রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৭
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
রাত তখন গভীরের তরে। জগতের নিয়ম অনুযায়ী এই সময়টা সবার ঘুমন্ত থাকার কথা। কিন্তু এই নিবিড় অন্ধকারের মাঝেও কিছু নিশাচর জেগে থাকে। অদ্ভুত সেই মানুষগুলো, যাদের নির্লিপ্ত চোখে ঘুম নেই তাদের অনায়াসেই রাতের প্যাঁচার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
মানুষের রাত জাগার কারণগুলো বড় বিচিত্র। কারো মাথায় পাহাড় সমান পারিবারিক চিন্তা, কারো পকেটে টাকার অভাব, আবার কেউ বা শরীরের ব্যধিতে ছটফট করছে,আবার কেউ সৃষ্টিকর্তার তরে যখন অভিযোগ ব্যক্ত করছে। কিন্তু এই সবকিছুর ভিড়ে একদল মানুষ আছে যারা সবচেয়ে অদ্ভুত। তারা পুরো রাত কাটিয়ে দেয় কেবল প্রিয় মানুষের কথা চিন্তা করে, বালিশ ভিজিয়ে দেয় নোনা জলের বিসর্জনে।
আমার দৃষ্টিতে, এদের অনায়াসেই ‘বোকার কাতার’-এ দাঁড় করানো যায়। তারা যার জন্য নিজের সুখের ঘুম হারাম করছে, চোখের নিচে কালি ফেলছে সেই প্রিয় মানুষটি হয়তো টেরও পায় না যে কোনো এক নিভৃত কোণে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে কিংবা কাঁদছে। কারো নিশি জাগ্রত থাকা যখন অন্যের কাছে অজানাই থেকে যায়, তখন সেই ত্যাগের মূল্য কতটুকু? তাদের এই একপাক্ষিক ব্যাকুলতা দেখে মাঝে মাঝে বড় আফসোস হয় মানুষ কতটাই না বোকা হতে পারে! আবার পরক্ষণেই বুকের ভেতর এক দলা করুণা এসে জমা হয়। মায়ার কী অমোঘ টান, যা মানুষকে এই নিঃস্বার্থ বোকামির পথে ঠেলে দেয়!
গভীর রাতে আরিয়ানের ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। আরিয়ানের ঘুম বরাবরের মতোই খুব পাতলা,সামান্যতম শব্দেও তার তন্দ্রা ছুটে যায়। চোখ খুলতেই সে শুনতে পেল কারো গুমরে মরা কান্নার আওয়াজ। কেউ একজন ভীষণ ধীর কণ্ঠে ডুকরে কাঁদছে।
আরিয়ান অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সে বিছানায় শুয়ে আছে। অথচ তার অস্পষ্ট মনে পড়ছে, সে তো বেলকনিতে ছিল! তবে কি সে ঘুমের ঘোরেই এখানে এসেছে, নাকি অন্য কিছু? নিজের প্রশ্নের উত্তর হাতড়াতে গিয়ে আরিয়ানের চোখ গেল ফ্লোরের দিকে।
রুমের ম্লান ড্রিমলাইটের নীলচে আলোয় দেখা যাচ্ছে এক মানবীকে। তৃণা জায়নামাজে বসে দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আরিয়ান দেখল রাত এখন তিনটা। এই তো তাহাজ্জুদের সময়। তৃণা কাঁদছে আর অস্ফুট স্বরে কী যেন বিড়বিড় করে বলছে।আরিয়ানের কৌতূহল বেড়ে গেল। সে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে বিছানার কিনারায় এসে কান পাতল। ঘরের পিনপতন নীরবতায় তৃণার ভাঙা কণ্ঠের আকুতি আরিয়ানের কানে স্পষ্ট ভেসে এল,
“মাবুদ, সবাই আমার বেলায় এত স্বার্থপর কেন? কেন দুনিয়ার সব মায়া আমার দুয়ারে এসে থমকে দাঁড়ায়? কেন আমাকে অবহেলা করতে কারও হাত কাঁপে না, কারও কলিজা মায়ায় আর্দ্র হয় না? আমাকে তুচ্ছ করতে, আমার গায়ে হাত তুলতে কেন কারও হৃদয় একটুও কেঁপে ওঠে না?
কেউ কি বোঝে না যে আমার এই শরীরটাও ব্যাথা পায়? আমি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাব ভেবে কেউ কেন একবারও থমকে যায় না? কেন আমায় অযত্নে রাখতে কারও এক বিন্দু দ্বিধাবোধ হয় না? তবে কি আমি এতটাই মূল্যহীন?
মাবুদ, তোমার পৃথিবীর সব নিয়ম কি শুধু আমার বেলায় বদলে যায়? যেখানে সবার জন্য ভালোবাসা আছে, সেখানে আমার জন্য কেন শুধু অবজ্ঞা? এত অনিয়মের সাগরে কেন আমাকে এভাবে একলা বাঁচিয়ে রাখলে প্রভু? এর চেয়ে কি ভালো হতো না যদি তুমি আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে?
কত রাত হয়ে গেল আমি আম্মুর সেই মায়াভরা মুখটা দেখি না। এই পাথরের শহরে বুক ফেটে গেলেও আমায় আগলে ধরার মতো তো কেউ নেই। যার আঁচলে মুখ লুকাবো, সেই মানুষটাকেও তো তুমি নিয়ে গেলে। আমাকেও নিয়ে যাও মাবুদ, এই পাথরের পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে…”
তৃণা হয়তো আরও কিছু বলছিল, কিন্তু আরিয়ান আর শুনতে পারল না। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা অপরাধবোধে মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিঃশব্দে সরে এসে আগের মতো শুয়ে পড়ল।
আঁধারে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান মনে মনে ভাবল, “এত কিসের কষ্ট এই মেয়ের? যে মোনাজাতে বসে এভাবে বুক ফাটিয়ে কান্না করছে?”
আরিয়ান জীবনের অনেক হিসাব মেলাতে পারলেও, তৃণার এই কান্নার হিসাব মিলাতে ব্যর্থ হলো। সে চোখ বন্ধ করে আবারও ঘুমের চেষ্টা করল।
তৃণা কিছুক্ষণ পর জায়নামাজ থেকে উঠল। আরিয়ান চোখ বন্ধ করে শুয়ে থেকেও তার প্রতিটি নড়াচড়া টের পাচ্ছিল। সে বুঝতে দিল না যে তৃণার সেই বুকফাটা হাহাকার আর মোনাজাতের প্রতিটি শব্দ তার কানে পৌঁছেছে।
খানিক বাদে আরিয়ান এমনভাবে চোখ খুলল, যেন সে এইমাত্র গভীর ঘুম থেকে জেগেছে। তৃণা আরিয়ানকে চোখ খুলতে দেখেই শিউরে উঠল। তার এই আকস্মিক কেঁপে ওঠা আরিয়ানের নজর এড়াল না, তবে সে কারণটা ঠিক ধরতে পারল না। আরিয়ান নিজের ভেতরেও এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব করছিল, শরীরটা বিষিয়ে আছে, বিছানা ছেড়ে উঠতে যেন প্রাণ চাইছে না।
তৃণা নিস্পলক দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান শুষ্ক গলায় বলল,
“তৃণা, আমাকে একটু পানি দিতে পারবে? ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে।”
তৃণা পাথরের মূর্তির মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে তখনো রাতের সেই ভয়ংকর স্মৃতি তাজা। সেই রক্তবর্ণ চোখ, সেই নিষ্ঠুর হাত সবকিছু মনে পড়তেই তার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে। তবুও সে কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসে জল ভরে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল।
আরিয়ান বারবার অবাক হচ্ছে, ‘মেয়েটা আমায় দেখে এভাবে সিঁটিয়ে যাচ্ছে কেন?’
আরিয়ান গ্লাসটা নিতে গিয়েই থমকে গেল। তার নজর গেল তৃণার হাতের সেই পোড়া ক্ষতের ওপর। কালচে হয়ে যাওয়া সেই গভীর ক্ষত দেখে আরিয়ান আঁতকে উঠল। আতঙ্কিত গলায় প্রশ্ন করল,
“এসব কী হয়েছে হাতে? কীভাবে হলো?”
তৃণা বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল। তার মুখ হাঁ হয়ে এল। এই লোকটা কী বলছে? কয়েক ঘণ্টা আগেই সে নিজের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরল এখানে, আর এখন দেবদূত সেজে জিজ্ঞেস করছে ‘কী হয়েছে?’
তৃণাকে চুপ করে থাকতে দেখে আরিয়ান আবার অস্থির হয়ে বলল,
“কী হলো, কথা বলতে পারছ না? হাত পুড়ল কী করে? দেখে তো মনে হচ্ছে কেউ জানোয়ারের মতো এখানে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরেছিল!”
তৃণা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আরিয়ান কি সত্যিই রাতের সেই নারকীয় অত্যাচারের কথা ভুলে গেল? নাকি ভুলে যাওয়ার এক নিখুঁত নাটক করছে? তৃণার ভয়ের জায়গায় এবার প্রচণ্ড ঘৃণা আর রাগ এসে ভর করল। সে এক হ্যাঁচকা টানে আরিয়ানের হাতের নাগাল থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল।
চোখ ফেটে জল আসলেও এবার গলায় সর্বশক্তি সঞ্চয় করে চিৎকার করে উঠল তৃণা,
“ফাইজলামি করছেন আমার সাথে? নিজেই প্রথমে নরপিশাচের মতো অত্যাচার করে এখন দরদ দেখানোর নাটক করছেন? লজ্জিত হওয়া উচিত আপনার!”
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে তৃণার অগ্নিঝরা চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। সত্যিই কি সে এমন কিছু করেছে?
তৃণার মুখে নরপিশাচ আর অত্যাচারের কথা শুনে আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার মুখ হাঁ হয়ে এল। সে ভ্রু কুঁচকে রেগে গিয়ে বলল,
“এসব কী বলছো তুমি? আমাকে অকারণে রাগিয়ে দিও না। আমি কখন তোমার ওপর অত্যাচার করলাম?”
তৃণা লক্ষ্য করল, লোকটাকে এখন আর মধ্যরাতের মতো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে না। বরং তার চোখেমুখে একরাশ বিস্ময়। তৃণা মনে মনে ভাবল, ‘একটা মানুষ এত অল্প সময়ে সবটা কীভাবে ভুলে যেতে পারে! এটা কি সত্যিই বিস্মৃতি, নাকি নিছক অভিনয়?’ সে আর কথা বাড়িয়ে লাভ দেখল না, কারণ এই মানুষটার সাথে তর্ক করা মানেই নতুন কোনো বিপদ ডেকে আনা।
আরিয়ান বিছানা থেকে নেমে দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এলো। সেখান থেকে একটা মলম বের করে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“হাতটা বাড়াও। মলম লাগিয়ে দিচ্ছি।”
তৃণা অনীহাভরে ধীর কণ্ঠে বলল,
“মলমটা আমাকে দিন, আমি নিজেই লাগিয়ে নেব।”
আরিয়ান কোনো কথা না বলে শুধু রক্তবর্ণ চোখে তৃণার দিকে তাকালো। সেই এক চাহনিতেই কাজ হলো। তৃণা আর দ্বিরুক্তি করার সাহস পেল না,ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে নিজের হাতটা আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
আরিয়ান এক হাতে তৃণার হাতটা আগলে ধরল। তার স্পর্শ এখন আর কর্কশ নয়, বরং ভীষণ নরম। আরিয়ানের হাতের আঙুল তৃণার ক্ষতে ছোঁয়া মাত্রই তৃণা যন্ত্রণায় ‘আহ্’ করে উঠল। আরিয়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর খুব সাবধানে মলমটা লাগিয়ে দিতে লাগল। মলম লাগানোর সময় আরিয়ান লক্ষ্য করল, তৃণার হাতে শুধু পোড়া দাগই নয়, বরং হাত মুচড়ানোর কালো হয়ে যাওয়া দাগও স্পষ্ট। তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল এসব কীভাবে সম্ভব?
কাজ শেষ হতেই তৃণা ছটফট করে উঠে দাঁড়াল। সে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে আরিয়ান পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছো?”
“ছাদে।”
“ছাদে কেন? এত রাতে ছাদে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ঘুমাও। ফজরের আজান দিলে তখন যেও,” আরিয়ান স্বাভাবিক স্বরেই বলল।
তৃণা দরজার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “ফজরের আজান অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছে।”
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, ঘুমের অভিনয় করতে করতে সে কখন যে সত্যিই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল, তা নিজেও জানে না। আরিয়ান আর কিছু বলল না। তৃণা পা টেনে টেনে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ান একই ভাবে বসে আছে। নিজের সত্তা বারবার তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করছে,
“সত্যিই কি আমি তৃণার হাত পুড়িয়ে দিয়েছি? আমিই কি মেয়েটার হাত মুচড়ে ধরেছিলাম? কিন্তু কেন? কেন এমন পিশাচের মতো আচরণ করলাম আমি?”
আরিয়ান দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরল। রগগুলো দপদপ করছে, অসহ্য এক যন্ত্রণা হচ্ছে মস্তিষ্কে। দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ করে অতীত হাতড়ানোর পর তার মনের পর্দায় মধ্যরাতের ঘটনাগুলো ঝাপসাভাবে ভেসে উঠল। পুরোটা পরিষ্কার না হলেও যতটুকু মনে পড়েছে, সেটুকুই তাকে নিজের চোখে অপরাধী প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এক বুক ঘৃণা জন্মালো নিজের ওপর।
তৃণা তখন ছাদের এক কিনারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই ছাদটা বেশ পরিপাটি। একদিকে সারিবদ্ধ ফুলের গাছ, অন্যপাশে কিছু সবজির চারা। এক কোণে একটা স্টিলের দোলনা থাকলেও তৃণার সেখানে বসতে ইচ্ছে হলো না। সে অপলক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সূর্য এখনো পুরোপুরি ওঠেনি, পূর্ব আকাশে লাল রঙের এক টুকরো আভা ফুটে উঠেছে। ভোরের হিমেল বাতাস এসে তৃণার কোমর ছাপানো লম্বা চুলগুলোকে অবাধ্যভাবে উড়িয়ে দিচ্ছে। তৃণা চোখ বন্ধ করে এই শুদ্ধতাটুকু অনুভব করার চেষ্টা করল। সে বিশ্বাস করে, মানুষের ক্ষতবিক্ষত মন ভালো করার একমাত্র মহৌষধ হলো প্রকৃতি। যত কঠিন সময়ই আসুক না কেন, প্রকৃতির সান্নিধ্য যেন সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়।
হঠাৎ পাশেই কারোর অস্তিত্ব টের পেয়ে তৃণা চোখ খুলল। দেখল আরিয়ান তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, দৃষ্টি তার আকাশের দিকেই নিবদ্ধ। তৃণা অস্বস্তিতে কয়েক পা দূরে সরে গেল। আরিয়ান তৃণার দিকে না তাকিয়েই খুব নিচু স্বরে বলে উঠল,
“সরি…”
তৃণা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“রাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য।”
তৃণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, ‘তাহলে এতক্ষণ ঘরে অত নাটক করার কী প্রয়োজন ছিল? সব মনে থেকেও না বোঝার ভান করার মানে কী?’
তৃণাকে আপন মনে বিড়বিড় করতে দেখে আরিয়ান এবার তার দিকে তাকালো। তার চোখে এখন অপরাধবোধের ছায়া। সে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বললে?”
তৃণা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকালো না। নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“না না, কিছু না। আর সরি বলার প্রয়োজন নেই। এর চেয়েও অনেক বড় বড় অত্যাচার সহ্য করার রেকর্ড আছে আমার। তাই সিগারেটের এই সামান্য ব্যথা এখন আর আমাকে কাবু করতে পারে না।”
আরিয়ান বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল তৃণার দিকে। তৃণা আবারও বলতে লাগল, তার দৃষ্টি তখনো দূরের দিগন্তে, “জানেন তো, মানুষের মন পাথরের না। কিন্তু আপনি বা আমি সবাই এটা ভুলে যাই। কাউকে কোনো আঘাত দেওয়ার আগে, কাউকে রক্তাক্ত করার আগে আমরা একবারও ভাবি না যে অপরপক্ষের মানুষটা কতটা ভেঙে যেতে পারে। তারপর কাজ শেষে আমরা খুব সুন্দর করে একটা ছোট শব্দ বলে দিই, ‘সরি’। আচ্ছা বলুন তো, এই তিন অক্ষরের শব্দটা কি সেই মনের গভীর ক্ষতটাকে কোনোদিন সুস্থ করতে পারে?”
আরিয়ান এবার কিছুটা বিরক্ত হলো। তার ভেতরে যে অপরাধবোধ কাজ করছিল, তৃণার তপ্ত কথাগুলো তাকে যেন আরও উস্কে দিল। সে কিছুটা কড়া গলায় বলল, “আমি শুধু তোমাকে একটা ‘সরি’ বলেছি, আর সেই উসিলায় তুমি আমাকে হাজারটা কথা শুনিয়ে দিলে? আমি ঠিক কবে, কত বছর আগে কাউকে সরি বলেছিলাম, তা আমার নিজেরই মনে নেই। আজ তোমাকে বললাম, আর এখন মনে হচ্ছে তোমাকে সরি বলাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অন্যায় হয়েছে।”
কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলেই আরিয়ান হনহন করে ছাদ থেকে নেমে গেল। তার ইগোতে লেগেছে। সে চেয়েছিল ক্ষমা চেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে, কিন্তু তৃণার বাস্তবধর্মী কথাগুলো তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা সে সহ্য করতে পারছে না।
তৃণা আরিয়ানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা ক্ষুণ্ণ, করুণ হাসল। সে মনে মনে ভাবল, ‘মানুষ বোধহয় এমনই। নিজের অন্যায়টা মেনে নেওয়ার চেয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপাতেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে
★★★
আরিয়ান রুম থেকে বের হয়ে নিচে নামতেই দেখল এক চমৎকার পারিবারিক আবহ।ড্রয়িংরুমে বসে আছেন তার বাবা আহাদ মির্জা, বড় চাচ্চু ইকবাল মির্জা এবং ছোট চাচ্চু এনামুল মির্জা। তিন ভাইয়ের আড্ডার মাঝে টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা চা। ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখা যায় না, কারণ কাজের চাপে সবাই আলাদা থাকে। তবে সকালের এই সময়টায় মাঝে মাঝে তাদের এই অটুট বন্ধন ফুটে ওঠে। পুরো বাড়ির মানুষ জানে, এই তিন ভাইয়ের মধ্যে কোনোদিন কোনো বিষয় নিয়ে বড় কোনো তর্ক হয়নি। তাদের এই মিল আর ভালোবাসাই হয়তো পুরো মির্জা পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে, নয়তো এতগুলো মানুষ এক ছাদের নিচে থাকা বর্তমান সময়ে প্রায় অসম্ভব।
আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে বলল, “গুড মর্নিং।”
তিনজনই একযোগে উত্তর দিলেন, “গুড মর্নিং।”
ছোট চাচ্চু এনামুল মির্জার সাথে আরিয়ানের সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুর মতো। আরিয়ান সরাসরি গিয়ে চাচ্চুর পাশে বসল এবং তার পেটে একটা মৃদু টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী চাচ্চু, পেটে তো দেখি বেশ ভুঁড়ি বাড়ছে!”
এনামুল মির্জা খুব গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন, “গতকাল রাতে ছোটমা-ও ঠিক এই একই কথা বলল। সত্যি করে বল তো বাবা, আমাকে কি দেখতে খুব খারাপ লাগছে?”
আরিয়ান হেসে জবাব দিল, “আরে না, তেমন খারাপ না। নিয়মিত একটু এক্সারসাইজ করো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“এক্সারসাইজ! আমি আবার কী এক্সারসাইজ করব?”
এনামুল মির্জা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“চিন্তা করো না, সময় করে একদিন আমি সব নিয়ম শিখিয়ে দেব,” আরিয়ান আশ্বস্ত করল।
ছেলের কথা শুনে আহাদ মির্জা হেসে বললেন,
“এনামুল, তুই আসলে এখনো সেই ছোটই রয়ে গেলি।”
এনামুল মির্জা হাসি হাসি মুখ করে উত্তর দিলেন,
“বড় ভাই, ওভাবে বলো না। আমি বয়সে বড় হয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনের বয়সটা এখনো বাড়ে নি।”
তার এই সরস মন্তব্যে ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। হাসি থামলে বড় চাচ্চু ইকবাল মির্জা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“আরিয়ান, তোমার ব্যবসার খবর কী? সব ঠিকঠাক চলছে তো?”
“জি চাচ্চু, ভালোই চলছে। সম্প্রতি একটা নতুন প্রজেক্ট হাতে পেয়েছি, সেটা নিয়েই এখন একটু বেশি ব্যস্ত আছি,” আরিয়ান বিনয়ের সাথে উত্তর দিল।
আড্ডার মাঝেই মিতু বিস্কুটের প্লেট নিয়ে এল। এনামুল মির্জা মিতুর দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “বউমা, রোহান কি কিছু বলেছে কবে আসবে? আমাকে তো ছেলেটা কিছুই বলে না।”
রোহানের নামটা উচ্চারণ হতেই ড্রয়িংরুমের সেই হাসিখুশি পরিবেশটা নিমেষেই থমকে গেল। মিতু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল,
“না বাবা, রোহান আমাকে আসার বিষয়ে কিছু বলেনি।”
এনামুল মির্জা এবার বেশ গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলেন, “রোহান কি তোমাকে নিয়মিত কল দেয়?”
মিতু কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিথর হয়ে রইল। তার টলটলে চোখে এক মুহূর্তের জন্য যেন এক সমুদ্র বিষাদ খেলা করে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব ধীর কণ্ঠে বলল,
“জি, নিয়মিত কল দেয়। সব সময় আমার খবর নেয়।”
মিথ্যাটা বলেই মিতু দ্রুত পায়ে উপরে উঠে গেল। ঘরের সবাই জানে রোহান মিতুর সাথে নিয়মিত কথা বলে না। পাঁচ বছর আগে বিদেশ গিয়ে সে যেন নিজের শিকড় ছিঁড়ে ফেলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র দুইবার দেশে ফিরেছে সে। মিতুর এই বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস সবাই টের পেলেও কেউ কিছু বলতে পারে না।
আহাদ মির্জা এবার আরিয়ানের দিকে ফিরে আদেশ দিলেন,
“আজ তুমি তৃণাকে নিয়ে উমরের বাড়িতে যাবে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
“পারব না আব্বু। আমি আজ ভীষণ ব্যস্ত।”
আহাদ মির্জা হঠাৎ জ্বলে উঠলেন। কড়া গলায় বললেন, “পারবে না মানে কী? শ্বশুরবাড়ি বউকে নিয়ে বিয়ের পরের দিনই যেতে হয়, আর তোমার বিয়ের আজ তিন দিন হয়ে গেল! আমার কথার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করো না।”
বলতে বলতে আহাদ মির্জার কণ্ঠটা হঠাৎ নরম হয়ে এল। তিনি কিছুটা ব্যথিত স্বরে বললেন, “দেখো আরিয়ান, তুমি আমার গর্ব। তুমি কোনোদিন আমার সম্মান নষ্ট করোনি। কিন্তু এই বিয়েটা নিয়ে তুমি আমায় হতাশ করছো। দোহাই তোমার, আমাকে আর সবার সামনে অসম্মানিত করো না।”
কথাগুলো বলে আহাদ মির্জা আর উত্তরের অপেক্ষা না করেই উঠে চলে গেলেন। আরিয়ান সোফায় বসে রইল। তার মাথার ভেতর রক্ত টগবগ করছে। তৃণার প্রতি তার বিতৃষ্ণা যেন শতগুণ বেড়ে গেল। এই তৃণা আসার পর থেকেই তাকে বাবার কাছে এত বড় হয়েও ধমক খেতে হচ্ছে।
বড় চাচ্চু ইকবাল মির্জা যাওয়ার সময় আরিয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। নিচু স্বরে সাবধান করে দিয়ে বললেন, “রোহানের মতো তুইও রসাতলে যাস না আরিয়ান। সময় থাকতে নিজেকে সামলা।”
আহাদ মির্জার আদেশ আরিয়ানের কাছে পাহাড়ের মতো ভারী মনে হলো। বাবার সেই আবেগঘন কথাগুলো যেখানে সম্মান আর গর্বের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে তা এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য আরিয়ানের নেই।
বিকালের দিকে ঠিক হলো বাড়ির ছোট-রা সকলে মিলে তৃণাদের বাড়ি বেড়াতে যাবে।
চলবে…
(তোমরা সবাই ঠিক করে গল্পে রিয়েক্ট দাও না পর্যন্ত। গল্পটা পড়েই বিদায় হয়ে যাও।প্রতিদিন অন্ততপক্ষে হাজার রিয়েক্ট তো আশা করতেই পারি নাকি!?)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০