Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯৪(শেষাংশ)


#জাহানারা

#জান্নাত_মুন

পর্ব :৯৪(শেষাংশ)

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

পাতালপুরীর ন্যায় আঁধারে ঢাকা পড়ে আছে যন্ত্রিক শহর। রাতের শেষ প্রহরে এসে প্রকৃতির চিরাচরিত শান্তশিষ্ট স্নিগ্ধ রূপ অপ্রসিদ্ধ এক বাসনায় উন্মত্ত হয়ে ওঠেছে। সেই উদগ্র আ’ক্রোশে এক দানবীয় হিং’স্রতায় উত্তাল করে দিতে চাইছে সব। বুনো দখিনা হাওয়ার দাপট লণ্ডভণ্ড করে দিতে চাইছে প্রকৃতির সুশৃঙ্খল। ত্রস্ত হয়ে অমানিশার গূঢ় চাদরে মুখ লুকিয়েছে উদিত একফালি রুগ্ন রুপোলী চাঁদ। তমসাচ্ছন্ন গগনে ক্ষণে ক্ষণে চাবুক মারছে বিদ্যুতের নীল ঝলকানি। সেই হুংকারের বজ্রকণ্ঠে কেঁপে উঠছে নিস্তব্ধ নিশুতি রাতের আকাশ-পাতাল। অথচ প্রকৃতির এই প্রলয়ংকরী নৈরাজ্য ছুঁতে পারল না মাফিয়া বসকে। কারণ সে নিজেই এক দুর্বোধ্য ত্রাস। বাস্তব হয়েও সকল বাস্তবতার উর্ধ্বে এক রহস্যময় অশুভসত্তা। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে নৃ’শংস’তা, নি’র্ম’মতা। যেন সে মৃ’ত্যুকে নয়, বরং মৃ’ত্যু পর্যন্ত তাকে ভয় করে। সে নিজেই মরিচীকার অতলে আচ্ছাদিত এক প্রহেলিকা।

তবে আজ আর এই হিং’স্র রুঢ় মানবের ইচ্ছে হলো না নিজের দানবীয় ব’র্বর সত্তার নি’ষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ করতে। অন্যথায় হয়তো তার সাথে এই দুরূহ ছলনার পরিশিষ্ট হিসেবে নি’র্মম শাস্তি ফিরিয়ে দিত। কিন্তু এখন কাকে দিবে? অহর্নিশ যার অঘাধ বিচরণ এই হৃদয়হীন মাফিয়া বসের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে। হৃদয়হীন! উহু, হৃদয়হীন হলে কি আর তার কদাচিত পাষণ্ড অন্তরে এক নারীর প্রতি সুতীব্র মোহ জন্মাত! সেই অপরূপা নীলাঞ্জনার পানে একবার দৃষ্টি রাখলে খেই হারাতো কি তার মতো ধূর্ত শাসকের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক! আর নাতো থমকাতো তার অবাধ্য হৃৎস্পন্দন। যে নারী তার হৃদয়হীন অন্তরে প্রাণের সঞ্চার করলো, যার উপস্থিতিতে একজন পাষণ্ডকে এক লহমায় লক্ষ্যচ্যুত করে দিতে সক্ষম, তবে তাকে কি করে শাস্তি দিবে মাফিয়া বস?

উহু পারবে না। এই দুরূহ সাধ্যি মাফিয়া বসের নেই। তাই তো তার প্রকাণ্ড দাবানলের অ’গ্নিগিরির ন্যায় অত্যুষ্ণ ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল নিমিষেই হিম হয়ে আসল। অন্যথায় তার অক্ষিপটের সেই লেলিহান অ’গ্নিশিখা হয়তো সব ভস্ম করে দিত। নিজের আ’ক্রোশ মিটাতে ধ্বং’সযজ্ঞ চালাতো পুরো বিশ্বজুড়ে। যে যুবক তার ধূর্ত আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অল্প বয়সেই তৈরি করেছে নিজের পাপের সাম্রাজ্য। যার আধিপত্য শুধু ফ্রান্সেই নয়, দেশের বাইরেও বিশ্বের নানান দেশে বিস্তার ঘটিয়েছে তার সহস্রাধিক বৈধ-অবৈধ ইন্ডাস্ট্রির। নাম লিখিয়েছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালীদের তালিকার শীর্ষে, হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অধিপতি। যার সামান্যতম কোপানলের ভয়ে সর্বদা তটস্থ হয়ে প্রতিনিয়ত পা চাটে বিশ্বের শীর্ষস্থায়ী নেতারাও। যে জনসম্মুখে দু’ষ্কৃীতি করে বেড়াতেও পরোয়া করে না, যার এক ইশারায় কেঁপে ওঠে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড, তাকে কিনা বাংলাদেশের সামান্য একদল সেনা সদস্য আটক করবে! বিষয়টা মাফিয়া বসের কাছে চরম হাস্যকর প্রহসন ঠেকল!

এত ধূর্ততা আর ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্বেও এই মূহুর্তে নিজের বি’ধ্বংসী শক্তির আস্ফালন দেখাতে বিন্দুমাত্র সাধ জাগল না এই বেপরোয়া মাফিয়া বসের। তার কিছুক্ষণ আগের ক্ষোভও উদ্দাম ঝড়ো হাওয়ার সাথে মিইয়ে গেছে। শৈত্য দৃষ্টি তার সম্মুখে। তার একমাত্র দুর্বলতার পানে। যার জন্য নিজের দানবীয় ব’র্বর সত্তাকে আড়াল করে সার্বক্ষণ কোমলত্বের মিথ্যাে খোলস পরে থাকার ক্ষুদ্র প্রয়াস চালাতো। এত করেও কিছু কি যায় আসল সেই নারীর! না! সেইতো মাফিয়া বসের দুর্লবলতাকে পুঁজি করে নিজেই মা’রণাস্ত্র হয়ে দাঁড়াল। তবে তার সখের দ্রোহী নারী জানে কি পৃথিবীর কোনো শক্তির কাছে পরাজিত না হওয়া মাফিয়া বস তার একমাত্র দুর্বলতার প্রতিই বারবার পরাজিত হয়ে বসে আছে। ধূলিসাৎ করেছে তার সকল দৃঢ়তা আর আত্মসংযম। তছনছ করে শতধাবিদীর্ণ করেছে তার সকল অহমিকার দেয়াল। কঙ্কালসার করে ছেড়েছে তার সমস্ত প্রতাপ আর আধিপত্যকে। তত্র নতুন করে তার কাছে আবার কিসের পরাজয়!

ঝড়ো হাওয়ার ডানায় ভর করে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিরা মেতে উঠেছে এক বুনো নৃত্যে। আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে সকলের গা। এদিকে বন্দুকের গান পয়েন্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইফান। সে আমাকে তার দিকে রিভলবার তাক করে ধরে রাখতে দেখে নির্লজ্জ ঔদ্ধত্যে অধরকোণ বাঁকাল। সেখানে ভেসে উঠল এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি। অতঃপর ইফান ধীরপায়ে আমার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে এগিয়ে আসতে লাগল নিদারুণ আঙ্গিকে। বারংবার মাইকিং-এ ইফানকে নিষেধ করা হচ্ছে নিজ জায়গা থেকে অনড় থাকতে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো আইন কি আর এই বেপরোয়া দানবকে দমাতে পারে? সে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগোতেই থাকল। বিধায় ইফান দু কদম এগোতে না এগোতেই আচমকা একটা বুলেট এসে সশব্দে বিঁধল তার বাম পায়ে। সহসা পায়ের গতি নড়বড় হয়ে গেল ইফানের। পলক কাইসার সহ সকলে আঁতকে উঠল। পলক কাইসার এবং ইফানের অনুগত সশস্ত্র বাহিনী ক্ষি’প্র গতিতে তাদের রিভলবার তাক করল আইনের সেই বিশাল বাহিনীর দিকে। এক চুল এদিক-ওদিক হলেই লা”শের পাহাড় জমে যাবে! অথচ ইফান নির্লিপ্ত, কোনো দিকে দৃষ্টিপাত না করেই হাত উঁচিয়ে ফেলল। মাফিয়া বসের আদেশক্রমে সকলে নিজ জায়গা থেকে এক বিন্দু নড়ল না। মা’রণাস্ত্র পর্যন্ত নিচে নামাতে বাধ্য হলো।

ইফান উপুড় হয়ে পড়তে গিয়েও নিজের দেহের ভারসাম্যকে সামলে নিল। দৃষ্টি উপরে তুলে আমার পানে তাকাল। আমার কঠিন খোলসে আবৃত মুখাবয়ব দেখে তার ক্ষুরধার চোখের মণিকোঠায় এক অদ্ভুত হাসি খেলে গেল। আমি ঢোক গিললাম। আমার অতর্কিত চাউনি দেখে ইফান ঠোঁট বাঁকিয়ে মাদকতা মেশানো হাস্কি কণ্ঠে আওড়াল,

–“তবে কি আমাকে ধ্বংস করার জন্যই তোমার এত আয়োজন!”

আমার থেকে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে অকস্মাৎ হাতে ধরে রাখা রিভলবারটা অবেলায় জমিনের বুকে ছেড়ে দিল ইফান। আমার দিকে দৃষ্টি স্থির করে রাখা তার ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল এখনো রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে। তবে তার সেই চোখের তারায় কোনো ক্ষো’ভ নেই, বিদ্বেষ নেই, কেবল আছেমাত্র একরাশ শীতলা, নিগূঢ়তা।

পায়ে গু’লিবিদ্ধ স্থান থেকে অনর্গল র’ক্তক্ষরণ হচ্ছে, অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে ইফান তার বেপরোয়া ভঙ্গিতে আমাকে গভীর নেত্রে দেখতে দেখতে এগিয়ে আসতে লাগল। তার অধরকোণ জুড়ে লেপ্টে রইল একই হাসির রেশ। এহেন উদ্দীপ্ত মুহূর্তেও লোকটা ভাবলেশহীন। যেন তার চারপাশে কিছুই হচ্ছে না। সবটাই যেন তার নিকট নিছক মশকরার ব্যাপার। গা ছাড়া ভাব নিয়ে সেভাবেই ইফান নি’র্লজ্জের মতো অধরকোণে হাসি ঝুলিয়ে রেখে ধীর কদম ফেলে এগিয়ে আসতে আসতে পুরুষালি গমগমে ভরাট হাস্কি গলায় মৃদু গুঞ্জনে সুর তুলল,

“হৃদয়ও মাঝারে পুষলাম কত আদরে

তুমি বন্ধু আপন চিনলা না…”

ইফান এসে আমার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল একদম সন্নিকটে। তার দিকে তাক করে ধরে রাখা আমার রিভলবারের নিশানার পানে একপলক তাকাল সে। অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে এক চিলতে অধর বাঁকিয়ে এক লহমায় বন্দুকের নিশানা বদলে দিল। বন্দুকের নল ধরে নিজের বুকের বাঁ পাশে ঠেকাল। আমি ভ্রুকুটি করতেই ইফান ফের অদ্ভুত রকমভাবে নিঃশব্দে হাসল। অতঃপর আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে ট্রিগারে ধরে রাখা আমার আঙুলে নিজের রুক্ষ আঙুলের চাপ বসাল। অবিলম্বে গু’লির বিকট আওয়াজে স্থবির হয়ে গেলে চারপাশের মহাকাল। এক লহমায় উবে গেল আমার মুখশ্রীর কঠোরতা। স্তব্ধ হয়ে গেলোম আমি। অজানা শঙ্কায় কেঁপে উঠল আমার বুক। ত্রস্ত নেত্রে ইফানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর বুকের দিকে তাকালাম। সহসা আমার শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। ওর ইস্পাতের ন্যায় কঠিন ঢেউ খেলানো চওড়া বক্ষ হতে অনর্গল তাজা লাল র’ক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আমার তটস্থতা দেখে ইফান সহাস্যে ফের পরবর্তী সুরটুকু তুলল,

“এ পাগলের ভালোবাসার স্বভাব

একদিন পোড়াবে আমার অভাব..!!”

বলতে গিয়ে পথিমধ্যে কখনো বা কম্পিত হলো তার কণ্ঠনালি, কখনো বা শুনাল বড্ড হৃদয়স্পর্শী। আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল অযাচিত আশঙ্কায়। তাই ত্বরিতে ইফানের মুখের দিকে তাকালাম। আমার ভীত হরিণীর ন্যায় তটস্থ অতর্কিত চাউনি দেখে ইফান ফের অদ্ভুত রকম হাসল। আমার বন্দুক ধরে রাখা হাতটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমি সিক্ত আর আতঙ্ক ভরা নেত্রে ইফানের র’ক্তাক্ত বক্ষপঞ্জর দেখে দ্রুত হাত সরিয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু ইফান সেই ফুরসতটুকু না দিয়ে আরও শক্ত করে বজ্রমুঠিতে চেপে ধরল আমার হাত। সহসা তার বুকে আরও ঠেসে বসল মা’রণাস্ত্রের নল। আমার সিক্ত নেত্রের ভাষা বিন্দুমাত্র অনুধাবন করার চেষ্টা না করে আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে আবারও তার খরখরে আঙুল ট্রিগারে রাখা আমার আঙুলের উপর চাপ বসাল। ফের গু’লির তীব্র আওয়াজে কেঁপে উঠল নিঝুম নিস্তব্ধ রাতের চরাচর। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ।

আমি ইফানের র’ক্তাক্ত বুকে দৃষ্টি ঘুরাতে গিয়েও গুলির বিকট শব্দে পলকে ইফানের বৃষ্টিস্নাত মুখাবয়বের দিকে দৃষ্টি রাখলাম। আমি তাকাতেই একই রকমভাবে নি’র্লজ্জ ভঙ্গিতে ওষ্ঠপুট প্রসারিত করল ইফান। অতঃপর তক্ষুনি লোকটা গড়গড়িয়ে মুখ ভর্তি র’ক্ত বমি করে দিল। আচমকা ইফানের বন্দী হাত থেকে খসে পড়ল আমার পেলব হাতখানা, জমিনে সশব্দে আঁছড়ে পড়ল হাতে ধরে রাখা ব’ন্দুকটি। চোখের পলকেই আমার সম্মুখে দু হাঁটু গেড়ে মাথা নুইয়ে বসে পড়ল স্বয়ং মাফিয়া বস। তাজা লাল তরলে ভেসে যাচ্ছে তার কালোয় মুড়ানো দানবীয় অবয়ব। মাহিন, মীরাদের চিৎকার করা আর্তনাদ ভেসে এলো। এদিকে সকলে ছুটে আসতে নিলেই ফের হাত উঁচাল মাফিয়া বস। মুখ না ঘুরিয়েই আঙুলের ইশারায় এদিকে আসতে সকলকে কঠোরভাবে মানা করল। তাতে সকলে তটস্থ হলো। কিন্তু কেউ সাহস দেখাল না আসার।

আমি যেন এই মূহুর্তে জীবন্ত কলের পুতুল! চাইলেও নিজের দেহকে বশ মানিয়ে নড়াচড়া করার বোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি। ইচ্ছে হলো ইফানকে বুকের সাথে ঝাপটে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে। কোথায় লেগেছে তা দেখতে। তবে আমার সেই সামর্থ্য আর কই! নিশ্চল দেহ ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। নিস্প্রভ দৃষ্টি সামনে স্থির।

হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে আলগোছে র’ক্তে মাখামাখি অধরযুগল মুছে নিল ইফান। নিশক্তি হয়ে আসা দুর্বল র’ক্তাক্ত হাতখানা উপরে তুলে অকস্মাৎ আলতো করে অতিসন্তপর্ণে ছুয়ে দিল আমার বাড়ন্ত উদর। অতঃপর আমার দিকে তাকিয়ে খুব খায়েস করে উচ্চারণ করল আদর করে তার দেওয়া আমার ডাকনাম, কম্পিত গলায় বলে উঠল,

–“বুলবুলি! আমার র’ক্ত বলে ওকে অবহেলা করো না। মানলাম পৃথিবীর সবচেয়ে জ’ঘন্য, ব’র্বর আর নি’কৃষ্ট এক পাপিষ্ঠ আমি, কিন্তু ও তো নিষ্পাপ। আমার শাস্তি ওকে দিও না৷”

‘আমার রক্ত’ শব্দ দুটো শুনা মাত্রই কোনো একটা অসুরিক থাবা এসে খামচে ধরল আমার বুক। অদৃশ্য এক জড়তার বন্ধন আমায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। বিধায় আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলাম না। শুধু গড়িয়ে পড়ল আমার চোখের তপ্ত নোনাজল। আমার প্রত্যুত্তর না পেয়ে ইফান ফের উদ্ভট হাসল। মুখে তার লেপ্টে আছে তাজা র’ক্ত। এতক্ষণে তার সুশ্রী বদনখানি মলিনতায় ঢাকা পড়েছে। এত র’ক্তক্ষরণে নজরকাড়া তার টগবগে বদনের স্বীয়রঙ বিলীন হয়ে এখন ফিকে ঠেকছে। তবুও তারমধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা লেশমাত্র নেই। সে আমার উদরের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সহাস্যে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,

–“আমার সোনা মা। আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ১ বছর ৩ মাস ২৬ দিন ৪ ঘণ্টা…

এইটুকু বলে থামল ইফান। নিরস হয়ে আসা অপর হাতটা হালকা উঁচিয়ে সেদিকে হাতঘড়িতে সময় দেখে জুড়ে দিয়ে বলল,“বারো মিনিট, বত্রিশ সেকেন্ড তোমার মায়ের সাথে কতই না কথা হলো। আজ আর থাক না! শেষ কথাগুলো তোমার সাথেই বলি।

এইটুকু বলতে গিয়েই নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল ইফানের। একবিন্দু অক্সিজেনের তাড়নায় তার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। র’ক্তিম বর্ণ চোখদুটো তার ছলছল করে উঠেছে। কিন্তু মাফিয়া বস নিজের দুর্বলতা, তার হার প্রকাশ করতে নারাজ। তাই আড়ালে শুকনো ঢোক গিলল। সহাস্যে কাতর গলায় হিসহিসিয়ে নিজ অনাগত সন্তানের কাছে অনুযোগের ন্যায় বলতে লাগল,

–“আমার এই অশুভ কালো দুনিয়ায় তোমার মাম্মা এক রক্তিম আভায় জ্বলজলিত পবিত্র আলোর শিখা। সে এক ভয়ংকর নারী। পৃথিবীর সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে আমার ইস্পাতের ন্যায় কঠিন বক্ষে ফুল ফুটাল। এই কলুষিত আন্তরটা সুভাষিত করলো। অথচ তার তনু বুকে আমার জন্য একবিন্দু ভালোবাসা জন্মাতে পারলাম না।

সে যে অগ্নীকণ্যা। পাপ-পাপী দুটোকেই যে সে বড্ড ঘৃণা করে। আর আমি যে এক আস্ত পাপের পাহাড়। মরিচীকার অতলে আচ্ছাদিত এক অশুভ সত্তা। যে তার মা ছাড়া পৃথিবীর সকলের থেকে শুধু ঘৃণায় কুড়ালো।

আজ আমার সেই মাও নেই। কিন্তু তুমি তো আছ, তুমি তো আমার আরেক মা,তাই না? আমার নিজের র’ক্ত। তোমাকে সেইভ রাখতে তোমার মায়ের থেকেও তোমার অস্তিত্ব আড়াল করে রেখেছিলাম।

বাট! বাট আই ফিল লাইক আই ওউন্ট বি অ্যারাউন্ড টু প্রোটেক্ট ইউ আফটার টুডে।

হয়তো তুমি একদিন পৃথিবীতে আসবে, সেদিন আমি বোধহয় তোমার পাশে থাকব না। আর সবার মতো তুমিও ঘৃণা করো না আমায়। এই সহ্যক্ষমতা আমার নেই।

আমার অবর্তমানে খেয়াল রেখো তোমার মাম্মার। ও ভীষণ বোকা নারী। আমার নির্বোধ আগুনপাখি। সে নিজের আগুনে নিজেই পুড়ে। আর ওকে পুড়তে দেখলে আমার বুকও পুড়ে। একদম ওকে আর কষ্ট পেতে দিও না। ভালো থেকো তোমরা। পারলে পাপাকে মাফ করে দিও। আর যদি কখনো ইচ্ছে হয় তবে পাপাকে মনে করো। পাপা উইল অলওয়েজ বি বাই ইয়োর সাইড, মাই প্রিন্সেস।”

নিভে এলো মাফিয়া বসের ক্লান্ত কণ্ঠ। রুদ্ধ হয়ে আসল শ্বাস-প্রশ্বাস। অনবরত র’ক্তক্ষ’রণের ফলে অবর্ণনীয় য’ন্ত্রণায় কপিশাভে রূপ নিল তার মলিন মুখশ্রী। মরিচীকার গোলকধাঁধায় স্থবির হয়ে আসল মস্তিষ্ক তার। অন্ধকার পুড়ে তাকে কেউ হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল অনবরত। ইফান না চাইতেও কুহেলিকার সেই ইন্দ্রজালে হারিয়ে যেতে লাগল। বুঁজে এলো তার র’ক্তাভ সিক্ত চোখ। তবুও এই বেপরোয়া লোকের অধরকোণের হাসির রেশ সরল না। বুঝতে দিল না তার অন্তর্দাহ। শেষ একটিবারের জন্যও তাকালো না আমার দিকে, ডাকল না আদুরে ডাক নাম ধরে। মিটালো না আমার এই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের তৃষ্ণা। গোলকধাঁধার চোরাবালিতে তলিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ইফান ঠোঁট বাড়িয়ে ছুয়ে দিল আমার বাড়ন্ত উদর। শেষ বারের মতো নিভে আসা ক্ষীণ, কাঁপা গলায় আওড়াল,

–“গুডবাই!”

অতঃপর আমার উদরেই ঢলে পড়ল এই বেপরোয়া দু’র্বোধ্য মাফিয়া বস। প্রকৃতির উশৃংখল রূপ আরও তেজস্বী হয়ে ওঠল। বাতাসের প্রবল ঝাপটায় সবকিছু তছনছ করে দিতে মত্ত হয়ে ওঠল যেন। আর সেই প্রলয়ের মাঝেই, দূর-দূরান্তের চতুর্দিক থেকে ভেসে এলো ফজরের পবিত্র আজানের ধ্বনি। আকস্মিক নামা বারিবর্ষণে ভিজে উঠলাম আমি৷ ভিজে উঠল মাফিয়া বসের র’ক্তস্নাত দেহ। প্রকৃতি যেন এক পাপিষ্ঠের বিদায়ের সাথে বর্ষণের প্রবল ধারায় ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চাইছে দুনিয়ার সকল পাপ, অন্যায়, নি’ষ্ঠুরতা। মুছে দিতে উন্মাদ হয়ে উঠল মাফিয়া বসের অস্তিত্বকে। আমি তখন বাকহারা, স্তব্ধ, স্তম্ভিত, বোধহীন, বিমূঢ়, পৃথিবীর সকল বাস্তবতার বাহিরে।

এই অবেলার বর্ষণে উপস্থিত সকলে ভিজে উঠল। সকলে নীরব স্বাক্ষী হলো এক দু’র্বোধ্য, দু’র্ধর্ষ অশুভ স্বত্তার বি’নাশের। কয়েক মূহুর্ত পার হতেই চারপাশে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো৷ সেনাবাহিনীরা এরেস্ট করল সকলকে৷ চারজন সেনা এগিয়ে এসে আমার উদরে লেপ্টে থাকা নিথর দানবীয় দেহটাকে তুলে নিয়ে যেতে লাগল। আমি পাথরের মতো স্থির দাড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম একাগ্র দৃষ্টিতে। ওরা ইফানকে ধরে অবেলায় নিয়ে যাচ্ছে। কোনো এক মোহগ্রস্ত বেড়াজালের অন্তঃপুরে বন্দি থেকে আমি শুধু দেখেই গেলাম লোকটার শান্ত মুখশ্রী। এখনো এই বেপরোয়া লোকটার অধরকোণে লেগে আছে সেই রহস্যময় হাসির রেশ। বিদায়ের বেলায়ও মনে হচ্ছে আমাকে তাচ্ছিল্য করে হাসছে।

দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল আমার। বুকের উপর কেউ বোধহয় পাথর চাপা দিয়েছে৷ বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। সেদিন সকলে দেখল আমার বাহ্যিক রূপ, কেউ দেখল না অন্তরের যাতনা। শুনলো না দাবালনের ন্যায় জ্বলে-পু’ড়ে ছারখার হতে থাকা হৃদয়ের আর্তনাদ। ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে ইফানকে নিয়ে চলে গেল সেনা চারজন। ক্ষনিকের মধ্যে প্রকৃতির অযাচিত ক্ষো’ভও ঝরে গেল। চারপাশের সব কোলাহল আমার কর্ণদার অব্ধি আর পৌঁছাতে পারল না। এক পাপিষ্ঠ সত্তার বিদায়ের সাথে নিশ্ছিদ্র কালো অন্ধকার মিইয়ে ধীরে ধীরে দিগন্তজুড়ে নবজাতক সূর্যদ্বয়ের লালিমা রেখা ভেসে উঠতে লাগল।

বি’ধ্বংসী, রূঢ়, জা’নোয়ারের ন্যায় নি’কৃষ্ট মাফিয়া বস এখন শান্ত। এক অসমাপ্ত ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছে। আর কখনো এই আমার জন্য ধরফরিয়ে নিদ্রাভঙ্গ করবে না। আমাকে মন ভরে দেখার জন্য নির্ঘুম রাত কাটাবে না। আমাকে আদর করে বুলবুলি ডাকবে না। আমার রা’গকে উস্কে দিতে ঝাঁঝওয়ালিও ডাকবে না। আর না তো আমার কষ্ট লাঘব করতে ডাকবে আগুনপাখি। আর বলবে না মন খুলে কাঁদতে। আর ছটপট করবে না আমাকে এক পলক দেখতে। সে এবার অভিমানী ঘুম দিয়েছে। গভীর ঘুম, যে ঘুমের শুরু আছে, শেষ নেই।

আমার চোখের সামনে সব ঝাপসা ঠেকছে। ধীরে ধীরে বিভীষিকার অতলান্তে তলিয়ে যাচ্ছি। মাফিয়া বসের নিথর দেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। সেই তখন থেকে দমিয়ে রাখা বাঁধন ছিড়ে এসে মনিবের নিথর দেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে আর্তনাদ তুলে কাঁদতে কাঁদতে উন্মাদের মতো দিশেহারা হয়ে ছুটতে লাগল ব্রুনো। সেই সাথে আঁধার পুড়ে নতুন দিনের সূচনা ঘটল। গোটা পৃথিবী জেগে উঠল। উঠল না শুধু সে। অভিমানী পুরুষ বুঝল না আমায়, বুঝল না আমার না বলা কথাগুলো, দেখল না আমায় পুড়তে। কথা দিয়েও কথা রাখল না, ফাঁকি দিল। বুঝল শুধু নিজের স্বার্থ, নিজের ইগো, নিজের জিত। করে দিল আমায় এই নশ্বর দুনিয়ায় নিঃস্ব, একা আর অসহায়। বানালো অপরাধী। তার শেষ বিদায় বেলা একই জায়গায়, একইভাবে অনড় হয়ে থমকে রইলো আমার সমগ্র পৃথিবী। চোখের সামনে থেকে অ্যাম্বুলেন্সও মিলিয়ে গেল। কোনো এক গোলক ধাঁধাঁর মারপেঁচে থমকে রইল এই মস্তিষ্ক, এই পুড়ন্ত হৃদয়, ছলছল করা জ্ব’লন্ত নেত্রযুগল। অতঃপর চোখের সামনে সবকিছু ধোঁয়াশা হয়ে উঠল। বুজে এলো আমার ভেজা দু’নয়ন। তারপর….

*

*

*

………..বর্তমান………

–“তারপর!”

রোদনভরা, কম্পিত গলায় কোনোমতে শুধাল নাদিয়া। জাহানারার নিজ মুখে বলা তার জীবনাতীত শুনে কাঁদতে কাঁদতে বেচারি নাদিয়ার পেলব মুখশ্রীখানা ফোলে ঠসঠসে রুপ নিয়েছে। নাকের জল চোখের জল মিলেমিশে একাকার। সে আলগোছে হাতের উল্টো পিষ্ট দিয়ে নাক মুছে জাহানারাকে শুধালেও জাহানারা সহসা কোনো প্রত্যতুত্তর করে উঠতে পারল না। দীর্ঘক্ষণ নিজের ফেলে আসা বিভীষিকার ন্যায় অন্ধকার জীবনের বিষাদময় পাতাগুলো পড়ে শুনিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল সে। স্মৃতিগুলোর অতলান্ত চাদর গায়ে জড়াতেই, তার শতধাবিদীর্ণ ভাঙা হৃদয়ে যেন নতুন করে ফাটল ধরল। কমলাকান্তের ন্যায় বসে দু’হাটু জড়িয়ে ধরে সেথায় মুখ গুঁজে ফুপিয়ে যাচ্ছে সে অনবরত। সেভাবেই মুখ না তুলে ভাঙা সিক্ত গলায় আওড়ালো,

–“তারপর সে আর আমার কাছে ফিরে এলো না। আর ফিরে এলো না আমার কাছে।”

হুহু করে কেঁদে উঠল রমণী। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নাদিয়াকে। কন্দনরত ভাঙা গলায় উন্মাদের মতো বলে উঠল,“সেদিন আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। দিন তিনেক পর যখন আমার জ্ঞান ফিরে তখন ওকে আমি আর কোথাও দেখতে পেলাম না।

ওকে শেষ একটি বারের জন্যও আমাকে কেউ দেখতে দিলো না। দিল না কেউ দেখতে! তার আগেই ওর সব অস্তিত্ব মুছে দিল।”

দীর্ঘদিন ধরে মনের গহীনে লুকিয়ে রাখা বিষাদগ্রস্ত অনুভূতিগুলো কাউকে বলে নিজের বহিস্থ কৃত্রিম কাঠিন্যের আবরণকে আর ধরে রাখতে পারল না জাহানারা। এতদিনের গড়া ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার খোলস ভেদ করে অবাধ্য ঝরনার মতো বেরিয়ে এলো তার লুকানো সমস্ত দুর্বলতা। কম্পিত হতে লাগল তার পেলব দেহখানা। জাহানারার এহেন তটস্থ অবস্থা দেখে সংবিৎ ফিরল নাদিয়ার। চটজলদি নিজের চোখমুখ মুছে জাহানারাকে দু’হাতে আগলে ধরল। জাহানারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্দীপ্ত গলায় বলে উঠল,

–“এই জাহান পাগল হয়ে গেছিস তুই? কান্না থামা বলছি। নিজের শরীরের অবস্থা দেখেছিস? এমন পেট নিয়ে কেউ এভাবে কাঁদে!”

নাদিয়ার বাক্য কর্ণদারে পৌঁছাতেই থমকাল রমণী। বুকের যাতনা হুড়মুড়িয়ে বেড়ে গেল শতগুণ। সত্যিই তো, সে তো আর একা নয়, তার গর্ভে বেড়ে ওঠছে মাফিয়া বসের শেষ চিহ্নটুকু। সেই বেপরোয়া পুরুষ তার এই অস্তিত্বটুকু রক্ষা করতে কতই না ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিল। অথচ গর্ভধারণী জাহানারা জানতেই পারল না সেই অভিশপ্ত রাতে যখন তারা খুব ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, দীর্ঘদিনের মান-অভিমানের দেয়াল ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল, সেদিনই মাফিয়া বস তার দৃঢ়তার আড়ালে পুষে রাখা সুপ্ত অজস্র অনুভূতি নিয়ে স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছিল, জাহানারার উদরে বেড়ে উঠতে থাকা নিজের অস্তিত্বের কথা। অগত্যা মেয়েটা তখন অবসন্নতায় গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গিয়েছিল। তাই শুনতে পায়নি রূঢ় মানবের মোহাবিষ্ট আকুলতাগুলো।

জাহানারা হাতটা আলতো করে রাখল নিজের বাড়ন্ত উদরে। সেখানে আজ প্রায় নয় মাসের ছোট্ট একটি নতুন সত্তাকে নিজ গর্ভে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে সে। অন্ধকার অশুভ দুনিয়ার সেই বি’ধ্বংসী আন্ডারওয়ার্ল্ড টেরোরিস্ট ব্ল্যাক-ভেনম মাফিয়া গ্রুপের ‘মিস্টার ভি’ খ্যাত দুর্ধর্ষ মাফিয়া বসের সন্তান ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠছে তার অন্ধকূপসম উদরে। আচানক এক তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠল জাহানারা। এক লহমায় সরে আসল নাদিয়ার কাছ থেকে। ত্বরিতে দৃষ্টি রাখল তার বাড়ন্ত গলগলে গর্ভস্থে। জাহানারা অনুভব করল তার ভেতরের ন’মাসের অস্তিত্বটুকু বড় বিচলিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন সে হঠাৎ বিচলিত হয়ে পড়ল? বাবার কথা ওঠায়! নাকি গর্ভধারিণীর যতনায়!

জাহানারা দু’হাতে আগলে ধরল নিজের বাড়ন্ত উদর। টলমলে নেত্রে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেথায়। চোখের কার্নিশ বেয়ে অবিলম্বে গড়িয়ে পড়ল তপ্ত অশ্রু। আজ প্রায় দীর্ঘ তিনটি মাস হতে চলল জাহানারা কাশ্মীরের এই বরফঘেরা উপত্যকায় এসেছে। এখানে জাহানারার দাদি সুরেহা বানুর বাপের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে তাকে। ইফান চৌধুরীর মৃ’ত্যুর পর তাকে বাপের বাড়ির লোক এখানে জোর করে রেখে গেছে। এখানে রেখে যাওয়ার নানান কারণ থাকলেও একটি অন্যতম কারণ জাহানারা মানসিক উন্নতি করা। কিন্তু কই আর হলো তা! দিনের পর দিন গুমরে মরছে মেয়েটা। বাইরে থেকে কঠিন দেখালেও ভেতর তার পুড়ে ছারখার।

নাদিয়া জাহানারার দূর সম্পর্কের ফুফাতো বোন হয়। জাহানারার দাদি সুরেহা বানুর ভাইপোর একমাত্র মেয়ে নাদিয়া। তাছাড়াও নাদিয়ার সাথে জাহানারার ঘনিষ্ঠ আরও একটি সম্পর্কও আছে বটে। তা হলো জাহানারার স্কুল-কলেজ জীবনের একমাত্র ছেলে বেস্টফ্রেন্ড আরিফের বর্তমান স্ত্রী নাদিয়া। কলেজ লাইফ শেষ করেই আরিফ যখন ইন্ডিয়া চলে আসে তখনই নাদিয়ার সাথে পরিচয় থেকে তাদের বিয়ে। তাদের বিয়ের পর কর্মসূত্রেই আরিফ স্ত্রী নাদিয়াকে নিয়ে কাশ্মীর এসে এখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। এতে নাদিয়ার সুবিধাই হয়েছে বটে। যখন মন চায় তখনই লাফিয়ে বাপের ভিটেতে চলে যেতে পারে।

সে যাক গিয়ে। জাহানারা এখানে আসার পর নাদিয়া মেয়েটাকে সবসময় বড্ড চুপচাপ, বড্ড নিষ্প্রাণ দেখে এসেছে। সবার সাথে কথা না বলে জবুথবু হয়ে ঝিম মেরে ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকে। তাই আজ জাহানারার ভেঙে পড়া দেখে নাদিয়া বিচলিত হয়ে উঠল। জাহানারাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে উদগ্রীব গলায় শুধালো,

–“কি হয়েছে? খারাপ লাগছে তোর?”

জাহানারা প্রত্যুত্তর করল না। যেন সে কিছু শুনতে পায়নি। নাদিয়া দু’হাতে আগলে ধরল জাহানারাকে। একজন মানুষের বুঝি এত ভ’য়ংকর অতীত হয় তা জাহানারার থেকে না শুনলে জানতেই পারতো না। আর এটাও জানতে পারত না একটা মানুষ এত ব্যথা নিয়েও বেঁচে থাকতে পারে! নাদিয়া জাহানারার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

–“শান্ত হ তুই। আর কাঁদিস না। পেটের বাচ্চাটার যে কষ্ট হবে!”

জাহানারা ফুপিয়ে উঠল। ঘনকালো নেত্রপল্লব তার সিক্ত হয়ে আছে। তার পেলব শুভ্র মুখশ্রীখানা মলিন হয়ে পড়েছে৷ তবুও রমণীর সৌন্দর্যে একবিন্দুও ভাটা পড়েনি। বরং এই অন্তঃসত্ত্বা রমণী দিনকে দিন আরও লাস্যময়ী হয়ে ওঠছে। নাদিয়া কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবুও কৌতুহল দমাতে না পেরে শুধাল,

–“আচ্ছা জাহান, ঐ অভিশপ্ত নীল পাথরটি কি এখনো তোর কাছেই আছে?”

নাদিয়ার এই আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে থমকে গেল জাহানারা। সহসা তার পাংগুটে চেহারায় ভেসে উঠল উদ্বীগ্নতার ছাপ। ইফানের মৃত্যুর পর জাহানারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, বড্ড বেশি অন্তর্মুখী হয়ে পড়েছে। তবুও নীল পাথরটা নিয়ে কখনো ভাবেনি তা নয়! অনেক ভেবেছে সে। কিন্তু সেই ভাবনার কোনো যুক্তিযুক্ত সমীকরণ আজও তার কাছে মেলেনি। সে খবর নিয়েছিল চৌধুরী বাড়িতে, সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও সিন্দুকটি কোথাও পাওয়া যায়নি।

জাহানারার ধারণা ঐ সিন্দুক সেদিন রাতেই আ’ক্রমণকারীরা লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সিন্দুকটি পাসওয়ার্ড ছাড়া খুলা অসম্ভব। সিন্দুকটি ইফান বিশেষভাবে অভিনব বৈজ্ঞানিক কায়দায় তৈরি করে এনেছিল। কেউ যদি পাসওয়ার্ড ছাড়া জোরপূর্বক সেই সিন্দুক খুলতে যায় কিংবা ভাঙার চেষ্টা করে, তবে সিন্দুকের ভেতরের শক্তিশালী লেজার রশ্মি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং সেই নীল পাথরটিকে ভেঙে ছিন্নভিন্ন করে দিবে। তবে সেই সিন্দুকের পাসওয়ার্ড একমাত্র জাহানারা আর ইফান জানত। কিন্তু ইফানের মৃত্যুর পর একমাত্র জাহানারাই জানে। এমনকি বাংলাদেশ থাকতে জাহানারার উপর পরপর দুবার হামলাও হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে দুবারই সে হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। হয়তো জাহানারাকে তার পরিবার বাংলাদেশ থেকে জোর করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার এটাও একটি মস্তবড় কারণ!

নাদিয়া অপেক্ষা করছে জাহানারার প্রত্যুত্তরের জন্য। তবে কোনো যুতসই উত্তর পাওয়ার আগেই হঠাৎই ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে বাইরে থেকে দু’হাত মেলে দিয়ে প্রজাপতির মতো ডানা কেটে ছুটে এলো আরিফ আর নাদিয়ার একমাত্র নয়নমণি—কাব্য আহসান। ঘরের অভ্যন্তরে পা রাখতেই সে তার আদুরে, কচি গলায় ডেকে উঠল,

–“আম্মি, আমি চলে আসছি।”

ছেলের গলা শুনে চকিতে তাকাল নাদিয়া। বছর পাঁচেকের ছোট্ট কাব্য, তার সেই পুচকে গায়ে জড়িয়ে আছে স্কুলের চেনা ইউনিফর্ম। ছেলেকে দেখে নাদিয়া কিছু একটা বলতে গিয়েও সহসা জবান হারিয়ে ফেলল। তার আগেই জাহানারার ফোলা চোখ-মুখ আর টলমলে অশ্রু দেখে ছোট্ট কাব্যের গাল দুটো অভিমানে ফুলে উঠল, সে কাঁদো কাঁদো গলায় শুধাল,

–“মাম্মাম তুমি কাঁদছ কেনো?”

ঘরের চৌকাঠ মাড়াতেই আরিফের দৃষ্টিগোচর হলো জাহানারাকে। গর্ভবতী রমণীর নাদুসনুদুস মিষ্টি মুখশ্রীর এহেন নাজেহাল দশা দেখে আরিফের বুজার বাদ রইল না মেয়েটা যে কেঁদে ভাসিয়েছে। তাই সে কাঁধ থেকে ছেলের স্কুলব্যাগ চেয়ারে রেখে আড়ালে তপ্তশ্বাস ছাড়ল। ওদিকে আদুরে গলার স্বর কর্ণকুহরে ধাক্কা খেতেই এতক্ষণে সংবিৎ যেন ফিরল জাহানারার। ভাবনার অতলান্ত গহ্বর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে চকিতে দৃষ্টি ঘুরাতেই দেখল টলমলে একজোড়া নিষ্পাপ চাউনি। পেলব অধরজোড়া টিপে ধরে আছে বাচ্চা ছেলেটা। এই বুঝি কেঁদে ভাসাবে। কিন্তু জাহানারা তা হতে না দিয়ে আকস্মাৎ বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে ভেজা কন্ঠে আওড়াল,

–“কাব্য, আমার কাব্য।”

চলবে,,,,,,,

যারা পড়েছেন সবাই রেসপন্স করবেন। ৯৫ পর্বেই চেষ্টা করব জাহানারা সমাপ্ত করার। অবশ্যই এক পর্বে দেওয়া সম্ভব হবে না, কারণ এখনো অনেকটা রহস্য সমাধান করা বাকি আছে। তাই ৯৫ পর্বকে দুই খন্ড করেই দিতে হবে। আশা করি তবেই জাহানারার ইতি টানতে পারব। ভালোবাসা নিবেন। হ্যাপি রিডিং🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply