শেষপাতায়সূচনা[৪২.১]
সাদিয়াসুলতানামনি
ছেলের ব্যা”ন্ডেজে মোড়ানো মাথাটা নিজের বুকে নিয়ে হুহু করে কেঁদে ওঠে পূর্ণতা। শব্দ করে কান্না পাচ্ছে তার কিন্তু শব্দ করে কাঁদলে তাজওয়াদের ঘুম ভেঙে যাবে। তাই সে নিজের কান্নার শব্দ আটকাতে নিজের ঠোঁট কা”মড়ে ধরে। একটু পরপর ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, নিজের বুকে জ্বলতে থাকা কষ্টের আগুনটাকে শান্ত করার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা মাত্র এটি।
পূর্ণতার ফুঁপানোর শব্দে ঘুমন্ত তাজওয়াদ জেগে ওঠে। চোখ খুলে পিটপিটিয়ে তাকায় সে। নিজেকে মায়ের কোলে পেয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। গুনগুনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—মাম্মা, ব্যতা কচ্চে।
ছেলের কথা শুনে পূর্ণতাও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সান্ত্বনা দিতে বলে–
—ভালো হয়ে যাবে বাবা। মাম্মা দোয়া পড়ে ফু দিয়ে দিলে আল্লাহ ভালো করে দিবেন। কাঁদে না সোনা।
ছোট মানুষ কি আর এত সান্ত্বনা বুঝে। তাজওয়াদ মায়ের বুকে মাথা রেখেই কাঁদতে থাকে। পূর্ণতাও ছেলেকে ধরে কাঁদতে থাকে। তাদের মা-ছেলের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা দূর থেকে অবলোকন করে কয়েকজন। তাদের চোখের কার্ণিশও ইতিমধ্যে ভিজে উঠেছে উক্ত ঘটনার সাক্ষী হয়ে।
তাদের মাঝে নওশাদও এগিয়ে আসে সবার আগে। পূর্ণতাদের কাছে এসে বলে–
—আনু, তোমার এখন কান্না থামানো উচিত। তোমার স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব পড়বে আর তাজেরও।
পূর্ণতা বহু কষ্ট করে নিজের কান্না থামায়। কিছুক্ষণ পর কেবিনে আরো অনেকেই প্রবেশ করে। জিনিয়া এসেই ভাতিজার মাথাটার ব্যান্ডেজ ও গলায় ঝুলিয়ে রাখা হাত দেখে হিচকি পেড়ে কাঁদতে থাকে। আদরের ভাবীর স্বাস্থ্যের অবনতি দেখে তার কান্না আরো বেড়ে যায়। সকলে শেষমেষ বহু কষ্টে তাকে থামাতে সক্ষম হয়।
সবার সাথে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ পূর্ণতার দৃষ্টি গিয়ে থামে কেবিনের এক নির্জন কোণায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে জাওয়াদ, তাকে দেখে মনে হবে যেন ভাঙা কোনো প্রতিমা। মানুষটা অদ্ভুত রকম এলোমেলো; চুল বিশৃঙ্খল, শার্ট কুঁচকে আছে। আর চোখদুটো যেন বহু রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি সেখানে জমাট বেঁধে আছে। চোখের সাদা অংশ লালচে, ফোলা পাতার আড়ালে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট। সে একদৃষ্টে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু সেই দৃষ্টি স্থির নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা। যেন চোখ আছে এখানে, অথচ মন বহু দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।
দুপুরের সময় একে একে সকলকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। থেকে যায় শুধু জাওয়াদ। ক্লান্ত দেহখানা পূর্ণতাদের কেবিনের বাহিরে টেনে এনে পাশে সারিবদ্ধ চেয়ার গুলোর একটির উপর ছেড়ে দেয়। তার শরীর যতটা না ক্লান্ত, তার চেয়ে বহুগুণ ক্লান্ত, পিপাসিত, ভঙ্গুর তার মন। প্রিয়তমা স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে এতটা অসুস্থ দেখে সে নিজেও যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছে মানসিক দিক দিয়ে।
দুইদিন আগে বিকেল বেলা যখন টনি ফোন দিয়ে জানালো, তাজওয়াদ সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফা”টিয়ে ফেলেছে আর পূর্ণতা ছেলের অবস্থা দেখে স্ট্রো”ক করেছে, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল তার বেঁচে থাকার কারণগুলো আবারও দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। এবার চিরতরে হারানোর পাঁয়তারা করছে তারা। সংবাদটা শোনা মাত্রই মিটিং রুম থেকে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বেরিয়ে এসে সকল ট্রাফিক রুলস ভে”ঙে গাড়ি ছুটিয়ে আনতে থাকে হসপিটালের উদ্দেশ্যে। সে যখন হসপিটালে পৌঁছায়, তখন জানতে পারে তাজওয়াদ আর পূর্ণতা দু’জনই ওটিতে রয়েছে। কি রূদ্ধশ্বাস, ভয়াবহ সময়গুলো কাটিয়েছে সেটা শুধু তারাই জানে।
তাজওয়াদের মাঝে ব্লা”ডের প্রয়োজন পড়ার দরুন তাদের একটু ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল। তাজওয়াদের ব্লা”ডগ্রুপ এবি নেগেটিভ। এই ব্লাড গ্রুপ কতটা রেয়ার সেটা সকলেরই জানা।আ”হত তাজওয়াদকে হসপিটালে নিয়ে আসার পথে অনেক জ্যাম পড়ায় তখন তার বেশ খানিকটা ব্লা”ড লস হয়। এজন্য ডাক্তাররা তাজওয়াদের অপারেশনের সময় ব্লা”ড লাগবে বলে জানায়। তাদের হসপিটালে এই ব্লা”ড গ্রুপ নেই। তখন জাওয়াদ এগিয়ে আসে তাজওয়াদকে র”ক্ত দিতে।
তাজওয়াদ ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে পূর্ণতাও তার চোখজোড়া বন্ধ করে। চোখ বন্ধ করতেই তার চোখের পর্দায় সিনেমার মতো ভেসে উঠতে থাকে সেই অভিশপ্ত দিনটির ঘটনা।
~ঘটনার দিন~
ঘটনার দিন পূর্ণতা তাজওয়াদকে বাসায় আরওয়ার কাছে রেখে একটা সাইট ভিজিটিংয়ে গিয়েছিল। তাজওয়াদের আগের দিন জ্বর আসায় তাকে বাসা থেকে বের করেনি সেদিন আর। পূর্ণতা যেতো না সাইটে কিন্তু ঐ লোকেশনে বড়সড় একটা গণ্ডগোল বেঁধেছে যা তার যাওয়ার মাধ্যমেই সমাপ্তি হতো।
বিকালের দিকে তাজওয়াদের জ্বর কমে যাওয়ায় সে আরওয়ার কাছে নুডলস খাওয়ার আবদার করে। আরওয়া তাজওয়াদকে রুমে রেখে নিচে আসে নুডলস বানাতে। বাসায় তখন সে, তাজওয়াদ, আঞ্জুমান, অজান্তা বেগম ছিলেন। আরিয়ান আর তার বাবা দুইজনই সেদিন অফিসে গিয়েছিলো। মালতি কাকী বাজারে গিয়েছিল কিছু একটা কিনতে।
আরওয়া নুডলস বানিয়ে উপরে যাবে তখনই কলিংবেল বেজে ওঠে। আরওয়া গিয়ে দরজা খুলে দেখে পূর্ণতা এসেছে। তারা দু’জন একসাথেই উপরে উঠতে নিবে তখনই দেখতে পায় তাজওয়াদ দূর্বল পায়ে হেঁটে নিচে নামছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার এক পর্যায়ে হুট করেই পা পিছলে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায় তাজওয়াদ।পূর্ণতা বা আরওয়া বিষয়টা বুঝার আগেই তাজওয়াদ সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে তাদের পায়ের সামনে এসে থামে। ছেলের র-ক্তা-ক্ত মুখশ্রী দেখে পূর্ণতার পৃথিবী যেন থমকে যায়। সে বোধ জ্ঞান হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। পূর্ণতাদের বাড়ির সিঁড়ি গুলো একটু উঁচু উঁচু আগেই বলা হয়েছে।
আরওয়ার আহাজারিতে পূর্ণতার ধ্যান ফিরলে সে ছেলেকে নিয়ে পা”গলের মতো ছুটো আসে হসপিটালে। ছেলেকে এতটা আহত হতে দেখে সে নিতে পারে না, হসপিটালে পৌছানে মাত্রই ডাক্তারদের কাছে তাজওয়াদকে দেওয়ার পরপরই পূর্ণতা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার পর জানতে পারে সে স্ট্রো”ক করেছে। এই দু’দিন তার জ্ঞান ছিলো না। জ্ঞান ফেরার পরপরই ছেলেকে দেখার জন্য পাগলামি করতে শুরু করলে ডাক্তাররা তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায়, কিন্তু নওশাদ নিয়ে আসে তাকে তাজওয়াদের কাছে।
পূর্ণতাকে এখনই ছেলের কাছে আসার পারমিশন দিচ্ছিল না ডাক্তাররা, কারণ ছেলেকে দেখে আরো পাগলামি করতে পারে সে। এতে করে তাদের দু’জনেরই স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু নওশাদের সহ্য হয়নি পূর্ণতার সেই কান্নাভরা আকুতি। তাই ডাক্তারদের অগ্রাহ্য করেই পূর্ণতাকে নিয়ে আসে তাজওয়াদের কাছে।
চোখ বন্ধ করে থাকার দরুন পূর্ণতার তন্দ্রাভাব এসে পড়েছিল। কিন্তু গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই পূর্ণতা অনুভব করে সেই ভীষণ যত্ন নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমনই একটা যত্ন নেওয়া হাতের বড্ড অভাববোধ করছিল সে। ভালোলাগা, কান্না উভয় অনূভুতিই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে নিমিষেই।
পূর্ণতা চোখ খুলে তাকালে দেখতে পায়, তার মাথায় হাত ব্যক্তিটির তার অতীব কাছের মানুষটি। যাকে ভালোবেসে সে আজ অনেকটা নিঃস্ব হওয়ার পথে। জাওয়াদ আলতো করে পূর্ণতার চুলে হাত চালাচ্ছে। তার দৃষ্টি নিবন্ধ পূর্ণতা ও তাজওয়াদেরই উপর। তাদের দু’জনের একজনও কথা বলছে না। শুধু অনুভব করছে নিজেদের অনুভূতি গুলো।
নিস্তব্ধতার সমাপ্তি ঘটিয়ে পূর্ণতাই প্রথমে বলে ওঠে–
—আপনার রেস্ট নেওয়া উচিত। এই দুইদিন অনেক করেছেন আমাদের মা-ছেলের জন্য। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিন।
জাওয়াদ কোন তাড়াহুড়ো ব্যতীত শীতল কণ্ঠে বলে–
—তোমরা তো আমারই। তোমাদের জন্য না খাটলে নিজেকেই বিশ্বাসঘাতক মনে হয়। নিজের মানুষকে আগলে রাখা পুরুষের বিলাসিতা নয়, কর্তব্য।
পূর্ণতা থমকালো কি? তার হৃদয়ে ভালোলাগার শীতল বাতাস একটুও কি বয়ে যায় নি জাওয়াদের কথায়? হয়ত, থমকেছে। ভালোলাগার শীতল বাতাসও বয়ে গিয়েছে হৃদয়ে। কিন্তু সে কেন অনুভব করতে পারছে না? কেন সবকিছু তার মিছে লাগে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে পূর্ণতা। কিন্তু উত্তর মেলে না।
কেটে গিয়েছে তিন দিন। পূর্ণতা নিজের অসুস্থতা ভুলে গিয়ে ছেলের পেছনে লেগে পড়েছে কোমড় বেঁধে। তার পরিবারের লোক থেকে শুরু করে, নওশাদ, টনি, আরওয়া, জাওয়াদরা সকলে তাকে এত স্ট্রেস নিতে নিষেধ করছে, কিন্তু ছেলের বিষয়ে আর কোন গাফিলতি করতে নারাজ সে। উপরন্তু তাজওয়াদের এই এক্সিডেন্টের জন্য বারংবার নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করছে পূর্ণতা।
তাজওয়াদের ডান হাতটা ফ্র্যাকচার হয়েছে আর মাথায় সেলাই লেগেছে। এছাড়া আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছে। ডাক্তার জানিয়েছে আর দু’টো দিন পর তাকে হয়ত হসপিটাল থেকে ছেড়েও দেওয়া হতে পারে।
সকাল হতেই একে একে সকলে হসপিটালে চলে আসে তাজওয়াদের খোঁজে। এই একটা বাচ্চার উপর যেন সকলের জান আঁটকে আছে। অসুস্থতার জন্য আগের মতো চটপটে না থাকলেও, সে সকলের সঙ্গ ভীষণ পছন্দ করে। বাবাই, টনি আঙ্কেল, আলু মামা, ভালো আঙ্কেল, পিপি এককথায় সবার চোখের মণি সে। কেউ না কেউ সর্বক্ষণ তার পাশে থাকবেই। পূর্ণতার অসুস্থতার জন্য অফিসে যেতে পারছে না। যদিও সে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সকলে তাকে এমন ধমক দিয়েছে তারপর আর অফিসের নাম মুখে নেয়নি। ডাক্তার তাকে হাইলি এলার্ট করে দিয়েছে, এই টুকু বয়সে তার দু’বার স্ট্রো”ক করা হয়ে গিয়েছে। তাই এখন থেকে সে যতটা সম্ভব স্ট্রেস ফ্রি থাকবে তার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। বেশি স্ট্রেস নেওয়া মানে নিজে নিজে পথ চিনে মৃ”ত্যুর দুয়ারে যাওয়া।
দুপুরে পূর্ণতা লাঞ্চ করাতে নিলে কয়েক লোকমা খেয়ে আর খেতে চায় না তাজওয়াদ। ভীষণ গড়িমসি করতে থাকে না খাওয়ার জন্য। মা ব্যতীত অন্য কারো হাতে একদমই খেতে চায় না সে। আবার পূর্ণতা খাওয়াতে নিলেও বিভিন্ন তাল-বাহানা করে। পূর্ণতা বিরক্ত হয়ে একটা ধমক দিলে বেচারা ঠোঁট কাঁপিয়ে, চোখে অশ্রুতে টইটম্বুর করে অভিমানী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। সেই সাথে নাক টানতে থাকে।
পূর্ণতাকে ধমক দিতে দেখে জাওয়াদ এগিয়ে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। সে মাত্রই অফিস থেকে এসেছে হসপিটালে। কেবিনে ঢুকেই পূর্ণতাকে তাজওয়াদের সামনে ধমকা ধমকি করতে দেখে সে খানিক রেগে যায়।
—আজব তো! ধমকাচ্ছো কেনো অসুস্থ ছেলেটাকে এভাবে?
পূর্ণতা রাগী গলায় বলে–
—ধমকাবো না তো মাথায় তুলে নাচবো? খেতে গেলে এত বাহানা কেন করে? এত জ্বালায় কেন আমায়? হাত ভে”ঙে আর মাথা ফা”টিয়ে শান্তি হয়নি? কত পাওয়ারফুল ঔষধ গুলো দিয়েছে ওকে, ওর সেটা খেয়াল আছে? এইটুকু ভাত নিয়েছি তাও খাচ্ছে না। না খেয়ে ঔষধ খাওয়াই পরে আরেক ঝামেলা হয়ে আমার জীবন নিয়ে টানাটানি হোক।
আমার দূর্বলতা বুঝে সবাই আমাকে কষ্ট দেয়, আমার পেটে জন্ম নিয়ে ও নিজেও সেই খাতায় নাম লিখিয়েছে। আমার একটা কথা শুনে না দেশে আসার পর থেকে। সেদিন বারবার করে বলে গেলাম, রুম থেকে বের হবি না। সিঁড়ির কাছে তো ভুলেও যাবি না। আমার সেই কথাও অমান্য করে রুম থেকে বের হয়ে পাকামো করে একা একাই সিঁড়ি দিয়ে নামলো। তার ফল হলো কি? আ’ম জাস্ট ফেড আপ। এই ছেলেকে নিয়ে যান আপনি। লাগবে না এমন ছেলে যে তার মা’কে কষ্ট দেয় বারবার। মায়ের কোন কথা শুনে না। এত অবাধ্যতা সইতে পারছি না আমি আর।
প্রচন্ড রাগ নিয়ে কথাগুলো শুরু করলেও শেষে এসে কান্নার মাধ্যমে সমাপ্তি নেয় পূর্ণতার কথাগুলো। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কাঁদতে থাকে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে পূর্ণতা অনেকটাই। তাছাড়া তারও শরীর খারাপ। ঔষধের সাইড ইফেক্ট তো রয়েছেই।
অন্যদিকে মায়ের কথাগুলো শুনে তাজওয়াদ এবার কেঁদে দেয় শব্দ করে। জাওয়াদের কোলে থেকেই কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—আমি তো তুমাল কতা চুনের লুমেই চিলাম মাম্মা। কিন্তু মামনী এচে বললো, তুমি নাকি আলেকটা বাবু কিনে এনেচো। একন তেকে তাকেই আদল কলবে, তাজকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিবে। এতা চুনেই তো আমি লুম তেকে বেল হয়েছিলাম।
আল সিলি দিয়ে নামাল সময় তাজ তো ভালো কলেই নামছিল। কিন্তু মাঝ সিলিতে আসাল পল কেমন একটা পিচলা পিচলা লাগাল কালনে পলে গিয়েছি। ও মাম্মা, তাজ আল দুট্টুমি কব্বে না। গুড বয় হয়ে থাকবে। তুমি প্লিজ আমাকে ভালো আন্তেলের সাথে পাটিয়ে দিও না। তাজ সব খাবে। তোমার সব কতা শুনবে।
কথাগুলো বলতে বলতে তাজের কান্নার প্রকোপ আরো বাড়তে থাকে। এদিকে তাক কথাগুলো শুনে কেবিনে উপস্থিত পূর্ণতা, জাওয়াদ, আরওয়া সকলে বেশ চমকে যায়। তাজ মামনী বলতে আঞ্জুমানকে বুঝিয়েছে। আরিয়ান তাজকে আঞ্জুমানকে মামনী ডাকতে বলেছে।
তাজের কান্না বাড়ছে বলে পূর্ণতা ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নেয়। কতক্ষণ আদর দিয়ে তার কান্না থামায়। তারপর খাবার খাইয়ে দুপুরের ঔষধ গুলো খাওয়ায়। ঔষধ খাওয়ানোর কিছুক্ষণ পরই তাজওয়াদ ঘুমিয়ে পড়লে পূর্ণতা আরওয়াকে বলে–
—আমার ফোনটা কোথায় আরওয়া? দাও তো সেটা।
আরওয়ার কাছেই পূর্ণতার ফোনটা ছিল। সে ফোনটা পূর্ণতাকে দিতেই পূর্ণতা বেশ মনোযোগ দিয়ে ফোন ঘাঁটতে থাকে। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটির পর জাওয়াদ লক্ষ্য করে পূর্ণতা কেমন কাঁপছে থরথর করে। জাওয়াদ ভয় পেয়ে তার কাছে গিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে–
—অ্যাঁই পূর্ণ! কি হয়েছে তোমার? কাঁপছো কেনো? খারাপ লাগছে কোথাও?
জাওয়াদের ডাকে পূর্ণতা চোখ ফোন থেকে উঠিয়ে তার দিকে তাকায়। পূর্ণতা তাকাতেই জাওয়াদ আঁতকে উঠে। কেনো? কারণ, পূর্ণতার চোখজোড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে ইতিমধ্যে। সে পূর্ণতার দুই গালে হাত রেখে প্রশ্ন করে–
—কি হয়েছে তোমার? বলো, আমায় বলো। কোথায় সমস্যা হচ্ছে? ডাক্তার ডাকবো?
পূর্ণতা কাঁপতে কাঁপতে বলল–
—উঁহু। ডাক্তার না পুলিশ ডাকবেন। কিন্তু এখন না, ৩/৪ ঘন্টা পর। আপনার পরিচিত কোন গু”ন্ডা বাহিনী আছে?
পূর্ণতার কথা শুনে জাওয়াদ আর আরওয়া দু’জনই বেআক্কল হয়ে যায়। প্রথমে পুলিশ, পরে আবার গু”ন্ডা বাহিনী। এসবের কি বলছে পূর্ণতা তারা সেটা বুঝতে পারছে না।
পূর্ণতা নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে নিজেই বলে–
—লাগবে না আপনার সাহায্য। টাকা ফেললে গুন্ডার অভাব হবে না।
জাওয়াদের থেকে চোখ সরিয়ে পূর্ণতা আবারও ফোনে মনোযোগ দেয়। সে টনিকে ফোন দিয়ে বলে–
—আধা ঘন্টার মধ্যে তিনজন লেডিস পালওয়ালসহ একটা লোকাল গু”ন্ডা বাহিনী হায়ার করে আহমেদ বাড়িতে আসো। ভাইয়াকে সাথে নিয়েই আসবে। সময় কিন্তু আধা ঘন্টা। যত টাকা লাগবে আমার ডেস্কের ড্রয়ারে সাইন করা চেক পাবে, সেটা দিয়ে উঠিয়ে নিও।
ফোনের অপর পাশে থাকা টনির পূর্ণতার এহেন আদেশ শুনে মাথা ঘুরে যায়। আরে ভাই, সে লেডিস পালওয়ালের খোঁজ পাবে কোথা থেকে? সে কি এসবের বিজনেস করে নাকি? বেচারা তৎক্ষনাৎ লেগে পড়ে কাজে। কাজ না হলে দেখা গেলো পূর্ণতা সুস্থ হয়ে তাকে পি”টিয়ে ভর্তা করে ফেললো।
পূর্ণতা কল কেটে বেড থেকে নামতে নামতে আরওয়াকে বলে–
—একটা কাজে যাচ্ছি। ফিরতে লেট হতে পারে। তাজওয়াদ উঠলে ওকে সামলাবে। আমার জন্য বেশি কান্নাকাটি করলে আমায় ফোন দিবে।
আরওয়া চিন্তিত হয়ে বলল–
—এই শরীরে কোথায় যাচ্ছেন ম্যাম? আর কয়েকটা দিন পরে কাজে গেলে হতো না?
—না, হতো না। কিছু কাজ সময়েই শেষ করতে হয়। নাহলে এমন দুর্ভোগ জীবনে বারবার পোহাতে হবে।
জাওয়াদ ও আরওয়া কিছুই বুঝে না পূর্ণতার কথা। পূর্ণতা আরওয়ার সাহায্যে হসপিটালের ড্রেস চেঞ্জ করে নেয়। এর মধ্যে বাসা থেকে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে আসলে সে হসপিটাল থেকে বের হয়। জাওয়াদ তো কিছুতেই ছাড়বে না পূর্ণতাকে একা। তাই সেও অনেকটা জোর করেই পূর্ণতার সাথে চলে যায়।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২০৩৫
চলবে?
[নেক্সট আসবে বাংলাওয়াশ পর্ব। আ’ম ঠু এক্সাইটেড টু রাইট দ্যাট পার্ট🤭
সকলে একটা হলেও মন্তব্য করবেন, আমি আপনাদের মন্তব্য পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকি।🥹
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.২