Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪০.১


শেষপাতায়সূচনা [৪০.১]

সাদিয়াসুলতানামনি [ভায়োলেন্স এলার্ট❗]

নিস্তব্ধতা চাদরে মুড়িয়ে থাকা রাতের নিকষ কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে পূর্ণতা একভাবে। তার বাহিরটা না যতটা শান্ত হয়ে আছে, মস্তিষ্ক ততই অশান্ত। জীবনটা আবারও কেমন খাপছাড়া হয়ে গিয়েছে তার। সবকিছু এলোমেলো লাগছে। তার গাট ফিলিংস হচ্ছে, কোথাও কিছুই ঠিক নেই। জাওয়াদ, তার, তাজওয়াদ, আরিয়ান, আরওয়া সকলের জীবন কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। আর এই এলোমেলো করার পেছনে যার হাত রয়েছে সেই ব্যক্তিটি হলো আঞ্জুমান রুহী নামক নিকৃষ্ট সাইকো রমণী। যে কিনা নিজে শান্তিতে থাকছে আর নাই বা এতগুলোকে মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে।

আজ সন্ধ্যার পর থেকেই এসব ভাবনা আরো বেশি করে তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আজই কেন এত বেশি ভাবছে এই বিষয়গুলো নিয়ে? তাহলে চলুন সন্ধ্যার পর থেকে হওয়া কিছু ঘটনা দেখে আসি।


~কয়েক ঘন্টা পূর্বের ঘটনা~

পূর্ণতা আরওয়াদের সাথে প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ করে রান্নাঘরে এসে দেখে আঞ্জুমানের মুখটা একটুখানি হয়ে আছে আর সে আনমনেই তরকারির হাড়িতে নাড়ছে। চুলো গ্যাস বেশি ছিলো বলে, তরকারিটাও পুড়ে গিয়েছে। পূর্ণতা শান্ত ভঙ্গিতে চুলোর কাছে গিয়ে গ্যাসটা বন্ধ করে দেয়। তার উপস্থিতিতে আঞ্জুমানের ধ্যান ভঙ্গ হয়। সে যখন দেখে তরকারি পুড়ে গিয়েছে তখন আফসোস করতে থাকে। পূর্ণতা তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের ও ছেলের জন্য ঝাল বিহীন নুডলস বানিয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে দেখে তাজওয়াদ লাফাতে লাফাতে নিচে নামছে সিড়ি দিয়ে।

পাঁচ-ছয়টার মতো সিড়ি যখন বাকি ছিলো তখনই বাচ্চাটা পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলে পড়ে যেতে নেয়। পূর্ণতা ছেলেকে পড়ে যেতে দেখে নুডলসের বাটি ফেলেই দৌড় দিতে নেয়, তবে সে তখন বেশ খানিকটা দূরেই ছিলো। দৌড়ে এসে ধরা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু পূর্ণতা ধরতে না পারলেও তাজওয়াদকে পড়া থেকে বাঁচিয়ে নেয় অন্য একটা কোমল হাত।

আরওয়া ও তার মা তখন মাত্রই বসা থেকে উঠেছিলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য গেস্টরুমের যাবে বলে। তারা যখন সিঁড়ির দিক দিয়ে নিচের গেস্টরুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিয়েছিল তখনই তাজওয়াদ পড়ে যেতে নেয়। দৃশ্যটা আরওয়ার চোখে ধরা পড়ে আর সে তাজওয়াদকে পড়ার আগেই দৌড়ে গিয়ে নিজে ধরে ফেলে বাহুতে জড়িয়ে নেয়। এই যাত্রায় তাজওয়াদ নাক ফাটতে ফাটতে বেঁচে যায়।

পূর্ণতা দৌড়ে এসে আরওয়ার থেকে ছেলেকে নিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। মা-ছেলে সমান তালেই কাঁপছে। তাদের বাসায় সিঁড়ি গুলো ভালোই উঁচু। আগের আমলের তৈরিকৃত আহমেদ বাড়ি বেশ আভিজাত্যপূর্ণ ভাবেই বানিয়েছিলো পূর্ণতার মরহুম দাদা। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেক কিছুরই পরিবর্তন এলেও কিছু জিনিসকে কি আসলেই পরিবর্তন করা যায়?

পূর্ণতা ছেলেকে বুকের থেকে সরিয়ে তার হাত-পা চেক করতে থাকে। কোথাও কোন ব্যথা পেয়েছে কিনা।ছেলেকে সুস্থ পেয়ে পূর্ণতার কলিজায় পানি আসে। আরওয়া তার কাছে এসে শান্ত গলায় বলে–

—আল্লাহ রক্ষা করেছেন আপু। আপনি নিজেকে সামলান, বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছে। ওকে শান্ত করা জরুরি এখন।

আরওয়ার কথায় পূর্ণতা নিজেকে একটু শান্ত করে। ছেলেকে কোলে নিয়ে সোফায় বসে নানানভাবে শান্ত করায়। তার সাথে ছিলো বাড়ির অন্যরাও। তাজওয়াদ পুরোপুরি শান্ত হতেই পূর্ণতা তাকে বলে–

—আব্বু, ঐ আন্টি টার জন্য তুমি ব্যথা পাওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছো। যাও তাঁকে গিয়ে থ্যাঙ্ক ইউ বলে আসো। আর নিজের স্পেশাল হাগ দিয়ে আসো।

পূর্ণতা আরওয়াকে দেখিয়ে কথাগুলো বলে। তাজওয়াদ লক্ষী বাচ্চার মতো মায়ের আদেশ পালনে লেগে যায়। সে ছোট ছোট কদম ফেলে আরওয়ার কাছে আসে। আরওয়া তখন দাড়িয়ে ছিলো বলে, তাজওয়াদ তার ভেজা গলায় বলে–

—আন্টি তুমি ইত্তু নিচু হও। তাজ তো ছুতো, ওত উপলে গিয়ে তোমাকে স্পেশাল হাগ দিতে পালবে না।

তাজওয়াদের তোতলা তোতলা কথায় আজ বহুদিন পর আরওয়ার ঠোঁটে হাসির দেখা মিলে। সে হাঁটু গেড়ে তাজওয়াদের সামনে বসতেই তাজওয়াদ আরেকটু এগিয়ে এসে তাকে টাইট করে জড়িয়ে ধরে। আরওয়াও তাঁকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে ধরে। হাগ দেওয়া শেষে তাজওয়াদ এক্সট্রা ভাবে আরওয়াকে দু’টো আদর দেয় তার দুই গালে। আরওয়ার গলা জড়িয়ে ধরেই বলে–

—থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি ফর সেভিং মাই লাইফ। তুমি একটা এঞ্জেল। আমি কি তোমাকে “এঞ্জেল আন্টি” ডাকতে পারি?

আরওয়া তার একটা গাল সামান্য টিপে দিয়ে বলে–

—অবশ্যই তুলতুল বাচ্চা। তবে আমিও তোমাকে তুলতুল বাচ্চা ডাকতে চাই। পারমিশন পাবো কি?

তাজওয়াদ মিষ্টি করে হেঁসে তাকে সম্মতি দেয়। পূর্ণতা নিজে গিয়ে আরওয়াকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ দেয়। কৃতজ্ঞতা পূর্ণ গলায় বলে–

— তোমাকে ধন্যবাদ দিলেও বোধহয় আমার কম হয়ে যাবে, শুধু বলবো ইনশা আল্লাহ কোন একদিন এর উপকারের সুন্দর একটা প্রতিদান দিবো।

প্রতিউত্তরে আরওয়া শুধুই মুচকি হাসি দিয়েছিল। পূর্ণতা খেয়াল করে দেখে, মেয়েটার চেহারায় কেমন একটা ভঙ্গুর ভাব রয়েছে। চোখের নিচে রাত জাগা দিনগুলো প্রমাণ স্বরূপ গাড়ো কালো হয়ে আছে। কপালে, মুখে, থুতনিতে কয়েকটা লাল ব্রণ রয়েছে। কিন্তু তার নজর আঁটকে যায় আরওয়ার ঠোঁটে কোণের ও বাম গালের কালো দাগগুলোতে। আবছায়া কালো কালো দাগগুলো সে এর আগেও দেখেছে। এমনকি একদিন নিজের গালেও এর উপস্থিতি পেয়েছিল।

শক্ত-পোক্ত পুরুষালী হাতের জোড়দাড় আঘাতের চিহ্ন এটা। পাঁচ বছর আগে জাওয়াদ তার গায়ে হাত তুলেছিল, সেই আঘাতের চিহ্ন প্রায় পাঁচ দিনের মতো ছিলো। বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন সেই পাঁচ বছর আগে চলে গেলেও, মন লাগা আঘাতগুলো এখনও দগদগে রূপে রয়েছে। যখন জাওয়াদ বা তার সাথে রিলেটেড লোকদের দেখে তখনই সেই আঘা*ত গুলোয় ব্যথা শুরু করে।

পূর্ণতা হাত উঠিয়ে আরওয়ার বাম গালটা আলতো ভাবে স্পর্শ করে। আরওয়া একটু কেঁপে এক কদম পেছনে চলে যায়। তার চোখে মুহূর্তের মাঝেই জমা হয় বিষাদের অশ্রুকণা। পূর্ণতা অবাক হয়ে যায় আরওয়ার চোখে পানি দেখে। তার মন তাকেই প্রশ্ন করে বসে–

—এ কি আরেক পূর্ণতা?

আরিয়ান আরওয়াদের ফ্রেশ হতে তাড়া দিতেই ওরা নিচের গেস্ট রুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে সকলে একসাথে নাস্তা করতে বসে। পূর্ণতাও সেখানেই থেকে যায় তাজওয়াদের জেদে। ছেলেটার আরওয়াকে এতটা ভালো লেগেছে যে, সে আবারও কথা বলতে চায় তার সাথে। পূর্ণতা তাকে যখন নুডলস খাইয়ে দিচ্ছিলো তখনও মায়ের কানে কানে আবদার পেশ করেছে ছোট জনাব–

—মাম্মা, আমি খেলা কলতে চাই এঞ্জেল আন্টির সাথে।

পূর্ণতা ছেলের মুখে আরেক চামচ নুডলস দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে–

—আমার সংসদে আপনার প্রস্তাব পাশ হবে না। আর নাই বা আগামী তিনদিন আপনি কোন প্রকার চকলেট পাবেন।

তাজওয়াদ মুখটা কাঁদো কাঁদো করে জিজ্ঞেস করে–

—কেনু মাম্মা? তাজ কি কলেছে?

—তোমাকে আমি রুমে বসিয়ে রেখে আসলাম, বললাম আমি দশ মিনিটে আসছি। কিন্তু তুমি মাম্মার কথা না শুনেই চলে আসলে। এসে আবার কি করলে? লাফাতে লাফাতে সিড়ি দিয়ে নেমে পড়ে যেতে নিচ্ছিলে। ঐ আন্টিটা না ধরলে বুঝতে পারছো এখন তুমি কোথায় থাকতে? দেশে আসার পর থেকে তুমি কিন্তু অনেক অবাধ্যতা করছো তাজ।

মায়ের বকুনি শুনে তাজওয়াদের মনটা খারাপ হয়ে যায়। সেকেন্ডের ব্যবধানে তার চোখে অথৈজলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পূর্ণতা দেখেও দেখে না এবার। মাঝে মধ্যে সাহস না করলে বাচ্চারা লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। তাজওয়াদ বেশ কয়েকবার সরি চায় নিজের কর্মের জন্য। কিন্তু পূর্ণতা প্রতিত্তোরে কোন কিছুই বলে না।

এর মাঝে আরওয়ারা ফ্রেশ হয়ে আবারও ড্রয়িংরুমে এসে বসে। ড্রয়িংরুমে তখন রয়েছে, পূর্ণতা, তাজওয়াদ, আরিয়ান,রাসেল, ও আরওয়া। আহনাফ সাহেবের অফিস থেকে জরুরি কল আসায় উনি সেটা এটেন্ড করতে গিয়েছেন। রাসেলের মা রেস্ট নিচ্ছেন। মিসেস আহমেদের মাথা ব্যথা করছিলো বলে সে রুমে শুয়ে আছেন। আর আঞ্জুমান রান্নাঘরে রান্না করছে।

টুকটাক নাস্তা-পানি খেয়ে রাসেল এবার আসল কথা বলার জন্য মুখ খোলে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করে–

—বন্ধু অনেক বিপদে পড়ে তোর কাছে আসা। আশা করি তুই খালি হাতে ফিরিয়ে দিবি না।

আরিয়ান তাকে আশ্বস্ত করে বলে–

—তুই নির্দ্বিধায় বল আমায় দোস্ত, আমি সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করবো তোকে।

—একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবি? আমার জন্য না, আমার বোনের জন্য।

—হ্যাঁ, তা তো পারবো ইনশা আল্লাহ। কিন্তু কয়েকদিন আগেও তুই ফোন দিয়ে জানালি উনি বিসিএস পরীক্ষায় টিকে গিয়েছে, শিক্ষা ক্যাডারে। তাহলে সরকারি চাকরি ফেলে অন্য চাকরি…….

খানিক বিভ্রান্তি নিয়েই বলে আরিয়ান। রাসেল নিজের কষ্ট গুলো দীর্ঘশ্বাসের মাধ্যমে বের করে দিতে চায়। তারপর বলে–

—আমরা ভাই বোন শুরু থেকেই কপাল পোড়া রে বন্ধু। বোনটা আমার আরো বেশি। জন্মের কয়েক বছর পর বাবার মৃত্যু, আজ এত ভালো একটা চাকরি পেয়েও জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এখানে আসতে হলো।

পূর্ণতা, আরিয়ান রাসেলের কথায় অবাক হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে মানে?

—গত কয়েক বছর ধরেই আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে আরওয়াকে উত্যক্ত করছিলো। বিয়ে করবে বলে কয়েকবার প্রস্তাবও দিয়েছিল, কিন্তু আমরা মানা করে দেই। ছেলে এক নাম্বারের লম্পট, বখাটে, আর দুশ্চরিত্রবান। আগেও দুটো বিয়ে করেছে বাপটাও বেশি ভালো না, দূর্নীতি বাজ এক নাম্বারের। এমন এক পরিবারে আমরা কি করে জেনেশুনে আমাদের মেয়ে দেই বল?

গত একমাস আগে হাবিব মানে চেয়ারম্যানের ছেলে আরকি, ও আরওয়ার সাথে অস*ভ্যতা করে মাঝরাস্তায়। আরওয়া ওকে অপমান করে বাসায় চলে আসে। সেই অপমান ও এত বছর ধরে রিজেকশনের বদলা নিতে গত এক সপ্তাহ আগে, সন্ধ্যায় আরওয়া যখন পড়িয়ে বাসায় ফিরছিলো, তখন ওকে জোর তুলে নিয়ে যায়৷ নিজেদের আড্ডাখানায়।

শেষের কথাগুলো বলার সময় রাসেলের গলা কেমন ভারী হয়ে যায়। পূর্ণতা আরওয়ার দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়েটা কেমন চোখ-মুখ ইস্পাতের ন্যায় শক্ত করে নিচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। চোখে তার অশ্রুর মেলা থাকলেও, সেটা অপমান বা লজ্জার জন্য আসা অশ্রু নয় সেটা পূর্ণতা বুঝতে পারে। আরিয়ানও এক ফাঁকে আরওয়ার দিকে তাকায়। আরওয়ার মুখের দিকে তাকাতেই তার বুকটা অকারণেই কেঁপে ওঠে। কেন এমনটা হয় সে নিজেও জানে না।

রাসেল নিজেকে সামনে বলে–

—ঐ শয়তান আমার বোনের সম্ভ্রম-হানি করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভাগ্য সহায় থাকায় পারেনি। হাবিব যখন আরওয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন আরওয়া এমন একটা ভান করে যেনো সে পরাজিত হয়ে গিয়েছে ওর সামনে। হাবিব বিষয়টা নিজের বিজয় হিসেবে ভেবে উল্লাস করতে করতে যখন আরওয়ার দিকে এগোচ্ছিলো, তখনই আরওয়া ওর খোঁপায় থাকা স্টিলের স্টিক বের করে হাবিবের ডান চোখে ঢু*কিয়ে দেয়। হাবিব ব্যথায় ককিয়ে পেছনে সরে যেতেই…..

—জানোয়ারটার ডান চোখ থেকে স্টিক বের করে ওর বাম চোখে ঢুকিয়ে দেই। দু’টো চোখই নষ্ট করে দেই একেবারের জন্য। যাতে ঐ চোখ দিয়ে আর কোন মেয়ের দিকে তাকাতে না পারে। কুকুরটার সাঙ্গোপাঙ্গ গুলো হয়ত মদ খেতে কোথাও চলে গিয়েছিল, তাই ওর চিৎকারে ছুটে আসেনি। আমাকে আটকে রাখা রুমটার বাহিরে এসে ওদের কাউকেই পাইনি।

তখন আমার মাঝে আরেক সত্ত্বা বলে উঠলো, যেটা দিয়ে আমার মতো কত-শত মেয়েকে নষ্ট করতে চেয়েছে বা করেছে, সেটার উত্তেজনা চিরকালের জন্য কমিয়ে দিলে কেমন হয়? প্রশ্নটা মাথা আসতেই, আমার মধ্যকার সব বিবেকবুদ্ধি যেনো লোপ পেয়ে যায়। এক অসু*রে শক্তি ভর করে আমার মাঝে। আমি চাঁদের আলোয় জঙ্গলের আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে একটা মাঝারি সাইজের পাথর পেয়ে যায়। পাথর টার সাইজ এতটাই বড় ছিলো, আমার মতো তিনজন মানুষের হয়ত উঠানো লাগবে। কিন্তু আমার মাঝে তখন এত শক্তি কোথা থেকে আসলো আমি নিজেও জানি না, নিজে একাই ঐ বড় পাথরটা উঠিয়ে শয়তান টার বংশ প্রদীপ চিরকালের জন্য নিভিয়ে দেই।

একদম হাড় হিম করা ঠান্ডা গলায় কথাগুলো বলে আরওয়া। তার মুখে না রয়েছে কোন অনুতাপ, নাইবা রয়েছে কোন অস্থিরতা। রয়েছে শুধু একরাশ স্বস্তি। যেনো নিজের কাজে নিজেই গর্বিত সে। পূর্ণতা আর আরিয়ান তার কথায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ভুলে গেছে বোধহয়।

আরওয়া থামার কিছুক্ষণ পর রাসেল বলে–

—পরেরদিন সকালে হাবিবের চেলা পেলারা ওকে ঐ অবস্থায় পেয়ে হসপিটালে নিয়ে যায়। হাবিবের অবস্থা বেশি একটা ভালো না। যখন-তখন যা কিছু হয়ে যেতে পারে। হাবিব বাবা চেয়ারম্যান সাহেব পড়েছে আরওয়ার জীবনের পেছনে। ছেলের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়ে গিয়েছে। আমাদের কিছু না করতে পারলেও যা কিছু হয়ে যাক, আরওয়াকে উনারা ছাড়বে না। আমি, তোর ভাবী, আর মা গ্রামেই বা তোর ভাবীর গ্রামে থাকতে পারব। কিন্তু আরওয়াকে ওখানে রাখা একদমই সেফ না। তাই উপয়ান্তর না পেয়ে তোর কাছে ছুটে আসা।

আরওয়া ঢাকায় থাকলে অন্তত আমরা নিশ্চিত থাকবো, ওর নাগাল পাবে না চেয়ারম্যান। আমাদের চার কূলে কেউ নেই ঢাকায় এটাই গ্রামের সকলে জানে। তাই চেয়ারম্যান ভাবতেও পারবে না যে, আরওয়া ঢাকায় আছে।

আরিয়ান তখনও তব্দা খেয়ে বসে আছে। কি মেয়ে মাইরি! এক ছেলের বংশের প্রদীপ জ্বালানোর মেশিন নষ্ট করে দিয়েছে, তার চোখ কানা করে দিয়েছে। এটা মেয়ে নাকি যমদূত?

অন্যদিকে আরওয়ার কথা শুনে পূর্ণতা ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। বেশ মনে ধরেছে মেয়েটাকে। একদম তার মন মতো। পূর্ণতা রয়েসয়ে তাদের সামনে আরওয়াকে অফার করে–

—জব করবে আমার কোম্পানিতে? আমার পি.এ. হয়ে?

পূর্ণতা অফার শুনে আরওয়া চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। শান্ত গলায় বলে–

—আমার দুঃখের কথা শুনে করুণা করছেন বুঝি?

আরওয়ার কথা পূর্ণতার ঠোঁটের কোণের হাসি আরেকটু চওড়া হয়। নাহ, সহজে টলানোর মতো মেয়ে এ নয়।

—উঁহু, একদমই ভেবো না করুণা করে দিচ্ছি। বাকিদের মতো পরীক্ষা দিয়ে টিকতে হবে। করুণা না নিজে নিতে পছন্দ করি, আর নাই বা অন্য কাউকে প্রয়োজন ব্যতীত দিতে পছন্দ করি। গত উইকেই আমার রিসেন্ট পি.এ. এর বিয়ে হয়েছে, এখন আর সে চাকরি করবে না। তাই ওর পোস্টে আসার জন্য লোক হায়ার করা হচ্ছে।

পূর্ণতা নিজের জামার পকেট থেকে ফোনটা বের করে কিছুক্ষণ টিপে, একটু পরই আরিয়ানের ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হয়।আরিয়ান ফোনটা নিয়ে দেখে পূর্ণতা পাঠিয়েছে। আরিয়ান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পূর্ণতার দিকে তাকালে পূর্ণতা বলে–

—ভাইয়ার কাছে সব ডিটেইলস দিয়ে দিয়েছি। ইন্টারভিউ পরশু হবে। বাকি সব তথ্য ফর্মটাতে পেয়ে যাবে।

কথা শেষ করেই তাজওয়াদকে নিয়ে উপরে চলে যায়। পূর্ণতা ফরওয়ার্ডনেস অন্যদের কাছে রূঢ় মনে হলেও, মেয়েটা যে কতটা কোমল মনের অধিকারী সেটা খুব কম সংখ্যক মানুষই জানে।


রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে যে যার রুমে চলে যায়। পুরো বিকেল মা-ছেলে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে বলে দু’জনই বর্তমানে রাতজাগা পেঁচার ন্যায় সজাগ। এর মাঝে তাজওয়াদ আবদার করে তারা মুভি নাইট করার। এই ছেলের আবদারের শেষ নেই! পূর্ণতা প্রথমে মানা করে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে শুয়ে পড়লেও, ঘন্টাখানেক হওয়ার পরও যখন তাদের কারোই ঘুম পাচ্ছিল না তখন উঠে বসে। ল্যাপটপে একটা ডিজনি মুভি ছেড়ে দিয়ে তাজওয়াদকে দেখতে বলে পূর্ণতা নিচে নেমে আসে। পপকর্ণ, আর সফট ড্রিঙ্কস নেওয়ার জন্য।

সে যখন একটা ট্রে তে জিনিস গুলো নিয়ে পুনরায় উপরের আসছিলো, তখনই দু’জন ব্যক্তির কথা কাটাকাটির শব্দ এসে তার কানে লাগে। সবকিছু নিশ্চুপ, শান্ত ও কোলাহল না থাকায় ফিসফিসিয়ে বলা কথাও বেশ ভালোই শোনা যাচ্ছে।

পূর্ণতা সেই ফিসফিসানি শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে চলে যায় সিঁড়ির পেছনের দিকটায়। বাগান থেকে আসা আবছায়া আলোয় দেখতে পায় দুইজন রমণী উতপ্ত ভঙ্গিতে বাক্য বিনিময় করছে। পূর্ণতা আরেকটু কাছে গিয়ে দেখে এক রমণী বলছে–

—আমার দান নিয়ে আবার আমার সাথেই গলা বাজি? বেশি বাড়াবাড়ি করবি না একদমই। দানের জিনিস অন্তত আমি আরওয়া ফেরত নেই না। আমার চাকরি হলেই আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাবো। আমাকে আমার মতো থাকতে দে, নাহলে ফলাফল ভালো হবে না।

ক্ষুদ্ধ ভাবে কথাগুলো বলে আরওয়া সেখান থেকে চলে যায় নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে। একটু পর আঞ্জুমানও সেখান থেকে বের হয়ে এসে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়। তারা সিঁড়ি অন্য পাশ দিয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে দাড়িয়ে থাকা পূর্ণতাকে দেখতে পায়নি। পূর্ণতা যদিও তাদের কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছে। আরওয়ার কথা শুনে মনে হলো, আঞ্জুমান তার আসাটা পছন্দ করছে না। কিন্তু কেনো? আঞ্জুমানের কথা অনুযায়ী এই মেয়েই তো তার নাম্বার আরিয়ানকে দিয়েছিল, যার জন্য তার আর আরিয়ানের সম্পর্ক হয় এবং পরবর্তীতে হয়। সেই মেয়ের আসাটা কেন পছন্দ না আঞ্জুমানের? আর আরওয়া কি বললো? দান? কি দান করেছে?


~বর্তমান~

এসব নিয়েই ভাবছিলো পূর্ণতা বেলকনিতে দাড়িয়ে। হালকা ঠান্ডা লাগায় রুমে আসে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ছেলের গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা আরেকটু টেনে দেয়। মাথার পাশে বসে কতক্ষণ হাত বুলিয়ে দেয় নিজের অস্তিত্বের এক টুকরো অংশকে। অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে গিয়েছে বাচ্চাটা। তারপর নিজেও শুয়ে পড়ে তার পাশে। কিন্তু ঘুম বাবাজি এখনও ধরা দেয় না।

হঠাৎই বেলকনি থেকে কেমন উদ্ভট আওয়াজ শুনতে পায়। এত রাতে বেলকনি থেকে এমন আওয়াজ আসার কারণ পেলো না পূর্ণতা। ভুতপ্রেতে এতটা বিশ্বাস নেই, কিন্তু হ্যাঁ, জ্বিনে বিশ্বাসী সে। সে দ্বিধান্বিত মন নিয়ে বেলকনির দিকে পা বাড়ায়। বেলকনির দরজা সে কস্মিনকালেও লাগাতো না। সে শীত হোক আর গ্রীষ্মকাল। শীতকালে প্রচন্ড শৈত্যপ্রবাদ হলে তখন কয়েকদিন বন্ধ রাখে, নাহলে রাখে না। তার হাস ফাঁস লাগে নাকি বেলকনির দরজা বন্ধ রাখলে।

পূর্ণতা ছোট ছোট কদম ফেলে বেলকনির দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়। পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকাতেই তার চক্ষু কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চায়…….

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]

শব্দসংখ্যা~২৩৬৫

চলবে?

[এত বড় পর্ব দিতে মন চায় না আপনাদের। আপনারা বড় পর্বগুলোতে রেসপন্স করেন না একদমই😒💔 আজকের পর্বে রেসপন্স বেশি করলে আগামী পর্বও বড় বড় আকারে আসবে।

সকলে অন্তত একটা হলেও কমেন্ট করবেন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply