শেষপাতায়সূচনা [১২]
সাদিয়াসুলতানামনি
অন্ধকার রুমে সিক্ত চিবুক নিয়ে বসে আছে এক সৌষ্ঠব পুরুষ। তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাঙাচোরা অনেক বস্তু। অসংখ্য কাঁচের ভাঙা টুকরো, এলোমেলো জিনিসের মাঝে বসে নিজের পূর্বের সুখময় দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করছে পুরুষটি। হাতে তার এক লাল খয়েরী শাড়ি। এই সেই শাড়ি যেটা পরিধান করেছিল বলে পুরুষটি প্রথমবারের মতো তার বহুল আকাঙ্ক্ষিত নারীটির উপর অধিকারের প্রয়োগ করেছিল। কিঞ্চিত পরিচয় করিয়েছিল নিজের বিশ্রী রাগের সাথে।
কিন্তু নারীটি কি ধাতুর তৈরী ছিল সেটা উপরওয়ালাই জানে, তার রাগ দেখানোতে সামান্য অভিমান টুকু তো করলোই না, বরং চাইল এক বহুমূল্যবান জিনিস। যেটা সে দিলো তো ঠিকই, কিন্তু দিয়ে তাকে হারিয়ে যেতে বাধ্য করল।
অতীত~
সেদিন খাওয়ার সময় হয় আরেক কাহিনি। মিসেস শেখ কিছুতেই ডাইনিং টেবিলে বসে খাবেন না। কিন্তু পূর্ণতা তাকে এনিয়েই ছাড়বে। শেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মিসেস শেখকে ডাইনিং টেবিলে সকলের সামনে বসে খাওয়ার ব্যাপারে রাজি করানো যায়। পূর্ণতা আজ প্রথম বারের মতো শ্বশুর বাড়ির সকলকে নিজহাতে বেড়ে খাওয়ায়। জিনিয়া ও মি.শেখ তাকে বেশ কয়েকবার তাদের সাথে বসতে বলে খেতে কিন্তু পূর্ণতা বলে সকলের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর সে খাবে।
তার রান্না যে কতটা ভালো হয়েছে সেটা সকলের খাওয়া দেখেই বুঝা যাচ্ছে। জিনিয়া ছোট মানুষ সে সকলের সামনেই বলে দেয়, তার ভাবীর রান্না ফাইভ স্টার হোটেলের সেফদের কাছে ফেইল। মি.শেখও এনিয়েবিনিয়ে তার প্রশংসা করেছে। শুধু ঘাড় ত্যাড়া মিসেস শেখ ও তার বাধ্যগত ছেলে জাওয়াদ চুপ ছিল পুরোটা সময়। পূর্ণতা তাদের সন্তুষ্ট নিয়ে খেতে দেখেই বুঝে নেয়, রান্না ভালো হয়েছে।
পূর্ণতা অশ্রুসিক্ত চোখে তাদের দেখতে থাকে। আজ তারও একটা সংসার আছে। সে একা না। জাওয়াদ তার স্বামী, তার ভালোবাসার মানুষ। তার মাধ্যমে আরেকটা বাবা ও মা পেয়েছে সে, পেয়েছে একটা বোনের মতো ননদ। এমনই একটা সুখের সংসারের স্বপ্ন সে বুঝ হওয়ার পর থেকেই করে এসেছে।
পূর্ণতার মা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের তিনজনের একটা সুখের সংসার ছিল। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর সে আর তার বাবা প্রচন্ড একা হয়ে যায় ভেতরই ভেতরে। তার বাবা নিজের একাকিত্ব ঘুচাতে কাজকে নিজের সঙ্গী করে নেয়। কিন্তু পূর্ণতা! সে তো তখনও ছোট। যেই বয়সে বাচ্চারা বাবা-মায়ের মাঝে শুয়ে তাদের থেকে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমায়, সেই বয়সে সে একা অন্ধকার ঘরে ঘুমিয়েছে। না সে একটুও ভয় পায়নি। তার ম্যাচিউরিটি এসে পরেছিল অল্প বয়সেই।
কিন্তু ঝড়ের রাতগুলোতে বর্জ্যপাতের শব্দ ভয় পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে তাকে বুকে আগলে নেয়নি। যদি বাবা বাসায় থাকত, তাহলে সে হয়ত আসত। নাহয় পূর্ণতাকে মাথায় বালিশ চাপা দিয়েই নিজের ভয় কমাতে হয়েছে।
তার চাচী ছিল তার আরেক মায়ের মতো। কিন্তু পূর্ণতার মা মারা যাওয়ার পর থেকে সেও কেমন বদলে যেতে শুরু করলো। সবকিছু কেমন দায় ছাড়া ভাবে করত। একদিন আরিয়ানকে সে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছিল, তখন পূর্ণতাও তাকে খাইয়ে দিতে বলে। তখন তার চাচী তাকে উটকো ঝামেলাও বলে আখ্যায়িত করে। আরিয়ান তখন ফোনে গেইম খেলছিল বলে এতটা খেয়াল করেনি। এরপর থেকে সে কখনোই কারো কাছে কোন আবদার করেনি, একমাত্র তার বাবা ছাড়া।
বাবার পর সে তার সকল আবদার, আহ্লাদ করে একমাত্র তার ব্যক্তিগত পুরুষের কাছে। যদিও প্রতিবারই সে খালি হাতে ফিরে যায়, কিন্তু তার বিশ্বাস তার আবদার গুলো একদিন সব পূরণ হবে জাওয়াদের মাধ্যমেই।
জাওয়াদ খেতে খেতেই হঠাৎই পূর্ণতার দিকে নজর দিলে দেখতে পায়, পূর্ণতার দু’গাল ভেসে যাচ্ছে অশ্রু জলে।জাওয়াদ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে–
—কি হলো কাঁদছো কেনো?
তার কথায় শুনে সকলেই খাওয়া থামিয়ে পূর্ণতার দিকে তাকায়। পূর্ণতা চটপট হাতে নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে একটা জোড়াতালির হাসি দিয়ে বলে–
—আরে হাতে মশলা ছিলো তো, সেই হাত দিয়েই চোখ চুলকে ফেলেছি। আপনারা খান, আমি একটু চোখেমুখে পানি দিয়ে আসছি।
পূর্ণতা কথাটা শেষ করে নিজের রুমে চলে যায়। সকলে কিছুটা অবাক হয় তার এহেন কাজে, কিন্তু পরে তারা খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে যায়। খেতে পারে না শুধু মাত্র জাওয়াদ। তার মন বলছে, ঐ অশ্রু শুধু তেলমশলার কারণে আসা অশ্রু না। ঐ অশ্রু অনেক কষ্টের পর পাওয়া কাঙ্ক্ষিত বস্তুর ফল। আর অল্প কিছু খেয়ে জাওয়াদ রুমে চলে যায়।
রুমে গিয়ে দেখে পূর্ণতা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে তখনও ভেজা। জাওয়াদ তার পেছনে গিয়ে নিঃশব্দে দাড়িয়ে পরে। সে বেশ শুনতে পারছে পূর্ণতা ফুপাচ্ছে। জাওয়াদের এবার কেন জানি টেনশন হতে থাকে। মেয়েটাকে ঘন্টা খানেক আগেও তো দেখলে কত হাসিখুশি। হঠাৎই কি হলো তার!
জাওয়াদ এবার মুখাবয়ব গম্ভীর করে রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে? তখন থেকে দেখছি কাঁদছো। এবার সত্যিটা বলবে, মিথ্যে আমার একটুও পছন্দ না।
কিছু সময় পেরিয়ে যায়। হুট করে পূর্ণতা পেছনে ঘুরে জাওয়াদের বুকে মুখ গুঁজে তার পিঠ খামচে ধরে কাঁদতে থাকে অল্প শব্দ করে। জাওয়াদ হতভম্ব হয়ে যায় তাকে কাঁদতে দেখে। সে এতদিন যেই পূর্ণতাকে দেখে এসেছে, সেই পূর্ণতা আর আজ তার সামনে দাড়িয়ে থাকা পূর্ণতা একদম ভিন্ন।
জাওয়াদ দোনামোনা করতে করতে তার একটা হাত রাখে পূর্ণতার পিঠে রাখে, তারপর আস্তে ধীরে বুলিয়ে দিতে থাকে। শান্ত করে পূর্ণতাকে সময় নিয়ে। পূর্ণতা একটু শান্ত হতেই তার বুক থেকে মুখ উঠিয়ে জাওয়াদের দিকে তাকায়। তাদের রুম থেকে আসা লাইটের আলোয় পূর্ণতার মুখশ্রী জাওয়াদের সামনে স্পষ্ট হতেই জাওয়াদ কিছুটা আঁতকে যায়। পূর্ণতার চোখ-মুখ লাল হয়ে ফুলে আছে।
পূর্ণতা রক্তজবার ন্যায় লাল মুখশ্রী ও ভাঙা ভাঙা গলার করা আবদার শুনে জাওয়াদের আশপাশ যেনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। পূর্ণতা নাক টেনে ভেঙে আসা গলায় বলে–
—একটা বাচ্চা দিবেন আমায় শ্যামসুন্দর পুরুষ। একটা ছোট জান, আপনার অস্তিত্ব আমি আমার মাঝে ধারণ করতে চাই। সে, আপনি, আমি, বাবা-মা, জিনি সবাইকে নিয়ে একটা সুখের সংসার হবে আমার। আপনার কাছে আমার ফার্স্ট এন্ড লাস্ট চাওয়া হবে এটা।
মাতৃত্বের স্বাদ অনুভব করতে চাই। প্লিজ দেন না একটা বেবি। কথা দিচ্ছি, জীবনে আর কিছু চাইবো না। কখনো আপনার কথার অবাধ্য হবো না, আপনাকে কখনো নাকানিচুবানি খাওয়াবো না প্রমিজ। দিবেন একটা বেবি?
—মাম্মাম, ও আম্মু দলজা কুলো। আই’ম স্বেলটারিং আউটসাইড।
তাজ তার ছোট ছোট হাত দিয়ে দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে কথাগুলো বলতে থাকে। তাজওয়াদের চিকন গলার স্বর শুনে পূর্ণতা তার অতীতের স্মৃতিচারণ থেকে বের হয়ে আসে। তাজওয়াদের জন্ম কানাডার মতো শীত প্রধান দেশে হওয়ায় সে একটুও গরম সহ্য করতে পারে না। এসির বাহিরে গেলেই ছেলেটা গরমে নাজেহাল হয়ে যায়।
পূর্ণতা দৌড়ে দরজা খুলে দেখে ছেলে তার লাল টমেটোর মতো গাল জোড়া ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একজন স্টাফ দাঁড়ানো। সে তাজওয়াদকে দিতেই এসেছিল।
পূর্ণতা তাজওয়াদকে কোলে তুলে স্টাফ টিকে বিদায় করে দেয়। দরজা লাগিয়ে ছেলের গায়ের পাঞ্জাবি খুলে দিয়ে এসি ছেড়ে বসিয়ে দেয়। ছেলেটা এক ঘন্টা হয়নি বাহিরে গিয়েছে, এর মধ্যেই ঘেমে একদম গোসল করে উঠেছে।
তাজওয়াদ একটু স্বস্তি পেতেই আদো আদো গলায় মায়ের কাছে নালিশ দিতে থাকে–
—মাম্মাম, একানের চবাই দুততু। জানো আমাকে চবাই কুলে নেওয়ার জন্য কিমুন কিমুন কলেচে। আমি বয় পেয়ে গেচি। আলু মামা ইত্তু বালু। সে কত্ত দমক দিয়েচে কিন্তু কেউ চুনেনি তাল দমক।
আলু মামা শুনে পূর্ণতা থতমত খেয়ে যায়। আলু নামে তার কোন কাজিন ব্রাদার আছে বলে তার মনে পরে না। সে ছেলেকে জিজ্ঞেসই করে বসে–
—আলু মামাটা আবার কে সোনা?
—কিনু, ঐ যে কাল আমাদেল চাতে পাক্কে গিলু। মনস্টার তাকে ডিসুম দিয়ে আমাদেল নিয়ে আসলু। ঐ মামাটা।
আরিয়ানকে সবাই ছোট করে আরু বলে, আরি বলে। একেকজন একেক নামে ডাকে। তাজ ছোট মানুষ, আরু উচ্চারণ করতে গিয়ে এটাকে আলু বানিয়ে দিয়েছে। পূর্ণতা ছেলের কথা শুনে কতক্ষণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে, তারপর হুট করেই হাহা করে হেঁসে দেয়। হাসতে হাসতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়েই পড়ে।
ছেলের গালে ঠোঁট ডাবিয়ে চুমু দিয়ে বলে–
—আব্বা, তুই এত কিউট কেন রে বাপ! আমার কিউটের ডিব্বা বাপজান। আরিয়ান মামাকে আলু মামা বানিয়ে ফেলেছিস। তোর আরিয়ান মামা শুনলে পেলে কেঁদে দেবে বোকা ছেলে। হা হা হা…
দুই মা-ছেলে মেতে ওঠে খুনসুটিতে। বিকেলের দিকে রোদ একটু পরতেই পূর্ণতা রেডি হয়ে তাজওয়াদকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়। নিচে গ্রাউন্ড ফ্লোরে আসতেই একজন পুরুষ তাকে ডেকে ওঠে। কণ্ঠস্বর কেমন চেনা চেনা ঠেকল। পূর্ণতার আত্মা ধক করে ওঠে পুরুষটির গলার আওয়াজ পেয়ে। তবে কি শেষ পর্যন্ত ধরা পরেই গেলো?
📌গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের নিকট পৌঁছে দিন।
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২