Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_১০

কলমে #নিলুফানাজমিননীলা

★★★
বিকেলের পড়ন্ত রোদে তৃণা ও অন্যরা মির্জা বাড়িতে ফিরে এসেছে। আরিয়ান সরাসরি বাড়িতে ফেরেনি,জরুরি কিছু মিটিং থাকায় সে মাঝরাস্তা থেকেই অফিসের দিকে চলে গেছে। তবে তৃণা তার দেওয়া কথা রেখেছে, সে মিহুকে সাথে করে নিয়ে এসেছে।
​নতুন আর বিশাল এই বাড়িটা পেয়ে মিহু যেন খুশিতে আত্মহারা। সে ছোট ছোট পায়ে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর থেকে থেকেই ‘মিউ মিউ’ করে চিৎকার করছে। কখনো দৌড়ে তৃণার শাড়ির আঁচল টেনে ধরছে, আবার কখনো রহস্যময় কোনো কোণ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
মিহুর এই চঞ্চলতা দেখে তৃণার মনটা একটু হালকা হলো।
​সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল, কিন্তু আরিয়ানের দেখা নেই। মায়মুনা বেগমের কোমরের পুরনো ব্যথাটা আজ হঠাৎ বেড়েছে, তাই তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। মির্জা বাড়িতে রাহি বেগম সাধারণত রান্না সামলান, কিন্তু তিনিও আজ বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। এই সুযোগে আজ পুরো রান্নার দায়িত্বটা তৃণা নিজের কাঁধে তুলে নিল।

​রান্নাঘরে তৃণার সাথে হাত বাড়ালেন মিতু। দুজনে মিলে গল্প করতে করতে রাতের খাবার বেশ গুছিয়ে প্রস্তুত করে ফেললেন। কিছুক্ষণ আগেই সবাই রাতের ডিনার শেষ করে নিজ নিজ রুমে চলে গেছেন। আরিয়ান ঠিক তখনই অফিস থেকে ফিরল। লোকটাকে ভীষণ ক্লান্ত মনপ হলো।ঘরে ঢোকার আগে সে শুধু একবার বলে গেল তার রুমে যেন এক কাপ কফি পাঠানো হয়।

​তৃণা অত্যন্ত যত্ন করে এক মগ কফি তৈরি করল আর সাথে এক কাপ চা। আরিয়ানকে কফিটা দিয়ে সে মায়মুনা বেগমের রুমেও এক কাপ চা নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। যদিও তৃণা জানে না মায়মুনা বেগম তার হাতের চা গ্রহণ করবেন কি না, তবুও কর্তব্যের খাতিরে সে এগিয়ে যেতে চাইল।
এক হাতে ট্রের ওপর কফি আর চায়ের কাপ সামলে নিয়ে তৃণা যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল, দেখল আরিয়ান রুমে নেই। পা বাড়াল মায়মুনা বেগমের ঘরের দিকে। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই ওর কদম দুটো থমকে গেল। পর্দার আড়াল থেকে ও দেখল এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্য।

​আরিয়ান তার মায়ের উরুতে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে, যেন সে কোনো প্রতাপশালী যুবক নয়, বরং মায়ের সেই ছোট্ট আদুরে সন্তানটি। মায়মুনা বেগম পরম মমতায় ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আরিয়ানের চোখ দুটো বোজা, চেহারায় রাজ্যের ক্লান্তি আর এক চিলতে প্রশান্তি। পৃথিবীর সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থেকে বাঁচতে সন্তান তার শেষ আশ্রয় খুঁজে পায় মায়ের আঁচলে।
​মায়মুনা বেগম মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে আরিয়ান? শরীরটা কি খুব খারাপ লাগছে তোর?”

আরিয়ান চোখ না খুলেই খুব অসহায় স্বরে বলল,
“না আম্মু, শুধু মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। একটু হাত বুলিয়ে দাও না!”

​মা ছেলের মাথায় আলতো করে একটা চুমু খেলেন, নিচু স্বরে কয়েকটা সূরা পড়ে ফু দিলেন। তারপর পরম যত্নে আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দিতে লাগলেন। তৃণা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, আর তার চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। এই যে পরম নিশ্চিন্তে মায়ের কোলে মাথা রাখা এই সুখটুকু তৃণার জীবন থেকে কতগুলো বছর আগেই চিরতরে হারিয়ে গেছে।
​তৃণার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। তারও তো ইচ্ছে করে তার মায়ের কোলে মাথা রেখে একটুখানি জিরিয়ে নিতে। এক জনমে কি মানুষের সবটুকু পাওয়া হয়? সে ভেবেছিল শাশুড়ির মাঝে হয়তো মায়ের ছায়া খুঁজে পাবে, কিন্তু সে ভাগ্য তো তার নয়। আজ আরিয়ানের এই সৌভাগ্য দেখে তৃণার মনে এক বিষাদমাখা লোভ জেগে উঠল। কিন্তু ভেতরে যাওয়ার সাহস ওর হলো না। পাছে ওর চোখের জল এই পবিত্র দৃশ্যটিকে অপবিত্র করে দেয়!
​ঠিক তখনই পেছন থেকে নৌশি এসে ডাক দিল,
“বউমনি? তুমি এখানে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আর তুমি কাঁদছো কেন?”

​তৃণা হকচকিয়ে গেল। ঝটপট চোখের জল মুছে মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল সে। কাঁপা গলায় বলল,
“না নৌশি, তেমন কিছু না। চোখে কী যেন একটা পড়েছে। এই নাও, চা আর কফিটা একটু ভেতরে দিয়ে দিও প্লিজ। আমি আসছি।”

​ট্রে-টা নৌশির হাতে একরকম গুঁজে দিয়েই তৃণা দ্রুত পায়ে চলে গেল। তার কান্নার বেগ তখন বাঁধ মানছে না। অন্ধকার করিডোরে একা হাঁটতে হাঁটতে সে শুধু ভাবল পৃথিবীতে মায়ের কোলের চেয়ে বড় কোনো স্বর্গ কি সত্যিই আছে?

তৃণা নিচে নামতেই দেখল মিহু ডাইনিং টেবিলের পাশ থেকে দৌড়ে এসে ওর পায়ের কাছে ভিড়ছে। নরম লেজটা দিয়ে তৃণার পায়ে সুরসুরি দিয়ে ও যেন নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। তৃণা আলতো করে মিহুকে কোলে তুলে নিল। মিহু চুপচাপ তৃণার বুকের সাথে লেপ্টে থেকে বড় বড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তৃণার মনে হলো, এই অবলা প্রাণীটা বোধহয় ওর মনের ভেতরের সবটুকু হাহাকার বুঝতে পারছে। আর বুঝবেই বা না কেন, ওদের দুজনের নিয়তি তো একই সুতোয় গাঁথা।
​তৃণার মনে পড়ে গেল মিহুকে পাওয়ার সেই বৃষ্টির দিনের কথা। ওর প্রতিবেশী এক নিষ্ঠুর মানুষ তাদের পালিত বিড়ালটাকে চারটে সদ্যজাত ছানাসহ রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। তৃণা নিজের ঘরের বারান্দা থেকে দেখত, মা বিড়ালটা কীভাবে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ওর সন্তানদের বুকের ওমে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করত। তৃণা তখন কতবার চেয়েছিল ওদের বাড়িতে আশ্রয় দিতে, কিন্তু রৌশনারা বেগমের তীব্র বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

​একদিন সকালে তৃণা তার খালার বাড়ি থেকে ফিরে এসে লক্ষ্য করল, রাস্তার সেই চেনা জায়গায় মা বিড়ালটা নেই। এক অজানা আশঙ্কায় তৃণা দৌড়ে সেখানে গেল। গিয়ে দেখল, মা বিড়ালটার নিথর দেহটা রাস্তার পাশে পড়ে আছে,কোনো দ্রুতগামী গাড়ি হয়তো ওর ওপর দিয়ে চলে গেছে। শুধু মা বিড়ালটাই নয়, তার পাশে থাকা অন্য তিনটে ছানাও না খেতে পেয়ে নিস্তেজ হয়ে মারা গেছে।
​সেই লাশের স্তূপের মাঝে শুধু এই সাদা রঙের বিড়াল ছানাটা কোনোমতে বেঁচে ছিল। ধুলোবালিতে মাখামাখি হয়ে ও তখন জীবনের শেষ নিশ্বাসটুকু নিচ্ছিল। তৃণা আর দেরি করেনি, সেই মরণাপন্ন ছানাটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে এসেছিল নিজের ঘরে। পরম যত্নে সুস্থ করে তুলে ওর নাম রেখেছিল ‘মিহু’।

​আজ মিহুর কপালে হাত বুলাতে বুলাতে তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিহুও তো মাতৃহারা, সে-ও তো একা। ঠিক তৃণার মতোই। নিজের মা নেই বলে তৃণা আজ অন্যের মায়ের ভালোবাসা দেখে আড়ালে কাঁদে, আর মিহু হয়তো তৃণার বুকেই নিজের হারিয়ে যাওয়া মায়ের ঘ্রাণ খুঁজে বেড়ায়।
​তৃণা মিহুর কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“আমরা দুজনেই বড় একা রে মিহু। আমাদের এই একাকিত্বের খবর কেউ কি রাখে!”
তৃণা মিহুর ছোট্ট তুলতুলে মুখখানা নিজের গালের সাথে মিশিয়ে ধরল। গভীর এক হাহাকার নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল,

​“কী রে মিহু, তোরও কি আমার মতো তোর মায়ের কথা চিন্তা করে খুব কষ্ট হয়? জানিস, আমার না বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝে বড্ড বেশি টনটন করে। ভীষণ ইচ্ছে হয় আম্মুকে জড়িয়ে ধরে একটু প্রাণভরে কাঁদি, কিন্তু সেই সুযোগটা আমার নেই ঠিক তোর মতো। কেউ নেই যার কাছে গিয়ে আমি বলতে পারি ‘আম্মু, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে’।”

​তৃণার চোখের একটি তপ্ত ফোঁটা মিহুর সাদা পশমে হারিয়ে গেল। সে মিহুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব অসহায় গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা মিহু, তুই কি বলতে পারিস মায়ের ভালোবাসার স্বাদ ঠিক কেমন? আমি না আমার আম্মুর ভালোবাসার স্বাদ একদম ভুলে গেছি। মায়ের গায়ের সেই পরিচিত গন্ধটা কেমন ছিল, মায়ের হাতের স্পর্শ কতটা শীতল ছিল সবই আজ ঝাপসা হয়ে গেছে। দশ বছর অনেক লম্বা সময় রে মিহু… এই দীর্ঘ সময়ে মা শব্দটা আমার কাছে শুধু এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই রয়ে গেল।”

​মিহু যেন তৃণার হৃদয়ের কম্পন টের পেল। সে করুণ সুরে একটা ‘মিউ’ শব্দ করে তৃণার কোল ঘেঁষে মুখ লুকালো। অবলা এই প্রাণীটি হয়তো ভাষা বোঝে না, কিন্তু মমতার স্পর্শটুকু ঠিকই চেনে।
​তৃণা মিহুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবল আসলে মানুষের কাছে নিজের মনের গোপন ক্ষতগুলো মেলে ধরার চেয়ে এই নির্বাক পশুদের কাছে বলা অনেক নিরাপদ। মানুষ বড়ই বিচিত্র তারা সুযোগ পেলে অন্যের দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করে, ক্ষতস্থানে নুনের ছিটা দেয়। কিন্তু এই অবলা প্রাণীগুলো কখনোই তা করে না। তারা শুধু নিস্তব্ধ হয়ে পাশে থাকে, নীরবে ভাগ করে নেয় মনের সমস্ত বিষাদ।
​তৃণা চোখ বন্ধ করে মিহুর শরীরের ওম অনুভব করার চেষ্টা করল। রাতের এই স্তব্ধতায় মাতৃহারা দুটি প্রাণ যেন একে অপরের একমাত্র শান্ত্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
★★★
মিতু কতক্ষণ ধরে রোহানকে কল করে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ‘ব্যস্ত আছে’। মিতু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে জানালার দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবল, ‘সময়ের সাথে সাথে মানুষগুলো বড্ড বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, নাকি ব্যস্ততাটা শুধু আমার জন্যই জমিয়ে রাখা?’
​কিছুক্ষণ পর আবারও কল দিতেই এবার ওপাশ থেকে রোহান কলটা ধরল। কিন্তু কুশল বিনিময়ের বদলে ভেসে এল কর্কশ এক কণ্ঠস্বর,
“সমস্যা কী তোমার? এতবার কেন কল করছো? তোমার কি মিনিমাম সেন্সটুকু নেই যে আমি ব্যস্ত থাকতে পারি?”

​মিতু এখন আর আগের মতো চমকে ওঠে না। রোহানের এই রুক্ষতা এখন তার নিত্যসঙ্গী। সে খুব স্বাভাবিক স্বরেই পালটা প্রশ্ন করল,
“ব্যস্ততা তো তোমার অনেক আগে থেকেই। তা এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলে?”

​“অফিসের দরকারি মিটিংয়ে ছিলাম। আর শোনো, তোমাকে কেন আমি সবকিছুর জবাবদিহি করব?” রোহানের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।

​মিতু হেসে উঠল, তবে সেই হাসিতে কোনো সুখ ছিল না। সে বলল, “হুম, ঠিকই তো! আমাকে কেন জবাব দেবে? আমি তো তোমার কেবল এক ঘরোয়া খেলনা স্ত্রী।”

​ওপাশ থেকে রোহান নিস্তব্ধ হয়ে রইল। মিতু ধরা গলায় আবার বলল, “রোহান, অনেক দিন হলো তোমার মুখখানা দেখি না। বড্ড ইচ্ছে করে একবার দেখার। একবার বাড়ি এসো না! আমার জন্য আসতে হবে না, বাড়ির অন্য সবার জন্য হলেও তো আসতে পারো। সেই উছিলায় অন্তত তোমাকে দেখা হয়ে যেত।”

​“সম্ভব না।”

“আচ্ছা, অন্তত একবার কি ভিডিও কল দেওয়া যাবে? কথা দিচ্ছি, মাত্র দুই মিনিট দেখব। আমি কোনো কথা বলব না, শুধু তাকিয়ে থাকব।” মিতুর কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

​আশ্চর্যজনকভাবে ওপাশ থেকে রোহান ভিডিও কল দিল। মিতুর মলিন মুখে যেন মুহূর্তেই বিশ্বজয় করার হাসি ফুটে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই প্রিয় মুখটি এক সুঠাম সুদর্শন পুরুষ, টি-শার্ট পরে সোফায় বসে নিজের অন্য একটি ফোনে টাইপ করছে। মিতু আজ অনেক যত্ন করে শাড়ি পরেছিল, ভেবেছিল রোহান হয়তো একবার তাকে দেখে বলবে ‘তোমায় সুন্দর লাগছে’। কিন্তু রোহান একবারও স্ক্রিনের দিকে তাকালো না। সে তার নিজের কাজ নিয়ে মগ্ন।
​মিতু একধ্যানে তাকিয়ে রইল সেই মুখটার দিকে। তন্নতন্ন করে খুঁজার চেষ্টা করল তার সেই পুরনো প্রেমিক রোহান মির্জাকে। কিন্তু এই রোহান আর সেই আগের রোহানের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মিতুর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, অথচ রোহান সেদিকে ভ্রুক্ষেপহীন। হঠাৎ রোহান যখন স্ক্রিনের দিকে তাকালো, মিতু দ্রুত নিজের জলটুকু মুছে নিল।
​মানুষ ঠিকই বলে,
‘মেয়েরা আসলেই বড্ড নির্লজ্জ হয়। নির্লজ্জ না হলে কি এই চরম অবহেলা জেনেও কেউ এমন করে ভালোবাসা ভিক্ষা করে?’
★★★
তৃণা রান্নাঘরের সব কাজ একে একে ধীরেসুস্থে শেষ করল। এতক্ষণ মিহু ছায়ার মতো তৃণার সাথেই ছিল। রুমে ফিরে সে দেখল আরিয়ান গভীর মনোযোগে ওয়ার্কিং টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। তৃণা তাকে কোনো বিরক্ত না করে নিঃশব্দে ব্যালকনিতে চলে গেল।
​রাতের এই প্রহরে ব্যালকনি থেকে বাইরের দৃশ্যটা অদ্ভুত মায়াবী লাগে। সোডিয়ামের হালকা হলদেটে আলোয় নিচের পাকা রাস্তাটা চকচক করছে। মাঝেমধ্যে দু-একটা রিক্সা টুংটাং শব্দ করে চলে যাচ্ছে। তৃণা স্থির দৃষ্টিতে নিচে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ তার নজর পড়ল রাস্তার এক কোণে। সেখানে একটি মা কুকুর শুয়ে আছে, আর তাকে ঘিরে তার তিনটে ছোট ছানা আনন্দে মেতেছে। বাচ্চাগুলো কখনো মায়ের ওপর উঠে লাফালাফি করছে, কখনো আবার খুনসুটি করছে। মা কুকুরটি পরম শান্তিতে তার সন্তানদের আগলে রেখেছে।
​দৃশ্যটা দেখামাত্রই তৃণা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। এই দৃশ্যগুলো তার ভেতরে এক তীব্র হাহাকার জাগিয়ে তোলে। নিজের অজান্তেই তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে তার কোলে থাকা মিহুর মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে লাগলো, মিহু ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
​হঠাৎ তৃণা পাশে কারো উপস্থিতি টের পেল। আরিয়ান এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। তৃণা একবার আড়চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়েই আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। বেশ কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর আরিয়ান ধীর গলায় বলল,
​“দুপুরের ব্যাপারটার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত, তৃণা। তোমাকে ওভাবে কথাগুলো বলা আমার একদমই ঠিক হয়নি।”

​তৃণা কোনো উত্তর দিল না, পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ান আবার বলতে শুরু করল,
“আসলে সত্যি কথাটা হলো, আমার হুটহাট খুব জেদ চেপে যায়। তখন রাগের মাথায় আমি কী বলতে কী বলি, তার কোনো ঠিক থাকে না।”

​তৃণা এবার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। শান্ত স্বরে বলল, “না, সমস্যা নেই। আমি অভ্যস্ত। এখন কি আপনার মাথা ব্যথাটা কমেছে?”

​আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকাল। তারপর হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, আম্মু যখন মাথায় হাত বুলিয়ে কী সব সূরা পড়ে ফু দিয়ে দেয়, তখন যেন জাদুর মতো ব্যথাটা উধাও হয়ে যায়।”

​তৃণা এবার আরিয়ানের চোখের দিকে চেয়ে ছোট করে হাসল। পরম তৃপ্তি মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি আপনার মাকে ভীষণ ভালোবাসেন, তাই না?”

আরিয়ান মৃদু হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি মাখা ছিল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বলল, “হুম, অনেক বেশি ভালোবাসি।”

​তৃণা আর কোনো কথা বাড়াল না। কিছুক্ষণ সেখানে নীরবতা বিরাজ করল। এরপর আরিয়ান পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। লাইটারের আগুনের ঝিলিকটা তৃণার চোখে পড়তেই সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,
“আপনি সিগারেটের নেশা আছে?”

​আরিয়ান ধোঁয়া ছেড়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“নাহ, নিয়মিত নেই। মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগলে একটু ধরাই।”

​সিগারেটের কড়া গন্ধটা তৃণার নাকে লাগতেই সে নিজের আঁচল দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলল। আরিয়ান সেটা খেয়াল করল। সে তৃণার দিকে একবার সরু চোখে তাকিয়ে সিগারেটে বড় একটা টান দিল। তারপর জ্বলন্ত সিগারেটটা ব্যালকনির মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নেভাতে নেভাতে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা তৃণা, তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?”

​তৃণা এক মুহূর্তও সময় নিল না। সোজাসুজি উত্তর দিল, “না।”
​উত্তরটা দেওয়ার পর তৃণা নিজেই নিজের ওপর অবাক হলো। অবচেতন মনে তৌহিদের নামটা একবারও ভেসে এলো না কেন? তবে কি তৌহিদের প্রতি তার যে টান ছিল, সেটা মোটেও ভালোবাসা ছিল না? নাকি জীবনের এই চরম বাস্তবতার ভিড়ে সেই ঠুনকো আবেগটা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে?

আরিয়ানের কণ্ঠস্বর হঠাৎ মখমলের মতো নরম হয়ে এল, যেন রাতের নিস্তব্ধতা তার হৃদয়ের কোনো গোপন আগল খুলে দিয়েছে। সে আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
​“জানো তৃণা, এই পৃথিবীতে ভালো না বাসাই বোধহয় সবচেয়ে নিরাপদ। ভালোবাসা মানুষকে এমন এক যন্ত্রণার অতলে ছুড়ে ফেলে দেয়, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ থাকে না। ভালোবাসা অনেকটা সেই পৌরাণিক সাপের মণি’র মতো ভীষণ দামী, ভীষণ উজ্জ্বল। সবাই জানে ওই মণি ছুঁতে গেলে কালনাগিনীর বিষাক্ত দংশনে মরণের সম্ভাবনা শতভাগ, তবুও মানুষ ওই মরণ-নেশাতেই মণির পেছনে ছুটে যায়।”
​সে সিগারেটের শেষ ধোঁয়াটুকু ছেড়ে দিয়ে ধীর স্বরে আবার বলতে শুরু করল,
“যারা সত্যিটা জেনেও শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার দেখা পায়, তারা হয়তো এই ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ। কিন্তু যারা মাঝপথে সব হারিয়ে শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। ভালোবাসা এমন এক দ্বিমুখী তলোয়ার, যে পায় সে তো ধন্য হয়ে যায় কিন্তু যে পায় না, তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে যে আগুনের দহন হয়, সেই হাহাকারটুকু কেবল সে একাই বোঝে। বাকি পৃথিবীর কাছে তা কেবলই অর্থহীন কিছু শব্দ মাত্র।”

​ তৃণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, লোকটার চোখের কোণে এক মুহূর্তের জন্য যেন এক সমুদ্র বিষণ্ণতা চিকচিক করে উঠল।

​তৃণা নিঃশব্দে আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই মুহূর্তে মানুষটার চেহারায় সেই পরিচিত রাগের ছিটেফোঁটাও নেই। তৃণা নিচু স্বরে বলল,
“আপনি যাকে ভালোবাসেন, সে নিঃসন্দেহে অনেক ভাগ্যবতী।”

​তৃণার কথা শুনে আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তৃণা হঠাৎ সাহস করে বলেই ফেলল, “আপনাকে হাসলে না ভীষণ সুন্দর লাগে! সব সময় কেন ওই ‘রাগী সাহেব’ ভাব ধরে থাকেন?”

​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো, সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “রাগী সাহেব মানে?”
​তৃণা একটু হেসে বলল,
“আপনার চরিত্রের সাথে ‘রাগী সাহেব’ নামটা খুব ভালো মানায়। সারাক্ষণ তো কপালে তিনটে ভাঁজ ফেলে সবাইকে ধমকান!”

​তৃণা ভেবেছিল এই অদ্ভুত নামে ডাকার কারণে আরিয়ান হয়তো এখনই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে। কিন্তু ওকে পুরোপুরি অবাক করে দিয়ে আরিয়ান হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল।তৃণা লোকটির হাসির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল।
‘পুরুষের হাসিও বুঝি এত সুন্দর হয়!’

চলবে…?

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply