রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_১৬
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
ভোরের হিমেল হাওয়া জানালা দিয়ে চুইয়ে ঘরের ভেতর আসছিল। সেই শীতল পরশে আরিয়ানের ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে অনুভব করল শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সূক্ষ্ম একটা ব্যথা, কিন্তু তার চেয়েও বেশি অনুভব করল বুকের ওপর এক অদ্ভুত ভার। নিচে তাকাতেই আরিয়ানের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সে দেখল, তৃণা অত্যন্ত অসহায়ভাবে তার বাহুডোরে আশ্রয় নিয়ে আছে। তৃণার মাথাটা আরিয়ানের হাতের ওপর, আর তার ছোট্ট একটা হাত আরিয়ানের প্রশস্ত বুকের ঠিক মাঝখানে রাখা। আরিয়ান নিজেও অজান্তে তৃণাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন কোনো এক অদৃশ্য বাঁধনে তারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে আছে।
আরিয়ানের প্রথম প্রবৃত্তি ছিল তৃণাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দেওয়া, কিন্তু আজ তার হাত নড়ল না। কোনো এক মায়া বা অদ্ভুত এক শৃঙ্খল তাকে আটকে দিল। সে পলকহীনভাবে তৃণার ঘুমন্ত আর বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান এবার খুব মৃদু স্বরে ডাকল, “তৃণা, শুনছো?”
তৃণা উত্তর দিল না, বরং ঘুমের ঘোরে আরিয়ানের গায়ের উষ্ণতা পেতে তাকে আরও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। এই নিবিড় সান্নিধ্যে আরিয়ানের বুকের ভেতর এক অজানা ঝড় শুরু হলো। সে নিজেকে সামলে নিয়ে এবার একটু জোরেই ডাক দিল।
ধীরে ধীরে পল্লব মেলল তৃণা। চোখ খুলেই যখন দেখল সে আরিয়ানের একদম বুকের ভেতর সেঁধিয়ে আছে, তার শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুতপ্রবাহ বয়ে গেল। সে দ্রুত উঠে বসতে চাইল, কিন্তু পারল না তার লম্বা রেশমি চুলগুলো আরিয়ানের হাতের নিচে চাপা পড়ে আটকে আছে। অতি কষ্টে চুলগুলো ছাড়িয়ে সে ছিটকে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল।
তৃণা ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এখনই হয়তো আরিয়ান রাগে ফেটে পড়বে, তাকে অসভ্য বলবে কিংবা ঠাস করে একটা চ’ড় বসিয়ে দিবে। সে কাঁপা গলায় অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল,
“ক্ষমা করবেন… আসলে গতকাল রাতে রুমের অবস্থা খারাপ ছিল আর আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। বিছানায় বসেই কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম টের পাইনি। প্লিজ বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে আপনার কাছে যাইনি।”
আরিয়ান কোনো তর্জন-গর্জন করল না, এমনকি কঠোর কোনো কথাও বলল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসল। তার শূন্য দৃষ্টি সারা ঘরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিয়ে ঘুরে এল। ঘরটা যেন কোনো কুরুক্ষেত্র!
আরিয়ানকে বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হতে দেখে তৃণা দ্রুত বলে উঠল,
“আপনি এখনই নামবেন না! সারা ঘরে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। আমি আগে এগুলো পরিষ্কার করি, তারপর আপনি নামুন। আপনার পায়ে বিঁধতে পারে।”
আরিয়ান তৃণার কথার কোনো প্রতিবাদ করল না। এক অবোধ শিশুর মতো সে কেবল মাথা নাড়িয়ে সায় দিল এবং বিছানায় বসে রইল। তার চোখ দুটি তৃণার কপালে লেগে থাকা সেই ক্ষতের দিকে স্থির হয়ে রইল, যা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে তার ভেতরের অন্ধকারটা কাল রাতে এই মেয়েটাকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে।
তৃণা নিচু হয়ে খুব সাবধানে মেঝে থেকে কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিল। ঘরের মেঝেতে রুপালি ঝিলিকের মতো ছড়িয়ে থাকা কাঁচগুলো গতকাল রাতের ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী দিচ্ছে। মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ অসাবধানতায় একটি ধারালো কাঁচের টুকরো তৃণার তর্জনীতে গভীর হয়ে বিঁধে গেল।
ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল তৃণা, “আহ…!”
শব্দটা শোনামাত্র আরিয়ান বিদ্যুৎবেগে বিছানা থেকে নেমে এল। নিজের পায়ের নিরাপত্তার কথা এক মুহূর্তের জন্যও তার মাথায় এল না। সে দ্রুত তৃণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল এবং তার ক্ষতবিক্ষত আঙুলটি নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। আঙুলের ডগা দিয়ে টকটকে লাল র’ক্ত চুইয়ে পড়ছে। আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, গলার স্বরে ফুটে উঠল শাসন মেশানো গাম্ভীর্য,
“সব কিছুতে এত তাড়া কিসের তোমার? একটু সাবধানে কাজ করলে কি হয়? দেখো, কতটা গভীরভাবে কেটে গেছে!”
তৃণা কোনো উত্তর দিল না। সে স্রেফ পাথরের মতো স্থির হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান নিজেই ফাস্ট এইড বক্সটা টেনে আনল। অত্যন্ত নিপুণ হাতে সে প্রথমে র’ক্তটুকু মুছে নিল, তারপর শীতল কোনো মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। পুরোটা সময় সে তৃণার চোখের দিকে একবারও তাকাল না।
তৃণা অপলক দৃষ্টিতে আরিয়ানের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা ক্ষণে ক্ষণে কেন এভাবে বদলে যায়? কখনও সে দানবের মতো সব চুরমার করে দেয়, আবার কখনও পরম মমতায় ক্ষত মুছে দেয়। তৃণা লোকটার চোখের ভাষা অনেক চেষ্টা করেও পড়তে পারে না
। সেখানে কি মায়া আছে, নাকি শুধুই দায়িত্ববোধের বোঝা?
★★★
ভার্সিটির গেটের সামনে হরেক রকম হকার আর শিক্ষার্থীদের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝে একটু অদ্ভুতভাবেই দাঁড়িয়ে আছে নির্জন। পরনে একটা সাধারণ শার্ট, লুঙ্গিটা মালকোঁচা মেরে পরা। সামনে বড় একটা কাঠের তক্তায় স্তূপ করে রাখা ভাজা বাদাম। ঠিক যেন পেশাদার কোনো বাদামওয়ালা। তার দুই পাশে দুই দেহরক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে হাসান আর নীর। নুসরাতের দেখা নেই, তাই সময় কাটাতে তারা তিন বন্ধু মিলে কিছুক্ষণ পরপরই তালার ওপর থেকে বাদাম তুলে মুখে দিচ্ছে।
নীর মুখটা কুঁচকে বলল, “কিরে নির্জন, তোর নুসরাত কি আজ ভার্সিটিতে আসেনি? কখন থেকে বাদাম চিবোচ্ছি বল তো? এভাবে চলতে থাকলে তো কাল সকালটা টয়লেটে কাটবে, পেট নির্ঘাত খারাপ হবে!”
হাসান নিজের পেটে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “পেট খারাপ মানে কী? আমার তো এখনই পেটের ভেতর ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। ডক্টর হয়ে শেষে কি নিজেদেরই চিকিৎসা করতে হবে?”
এমন সময় এক জোড়া তরুণ-তরুণী নির্জনের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটা পকেটে হাত দিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল, “এই যে মামা, জলদি কুড়ি টাকার বাদাম দাও তো!”
নির্জন অভ্যাসবশত খেঁকিয়ে উঠতে চাইল ‘মামা কাকে বলছিস? আমি কি বাদামওয়ালা নাকি যে বাদাম দিব!’ কিন্তু পাশে দাঁড়ানো নীর কনুই দিয়ে ওকে একটা গুঁতো দিল। নির্জন সম্বিত ফিরে পেয়ে জোর করে গালে একটা হাসি টেনে আনল। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,
“হায় রে কপাল! শেষ পর্যন্ত নুসরাতের জন্য বাদামওয়ালাও সাজতে হলো!”
সে কোনো মাপজোক ছাড়াই বড় এক মুঠো বাদাম ঠোঙায় ভরে বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা ঠোঙার ওজন দেখে অবাক হয়ে বলল, “আরে মামা, বিশ টাকার বাদাম দিতে বললাম, তুমি তো দেখছি পঞ্চাশ ষাট টাকার মতো দিয়ে দিয়েছ!”
নির্জনের তখন মেজাজ সপ্তমে, কিন্তু নুসরাত যেকোনো সময় চলে আসতে পারে ভেবে সে রাগ গিলে ফেলল। মোলায়েম সুরে বলল, “না না, আপনাদের মতো কিউট কাপলদের জন্য এটা আমার পক্ষ থেকে স্পেশাল গিফট। যান, এনজয় করুন।”
ছেলে-মেয়ে দুটো অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে চলে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে নির্জনের নজর গেল ভার্সিটির মেইন গেটের দিকে।খয়েরী রঙের সালোয়ার কামিজ পরা নুসরাত বই হাতে বের হচ্ছে। নির্জন বিদ্যুৎবেগে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বলল, “এই তোরা জলদি পালা! নুসরাত আসছে। তোদের দেখলে সব প্ল্যান মাটি হয়ে যাবে!”
হাসান আর নীর মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের আড়ালে ওপাশের একটা ঝালমুড়ির দোকানের পেছনে গিয়ে লুকাল।
নুসরাত গেট দিয়ে বের হতেই চোখে ঠিক করে নিল তার চিরচেনা সাদা ফ্রেমের চশমাটা। এই চশমাটা এখন তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে। সে মাটির দিকে তাকিয়ে আপন মনে হাঁটছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা চেনা কণ্ঠের ডাক শুনে থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে।
“ও চশমাওয়ালি ম্যাডাম! টাটকা বাদাম নিয়ে যান।”
নুসরাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ‘চশমাওয়ালি’ ডাকটা তার খুব পরিচিত প্রতিদিন ভার্সিটির সামনে যে সুদর্শন ছেলেটা দামী শার্ট-প্যান্ট পরে তাকে অপলক দেখে, সে তাকে এই নামেই ডাকে। কিন্তু আজ ডাকের উৎসটা দেখে নুসরাতের চোখ ছানাবড়া! সামনে নির্জন দাঁড়িয়ে, গলায় একটা সস্তা গামছা ঝোলানো, আর সামনে কাঠের স্ট্যান্ডে ভাজা বাদামের স্তূপ।
নুসরাত অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি… আপনি এখানে বাদাম বিক্রি করছেন কেন?”
নির্জন মুখে এক চিলতে বিনয় এনে বলল,
“কেন ম্যাডাম, আমি তো বাদামই বিক্রি করি।”
“ফাইজলামি করেন আমার সাথে?” নুসরাত এবার কিছুটা রেগেই গেল। “প্রতিদিন দেখি দামী শার্ট-প্যান্ট পরে গাড়ির আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর এই দুদিনেই আপনি একদম বাদামওয়ালা হয়ে গেলেন? রাতারাতি এমন কী হলো?”
নির্জন লাজুক হাসল। “হয়ে গেলাম আরকি।আপনার সামনে বড় লোকি ভাব নিতাম।এবার বলুন, বাদাম খাবেন তো?”
নুসরাত কৌতূহল সামলাতে না পেরে বলল, “আচ্ছা দিন।”
নির্জন যত্নের সাথে একটা ঠোঙা ভরে বাদাম এগিয়ে দিয়ে সুযোগ বুঝে বলল, “আচ্ছা ম্যাডাম, আপনার বুঝি খুব গরীব ছেলে পছন্দ?”
নুসরাত বাদামের ঠোঙা হাতে নিয়ে অবাক হলো, “কে বলল এই কথা?”
“না, মানে শুনলাম আরকি।”
নুসরাত এবার মুচকি হাসল। নির্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে সে খেয়াল করল ছেলেটার মুখে এক ফোঁটা দাড়ি নেই, একদম পরিষ্কার। নুসরাত হঠাৎ বলে উঠল,
“আসলে ছেলেদের দাড়িতেই বেশি সুন্দর দেখায়।”
নির্জন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলল, “কী করব বলুন ? আমার মুখে ঠিকমতো দাড়িই গজায় না। কয়েকদিন পর পর এক-দুটো বের হয় শুধু।”
নির্জনের এই অসহায় হাবভাব আর কথা বলার স্টাইল দেখে নুসরাত খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, “তাহলে তো দেখছি আপনি এখনো ছোট বাচ্চা রয়ে গেছেন!”
নির্জন নুসরাতের ওই নির্মল হাসির দিকে তাকিয়ে যেন মুহূর্তের জন্য পৃথিবী ভুলে গেল। তার সার্থকতা ওই এক টুকরো হাসিতেই। নুসরাত নির্জনের তাকিয়ে থাকা দেখে চশমাটা একবার ঠিক করে বিড়বিড় করে বলল, ‘উফ! পুরুষ মানুষ অভিনয়ের জন্য একদম সেরা!’
নির্জন পুরোপুরি শুনতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বললেন?”
“না, কিছু না। এবার আসি।” নুসরাত আর দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল। নির্জন তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে হাত নাড়ল। তবে নুসরাত কিছুটা দূরে গিয়ে আবার পেছন ফিরে নির্জনের বাদামওয়ালা রূপটা দেখে মুচকি হেসে উঠল।
★★★
সকাল থেকেই মির্জা বাড়িতে উৎসবের আমেজ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে বিভিন্ন রকম খাবারের সুবাস। কত বছর পর রোহান বিদেশ থেকে ফিরছে! বাড়ির সবার মুখে হাসি থাকলেও, মিতুর চোখের কোণে যেন উপচে পড়ছে এক অন্যরকম আনন্দ। মনে হচ্ছে, সে যেন আজ তার হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ ফিরে পেতে যাচ্ছে।
সন্ধ্যা নামার আগে রাহি বেগম মিতুকে পরম আদরে বললেন, “মা, সকাল থেকে তো অনেক খাটুনি হলো। এবার গিয়ে একটু হাত-মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নাও। তোমার বর আসার সময় তো হয়ে এলো।”
মিতু লাজুক হেসে উপরে নিজের রুমে চলে গেল। আলমারি খুলে সে বের করল তার সবচেয়ে প্রিয় সেই গাঢ় নীল রঙের জামদানি শাড়িটা। রোহান মিতুকে নীল রঙে দেখতে ভীষণ পছন্দ করে। মিতুর মনে পড়ে গেল বিয়ের আগের সেই দিনটির কথা, যেদিন রোহান তাকে প্রথম প্রপোজ করেছিল। সেদিনও মিতুর পরনে ছিল নীল শাড়ি। তারপর থেকে রোহান প্রায়ই মিতুর জন্য নীল শাড়ি কিনে আনত।
একবার মিতু অভিমান করে বলেছিল, “আমার আলমারি তো নীল শাড়িতে ভরে গেল! তুমি কি আর অন্য কোনো রঙ চোখে দেখ না?”
রোহান মিতুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় স্বরে বলেছিল, “আমার এই নীলাঞ্জনাকে যখন নীল শাড়িতে দেখি, তখন মনের ভেতর যে প্রশান্তি নামে, তা অন্য কোনো রঙে আসে না মিতু।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুরনো স্মৃতিগুলো ভাবতে ভাবতে মিতুর চোখের কোণ ভিজে উঠল। তবে আজ আর সে কাঁদবে না আজ তো আনন্দের দিন। মিতু খুব যত্ন করে শাড়িটা পরল, চোখে গাঢ় কাজল আর কপালে একটা নীল টিপ পরল। আজ সে আবার সেই পুরনো ‘নীলাঞ্জনা’ হয়ে রোহানের সামনে দাঁড়াতে চায়।
নিচে ড্রয়িংরুমে তখন টানটান উত্তেজনা। খবর এসেছে রোহানের ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে। সবাই সোফায় বসে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল। মিতু আর কাউকে সুযোগ না দিয়ে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুলল। তার হৃদপিণ্ড তখন থরথর করে কাঁপছে। দরজা খুলেই সে একরাশ হাসি নিয়ে ডাকতে চাইল ‘রোহান!’
কিন্তু পরক্ষণেই মিতুর হাসিমাখা মুখটা পাথরের মতো জমে গেল। দরজার ওপাশে আদনান আর মেজো চাচু এমদাদুল মির্জা দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তাদের মাঝখানে বা পেছনে যে মানুষটির থাকার কথা ছিল, তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তারা দুজন বেশ বিমর্ষ আর বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
মিতুর বুকটা ধক করে উঠল। সে তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল, “রো… রোহান কোথায়? ও কি আসেনি? আপনারা একা কেন?”
আদনান মিতুর চোখের দিকে তাকাতে পারল না, সে মাথা নিচু করে ফেলল। ড্রয়িংরুমের ভেতর থেকে বাকিরাও উঠে এল। মায়মুনা বেগম অস্থির হয়ে বললেন, “কিরে আদনান, রোহান কোথায়? কথা বলছিস না কেন?”
মিতু পাগলের মতো দরজার বাইরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে এদিক-সেদিক খুঁজে দেখল, যদি কোথাও রোহান লুকিয়ে থাকে! হয়তো ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য সে কোনো গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু না, যতদূর চোখ যায় ধূসর কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মিতুর বুক ফেটে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
মিতু টলমল পায়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। এমদাদুল মির্জা সোফায় বসে আছেন, তাঁর চোখেমুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। এমদাদুল মির্জা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা রোহানকে রিসিভ করতে গেলি, অথচ তাকে ছাড়াই বাড়ি ফিরলি কেন?”
এনামুল মির্জা মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বললেন, “ভাইজান, এয়ারপোর্টেই ওর সাথে দেখা হয়েছিল। কিন্তু ও আমাদের সাথে গাড়িতে উঠল না। বলল, ওর নাকি জরুরি একটা কাজ আছে, কার সাথে যেন দেখা করতে হবে।”
রাহি বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“বাড়ির সবাই ওর জন্য পথ চেয়ে বসে আছে, আর ও আমাদের সাথে দেখা না করে আগে অন্য কার সাথে দেখা করতে গেল?”
“জানি না ভাবি। শুধু বলল কোনো একটা হোটেলে তার কোনো ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে হবে। আর খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে।”
তৃণা একপাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ হচ্ছে রোহানের ওপর। কী অমানবিক একটা মানুষ! নিজের বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রীকে অপেক্ষায় রেখে সে হোটেলে কার সাথে সময় কাটাতে চলে গেল? তৃণার নজর গেল মিতুর দিকে। মেয়েটা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু করে হাতের নখ খুঁটছে। তার ওই নীল শাড়ির আঁচলটা অবহেলায় মেঝেতে লুটাচ্ছে। মিতুর চোখে জল চিকচিক করলেও সে ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
সবাই যখন রোহানকে গালমন্দ করছিল, মিতু তখন এক টুকরো শুকনো হাসি মুখে টেনে বলল,
“রোহান হয়তো সত্যি কোনো বড় দরকারি কাজ পড়েছে, চলে আসবে ও।”
মিতু মিথ্যা হাসিতে কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করলেও বাড়ির সবার বুঝতে বাকি রইল না যে, এই হাসির আড়ালে কত বড় ক্ষত লুকিয়ে আছে। এমদাদুল মির্জা ছেলের ওপর হতাশ হয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। রাহি বেগমও ছেলের এমন ব্যবহারে ক্ষুব্ধ আর ব্যথিত হলেন। তিনি মিতুর ম্লান মুখটার দিকে মায়ার দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উপরে চলে গেলেন। একে একে সবাই ড্রয়িংরুম ছেড়ে চলে গেল।
রাত এখন এগারোটার কাছাকাছি। বাইরে হাড়কাঁপানো উত্তুরে বাতাস বইছে। মিতু এখনো দরজার সামনে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে আদনান একবার কল দিয়েছিল, রোহান নাকি বলেছে সে পথে আছে। মিতু জানালার কাঁচ সরিয়ে বাইরের কুয়াশার দিকে চেয়ে।
তৃণা দোতলার করিডোর থেকে একদৃষ্টিতে মিতুর দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের তীব্র শীত আর ভেতরের তীব্র অপেক্ষার চাপে মিতু তখন রীতিমতো কাঁপছে। তৃণা কয়েকবার গিয়ে জোর করেছিল রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য, কিন্তু মিতু যেন এক অটল পাহাড়,স্বামীর আগমনের পথে সে পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেই। অবশেষে তৃণা না পেরে নিজের একটা গরম শাল নিয়ে গিয়ে জোর করে মিতুর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে এল।
করিডোরে তৃণার পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল আরিয়ান। সেও নিচের এই করুণ দৃশ্য দেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হতাশ গলায় বলল,
“রোহান ভাইয়া কেন এমন হয়ে গেল কে জানে! আগে তো লোকটা বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখত। কত হাসি-ঠাট্টা করত সারাক্ষণ।”
তৃণা আরিয়ানের দিকে না তাকিয়েই ম্লান স্বরে প্রশ্ন করল, “বিবাহ কি এতটাই মজবুত বন্ধন? ভালোবাসা কি এতটাই খাঁটি হতে পারে যে, এত অবহেলার পরেও একটা মেয়ে এভাবে তীর্থের কাকের মতো স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে? ভালোবাসা কি মানুষকে সত্যিই পাগল বানিয়ে দেয়?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বলল,
“হয়তো তাই। তা না হলে মিতু ভাবি এতক্ষণ নিশ্চয়ই এভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত না। মানুষের মস্তিষ্ক হার মানলে হয়তো হৃদয় এভাবেই কাজ করে।”
রাত যখন গভীর, তখন আবারও দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। এই শব্দের সাথে সাথে মিতুর অবসন্ন শরীরে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এল। তার মুখমণ্ডল খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে দরজার নব ঘোরাল। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এবার আর ভুল হবে না দরজার ওপাশে তার প্রিয় রোহানই দাঁড়িয়ে আছে।
দরজা খুলতেই দেখা মিলল লম্বা-চওড়া সেই মানুষটির। মিতুর স্বপ্নপুরুষ, তার রোহান। মিতু মায়ায় ভরা ছলছল চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। রোহানের চোখেও এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব। ওপর থেকে আরিয়ান আর তৃণা শ্বাসরুদ্ধকর এই পুনর্মিলনের মুহূর্তটি দেখছিল।
মিতু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। একরাশ আবেগ আর অভিমান নিয়ে সে ঝাপিয়ে পড়ল রোহানের বুকে, জড়িয়ে ধরল তাকে শক্ত করে। এতগুলো দিন, এতগুলো দীর্ঘ রাত সে শুধু এই মুহূর্তটার জন্যই বেঁচে ছিল। মিতু আশা করেছিল রোহানও তাকে সজোরে জড়িয়ে ধরে বলবে সে কতটা মিস করেছে। কিন্তু রোহানের হাত কাঁপছে। সে মিতুর পিঠে হাত রেখে তাকে আপন করে নিল না। বরং সে কেবল চোখ বন্ধ করে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মিতুর চোখের জল রোহানের শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই রোহান মিতুর বাহু ধরল। কোনো মমতা নয়, বরং এক ধরণের দূরত্ব বজায় রেখেই সে মিতুকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে দিল। মিতু অবাক হয়ে রোহানের মুখের দিকে তাকাল। তার স্বামীর চোখে আজ ভালোবাসার বদলে এক অজানা দূরত্ব আর কাঠিন্য।
মিতু পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখদুটো যেন বিশ্বাস করতে পারছে না এই মানুষটাকেই সে নীল শাড়িতে বরণ করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা শীতে কাঁপছিল। রোহানের চোখেমুখে ফিরে পাওয়ার কোনো আনন্দ নেই, নেই কোনো তৃপ্তি। বরং এক অদ্ভুত বিরক্তি আর উদাসীনতা তার মুখাবয়বকে কঠিন করে তুলেছে।
রোহান মিতুর পাশ কাটিয়ে গটগট করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ড্রয়িংরুমের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে সে বরফশীতল গলায় প্রশ্ন করল, “বাড়ির সবাই কোথায়?”
মিতু কোনোমতে নিজের কণ্ঠস্বর গুছিয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, “তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সবাই ক্লান্ত হয়ে উপরে চলে গেছে।”
রোহান আর একটি শব্দও খরচ করল না। মিতুর দিকে ফিরেও না তাকিয়ে সে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। মিতুর মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি দুলছে। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে তার। একটা মানুষ এতটা পাথর কী করে হয়ে যায়? এই মানুষটার বুকেই কি সে একসময় মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতো?
সিঁড়ির মাথায় উঠতেই রোহানের মুখোমুখি হলো আরিয়ান আর তৃণা। আরিয়ান তার বড় ভাইকে দেখে কিছুটা অবাক আর কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে এগিয়ে এল। কুশল বিনিময়ের পর আরিয়ান নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে সরাসরি বলল,
“ভাইয়া, এসব কী হচ্ছে? তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ? আর মিতু ভাবির সাথে এতদিন পর দেখা হলো, অথচ তুমি একবারও জিজ্ঞেস করলে না মেয়েটা কেমন আছে? ও যে কখন থেকে দরজায় তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে সেটা কি তুমি জানো?”
রোহান আরিয়ানের কথার কোনো পাত্তাই দিল না। বরং তার চোখেমুখে অবজ্ঞা ফুটে উঠল। সে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“এইসব কান্নাকাটি আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সবই নাটক। এসব নাটক দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। আমার এখন ঘুমানো দরকার।”
বলেই রোহান গটগট পায়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি যেন মিতুর কলিজায় গিয়ে আঘাত করল।
তৃণা সিঁড়ি দিয়ে নেমে মিতুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সে মেয়েটার ভেঙে পড়া মুখটা দেখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু মিতু আজ অজেয়। সে নিজের চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু পরম দক্ষতায় ভেতরে চালান করে দিল। তৃণাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মিতু ম্লান হেসে বলল, “আসলে ও তো অনেক লম্বা পথ জার্নি করে এসেছে, তাই খুব টায়ার্ড। মেজাজটা বোধহয় একটু বিগড়ে আছে। আমি যাই, ওর খাবারটা দিই।”
বলেই মিতু ধীর পায়ে উপরে উঠে গেল। তৃণা নিচ থেকে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, মিতু যে অদৃশ্য বর্ম দিয়ে নিজের কষ্টগুলোকে ঢেকে রেখেছে, সেই শক্তি পৃথিবীর খুব কম নারীরই থাকে। তৃণা নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, “মিতু ভাবি যতটা শক্ত, আমি কি কোনোদিন এতটা হতে পারব? এত অবহেলার পরেও কেউ এভাবে আগলে রাখতে পারে?”
চলবে…
(ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।রিচেক দেওয়া হয়নি লেখায় ভুল থাকতে পারে।)
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE