Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.২


শেষপাতায়সূচনা [৩৮.২]

সাদিয়াসুলতানামনি

—পিপি, তুমি পললে কিভাবে টনি আঙ্কেলের উপল?

তাজওয়াদ গোল গোল চোখে তাকিয়ে জিনিয়াকে প্রশ্ন করে। তাজওয়াদের প্রশ্নটা শুনে জিনিয়া আরো লজ্জা পেয়ে যায়, তাই সে তাড়াতাড়ি করে টনির উপর থেকে উঠতে চায়। কিন্তু বিধিবাম! জিনিয়ার চুল গিয়ে আঁটকে যায় টনির শার্টের বোতামের সাথে। তাই সে যখন উঠতে যায় তখন চুলে টান লেগে আবারও ধপ্ করে এসে পড়ে টনির বুকের উপর। এবার টনি সেই রেগে যায়। রাগে কিড়মিড়িয়ে বলে–

—একটা মানুষ এতটা চাইল্ডিস, নাদান কিভাবে হতে পারে তা আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না মিস লিলিপুট। দেখছেন শার্টের বোতামে চুল আঁটকে গিয়েছে তাও আপনার নাচানাচি না করলে হচ্ছিল না, তাই না? যত্তসব ছোট আণ্ডাবাচ্চা!

একের পর এক অপমানে জিনিয়ার ফর্সা মুখ রাগে লাল হয়ে থাকে। আরে ভাই সে কি খেয়াল করেছিল যে তার অবাধ্য চুল এই অসভ্য লোকের শার্টের বোতামে গিয়ে আটকে গিয়েছে? জিনিয়া জেদ করে নিজের চুল টান দিয়ে ছিঁড়েই ফেলে টনির শার্টের বোতাম থেকে। তারপর নিজেই তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ে টনির উপর থেকে। তারপর তাজওয়াদের কাছে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলে–

—বলে স্লিপ কেটে পড়ে গিয়েছি সোনা। কেমন আছো তুমি?

জিনিয়া আর তাজওয়াদ কথা বলতে থাকে। এই ফাঁকে জাওয়াদ টনিকে নিয়ে রুমের বাহিরে চলে আসে কিছু কথা বলার জন্য। তারা দু’জন গিয়ে একটা ফাঁকা করিডরে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর জাওয়াদ টনিকে বলতে থাকে কিভাবে সে আর পূর্ণতা আলাদা হলো। সবটা শুনে টনির বেশ খারাপই লাগে। এখানে ভুক্তভোগী জাওয়াদ-পূর্ণতা দু’জনই। জাওয়াদের যেমন দোষ রয়েছে পূর্ণতারও সামান্য হলেও দোষ আছে। সব শুনে টনি বলে–

—সবই বুঝলাম, কিন্তু আমি আমার দায়িত্ব থেকে সরতে পারব না। ম্যাম আমার কাজে গাফেলতি পেলে আমাকে কাজ থেকে বের করে দিতে দুইবারও ভাববে না। আর আমি কিছুতেই এই কাজটা ছাড়তে পারব না।

জাওয়াদ তার কথা শুনে কিছুটা অশান্ত ভঙ্গিতে বলে–

—আমার বিশ্বাস, তোমার ম্যাম এমনটা করবে না। আর যদি করেও আমি তোমাকে আমার কোম্পানিতে চাকরি দিবো। তুমি টাকা পয়সার টেনশন করো না। তোমাকে সব রকমের ফ্যাসিলিটিজ দেওয়া হবে।

তুমি জাস্ট আমাকে পূর্ণ আর তাজওয়াদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ করে দাও প্লিজ। আমি পূর্ণতাকে হাসিল করতে চাই। ওদের নিয়ে আমি একটা সংসার সাজাতে চাই। আমার পূর্ণর স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমি ভুল করেছি। না, না ভুল না অন্যায় করেছি। কিন্তু সেই অন্যায়টা এখন শুধরে নিতে চাইছি।

টনি শান্ত হয়ে জাওয়াদের কথা শুনে, জাওয়াদ থামতেই টনি বলা শুরু করে–

—টাকা-পয়সার বিষয় না ভাইয়া এখানে। আমার যা একাডেমিক সার্টিফিকেট আছে তাতে আমি অনায়াসেই ভালো কোম্পানিতে চাকরি পেতে পারি। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার পড়াশোনা শেষ হয়েছে গত বছরই। আমি ম্যামের সাথে থাকতে চাইছি, কারণ উনি যেমন একা, উনার চারকূলে আপনজন যেমন থেকেও নেই। আমিও ঐ পথেরই পথিক।

পাঁচ বছর আগে উনার সাথে আমার দেখা কানাডার মাটিতে। আমার মাও ম্যামের মতোই ছোট থাকতে মারা যান। বাবা আমার জন্য আরেকজন মায়ের ব্যবস্থা করে ঠিকই, কিন্তু ঐ মহিলা আমার মা হয়ে উঠতে পারেননি কখনোই। বাবার বিয়ের একমাস পরেই আমার বাবা কানাডায় পাঠিয়ে দেয় তার বোনের কাছে পড়ালেখা করার জন্য। সেই যে ঘর ছাড়া হলাম, আজও সেই ঘরে ফিরতে পারি নি।

পাঁচ বছর আগে আমার ফুফুরা দেশে চলে যান স্থায়ী ভাবে। আমাকেও নিতে যেতে চেয়েছিল তাদের সাথে। পরে আমি জানতে পারি দেশে ফিরলে আমার ফুফাতো বোনের সাথে আমায় বিয়ে দিবেন বাবা। আমার বাবা ভীষণ লোভী প্রকৃতির মানুষ। তাই আমার কথা চিন্তা না করেই, আমার কোন মতামত না নিয়েই তিনি তার দুশ্চরিত্রবান ভাতিজির সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলেন শুধু মাত্র সম্পত্তির লোভে। আমি জানতে পেরে মানা করে দেই বিয়েটা করতে। তখন আমার বাবা আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করে, আমার সকল খরচাপাতি দেওয়া বন্ধ করে দেন হুট করেই। আমি ভাবতেও পারি নি, বাবা সম্পত্তির লোভে এমন কিছু করবে। একদমই আচমকা টাকাপয়সা না দেওয়ায় আমি পরেছিলাম অকুল দরিয়ায়। বাসা ভাড়া না দিতে পারার কারণে বাসার মালিক আমায় বের করে দেন বাসা থেকে।

কানাডার শীত কেমন তা নিশ্চয়ই আপনাকে বলা লাগবে না। সারারাত রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে থাকার কারণে ঠান্ডায় প্রায় ম**রতে বসেছিলাম, তখন পূর্ণতা ম্যাম এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। উনি তখন প্রেগন্যান্ট ছিলেন আর কানাডার অন্টারিও-র একটা স্কুলে চাকরি করতেন। আমি সুস্থ না হওয়া অব্দি আমার সকল খরচ সেই বহন করেন। সুস্থ হওয়ার পর আমার সাথে ঘটা কাহিনি জানতে পেরে সেই আমাকে একটা ক্যাফেতে পার্টটাইম জবের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পড়ালেখায় ক্ষতি হবে দেখে ফুলটাইম জব করতে দিতেন না তিনি। নিজেও আমাকে ভীষণ আর্থিক সাহায্য করতেন।

নিজের জন্মদাতা পিতা যেখানে তার স্বার্থে আঘাত লাগার কারনে আমায় এমন কষ্ট দিয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা একটা মানুষ আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি না থাকলে হয়ত আমি সার্ভাইভ করতে পারতাম, কিন্তু সেটা করতে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। পূর্ণতা ম্যামকে আমি ম্যাম সম্বোধন করলেও, মনে মনে তাকে নিজের বোনই ভাবী। পড়ালেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি অন্টারিওতে একটা কোম্পানিতে চাকরি নেই ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে নিজের ইচ্ছেতেই হয়ে যাই ম্যামের পারসোনাল বডিগার্ড। আমার মন বারবার বলতো, আমার যদি একটা বোন থাকত, তাহলে কি আমি তাকে এভাবে একা থাকতে দিতে পারতাম?

আপনার কি মনে হয় না, এজন্য হলেও আমার কৃতজ্ঞতা থাকা দরকার ম্যামের উপর? আমি আপনাদের বিষয়টি অল্পস্বল্প জানতাম আগে থেকেই, আজ আপনি সবটা জানালেন। কিন্তু আপনাকে সাহায্য করতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। ম্যাম যদি জানতে পারে আমি আপনাকে তাদের কাছে আসার সুযোগ করে দিয়েছি তাহলে ম্যাম ভীষণ কষ্ট পাবেন।

জাওয়াদ সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনে। ভেবে দেখে টনির জায়গায় সে সঠিক। টনি কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই তার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার চেষ্টা করছে। তাও সে টনির হাত ধরে বলে–

—প্লিজ ভাই, এই সাহায্যটুকু করো। আমি বুঝতে পারছি তোমার মনের কথা। কিন্তু আমার দিকটাও একটু ভেবে দেখো প্লিজ। তোমার একটু কনসিডারে তোমার ম্যাম তার সংসার ফিরে পেতে পারে, তাজওয়াদ তার পরিবার পেতে পারে। তুমি তো জানো, বুঝো পরিবার ছাড়া বেঁচে থাকা কতটা কঠিন। আমার তাজওয়াদের পুরো একটা পরিবার থাকতে সে একা একা বড় হচ্ছে, শুধু তার বাবার ভুলের জন্য। তোমরা সবাই যদি আমাকে আমার ভুলটা শোধরানোর সুযোগ না দাও, তাহলে পূর্ণতা আর তাজওয়াদ কখনোই একটা ফ্যামিলি পাবে না।

কথাগুলো বলতে বলতে জাওয়াদের চোখে অশ্রু এসে জমা হয়েছে। টনি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। জাওয়াদের চোখ স্পষ্ট বলে দিচ্ছে সে কতটা অনুতপ্ত নিজের কাজে। মায়ের বাধ্যগত সন্তান হতে গিয়ে আজ কয়েকটা বছর ধরে সে কতটা যন্ত্রণা ভুগছে সেটাও তার চোখে ভেসে উঠেছে। একজন পুরুষ যখন প্রিয় মানুষটিকে পেতে নির্দ্বিধায় চোখের পানি ফেলতে পারে অন্যের সামনে, তখন বুঝতে হবে তার ভালোবাসা কতটা গভীর, কতটা প্রখর।

টনি নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জাওয়াদের কাঁধে হাত রেখে বলে–

—টেনশন করবেন স্যার। আমি আপনাকে সাহায্য করবো। কিন্তু আপনি একটু খেয়াল রাখবেন ম্যাম যাতে টের না পায় আপনার উপস্থিতি গুলো। তাহলে হয়ত আমারও বারোটা বাজিয়ে দিবে আপনার সাথে সাথে।

টনির কথা শুনে জাওয়াদ অশ্রুসিক্ত চোখেই হেঁসে দেয়। তারপর তারা দু’জনই চলে আসে কিডস জোনে। জাওয়াদকে দেখে জিনিয়া খেলা থামিয়ে তাজওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–

—তাজ বাবা, দেখো তো উনাকে চিনতে পারো নাকি?

জাওয়াদকে দেখিয়ে বলে জিনিয়া কথাটা। তাজওয়াদ পেছনে ঘুরে জাওয়াদকে দেখতে পেয়ে এক গাল ভর্তি করে হাসি দেয়। তারপর আদোও আদোও গলায় বলে–

—হুম চিনি তো। জানো পিপি, এই আঙ্কেলটা আগে পঁচা ছিলো, তাজের তাকে একতুও ভালো লাগত না। কিন্তু একদিন আমি আল মাম্মা ঘুলতে গিয়েছিলাম, মাম্মা ফুক্কা খাওয়ার কারণে অনেক ঝাল লেগেচিলো। তখন উনি সুপার হিলোল মতো এচে, আমাল মাম্মাকে পানি দিয়েচিল। তালপল থেকে এই আঙ্কেলটিকে তাজের অনেক ভালো লাগে। উনি ভালো আঙ্কেল। ভালো আঙ্কেল, তুমি একানে কি কচ্চো?

সন্তানের কাছে বাবা ডাক শোনার পরিবর্তে আঙ্কেল ডাক শোনা কতটা পীড়াদায়ক সেটা জাওয়াদ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু কি আর করার! এমন সিচুয়েশন সে নিজেই তৈরি করেছে, তাই ভাগ্যকে দোষ দিলে এটা তার আরেকটা বড় বোকামি পূর্ণ কাজ হবে।

জাওয়াদ তাজওয়াদের সামনে এসে হাঁটু গেঁড়ে বসে, তারপর তার দুই গালে হাত রেখে বলে–

—আমি এখানে কাজ করি বাবা। তুমি এখানে কি করছো?

—মাম্মার আজ একানে মিটিং আচে, আমি তো মাম্মার বডিগার্ড, তাই মাম্মাকে প্লটেক্ট কততে তার সাথে সাথে আসছি।

জাওয়াদ তাজওয়াদকে বাহবা দিয়ে বলে–

—বাহ! আমাদের ছোট তাজওয়াদও তার মাম্মার বডিগার্ড। তা কি করছিলে তুমি সোনা?

তাজওয়াদ জিনিয়াকে দেখিয়ে বলে–

—এতা হচ্ছে আমাল পিপি। পিপির সাথে খেলছিলাম। তুমি খেলবে আমাদের সাথে?

জাওয়াদ তাজওয়াদকে ফিরতি প্রশ্ন করে–

—তাজওয়াদ কি নিবে আমাকে তাদের সাথে খেলায়?

—হ্যাঁ, নিবো তো। পিপি, এই আঙ্কেলটাকে নেই খেলায়?

জিনিয়া তাদের দুই বাপ-ছেলের কর্মকাণ্ড দেখে মনে মনে হেঁসে যাচ্ছে। কিন্তু উপরে একদম স্বাভাবিক। সে তাজওয়াদের প্রশ্ন শুনে বলে–

—হ্যাঁ, নিতেই পারি। কিন্তু উনাকে আর উনাকে (টনিকে দেখিয়ে) চোর হতে হবে। আর আমি তুমি হবো পুলিশ। আপনি রাজি মি.ভাইয়া?

জাওয়াদ খুশি মনে রাজি হয়ে যায়। টনি রাগী রাগী চোখে জিনিয়ার দিকে তাকালে জিনিয়া তাকে একটা গা জ্বালানো হাসি উপহার দেয়। তারপর ওরা খেলায় মশগুল হয়ে যায়। খেলতে খেলতে কখন যে সময় চলে যায় কারোরই খেয়াল থাকে না।

এদিকে পূর্ণতাও তার মিটিং শেষ করে কিডস জোনে এসে পড়ে। ঐতিহ্যর পক্ষ থেকে তাদেরকে বারবার লাঞ্চের অফার করায় তারা আর মানা করতে পারে না। একটু ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে খেতে বসবে। কিন্তু কিডস জোনে এসে পূর্ণতার চোখ বড় বড় হয়ে যায় যখন সে দেখে তাজওয়াদ জাওয়াদের সাথে গলায় গলায় ভাব করে খেলছে। জাওয়াদের কাঁধের উপর চড়ে ঘুরছে তাজওয়াদ আর প্রাণ খুলে হাসছে।

দৃশ্যটা অন্যসব মা অথবা স্ত্রীর জন্য স্বস্তি ও আনন্দের বিষয় হলেও, পূর্ণতা আনন্দিত হতে পারে না। বরং তার মনে এসে জমা হয় একরাশ ভয়। সে বড় বড় পা ফেলে জাওয়াদদের কাছে এসে তাজওয়াদকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় জাওয়াদের কাছে। তারপর নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাগান্বিত দৃষ্টি নিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে বলে–

—আমার ছেলের থেকে দূরে থাকুন মি.শেখ।

জাওয়াদ ভীষণ কষ্ট পায় তাজওয়াদকে এমন করে কেড়ে নেওয়ার কারণে। হ্যাঁ, মানছে সে দোষ করেছে। কিন্তু তাজওয়াদ যে তারও সন্তান এটা অস্বীকার করার কোন অপশন নেই। সে মলিন চোখে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে থাকে। জাওয়াদের চাহনি দেখে পূর্ণতার বুকে চিনচিনে ব্যথার সৃষ্টি হলেও পূর্ণতা সেটাকে পাত্তা দেয় না। কারণ সে যদি এই ব্যথাকে পাত্তা দেয়, তাহলে খুব সহজেই আবার ভেঙে পরবে।

হঠাৎই পূর্ণতার মাথায় একটা প্রশ্ন বিদ্যুৎ বেগে খেলে যায়। সেটা হলো, জাওয়াদ এখানে কি করছে? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে জিনিয়াও আছে। কিন্তু তারা দু’জন এখানে কেন? আর তারা জানলই বা কি করে পূর্ণতা বা তাজওয়াদ এখানে আছে।

প্রশ্ন গুলো পূর্ণতা সরাসরি জাওয়াদকে করেই বসে–

—ওয়েট এ মিনিট, আপনি এখানে কি করছেন? আর জিনি? তুমি এখানে? তোমরা কি করে জানলে আমরা এখানে আছি?

পূর্ণতার প্রশ্ন শুনে জিনিয়া থতমত খেয়ে তার ভাইয়ের দিকে তাকায়। চাহনি দিয়ে বুঝাতে চায়, ভাই তুমিই বলো কি বলবে। পূর্ণতার প্রশ্ন শুনে জাওয়াদের ম্যানেজার কামরুল ইসলাম বলতে নেয়–

—ম্যাম উনি আমাদের ব…..

কামরুল ইসলামকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে জাওয়াদ গম্ভীর গলায় বলে–

—আমি এখানে জব করি, আর আমিই জিনিয়াকে তোমাদের খবর দিয়েছি।

জাওয়াদ ঐতিহ্য ফ্যাশন হাউজে কাজ করে শুনে পূর্ণতার বেশি একটা ভালো লাগে না। কারণ তার এখানে কাজ করা মানে না চাইতেও পূর্ণতা আর তার সাক্ষাৎ হবে বারংবার।। যেটা সে একদমই চাইছে না।

অন্যদিকে জাওয়াদের ম্যানেজার এমন মিথ্যে কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। ততক্ষণে মাহবুবও দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে এসে উপস্থিত হয়। পূর্ণতার চোখ ফাঁকি দিয়ে ইশারা জিজ্ঞেস করে, জল কতদূর গড়ালো? জাওয়াদ তাকে চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে বেশি কিছু হয়নি।

কিন্তু তাদের এই চোখাচোখি পূর্ণতার কাছে ধরা পড়ে যায়। সে ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারে, মাহবুবকে সে এর আগেও দেখেছে। সিলেটে জাওয়াদের সাথে দেখেছিল। তখন একবারই দেখেছিল বলে আজ চিনতে পারেনি শুরুতেই। কিন্তু এখন চিনতে পেরেছে। পূর্ণতার এবার নিজের উপরই মেজাজ গরম হয়। বিষয়টা আগে কেন তার মাথায় আসলো না এরজন্য। আগে ধরতে পারলে, হয়ত ডিলটা সাইন করত না সে। এতে তাদের যত লসই হোতো না কেনো। পূর্ণতা বুঝে পায় না, যার থেকে সে দূরে থাকার জন্য এত প্রচেষ্টা করছে ভাগ্য তাকে বারংবার সেই মানুষটির কাছেই এনে রাখছে। কিন্তু কেনো?


ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহকে টেনে বাসায় ফিরে পূর্ণতা। তাজওয়াদ আজ একটু বেশিই ক্লান্ত থাকার কারণে ঘুমিয়ে পড়েছে সাতটার দিকে। পূর্ণতা ছেলেকে কোলে তুলে বাসায় ঢুকে একদম নিজের রুমে চলে যায়। প্রথমে ঘুমন্ত তাজওয়াদকে কোনমতে জামাকাপড় বদলে দিয়ে হাত-পা ভেজা টাওয়াল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। তারপর নিজেও ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে থাকে। সারাদিনের দৌড়ঝাপে আজ আবার মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। এই সময়ে তার একটা কড়া কফি চাই। কিন্তু শরীর বিছানা ছাড়তে চাইছে না।

পূর্ণতা যখন শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছিলো তখনই তার রুমের দরজায় কেউ নক করে। পূর্ণতা গিয়ে দরজা খুলতেই সামনে আঞ্জুমানকে দেখতে পায়। তার হাতে এক মগ কফি। সে কফিটা পূর্ণতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে–

—নাও তোমার জন্য এনেছি। তোমাকে দেখে অনেক টায়ার্ড লাগছিলো তাই ভাবলাম এটা তোমার প্রয়োজন হতে পারে।

পূর্ণতার আঞ্জুমানের এত ভালোবাসা সহ্য হয় না। তাকে সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে এখন এমন ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে। মানে আছে এসবের? সে চোয়াল শক্ত করে কাঠকাঠ গলায় বলে–

—তোমার কাছে চেয়েছি আমি কফি? দেখো নিজের চরকায় তেল দাও। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। তোমাকে আমি সেদিনও বলেছি, আজও বলছি তোমার সম্পর্ক আমার ভাই ও তার বাবা-মায়ের সাথে। আমার বা আমার ছেলের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তাই আমাদের মা-ছেলেকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। আমাকে রাগিয়ে নিজের কান্নার কারণ ডেকে এনো না।

কথাটা বলে পূর্ণতা আঞ্জুমানের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়। আঞ্জুমান দরজার একটু বেশি কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো বলে পূর্ণতা যখন দরজাটা লাগায় তখন সেটা এসে ঠাস করে লাগে তার নাকে। এনে আঞ্জুমান বেশ ভালোই ব্যথা পায়। রাগে আঞ্জুমানের ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায়। আসলে সে নিজেও আসতে চায়নি পূর্ণতার জন্য কফি নিয়ে। নিচে তার শ্বশুর মশাই ও স্বামী বসে ছিল। আরিয়ানই আঞ্জুমানকে পূর্ণতার জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসতে বলে। শ্বাশুড় আর স্বামীর সামনে ভালো সাজতেই সে কাজটা করে। এসে যে এমন অপমানিত হতে হবে সেটা সে আগে থেকেই জানত। আঞ্জুমান বিধ্বংসী রাগ নিয়ে পূর্ণতার রুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর শব্দ করে পা ফেলতে ফেলতে সেখান থেকে চলে যায় নিচে।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২১০৩
~চলবে?

[আজও “ছোট” বলে অভিযোগ করবেন? আপনারা বেশি বেশি রেসপন্স করলে আমারও বড় বড় করে পর্ব লিখতে ইচ্ছে হয়। আর অনিয়মিত বলে মন খারাপ করেন, এটার কারণ আমি কয়েকবার বলেছি। বলতে বলতে ক্লান্ত, তাই আজ আর বললাম না।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply