও তো হতে পারে তোমার ছেলের আমাকে পছন্দ না। তার অন্য কাউকে পছন্দ।”
তাজের আম্মু মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলেন,
” কি আবোলতাবোল বলছিস। তাজের অন্য কাউকে পছন্দ হবে কিভাবে! তোর সাথে বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেছে। তুইও জানিস তাজও জানে। তোদের সম্মতি নিয়েই সব ঠিক করা হয়েছে তাহলে আজ হঠাৎ এই কথা কেনো বলছিস?”
নৌমি গলা ঝেড়ে মিষ্টি হেসে বলল,
” আমি তো এমনেই বলছিলাম। তোমরা সবকিছুতে এত সিরিয়াস হয়ে যাও কেনো?”
তাজের আব্বু বললেন,
” তোমরা সিরিয়াস কথা বললে আমরা সিরিয়াস না হয়ে পারি না।”
“মামা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“হ্যাঁ, বলো।”
“আচ্ছা ধরো, তাজ ভাইয়ার অন্য একজনকে ভালো লাগল। বিয়ের জন্য সে মেয়ে একদম পারফেক্ট। তাদের দুজনকে বেশ ভালো মানায়। তখন কি করবে? ঐ মেয়ের সাথে ভাইয়ার বিয়ে দিবে না?”
তাজের আব্বু মৃদু হেসে বললেন,
” তোর মাঝে কিসের কমতি আছে বল তো! তাজের সাথে তোকে মানায় বলেই তোদের বিয়ে ঠিক করেছি আমি। তুই নিজেকে সবসময় ছোট মনে করিস কেনো? আর পাঁচটা মেয়ের থেকে তুই কোনো অংশে কম না। বুঝতে পেরেছিস?”
“জি জি। বুঝতে পেরেছি, মামা। সত্যি কথা বলতে তোমরা আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসো তো তারজন্য তোমাদের চোখে আমাকে পরীর মতো লাগে কিন্তু বাস্তবে আমি পরীর প এর মতোও না। “
” কে বলেছে?”
“আমি বলেছি। শুনো, সুন্দরী মেয়েদের কিছু গুণাবলি থাকে। যেমন ধরো তাদের চোখ থাকে টানা টানা, কাজল দিলে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করবে। মাথার চুল থাকবে ইয়া লম্বা। ভেজা চুল ছেড়ে কারো সামনে আসলে এক দেখায় পাগল হয়ে যাবে৷ কথা বলবে গুছিয়ে, সবসময় শাড়ি পড়ে ঘুরঘুর করবে৷ বাড়িতে ঢুকার আগেই বুঝা যাবে এই বাড়িতে নতুন বউ এসেছে। অথচ দেখো, আমার মধ্যে এর একটা গুণ ও নেই। আমার চুল কাঁধ থেকে নামতেই চাই না৷ চুলের আগায় ইট বেঁধে রাখলেও লম্বা হবে বলে মনে হয় না! আমার চোখ দেখো, সুন্দরের কোনো কাতারেই পরে না। গুছিয়ে কথা বলা তো আমার কাছে বিলাসিতা। আর শাড়ি পড়ে ঘুরঘুর করা! হাহাহাহা। এক ঘন্টায় ৭ বার উষ্ঠা খাব পরের ঘন্টায় হাসপাতালে থাকতে হবে। এখন তোমরাই বলো, আমি কি ভুল কিছু বললাম?”
তাজের আব্বু চোখ সরু করে নৌমিকে দেখছেন। মেয়েটা সত্যিই অগোছালো। কথা বলার সময় ভেবে কথা বলা তার স্বভাবেই পড়ে না। ছোট থেকে সবার ভালোবাসা পেতে পেতে বড্ড বেশি আদুরে হয়েছে। যখন যাকে ইচ্ছে যা খুশি বলে দিতে পারে। তাজের আব্বু রাগী স্বরে বললেন,
” তোর মুখে এসব কথা যেনো আর কোনোদিন না শুনি। কথাটা মনে থাকবে?”
নৌমি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
” আমি তো সত্যি কথায় বলেছি।”
“সত্যি মিথ্যে কিছুই শুনতে চাই না আমি। তুই আমার ছেলের বউ হবি মানে তুই ই হবি। আমি তোকে কোনোদিন কারো সাথে তুলনা করিনি৷ আর করতেও চাই না। আমার ছেলের বউয়ের ব্যাপারে কে কি বলবে সেটা আমি দেখব!”
নৌমি কথা ঘুরানোর জন্য দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
” কারো বলতে হয় না৷ তোমার ছেলেই দিনে ১০ বার করে বলে।”
” ঠিক আছে৷ তাজকেও শাসন করব আমি।”
“তাহলে ঠিক আছে। যাই দেখে আসি, ভাইয়া কি করছে!”
★
শুভ্র আজ বেগুনি রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে৷ শুভ্রর সাথে রঙ মিলিয়ে মিশুও আজ বেগুনি রঙের শাড়ি পড়েছে৷ সেই দুপুর থেকে শুভ্রর সাথে ছবি তোলার জন্য পিছন পিছন ঘুরছে। কিন্তু শুভ্র বারবার এড়িয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে মিশুকে দেখলে ঐ রাস্তাতে পা ই বাড়ায় না৷
সন্ধ্যার পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে৷ মেহমানরা ধীরে ধীরে যাওয়া শুরু করেছে। শুভ্র ফোন হাতে উঠোনের এক কোনে বসে আছে৷ বিকেল থেকে নৌমিকে অনেকগুলো কল করেছে কিন্তু একটা কলও রিসিভ করছে না।
এরমধ্যে মিশু ছুটে আসলো। শুভ্রর সামনে একটা চেয়ার টেনে বসল। শুভ্র আড়চোখে মিশুকে একবার দেখে পুনরায় ফোনের স্ক্রিনে তাকাল৷ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
” কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ।”
” বলো।”
“তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। মাশা-আল্লাহ।”
” ধন্যবাদ৷ আর কিছু?”
“আমাকে কেমন লাগছে বললে না?”
শুভ্র ধীর কণ্ঠে বলল,
“খেয়াল করিনি। “
“এখন করো।”
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
” কি করব?”
“খেয়াল করো। কেমন লাগছে বলো।”
শুভ্র না তাকিয়েই বলল,
” ভালো লাগছে। “
মিশু শাড়ির আঁচল টেনে নিজের মুখ ঘুরে রাগী স্বরে শুধাল,
” না দেখেই বলে দিলে ভালো লাগছে৷ তাহলে এবার বলো, আমার ঠোঁটে দেওয়া লিপস্টিকের রঙ কি?”
শুভ্র মুখের উপর জবাব দিল,
” লাল খয়েরী।”
#চলবে…..
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৪
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৯
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৭