রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্রের
পর্ব_৪৭
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ধরণীর বুকে কেবলই সন্ধ্যা নেমেছে। তবে আজ সন্ধ্যার আকাশটা বড্ড বৈরী। মেঘে মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশটা যেন বিষাদমাখা এক ভারী চাদর। চারদিকে ঝুপ করে এক ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে,মনে হচ্ছে সন্ধ্যার ললাটে সময়ের আগেই নিশুতি রাতের কালি লেপে দেওয়া হয়েছে। বাতাসের ঝাপটা আর মেঘের গর্জনে পুরো প্রকৃতিতে একটা থমথমে হাহাকার।
এই গা ছমছমে অন্ধকারের মাঝে মির্জা বাড়ির অন্দরে বইছে উদ্বেগের ঝড়। তৃণা বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার চোখজোড়া বন্ধ, নিশ্বাস বইছে খুব ধীরলয়ে। আরিয়ান তৃণার মাথার কাছে বসে আছে পাথর হয়ে, বারবার কম্পিত হাতে তৃণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শিকদার বাড়ির প্রত্যেকের মুখে আজ প্রগাঢ় দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।
মায়মুনা বেগম তৃণার বরফের মতো শীতল হাতের তালুতে অবিরাম মালিশ করে উষ্ণতা ফেরানোর চেষ্টা করছেন। নুসরাত আর নৌশি দুজন মিলে তৃণার পায়ের পাতায় তেল ঘষছে। অচেতন তৃণা ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছে, যেন অবচেতন মনেও কোনো এক প্রচণ্ড শীত বা ভীতি তাকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে ধরে আছে। ডক্টরকে ফোন করা হয়েছে অনেক আগে, কিন্তু বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টির দাপটে তার পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
আরিয়ান এবার ধৈর্য হারিয়ে আদনানের ওপর চিৎকার করে উঠল,
“ডক্টর কাকু এখনো আসছেন না কেন? এখানে পৌঁছাতে কি যুগ পার হয়ে যাবে? যদি না পারেন তবে বলো, আমি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাই!”
নুসরাত শান্ত স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ভেজার কারণে শরীর হিমাঙ্কিত হয়ে গেছে। ডক্টর আসুক, ঠিক হয়ে যাবে।”
আরিয়ান তৃণার ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। সেই চঞ্চল শ্যামলিনী মেয়েটা আজ কতটা নিস্তেজ! আরিয়ান বারবার তার কানের কাছে মুখ নিয়ে করুণ সুরে ডাকছে,
“তৃণা! এই যে তৃণা, শুনতে পাচ্ছো?”
তৃণার কোনো সাড়াশব্দ নেই। মায়মুনা বেগম অস্থির হয়ে উঠলেন, নিজের কোমরের ব্যথা ভুলে গিয়ে বউমার জন্য লড়ে যাচ্ছেন। মিতু অসুস্থ শরীর নিয়েই এসে তৃণার মাথায় মমতাভরা হাত রাখল। রাহি বেগম এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইলেন, মায়মুনা বেগমকে বললেন,
“মেঝো, তুমি এবার ওঠো। আমি তেল মালিশ করে দিচ্ছি। তোমার কোমরের ব্যথাটা তো আবার বেড়ে যাবে।”
মায়মুনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। ফারহানা বেগম ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে গরম তেল নিয়ে রুমে ঢুকলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও তীব্র হচ্ছে।
মুহূর্ত কয়েকের আগের কথা। বাইরে তখন বছরের প্রথম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাইরের সেই তুমুল গর্জনে আরিয়ানের কাঁচা ঘুমটা হঠাৎই ছুটে গেল। সে পাশ ফিরে দেখল বিছানা খালি, তৃণা রুমে নেই।
আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে ড্রয়িংরুমে গেল, বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞেস করল কিন্তু কারো কাছেই কোনো খবর নেই। এক অজানা আশঙ্কায় আরিয়ানের বুকটা কেঁপে উঠল। সে পাগলের মতো বাড়ির আনাচে-কানাচে তৃণা বলে ডাকতে লাগল। সিঁড়ি ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ছাদের দরজায় গিয়ে পৌঁছাল সে। দেখল বাইরের দিক থেকে ছিটকিনি আটকানো। আরিয়ান ভাবল, বাইরে থেকে যেহেতু বন্ধ, তৃণা নিশ্চয়ই ভেতরে থাকতে পারে না।
সে ফিরে আসতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে সে থমকে দাঁড়াল। অবচেতন মনের ইশারায় সে পুনরায় ফিরে গিয়ে ছাদের দরজাটা সজোরে খুলল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বৃষ্টির তাণ্ডব। চোখ যতদূর যায়, ঝাপসা আলোয় কাউকে দেখা গেল না। আরিয়ান যখন ফিরে যাবে, তখনই তার দৃষ্টি থমকে গেল ঠিক পাশে, দেয়ালের সাথে ঘেঁষে নিথর হয়ে পড়ে আছে একখণ্ড মানবদেহ।
আরিয়ান আর্তনাদ করে ছুটে গিয়ে তৃণাকে বুকের মাঝে আগলে ধরল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আরিয়ানের মনে হলো তার পৃথিবীটা বুঝি স্তব্ধ হয়ে গেছে। তৃণার শরীরটা বরফের মতো শীতল, কোনো স্পন্দন নেই। আরিয়ানের মনে হলো তার বুকের ভেতরটা হাজারো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে তীব্র যন্ত্রণায়। সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল,
“শ্যামলিনী! ও শ্যামলিনী! কথা বলো!”
এক বুক আতঙ্ক নিয়ে আরিয়ান শেষ আশা জাগিয়ে তৃণার নাকের কাছে হাত রাখল। মৃদু তপ্ত নিশ্বাসের স্পর্শ আঙুলে লাগতেই আরিয়ানের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। না, তার শ্যামলিনী তাকে ছেড়ে যায়নি, সে নিশ্বাস নিচ্ছে। আরিয়ান এক মুহূর্তও দেরি করল না। বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে একাকার অবস্থায় সে তৃণাকে পাঁজাকোলা করে বুকে জড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। তার দুশ্চিন্তা আর চোখের জল বৃষ্টির সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল তখন।
তখনই রুমে শোরগোল তুলে ডক্টর প্রবেশ করলেন। তাকে দেখেই আরিয়ান অস্থিরতায় ফেটে পড়ল, যেন এক মুহূর্ত দেরি হওয়া মানেই বড় কোনো বিপর্যয়। সে আর্তনাদ করে বলল,
“কাকু, দেখুন প্লিজ মেয়েটার কী হলো! ওকে কি হাসপাতালে নিতে হবে? আপনি বললে আমি এখনই গাড়ি বের করছি।”
ডক্টর সাহেব আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,
“স্থির হও আরিয়ান। আমাকে আগে পরীক্ষা করতে দাও।”
ডক্টর প্রথমে তৃণার হাত ধরে পালস চেক করলেন। এরপর টর্চ দিয়ে তার চোখজোড়া খুব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন। রুমের সবাই তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ডক্টরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পরীক্ষা শেষ করে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তৃণার পালস স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম চলছে, তবে ভয়ের কিছু নেই, ঠিক হয়ে যাবে। আর চোখ দেখে যতটা বুঝলাম, মেয়েটা হয়তো কোনো কারণে প্রচণ্ড প্যানিক অ্যাটাক বা মানসিক আতঙ্কের শিকার হয়েছিল। শরীর ভীষণ ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে আছে। ওকে এখনই কয়েকটা গরম কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও।”
ডক্টর দ্রুত নিজের ব্যাগ থেকে স্যালাইন বের করে তৃণার হাতে পুশ করে দিলেন। ঘর থেকে বেরোনোর আগে আশ্বস্ত করে বললেন,
“চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে এলেই ওর জ্ঞান ফিরবে। বৃষ্টির পানিতে অনেকক্ষণ ভিজে থাকার কারণেই শরীর এমন জমে গেছে।”
আদনান ডক্টর সাহেবকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য তার সাথে নিচে নেমে গেল।
বাইরে তখন বৃষ্টি তান্ডব কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, কিন্তু চারদিকের থমথমে অন্ধকার কাটেনি। এখন রাত প্রায় আটটা। ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ সবার নজর কাড়ল ছোট তূর্ণা। সে ধীরপায়ে তৃণার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো। তার ছোট ছোট চোখগুলোতে একরাশ বিষাদ আর মমতা। সে আলতো করে তৃণার হিমশীতল হাতটা নিজের ছোট্ট হাতের মুঠোয় নিল।
সাত বছরের ছোট্ট তূর্ণার নিষ্পাপ মুখে আজ এক গভীর অপরাধবোধের ছাপ। মেয়েটা যেন কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু বুকফাটা এক ভয়ে তার গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। নুসরাত তূর্ণার এই কুঁকড়ে থাকা অবস্থা দেখে এগিয়ে এল। তাকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“তূর্ণা মামণি, ঘুম শেষ হয়েছে তোমার?”
তূর্ণা নুসরাতের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে নুসরাতের গলা জড়িয়ে ধরে হঠাৎ গুমরে কেঁদে উঠল। নুসরাত এই কান্নার সঠিক কারণ ধরতে পারল না,সে ভাবল হয়তো অসময়ে ঘুম থেকে উঠেছে বলেই মেয়েটা এমন করছে। তাই সান্ত্বনা দিতে দিতে সে তূর্ণাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত গভীর হতে শুরু করেছে। ডক্টরের আশ্বাসে এবং তৃণার শরীরে উষ্ণতা ফিরতে দেখে বাড়ির সবাই একে একে ঘর থেকে বিদায় নিল। কিন্তু আরিয়ান নড়ল না। এই দীর্ঘ সময় সে এক সেকেন্ডের জন্যও তৃণার শিয়র ছেড়ে ওঠেনি। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ তৃণার খুব ক্ষীণ একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কথাগুলো অস্পষ্ট, তবে তৃষ্ণার্ত। আরিয়ান তড়িৎ তৃণার মুখের কাছে নিজের কান নিয়ে গেল। তৃণা খুব কষ্টে অস্ফুটে বলল,
“পানি… একটু পানি দাও।”
আরিয়ান চটজলদি টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিল। এক হাত দিয়ে তৃণার মাথার নিচে আলতো করে ধরে তাকে একটু উঁচু করে সযতনে পানি খাইয়ে দিল। তৃণার ঠোঁটে পানির স্পর্শ লাগতেই সে একটু ধাতস্থ হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিয়ান নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে তৃণাকে খুব শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। তৃণা আজ কোনো বাধা দিল না, বরং এক পরম সুখের আশ্রয়ে চোখ বুজে আরিয়ানের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে লাগল।
তৃণার শরীর এখনো সামান্য কাঁপছে, আর এক হাতে স্যালাইন চলছে ধীরলয়ে। আরিয়ান তৃণার চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“কেন গিয়েছিলে ছাদে শ্যামলিনী? আমার কথা কি একবারও মনে পড়েনি? তোমার কিছু হয়ে গেলে এই আরিয়ান মির্জা কিসের টানে বেঁচে থাকত বলো তো?”
তৃণা কোনো উত্তর দিল না।
এভাবেই আরও আধা ঘণ্টা কেটে গেল। স্যালাইনের শেষ ফোঁটাটুকু শরীরে প্রবেশ করার পর আরিয়ান নিজেই নিডল খুলে দিল। বাড়ির সবাই একে একে এসে তৃণার খোঁজ নিয়ে গেছে, নুসরাত পরম মমতায় নিজ হাতে তৃণাকে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে। তৃণা এখন আগের চেয়ে বেশ খানিকটা স্বাভাবিক। সে বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে।
আরিয়ান টেবিল থেকে ওষুধের প্যাকেট ছিঁড়ে দুটো বড়ি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে তৃণার সামনে এসে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল,
“এই নাও, খেয়ে নাও।”
“ওষুধ খেতে একদম ভালো লাগে না।”
“আমারও তোমার এই ফ্যাকাশে অসুস্থ মুখটা দেখতে একদম ভালো লাগে না। তাই কোনো তালবাহানা
ছাড়াই চটজলদি লক্ষ্মী বউয়ের মতো খেয়ে নাও।”
তৃণা বুঝতে পারল আজ আরিয়ানের সাথে জেদ করে লাভ নেই। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওষুধটা গিলে নিল সে। আরিয়ান এবার গ্লাসটা সরিয়ে রেখে তৃণার খুব মুখোমুখি হয়ে বসল। তৃণার একটা হাত নিজের তপ্ত মুঠোর ভেতর নিয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“বৃষ্টিকে এত ভয় পাও কেন তৃণা?”
আরিয়ানের এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে তৃণা কিছুটা হকচকিয়ে গেল। তার চোখের মণি কাঁপছে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদিকে তাকালো। কিন্তু আরিয়ান ছাড়ল না, সে আবারও একই প্রশ্ন করল,
“সেই কয়েকমাস আগেও যখন বৃষ্টি হয়েছিল, তুমি খুব ভয় পেয়েছিলে। আমি দেখেছিলাম। তখনই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম কিন্তু সুযোগ হয়নি। আজ বলো তো শ্যামলিনী, কী হয়েছে তোমার? কেন বৃষ্টির শব্দে তুমি এমন নিথর হয়ে যাও?”
তৃণা এবার বেশ ধীর এবং ধরা গলায় বলল,
“প্লিজ এক প্রশ্ন বারবার করবেন না। পুরনো কথা বাদ দিন না।”
আরিয়ানের চোখে এক রাশ অভিমান ভর করল। সে হাতটা একটু আলগা করে বলল,
“বাদ দেব? তার মানে তুমি আমাকে বলবে না? এত দিন পাশে থেকেও কি আমি তোমার একটুখানি বিশ্বাসও জোগাড় করতে পারিনি তৃণা?”
তৃণা আরিয়ানের আহত চোখের দিকে তাকালো। আরিয়ান আর কথা বাড়ালো না। সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে গম্ভীর মুখে বলল,
“ওকে, অল রাইট। ঘুমাও তুমি, আর কোনো প্রশ্ন করব না।”
তৃণা হঠাৎ বলতে শুরু করল। আরিয়ানের যাওয়ার পা দুটো থমকে গেল। স্মৃতির পাতায় সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তগুলো ভিড় করে এল তার চোখের সামনে।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। তৃণার বয়স তখন মাত্র ষোলো। রৌশনারা বেগমের কড়া শাসনে তার বাড়ি থেকে বের হওয়া তো দূরের কথা, সারাদিন ঘরের কাজ করতে করতেই দম ফেলার সময় পেত না সে। তবে যখনই একটু অবসর জুটত, সে চুপিচুপি ছাদে চলে যেত। সেখানে তার নিজের হাতে লাগানো গাছ আর ফুলগুলোর সাথে সে কথা বলত।
সেদিন ছিল তপ্ত এক দুপুর। ছাদে উঠতেই দেখল আকাশে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি তৃণার ভীষণ প্রিয় ছিল,মেঘ দেখলেই তার কিশোরী মনে আনন্দের জোয়ার বইত। ছাদে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রিমিঝিম ধারায় বৃষ্টি নামল। তৃণা দুহাত ছড়িয়ে খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বিহঙ্গের মতো দাঁড়িয়ে ভিজতে শুরু করল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলছিল।
কিন্তু সেই সুখ ছিল ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ পেছন থেকে কারো শক্ত হাতের কর্কশ স্পর্শ অনুভব করল সে। নিজের শরীরে পরপুরুষের হাতের অনধিকার প্রবেশ টের পেতেই তৃণা ছিটকে দূরে সরে গেল। ধক করে ওঠা কলিজা নিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে রৌশনারা বেগমের ভাই তার সৎ মামা। (মানে তৌহিদের বাবা)
তৃণা নিজের ভেজা শরীর দুহাতে আড়াল করার চেষ্টা করে কাঁপা গলায় বলল,
“মা… মামা? আপনি এখানে?”
লোকটার চোখেমুখে তখন এক পৈশাচিক কামনার ছায়া। সে এক কুটিল হাসি দিয়ে তৃণার দিকে এগোতে লাগল। বিকৃত গলায় বলল,
“আরে মা মণি, ভয় পাচ্ছিস কেন? আয়, মামার কাছে আয়। আজ তো কেউ নেই বাড়িতে।”
বৃষ্টির ঝাপটার সাথে পাল্লা দিয়ে তৃণার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে বলল,
“প্লিজ, আমাকে যেতে দিন! আমি নিচে যাব।”
কিন্তু লোকটা থামল না। লালসার নষ্ট দৃষ্টি দিয়ে সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার মেয়ের বয়সী এই ষোড়শী কন্যার বৃষ্টিতে ভেজা শরীরটা গিলতে লাগল।
লোকটা লোলুপ দৃষ্টিতে তৃণার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
“তুই শ্যামলা হলেও তোর চেহারায় আলাদা এক জোস আছে রে!”
তৃণা সেখান থেকে প্রাণপণ শক্তিতে দৌড়ে পালাতে চাইল, কিন্তু লোকটা চিলোর মতো ছোঁ মেরে তৃণার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর তার গালে নোংরা হাত বুলিয়ে কুৎসিত সুরে বলল,
“তুই আজকের জন্য আমার হয়ে যা। তাহলে কথা দিচ্ছি, তোকে আর তোর সৎ মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।”
তৃণা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। তার দুচোখ দিয়ে ভয়ের নোনা জল আর বৃষ্টির ধারা একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছিল। সে চিৎকার করে উঠল,
“ছাড়ুন বলছি মামা! তা না হলে আমি চিৎকার করব!”
লোকটি হো হো করে অট্টহাসি দিয়ে উঠল,
“চিৎকার করবি? কর! এই বাড়িতে কে আছে তোকে বাঁচানোর মতো? তোর বাপ তো কাজের জন্য শহরের বাইরে হাসপাতালে। আর এই বৃষ্টির মাতম ছাপিয়ে তোর আওয়াজ কি আর বাইরে যাবে রে পাগলী?”
লোকটি যখন তৃণার শরীরকে আরও নিবিড়ভাবে লাঞ্ছিত করতে এগিয়ে এল, তখন তৃণা কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে লোকটিকে সজোরে ধাক্কা দিল। লোকটি সামলাতে না পেরে পাশের টবের সাথে পা আটকে গিয়ে ছিটকে পড়ল সরাসরি ইটের ওপর। মুহূর্তেই তার মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগল।
তৃণা এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে উন্মাদের মতো দৌড় লাগাল ছাদ থেকে নামার জন্য। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতেই তার পথ আগলে দাঁড়ালেন রৌশনারা বেগম। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
তৃণা সামনে একজন নারীকে দেখে, তাকে নিজের শেষ আশ্রয় আর মা ভেবে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“মা! আমাকে বাঁচাও!”
কিন্তু রৌশনারা বেগম বরাবরের মতোই কর্কশভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তার নজর ততক্ষণে রক্তাক্ত ভাইয়ের ওপর পড়েছে। তিনি চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে ভাইকে আগলে ধরলেন।
“এই অবস্থা কেন ভাই? কী হয়েছে তোমার?”
লোকটি নিজের শয়তানি বুদ্ধি খাটিয়ে কপট যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল,
“এই ফাজিল মেয়েটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল! শুধু বলেছিলাম এভাবে বৃষ্টিতে ভিজো না মা, ঠান্ডা লেগে যাবে। ব্যস, এই কথা বলতেই ও আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করল!”
রৌশনারা বেগম আগুনের গোলার মতো রাগী চোখে তৃণার দিকে তাকালেন।
তৃণার বিস্ময়ের সীমা রইল না। মানুষের চেহারায় যে এত বড় শয়তান লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। সে আর্তনাদ করে চিৎকার করে উঠল,
“না মা! এই লোক মিথ্যা বলছে। উনি আমার সাথে…”
বাকি কথাটা আর শেষ করতে পারল না তৃণা। তার আগেই রৌশনারা বেগম বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তৃণার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরলেন। তৃণা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। এক হাতে চুল টেনে ধরে অন্য হাতে তিনি অনবরত তৃণার গালে, পিঠে আর শরীরে চড়-থাপ্পড় মারতে লাগলেন। অসহায় কিশোরী নিজেকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বলল,
“মা, বিশ্বাস করো আমি কিছু করিনি! আর মেরো না মা, খুব লাগছে!”
কিন্তু রৌশনারা বেগমের কানে তখন কোনো আর্তনাদই পৌঁছাচ্ছিল না। তৃণার ছোট্ট শরীরটা এত আঘাত সহ্য করতে না পেরে একসময় জলে মাখা ছাদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু তাতেও রৌশনারা বেগমের পৈশাচিক আনন্দ মিটল না। তিনি এবার নিজের পা দিয়ে তৃণার কোমরে আর পেটে সজোরে লাথি দিতে শুরু করলেন।
এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে ভুলল না সেই লম্পট মামা। সে তৃণাকে বাঁচানোর ভান করে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল এবং সুযোগ বুঝে তৃণার স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতে চাইল। তৃণা ঘৃণা আর আতঙ্কে শেষবারের মতো সর্বশক্তি দিয়ে লোকটিকে ধাক্কা দিল। এবার মামাও রাগে অন্ধ হয়ে তৃণার অবশ হয়ে আসা শরীরে উপর্যুপরি লাথি মারতে লাগল। বৃষ্টির সেই মিঠে দিনটা মুহূর্তেই তৃণার জীবনের সবচেয়ে নিকষ কালো কালদিনে পরিণত হলো।
একসময় অসহ্য যন্ত্রণায় তৃণা নিস্তেজ হয়ে পড়ল। চেতনা হারানোর আগে সে শুধু দেখেছিল আকাশের অবিরাম বর্ষণ, যা হয়তো তার চোখের জল আড়াল করার জন্যই নেমেছিল। তারা তৃণাকে ওই বৃষ্টির মধ্যেই ছাদের এক কোণে অঘোরে পড়ে থাকতে দেখে চলে গেল। তবে সেদিন হয়তো রিনি (তৃণার সৎ বোন) জীবনের সবচেয়ে বড় পুণ্যটি করেছিল সে এসে তৃণাকে ওই অবস্থায় উদ্ধার করে নিজের রুমে নিয়ে যায়। রিনি জানত না কী হয়েছিল বা কেন তৃণাকে মারা হয়েছে, কিন্তু বোন হিসেবে সেটুকু মমতা সে দেখিয়েছিল।
পরপর তিন দিন তৃণা জ্বরের ঘোরে আর শরীরের কালশিটে দাগ নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিল। উমর হাওলাদার তখন কাজের সূত্রে অন্য শহরে ছিলেন। ফিরে আসার আগেই রৌশনারা বেগম তৃণার কানে বিষ ঢেলে শাসিয়ে দিলেন,
“যদি এই নিয়ে তোর বাপের কাছে একটা শব্দও করিস, তবে একদম জানে মেরে ফেলব! মনে রাখিস, এত তাড়াতাড়ি ম’রার শখ না থাকলে মুখ বন্ধ রাখবি।”
নিজের জীবনের চেয়ে দামি আর কী হতে পারে ষোলো বছরের এক মেয়ের কাছে? তাই সেই বিভীষিকা আর লাঞ্ছনার গল্প সে আর কাউকে বলতে পারেনি। আজ এত বছর পর সেই জমাট বাঁধা পাথরটা আরিয়ানের সামনে চোখের জল হয়ে গলে পড়ছে।
নিজের জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায়টি বলতে বলতে তৃণা কান্নায় ভেঙে পড়ল। আরিয়ানের পুরো শরীর তখন রাগে রি রি করছে, চোখের সামনে সে সব ঝাপসা দেখছে। সে তৃণাকে বুকের মাঝে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন তার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে এই মুহূর্তেই তৃণার সব পুরনো ক্ষত মুছে দেবে। মেয়েটা শিশুর মতো ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে আরিয়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে।
এত বছর! এতটা কাল তৃণা এই বিষপাথর বুকে চেপে বেঁচে ছিল কী করে? মেয়েটার কি দম বন্ধ হয়ে আসেনি? আরিয়ান সহসা হাহাকার করে বলে উঠল,
“এতটা পাহাড়সম কষ্ট কী করে লুকিয়ে রাখলে শ্যামলিনী? তোমার কি একবারও কাউকে বলতে ইচ্ছে হয়নি? মানুষ সামান্য ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে, আর তুমি এই মৃত্যুযন্ত্রণা বয়ে বেড়ালে একলা নিভৃতে! কথা দিচ্ছি, যে ন’রপশুগুলো আমার শ্যামলিনীর পবিত্র গায়ে হাত দেওয়ার সাহস করেছে, তাদের আমি টুকরো টুকরো করে ফেলব।”
তৃণা আরিয়ানের চোখের আগুনের মতো তীব্র আভা দেখে শিউরে উঠল। সে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
“না! আপনি কাউকে কিছু বলবেন না। প্লিজ, বিষয়টাকে আর বড় করবেন না।”
কিন্তু আরিয়ান তখন অন্য মানুষ। তার কানে কোনো অনুনয়ই পৌঁছাচ্ছে না। সে ঝটকা দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আলমারির ড্রয়ার থেকে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটা হাতে তুলে নিতেই তৃণা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। নিজের শরীরের অসুস্থতা আর দুর্বলতা ভুলে সে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
“প্লিজ যাবেন না! দোহাই লাগে আপনার, কোনো পাগলামি করবেন না।”
আরিয়ান এবার হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গর্জে উঠল,
“যে পশু আমার শ্যামলিনীর গায়ে হাত দিয়েছিল, তাকে আমি জ্যান্ত ছেড়ে দেব? ওই শু’য়োরের বাচ্চার বুক আমি গু”লিতে ঝাঁঝরা করে দেব। কু’ত্তা দিয়ে খাওয়াবো ওর মাং”স!”
আরিয়ান তৃণাকে সরিয়ে দিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়েও আবারও ঘুরে দাঁড়ালো। তার দুটে চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে, নাসারন্ধ্র কাঁপছে ক্রোধে। তৃণা আরিয়ানের হাতটা খামচে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
“প্লিজ যাবেন না। আপনি অপরাধী হয়ে যান তা আমি চাই না। আমি আপনাকে হারাতে পারব না!”
আরিয়ান তৃণার অশ্রুসজল চোখে আলতো করে চুমু খেয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি হারাবো না শ্যামলিনী। তবে ওদের মতো জানোয়ারদের অন্যায়ের শাস্তি হওয়াটা আজ খুব জরুরি। তুমি শুধু ওই শু”য়োরের বাচ্চার বাড়ির ঠিকানাটা দাও আমাকে।”
তৃণা আতঙ্কে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে আকুতি করল,
“প্লিজ না ! এমন কিছু করবেন না।”
আরিয়ান তৃণাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিচে ড্রয়িংরুমে তখন বাড়ির সবাই বসে ছিলেন। আরিয়ানের হাতে আ”গ্নেয়াস্ত্র দেখে তারা প্রত্যেকেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এনামুল মির্জা আর মায়মুনা বেগম তাকে আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু রাগে অন্ধ আরিয়ান কারো কোনো কথাই শুনল না।
তৃণা নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও কোনোমতে টলমল পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে রোহান আর আদনানকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে উঠল,
“আপনারা যান! আরিয়ানকে আটকান এখনই। ও হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, আজ ও হয়তো কাউকে খু”নই করে ফেলবে!”
তৃণার কথা শুনে বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল। রোহান, আদনান আর এনামুল মির্জা তিনজনই আর এক সেকেন্ড দেরি করলেন না। ততক্ষণে আরিয়ান নিজের গাড়ি নিয়ে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেছে। তারা তিনজনও অন্য একটি গাড়ি নিয়ে দ্রুত আরিয়ানের গাড়ির পেছনে ধাওয়া করতে লাগলেন। কিন্তু আরিয়ানের গাড়ির গতিবেগ এতই বেশি যে, সে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বা রাস্তার নিয়ম মানছে না।
তৃণার মাথা ভনভন করে ঘুরছে। নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে সে সোফায় ভেঙে পড়ল। রাহি বেগম আর মায়মুনা বেগম ছুটে এসে তাকে আগলে ধরলেন। তৃণা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ভাবছে ঠিক এই ভয়টার কারণেই সে এত বছর কোনোদিন মুখ খোলেনি। আরিয়ান যদি সত্যিই রাগের বশবর্তী হয়ে বড় কোনো ভুল করে বসে, তবে কী হবে? যদি সত্যিই সে লোকটাকে গু”লি করে দেয়!
চলবে…
(অনেকটা বড় পর্ব তাই হয়তো কোথাও ভুল হলে হতেও পারে।ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৩
-
রোদ্দুরের ছেড়া মানচিত্র পর্ব ৩৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮