রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৫২ (বর্ধিতাংশ)
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
বাইরে তখন প্রকৃতির তাণ্ডব শুরু হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টির দাপটে সন্ধ্যার আগেই যেন মাঝরাত নেমে এসেছে চারদিকে। আদনান হন্যে হয়ে ফুলের দোকান খুঁজলেও মনের মতো ফুল পায়নি, যেগুলো খোলা ছিল, সেগুলোতেও বাসি ফুলের স্তূপ। অগত্যা কোনো উপায় না দেখে রাস্তার ধারের সেই পরিচিত কৃষ্ণচূড়া গাছটা থেকেই একগুচ্ছ টকটকে লাল ফুল পেড়ে নিল সে। নৌশি কৃষ্ণচূড়া বড্ড ভালোবাসে, এই রক্তিম রঙটা ওর অভিমানী মুখে দারুণ মানাবে।
রেইনকোট থাকায় আদনান নিজে খুব একটা ভেজেনি। বাইকটা মির্জা বাড়ির গ্যারেজে রেখে কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে গেল। ড্রয়িংরুমে তখন বাড়ির বড়দের আসর বসেছে। মায়মুনা বেগম আদনানকে দেখেই বললেন,
“সারাদিন কোথায় ডই ডই করে ঘুরে বেড়াস? এক মুহূর্তের জন্য তোকে বাড়িতে পাওয়া যায় না।”
আদনান ক্লান্ত হাসিতে জবাব দিল,
“ভার্সিটিতেই ছিলাম আম্মু। তারপর বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দিতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল।”
সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রাহি বেগম তাকে থামিয়ে দিলেন। স্নেহমাখা স্বরে বললেন,
“আদনান, মিষ্টি খেয়ে যা বাবা। তোর তো মিষ্টি ভীষণ প্রিয়।”
আদনান কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল। একটা রসালো মিষ্টি হাতে নিয়ে কামড় দিতে দিতে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ কিসের মিষ্টি? কে আনল?”
রাহি বেগম হাসিমুখে তৃপ্তির সাথে জবাব দিলেন,
“নৌশিকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল। তারাই নিয়ে এসেছে।”
মুহূর্তেই আদনানের চিবানো থেমে গেল। গলার কাছে মিষ্টিটা যেন পাথরের মতো আটকে গেল তার। হাতটা নামিয়ে এনে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ গলায় সে প্রশ্ন করল,
“পাত্রপক্ষ মানে? কিসের পাত্রপক্ষ? কেন ওকে দেখতে আসবে?”
আদনানের গলার স্বরের আকস্মিক পরিবর্তন আর চোয়ালের কঠোরতা দেখে উপস্থিত সবাই থমকে গেল। ড্রয়িংরুমের উৎসবমুখর পরিবেশটা এক নিমিষেই থমথমে হয়ে উঠল। আদনানের দুচোখে তখন কৃষ্ণচূড়ার চেয়েও গাঢ় লাল আভা খেলা করছে।
এমদাদুল মির্জা সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ছিলেন। তিনি বেশ তৃপ্তির সুরে বললেন,
“ছেলেটা খুব ভালো আদনান। আমেরিকায় সেটেলড, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বিয়ের পর নৌশিকেও সাথে করে নিয়ে যাবে। আমাদের মেয়েটা রাজসুখেই থাকবে ওখানে।”
আদনানের ভেতরটা তখন যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, অথচ সে সেটা বাইরে প্রকাশ হতে দিল না। ভেতরের কাঁপুনিটা দাঁতে দাঁত চেপে সামলে নিয়ে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল,
“এত ছোট একটা মেয়েকে কেন এখনই বিয়ে দিচ্ছো বড়বাবা? ওর তো এখনো পড়াশোনার অনেকটা বাকি।”
রাহি বেগম আদনানের উদ্বেগ দেখে ধীর কণ্ঠে বললেন,
“আরে বাবা, নৌশি নিজেই বিয়ের কথা তুলেছে। আমাদের তো এখন কোনো প্ল্যানই ছিল না। তুই তো জানিসই মেয়েটা কত জেদি! ও যেটা ধরে সেটা করেই ছাড়ে।”
আদনান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। হাতে ধরা মিষ্টিটা প্লেটে রেখেই সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। রাহি বেগম পেছন থেকে ডাকলেন,
“কিরে, মিষ্টিটা খেলিনা? তোর তো খুব প্রিয়!”
আদনান বড় মায়ের ডাকে কোনো সাড়াও দিল না, পেছনে ফিরে তাকালোও না। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে ওপরে উঠে গেল। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে। বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সাত দিনের চ্যালেঞ্জের কথা ও এভাবে সত্যি করে তুলবে, সেটা আদনান কল্পনাও করতে পারেনি।
নৌশির রুমের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখল, নৌশি কানে এয়ারপড লাগিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রুম থেকে বের হচ্ছে।
নৌশির মুখে তখন জয়ের এক অদ্ভুত আভা। আদনানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সে একটু থামল। আদনান রক্তাভ চোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“এই নাদানের বাচ্চা! সত্যি সত্যি বিয়ে করে ফেলছিস?”
নৌশির কানে এয়ারপড থাকায় সে কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পেল না। সে ভ্রু নাচিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“কী বললি? জোরে বল, শুনতে পাচ্ছি না।”
আদনান আবারও চিৎকার করে বলল,
“তুই আমার ওপর জেদ করে সত্যিই এই বিয়েটা করছিস? ভালো করছিস না কিন্তু নাদান!”
নৌশি এবারও যেন কানে খাটো হওয়ার ভান করে বলল, “কী? আরও জোরে বল।”
আদনানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে গেল। সে এক ঝটকায় নৌশির কান থেকে এয়ারপড দুটো ছিনিয়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারল। তারপর বাঘের মতো গর্জে উঠে বলল,
“লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার শুনে রাখ তুই এই বিয়ে করবি না, ব্যস!”
নৌশি ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। অবজ্ঞাভরে বলল,
“আমি বিয়ে করলে তোর সমস্যা কী শুনি? আমি কেন তোর কথা শুনব? বিয়েটা অবশ্যই হবে এবং এই সপ্তাহেই হবে। পারলে ঠেকাস!”
আদনান এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নৌশির দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। আগুনের মতো দৃষ্টি দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর খাদে নামিয়ে আনল,
“আমি বলেছি করবি না মানে করবি না। যদি এই বিয়ে হয়, তবে আমি চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেব। দরকার হলে তোকে খু*ন করে ফেলব, তবুও অন্য কারও হতে দেব না!”
নৌশি সজোরে ধাক্কা দিয়ে আদনানকে সরিয়ে দিল। জেদি গলায় বলল,
“খবরদার! আমায় আর স্পর্শ করবি না, দূরে থাক। আর কিসের জন্য এত অভিনয় করছিস? তুই তো আমাকে সব সময় ছোট বোনের নজরেই দেখেছিস, তাই না? তাহলে আজ বড় ভাইয়ের দায়িত্বটা পালন কর, বাগড়া দিস না।”
বলেই নৌশি গটগট করে সিঁড়ির দিকে চলে যেতে লাগল। আদনান রাগে অন্ধ হয়ে পাশের দেয়ালে সজোরে এক ঘুষি বসাল। তার হাতের কড়া থেকে র*ক্ত চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই ব্যথার চেয়েও বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা যেন তীব্রতর।
নৌশি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আড়ালে নিজের চোখের জলটুকু মুছে নিল। একবার আড়চোখে ওপরের দিকে তাকালো, আদনান তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নৌশি মনে মনে বলল,
“এত কিছুর পরেও স্বীকার করবি না যে তুই আমায় ভালোবাসিস? তুই কি সত্যিই এত পাষাণ আদনান?”
নিচে গিয়ে নৌশি নিজেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করে সবার সাথে বসল। এমদাদুল মির্জা ফোনে কথা বলছিলেন, নৌশিকে দেখে ফোনটা রেখে বললেন,
“মারে, ওনারা মাত্র কল দিলেন। ছেলে নাকি পরের সপ্তাহেই আমেরিকা চলে যাবে, তাই তারা চাচ্ছে এই সপ্তাহেই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে। তোর কি কোনো সমস্যা আছে?”
নৌশি কিছুক্ষণ নিথর হয়ে বসে রইল। তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলেও ধীর অথচ স্থির কণ্ঠে জবাব দিল,
“না আব্বু, আমার কোনো সমস্যা নেই।”
মিতু আর তৃণা পাশ থেকে অবাক হয়ে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা নিজের মনের কথা কাউকে না বললেও, তার এই অস্বাভাবিক শান্ত থাকাটা তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধছে।
★★★
রাত তখন এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। মির্জা বাড়ির সবাই নিজ নিজ ঘরে ঘুমে আচ্ছন্ন। ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতায় তৃণা একা সোফায় একটা কুশন আঁকড়ে ধরে হেলান দিয়ে বসে আছে। আরিয়ান আজও ফিরতে দেরি করছে। বাবার অফিস সামলে নিজের নতুন ব্যবসার দেখভাল করতে গিয়ে লোকটার দম ফেলার সময় থাকে না।
তৃণার চোখের পাতা বারবার বুজে আসছে ক্লান্তিতে। আরিয়ান বারবার বারণ করে দিয়েছে ওর জন্য রাত না জাগতে, কিন্তু মন কি আর অত বারণ শোনে! ঠিক তখনই কলিং বেলের চিরচেনা শব্দটা কানে এল। তৃণার ঠোঁটে মুহূর্তে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল সামনে ক্লান্ত আরিয়ান দাঁড়িয়ে।
হাতে ওর কালো কোটটা ঝুলছে, সাদা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। সারাদিনের ধকলের ছাপ ওর উসকোখুসকো চুলে আর চোখের নিচের কালিতে স্পষ্ট। কিন্তু দরজার ওপাশে তৃণাকে দেখামাত্রই আরিয়ানের সব ক্লান্তি যেন উবে গেল, ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চওড়া হাসি। এক হাতে তৃণাকে নিজের বুকের সাথে নিবিড় করে মিশিয়ে নিয়ে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু আঁকল আরিয়ান। তারপর আদুরে ধমকের সুরে বলল,
“তোমাকে না বলেছিলাম আমার জন্য জেগে না থাকতে? তবুও জেগে আছো? দিন দিন বড় অবাধ্য হয়ে যাচ্ছ তুমি। যদি এভাবে রাত জেগে অসুস্থ হয়ে পড়ো, তখন কী হবে?”
তৃণা আরিয়ানের বুকের ঘ্রাণ নিতে নিতে আলতো হেসে জবাব দিল,
“অসুস্থ হলে আপনি আছেন তো আমার রাগী সাহেব! আপনিই সুস্থ করে দেবেন।”
আরিয়ানকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তৃণা ওকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,
“যান, ঝটপট ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
আরিয়ান এবার আর তর্ক করল না। বাধ্য ছেলের মতো মুচকি হেসে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
আরিয়ান হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসতেই তৃণা সযত্নে খাবারের প্লেটটা এগিয়ে দিল। আরিয়ান আড়চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“খেয়েছো?”
তৃণা খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে উত্তর দিল,
“হুম, সবার সাথেই খেয়ে নিয়েছিলাম।”
আরিয়ান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। মাথা নেড়ে বলল,
“ইদানীং মিথ্যা বলাও শিখে গেছো? মা কিছুক্ষণ আগে কল দিয়ে তোমার নামে এক গাদা নালিশ করেছে। সাথে আমাকেও আচ্ছা করে বকা দিল। বলল, আমার জন্য তুমি নাকি না খেয়ে বসে থাকো। এভাবে প্রতিদিন থাকলে শরীরটা কি আর টিকবে?”
তৃণা ধরা পড়ে গিয়ে একটু নাক কুঁচকালো। অভিমানী সুরে বলল,
“এখন আমাকে খেতে বলবেন না প্লিজ, একদম ইচ্ছে করছে না।”
আরিয়ান এবার আদুরে গলায় আবদার করল,
“আচ্ছা, আমাকে অন্তত খাইয়ে দাও।”
“কেন? আপনি কি নিজের হাতে খেতে পারেন না?”
“উঁহু, পারি না।”
“আপনি সত্যিই বড্ড জেদি!”
“সেটা আমি জানি।”
তৃণা আর কথা বাড়ালো না। এই লোকের যুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে জেদ বজায় রাখা অসম্ভব। সে ভাত মেখে প্রথম লোকমাটা আরিয়ানের মুখে তুলে দিতেই আরিয়ান দুষ্টুমি করে তৃণার আঙুলে মৃদু কামড় বসাল। তৃণা ঝট করে হাত সরিয়ে এনে ধমকের সুরে বলল,
“বাচ্চামো কমান তো!”
আরিয়ান তৃপ্তির হাসি হেসে বলল,
“এটাকে বুঝি বাচ্চামো বলে? পাগলি, একেই তো ভালোবাসা বলে।”
তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল,
“হুম, মেনেছি আপনার ভালোবাসা।”
খাওয়ার মাঝেই আরিয়ানের ফোনে অফিসের একের পর এক ইমেইল আসছিল। খাওয়া শেষ করে সে ল্যাপটপ নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসল। তৃণা এক দৃষ্টিতে আরিয়ানের ব্যস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সারাদিনের খাটুনির পর লোকটার বিশ্রাম নেই দেখে তার খুব মায়া হলো। সে নরম স্বরে বলল,
“সারাদিন তো কাজেই ডুবে ছিলেন। বাসায় এসে অন্তত একটু রেস্ট নিন!”
আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তৃণার দিকে তাকাল। ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলল,
“আচ্ছা, আর কাজ করব না। তুমি বোধহয় বিরক্ত হচ্ছো আমার ওপর?”
“না, বিরক্ত হচ্ছি না। আপনি বরং জলদি শেষ করে নিন।”
আরিয়ান শেষ জরুরি ইমেইলটা পাঠিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল। সামনে তাকাতেই দেখল তৃণা সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে ক্লান্তিতে ওর মায়াবী মুখটা যেন আরও ম্লান দেখাচ্ছে। আরিয়ান নিঃশব্দে তৃণার সামনে ঝুঁকে পড়ল। পরম মমতায় ওর কপালের অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিতেই তৃণা চোখ মেলল।
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। চোখের পলকে তৃণাকে এক টানে পাজাকোলে তুলে নিল। তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, “কী করছেন! কেউ দেখে ফেলবে তো!”
আরিয়ান কোনো কথা না বলে তৃণার চোখের গভীরে তাকিয়ে থাকল। সেই দৃষ্টিতে আজ কোনো ক্লান্তি নেই, আছে কেবল অতল এক গভীর প্রেম।
তৃণার রেশমি চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, আর সেই কালো শাড়ির আঁচলটা মেঝের সাথে লুটোপুটি খাচ্ছে। আরিয়ান ওকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। তৃণা আরিয়ানের গলার সাথে ঝুলে থেকে বলল,
“আপনি দিন দিন বড্ড বেহায়া হয়ে যাচ্ছেন কিন্তু, রাগী সাহেব!”
আরিয়ান তৃণার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
“স্ত্রীকে ভালোবাসতে গেলে একটু বেহায়া হতে হয় । হিসেব কষে ব্যবসায়ী হওয়া যায়, কিন্তু আদর্শ স্বামী হওয়া যায় না। বুঝলেন বউজান?”
তৃণা আরিয়ানের এমন অকাট্য যুক্তির সামনে হার মানল। সে লাজুক হেসে আরিয়ানের চওড়া বুকে মুখ ঘষল। আরিয়ান ওকে নিয়ে সোজা রুমে ঢুকল এবং আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল। এরপর আলমারি থেকে একটা ঝকঝকে বক্স বের করে আনল। সেটা তৃণার হাতে দিয়ে আরিয়ান ওর পাশেই বসল।
তৃণা বক্সটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখল, ওটা লেটেস্ট মডেলের একটা স্মার্টফোনের বক্স। উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা Samsung Ultra Pro Max. তৃণা বিস্ময়ভরা চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“নতুন ফোন কিনলেন নাকি?”
আরিয়ান ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমার জন্য না, এটা তোমার জন্য।”
“সে কী! এত দামি ফোন আমার জন্য কেন কিনতে গেলেন?” তৃণার কণ্ঠে যেমন বিস্ময়, তেমনি কিছুটা সংকোচ।
আরিয়ান এবার একটু আধিপত্যের সুরে বলল,
“কেন? আমার বউয়ের জন্য আমি কি দামি জিনিস কিনতে পারি না?”
“না, মানে এত দামি কিছুর তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। সাধারণ একটা হলেই তো হতো,” তৃণা বিড়বিড় করে বলল।
আরিয়ান এবার তৃণার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“আমার বউকে আমি কী দেব আর কী দেব না, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার। এতে তোমার মানা করার কোনো অধিকার নেই, বুঝেছ?”
আরিয়ানের এই ডিক্টেটর মার্কা ভালোবাসা দেখে তৃণা আর না হেসে পারল না। সে ফোনটা হাতে নিয়ে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে তখনো ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ হচ্ছে, কিন্তু এই চার দেয়ালের মাঝে এখন কেবল একরাশ প্রশান্তি আর স্নিগ্ধ প্রেম।
★★★
জ্যোৎস্না প্লাবিত এক মায়াবী রাত। ইমতিয়াজ বাড়ির বেলকনিতে দোলনায় পাশাপাশি বসে আছে নির্জন ইমতিয়াজ আর নুসরাত। চারপাশ একদম নিঝুম, শুধু মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। নির্জন পরম শান্তিতে নুসরাতের কোলে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, আর নুসরাত আলতো করে তার চুলে আঙুল চালিয়ে দিচ্ছে।
নুসরাতের মুখের সেই এসিডের ক্ষতটা ইদানীং ওষুধের গুণে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। দাগটা এখন আর আগের মতো স্পষ্ট বোঝা যায় না, হয়তো আর কিছুদিন পর পুরোপুরি মিলিয়ে গিয়ে আগের সেই সতেজতা ফিরে আসবে। নুসরাত অপলক দৃষ্টিতে নির্জনের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, এই পুরুষটা কতটা অদ্ভুত আর স্নিগ্ধ! নুসরাতের মতো দগ্ধ চেহারার একটা মেয়েকে সে অবলীলায় আপন করে নিল। পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মেয়ে বোধহয় সেই!
নির্জন হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ডাকল,
“চশমাওয়ালি ম্যাডাম!”
নুসরাত মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “হুঁ।”
“একটা প্রশ্ন করি?”
নুসরাত হেসেই ফেলল।
“করো না। এটার জন্য আবার অনুমতি লাগে নাকি?”
নির্জন চোখ বন্ধ রেখেই একটা গূঢ় প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“তোমার জীবনে আমার আগে কি অন্য কাউকে ভালোবেসেছিলে?”
নির্জনের এই প্রশ্নে নুসরাতের হাতজোড়া থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে উঠল তার। কী উত্তর দেবে সে? সে কি সত্যিই বলতে পারবে তার এই ‘বাদামওয়ালা’র আগেও অন্য একজনকে সে মনে-প্রাণে ভালোবেসেছিল? শুধু কি ভালোবাসা! তাকে পাবে না জেনে একদিন তো সে আত্মহ*ত্যার পথও বেছে নিয়েছিল।
নুসরাত দীর্ঘশ্বাস চেপে চোখ বুজে শান্ত গলায় বলল,
“না, আমি কাউকে ভালোবাসিনি।”
নির্জন কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না, শুধু ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলালো। নুসরাতের হাতের তালুতে একটা উষ্ণ চুমু খেয়ে খুব ধীর কণ্ঠে বলল,
“আমি তোমার চোখের ভাষা পড়তে জানি।”
নুসরাত আর কোনো উত্তর দিল না। সে আকাশের সেই বিশাল নীলিমার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
“পৃথিবীর কেউ না জানুক, আমার স্বামীর আগে আমি অন্য কাউকে ভালোবেসেছিলাম।”
চলবে
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৪
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫০ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৪ (প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫১