Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৪(বর্ধিতাংশ)


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৫৪(বর্ধিতাংশ)

★★★
মির্জা বাড়ির সেই আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই হিমাঙ্কিত হয়ে গেল। চারদিকে রেশমি আলোর ঝিলিক ছাপিয়ে এখন কেবল পুলিশের সাইরেনের প্রতিধ্বনি আর মানুষের অস্ফুট ফিসফিসানি। নৌশি কবুল বলার ঠিক আগমুহূর্তে ইউনিফর্ম পরা চার-পাঁচজন পুলিশ অফিসার ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ায় গোটা বিয়েবাড়ি যেন থমকে গেছে।
​ইকবাল মির্জা হতবিহ্বল হয়ে এগিয়ে গেলেন। তাঁর কণ্ঠে বিস্ময় আর আতঙ্ক মিশে আছে,
“কী ব্যাপার অফিসার? এভাবে আমাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আপনারা! কোনো ঝামেলা হয়েছে কি?”

​পুলিশ অফিসার ইকবাল মির্জার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি নৌশির পাশে বসা সেই সুবেশ বরের দিকে এগিয়ে গেলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
“আপনারা যখন নিজেদের আদরের মেয়েকে বিয়ে দেন, তখন কি পাত্রের হাড়ির খবরটাও ভালো করে নেন না?”

​ইকবাল মির্জা অবাক হলেন,
“মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?”

​অফিসার বরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল
, “এই যে আপনাদের আমেরিকা প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার, ইনি আসলে বিদেশের বড় এক দালাল চক্রের পান্ডা। বাংলাদেশের সহজ-সরল মেয়েদের উচ্চশিক্ষার আর সুন্দর জীবনের লোভ দেখিয়ে এরা বিদেশে পাচার করে দেয়। এই ছেলেটার নামে আমাদের কাছে শক্ত এভিডেন্স আছে।”

​খবরটা শোনামাত্রই উপস্থিত সবার যেন বাকশক্তি হারিয়ে গেল। নৌশি আক্ষরিক অর্থেই মুখ হাঁ করে পাথরের মতো বসে রইল। বরবেশে থাকা ছেলেটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“কী যা তা বলছেন আপনি? আমি আমেরিকা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছি, আর আপনি বলছেন আমি নারী পা*চারকারী? ডু ইউ নো হু আই অ্যাম?”

​অফিসার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে লোকটির কাঁধে হাত রাখলেন,
“হুম, খুব ভালো করেই জানি। প্রমাণ ছাড়া আমরা মির্জা বাড়ির মতো জায়গায় হানা দিইনি। চলো মামার বাড়ি, সেখানে গেলেই তোমার সব ডিগ্রি বেরিয়ে আসবে।”

​বরের পরিবারের লোকজন তেড়ে আসলেও পুলিশের কড়া নির্দেশের সামনে সবাই দমে গেল। হট্টগোলের মাঝে নৌশি হঠাৎ খেয়াল করল করিডরের থামে হেলান দিয়ে থাকা আদনানকে। ছেলেটা বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়, বরং তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা আরও গাঢ় হয়েছে।
​বরের বাবা মরিয়া হয়ে এগিয়ে এলেন,
“আমার ছেলে নির্দোষ! সব মিথ্যে অভিযোগ দিয়ে আমাদের মান-সম্মান ডুবানো হচ্ছে। কারোর ইশারায় আপনারা এসব নাটক করছেন!”

পুলিশ অফিসার আর কারো কোনো অজুহাত শুনলেন না। পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে রুক্ষ স্বরে বললেন,
“আমাদের কাছে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে, আইন নিজের গতিতে চলবে।”

​এই অকাট্য প্রমাণের সামনে বরের বাড়ির লোকজনের দম্ভ মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আহাদ মির্জা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সব দেখছিলেন, এবার তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। বললেন,
“অসংখ্য ধন্যবাদ অফিসার। আপনারা সময়মতো না এলে আজ আমার ভাইঝির জীবনটা জ্যান্ত নরক হয়ে যেত। আমাদের অন্ধ বিশ্বাস আজ আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছিল।”

​অফিসার মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
“কর্তব্য পালন করেছি মাত্র। ভালো থাকবেন।”

​পুলিশের গাড়ি যখন সেই প্রতারক বরকে নিয়ে মির্জা বাড়ির গেট পার হলো, তখন পুরো বাড়িতে এক শ্মশানসম নিস্তব্ধতা নেমে এল। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে কানাকানি আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে বিয়ের আসর থেকে বর গ্রেফতার হওয়া মানেই মেয়ের কলঙ্ক। এই সমাজ আজও ভাঙা বিয়েকে বড্ড নিচু চোখে দেখে। নৌশি এখনো সেই স্টেজে বেনারসি জড়িয়ে পাথরের মতো বসে আছে, তার চোখে জল নেই, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে শুধু দূর থেকে আদনানের সেই রহস্যময় শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।
​রাহি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন,
“আমার মেয়েটার সাথেই এমনটা হতে হলো? এখন লোকে কী বলবে? কে নেবে আমার মেয়েকে?”

মায়মুনা বেগম আর ফারহানা বেগম তাঁকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু কারোর কাছেই কোনো উত্তর নেই।
​ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে নুসরাত ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। সে নৌশির বাবা ইকবাল মির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
​“বড় বাবা, তোমরা অনুমতি দিলে আমি একটা কথা বলতে চাই।”

​ইকবাল মির্জা দিশেহারা হয়ে বললেন,
“কী বলবি বল মা?”

​“বড় বাবা, আমার মনে হয় নৌশির বিয়েটা যদি আজ না হয়, তবে আমাদের বংশের মান-সম্মান যাবে। নৌশিও ভেতর থেকে ভেঙে যাবে।”

​ইকবাল মির্জা অসহায়ভাবে মাথা নিচু করে বললেন,
“কী করব বল? কার সাথে এখন ওর বিয়ে দেব? ভাগ্য এত খারাপ হবে কে জানত!”

​নুসরাতকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল আরিয়ান। সে বড় বাবার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক কিন্তু জোরালো কণ্ঠে বলল,
​“বড় বাবা, পরিস্থিতি বদলাতে হলে আমাদেরও বদলাতে হবে। বংশের পুরোনো নিয়মের চেয়ে নৌশির জীবন অনেক বড়। আমি চাই, এখনই এই আসরেই আদনানের সাথে নৌশির বিয়েটা সম্পন্ন হোক।”

​আরিয়ানের এই প্রস্তাব যেন মির্জা বাড়িতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটাল। সবার নজর গিয়ে পড়ল লাল শেরওয়ানি পরা আদনানের দিকে, যে এতক্ষণ একটা জাদুকরী মুহূর্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল।
মির্জা বাড়ির অন্দরমহলে তখন এক থমথমে উত্তেজনা। আরিয়ানের সোজাসাপ্টা প্রস্তাব দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক বিশাল বরফখণ্ডে আঘাত করল। এনামুল মির্জা ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এসে বললেন,
“আরিয়ান, তুই কী বলছিস ভেবে দেখছিস? নুসরাত আর তুই মিলে এই বাড়ির শত বছরের নিয়ম ভাঙার কথা বলছিস?”

​আরিয়ান শান্ত কিন্তু ধীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“হ্যাঁ ছোট চাচ্চু, আমি খুব ভেবেই বলছি। তোমাদের নিয়ম কি একটা মেয়ের জীবনের চেয়েও বড়? আজ যদি এই বিয়েটা না হয়, তবে নৌশির সারাজীবনের অসম্মানের দায়ভার কি তোমাদের এই নিয়ম নিতে পারবে?”

​ইকবাল মির্জা অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
“কিন্তু ওরা তো দুজনেই অবুঝ। ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে।”

​এতক্ষণ এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আহাদ মির্জা এবার ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। তিনি বড় ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর দুচোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি ইকবাল মির্জার হাত ধরে বললেন,
“ভাইজান, আজ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই হয়তো আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য ঘটেছিল। আমি চাই আদনান আর নৌশি মা-মণির বিয়েটা আজ এই আসরেই হোক।”

​ইকবাল মির্জা চমকে উঠে বললেন,
“তুইও এসব কী বলছিস আহাদ?”

​“আমি ঠিকই বলছি ভাইজান। আদনান আজ যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তাতে আমি নিশ্চিত ও নৌশিকে পৃথিবীর সব বিপদ থেকে আগলে রাখবে। নিয়মের চেয়ে মানুষের সুখ অনেক বড়।”

​বাড়ির বড়দের এমন নমনীয়তা দেখে উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। দীর্ঘ বিতর্কের পর অবশেষে মির্জা বাড়ির সেই কঠোর নিয়ম হার মানল ভালোবাসার কাছে। সবাই রাজি হলো আদনান আর নৌশির বিয়েতে।
​নৌশি তখনো স্টেজে বসে আছে, তার মনে হচ্ছে সে কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। পাশে এসে বসল আদনান পরনে সেই লাল শেরওয়ানি, যা সে হয়তো আজকের এই মুহূর্তটার জন্যই লুকিয়ে রেখেছিল। কাজি সাহেব আবারও খাতা খুলে বসলেন। নৌশি আর আদনান কেউ কারোর দিকে তাকাতে পারছে না, এক অদ্ভুত লজ্জা আর প্রাপ্তির আনন্দ তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।

​কাজি সাহেব গম্ভীর স্বরে আদনানকে বললেন,
“বাবা, তুমি কি এই বিয়েতে রাজি আছ? থাকলে তিনবার বলো কবুল।”

​আদনানের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম বাজছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর লড়াইয়ের পর আজ সে তার নাদান কে নিজের করে পাওয়ার শেষ ধাপে। সে রুদ্ধশ্বাসে অস্ফুট স্বরে বলল,
“কবুল,কবুল, কবুল। আলহামদুলিল্লাহ!”

​কাজি সাহেব এবার নৌশির দিকে ফিরলেন। নৌশির মনে হচ্ছিল সবটাই বুঝি স্বপ্ন, এখনই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে আর সে দেখবে সেই অপরিচিত লোকটার সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। নুসরাত এসে নৌশির কাঁধে হাত রাখল,যেন অভয় দিচ্ছে। নৌশি সেই স্পর্শে সাহস পেয়ে বুজে থাকা চোখে জল টলটল করা অবস্থায় বলে উঠল,
“কবুল,কবুল, কবুল।”

আলহামদুলিল্লাহর ধ্বনিতে মির্জা বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন আজ পবিত্র হয়ে উঠল। যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও বিসর্জনের সুর বাজছিল, সেখানে এখন কেবলই প্রাপ্তির আনন্দ। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদনান আর নৌশি যখন একে অপরের চোখের দিকে তাকাল, নৌশি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঠোঁট উল্টে নিঃশব্দে একরাশ আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিল সে।
​নুসরাত পরম মমতায় নৌশিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাগলি মেয়ে! তুই ভেবেছিলি কী করে যে আমি তোকে আর আদনানকে এত কষ্ট পেতে দেব? তোদের এই হাহাকার কি আমি সইতে পারতাম?”

​নৌশি বিস্ময়ভরা চোখে নুসরাতের দিকে তাকাল। অস্ফুট স্বরে শুধাল,
“তার মানে? সব কি তবে তোমারই পরিকল্পনা ছিল আপু?”

​নুসরাত রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলল,
“সে সব পরে জানবি। এখন শুধু এই মুহূর্তটাকে উপভোগ কর।” নৌশি আর প্রশ্ন করল না, শুধু নুসরাতের কাঁধে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

​একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল আরিয়ান আর তৃণা। উৎসবের এই আবহে আরিয়ান হঠাৎ তৃণার একদম কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল,
“শ্যামলিনী, এদের এই মিষ্টি বিয়ে দেখে তোমাকে আবারও নতুন করে বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে!”

​তৃণা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“মানে? হঠাৎ এই পাগলামি কেন?”

​আরিয়ান তৃণার চোখের গভীরতায় হারিয়ে গিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আমাদের বিয়েটাও তো সহজ ছিল না শ্যামলিনী। ওটা তো ছিল একটা র*ক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। আমি চাই সব নিয়ম মেনে আবারও তোমাকে নিজের করে পেতে।”

​আরিয়ানের এই রোমান্টিক কথায় তৃণা লাজুক এক হাসি দিল. ​নুসরাত কিছুটা দূর থেকে ওদের দুজনকে দেখছিল। আরিয়ান আর তৃণার এই অনাবিল সুখ দেখে ওর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে পাশে থাকা নির্জনের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভালোবাসার এই উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“স্রষ্টা যা করেন, নিশ্চয়ই আমাদের ভালোর জন্যই করেন, তাই না?”

​নির্জন নুসরাতকে নিজের একহাতের আশ্রয়ে কাছে টেনে নিল। গভীর স্বরে বলল,
“একদম ঠিক। মেঘ না জমলে কি আর এমন বৃষ্টির পর স্নিগ্ধ রোদের দেখা পাওয়া যেত?”
★★★
রাত তখন বেশ অনেকটা। মির্জা বাড়িতে এখনো আত্মীয়-স্বজনের ভিড় কমেনি, চারদিকে হাসাহাসি আর খোশগল্পের শব্দ। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে আদনানের ছটফটানি যেন কমছেই না। বিয়ে তো হলো, কিন্তু সেই কখন থেকে নৌশির সাথে দুটো কথা বলার সুযোগই পাচ্ছে না সে।
​হঠাৎ পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠতেই আদনান একটু আড়ালে সরে গেল। স্ক্রিনে বন্ধুদের নম্বর দেখে দ্রুত কলটা রিসিভ করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কীরে, লোকটাকে শেষ পর্যন্ত কী করলি?”

​ওপাশ থেকে বন্ধুটি খিলখিল করে হেসে উঠল,
“আরে দোস্ত, একদম মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিয়েছি! ব্যাটা তো ভয়ে কাঁপছিল। আমাদের পুলিশের অভিনয়টা কেমন হয়েছে বল?”

​আদনান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসল।
“দুর্দান্ত! তোদের এই নাটকের জন্যই আজ আমি নৌশিকে ফিরে পেলাম। তোদের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না রে।”

​“আরে রাখ তোর ধন্যবাদ! এখন আমাদের সাথে সময় নষ্ট না করে ভাবির কাছে যা। শুভ রাত্রি!”

​আদনান হাসিমুখে কলটা কেটে দিয়ে যেই না ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অমনি তার বুকটা ধক করে উঠল। সামনে হাতদুটো পকেটে ঢুকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরিয়ান। ভাইয়ের সেই জহুরির চোখ ফাঁকি দেওয়া যে অসম্ভব, সেটা আদনান ভালো করেই জানে। আরিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
​“তার মানে, বাড়িতে যে পুলিশগুলো এসেছিল, তারা তোরই সাজানো লোক ছিল? তাই তো?”

​আদনান মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আসলে ভাইয়া, আমি…”

​আরিয়ান এবার কিছুটা চড়া স্বরে ধমক দিয়ে উঠল,
“স্পষ্ট করে জবাব দে আদনান!”

​“হ্যাঁ ভাইয়া… ওরা আমার বন্ধুই ছিল,” আদনান মাথা নিচু করে স্বীকার করল।

​আরিয়ানের চোখে তখনো রাগের রেশ।
“একটা মানুষের ওপর এভাবে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে সবার সামনে চোর-দালাল সাজালি? তুই জানিস ওই ছেলেটার ক্যারিয়ার আর সম্মানের কতটা ক্ষতি হতে পারত?”

​আদনান এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল,
“এছাড়া আমার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না ভাইয়া। নৌশিকে পাওয়ার জন্য আমাকে এই ঝুঁকিটা নিতেই হতো। আর শুনো, ওই ছেলেটা যতটা ধোয়া তুলসী পাতা সাজছিল, ততটা সে নয়। আমি কালই খোঁজ নিয়েছি, ওর চরিত্র মোটেও ভালো না। ডিস্কো ক্লাবে রাত কাটানো আর আজেবাজে নেশায় আসক্ত থাকার অনেক প্রমাণ আছে ওর বিরুদ্ধে।”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এই কথাগুলো আগে বড় আব্বুকে বললেই তো বিয়েটা ভেঙে দেওয়া যেত। এই নাটক করার কী দরকার ছিল?”

​“আমি যদি সত্যি কথাগুলো বলতাম, তবে কেউ বিশ্বাস করত না ভাইয়া,” আদনান ধরা গলায় বলল। “সবাই ভাবত আমি নৌশিকে পাওয়ার জন্য এসব মিথ্যে গল্প সাজাচ্ছি। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, শুধু কলঙ্ক দিয়েই এই বিয়েটা আটকানো সম্ভব ছিল।”

​আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয় কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। ছোট ভাইয়ের এই মরিয়া অবস্থাটা সে মনে মনে অনুভব করতে পারল। আরিয়ানের কঠিন মুখটা এবার কিছুটা শিথিল হলো। সে আদনানের কাঁধে হাত রেখে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
​“যা, অনেক রাত হয়েছে। এবার গিয়ে নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু কর। আর শোন, নৌশিকে যেন কোনোদিন কোনো অভাব বা কষ্টের ছোঁয়া পেতে না হয়।”
★★★
নৌশি তখনো আদনানের রুমের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের মায়াবী জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে ছিল। বিকেলের সেই বিষাদ আর রাতের এই পূর্ণতা সবই যেন কোনো রূপকথার গল্প। ভাবতে অবাক লাগছে, যে চঞ্চল ছেলেটাকে সারাজীবন আদু ভাই বলে খেপিয়েছে, আজ সে-ই কিনা তার স্বামী! তার জীবনের পরম আশ্রয়।
​হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরটায় সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ফিসফিসিয়ে ভেসে এল,
“বউ!”

​ডাকটা শুনে নৌশির শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। এই নামে আগে কখনো কেউ ডাকেনি তাকে। সে ধীরপায়ে ঘুরে তাকাল। সামনে লাল শেরওয়ানি পরা আদনান দাঁড়িয়ে, তার চোখেমুখে আজ এক প্রশান্তি আর ঠোঁটের কোণে সেই অমায়িক হাসি।
​নৌশিও বেশ খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে পাল্টা ডাক দিল,
“জামাই!”

​আদনান এবার ড্রামাটিক কায়দায় নিজের বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। যেন এই ডাকটা সরাসরি তার হৃদপিণ্ডে গিয়ে আঘাত করেছে। সে আবারও গাঢ় স্বরে ডাকল,
“বউ!”

​নৌশি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“জামাই!”

​“ও বউ!” আদনান এবার এক পা এগিয়ে এল।

​নৌশি এবার লজ্জায় আর তাকাতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে বলে উঠল,
“ধ্যাত! কী শুরু করলি এসব?”

​আদনান অপলক দৃষ্টিতে তার এই অপরূপা সুন্দরী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। আজ নুসরাত আপু পাশে না দাঁড়ালে কি নৌশি এই ঘরে থাকত? গতকাল রাতে যখন বাবার পায়ে ধরেও কোনো ফল হয়নি, তখন আদনানের মাথায় প্রথম আত্মহত্যার চিন্তাটা এসেছিল। সে ভেবেছিল, নৌশিকে ছাড়া বেঁচে থাকার চেয়ে ম*রে যাওয়াই শ্রেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নেড়েছিল নুসরাত।
​নুসরাত সেদিন কেবল দরজা খোলেনি, আদনানের বন্ধ হয়ে যাওয়া ভাগ্যের দরজাটাও খুলে দিয়েছিল। নুসরাত আর আরিয়ান মিলেই এই পুলিশি অভিযানের ছক কষেছিল। আজ নৌশির এই লাজুক হাসির পেছনের কারিগর যে ওই দুজন, সেটা ভেবেই আদনানের বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল।

​আদনান এগিয়ে গিয়ে নৌশির হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জানলা দিয়ে আসা হালকা বাতাস তখন নৌশির চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল।
আদনান নেশালো মাখা স্বরে বলল,
“নাদানের বাচ্চাকে আজ কিন্তু আসমানি হুরদের মতো সুন্দর লাগছে!”

​নৌশি অবাক হয়ে এক জোড়া ভুরু বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট উল্টে বলল,
“বাপরে! সূর্য আজ কোন দিকে উঠল? জীবনে প্রথম তোর মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনলাম।”

​আদনান শব্দ করে হাসল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না, পরম আবেশে নৌশিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। নৌশিও সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আদনানের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকাল। দুজনের চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল এতদিনের না পাওয়া, সমাজের ভয় আর বিচ্ছেদের সুর যেন এই এক আলিঙ্গনে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
​বেশ কিছুক্ষণ এই নিস্তব্ধ আবেগমাখা মুহূর্ত কাটার পর নৌশি হঠাৎ আদনানকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। নাকে হাত দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“উফ! দূরে যা তো। তোর শরীর থেকে ছাগলের গন্ধ আসছে!”

​আদনান থমকে গেল। তারপর নিজের শেরওয়ানির হাতা শুঁকে একগাল হেসে দিল। নৌশির এই চিরচেনা দুষ্টুমিই তো তাকে বাঁচিয়ে রাখে। সে নিজের অবাধ্য চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ড্যাশিং ভঙ্গিতে নৌশির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার চোখে তখন নেশাতুর চাহনি। সে এবার নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে গান ধরল,
​“কোনো কিচ্ছু শুনবো না,
কোনো বারণ মানবো না।
আয় সজনী গান করি গলা মিলাইয়া,
গানের তালে নাইচা যাবি কোমর দুলাইয়া!”

​আদনানের গানের তালের সাথে পা মিলিয়ে এগিয়ে আসা দেখে নৌশি লাজুক হাসলো। রুমের ভেতর তখন তাজা ফুলের সুবাস আর ভালোবাসার খুনসুটি মিলেমিশে একাকার। আদনান গান গাইতে গাইতে নৌশির হাতটা ধরে নিজের দিকে এক ঝটকায় টেনে নিল।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply