সীমান্তরেখা
লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক
পর্ব_১৯
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]
ওরা যখন রাজশাহীতে পৌঁছালো, তখন প্রায় ভোর হয়ে গেছে। আকসা বাসায় এসেই আগে ধপ করে শুয়ে পরলো সোফার ওপরে। তবে মেজবাহ শোয়নি। আগেই ওয়াশরুমে ঢুকে গিয়েছে ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
আকসা বসার ঘরেই ঘুমে ঢুলছিল। হঠাৎ ওদের শোবার ঘর থেকে মেজবাহ’র ডাক শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসলো। দ্রুত উঠে ঘরে গিয়ে দেখলো, মেজবাহ গোসল সেরে এসেছে। ওর পরনে একটা ট্রাউজার আর উদাম শরীরের ওপর পিঠের দিক থেকে মাঝারি একটা সফেদ রঙা তোয়ালে বুক অবধি টেনে রাখা। মেজবাহ ফরসা গাত্রবর্ণের। ব্লু রঙের ট্রাউজারের ওপরে শুধুমাত্র পেটানো পেট ও পিঠের নিচের সামান্য কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। মেজবাহ’র সামান্য বড় হওয়া সামনের চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি পরছে তখনও।
আকসা অবাক হলো বেশ৷ শীতের শেষ সময়কাল হলেও রাতের দিকে বেশ ভালোই ঠান্ডা পরছে ইদানীং। এতো ঠান্ডার মধ্যে মেজবাহ গোসল করেছে! আকসা দ্বিধান্বিত হয়ে মেজবাহকে বিচলিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো— “এই শীতে এখন আপনি ফ্রেশ হলেন যে?”
আকসার প্রশ্নের জবাবে মেজবাহ তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না। আচনক নিজের দিকে মেজবাহকে এগোতে দেখে বিচলিত হলো আকসা। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল ওর। না চাইতেও পেছাতে শুরু করলো। মেজবাহ যতো এগোলো, আকসা তার দ্বিগুণ বেশি পিছিয়ে গেল। শেষমেশ ওর শরীর ঠেকলো পেছনের রিডিং টেবিলের সাথে। সেখানে মিশে যেতেই ঢোক গিলে মেজবাহ’র মুখের দিকে তাকালো আকসা। মেজবাহ’র রাগটা এখনো পরেনি। মেজাজ শান্ত হয়নি। গাড়িতে থাকাকালীন তো একটা কথাও বলেনি। প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে ছিল৷ বেশ স্পিডের সাথে গাড়ি ড্রাইভ করছিল। আকসা এর মাঝে গাড়িতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। একারণে তখন আর মেজবাহ’র সাথে কথা বলতে পারেনি।
মেজবাহ’র চোখ-নাকের ডগা লাল হয়ে আছে এখনো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকসার দিকে। একহাত এগিয়ে আকসার কাঁধে ঝোলানো ওড়নার ওপরে রেখেছে। মুখের অভিব্যক্তি শত চেষ্টা করেও বুঝতে পারলো না আকসা। পুনরায় ঢোক গিলে বললো, “কী করছেন মেজবাহ?!”
প্রশ্নটা করামাত্র আকসার ওড়না একটানে শরীর থেকে খুলে পেছনে ফ্লোরের ওপরে ছুঁড়ে ফেললো মেজবাহ। আকসা আতংকিত হয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা ওড়নার দিকে তাকালো। বিরবির করে বলার চেষ্টা করলো— “মেজবাহ কি কর—”
পুরো কথা শেষ করতে পারলো না ও। তার আগেই মেজবাহ ওর ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো, “হুশ চুপ। কোনো কথা নয়। আমি যা বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো। এখনই ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেবে।”
“এখন? কেন?”
আকসা চরম অবাক হয়ে প্রশ্ন করতেই মেজবাহ কেমন অদ্ভুতভাবে হেঁসে বললো, “আমার স্ত্রীকে অন্য পুরুষ ছুঁয়েছে আকসা৷ তোমার শরীরে সেই স্পর্শ এখনো লেগে আছে। আমি চাই না, আমার স্ত্রী’র শরীরে এই স্পর্শ আর এক মুহূর্তও লেগে থাকুক। বিলিভ মি, টলারেট করতে পারবো না। ভাবলেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে, ওই জানোয়ারটাকে গিয়ে মেরে ফেলি!”
“মেজবাহ! শান্ত হোন! প্লিজ।”
ওর হাতের বাহু শক্তভাবে চেপে ধরে আকুল কন্ঠে কথাটা বলতেই মেজবাহ আকসার মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত হলো। শীতল চোখে তাকিয়ে থেকে কিঞ্চিৎ হেঁসে বললো, “এখনই গিয়ে ফ্রেশ হবে ওকে? ওই জানোয়ার যেখানে যেখানে ছুঁয়েছে, সেই প্রতিটা জায়গায় বডি ওয়াশ দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করবে। হেল্প লাগলে বলতে পারো। আমি আসবো?”
“ন—না! আপনার হেল্প লাগবে না। আমি একাই পারবো।”
অস্থিরতার সহিত কথাটা বলেই আকসা দৌড়ে ড্রয়ার থেকে জামাকাপড় বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। মেজবাহ ওর ওই অস্থিরতা দেখে মৃদু হাসলো।
.
.
আকসার শ্বশুরবাড়ির সবাই পরদিন সকাল এগোরাটার মধ্যেই ফিরলেন। আকসার শাশুড়ি ফিরেই আগে ছেলের ঘরে আসলেন। আকসা তখন রিডিং টেবিলে ছিল। আর মেজবাহ বিছানার ওপরে বসে গভীর মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করছিল।
মামনিকে দেখে মেজবাহ তড়িঘড়ি করে ল্যাপটপ বন্ধ করলো। মৃদু হেঁসে বললো, “তোমরা কখন আসলে? টের পেলাম না তো।”
“সবেমাত্র এসেছি। তুমি বোধহয় কাজে খুব ব্যস্ত ছিলে, তাই খেয়াল করোনি।”
“এইতো মামনি। একটু ব্যস্ত ছিলাম আরকি।”
মেজবাহ জবাবটা দিয়ে সামান্য হাসলো। আকসা শাশুড়িকে দেখে উঠে একপাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। ইশা বেগম ওর সাথে এখনো কোনো কথা বলেননি৷ এজন্য আকসা উদ্বিগ্ন হচ্ছে। ইশা বেগম ছেলের মুখটা দেখলেন। মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে হা-হুতাশ করে আফসোসের সাথে বললেন, “আহারে আমার বাপটা! একরাতের মধ্যে মুখ একদম শুকিয়ে গেছে আমার ছেলেটার। সকালে খাওনি?”
“জাস্ট কফি খেয়েছিলাম মামনি। আর কিছু খেতে ইচ্ছা করেনি।”
ইশা বেগম এবার পাশ ফিরে চাতক পাখির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা আকসাকে উদ্দেশ্য করে বললো, “বৌমা, যেয়ে আমার ছেলের জন্য একটা সিদ্ধ ডিম আর স্যালাদ করে নিয়ে এসো তো। ওগুলোই খায় আমার ছেলেটা।”
শাশুড়ির কন্ঠস্বর স্বাভাবিক-ই। আকসার সাথে সবসময়কার মতো করেই কথা বলছেন। এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করে আকসা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো যেন। এতোক্ষণ বেশ ভয়ে ভয়ে ছিল ও। আকসা দ্রুত ঘর থেকে পা বাড়িয়ে দরজার বাইরে যেতেই হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল। ওর শাশুড়ি মেজবাহকে বলছেন, “তোমার আব্বুকে কেন ব্লক করেছো বাবা? উনার সাথে কথা বলবে না? উনি তো খুব কষ্ট পাচ্ছেন৷ গতকাল তোমার ওই কথাগুলোতেও কষ্ট পেয়েছিলেন খুব৷ সারারাত ঘুমাননি। তোমার কথা বলছিলেন বারবার।”
আকসা উঁকি মেরে দেখলো, মায়ের কথা শুনে মেজবাহ মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। ইশা বেগম ছেলের মুখে হাত রেখে ফিরিয়ে বললেন, “কথা বলবে না তার সাথে? হঠাৎ এমন কেন করলে?”
“কেন করেছি, সেটা তো তোমাদের সবার কাছে এতোক্ষণে ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ার কথা মামনি। একজন পার্ভাটকে মেরেছি আমি। কোনো মুজরিমকে নয়।”
“সেটা তো জানি বাবা। তুমি যেটা করেছো, সেটা তোমার দিক থেকে ঠিক আছে। অমন সিচুয়েশনে মাথা গরম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার আব্বুর সাথে এমন করছো কেন?”
মেজবাহ ঠোঁট চেপে বললো, “আব্বুর আমাকে সেই মোমেন্টে সাপোর্ট করা উচিত ছিল মামনি। তার বাড়ির বউয়ের ওপরে আঁচ লেগেছে৷ তিনি কীভাবে পারেন চুপ করে থাকতে? উল্টো আমাকে আরো থামতে বললেন! বিলিভ মি মামনি, আব্বু থামতে না বললে ওই জানোয়ারকে আমি ওখানেই জায়গায় মেরে পুঁতে ফেলতাম। তাতে আমার জেল-হাজত, যাবজ্জীবন যা হওয়ার হয়ে যেতো। আই ডোন্ট কেয়ার। বাট আব্বুর এবং তোমার বৌমার রিকোয়েস্টই থেমে গিয়েছি। নেহাত ছোটবেলা থেকে আব্বুর সব কথা শুনি।”
ইশা বেগমের চোখ ছলছল করছে। মেজবাহ তার মায়ের কোলে মাথা রাখতেই ইশা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “বুঝেছি, খুব রাগ করেছো৷ তোমার আব্বু তো আত্মীয় বাড়ি বলেই পরিস্থিতি শান্ত করতে তোমাকে থেমে যেতে বলেছিলেন। তবে তার ওপর বেশিক্ষণ রাগ করে থেকো না৷ জানো তো, তিনি তোমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারেন না। তার খুব কষ্ট হয়। আর তুমি সামান্য কিছু হলেই তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দাও। এটা ঠিক নয় বাবা। এমন আর করবে না, বুঝেছো?”
“জি মামনি।”
মেজবাহ মৃদু আওয়াজে কথাটা বলে সায় জানালো। ইশা বেগম হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “বৌমাকে খুব ভালোবাসো, তাইনা?”
আচনক প্রশ্নটা শোনামাত্র তড়িৎ গতিতে মেজবাহ মায়ের কোল থেকে উঠে বসলো। বিচলিত দেখাচ্ছে ওকে। মায়ের কৌতূহলী মুখের দিকে তাকিয়ে মেজবাহ স্বাভাবিক মুখ করে বললো, “খিদে পেয়েছে মামনি। তোমার বৌমাকে রান্নার দায়িত্ব দিতে গেলে কেন? কাজে গাফিলতি দেখছো তো?”
“খিদে পেয়েছে তোমার! দাঁড়াও আমি যাচ্ছি।”
ছেলের খিদের কথা শুনে ইশা বেগম দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। আকসা এতোক্ষণ ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কোণে। শাশুড়িকে উঠতে দেখে নিঃশব্দে দৌড় দিলো রান্নাঘরের দিকে।
.
.
“আমি আজ-ই চট্টগ্রামে ফিরছি আব্বু।”
“আজ-ই?!”
ছেলের কথা শুনে অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করলেন এহসানুল হক। মেজবাহ শান্ত গলায় জবাব দিলো— “জি। কিছু জরুরি কাজ পড়ে গেছে। রাতের গাড়িতে উঠবো।”
জরুরি কাজের কথা শুনে কেউ আর কিছু বলতে পারলো না। আকসা পাশের আরেকটা সোফায় ওর শাশুড়ির পাশে বসে কুশি কাঁটার বুনন শিখছিল। ভরা আসরের মাঝে হঠাৎ মেজবাহ’র এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে হাত থমকে গেল ও। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেজবাহ’র দিকে। মেজবাহ ওর আব্বুর দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই আকসার চোখে চোখ পরলো ওর। আকসার চোখে প্রচন্ড ব্যাকুলতা। যেটা সহজে সবাই ধরতে পারবে না। মেজবাহ বোধহয় বুঝতে পারলো। ও একপলক দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পুনরায় ওর মামনিকে বললো, “আকসাকেও আমার সাথে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাচ্ছি মামনি। অথোরিটি থেকে ইমার্জেন্সি পারমিশন নিয়েছি। আপাতত তেমন কিছু প্রয়োজন নেই। শুধু ওকে ওর কিছু দরকারি জিনিসপত্র প্যাকিং করে নিতে বলবে।”
আকসা চমকালো। মেজবাহ ওকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবে! হঠাৎ! আকসা হতবিহ্বল চাহনিতে তাকিয়ে রইলো মেজবাহ’র দিকে। তবে মেজবাহ’র মুখ সেই আগের মতোই গম্ভীর, শান্ত। ওর মুখ দেখে কিছু বোঝা গেল না। আকসার শাশুড়ি ওকে তাড়া দিলো ব্যাগপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। এখন বিকাল তিনটা বাজে। রাত আটটার মধ্যে বেরিয়ে পরতে হবে ওদের।
.
.
আকসা বিছানায় রাখা লাগেজের ওপরে বসে অজস্র কথা ভাবছে। মেজবাহ ওকে হঠাৎ ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবে কেন? আগে তো কিছু বলেনি৷ এটা কি হঠাৎ করা পরিকল্পনা? কিন্তু কেন?
আকসা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। মেজবাহ বাইরে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বেরিয়েছে বিকালে৷ ফেরার কথা পাঁচটার সময়। মেজবাহ’র আবার টাইমটেবল মেইনটেইন করার দারুণ অভ্যাস। ঠিক সময়েই ফিরবে নিশ্চয়ই। পাঁচটা বাজতে আর বিশ মিনিট বাকি। আকসা উঠে লাগেজটা সোজা করে রাখলো পালঙ্কের একপাশে৷ হঠাৎ বিছানার ওপরে পড়ে থাকা ওর ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো। আকসা দ্রুত ফোনটা টেনে এনে দেখলো, সেই ব্যক্তির ফোনকল। ঘরের দরজা ভেজানো আছে। এই ঘরে এখন কেউ আসবে না। আশেপাশে একবার অবলোকন করে আকসা কল রিসিভ করলো। আজ ওর মন বড্ড ফুরফুরে। তাই কল রিসিভ করেই আগে একটা লম্বা সালাম দিয়ে হেঁসে জিজ্ঞাসা করলো, “কেমন আছেন?”
ফোনের ওপাশের ব্যক্তি জবাব দিয়ে পাল্টা হাকিকাত জিজ্ঞাসা করতেই আকসা মৃদু হেঁসে বললো, “আমি তো খুব ভালো আছি। সামনে আরো ভালো থাকবো৷ কেন জানেন? কারণ, আমার হাসবেন্ডের সাথে তার ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্তে আপনার সাথে কথা বলতে পারবো। কোনো দ্বিধা-আতঙ্ক থাকবে না আর। লোকের সন্দেহের ভয়ে জড়ো হতে হবে না৷ এটা খুব বিশ্রী ব্যাপার জানেন তো। আমাকে কেউ সন্দেহ করুক— এটা আমার ভালো লাগে না। হ্যাঁ, ওখানে গেলে ভালোই হবে। আমার হাসবেন্ড তো সবসময় ক্যান্টনমেন্টে থাকবে না। ফ্রি থাকবো অলটাইম। যখন খুশি কল দিতে পারবেন। আমাকে পাবেন।”
“তো, তোমাকে আর কতভাবে পাওয়া যাবে?”
আচনক পেছন থেকে পরিচিত গলার আওয়াজ পাওয়া মাত্র আকসা চমকে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো, মেজবাহ বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে! মেজবাহ’র মুখের ওপরে গিয়ে দৃষ্টি আটকালো আকসার। গতকাল রাতে লোকটার যেই রাগী চাহনি, রক্তলাল চোখ, নাকের ডগা লাল আর কপালের শিরা ফুলে যাওয়া দেখেছিল — এই মুহূর্তে তার দ্বিগুণ ক্ষুব্ধতা দেখলো ওই চোখে-মুখে। খেয়াল করে দেখলো, মেজবাহ’র হাতের তালু শক্তভাবে মুঠো করে রাখা। চোখ অতিরিক্ত লাল হয়ে আছে। আকসা ঢোকের পর ঢোক গিললো। হাতে থাকা ফোনটা তখনও কলে রয়েছে। একবার মেজবাহকে দেখে আরেকবার আড়চোখে হাতের ফোনটাকে দেখলো। আকসা দ্রুত ফোনটা সামনে টেনে এনে কল কাটতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে মেজবাহ টান মেরে ফোনটা কেঁড়ে নিলো ওর হাত থেকে। মেজবাহ’র একহাত পাশের চেয়ারের ওপরে রাখা। আরেকহাত ফোনে। ফোন কানে ধরে মেজবাহ প্রথমে কোনো কথা বললো না৷ ফোনের ওপাশ থেকে সমানে একজন পুরুষ বলেই চলেছে— “কী হলো আকসা? কথা বলছো না কেন? তোমার স্বামী চলে এসেছে নাকি আবার? কল কেটে দেবো আমি?”
মেজবাহ এবার কঠিন গলায় বললো, “আব্বে শালা!”
আর কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে কল কেটে গেল। কল কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই আকসাকে একটানে ঘুরিয়ে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো মেজবাহ। আকসা ঢোক গিলে করুণ চোখে তাকালো ওর দিকে। মেজবাহ রাগে আপাতত হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। ও আকসার হাতের বাহু খামচে ধরে ওর থুতনি উঁচু করে ধরতেই আকসা কাঁপা স্বরে মিনমিন করে বললো, “মেজবাহ ফোনটা…”
‘ফোন’ শব্দটা শোনামাত্র-ই মেজবাহ এক আছাড়ে ফ্লোরের ওপরে ছুঁড়ে ফেললো ফোনটা। আকসা সেই শব্দে কেঁপে উঠলো। মেজবাহ ওকে ছাড়লো না৷ ওর দুই গালে হাত চেপে ধরে বললো, “হাসবেন্ড থাকতে অন্য পুরুষের সাথে..ছিহ! এতো নিকৃষ্ট তুমি? এতোটা? ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার ব্যাপারে খুশি হচ্ছো শুধুমাত্র তোমার এই আশিকের সাথে কথা বলতে পারবে বলে, তাইনা? তাইনা আকসা?”
“না না না। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন মেজবাহ। আমার কোনো আশিক নেই। কোনো আশিক নেই আমার। এসব ভুল। মিথ্যা সব। আপনি যা ভাবছেন, সেসব ঠিক নয়।”
“তাহলে কী ঠিক? কী হ্যাঁ? বোঝাও আমাকে আকসা। বোঝাও!”
মেজবাহ সামান্য চেঁচিয়ে উঠলো৷ আকসার হাতের বাহু চেপে ধরে রেখেছে ও। আরেক হাতে থুতনি উঁচু করে ধরে রাখা। আকসাকে চেয়ারের সাথে ঠেসে ধরেছে। ও ছটফট করছে৷ অন্য সময় হলে আকসার এই ছটফটানি এক মুহূর্ত সহ্য করতো না মেজবাহ। সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতো। তবে আজ ছাড়লো না। আরো রূঢ়ভাবে স্পর্শ করলো ওকে। কঠিন থেকে কঠিনতর হলো। মেজবাহ’র চোখ মারাত্মক লাল হয়ে গেছে৷ ওই চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় হলো আকসার৷ আকসা কাতরাতে কাতরাতে বললো, “ছাড়ুন মেজবাহ৷ লাগছে আমার। এভাবে ধরবেন না আমাকে। ব্যাথা পাই আমি।”
“ছাড়বো? হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। ছেড়েই দেবো তোমাকে৷ তোমাকে আর রাখা যাবে না। একমুহূর্তের জন্যও না। এমন মেয়েকে আমি আমার জীবনে রাখবো না, যে এক্সট্রা ম্যারেটিয়াল অ্যাফেয়ার করে বেড়ায়। থুহ! তুমি আমার থুতু পাওয়ারও যোগ্য না! তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম! ভালোবেসেছিলাম। আর তুমি..তুমি এই প্রতিদান দিলে? এতোবড় ধোঁকা!”
আকসাকে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিলো মেজবাহ। মেজবাহ’র চোখের কোণ বেয়ে একফোটা দুর্বোধ্য জল গড়িয়ে পরলো। মেজবাহ সঙ্গে সঙ্গে হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো সেটা। আকসা বুঝতেও পারলো না। আকসার পায়ের নিচে মাটি নেই যেন। হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেল! মাথায় প্রচন্ড চাপ পরছে। বুক মাত্রাতিরিক্ত ধুকপুক করছে। অনবরত ঘামছে ও। আকসা এগিয়ে এসে মেজবাহ’র হাতের বাহু ধরে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বললো, “আমি এসব কিছু করিনি মেজবাহ। আমি এমন মেয়ে নই। আপনাকে ধোঁকা দিইনি আমি।”
“আব্বে চুপ! তোর আর কোনো কথা শুনতে চাইনা আমি!”
আকসার হাত ছিটকে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল মেজবাহ। আকসাকে দেয়ালের সাথে ঠেসে চেপে ধরে দাঁত দাঁত পিষে বললো, “এই তোর সাথে আমার কীসের শত্রুতা হ্যাঁ? বল! কীসের শত্রুতা? নাকি তুই আমার ওপর কোনো এক্সপেরিমেন্ট করছিস? কোনটা? দেখতে চাইছিস যে, একজন ভদ্র পরিবারের ছেলের ধৈর্যের বাঁধ কতোটুকু? সর্বোচ্চ আঘাত পেলে কেমন আচরণ করে, সেটা দেখতে চাইছিস তুই? তুই আমাকে আর কোনোভাবে হার্ট করতে বাকি রাখিসনি! অলরেডি সবভাবে করে ফেলেছিস। শুধু এটাই বাকি ছিল। এটুকুও করে ফেললি! এই-যে তাকিয়ে দ্যাখ। এইযে এখানটায় আঘাত লাগে বুঝলি? আঘাত করতে করতে আর কিছু বাকি রাখিসনি এখানে! তোর মতো হার্টলেস আর ক্যারেক্টারলেস মেয়ে এটা বুঝবেও না। তোকে তোর এতো ভুলের পরেও ক্ষমা করে দিলাম, কখনো অসম্মান করিনি, কোনোভাবে তোর অসম্মান হতে দিইনি— তারপরও তুই! তুই দেখিয়ে দিলি, পাঁচ বছর আগের সেই আকসার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সে আগের মতোই স্বার্থপর আর নিকৃষ্ট রয়ে গেছে!”
মেজবাহ’র চিৎকার-চেঁচামেচি করে কথাগুলো বলতে বলতে পুনরায় চোখ লাল হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে ওর৷ আকসার বাহুতে রাখা হাতদু’টো কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আকসার চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। মুখের ওপরে এসে পড়ে আছে। সমানে কাঁদছে ও। মেজবাহ’র তবু সামান্য দয়া-মায়া হলো না। ও দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “আজকের পর থেকে তোর-আমার কোনো সম্পর্ক আর থাকলো না! আজ, এখানে, এই মুহূর্তেই আমাদের সব সম্পর্ক শেষ। আজকের পর তোকে আমি চিনি না৷ এই বাসায়ও তোর কোনো জায়গা হবে না। গেট আউট!”
মেজবাহ’র চিৎকারে আকসা কেঁপে উঠে মুখে হাত ঢেকে ডুকরে কাঁদতে লাগলো। আচনক ওর হাতে টান লাগলো। মেজবাহ ওকে টেনে ধরে বললো, “লাগেজ নাও। এখনই বের হবে।”
মেজবাহ’র এই রূপ এর আগে কখনো দেখেনি আকসা। ও ভয়ে ভয়ে গুছিয়ে রাখা লাগেজটা উঠিয়ে নিতেই মেজবাহ ওর হাত টেনে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে আসলো। ড্রয়িংরুমে মেজবাহ’র মামনি আর চাচি বসে ছিলেন। ছেলে আর ছেলে-বৌকে এমতাবস্থায় দেখে অবাক হলেন তারা। মেজবাহ আকসার হাত ধরে টেনে সদর দরজার দিকর নিয়ে গেল। মেজবাহ’র ওই রাগ আর আকসাকে কাঁদতে দেখে আকসার শাশুড়ি আর চাচি শাশুড়ি বিচলিত হয়ে দ্রুত উঠে আসলেন। আকসার শাশুড়ি অস্থির হয়ে ছেলেকে বললেন, “কী করছো বাবা? বৌমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো এভাবে? আর বৌমা কাঁদছে কেন?”
মেজবাহ ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে ফিরে ক্রুর হেঁসে বললো, “তোমার বৌমা ওর বাসায় যাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ যাবত কান্নাকাটি করছে মামনি৷ তাই ওকে ওর বাসায় দিয়ে আসতে যাচ্ছি।”
“তাহলে যে ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার কথা ছিল?”
“নসিবে থাকলে যাবে কোনো একদিন।”
পুনরায় হেঁসে কথাটা বলে কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জোরপূর্বক আকসার হাত ধরে টেনে নিচে নিয়ে গেল মেজবাহ। আকসা এতোক্ষণ হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও মেজবাহ’র শক্তির কাছে অসহায় হলো। আকসাকে মেজবাহ গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতেই আকসা সর্বশক্তি দ্বারা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আমি কোথাও যাবো না মেজবাহ। ছাড়ুন আমাকে৷ এখানে থাকবো আমি।”
“হু আর ইউ? এখানে থাকার কে তুমি? হু?”
“আপনার স্ত্রী। আপনি আমার স্বামী। আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।”
মেজবাহ টান মেরে আকসাকে সামনে এনে আঙুল তুলে শাসিয়ে জোর গলায় বললো, “এই ফালতু মেয়ে, আমি তোমার স্বামী নই! আজকের পর থেকে আমাকে স্বামী পরিচয় দেবে না! খুন করে ফেলবো!”
চলবে
Share On:
TAGS: ঝিলিক মল্লিক, সীমান্তরেখা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সীমান্তরেখা পর্ব ৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৬
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৮
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১৯
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ১
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ৫
-
উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২১
-
সীমান্তরেখা পর্ব ২