Golpo romantic golpo যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ

যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ১২


যেখানেপ্রেমনিষিদ্ধ

ইশরাতজাহানজেরিন

পর্ব_১২

সোফার ওপর পা তুলে জয় বাংলা গান শুনছে আব্রাজ। পা দু’টো চাঙ্গে উঠিয়ে রেখেছে। ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির বেলকনি দেখা যায়। এইসময় গান্ডরের মতো দেখতে রাম ছাগল প্রতিবেশি মফিজ মিয়ার সুকন্যা ডেমরিটা রুমে ক্লাসিক গানে নৃত্যকলার নামে মির্কি নাচ শিখে। তাও যেন তেন তার শিক্ষা গুরু নয়, একেবারে হাফ লেডিস। ওই হাফ লেডিসটার পাছা দুলানো দেখে একবার তো আব্রাজ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। তবে ওটাকে দেখতে পারেনা আব্রাজ। আব্রাজকে ছাইয়া বলে একবার ডেকেছিল, পরে ওটাকে নেংটা করিয়ে লোক দিয়ে রাতে, পিছামারা নাচ করিয়েছিল আব্রাজ। সেই থেকে ভয়ে আব্রাজের সামনে আসে না। তবে ওই ডেমরির কর্তনের শব্দে আব্রাজের কানটা পঁচে যাচ্ছে। কবে জানি এই শালীকে কিডন্যাপ করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে আসে আব্রাজ। সে আরো সাউন্ড বাড়িয়ে দিলো। এরই মাঝে হঠাৎ করে কে জানি তার নাম ধরে ডাকতেই সে উঠে বসল। জানালার দিকে একবার চাইতেই দেখল মফিজ মিয়ার সেই ডেমরি মেয়েটা। সে আব্রাজকে বলল, “একটু সাউন্ডটা কমাবেন? আপনার জন্য আমি নাচ করতে পারছি না।”

আব্রাজ জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর মেয়েটিকে বলল, “ডান্সারদের নাচের সাথে সুন্দর একটা থোমাও লাগে। আর সাপের মতো শরীর নাড়ালেই নাচ হয়না। এই মেয়ে এমন নাচ করে তুমি দেশের ইজ্জত নিলামে তুলতে চাও নাকি? সাবধান করে দিচ্ছি ভালো হয়ে যাও। ভালো হতে পয়সা লাগে না। দেশের ইজ্জত নিলামে তুললে কিন্তু আমি তোমাকে ধোপা খানায় কেচে রোদে শুকাতে দিবো।” বলেই সে সাউন্ড বাড়িয়ে জানালার দরজা লাগিয়ে ধ্যানে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আব্রাজের মা এসে তাকে খাবার টেবিলে বসতে বলল। এই ছেলে সারাদিন বাইরে থেকে এই অবেলায় বাসায় এসেছে। সে বাসায় যখনি আসুক, আর পেট যতই ভরা থাকুক। বাসায় এসে ভাত এক প্লেট খাবাবেই। টেবিলে বসতেই তার মা তাকে তরকারি বেড়ে দিতেই সে বলল, ” এই কি বাল এসব? এই বাল আমি খাই? এই বাল দেশের মন্ত্রী খেতে পারে? যদি এই বাল খেয়ে আমার বাল হয়ে যায় তাহলে আমি দেশের কোন বালের উন্নয়ন করতে পারব। মা তুমিও দেশদ্রোহী। ছোট মাছ মানুষ খায়? যাদের ব্রেন নেই ওদের খাওয়াও।”

“ছিঃ আব্রাজ কি মুখের ভাষা হয়েছে। এই কারণেই তো বলি তোকে মানুষ ভোট কেন দেয় না? ভোট চোর!”

“এই এই এই, তুমি কি মিন করছো? ছেলেকে নিয়ে এসব বলতে লজ্জা করল না? কেমন মা আমার মতো এত ভালো ছেলেকে পেটে ধরলরে? খোদা গর্ভের কি দুনিয়ায় কম পড়েছিল যে এমন ঘরে ডাউনলোড করলে দেশের নেতাকে। আর ভোট দেয় না মানে? সবাই ভোট দেয় খালি তুমিই দেও না। আগের বার টাকলা মাসুদকে কচু মার্কায় যে তুমি ভোট দিয়েছিলে সব জানি। খালি কিছু বলি না।”

আব্রাজের মা চুপ করে গেলেন। ছেলের সাথে যে সে পারবে না ভালো করেই জানে। সে ছেলেকে বলল, “এখন এসব খাও না, বিয়ে করে বউ রান্না করলে তো ঠিকই খাবে।”

“তো বিয়ে করাও না। তুমি আসলে চাও না তোমার ছেলের পুষ্টি হোক, সে সুস্থ থাকুক। যদি চাইতে তাহলে জলদি বিয়ে দিতে। যাতে ছেলেটা ছোট মাছ খেয়ে সুস্থ থেকে দেশের আরো বেশি বেশি পেছন মারতে পারে না মানে উন্নয়ন করতে পারে।”

আব্রাজের মা নাউজুবিল্লাহ বলে সেখান থেকে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় সাঁঝকে ডেকে বললেন, আব্রাজকে তুই খাবার পরিবেশন করে আয়। সাঁঝ আজকে ২ বার বাঁশ খেয়েছে তাই মনটা খারাপ ছিল। রুম থেকে বের হয়নি। আব্রাজ ভাই যে এসেছে তাও জানে না। আব্রাজ ভাইয়ের সাথে তার জরুরি কথা ছিল। বলবে বলবে বলে আর বলা হচ্ছে না। সে দৌড়ে খাবার টেবিলে যেতেই আব্রাজের পাশে গিয়ে বসল। আব্রাজ ফোনে কার্টুন দেখে দেখে ভাত খাচ্ছে। সাঁঝ আসতেই ফোনটা কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে বলল, “আরে কি বাল দেখো।”

“তোর বাল দেখি।”

“আমার বাল পরে দেখো আগে শুনো, কড়া একটা খবর আছে।”

“মেয়ে দেখলি নাকি আমার জন্য? সেই বাল তো দেখতে পারিস না শালী। তুই আমার টেঙ্গার কড়ার নিউজ আনছিস।”

“আরে এরচেয়ে ভালো।”

“কী?”

“আমার আর তোমার বিয়ে এবার হবেই।”

“কী? দেখ তুই আমার সারগিদ তার চেয়ে বেশি কিছু না। দেখ আমি হ্যান্ডসাম তাই বলে আমার রুচি এত খারাপ না। দেশের নেতা বলে একটা পাগলকে বিয়ে করে জনদরদী নেতা হতে পারব না। দূর হ মা, গাড়ি ঘুরিয়ে জাহান্নামে যাহ।”

“আরে বেশি বুঝো তুমি। এই কারনেই তো ভোট চুরি করা লাগে।”

“এই….এই মুখ সামলে।”

“শুনো আরযান ভাইকে যদি আমি আর তুমি একসাথে মিলে প্রেমে ফেলতে পারি, তাহলে আমাদের প্রেমের রাস্তাও ক্লিয়ার হবে আর বিয়ের। দেখো ভাই সংসার হলে মধু। আর আমরা হলার মৌমাছি তবে ওই কালো ভ্রমর আরযান ভাইয়ের কারনে আমরা মধু আহরণ করতে পারছি না।”

“তাই তো, কিন্তু করবি কেমন করে? আমি তো নিজেই মেয়ে পটাতে পারলাম না ঠ্যাটা আরযানের গতি করব কি করে?”

“তোমার মতো একের নেতারা সবই পারে।”

“ইশ লজ্জা দিস না। যাহ দেখছি কি করা যায়।” আব্রাজ খেয়ে হাত ধুয়ে, মুখ মুছে সাঁঝকে বলল, “আমার রুমে আয়। তারপর দরজা লাগিয়ে করব।”

“কী! আমার সাথে আবার কোন বাল করবা?”

“আরে পরিকল্পনা। আরযানকে নিয়ে।”

“ওহ আচ্ছা চলো তাহলে।”

আব্রাজ আগে আগে চলল। সাঁঝ তার পেছন পেছন। তেজের রুমের সামনেটা অতিক্রম করতেই হঠাৎ কোথ থেকে যেন তুফান বয়ে গেল। তেজ জলদি রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে পড়ল আব্রাজের সামনে। কাঁদো কাঁদো অবস্থা তার। আবার রাগেরও ফুঁসছে। আব্রাজ ভাইকে দেখে বলল, “বিয়ের মধু খাওয়া ব্যাটা মানুষ রুম ছেড়ে রুমের বাইরে কেন?”

“করো বিয়ে, মজা তখন বুঝবা। মধু খাই না কদু সেটা আমিই জানি। এটা মেয়ে নাকি দানব? কি শক্তি মাইরি? যা আমার করার কথা তা সে করে।”

আব্রাজ তাকে ধাক্কা মেরে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলল, “লজ্জা সরম নেই। এসব কথা কেউ অবিবাহিত বড় ভাইকে ওপেনলি বলে? নাউজুবিল্লাহ, এখন ওযু করে বাল পবিত্র হতে হবে।”

তেজ বোকার মতো তাকিয়ে রইল। কি এমন বলল সে? সে তো বলতে চেয়েছে তার বউ তাকে পিটিয়েছে। যেখানে সে শুনেছে স্বামীরা নাকি বউ পিটায় সেখানে তার বউ তাকে। ভুল তো বলেনি, আব্রাজ ভাই নাউজুবিল্লাহ বলল কেন? তেজ নিজেকে সামলে নিচে যেতে নিবে। তার আগেই হঠাৎ আব্রাজের ঘর থেকে দৌড়ে সাঁঝ এসে হঠাৎ তার সামনে দাঁড়াল রুখে। ফিসফিস করে বলল,”এই ভাই আমাকেও বলো তোমার বউ তোমার সাথে কি করেছে। তোমার দিব্যি কাটছি আমি কাউকেই বলব না।” বলেই সে লজ্জায় মুখ আড়াল করল। তেজ এবার রেগে পায়ের জুতো জোড়া খুলে সাঁঝকে ধমকে বলল, “হোপ যাবি? নাকি এটা তোর মুখে ছুঁড়ে মারব।” জুতো পিটার ভয়ে সাঁঝ তেড়ে দৌড়ে পালায়। সে যেতেই তেজ নিজের চুল খামচে ধরে বলল, “হায় মাবুদ এক মুতুর জন্য এত কাহিনি হবে জানলে মুতুর জায়গায় কসটেপ মারতাম আমি। বাঁচাও মাবুদ, বাঁচালে মসজিদের দানবাক্সে পাঁচ টাকার পয়সা দিবোনি।”

শুটিং স্পটটা তো সেই সকাল থেকেই ব্যস্ত। বিশাল সেট। একটা পুরনো জমিদার বাড়ির আদলে তৈরি করা হয়েছে। চারপাশে লাইট, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, আর দৌড়াদৌড়ি করছে অ্যাসিস্ট্যান্টরা। মীর আরবিন প্রাণ কালো শার্ট, সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে। একজন তার মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে মেকআপ ভ্যানে বসে আছে প্রত্যাশা। সাদা-লাল শাড়িতে জীবন্ত গোলাপ লাগছে। কেবল গোলাপ বললে ভুল হবে, দেবদাস মুভির পারু বললেও ভুল হবে না চুলগুলো খোলা, কপালে ছোট্ট টিপ। ওইযে অদ্ভুত রকম দেখতে চোখ, ওই চোখেই তো অসাধারণ সৌন্দর্য লুকায়িত। এই সৌন্দর্যকে ক্যামেরায় বন্দি করা কোনো পাপ নয় তো? প্রাণ একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। নিজের মনে বলল, “এভাবে তাকানো ঠিক না, প্রাণ… তুই ডিরেক্টর, প্রফেশনাল থাক, পার্সোনালে যাস না।”

কিন্তু মনের ভেতর আরেকটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করল, “গতকাল রাতেও তো ঘুমাতে পারিসনি… কেন? এই মেয়েকে দেখে ঘুম উড়ে গিয়েছিল?”

সে বিরক্ত হয়ে সানগ্লাস খুলে ফেলল। “ক্যামেরা রেডি?” গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল ক্যামেরামান বাবুলকে।

একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট দৌড়ে এসে তাকে বলল, “জি স্যার, অলমোস্ট রেডি।”

“হিরোইন কোথায়?” ঠিক তখনই প্রত্যাশা ভ্যান থেকে নেমে এলো। প্রাণ একটু থেমে তাকাল কয়েক সেকেন্ডের জন্য… তারপর নিজেকে সামলে নিল। প্রত্যাশা সামনে এসে প্রাণের দিকে চেয়ে মৃদু হাসল, “গুড মর্নিং, স্যার।”

প্রাণ চোখ সরিয়ে নিয়ে শীতল গলায় বলল, “শুটিং স্পটে ‘স্যার’ না। এখানে সবাই আমাকে প্রাণ বলে বলে।”

পাশের সবাই অবাক হয়ে তাকালো। এখানে সবাই তাকে নাম ধরে কবে থেকে ডাকল? সবাই তো স্যার, বস ডাকে।

প্রত্যাশা একটু অবাক হয়ে তাকাল, তারপর মাথা নাড়ল, “ওকে… প্রাণ।”

প্রাণ অকারণে গলা পরিষ্কার করল, “স্ক্রিপ্ট পড়েছ?”

“তিনবার।”

“ডায়লগ ভুল হলে আমি কিন্তু ছাড়ব না।”

প্রত্যাশা চোখ তুলে তাকাল, “আপনি ছাড়বেন না, নাকি চরিত্রটা ছাড়বে না?”

প্রাণ থমকে গেল। এই মেয়েটা শুধু সুন্দর না… মাথাও কাজ করে। সে একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল,

“দেখি, কতটা পারো।”

ডিরেক্টরের কণ্ঠস্বর আবার শক্ত হয়ে উঠল, “সাইলেন্স প্লিজ! রোল ক্যামেরা!”
ক্ল্যাপস্টিক পড়ল। “সিন ওয়ান, টেক ওয়ান!”
প্রাণ নিজের পজিশনে গিয়ে দাঁড়াল। এখন সে শুধু ডিরেক্টর না। সে চরিত্রও। প্রত্যাশা তার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রাণ সৌমিক চরিত্রে অভিনয় করছে আজ। আর এইযে প্রত্যাশা? সে অভিনয় করবে অনিপমা চরিত্রে। অ্যাসিস্ট্যান্ট আবারও তাকে স্ক্রিপ্ট দিতেই সে বলল, “নো নিড। তুমি নতুন নাকি? জানোনা মীর আরবিন প্রাণের একবার স্ক্রিপ্টে চোখ বুলালেই হয়ে যায়? এটা মুখস্থ বিদ্যা নয়। ইট’স কলড আর্ট।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিনয় শুরু হলো। প্রাণ আর প্রত্যাশার চোখে চোখ পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল। ডায়লগ শুরু হলো। “তুমি জানো না, আজও তোমাকে ছাড়া এই শহরটা কতখানি শূন্য লাগে…” প্রত্যাশা তাকিয়ে রইল, চোখের কোণে জল জমে উঠছে। একদম নিখুঁত টাইমিংয়ে প্রাণ বলল, “তাহলে কেন দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে আমাকে?”

“কারণ… কাছে থাকলে নিজেকে সামলাতে পারতাম না।”

ডিরেক্টর হিসেবে তার “কাট” বলা উচিত ছিল।
কিন্তু সে বলল না। কারণ এই মুহূর্তে সে ডিরেক্টর না… সে শুধু একজন মানুষ, যে নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে। প্রাণ নিজেকে সামলে নিল। গলা পরিষ্কার করে বলল, “ওকে, নেক্সট সিন সেট করো।”
সহকারী ডিরেক্টর বলল, “স্যার, এই সিনে আপনি ওনার চুল সরিয়ে কপালে কিস করবেন।” প্রাণ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ… রেডি।”

ক্ল্যাপস্টিক পড়ল। “সিন থ্রি, টেক ওয়ান!”

প্রাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। প্রত্যাশার ভেজা চুলগুলো কপালের ওপর পড়ে আছে। সে হাত বাড়াল… আঙুলের স্পর্শে চুলগুলো সরাল। প্রত্যাশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। একটা কাঁপা শ্বাস বেরিয়ে এলো। প্রাণ ঝুঁকে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“কাট!”
কিন্তু সাথে সাথেই প্রাণ বলল, “না… ঠিক হয়নি। ইমোশনটা ঠিক আসেনি। আবার হবে।”
সবাই একটু অবাক। সিনটা তো পারফেক্টই লাগছিল!
টেক টু… আবার একইভাবে সিন শুরু। এইবার প্রাণ একটু বেশি সময় নিল। চুল সরানোর সময় আঙুলগুলো একটু বেশিক্ষণ থেমে রইল। চুমুটাও… আগের চেয়ে গভীর, দীর্ঘ। “কাট!”
সে আবার মাথা নাড়ল, “না… আরও ভালো হতে পারে।”
টেক থ্রি… টেক ফোর… একটার পর একটা রিটেক চলতেই থাকল। ক্রুদের মধ্যে গুঞ্জন।
“এতবার কেন নিচ্ছে?”

“প্রত্যাশা তো ঠিকই করছে!” প্রত্যাশাও বুঝতে পারছে কিছু একটা অস্বাভাবিক। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে ভুল করছে না তো? প্রাণ কত বড় একজন অভিনেতা। তার সামনে প্রত্যাশা ফু দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া কোনো তুচ্ছ বস্তু! সে যে নিজের প্রথম চান্সে এত বড় একটা প্রোজক্ট আর এতবড় অভিনেতার সাথে প্রধান চরিত্রে কাজ করতে পারছে এটাই অনেক। তবে প্রাণের স্পর্শে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি ছড়িয়ে যাচ্ছে তার শরীর জুড়ে। কিন্তু সে পেশাদার, নিজেকে সামলাতেই হবে। টেক ফাইভ এইবার সিন শুরু হতেই প্রত্যাশা হঠাৎ প্রাণের চোখের দিকে তাকাল। সরাসরি, গভীরভাবে। প্রাণ থেমে গেল এক সেকেন্ড। এই চোখে তো শুধু অভিনয় নেই, অন্য কিছু আছে। সে আবার চুল সরাল, কিন্তু এবার হাত কেঁপে উঠল হালকা। চুমু দেওয়ার আগে এক মুহূর্ত থামল। প্রত্যাশা খুব ধীরে বলল, ফিসফিস করে, “এটা কি শুধু সিনের জন্য…?” প্রাণের শ্বাস আটকে গেল। ক্যামেরা এখনো চলছে। চারপাশে সবাই নিঃশব্দ। সে উত্তর দিল না। শুধু কপালে চুমু দিল। এইবার আগের সবগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সত্যি, অনেক বেশি বাস্তব লাগছে সিনটা।
“কাট!” এইবার সত্যিই কাট। পুরো সেটে নীরবতা।
প্রাণ ধীরে বলল, “ওকে… এইটাই ফাইনাল।”

পরের সিন হবে বিদায়ের দৃশ্য। সেট একই, বৃষ্টি চলছেই। এই সিনে গল্প অনুযায়ী, নায়িকা কাঁদতে কাঁদতে চলে যাবে, নায়ক দাঁড়িয়ে থাকবে একা, ভেঙে পড়া মানুষ হয়ে। প্রাণ আরেকবার দেখে নিলো তার সিনে কি থাকবে আর কি কি বাদ। ক্ল্যাপস্টিক পড়ল। “সিন ফোর, টেক ওয়ান!” প্রত্যাশা ধীরে ধীরে বলল, তার গলা কাঁপছে, “আমাদের গল্পটা… এখানেই শেষ হওয়াই ভালো। আমরা একে ওপরের কাছে থাকলে… দুজনেই শেষ হয়ে যাব।”

প্রাণ চুপচাপ তাকিয়ে আছে। “তুমি চলে গেলে… আমি কীভাবে থাকব?”

প্রত্যাশা মৃদু হাসল, “যেভাবে এতদিন ছিলে… একা।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে শুরু করল।
সবকিছু একদম পারফেক্ট ছিল। ক্যামেরা, আবেগ, টাইমিং…একেবারে সব। কিন্তু… প্রাণের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল হঠাৎ। এইভাবে তাকে চলে যেতে দেখা সে আর নিতে পারল না। প্রত্যাশা কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে প্রাণ তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। পুরো সেট থমকে গেল। এটা স্ক্রিপ্টে নেই।
প্রত্যাশা চমকে ঘুরে দাঁড়াল, “প্রাণ?” কথা শেষ হওয়ার আগেই, প্রাণ তাকে টেনে নিজের খুব কাছে এনে ফেলল। দুজনের মাঝের দূরত্ব শূন্য। তার শ্বাস ভারী… চোখে তীব্র কিছু একটা। এক সেকেন্ডের জন্য সে থামতে পারত। নিজেকে থামাতে পারত। কিন্তু পারল না। সে ঝুঁকে পড়ল, এবার কোনো নরমতা নেই, কোনো হিসাব নেই। প্রত্যাশার ঠোঁটে শক্ত, আকস্মিক চুমু সে বসিয়ে দিলো। চারপাশে নিস্তব্ধতা।
বৃষ্টি পড়ছে… ক্যামেরা চলছে… অথচ সহকারী ডিরেক্টর
“কাট” বলতে ভুলে গেছে। কারণ কেউ বুঝতেই পারছে না, এটা অভিনয়, নাকি বাস্তব। প্রত্যাশা প্রথমে জমে গেল। তারপর হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নিল।
শ্বাস কাঁপছে, চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
“কাট!!!” এইবার সহকারী ডিরেক্টরের গলা কাঁপল।
পুরো সেটে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
“এটা তো স্ক্রিপ্টে ছিল না…”
“কি হলো এটা!”
প্রত্যাশা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। তার চোখে জল তবে কিসের জল? হতে পারে বৃষ্টির পানির।
সে কাঁপা গলায় বলল, “আপনি এটা কেন করলেন ?”
প্রাণ কিছুক্ষণ চুপ। তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত।
সে নিজেই বুঝতে পারছে সে সীমা পেরিয়ে গেছে।
ধীরে, নিচু স্বরে বলল, “সরি সরি আমি ভেবেছিলাম চুমুর বোধহয় এমন একটা সিন এখন ছিল।”

সে আর কিছু ব্যখ্যা দেওয়ার আগেই সহকারী ডিরেক্টর এসে বলল, “জোস প্রাণ। একেবারে মারাত্মক সিন হয়েছে। এতক্ষণ কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল। এই সিনটা দিলে গল্পটা আরো জোস হবে, দর্শক খাবে বেশি। তুমি আরেকটা রিটেক দিতে পারবে? প্লিজ!”

প্রাণ সহকারী ডিরেক্টর মিহাদের দিকে তাকালো। আরেকটার প্রত্যশার ঠোঁটে সে তাহলে চুমু দিতে পারবে? সে মুহূর্তেই উৎফুল্ল গলায় বলল, “চলুন প্রত্যাশা রিটেকের জন্য তৈরি হয়ে নিন।” একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “এটা জাস্ট একটা অভিনয়, তবে আপনি কিন্তু বাস্তবের মতো ফিল করতে পারেন।”

প্রত্যাশা লজ্জায় পড়ে গেল। “কী?”

“ইয়ে মানে, ফিল বলতে এমন ভাবে অভিনয় করবেন যেন বাস্তব মনে হয়। অভিনয় হচ্ছে শিল্পী, ফিল করতে হয়। অনুভব তো বুঝেন? আসলে ফিল বললে অশ্লীল লাগে তাই না? আচ্ছা আপনি না হয় বাস্তবের মতো অনুভব করুন। যাকে ফেইক না লাগে।”

প্রত্যাশা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। প্রথম দিনেই ঠোঁটে চুমু? হায়য়য়য়য়য়য় মাবুদ!

চলবে?

( এই গল্পের জন্য আপনারা এত পাগল অথচ রেসপন্স দেখলে কান্না আসে। সবাই কমেন্ট করে যাবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply