Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ১৩


মেজর_শিকদার-১৩

ঈশিতা_ইশা

(কপি এবং কপি পোস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(রিচেক দেইনি। পরে দিবো।)

ওপাশে আবার নীরবতা নেমে আসে।
তৃণা অনুভব করতে পারে রওনক কিছু একটা ভাবছে।

কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে বলে,
“তখন মনে হয়েছিলো তোমাকে বিয়ে করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।”

তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।

“আপনি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই জবাব দিচ্ছেন।”

রওনক একটু থামে।

“কেনো? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?”

“আমি এমনটা বলিনি৷ একটা মানুষ সম্পর্কে কোনো কিছু না জেনে তাকে বিয়ে করতে রাজি হলেন বিষয়টা কি করে স্বাভাবিক নিবো? তাছাড়া আপনি কখনো এই বিষয়ে আমার সাথে কথা অবধি বলেননি।”

রওনক শান্ত গলায় বলে,
“আমি একটু সময় দাও তৃণলতা। এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“একটা অনেস্ট উত্তর দিন তো।”

“কী?”

“আমাদের মধ্যে আসলে সম্পর্কটা কী? বিবাহিত হলেও আমাদের মধ্যে আদোও স্বামী-স্ত্রী’র স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে?”

রওনক ধীরে বলে,
“এই প্রশ্নটা হঠাৎ কেনো?”

“হঠাৎ না। অনেকদিন ধরেই মনে ছিল।”

রওনক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
“তুমি কী মনে করো?”

তৃণা তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় না।
কিছুক্ষণ পরে আস্তে বলে,
“আমার মনে হয় আমরা শুধু একটা পরিস্থিতির কারণে বিয়ে করেছি।”

রওনক ধীরে বলে,
“পরিস্থিতি অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো তৈরি করে।”

তৃণা মৃদু গলায় বলে,
“কিন্তু পরিস্থিতি কি সম্পর্ক তৈরি করে?”

রওনক এবার একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“সব সময় না।”

তৃণা চুপ করে যায়।
ঘরের ভেতরটা নিঃশব্দ। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেয়ালে ছায়াগুলো স্থির হয়ে আছে।

রওনক আবার প্রশ্ন করে,
“তুমি কি এই বিয়েটা নিয়ে অস্বস্তিতে আছো?”

তৃণা কয়েক সেকেন্ড ভেবে জবাব দেয়।
“অস্বস্তি না..বিভ্রান্ত।”

“কেনো?”

তৃণা ধীরে জবাব দপয়,
“কারণ আমরা একে অপরকে ঠিকমতো চিনি না। অথচ আমরা একটা সম্পর্কে বাঁধা।”

রওনক নরম গলায় বলে,
“সময় লাগবে তৃণলতা। টাইম হিলস এভরিথিং।”

তৃণা এবার সরাসরি প্রশ্ন করে,
“আর যদি সময়ের পরেও কিছু না বদলায়?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বহে।
তারপর রওনক খুব শান্ত গলায় বলে,
“তাহলে আমরা তখন সিদ্ধান্ত নেবো।”

তৃণা একটু অবাক হয়।

“কী সিদ্ধান্ত?”

রওনক ধীরে উত্তর দেয়,
“যেটা তোমার জন্য ভালো হবে।”

তৃণার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
সে বুঝতে পারে না এই কথার ভেতরে স্বস্তি আছে নাকি শূন্যতা।

রওনক আবার স্বাভাবিক গলায় বলে,
“এখন এসব ভেবে মাথা খারাপ করার দরকার নেই। তুমি অসুস্থ। ঘুমাও।”

তৃণা চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে,
“ঠিক আছে।”

রওনক বলে,
“গুড নাইট তৃণলতা।”

“গুড নাইট।”

কলটা কেটে যায়।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
তৃণা কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়েই বসে থাকে।
তার মাথার ভেতর রওনকের কথাগুলো ঘুরতে থাকে।

বালিশের পাশে ফোন রেখে ল্যাম্প বন্ধ করে শুয়ে পড়ে সে। রিশানের দিকে ফিরে তার গায়ে হাত রেখে আলতো করে বুলাতে শুরু করে।

চেয়ারে হেলান দিয়ে সিলিং এর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রওনক। প্রতিবার তৃণা তাকে প্রশ্ন করে আর সে কোনো রকম পাশ কাটিয়ে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যায়। এভাবে আর কতদিন সে তৃণার কাছ থেকে সবটা লুকাবে?

হুট করে রওনকের মনে হয়, নিজ স্বার্থে সে মেয়েটার জীবন নষ্ট করছে না তো?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই রওনকের বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে। সে ধীরে চোখ বন্ধ করে।

অন্ধকার ঘরটার ভেতর শুধু টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। আলোটা সরাসরি তার মুখে পড়ছে না, তবু বোঝা যায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তৃণার মুখ।
মেয়েটা আজ যে প্রশ্নটা করলো সেটার উত্তর সে জানে। কিন্তু সেই উত্তর বলার সময় এখনও আসেনি।
.

সকালটা অদ্ভুত নিরবতায় শুরু হয়।
ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো। গরম গরম পরোটা, ডিম, চা। সব কিছুই রোজকার মতোই। কিন্তু তৃণার কাছে আজ সবকিছু কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছে।
চুপচাপ বসে আছে সে। প্লেটে খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, কিন্তু খাচ্ছে না ঠিকমতো।

তার চোখ অন্যমনস্ক। মাথার ভেতর ঘুরছে রাতের সেই কথাগুলো। রওনকের সাথে এই সম্পর্কটা ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিল হয়ে উঠছে। তৃণার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে।
সে তো এই বিয়েটা চায়নি এমন না।
বরং রওনকের সাথে বিয়ের কথা শুনে সে কতটা খুশি হয়েছিলো, সেটা সে নিজেও ঠিক বোঝাতে পারবে না।
রওনক নামটা শুনলেই একসময় তার ভেতরে অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করতো।মশান্ত, গম্ভীর, দায়িত্বশীল একজন মানুষ। অজান্তেই কবে যেন তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো সে।
আর সেই মানুষটার সাথেই হঠাৎ করে বিয়ে!
সবকিছু যেন স্বপ্নের মতোই লেগেছিলো তখন।
কিন্তু এখন বাস্তবটা একদম আলাদা।

বিয়ের পর থেকেউ তাদের মাঝে একটা অদৃশ্য দূরত্ব। কথা হয়, খোঁজ নেয়, যত্নও করে কিন্তু কোথাও যেন কিছু নেই। কোনো অনুভূতির প্রকাশ নেই। কোনো টান নেই। এই সম্পর্কটা ঠিক কী?

তৃণার নিজের কাছেই উত্তর নেই।
তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শূন্য লাগে।
একটা প্রশ্ন হঠাৎ করে মাথায় আসে—
রওনক কি এখনও তার প্রথম স্ত্রীকে ভুলতে পারেনি?

প্রশ্নটা আসতেই তৃণার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে আসে। চোখের ভেতর অদ্ভুত একটা কষ্ট জমে ওঠে।
ঠিক তখনই মাহির উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করে,
“তুই খাচ্ছিস না কেনো?”

মাহির কণ্ঠে তৃণার ধ্যান ভাঙে।
সে তাকায়। মাহি তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।

“কিছু হইছে?”

তৃণা তড়িঘড়ি মাথা নাড়ে।

“না। কিছু না।”

মাহি সন্দেহভরা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

“তোর মুখটা কেমন দেখাচ্ছে। শরীর খারাপ লাগছে?”

“না, ঠিক আছি।”

তৃণা এবার জোর করে একটু খাবার মুখে তোলে।

পাশেই বসে রিশান চামচ দিয়ে ডিম ভেঙে খেলতে খেলতে বলে,
“তৃণ, তুমি আবার অসুস্থ হলে কিন্তু আমি ড্যাডিকে বলে দিবো।”

তৃণার মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।

“আচ্ছা, বলো।”

ঠিক তখনই দোতলা থেকে নামেন মিসেস জান্নাত। হালকা বেগুনি রঙের শাড়ি পরে আছেন। হাতে ব্যাগ। চুলগুলো সুন্দর করে খোপা করা। ঠোঁটে ম্যাচিং লিপস্টিক। তাকে দেখেই বোঝা যায় বেশ শৌখিন মানুষ তিনি। সবসময় ফিটফাট থাকতে পছন্দ করেন।

“তোমরা ব্রেকফাস্ট করছো?”

মাহি মাথা তুলে উত্তর দেয়,
“হ্যাঁ মম। কোথাও যাচ্ছো?”

মিসেস জান্নাত চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন,
“তোমার মেজ খালামনির বাসায় যাবো। দুইদিন সেখানে থাকবো। কিছু কাজ আছে।”

তারপর চোখ যায় তৃণার দিকে।

“তোমার জ্বর কেমন এখন?”

তৃণা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“এখন নেই। সেরে গেছে।”

মিসেস জান্নাত কাছে এসে একটু তাকিয়ে দেখেন তাকে।

“মুখটা কেমন শুকনো লাগছে। ঠিকমতো ওষুধ খাবা। কোনো সমস্যা হলে আমাকে কল দিবা।”

তৃণা মৃদু স্বরে বলে,
“জি।”

মাহি পাশ থেকে বলে,
“কোনো টেনশন কোরো না। আমি আছি।”

মিসেস জান্নাত মাথা নাড়িয়ে বলেন,
“হুম। খেয়াল রেখো।”

তারপর আর দেরি না করে বেরিয়ে যান।
ডাইনিং আবার শান্ত হয়ে যায়।

কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থাকার পর মাহি হঠাৎ বলে,
“এই শোন, কালকে তো শুক্রবার। চল না আমরা তিনজন কোথাও ঘুরতে যাই।”

রিশান সাথে সাথে লাফিয়ে ওঠে,
“ইয়েস! আমি পার্কে যাবো! আইসক্রিম খাবো!”

তার উত্তেজনা দেখে মাহি হেসে ফেলে।

“ওকে, পার্কই যাবো।”

তারপর তৃণার দিকে তাকায়
“তুই কী বলিস?”

তৃণা হালকা হাসে। বলে,
“ওকে।”

ঠিক তখনই তৃণার ফোনটা কেঁপে ওঠে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে অপরিচিত সেই নাম্বারটি।
তৃণার হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।

বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
সে দ্রুত ফোনটা হাতে নেয়।

“আমি আসতেছি..”

বলে চেয়ারের থেকে উঠে দাঁড়ায়।
মাহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

“কই যাচ্ছিস?”

“একটু আসছি।”

তৃণা আর কিছু না বলে টেবিল ছেড়ে একটু দূরে সরে যায়।

করিডোরের একপাশে গিয়ে থামে।
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে কলটা রিসিভ করে।

“হ্যালো..”

অপরিচিত সেই কণ্ঠ ভেসে আসে,
“অবশেষে ধরলেন।”

তৃণার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কণ্ঠটা সে চিনে ফেলেছে।

“আপনি আবার কেনো ফোন করছেন?”

লোকটা শান্ত স্বরে বলে,
“কারণ আপনি এখনও এখানেই আছেন।”

তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।
“মানে?”

“আমি আগেও বলেছিলাম এই বাড়ি, বাড়ির লোকজনের মাঝে আপনি অনিরাপদ। দ্রুত এই বাড়িটা ছেড়ে চলে যান।”

তৃণার চোখে এবার বিরক্তি স্পষ্ট।

“দেখুন, আপনি কে আমি জানি না। আর আপনার এসব কথা শোনারও কোনো দরকার নেই আমার।”

লোকটা থামে না।

“আপনার দরকার আছে। আপনি শুধু বুঝতে পারছেন না।”

তৃণা এবার দৃঢ় গলায় বলে,
“এটা আমার সংসার। আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ।

তারপর একটু নরম, কিন্তু চাপা স্বরে সে বলে, “সংসার! মাই ফুট! যেমনটা ভাবছেন তেমন কিছুই না৷ ঐ মেজরের সাথে থাকলে আপনার জীবনটাও নষ্ট হবে। ওর মতো পাথরের সাথে সংসার করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব না।”

কথাটা তৃণার ভেতরটা কেমন যেন নাড়িয়ে দেয়। তবুও সে নিজেকে সামলায়।

“সেটা আমার একান্ত ব্যপার। আমার জীবন আমি যা খুশি করবো। খবরদার আমার স্বামীকে নিয়ে একটাও আজেবাজে কথা বলবেন না।”

“বাহ্! মিসেস শিকদার দেখছি মেজরকে ডিফেন্ড করছে! বিয়ে হতে না হতোই ঐ লোকের প্রতি এতো প্রেম!”

“আপনি কী বলতে চান? পরিষ্কার করে বলুন। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলার মানে কী?”

লোকটা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে।

“এখন বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না।”

“তাহলে ফোন করছেন কেনো?”

“আপনাকে প্রস্তুত করার জন্য।”

তৃণা এবার চুপ হয়ে যায় এক মুহূর্ত।

তারপর জোর গলায় বলে,
“আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

লোকটা শান্ত স্বরে জবাব দেয়,
“আমি আপনাকে জোর করছি না। তবে অপশন দিচ্ছি। হয় আপনি নিজ থেকে এই বাড়ি থেকে চলে যাবেন নয়তো আমি আপনাকে আমার উপায়ে সেখান থেকে বের করবো। আর আমার উপায়টা সহজ হবে না। আপনি নিজে ভেবে দেখুন কোন রাস্তা চুজ করবেন।”

একটু থেমে আবার বলে,
“সময় খুব বেশি নেই আপনার হাতে। আজকে দুপুর অবধি সময় দিচ্ছি।”

কলটা কেটে যায়।
তৃণা কয়েক সেকেন্ড ফোনটা কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে নামায়। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে।

এই লোকটা কে?
কেনো বারবার একই কথা বলছে?
আর কেনো তার কথাগুলো এতটা অস্বস্তিকরভাবে সত্যি মনে হচ্ছে?

“তৃণা..”

মাহির ডাক শুনে সে চমকে ওঠে।

“এখন না বের হলে কিন্তু আমরা তিনজনই লেট হয়ে যাবো!”

তৃণা কোনো জবাব দেয় না।
মাহি তার দিকে এগিয়ে আসে, কাঁধে হাত রাখে।

“এই, কী হয়েছে তোর? তোকে কেমন চিন্তিত লাগছে।”

তৃণা তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। মাহি হালকা হাসে।

“কিছু নিয়ে চিন্তিত? চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তারপর একটু কাছে ঝুঁকে নরম গলায় বলে,
“ভাইয়ার সাথে তোর যে দূরত্ব চলছে, এটা একসময় ঠিক হয়ে যাবে। ভাইয়া খুব জলদি ঢাকায় আসবে। তখন সব নরমাল হয়ে যাবে।”

কথাগুলো শুনে তৃণা মৃদু হাসে। মাহিকে কি করে বলবে এই অচেনা লোকটার কথা!

ঠিক তখনই রিশান এসে তার হাত ধরে।

“আই লাভ ইউ, তৃণ!”

তৃণার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
সে ঝুঁকে তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খায়।

“আই লাভ ইউ টু।”

মাহি আবার তাড়া দেয়,
“এই, চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে!”

রিশান আগে গাড়ির দিকে ছুটে। মাহি তাকে সাবধান করতে করতে পেছন পেছন ছুটে। সার্ভেন্ট আগেই তাদের ব্যাগগুলো গাড়িতে দিয়ে এসেছে। গাড়ির পেছনের সিটে মাহির পাশে উঠে বসে তৃণা। ড্রাইভারের পাশের সিটে রিশান বসা।

দরজা বন্ধ হতেই আবার ফোনটা বের করে।
স্ক্রিনে সেই নাম্বারটা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

তারপর ধীরে নাম্বারটা ব্লক করে দেয়। তবুও ভেতরটা কেমন খচখচ করছে।

.

ক্লাসরুমে লেকচার চলছে। বোর্ডে কিছু লিখছেন স্যার। চারপাশে সবাই নোট নিচ্ছে মন দিয়ে। তৃণাও খাতা খুলে লিখছে। হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা কেঁপে ওঠে।

ভ্রু কুঁচকে ফোনটা তুলে নেয় সে। মেসেজটা ওপেন করতেই চোখ থেমে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য।

“মিসেস শিকদার, আপনাকে সাবধান করেছিলাম। মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।”

মেসেজটা পড়ে তৃণা চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে ওঠে। বিরক্ত মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এসব পাত্তা দিলে তাকে পেয়ে বসবে। তাড়াতাড়ি এই নাম্বারটাও ব্লক করে সে। বুকের ভেতরটা খচখচ করলেও পাত্তা দিলো না সে।

কাজ শেষ হতেই ফোনটা উল্টো করে টেবিলে রেখে দেয়। মনোযোগ দেয় স্যারের লেকচারে।

কয়েক মুহূর্ত পর আবার ফোনটা কেঁপে ওঠে। ফোনের দিকে তাকায় সে। ঢোক গিলে ফোনটা উল্টো করে।
আরেকটা মেসেজ! তবে অন্য নাম্বার থেকে।

“আপনি আমার কোনো কথাই শুনলেন না। এরপর যা হবে সকল দায়ভার আপনার। দ্যা গেম ইজ অন।”

মেসেজটা দেখে তৃণার কপালে ভাজ পড়ে। এই অচেনা লোকটা চাইছেটা কি! তাকে এক দন্ড স্বাভাবিক থাকতে দিচ্ছে না কেনো!

সে এবারও কোনো রিপ্লাই দেয় না। ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে।
ক্লাস তখন শেষের দিকে। আর পাঁচ মিনিট বাকি ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট হয়। ফোনটা বের করে দেখে অচেনা একটা নাম্বার।

তৃণা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনের দিকে। বিরক্তি নিয়েই কলটা রিসিভ করে।

নিচু গলায় বলে,
“হ্যালো?”

ওপাশে অপরিচিত এক কণ্ঠ শোনা যায়।
“আপনি কি তৃণা?”

তৃণার কপাল কুঁচকে যায়।
“জি। বলুন।”

লোকটা দ্রুত বলে,
“রাস্তায় একজন মেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে। তার ফোনের ইমারজেন্সী কন্টাক্টে আপনার নাম- নাম্বার পেয়ে কল দিলাম।”

তৃণার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
অস্ফুট স্বরে আওড়ায়,
“মাহি!”

ওপাশের লোকটা দ্রুত বলে,
“হ্যাঁ ম্যাম, মনে হয় নামটা মাহি। ওর ফোনে লাস্ট ডায়াল আর ইমারজেন্সি কন্টাক্টে আপনার নামই ছিল। তাই..”

তৃণার হাত কেঁপে ওঠে।

“কোথায়? কোথায় হয়েছে?”

“ধানমন্ডি লেকের কাছে। আমরা এখন ওকে নিকটের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। অবস্থা খুব একটা ভালো না মনে হচ্ছে..”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তৃণার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়।

“কোন হাসপাতালে নিচ্ছেন?”

লোকটা দ্রুত একটা নাম বলে দেয়। তৃণা আর কিছু শোনে না।

“আমি আসছি… প্লিজ খেয়াল রাখবেন ওর।”

কলটা কেটে দেয় সে। হাতটা এখনও কাঁপছে।

চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ করে কেমন দূরে সরে যায়। স্যারের কথা, ক্লাসের শব্দ সব কেমন ঝাপসা হয়ে যায়।

তৃণা ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
চেয়ারের শব্দে পাশে বসা কয়েকজন তাকায়। স্যারও থেমে যান।

“হ্যাঁ? কিছু বলবে?”

তৃণা শব্দ খুঁজে পায় না প্রথমে।

কিছুক্ষণ পর খুব কষ্ট করে বলে,

“স্যার, আমার ননদের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমাকে এখনই যেতে হবে।”

স্যার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন। তারপর মাথা নাড়েন।

“ওকে, ইউ মে গো।”

আর এক মুহূর্তও দেরি করে না তৃণা।

ব্যাগটা তুলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বের হয়ে যায় ক্লাসরুম থেকে। করিডোরে বের হতেই তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। হাত কাঁপতে কাঁপতে আবার ফোনটা বের করে।

ডায়াল করে রওনকের নাম্বার। কয়েক সেকেন্ড রিং হয়।

তারপর ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা পায়।
“হ্যাঁ তৃণলতা, আমি মিটিং এ ঢুকবো তোমাকে পরে কল..”

তৃণা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
“মাহি..মাহির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে..”

ওপাশে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা।
তারপর রওনকের কণ্ঠ বদলে যায়।

“কোথায়?”

তৃণা দ্রুত লোকেশনটা বলে দেয়।

“তুমি গাড়ি নিয়ে এখনই সেখানে যাও। আমি রাহিকে কল দিচ্ছি।।”

কলটা কেটে যায়।
তৃণা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে প্রায় দৌড়ে। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্নই ঘুরছে—কেনো?

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায় সেই মেসেজ।
“দ্যা গেম ইজ অন।”

তৃণার পা থমকে যায় এক সেকেন্ডের জন্য।
তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মাথার ভেতর একটা ভয়ংকর চিন্তা ধাক্কা দেয়— এটা কি সত্যি এক্সিডেন্ট নাকি অন্য কিছু?

তৃণা আর ভাবতে পারে না। দ্রুত বাইরে বের হয়ে যায়। ড্রাইভার গাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ধুমপান করছিলো। তৃণাকে ছুটে আসতে দেখে ভড়কে যায়। তাড়াতাড়ি সিগারেট ফেলে পায়ের নিচে পিষে দেয়।

তৃণা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“তাড়াতাড়ি ধানমন্ডি পপুলার হাসপিটালে চলুন।”

ড্রাইভার মাথা নাড়িয়ে সিটে বসে। তৃণাও কোনো মতে দরজা খুলে পেছনের সিটে উঠে বসে। গাড়িতে উঠার সময় তাড়াহুড়োতে তৃণার হাতের স্বর্ণের ব্রেসলেটটা খুলে পিচঢালা রাস্তায় পড়ে যায়। সে সেটা খেয়াল করে না।
ড্রাইভারকে তাড়া দিতেই গাড়ি স্টার্ট হয়। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় গাড়ি মেডিকেলের গেইট ত্যাগ করে।

গাড়িটা যেতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাস্তা আবার ফাঁকা হয়ে যায়। মাটিতে পড়ে থাকা ছোট্ট স্বর্ণের ব্রেসলেটটা রোদের আলোয় হালকা ঝিলমিল করে ওঠে।
ঠিক তখনই একটা ছায়া এসে থামে সেখানে।
কালো হুডি, মুখে মাস্ক পরা একজন লোক নিচু হয়ে ব্রেসলেটটা তুলে নেয়। আঙুলের ফাঁকে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড সেটা ঘুরিয়ে দেখে।

তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে। সবকিছু ঠিক যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবেই হচ্ছে।
লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাটন ফোন বের করে। নাম্বার ডায়াল করে কানে তোলে।

ওপাশে কল রিসিভ হতেই সে নিচু, নিয়ন্ত্রিত গলায় বলে,
“বস, কাজ হয়ে গেছে।”

একটু থামে।
তারপর দৃষ্টি তুলে সেই রাস্তার দিকে তাকায়, যেদিক দিয়ে তৃণার গাড়িটা মিলিয়ে গেছে।

“শিকার ছুটছে আপনার নীড়ে।”

ওপাশে কী বলা হয়, তা শোনা যায় না।
কিন্তু লোকটার মুখের হাসিটা আরও একটু গভীর হয়।

“জি, সব প্ল্যান অনুযায়ীই হচ্ছে।”

কলটা কেটে দেয় সে। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে মুঠোর ভেতর ব্রেসলেটটা চেপে ধরে। চোখের সামনে অদৃশ্য কোনো হিসেব কষে নেয়। এরপর ঘুরে হেঁটে চলে যায় ভিড়ের মাঝে—একদম সাধারণ মানুষের মতোই।


(চলবে..)

(কেমন লাগলো কমেন্টে জানাবেন। পরবর্তী পর্ব শনিবার আসবে না। রবি/সোমবার আসবে।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply