শেষপাতায়সূচনা [২৪]
সাদিয়াসুলতানামনি
সময়ের সাথে সাথে এতদিন জমে থাকা সকল দুঃখ, কষ্ট, অভিমান ক্রোধ হয়ে বের হয়ে আসতে চায় পূর্ণতার। সে চেয়েও নিজের গলার স্বর কমাতে পারে না। অন্যদিকে মিসেস শেখ ও আঞ্জুমান সর্তক থাকে এ বিষয়ে। একে তো জাওয়াদের রুম পাশেই। তার বেলকনিতে গেলেই মিসেস শেখের রুমের জানালা দিয়ে কথা শোনায় যায়। দ্বিতীয়ত, জাওয়াদ নিজেই বাসায় আছে বর্তমানে। তারা কোন ভুলভাল কথা বলে ফেললে পরে নিজেদের চালই উল্টো পরে যেতে পারে। মিসেস শেখ ক্ষীণ গলায় বলে–
—এটা কেমন অভ্যাস তোমার পূর্ণতা? একজনের রুমে আড়িপাতা, বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢুকে যাওয়া। আগেও দেখেছি তুমি এমনটা করেছো। এতটা ম্যানার্সলেস হলে কি করে হয়? এই তোমার বাবার দেওয়া আর্দশ শিক্ষা?
কথায় কথায় বাবার শিক্ষাকে আঙ্গুল তোলায় এবার পূর্ণতার ভীষণ রাগ হয়। তার বাবার দেওয়া শিক্ষা ভালো বলেই, এতদিন সব মুখ বুজে সহ্য করছে। কিন্তু আজ আর পূর্ণতা নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। সে চিৎকার করে বলতে থাকে–
—খবরদার আমার বাবার শিক্ষার উপর আর একবার আঙুল তুলবেন না। আমার বাবার দেওয়া শিক্ষা ভালো বলেই, আপনার সকল মানসিক অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করছি। আমার বাবার শিক্ষার উপর আঙুল তোলার আগে নিজের নিজে তাকান। একটা অসম্ভব আত্নগরীমা সম্পন্ন মানুষ আপনি এটা কি জানেন?
চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ শুনে জাওয়াদ ছুটে বেলকনি থেকে তার রুম পেরিয়ে মিসেস শেখের রুমের দিকে আসতে থাকে। তার রুম ও মিসেস শেখের রুম পাশাপাশি হওয়ায় জাওয়াদ মিসেস শেখের চাপা গলায় বলা কথা গুলো স্পষ্ট করে শুনতে না পারলেও পূর্ণতার চিৎকার করে বলা কথাগুলো ঠিকই শুনতে পেরেছে। নিজের মাকে এমন অপমানিত হতে শুনে জাওয়াদ ভয়ংকর রেগে যায়।
মিসেস শেখ ও পূর্ণতার কথার মাঝে আঞ্জুমান ঢুকে আসে। সেও তার ফুফুর মতো চাপা গলায় বলে–
—ফুপিমনি কি ভুল বলেছে হ্যাঁ? তোমার বাবা একজন বাবা হিসেবে ব্যর্থ। নাহলে তার মেয়ে কেন একজনের বাগদত্তাকে ছিনিয়ে নিয়ে তার বউ হবে? এমন বাবার শিক্ষাকে থু মারি।
নিজের বাবাকে এমন অপমানিত হতে দেখে পূর্ণতার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। সে যেই না হাত তুলে আঞ্জুমানকে থাপ্পড় মারতে যাবে তখনই মিসেস শেখ আঞ্জুমানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজে তার জায়গায় এসে দাঁড়ায়, এরফলে থাপ্পড়টা লাগে মিসেস শেখের গালে।
—ফুপিমনিইইইইইই…..
—আম্মাআআ…….
জাওয়াদ গর্জন করে ছুটে আসে তার মায়ের কাছে। আঞ্জুমান তার ফুফুকে নিজের কাছে আগলে নেয়। মিসেস শেখ কান্নার ভান করে বলে–
—বউমা, তুমি আমার গায়ে হাত তুললে?
এদিকে পূর্ণতাও ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। সে তো আঞ্জুমানকে মারতে নিয়েছিল, তাহলে মিসেস শেখ আসলো কেন? তার বাড়ন্ত হাতটা এখনও হাওয়ায় ভাসছে। আসলে পূর্ণতা দরজার দিকে পিঠ দিয়ে দাড়িয়ে ছিলো তাই সে জাওয়াদের আসাটা দেখতে পায়নি, কিন্তু মিসেস শেখ পূর্ণতার ঘাড় টপকে ঠিকই জাওয়াদকে আসতে দেখেছিল। তাই ইচ্ছে করে আঞ্জুমানকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গা নেয়। পূর্ণতা থাপ্পড় না দিলেও তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে দেখলে জাওয়াদ নিশ্চয়ই আরো ক্ষেপে যেতো। কিন্তু পূর্ণতার থাপ্পড় মারায় তার বল একদম বাউন্ডারির বাহিরে চলে গিয়েছে।
জাওয়াদ রক্ত চক্ষু নিয়ে একবার মায়ের দিকে তাকায়। মিসেস শেখ বয়স হয়ে গেলেও চেহারার উজ্জ্বলতায় তেমন একটা মলিনতা আসেনি। সে আবার বরাবরের মতোই লাল ফর্সা। পূর্ণতার হাতের চড় এসে তার লাল গালটা আরো লাল হয়ে গিয়েছে। মায়ের গাল থেকে চোখ সরিয়ে জাওয়াদ ঝড়ের বেগে পূর্ণতার দিকে ফিরতে তার এক গালেই পরপর তিনটা থাপ্পড় দেয় সে। জাওয়াদের শক্ত হাতের এতগুলো থাপ্পড় খেয়ে পূর্ণতার ঠোঁট দাঁতের সাথে কেটে রক্ত বের হতে থাকে।
জাওয়াদ পূর্ণতার চুলের মুঠি ধরে রেগে হিসহিসিয়ে বলে–
—অ্যাঁই তোর এত বড় সাহস কি করে হলো আমার মায়ের গায়ে হাত তোলার? বল কি করে হলো? এই তুই আমার মা’কে ভালোবাসিস? বল কি করে পারলি নিজের মায়ের বয়সী আরেক মাকে থাপ্পড় দিতে?
প্রচন্ড ব্যথায় পূর্ণতা তার ঘোর থেকে বের হয়। সে আকুতি নিয়েই বলে–
—বিশ্বাস করুন জাওয়াদ, আমি কল্পনাতেও আম্মাকে মারার কথা ভাবতে পারিনি। আমি তো আঞ্জুমানকে মারার জন্য হাত তুলেছিলাম, ও আমার বাবাকে যা নয় তা বলে অপমান করছে। কিন্তু আম্মা শেষ মুহুর্তে এসে ওকে সরিয়ে দিয়ে নিজে এসে দাঁড়ায়, আর ভুলবশত চড়টা উনার গায়ে লাগে। আপনি আমায় ছাড়ুন জাওয়াদ, আমি আম্মার পা ধরে মাফ চাইবো। বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি।
তার কথার মাঝেই মিসেস শেখ ভাঙা গলায় বলে–
—মিথ্যে কেন বলছো পূর্ণতা? তুমি আমার রুমে এসেই তো চোটপাট শুরু করে দিলে।আঞ্জুমান কখন তোমার বাবাকে অপমান করলো? নিজের দোষ আর আমার ভাতিজির কাঁধে চাপিয়ে দিও না দয়া করে।
কথাটা বলেই সে আঁচলে মুখ গুঁজে হুহু করে কেদে দেয়। এদিকে মা পাগল জাওয়াদ মায়ের কান্না দেখে আরো পাগল হয়ে যায়। পূর্ণতা মিসেস শেখের কথায় পর কিছু বলতে চায় কিন্তু জাওয়াদ তার রুহ কাঁপানো ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়–
—চুপপপপ… আর একটা কথাও বলবি না চরিত্রহীন মেয়ে কোথাকার। আর কত মিথ্যে বলবি? আর কত অশান্তি করবি? আমাদের শান্ত-সুন্দর জীবনটাকে তোর মতো অপয়া, দুঃশ্চিতাবান মেয়ে এসে বিষিয়ে দিয়েছে। নিজের বাবার টাকার দাপটে আর কত আমাদের জীবনটাকে অসহনীয় করে তুলবি বল? তোর কারণেই তোর মা মরেছে, এবার আমার মা’টাকেও খাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস। তোর মতো মেয়ের সাথে আদোও সংসার করা যায়? তোরা সংসার কি সেটাই জানিস না, সংসার কি করবি?
জাওয়াদের একের পর এক কথার বাণ এসে পূর্ণতাকে খুবই নির্মম ভাবে আহত করতে থাকে। পূর্ণতার মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায় জাওয়াদের এমন বিষাক্ত কথার বাণে। সে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে জাওয়াদের রাগে শক্ত হয়ে যাওয়া মুখশ্রীর দিকে। জাওয়াদ রাগের মাথায় যা মুখে আসছে তাই বলে দিচ্ছে পূর্ণতা। একটাবারও ভেবে দেখছে না মেয়েটা তার এমন বিষাক্ত কথাগুলো সইতে পারবে কিনা।
সারাদিন না খাওয়া, তারউপর ছুটো, বাসায় এসে এমন দুঃস্বপ্নের ন্যায় হওয়া ঘটনা সবের সংমিশ্রণে পূর্ণতার গলা রুদ্ধ হয়ে এসেছে। সে বহু কষ্টে বলে–
—কি এমন করলাম যার কারণে শেষ পর্যন্ত আমাকে দুঃশ্চিত অপবাদটিও নিজের নামে শুনতে হলো?
জাওয়াদ পূর্ণতার মাথার চুল একপ্রকার ছুঁড়ে মেরে ছাড়ে যার কারণে পূর্ণতা নিচে পড়ে যায়। জাওয়াদ তার ফোনটা পকেট থেকে বের করে ফাহিমের ইনবক্সে ঢুকে পূর্ণতার ছবিগুলো তার সামনে ধরে বলে–
—তোর সব কেচ্ছা-কাহিনি আমার কাছে ফাঁস হয়ে গিয়েছে। দেখ তোর পুরানো প্রেমিক আজ আমাকে এই ছবিগুলো পাঠিয়েছে,যেখানে তুই তোর নতুন আশিকের সাথে ফুর্তি করতে গিয়েছিলি। এরপরও বলবি, তুই সতি-সাবেত্রী? বল এই ছবির ছেলে তোর আশিক আর মেয়েটা তুই না?
পূর্ণতা ছবিটা দেখেই চিনে ফেলে। কিছুদিন আগের তার ভাইয়ের সাথে যাওয়া সেই ক্যাফের ছবি এগুলো। সে জাওয়াদের ভুল ভাঙিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অস্থির হয়ে বলে–
—মেয়েটা আমি কিন্তু ছেলেটা আমার কোন আশিক না। আমার ভাইয়া ও’। ওর নাম আ….
পূর্ণতার কথা মাঝেই জাওয়াদ উন্মাদের ন্যায় হাসতে থাকে। তাকে এমন হাসতে দেখে উপস্থিত তিন নারীই অবাক হয়ে যায়। জাওয়াদ তার হাসি থামিয়ে বলে–
—একসময় ছিলো সাইয়া, ধরা খাওয়ার পর হয়ে গেলো ভাইয়া? তোর বাপের না তুই একমাত্র মেয়ে? তাহলে তোর ভাই আসলো কোথা থেকে? আমি বলদ রে, কিন্তু এতটা বলদ না যে, সত্য-মিথ্যা বুঝবো না।
আচ্ছা ওর কথা বাদ দিলাম, কিন্তু যে আমাকে এসব জানিয়েছে সে কি করে জানল তোর কাঁধে জামার নিচে একটা তিল আছে? এটা তো একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ ছাড়া কারো জানার কথা না। এমনকি আমি তোর স্বামী হয়েও তোকে এত গভীর ভাবে জানি না। বল মিথ্যে এটা?
পূর্ণতা এর জবাব দিতে পারে না। কারণ সত্যিই তার কাঁধের উপর জামার নিচে একট বড় তিল রয়েছে। কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছে না কোন পুরুষ তার সম্পর্কে এত গভীরভাবে জানল কি করে। সে অশ্রু সিক্ত চোখে আঞ্জুমান ও মিসেস শেখের দিকে তাকালে দেখতে পায় তাদের দু’জনের ঠোঁটের কোণেই হাসি খেলা করছে। পূর্ণতার বুঝতে বাকি থাকে না তারাই এসব পেছনে রয়েছে।
এদিকে পূর্ণতাকে চুপ থাকতে দেখে প্রচন্ড রেগে যায়। শান্ত মানুষ যখন ক্ষেপে যায়, তখন সে কি বলে নিজেও জানে না। সে আবারও পূর্ণতার চুলের মুঠি ধরে তাকে টানতে টানতে বাসার বাহিরে এনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে–
—তোর মতো নষ্টার সাথে আর যাই হোক সংসার করা যায় না। আমার কসম লাগে তোর, আর কোনদিন আমার বা আমার পরিবারের আশেপাশেও আসবি না। আসবি তো আমার মরা মুখ দেখবি।
কথাটা বলে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয় জাওয়াদ। তারপর নিজের রুমে গিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। তাকে বিকট শব্দে দরজা লাগাতে শুনে মিসেস শেখ ও আঞ্জুমান দু’জনই কেঁপে ওঠে। জাওয়াদ তার রুমে গিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে দাঁত দিয়ে হাত কামড়ে ধরে। দাঁতের শক্তি হাতে প্রয়োগ করার ফলে হাত কেটে র”ক্ত পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোন হুঁশ নেই।
ফ্ল্যাটের বাহিরে করিডরের ফ্লোরে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকে পূর্ণতা। তার কাছে সবটা কেমন ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে। কালও তো সব ঠিক ছিলো। আজকের দিনটা নিয়ে সে কতকিছু প্ল্যান করেছিলো। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেলো। তার এবং তার শ্যামসুন্দর পুরুষের পথচলা আজকে ইতি ঘটলো।
পূর্ণতা দূর্বল শরীরটাকে কোনমতে টেনে তুলে নিচ থেকে। তারপর এক কদম, দুই কদম করে হেঁটে বেরিয়ে আসতে শুরু করে সে বিল্ডিং থেকে, যেখানে সে একটা সাজানো-গোছানো সংসার তৈরি করতে চেয়েছিলো।
খালি পায়ে, ছন্নছাড়া অবস্থাতেই সে হেঁটে এসে উপস্থিত হয় নিজের বাবার বাড়ির আঙিনায়। কলিংবেল দেওয়ার পর কাজের মেয়ে এসে দরজা খুলে পূর্ণতাকে এমন অবস্থায় দেখে “ছোট সাহেব” বলে একটা চিৎকার দেয়। পূর্ণতার মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে।
কাজের মেয়ের চিৎকার শুনে বাড়ির সকলে রুম থেকে বের হয়ে আসে। পূর্ণতাকে এমন অবস্থায় দেখে মি.আহমেদ মেয়ের কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করবেন এরই মাঝে পূর্ণতার মাথা ঘুরে ওঠে। চোখের সমানে সব অন্ধকার হয়ে যায়। সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে নিলে মি.আহমেদ মেয়েকে ধরে ফেলেন। পূর্ণতার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে দেখেন, পূর্ণতা জ্ঞান হারিয়েছে।
মি.আহমেদ কষ্ট করে মেয়েকে সোফায় শুয়ে দেয় তারপর কল লাগায় পূর্ণতার ডাক্তার আন্টিকে। সে এসে তার ট্রিটমেন্ট করে জানায় পূর্ণতার মাঝে মাইল্ড স্টোক লক্ষণ দেখা দিয়েছে, তাকে ইমিডিয়েট হসপিটালে ভর্তি করাতে। মি.আহমেদ তখনই মেয়েকে নিয়ে ছুটে হসপিটালে। সময়মতো হসপিটালে আসায় পূর্ণতার বড় ক্ষতি হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছে। অবর্ণনীয় মানসিক কষ্টের কারণে এই মাইল্ড স্টোক হয়েছে পূর্ণতার, যেখানে তার সামান্য কান্নাকাটি করাও নিষেধ।
মি.আহমেদ পুরোটা সময় মেয়ের টেনশনে হা-হুতাশ করে কাটিয়েছে। এদিকে জাওয়াদ পরের দিনই রিজেগনেশন লেটার জমা দিয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়। পূর্ণতার সাথে সকল যোগাযোগের পথ সে নিজ হাতে বন্ধ করে দেয়।
পূর্ণতা সুস্থ হয়ে সময় লাগে ৩/৪ দিন। মেয়ের টেনশনে মি.আহমেদ নিজেও কিছুটা অসুস্থ হয়ে পরেছেন। জাওয়াদকে পূর্ণতার খবর দিতে চায় সে, কিন্তু জাওয়াদের সকল নাম্বার বন্ধ পায়। পূর্ণতা একটু সুস্থ হতেই মি.আহমেদ তাকে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে, পূর্ণতা শান্ত গলায় একে একে খুলে বলে সব ঘটনা। বাবাকেই তো বলবে সে তার সকল দুঃখ, কষ্ট। বাবা ছাড়া তার আর কে আছে এই দুনিয়ায়? এবং এ-ও বলে সেও আর জাওয়াদের সংসারে ফিরবে না কোনদিন। কোনদিন জাওয়াদের ভুল ভাঙলেও না। চেষ্টা তো কম করেনি সে। কিন্তু দিনশেষে তার ভালোবাসা হেরে গেলো তার মায়ের আসনে বসানো শ্বাশুড়ির নোংরা ষড়যন্ত্রের সামনে। সব শুনে মি.আহমেদ হতভম্ব হতেও ভুলে যায়। তার একমাত্র কলিজার টুকরা এত কষ্ট পেয়েছে জানতে পেরে সেও কষ্টের সাগরে ডুবে যায় যেন।
মি.আহমেদ জাওয়াদের পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে চায় এমন নিকৃষ্ট কাজের জন্য। কিন্তু পূর্ণতা তাকে থামিয়ে দেয়। কি দরকার শুধু শুধু ঝামেলা করে আরো। একটা সুখের সংসার চেয়েছিলো, কিন্তু উপরওয়ালা তার এই চাওয়া পূরণ করতে নারাজ। উনি নারাজ থাকলে আর কার সাধ্যি আছে বান্দার শখ পূরণ হবে?
পূর্ণতার অসুস্থতার কারণে অফিসের ঠিকমতো নজর রাখতে না পারা। জাওয়াদ এবং তার মতো দায়িত্বশীল, বিশ্বস্ত লোকদের অনুপস্থিতি ইত্যাদি কারণে আহমেদ গ্রুপের অভ্যন্তরে বেশ ক্ষতি হয়। কিছু এমপ্লয়ি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের তথ্য চুরি করে অন্য কোম্পানির কাছে বেঁচে দেয়। যার কারণে শেয়ার মার্কেটে আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রির শেয়ারের মূল্য একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে। রাত দিন তিল তিল করে গড়ে তোলা বিজনেসে এমন ধ্বস, একমাত্র সন্তানের এমন করুণ পরিণতি ইত্যাদি বিষয়ে মি.আহমেদ এত চিন্তায় পড়ে যান যে, সে পূর্ণতা বাড়ি ফিরে আসার পনেরো দিনের মাথায় হার্ট অ্যাটাক করে পাড়ি জমান দূর আকাশে। জনমদুখিনী পূর্ণতা এবার পুরোপুরি একা হয়ে যায় এই জগৎ সংসারে।
মি.আহমেদ মারা যাওয়ার পর পূর্ণতা আরো ভেঙে পড়ে। পরপর এতগুলো কষ্ট পাওয়ার পরও বেচারির কষ্ট পাওয়া শেষ হয় না। মি.আহমেদ মারা যাওয়ার পর তার কাছের কিছু মানুষের আসল রূপ বের হয়ে আসে।
আহনাফ সাহেবের স্ত্রী অজান্তা বেগম প্রয়াস চালায় পূর্ণতার ভাগের সম্পত্তি সহ আহমেদ গ্রুপ টাও নিজের ছেলের নামে করে নেওয়ার। মি.আহমেদ মারা যাওয়ায় গ্রামের থেকে তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আসে, যারা অজান্তা বেগমের সাথে তাল মিলিয়ে পূর্ণতাকে নানান কথা শোনাতে থাকে। ঐ সময়টা পূর্ণতা এতটা ভেঙে পড়ে যে, সে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে একটু শান্তির জন্য দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে চায়।
পূর্ণতা অসুস্থ দেখে আরিয়ান সাময়িক ভাবে আহমেদ কোম্পানির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল, তার সম্পত্তির উপর কোন লোভ ছিলো না। পূর্ণতা যখন দেখলো আরিয়ান বেশ নিষ্ঠার সাথেই কোম্পানি পরিচালিত করছে, তখন সে যেন একটা সুযোগ পায় সব ছেড়ে ছুঁড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়ার।
সে গোপনেই নিজের ভিসা রেডি করে কাউকে না জানিয়ে পাড়ি জমায় কানাডায়। সেখানে যাওয়ার পরের মাসেই জানতে পারে সে প্রেগন্যান্ট। কিন্তু এত এত মানসিক আঘাত ও কষ্টের পর তার গর্ভাবস্থা হয়ে উঠেছিলো অনেক জটিল। ডাক্তার তাকে এবরশন করিয়ে নিতে বলেছিলো, কারণ বাচ্চা যে শেষ পর্যন্ত সার্ভাইভ করতে পারবে, এটা ডাক্তাররা নিজেরাও বলতে পারছিলো না। কিন্তু পূর্ণতা রিস্ক নিয়ে তাজওয়াদকে জন্ম দিতে সক্ষম হয়। তারপর থেকে তাজওয়াদই হয়ে ওঠে পূর্ণতার বাঁচার একমাত্র সম্বল।
বর্তমান~
—বাবা তুমিও আমায় একা করে চলে গেলে? তুমিও পূর্ণতাকে ভালোবাসা ছেড়ে দিলে বাবা? পূর্ণতার যে এই জগৎ সংসারে আর কেউ রইলো না বাবা। ও বাবা, আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে যাও না। তুমি আর আম্মু তো মরে গিয়ে বেঁচে গেলে, আমায় তিলে তিলে মরার জন্য রেখে গেলে এই নিকৃষ্ট দুনিয়ায়। বাবা, ও বাবা, আমায় ছেড়ে কেন গেলে বাবা? বাবা, যেও না আমায় ছেড়ে। বাবা, বাবাআআআ আমার যে কেউ নেই আপন বলতে….. তুমিও আমায় ছেড়ে যেও না বাবা। পূর্ণতার কেউ নেই বাবা একমাত্র তুমি ছাড়া।
ঘুমের ঘোরেই বিরবিরিয়ে কথাগুলো বলে পূর্ণতা। তার বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে বিরতিহীনভাবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। জাওয়াদ হাত বাড়িয়ে পূর্ণতার চোখের অশ্রুগুলো মুছে দেয়। নিজের চোখ বেয়েও যে পানি পড়ছে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই।
জাওয়াদ তার মুখটা পূর্ণতার কানের কাছে নিয়ে এসে বলে–
—কে বলেছে পূর্ণতার কেউ নেই? পূর্ণতার তার বর আছে। তার জাওয়াদ সাহেব থাকতে তার কি আর কাউকে লাগবে?
পূর্ণতা একা একাই বিরবির করতে করতে কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে যায়। জাওয়াদ তার পাশে বসে থেকেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে বাকিটা রাত। একটু পরপর পাশের কেবিনে ঘুমন্ত ছেলেকে দেখে আসতেও ভুলে না। টনি তাকে অনেকবার চলে যেতে বলে কিন্তু জাওয়াদ শুনে না। সে কি তার প্রাণভোমরাদের এখানে একা রেখে যেতে পারে? উপরন্তু টনি তাকে বারবার চলে যেতে বলছিলো বলে, জাওয়াদ হুমায়ুনকে বলিয়ে আশেপাশের ছিঁচকে চোরদের টাকা দিয়ে টনিকেই বের করে দেয় হসপিটালের ত্রিসীমানা থেকে।
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী পাঠক মহলের কাছে পৌঁছে দিন।
শব্দসংখ্যা~২২২৫।
~চলবে?
[অবশেষে আপনাদের বহুল আকাঙ্ক্ষীত অতীতের পরিসমাপ্তি ঘটল। এবার বাকি থাকে জাওয়াদ কি করে সত্য জানতে পারল। এটাও বলবো, কিন্তু আগে কিছুদিন বর্তমান দেখিয়ে তারপর।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🫶]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২