Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১


পাঁচ বছর আগে চরিত্রহীন অপবাদ দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া স্ত্রীকে খুজে পেয়ে জাওয়াদ উন্মাদের ন্যায় করতে থাকে। জনসম্মুখেই এলোপাতাড়ি চুমু দিতে থাকে তাকে। তারপর হুট করেই নারী টিকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিয়ে হুহু করে কেঁদে দেয় সকলের সামনে।

এমন সুঠাম দেহের অধিকারী পুরুষকে পার্ক ভর্তি মানুষের সামনে একটা নারীকে একবার চুমু, আবার পরপরই পাগলের মতো কাঁদতে দেখে আশেপাশের সকলেই তব্দা খেয়ে যায়। তারা গোলগোল চোখে তাকিয়ে পুরো ঘটনা দেখতে থাকে।

অন্যদিকে একজন পুরুষের অযাচিত স্পর্শে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায় পূর্ণতা, কিন্তু সেকেন্ডের মাঝেই বুঝতে পারে কি হচ্ছে তার সাথে। পূর্ণতার সজ্ঞানে মাত্র দু’জন পুরুষ তাকে স্পর্শ করার অধিকার রাখে। এক হলো, তার জন্মদাতা পিতা, আরেকজন হলো তার সন্তানের পিতা।

প্রথমজন বহু বছর আগেই উপরওয়ালার প্রিয় হয়ে গিয়েছে। আরেকজন পূর্ণতার প্রিয় মানুষদের তালিকা থেকে অপ্রিয়দের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। আর বাকিসব পুরুষদের জন্য পূর্ণতা নিজেকে হারাম করেছে। সেখানে আজ একজন পুরুষের এমন হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরায় তার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। কিন্তু তখনই পুরুষটির আকস্মিক কেঁদে ওঠায় পূর্ণতা হকচকিয়ে যায়। ধাক্কাধাক্কি লাগিয়ে সরিয়ে দিতে চায় নিজের থেকে দূরে, কিন্তু এমন স্বাস্থ্যবান সুপুরুষের শক্তির কাছে পূর্ণতার শক্তি নেহাৎই চুনোপুঁটির মতো।

পূর্ণতার নাসারন্ধ্রে এসে বারি খায় একসময়ের প্রিয় পুরুষটির মোহনীয় গায়ের সুবাস। পূর্ণতার সব হুড়োহুড়ি, অস্থিরতা আস্তে আস্তে থেমে যায়। তাহলে কি ইনিই সে?স্পর্শও চিনতে পারে পূর্ণতা কিছুটা।

বেহায়া মন আবারও আবদার করে উঠে পাঁচ বছর আগের মতোই পূর্ণ অধিকার নিয়ে এই টানটান সিনায় মাথা এলিয়ে রাখতে ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু না, সে একই ভুল আবারও করবে না। অধিকার তার উপরই খাটানো যায় যার সাথে একটা গভীর সম্পর্ক থাকে। ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু জাওয়াদের সাথে তো তার কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে কিসের অধিকার খাটাবে পূর্ণতা? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে সে।

পূর্ণতাকে আরো চমকে দিয়ে জাওয়াদ আবারও তার সারা মুখে এলোপাতাড়ি চুমু দিতে থাকে। পাগলের মতো কি সব বলতে থাকে, কান্নার দাপটে পূর্ণতা কিছুই বুঝতে পারছে না যদিও। কিন্তু জাওয়াদের এমন কাজে সে হতভম্ব হয়ে রিয়াক্ট করা ভুলে গিয়েছে।

জাওয়াদ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে পূর্ণতার গালে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে–

—পূর্ণ তুমি কই গিয়েছিলে? এত পাষাণ কি করে হতে পারলে তুমি? আমাকে না এত বলে ভালোবাসো, এই তার নমুনা? এতগুলো দিন কি করে পারলে আমার থেকে দূরে থাকতে?

কথাগুলো বলে জাওয়াদ পূর্ণতার কপালে কপাল ঠেকিয়ে পুনরায় ডুকরে উঠে। এদিকে পূর্ণতার হুঁশ ফিরতে সে জাওয়াদকে নিজের থেকে দূরে সরাতে চায়। নিজের গাল থেকে তার হাত সরাতে চায় কিন্তু একহাতে প্লাস্টার করা থাকায় অন্য একটি হাত দিয়ে তেমন সুবিধা করতে পারে না।

তাকে এমন অস্বস্তি দায়ক পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে হাজির হয় আরিয়ান, পূর্ণতার কাজিন। সে একটা কল এটেন্ড করতে একটু কোলাহল থেকে দূরে গিয়েছিল, তখনই এসব হয়ে যায়।

আরিয়ান জাওয়াদ ও পূর্ণতার কাছে এসে জাওয়াদকে ঝটকা দিয়ে পূর্ণতার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সে তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। তারপর জাওয়াদের কলার খামচে ধরে তার মুখে একটা পাঞ্চ করে দেয় আরিয়ান। ঘটনার আকস্মিকতায় জাওয়াদ কিছুটা পেছনে সরে গিয়ে পড়ে যেতে নিলে তার বন্ধু মাহবুব এসে তাকে ধরে ফেলে।

পূর্ণতা জাওয়াদকে মার খেতে দেখে ভয় পেয়ে যায় তাই সে আরিয়ানের হাত টেনে ধরে তাকে সেই জায়গা থেকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আরিয়ান যায় না। সে পূর্ণতার থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে এনে আবারও মারতে যায় জাওয়াদকে। এমন সময় তাকে এসে আবারও আটকায় পূর্ণতা।

সে আরিয়ানের হাত ধরে তাকে টানতে টানতে বলে,–

—আরিয়ান, যথেষ্ট হয়েছে। চলো গাড়িতে বসো।

আরিয়ান রাগে ফসফস করতে করতে বলে–

—তুমি আমাকে ছাড়ো পূর্ণতা। এই হারামির সাহস কি করে হয় তোমাকে স্পর্শ করার!

কথাটা বলে সে আবারও মারতে নিবে পূর্ণতা তার হাত ঝাপটে ধরে শক্ত করে। টেনে নিয়ে যেতে চায় এই জায়গা থেকে দূরে। জাওয়াদ নিজেকে মাহবুবের নিকট থেকে সরিয়ে এনে আবারও পূর্ণতার কাছে যেতে চায়, কিন্তু একটা বাচ্চার গলার আওয়াজে থেমে যায়।

জাওয়াদ কিছুটা ভরকানো চাহনি নিয়ে নিচের দিকে তাকালে দেখতে পায় বছর চারের একটা বাচ্চা ছেলে। যে কিনা নিজের বুকের সাথে একটা ফুটবল চেপে ধরে অশ্রুসিক্ত চোখে আরেক হাত দিয়ে পূর্ণতার হাঁটু ধরে রয়েছে। এখানকার এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখে ছোট জানটা ভয় পেয়ে গিয়েছে। বাবুটা অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে একটু বেশিই ফর্সা, আর চোখ গুলো গ্রে কালারের। অদ্ভুত ধরণের কিউট বাচ্চাটা।

জাওয়াদ খেয়াল করে দেখে, বাচ্চাটা পূর্ণতাকে “মাম্মা” বলে ডেকে তার কোলে উঠতে চাইছে। জাওয়াদের বুকটা ধক করে উঠে। পূর্ণতা কি আবার নতুন করে জীবন শুরু করেছে তাকে ফেলে দিয়ে? তাহলে এখন তার কি? সে কি নিয়ে বাঁচবে? তাহলে কি পূর্ণতাকে এতক্ষণ প্রটেক্ট করা ছেলেটাই তার হাসবেন্ড? জাওয়াদ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে না গিয়ে ভ্যাবলার মতো তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

পূর্ণতা আরিয়ানকে বলে–

—ভাইয়া ওকে একটু আমার কোলে উঠিয়ে দাও না।

আরিয়ান পূর্ণতার কথা মতো বাচ্চাটিকে তার কোলে তুলে দেয়। কিন্তু ছাড়ে না, নিজেও পাশ থেকে বাচ্চাটিকে ধরে রাখে, যাতে পূর্ণতার হাতের উপর কম চাপ পড়ে। পূর্ণতা বাবু টাকে নিজের সাথে আগলে নিয়ে আদুরে গলায় বলে–

—কি হয়েছে আমার তাজওয়াদের? আব্বু, তুমি ভয় পেয়েছো? ডোন্ট বি স্ক্রেড বাচ্চা। এই তো মাম্মি।

তাজওয়াদ অর্থাৎ বাবুটা অর্ধবাংলা আর ইংরেজি টোন মিলিয়ে বলে–

—মাম্মা, আমি বাচায় দেতে তাই। একানে মনস্টার আচে। তাজ বয় পাচ্চে।

—আচ্ছা চলো বাসাই যাই। ছোট নানুমনি আমায় ফোন দিয়ে বললো সে নাকি তাজের জন্য কি সারপ্রাইজ মেক করেছে। চলো চলো, তাড়াতাড়ি বাসাই চলো।

তাজ পূর্ণতার গলা জড়িয়ে ধরে হেঁসে দেয়। সন্তানের হাসি দেখে পূর্ণতার মনটা ভরে ওঠে। সে ঠোঁট দাবিয়ে তাজওয়াদের ফুলো ফুলো গালে চুমু খায়। তাজওয়াদও মাকে পাল্টা আদর দিতে সময় নেয় না।

এতক্ষণ এসব কিছুই জাওয়াদ ও মাহবুব হা করে দেখছিল। আরিয়ানকে পূর্ণতার “ভাই” বল সম্বোধন করাটা জাওয়াদের কর্ণগোচর হয়। জাওয়াদ মনে মনে বলে–

—ঐ ছেলেটা (আরিয়ান) যদি পূর্ণতার হাসবেন্ড না হয়, তাহলে বাচ্চাটা কার? আমার কি?

হঠাৎই জাওয়াদের পাঁচ বছর আগের একটা দিনের কথা মনে পড়ে যায়। তার প্রশ্নের উত্তর সে পেয়ে যায় সেই ঘটনাটি মনে করার মধ্য দিয়ে। হ্যাঁ, বাচ্চাটি তারই। পূর্ণতা যখন দেশ ছেড়েছিল তখন সে প্রেগন্যান্ট ছিল। বাচ্চাটার নামও তার সাথে মিলিয়ে রাখা, বয়সও হিসেব মতো ঠিকই আছে। জাওয়াদের চোখ আবার ছলছল করে ওঠে।

সে দৌড়ে গিয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে তাজওয়াদ সহ পূর্ণতাকে জড়িয়ে নিজের বুকের সাথে। এতে করে পূর্ণতা ও তাজওয়াদ দুইজনই চমকে যায়। পূর্ণতার একহাতে প্লাস্টার আরেকহাতে তাজওয়াদ। তার কোন হাতই খোলা নেই বলে সে জাওয়াদকে নিজের থেকে সরিয়ে দিতে পারছে না।

এদিকে জাওয়াদ এত জোরে তাদের দু’জনকে জড়িয়ে ধরেছে মনে হচ্ছে নিজের বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নিবে। হঠাৎই সে পূর্ণতা ও তাজওয়াদকে নিজের বুকের থেকে সরিয়ে এনে দুইজনকেই এলোপাতাড়ি চুমু দিতে থাকে। তাজওয়াদ ভয় পেয়ে কেঁদে দেয় পূর্ণতার গলা জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—মম, মনস্টার। হি উইল ইট আস।

তাজওয়াদকে কাঁদতে দেখে পূর্ণতা বিচলিত হয়ে যায়। সে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলে–

—জাওয়াদ ছাড়েন আমায়। আমার ছেলে ভয় পাচ্ছে আপনাকে। স্টে আওয়ে ফ্রম আস।

এতক্ষণে আরিয়ান নিচ থেকে উঠে এসে পুনরায় জাওয়াদকে ধাক্কা দিয়ে পূর্ণতাদের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। একজন বডিগার্ড ও আরিয়ানের তার ড্রাইভারও এসে পড়েছে। তারা দু’জন জাওয়াদকে ধরে রেখেছে। আরিয়ান ও পূর্ণতা তাজওয়াদকে নিয়ে পার্ক থেকে বের হওয়ার জন্য হাঁটা দেয়। পিছনে থেকে অনবরত জাওয়াদের ডাক, আকুতিকে অগ্রাহ্য করেই। জাওয়াদ চিৎকার করে ডেকে বলছে–

— পূর্ণ, পূর্ণ যেও না প্লিজ। আমি সরি, ভীষণ ভীষণ সরি। আমার ছেলেকে আমার কাছে দাও একটু। এত পাষাণ হয়ো না পূর্ণ। আমায় ক্ষমা করো, প্লিজ আমার কাছে ফিরে আসো, প্লিজ।

পূর্ণতা গাড়িতে বসার আগে একবার জাওয়াদের দিকে ফিরে তাকায়। চোখে তারও পানি আর ঠোঁটে কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলে সে, কিন্তু দূরত্বের কারণে জাওয়াদ শুনতে পায় না। আরিয়ান ও পূর্ণতা গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার ও বডিগার্ডটা জাওয়াদকে ছেড়ে দিয়ে গাড়ির দিকে ছুট লাগায়। জাওয়াদও তাদের পেছন পেছন ছুট লাগায়। কিন্তু ধরতে পারে না তাদের গাড়িটাকে। বডিগার্ড ও ড্রাইভার গাড়িতে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করে।

[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ ❌]

📌গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রমী বন্ধুমহলের কাছে পৌঁছে দিন।🤍

শেষ পাতায় সূচনা [০১]

সাদিয়াসুলতানামনি

[প্রচন্ড রাইটিং ব্লকে থেকে লিখলাম গল্পটা। কেমন হয়েছে জানাবেন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🥹🫶]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply