হিপনোটাইজ
তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:2
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
_______________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।⭕
জীর্ণশীর্ণ একটি মেয়ে, ধনুকের মতো চিকন শরীর টা বাঁকিয়ে বসে আছে সে। সদ্য ফোটা শাপলা ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটো কাঁপছে কান্নার তোপে , টান টান মোহমীয় স্নিগ্ধ আঁখি জোড়ায় কান্নারা বাধ ভেঙেছে, বান ভেঙেছে অশ্রুরা।
নীল চোখের এক যুবক শিয়রে বসে আছে তার, নির্মমতার পরিচয় দিচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে।জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরছে মেয়েটির উন্মুক্ত উদরে। গুনে গুনে 30 সেকেন্ডের পরপর একই কাজ জারি রেখেছে সে, বিরবির করে বলছে ,
“শুনো ব্লু ব্লাড গার্ল, আমার অন্ধকার রাজত্বে তোমার পদচারণ ঠিক সায়ানাইডের চেয়েও বিষাক্ত।”
ঘুমের মধ্যেই নিস্পাপের নিঃশ্বাস ভারি হতে শুরু করলো, দ্রুত গতিতে উঠানামা শুরু করলো বুক। অথচ ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে না, এমন মনে হচ্ছে ঘটনাগুলো তার সামনে ঘটছে, ওই যে অদূর থেকে স্পষ্ট ভেসে আসে কারো চিৎকারের আওয়াজ,
“আমি ফিরবো ব্লু ব্লাড গার্ল,এই বাংলায় আরেকটি শিশুর জন্ম হবে, কোন এক মজুর কিংবা কৃষকের ঘরে আমি আবারো ফিরবো।”
ঘুম থেকে চেচিয়ে উঠলো নিস্পাপ,শরীর টা থরথর কাপছে, চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো অনুরিকা,
“কি হয়েছে তোমার?আবারো দুঃস্বপ্ন দেখেছো?
নিস্পাপ হাতের তালু দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছলো দ্রুত,পরনের কামিজ উল্টে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
” আমার উদরে কিসের চিহ্ন অনু?”
অনু হতাশ হয়, দীর্ঘশ্বাস ছিটকে বের হয় নাসিকাগ্রন্থ থেকে,এই নিয়ে কত হাজার বার নিস্পাপ এই প্রশ্নটা করেছে হিসেব নেই অনুর, প্রতিবার একই উত্তর পেয়েও নিস্পাপ কেনো পুনরায় একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে যানা নেই তার। অনু ফোস করে দম নিলো,উত্তরে বলল,
“তোমার পেটে কিছু পুড়ে যাওয়া চিহ্ন ছাড়া আর কিছু নেই নিস্পা, প্রতিদিন একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাল্টে যাবে না।”
নিস্পাপের চোখে মুখে আতংক,শুখনো ঢোক গলদঃকরন করে বললো,
“কিন্তু ওই পুড়ে যাওয়া মেয়েটাকে আমি স্বপ্নে দেখি অনু। একটা লোক মেয়েটার পেটে জ্বলন্ত সিগারেটের ছেকা দিচ্ছে, ঠিক যেমনটা আমার শরীরে।”কথাগুলো বলতে গিয়ে কন্ঠ কেঁপে এলো নিস্পার।
” আমি বুঝতে পারছি নিস্পা, তোমার মানসিক অবস্থা ভালো নয়, সারাক্ষণ একটা হ্যালুশিনেশনে ডুবে থাকো তুমি। এটা তোমার শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর বুঝতে পারছো?নিজেকে একটু ফ্রিডম দেও নিস্পা।এসব অপার্থিব চিন্তা ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসো।”
নিস্পাপ উত্তরে আর কিছু বলে না, ওড়না টা গায়ে জড়িয়ে, পা গুনে গুনে এগিয়ে যায় আধ খোলা জানালার দিকে।এক হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলেই তাকালো দূরের হিজল গাছটার দিকে, রিনরিনিয়ে বিরবির করলো,
“ব্লু ব্লাড গার্ল কে?আর আপনিই বা কে?কেনো আমার স্বপ্নে আসেন বারবার?এই স্বপ্নের সাথে কি সম্পর্ক আমার?”
আজকের তাজা খবর, ঢাকার উত্তরে মাটি খোড়ার সময় কয়েক যুগ আগের দুটো লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কঙ্কালের হাড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় নি। ঘটনা স্থলে ইতমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন এমপি তাওসিফ তাকরিম। ঘটনাটা খুটিয়ে দেখার জন্য সাথে করে নিয়ে এসেছেন একজন সাইন্টিস্ট। কর্মরত লোকেরা হাড়গুলো উপরে তুলতে সাহায্য করছে তাদের।
মূলত জায়গাটা তার পূর্ব পুরুষদের, কয়েকযুগ ধরে খালি পড়ে ছিলো, তার দাদা আর বাবাকে যতবার এই জায়গাটায় বাড়ি করার কথা বলতো ততবারই ওদের চেহারা কেমন পাল্টে যেতো। কোনকিছু নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকতো তারা, বিশেষ করে এই জায়গাটার কথা উঠলেই কেমন আতংকে জর্জরিত হতেন।
অথচ তাকরিম এক অজানা টান অনুভব করে এই জায়গাটাতে, কেনো যানি মনে হয় পৃথিবীর কোথাও এতো শান্তি নেই, যেই শান্তিটা এইখানে আছে। জায়গাটার কাছে আসতেই কেমন অদ্ভুত ভাবে পুলকিত হয় তার মন, মস্তিষ্ক।পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে হারিয়ে যায় অন্য জগতে।তাই দাদা মারা যাওয়ার পর পরই, বাবার সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করেই এই জায়গাটায় বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু সে ঘূনাক্ষরেও বুঝতে পারে নি এমন একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটতে পারে এখানে। তবে কি দাদা আর বাবা এই ভয়টায় পাচ্ছিলো?
মাটি খোঁড়ার কাজ এখনও চলছে। কর্মরত শ্রমিকরা এখন অন্য দিক থেকে খননের কাজ শুরু করেছে। খননের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে আরও এক বিরল ও চমকপ্রদ দৃশ্য।
এবার আর দুটি নয়, বরং বিশ থেকে পঁচিশ বা তারও বেশি মানুষের হাড়গোড়ের অস্তিত্ব উদ্ঘাটিত হয়েছে। প্রতিটি হাড় যেন এক অজানা অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবার সামনে। উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে এমন দূর্লবীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে।
হাড়গোড়ের সংখ্যা এবং বিন্যাস দেখে অনুমান করা যায়, এখানে হয়তো কোনো প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র বা অজানা ঐতিহাসিক ঘটনার নিদর্শন লুকিয়ে আছে।
তাকরিম চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে,কপালে তার সুক্ষ্ম ভাজ,চোখের পরতে পরতে বিস্ময় আর কৌতুহলের ছড়াছড়ি। পাশে একজন গার্ড খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে মাথায় ছাতা ধরে রেখেছে তখন থেকে। সাদা শার্টের উপর কালো সুটে বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে তাকে।
সবাই এমন দূর্লবীয় ঘটনা এভয়েড করে হা হয়ে তাকিয়ে দেখছে দেশের নতুন এমপি তাওসিফ তাকরিম কে। বিশেষ করে মেয়েগুলো তো ইতমধ্যে সংসার পাতার স্বপ্নও দেখে ফেলেছে।
তাকরিমের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,সে ঘটনা পর্যবেক্ষনে ব্যাস্ত। হটাৎ তার ঈগল চক্ষু জোড়া আটকালো একটি জ্বলজ্বলে পথড়ের দিকে, দপ করেই উঠে দাড়ালো তাকরিম, তড়িঘড়ি করেই কঙ্কালের আঙুল থেকে খুলে রেখে দিলো আংটি টি।
আংটির উপর বসানো পাথরটি চিনতে এক মুহুর্ত বিলম্ব হয় নি তার, এটি পৃথিবীর মহামূল্যবান পাথর আলেকজান্দ্রিত। যে পাথর বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন রুপ ধারন করে। আলোতে পান্নার মতো এবং অন্ধকারে লাল রুবির মতো বর্ন হয় তার।
রিংটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরতেই তাকরিম হারিয়ে যায় এক অন্য দুনিয়ায়, সেকেন্ডের গতিতে ফিরেও আসে নিজের জগতে, অথচ একটু আগের চেহারাটা সম্পুর্ন পাল্টে গিয়েছে। ঠোঁটে ধরা দিয়েছে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি,আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলে,
“অপূর্ণ মৃত্যু আমাদের আবার জন্ম দিয়েছে ,আমাদের খুব শীঘ্রই দেখা হবে আলেকজান্দ্রা , খুব শীঘ্রই। “
এডভোকেট ত্রিজয় তেজ। তার দ্বারা এ পর্যন্ত কোন ন্যায় বা সত্যের জিত হয়নি, বরং মার্ডার,কিংবা ধর্ষন কেসের আসামী গুলো খুব ভালো ফেসিলিটি পায় তার কাছ থেকে। তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলের সাহায্যে সে অনায়াসে একের পর এক কেস জিতে নিচ্ছে অথচ ন্যায়ের পক্ষে নয় বরং অন্যায়ের পক্ষ হয়ে।
তার অফিস কক্ষে আজ আবারো একজন মক্কেল এসেছে,অথচ সে ভাবলেশহীন বসে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে।ইভান তার বিশ্বস্ত পি এ, বর্তমান যুগে যেখানে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করা যায় না, সেখানে ইভান নিঃসন্দেহে একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ।
ত্রিজয়ের সামনে ফাইল পত্র এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
“স্যার আজকের কেসটা জটিল, শিল্পপতি আইয়ুব শিকদারের একমাত্র ছেলে একটি মেয়েকে রে*প করেছে, এবং আই উইডনেস হিসেবে মেয়েটি নিজেই সাক্ষী দিয়েছে।”
ইভানের কথায় কোনরুপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না ত্রিজয়। সামনে বসে থাকা আইয়ুব খানের মুখটা আমের আঁটির মতো চুপসে গেলো।ত্রিজয়ের গম্ভীরতা দ্বিধায় ফেলে দিলো তাকে, মনে তো হচ্ছে কেসটা জিততে পারবে না। আইয়ুব খান গলা খাকালেন, কপাল কুচকে বললেন,
“দেখুন কেসটা জিততে পারলে বলুন নইলে আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।”
আইয়ুবের কথায় এবং চোখে বিরক্তি স্পষ্ট। অথচ ত্রিজয় তার গতিতে চলছে, কফির কাপে সর্বশেষ চুমুক দিয়ে টিবেলের উপর রাখলো, ইভানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“এমাউন্টের কথা বলেছো?”
ইভান মুচকি হাসলো, আইয়ুব শিকদারের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ধরে নিন কেসটা আপনি জিতে গিয়েছেন তবে এটার জন্য একটা বড় এমাউন্ট পে করতে হবে।”
আইয়ুবের চোখে মুখে উৎকন্ঠা,এতোক্ষনে দেহে প্রান ফিরলো বুঝি, একমাত্র ছেলে বলে কথা, এই বয়সে আধএকটু ভুল করবেই তাই বলে বাবা হয়ে তো আর সারাজীবন জেলে পচে মরতে দিতে পারে না।আইয়ুব উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কত টাকা লাগবে বলুন আমি দিতে প্রস্তুত।”
ত্রিজয় টেবিলের উপর দুটো পা তুলে আড়াআড়ি করে রাখলো।ঠোঁট দুটো গোল করে তৈরি করলো এক সুমধুর সুর, আইয়ুব ভড়কালো, সামান্য একজন উকিলের এমন ভাব সহ্য হচ্ছে না তার, কিন্তু কিছু করার নেই, ছেলের জন্য দাতে দাত চেপে সব সহ্য করে নিচ্ছে এই মুহূর্তে।
ইভান মেকি হাসলো,
“পরশু আপনার ছেলের কেসটা কোর্টে উঠবে, গুনে গুনে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা স্যারের হাতে আসলে স্যার মুখ খুলবে।এখন আপনি আসতে পারেন।”
আইয়ুবের হাস্যজ্বল মুখটা আবারো দপ করে নিভে গেলো, অনিশ্চয়তায় ভুগলো সে, আদৌও পাড়বে তো এই উকিল, নাকি টাকা হাতানোর ধান্দা? আবার মনে মনে নিজেকে নিজেই বললো,”
আইয়ুব শিকদারের টাকা মেরে কোথায় যাবে আর, ছেলেকে বাচাতে না পাড়লে এই উকিলকেও বাঁচতে দিবো না।”
চলবে,,,,,,,,
Share On:
TAGS: তাজনিন তায়্যিবা, হিপনোটাইজ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
হিপনোটাইজ পর্ব ১০
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৬
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৫
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৩
-
হিপনোটাইজ পর্ব ১
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৪
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৭
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৯
-
হিপনোটাইজ পর্ব ৮