Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪


রোদ্দুরেরছেড়ামানচিত্র

পর্ব_৩৪

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
শীতের হিমেল ভাবটা কেটে গিয়ে প্রকৃতিতে এখন বসন্তের আগমনী গান। হালকা বাতাস জানান দিচ্ছে ঋতুরাজ এসে গেছে। লোকে বলে বসন্ত হলো ভালোবাসার ঋতু, মনে রঙ লাগার সময়। কিন্তু নুসরাতের মনে আজ রঙের বদলে কেবলই ছাই রঙা বিষণ্ণতা। জানালার খোলা পাল্লা দিয়ে বসন্তের বাতাস হু হু করে ঘরে ঢুকছে, কিন্তু সেই বাতাসে নেই কোনো স্বস্তি।
​নুসরাত বিছানায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে ছোট হয়ে বসে আছে। তার নির্নিমেষ দৃষ্টি জানালার বাইরের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসা এক জোড়া ময়না পাখির দিকে। পাখি দুটি কী ভীষণ সুখে একে অপরের চঞ্চু ঘষছে! নুসরাত চোখ বুজলে এখনো কানে বাজে সেই পরিচিত ডাক “চশমাওয়ালি ম্যাডাম!” নির্জনের সেই কণ্ঠস্বর যেন এই বাতাসের প্রতিটি কণা থেকে ভেসে আসছে। কিন্তু চোখ খুললেই চারপাশের শূন্যতা তাকে বিদ্রূপ করে।

​মানুষ কীভাবে এতটা পাষাণ হতে পারে? কয়েক দিন আগেও যে নির্জন তাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না, সে আজ তার একটা খোঁজও নিল না। নুসরাতের মনে হলো, যারা বলে ‘সুন্দর মনই আসল, রূপ কিছুই নয়’ তারা আসলে এক চরম মিথ্যার জগতে বাস করে। এই পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর, এখানে প্রথম দেখা হয় রূপের সাথে, গুণের সাথে নয়। প্রত্যেক পুরুষই হয়তো সুন্দরের পূজারি, নুসরাতের সেই চিরচেনা রূপটাই যখন নষ্ট হয়ে গেছে, তখন নির্জন কেন আর তাকে মনে রাখবে?
​নুসরাতের গাল বেয়ে দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রু বালিশের ওপর টুপ করে গড়িয়ে পড়ল। সে ফোনটা হাতে নিল, বুকের সব অভিমান পাথরচাপা দিয়ে একবার শেষবারের মতো নির্জনকে কল দিতে চাইল। কিন্তু ফোনের অন্ধকার স্ক্রিনে নিজের ছায়া পড়তেই চমকে উঠল সে। বাম দিকের সেই ক্ষতবিক্ষত অংশটা যেন চিৎকার করে তাকে বলছে
‘তুমি কি আয়নায় নিজেকে দেখেছ নুসরাত?’
​মুহূর্তেই ফোনটা সরিয়ে ফেলল সে। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“ঠিকই তো আছে। নির্জন কেন আমাকে তার জীবনে আশ্রয় দেবে? আমার তো এখন সৌন্দর্য নেই, রূপ নেই। তাহলে নির্জন কেন আমাকে ভালোবাসবে?”

​বলতে বলতে নুসরাত হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল একরাশ হাহাকার আর তিক্ততা। সে আয়নার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে আবার বলল,
“আমিই বা কেমন পাগল! এই পোড়া চেহারা নিয়ে নির্জনের মতো সুদর্শন ছেলেকে পাওয়ার আশা করছি? ওটা তো এখন আমার জন্য আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো অসম্ভব!”
​নুসরাতের মুখের কান্না এখন কান্নায় নেই, এক অদ্ভুত হিড়িক তোলা হাসিতে রূপ নিয়েছে। যে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বুক গভীর ঘৃণা হয়তো নির্জনের প্রতি, নয়তো নিজের এই ভাগ্যের প্রতি।
★★★
কিচেন থেকে মশলা কষানোর চমৎকার একটা ঘ্রাণ নাকে আসছে। আরিয়ান ডাইনিং টেবিলে বসে অধৈর্যভাবে মোবাইল স্ক্রল করছে, কিন্তু তার মনোযোগ মোবাইলে নেই। ঘড়ির কাঁটা বাড়ছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আরিয়ানের মনের অস্থিরতা। সিফাতের সাথে নির্দিষ্ট সময়ে তাকে পৌঁছাতে হবে। বাড়ির বাকিরা এখনো গভীর ঘুমে, শুধু তৃণা কিচেনে তার জন্য নাস্তা গুছিয়ে দিতে ব্যস্ত।
​আরিয়ান আর সহ্য করতে না পেরে একটু চড়া গলায় ডাকল,
“তৃণা, তোমার কি হলো? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, না হলে আমি বের হই?”

​তৃণা ভেতর থেকেই জবাব দিল,
“আর মাত্র এক মিনিট! সব হয়ে এসেছে।”

​আরিয়ান ডাইনিং টেবিল থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে কিচেনের দিকে তাকাল। শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে এক মনে কাজ করে যাচ্ছে তৃণা। তার পিঠ ছাপিয়ে থাকা সেই লম্বা কাজল কালো চুলগুলো আজ আলতো করে একটা হাতখোঁপা করা। চুল থেকে দু-একটা অবাধ্য চুল ঘাড়ের পাশে দুলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে চুলা থেকে কড়াইটা নামাতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় তৃণা ভুলে খালি হাতেই গরম হাতলটা ধরে ফেলল।

​তৃণা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে চিৎকার দিল, “আহ্!”
​চিৎকারটা কানে যাওয়া মাত্রই আরিয়ান বিদ্যুতের বেগে কিচেনে ঢুকল। তৃণা নিজের পোড়া জায়গাটাতে পাগলের মতো ফুঁ দিচ্ছিল। আরিয়ান এক মুহূর্ত দেরি না করে তৃণার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। জায়গাটা লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
​আরিয়ান কোনো কথা না বলে বেসিনের কলটা ছেড়ে দিয়ে তৃণার হাতটা ঠান্ডা পানির নিচে ধরল। তার চোখ-মুখে তখন এক তীব্র উদ্বেগ আর অস্থিরতা। তৃণা পলকহীন দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটা ছ্যাঁকা, অথচ লোকটার চোখে যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ব্যাকুলতা।
​আরিয়ান ফুঁ দিতে দিতে ধমকের স্বরে বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করার কী দরকার ছিল? তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তৃণা? হাতটা পুড়িয়ে ফেললে তো!”

​তৃণা কোনো জবাব দিল না। তার মনে হলো, যে আরিয়ান এক অচেনা পাহাড়ি মেয়ের খোঁজে পাগল হয়ে ছুটে যাচ্ছে, সেই মানুষটাই কি আজ তার সামান্য ব্যথায় এতখানি অস্থির? এই দুই আরিয়ানের মাঝে সে কাকে বিশ্বাস করবে?
তৃণা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল গলায় বলল,
​“সামান্য কথা রক্ষা করার জন্য এত আদিখ্যেতা আর এত অভিনয় করার তো কোনো দরকার নেই।”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ঠিক যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তৃণার হঠাৎ এই আক্রমণাত্মক কথায় আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে ভাবতেও পারেনি তার উৎকণ্ঠার জবাবে এমন একটা তীরের মতো কথা ধেয়ে আসবে।সে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী বললে?”

​“বললাম, সেদিন সকালে অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে না হয় বলেই দিয়েছিলেন যে আমাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি খুব ভালো করেই জানি, সেটা ছিল স্রেফ আপনার ভেতরের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা উপায়। তাই আমার জন্য এখন আর এতটা দরদ মাখানো অভিনয় করার দরকার নেই। হাত ছাড়ুন!”

​বলেই তৃণা এক ঝটকায় আরিয়ানের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার চোখে তখন অভিমান আর ক্ষোভের এক মিশ্র আগুন।যতই মেয়েটা বলুক আরিয়ান সেই পাহাড়ি মেয়েকে খুজে পাক।কিন্তু কোনো স্ত্রী কি নিজের সংসার নিয়ে টানা ছেছড়া করার মতো শক্তি থাকে? আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিচেনের মাঝখানে। তৃণা আবার খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
“ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”

​আরিয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুতপায়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে এল। তার মাথার রগগুলো অপমানে আর রাগে দপদপ করছে। মনে মনে সে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ভাবল ‘এই কারণেই মেয়ে মানুষকে সাহায্য করতে নেই! সবকিছুতেই ওরা বাঁকা মানে খুঁজে বের করে। আমি ওর ব্যথায় অস্থির হয়ে ছুটে গেলাম, আর ও আমাকে বলছে অভিনয় করছি? ঠিক আছে, আজ থেকে আমার চোখের সামনে ও যত চটপট করুক আর যা-ই হোক, আমি আর কক্ষনো ওকে সাহায্য করতে যাব না।’
​আরিয়ান মনে মনে শক্ত এক প্রতিজ্ঞা করে নিল। সে দ্রুত খাবার খেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।
★★★
বিছানার এক কোণে পাথরের মতো বসে আছে মিতু। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ, চোখের কোণে একরাশ হতাশা আর অনিশ্চয়তা। ঠিক সেই মুহূর্তে রুমে প্রবেশ করল রোহান। মিতুকে ওভাবে বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতে দেখে রোহানের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মিতুর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল। দুহাতে মিতুর মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলল,
​“কী হয়েছে আমার নীলাঞ্জনা? মন খারাপের কারণটা কী, বলবে তো?”

​মিতু কোনো উত্তর দিল না, মূর্তির মতো বসে রইল। রোহান এবার আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“আমার ওপর কি কোনো কারণে রাগ করেছো? আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি, তবে এই দেখো এখনই কানে ধরছি।”

​রোহান সত্যিই নিজের কানে হাত দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিতু দ্রুত তার হাতটা চেপে ধরে আটকে দিল। ম্লান গলায় বলল, “না রোহান, ওরকম কিছু না।”

​“তাহলে কেমন কিছু? খুলে বলো তো।” রেহান অভয় দিল।

​মিতু ধীর হাতে তার পেছনে লুকিয়ে রাখা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিটটা বের করে রোহানের হাতে দিল। রেহান কিটটার দিকে তাকিয়ে দেখল ফলাফল নেগেটিভ। এক মুহূর্ত নীরব থেকে রোহান মৃদু হাসল। মিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“এই পাগলি মেয়ে! এই সামান্য কারণে তুমি মুখটা অন্ধকার করে বসে আছ?”

​মিতুর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে ধরা গলায় বলল,
“একবার নয় রেহান, এ নিয়ে দু-বার মিস হয়ে গেল। আমার খুব ভয় হচ্ছে। আমি কি মা হতে পারব না?”

​রোহান আলতো করে মিতুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। গভীর শান্ত গলায় বলল,
“আমরা কি খুব বুড়ো হয়ে গেছি? এত তাড়াহুড়ো কিসের? সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নিয়ামত। তিনি যখন খুশি হবেন, ঠিক তখনই আমাদের কোল আলো করে কেউ আসবে। তুমি কেন শুধু শুধু চিন্তা করছ?”

​রোহান সান্ত্বনা দিলেও মিতুর মনের কোণ থেকে শঙ্কার মেঘ পুরোপুরি কাটছিল না। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না তো?”

​“একদমই না, বিশ্বাস রাখো।” রেহান পরম মমতায় জবাব দিল।
​মিতুর ঠোঁটে এবার একটু হাসির রেখা দেখা দিল। রোহান মিতুর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা গলায় বলল,
“বউ গো, এবার একটা চুমু দাও না!”

​মিতু লাজুক হেসে রেহানের গায়ে একটা চিমটি কেটে বলল, “তুমি এত চুমুখোর কেন বলো তো?”

​রোহান আর উত্তরের অপেক্ষা করল না। মিতুর কপালে গভীর ভালোবাসায় একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল, “গাঁজাখোর তো আর নই, নিজের বউয়ের ভালোবাসার খোর হওয়া কি দোষের?”

​রোহানের এই রসিকতায় মিতু খিলখিল করে হেসে উঠল। মুহূর্তেই ঘরের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে এক নির্মল ভালোবাসার আবেশ ছড়িয়ে পড়ল।
★★★
দুপুর গড়িয়ে তখন গূদিলির আভা দেখা যাচ্ছে।​গাড়ির পেছনের সিটে জানালার কাঁচ নামিয়ে চুপচাপ বসে আছে আরিয়ান। তার চোখেমুখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। বাইরে নীল আকাশের নিচে বান্দরবনের থানচি-আলীকদম সড়কের সেই চিরচেনা রূপ বিশাল সব পাহাড় যেন আকাশের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ঠিক ধারেই কয়েকশ ফুট গভীর খাদ, যার নিচে ঘন সবুজ বন আর নাম না জানা পাহাড়ি ঝিরির শব্দ। মাঝে মাঝে রাস্তার একদম গা ঘেঁষে দুই-একটা ছোট মাচাং ঘর দেখা যাচ্ছে, যেখানে পাহাড়ি শিশুরা আপনমনে খেলছে।
​সাদিফ উত্তেজনায় ফুটছে। সে জানালার বাইরে মাথা বের করে চিৎকার করে বলল,
“দোস্ত, একবার দেখ! কী অদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবীটা! এই বাঁকগুলো দেখলেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। তোর ভালো লাগছে না আরিয়ান?”

​আরিয়ান ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাদিফ যা দেখছে তা হলো সৌন্দর্য, কিন্তু আরিয়ান যা দেখছে তা হলো এক বিভীষিকা। তার চোখের সামনে বারবার চার বছর আগের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠছে।
​ঠিক এই রাস্তাতেই, এই বাঁকটাতেই চার বছর আগে সে এক পলকের জন্য তাঁকে দেখেছিল।আর বারবার চোখো ভাবছে সেই গাড়িটা কীভাবে খাদে গিয়ে পড়েছিল।আরিয়ানের এসব মাথায় আসতেই মাথর যন্ত্রণা আরম্ভ হলো।
​সেই পাহাড়, সেই সর্পিল রাস্তা আর সেই মেঘের আনাগোনা সবই ঠিক আছে। শুধু সেই মেয়েটা নেই। আরিয়ান এবার এখানে ফিরে এসেছে স্রেফ ভ্রমণের জন্য নয় সে এসেছে ওই গভীর খাদের কিনারে হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়েটার কোনো একটা চিহ্ন খুঁজতে। যে সৌন্দর্য সাদিফকে মুগ্ধ করছে, সেই সৌন্দর্যই আরিয়ানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে এক অমীমাংসিত অপরাধবোধে।
​রাস্তার পাশের জুম ঘরগুলো পেছনে ফেলে গাড়িটা যখন ডিম পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠছে, আরিয়ান তখন ভাবছিল সেই মেয়েটা কি আজও ওই কুয়াশার আড়ালে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে?
হঠাৎ আরিয়ান বলল গাড়ি থামাতে।সাদিফ বলল,
“কি হলো?”
ড্রাইভার গাড়ি থামাতেই আরিয়ান নেমে দাঁড়াল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল চার বছর আগের সেই দিনটিতে। ঠিক এই জায়গাটায় তাদের বাসটা দাঁড়িয়ে ছিল যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে। আরিয়ান জানালার কাঁচ দিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য বৃষ্টির অঝোর ধারায় ডানা মেলা পাখির মতো এক কিশোরী নীল গাউন পরে ঘুরছে, যেন সে বৃষ্টিরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
​আরিয়ান কল্পনাতেই এক চিলতে হাসল। কিন্তু চোখ খুলতেই সামনে সেই শূন্য পাহাড় আর ধূসর রাস্তা। সাদিফ কাছে এসে একটু বিরক্তি আর দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল,
“আরিয়ান, এখন তো আসলাম। এবার কী করবি?”

​আরিয়ান চারপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বলল, “সামনেই তো একটা হোটেল আছে, তাই না?”

​সাদিফ মাথা নেড়ে বলল,
“হুম, কিন্তু ওটা খুবই সাধারণ মানের ছোট হোটেল। আর আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার আশেপাশে তেমন জনবসতি নেই। হাতেগোনা কয়েকটা ঘর মাত্র।”

​আরিয়ান কিছুটা যুক্তি দিয়ে ভাবল,
“শোন সাদিফ, একা একটা মেয়ে নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে এখানে ভিজতে আসবে না। তার মানে সে আসেপাশেই কোথাও ছিল। তবে আমি নিশ্চিত, মেয়েটা এই অঞ্চলের কোনো আদিবাসী বা পাহাড়ি কন্যা ছিল না। তার পরনের নীল গাউনটা ছিল আধুনিক। আমার মনে হচ্ছে সে শহর থেকে এখানে বেড়াতে এসেছিল এবং হয়তো এই হোটেলেই উঠেছিল।”

​দুজনে আর গাড়িতে উঠল না। পাহাড়ের খাঁজকাটা পথ ধরে কিছুটা হাঁটতেই সেই জরাজীর্ণ হোটেলের সামনে পৌঁছাল তারা। হোটেলের ভেতরে পা রাখতেই কাউন্টার থেকে এক বয়স্ক লোক অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম। আপনারা কি রুম বুক করবেন?”

​আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
“না, আমরা আসলে একটা খোঁজ নিতে এসেছি।”

​লোকটি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল।
“খোঁজ? কীসের খোঁজ?”

​আরিয়ান সরাসরি মূল কথায় চলে এল,
“আচ্ছা, আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে, জুন মাসের একুশ তারিখ ওই সময় এই হোটেলে যারা যারা ছিলেন, তাদের লিস্টটা কি একবার দেখা যাবে?”

​লোকটির চেহারায় এবার সন্দেহের রেখা ফুটে উঠল। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনারা কারা শুনি? চার বছর আগের লিস্ট তো আর্কাইভে থাকে। হুট করে চাইলেই কি আর দেওয়া যায়? আমি কেন আপনাদের এই গোপন তথ্য দেব?”

​আরিয়ান বুঝল পরিস্থিতি সহজ নয়। সে পকেট থেকে তার পার্স বের করতে করতে সাদিফের দিকে তাকাল। পাহাড়ের এই রহস্যময় অধ্যায় উন্মোচন করা কি এতই সহজ হবে?
আরিয়ান আর সাদিফ যে ভয়টা পাচ্ছিল, ঠিক সেটাই হলো। চার বছর আগের নথিপত্র বের করে দেওয়া কোনো সাধারণ হোটেলের পক্ষে সহজ নয়, আর নিরাপত্তা বা গোপনীয়তার খাতিরে তারা সেটা দিতেও চায় না। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কী হয়েছে এখানে? এত হট্টগোল কিসের?”

​আরিয়ান পেছনে ফিরতেই অবাক হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিরব আরিয়ানের স্কুলের পুরনো বন্ধু। রিসিপশনের লোকটি নিরবকে দেখে বিনয়ের সাথে বলল, “স্যার, দেখুন না! এই লোকগুলো এসে পুরনো খাতা চাচ্ছে আর ঝামেলা করছে।”

​নিরব আরিয়ান আর সাদিফকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর চওড়া হাসি দিয়ে এগিয়ে এল। তিন বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। কুশল বিনিময়ের পর নিরব অবাক হয়ে বলল,
“তোরা এখানে? এই পাহাড়ে কী মনে করে?”

​আরিয়ান আর রাখঢাক করল না। সে সংক্ষেপে তার আসার উদ্দেশ্য আর সেই রহস্যময়ী মেয়ের কথা খুলে বলল। নিরব এই হোটেলের ম্যানেজমেন্টের সাথে যুক্ত, তাই সে এককথায় সাহায্য করতে রাজি হয়ে গেল। তবে সে জানাল, পুরনো রেজিস্টারগুলো আলাদা একটা স্টোর রুমে রাখা হয়েছে, যেখানে ধুলো আর স্তূপ করা ফাইলের মাঝে ওটা খুঁজে বের করতে বেশ সময় লাগবে।
​আরিয়ানের ধৈর্য ধরার কোনো বিকল্প ছিল না। প্রায় এক ঘণ্টা ধুলোবালি ঘেঁটে অবশেষে চার বছর আগের সেই জীর্ণ খাতাটা বের করা হলো।খাতার অবস্থা খারাপ। আরিয়ানের হাত উত্তেজনায় কাঁপছে। খাতাটা খুলে দেখল, চার বছর আগে এই হোটেলটা এখনকার মতো এত উন্নত বা বড় ছিল না, তাই বর্ডারের সংখ্যাও ছিল সীমিত।
​আরিয়ান প্রতিটি নাম খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। পুরো লিস্টে দেখা গেল, সেই নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র তিনটি পরিবার ঢাকা থেকে এসে এখানে উঠেছিল যাদের সাথে কিশোরী বা তরুণী মেয়ে ছিল।
​আরিয়ানের হৃদস্পন্দন যেন বেড়ে গেল। সে ঝটপট মোবাইল বের করে ওই তিনজনের নাম এবং তাদের ঢাকার ঠিকানার ছবি তুলে নিল। সাদিফ আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কাজ তো অর্ধেক হয়ে গেল। এখন এই তিনজনের মধ্যে তোর সেই পাহাড়ি কন্যা কে, সেটা খুঁজে বের করা কেবল সময়ের ব্যাপার।”

​আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, নিয়তি তাকে কোনো এক বিশাল গোলকধাঁধার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
★★★
মোজাহের আহমেদ এবং মাহমুদা বেগম সোফায় বসে বেশ খোশগল্প করছিলেন। ঠিক তখনই নির্জন অনেকটা ঝড়ের বেগে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। ছেলেকে দেখে মোজাহের সাহেব হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় গিয়েছিলে বাবা? ইদানীং তো তোমার টিকিটিরও দেখা পাওয়া যায় না।”

​নির্জন সোফার একপাশে বসে গম্ভীর গলায় বলল, “হাসপাতালে একটা দরকারি কাজ ছিল।”

​মাহমুদা বেগম পরম মমতায় বললেন,
“অনেক তো ছোটাছুটি হলো, এবার যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি খাবার দিচ্ছি।”

​নির্জন তার মা-বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“দাঁড়াও, তোমাদের সাথে আমার একটা খুব দরকারি কথা আছে।”

ছেলের কণ্ঠস্বরে এক অস্বাভাবিক দৃঢ়তা দেখে মোজাহের সাহেব কিছুটা অবাক হলেন। তিনি চশমাটা ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী এমন কথা?”

​“আব্বু, আমি বিয়ে করতে চাই।”

​নির্জন এই কথাটা বলতেই মোজাহের এবং মাহমুদা উভয়ের মুখেই স্বস্তির হাসি ফুটল। মাহমুদা বেগম উৎফুল্ল হয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ! এ তো খুব খুশির খবর। ঠিক আছে, আমরা কাল থেকেই তোমার জন্য মেয়ে দেখা শুরু করছি।”

​নির্জন শান্ত কিন্তু স্থির কণ্ঠে বলল,
“মেয়ে দেখতে হবে না আম্মু। সেই মেয়ের কথা আমি তোমাদের আগেও জানিয়েছি এবং তোমরা রাজিও হয়েছিলে। এখন শুধু তোমরা একবার মির্জা বাড়িতে যাবে আর বিয়ের কথা পাকা করে আসবে।”

​নির্জনের কথা শেষ হতেই পুরো ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া যেন নিমিষেই বদলে গেল। মাহমুদা বেগম আর মোজাহের সাহেবের মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। মাহমুদা বেগম বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“এসব কী বলছ নির্জন? তুমি নুসরাতের কথা বলছ? ওই মেয়েটার কথা আপাতত ভুলে যাও।”

​নির্জন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে আহত দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী বলছ আম্মু? ভুলে যাব? কিন্তু কেন? তোমরা তো নুসরাতকে আগে থেকেই পছন্দ করতে।”

​মাহমুদা বেগম এবার কঠোর গলায় বললেন,
“তুমি বুঝতে পারছ না কেন নির্জন? মেয়েটার মুখের অবস্থা তুমি দেখেছ? ওর মুখের বাম দিকটা যেভাবে পুড়ে বীভৎস হয়ে আছে, তা দেখলেই তো ভয় লাগে! আমার একমাত্র ছেলের বউ হবে ওই কুৎসিত মেয়েটা? লোকে দেখলে কী বলবে একবার ভেবে দেখেছ?”

​নির্জনের বুকটা অপমানে আর কষ্টে ফেটে যেতে চাইল। তার মা-ও কি তবে নুসরাতের মনের বদলে তার পোড়া চামড়াকেই দেখছেন?
নির্জনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। নিজের শিক্ষিত এবং মার্জিত মা-বাবার মুখ থেকে এমন সংকীর্ণ কথা সে কল্পনাও করতে পারেনি। তার চোখে আজ একরাশ বিস্ময় আর ঘৃণা খেলা করছে। সে নিজের বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলল,
​“আমি নুসরাতের চেহারা দুর্ঘটনার পর একবারও দেখিনি আব্বু। কারণ আমার কাছে নুসরাত মানে তার ওই মায়াবী চোখ আর পবিত্র একটা মন। আমার চোখে সে আগেও যা ছিল, এখনো ঠিক তাই আছে। আমি তোমাদের সাথে কোনো অভদ্রতা করতে চাই না, কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি তোমরা আজই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মির্জা বাড়িতে যাবে।”

​মোজাহের আহমেদ রাগে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“বললেই হলো? বিয়েটা কি ছেলেখেলা মনে হচ্ছে তোমার? আজ আবেগের বশে বড় বড় কথা বলছ, কাল যখন পাড়া-প্রতিবেশীরা আড়ালে হাসাহাসি করবে, বলবে ‘নির্জন এ কেমন কুৎসিত মেয়েকে বিয়ে করল’ তখন তুমি নিজেই লজ্জায় মাথা তুলতে পারবে না।”

​নির্জনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“জি আব্বু, আমি সেই লজ্জা পেতেও রাজি। কে কী বলল তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আই অনলি নো নুসরাত ইজ মাই হার্ট। আমি নুসরাতকে ভালোবেসেছি, তার চামড়াকে নয়।”

​মাহমুদা বেগম এবার কঠোর স্বরে বললেন,
“যতই আবেগের কথা বলো নির্জন, এই পোড়া মুখ নিয়ে ওই মেয়ে আমাদের বাড়ির বউ হয়ে ঢুকবে না। আমরা এই বিয়েতে রাজি নই।”

​“ওকে, ফাইন আম্মু। তোমরা যদি রাজি না হও, তবে আমারও কিছু করার নেই। আমি নুসরাতকেই বিয়ে করব, এটাই শেষ কথা।”

​মোজাহের সাহেব এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি আঙুল উঁচিয়ে শাসালেন,
“তুমি আমাদের সাথে মুখে মুখে তর্ক করছো? একটা মেয়ের জন্য এতটা অভদ্র হয়ে গেলে? মনে রেখো, তুমি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করো, তবে আমি তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করব। এই বাড়ির এক ইঞ্চি মাটিও তুমি পাবে না।”

​নির্জন একটুও বিচলিত হলো না। সে ধীরপায়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“যা ইচ্ছে হয় করুন আব্বু। তবে নিজের ভালো থাকা আর ভালোবাসা নিয়ে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করতে পারব না। আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করলে যদি আপনাদের শান্তি হয়, তবে তাই সই।”

​বলেই নির্জন কারোর উত্তরের অপেক্ষা না করে সজোরে দরজা টেনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মাহমুদা আর মোজাহের সাহেব পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। যে ছেলে কোনোদিন তাদের কথার অবাধ্য হয়নি, সেই ছেলে আজ একটা মেয়ের জন্য পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল?

চলবে…

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply