Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর শিকদার

মেজর শিকদার পর্ব ১১


মেজর_শিকদার-১১

ঈশিতা_ইশা

[কপি পোস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

ওপাশের কণ্ঠ ঠান্ডা।
“মেজর রওনক শিকদারের বিষয়ে আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। আপনি কি একা আছেন?”

তৃণার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ধকধক করতে শুরু করে। এসির নিচে বসেও তরতর করে ঘামছে সে। ওড়নার একাংশ দিয়ে কপাল মুছে নিলো। ইতিমধ্যে গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ!

সে একটু থেমে সাবধানে প্রশ্ন করে,
“আপনি কে?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর লোকটা ধীরে উত্তর দেয়,
“আপনি আমাকে চেনেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি, মিসেস শিকদার।”

কথাটা বলার পর মনে হলো লোকটা শব্দ হীন হাসছে।
তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।
“কি বলতে চান?”

“প্রথমে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনার কি মনে হয়, আপনার বিয়েটা খুব স্বাভাবিক ভাবে হয়েছে?”

প্রশ্নটা শুনে তৃণা এক মুহূর্ত চুপ করে যায়। গলা আবারো শুকিয়ে আসে। মাথার ভেতর টিপটিপ করছে।

সে কঠিন গলায় উত্তর দেয়,
“আমি এসব নিয়ে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে চাই না।”

ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ আসে।
“আপনি চাইবেন। কারণ সত্যিটা আপনার জানা দরকার।”

তৃণা এবার বিরক্ত হয়ে বলে,
“দেখুন..”

লোকটা তাকে থামিয়ে দেয়।

“আপনার শ্বশুর আকরাম শিকদার। স্বামী মেজর রওনক শিকদার। বিয়েটা আপনার বড়ো বোন তিন্নির সাথে ঠিক হয়েছিল কিন্তু বিয়ের দিন সে নিজের প্রেমিকের সাথে পালায় এরপর রওনক শিকদার আপনাকে বিয়ে করে। আর আপনি এখনো জানেন না কেনো সেদিন রওনক আপনাকে এত তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা করেছিলো। ঠিক বলছি?”

তৃণার বুক কেঁপে ওঠে।
সে উঠে বসে বিছানায়।

“আপনি এসব জানলেন কীভাবে?”

লোকটা শান্ত গলায় বলে,
“কারণ আমি সেই মানুষদের একজন যারা এই পুরো খেলাটা অনেকদিন ধরে দেখছে।”

“খেলা?”

“হ্যাঁ। এমন একটা খেলা যেখানে আপনি নিজেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

তৃণার মাথা যেন আরও ঝিমঝিম করে ওঠে।

সে ধীরে বলে,
“আপনি কি বলতে চাইছেন?”

ওপাশের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়।

“আপনার জীবন এখন বিপদের মধ্যে আছে, মিসেস শিকদার।”

তৃণার আঙুল শক্ত হয়ে যায় ফোনের চারপাশে।

“কিসের বিপদ?”

“যে কারণে আপনাকে রওনক শিকদার বিয়ে করেছেন সেই কারণেই।”

তৃণার বুক ধক করে ওঠে।

“মানে?”

লোকটা ধীরে ধীরে বলে,
“আপনি কি সত্যিই মনে করেন রওনক শিকদার পরিস্থিতিতে পড়ে আপনাকে বিয়ে করেছে?”

প্রশ্নটা সরাসরি এসে আঘাত করে তৃণাকে। সে কিছু বলতে পারে না। নিজেও এসবের কারণ জানে না। রওনক কখনোই তাকে কিছু বলেনি। সবসময় এড়িয়ে যায়।

ওপাশের কণ্ঠ আবার শোনা যায়,
“আপনাকে বিয়ে করা ছিল একটা পরিকল্পনা। অবশ্য আপনার জায়গায় আপনার বোন থাকলেও একই পরিকল্পনার অংশ হতেন। সে পালিয়ে বেঁচে গেছে তবে আপনি ফেঁসে গেছেন মিসেস শিকদার। ফেঁসে গেছেন একটা স্বার্থপর, খুনী পরিবারের জালে।”

তৃণার মাথা ঝিম ধরে যায়। তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

“আপনি মিথ্যা বলছেন।”

ওপাশের লোকটা একটুও উত্তেজিত হয় না। বরং খুব শান্ত স্বরে বলে,
“মিথ্যা হলে কলটা কেটে দিন। তাহলে আপনার জীবন আগের মতোই শান্ত থাকবে। তবে কোনো দিনই সুখী হবেন না। অন্ধকারে থাকবেন চিরকাল।”

তৃণার আঙুল শক্ত হয়ে ওঠে ফোনের চারপাশে। কেটে দিতে পারত। কিন্তু কেমন একটা অজানা কৌতুহল, ভয় তাকে আটকে রাখে।
সে ধীরে বলে,
“আপনি আসলে কি চান?”

লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে।
তারপর বলে,
“আমি চাই আপনি চোখ খুলে দেখুন। যে পরিবারে আপনি বিয়ে করে এসেছেন, তারা আপনাকে ঠিক কতটা জানাতে চায় আর কতটা লুকিয়ে রাখছে।”

তৃণার ভ্রু কুঁচকে যায়।
“আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?”

“আপনি কি জানেন, রওনক শিকদার গতকালকে ডিউটি থেকে ইমারজেন্সী ছুটি নিয়ে ঢাকা ছুটে এসেছিলো?”

প্রশ্নটা অপ্রস্তুত করে দেয় তৃণাকে।
সে ধীরে বলে,
“না।”

“জানেন না। কারণ আপনাকে কেউ জানায়নি। আপনাকে শুধু গল্পের বাইরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আপনি তাদের জন্য গল্পের অতিরিক্ত চরিত্র।”

তৃণার চোখ মুখ নরম হয়ে আসে।

লোকটা আবার বলে,
“আপনি কি জানেন আপনার বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল? যার কারণে রওনক শিকদার বিয়েটা যে কোনো মূল্যে করতে চেয়েছিলো!”

“কি ঘটনা?”

“সেটা তো আপনি খুঁজে বের করবেন মিসেস শিকদার।”

তৃণা কিছুই বুঝতে পারে না। বিরক্তি মিশ্রিত স্বরে বলে,
“আপনি আলতু ফালতু কথা বলে আমাকে ফাঁসাতে চাইছেন।”

লোকটা এবার নিচু স্বরে বলে,
“রওনকের সাথে আপনার সম্পর্কটা কেমন? সাধারণ স্বামী-স্ত্রী’র মতোন নাকি অন্য রকম?”

তৃণার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
“আপনি কি বলতে চাইছেন?”

“আমি বলতে চাইছি—রওনক শিকদার কাগজে কলমে আপনাকে বিয়ে করলেও আপনি কখনোই তার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবেন না। আপনি নাম মাত্র স্ত্রী!”

শেষের কথাটা বাজ পড়ার মতো কাজ করলো। রুমের ভেতর হঠাৎ যেন ঠান্ডা হয়ে যায়।

তৃণা ধীরে বলে,
“আপনি মিথ্যে বলছেন আমায় বিভ্রান্ত করতে। আমি এসব কিছুই বিশ্বাস করি না।”

লোকটা এবার খুব স্পষ্ট করে বলে,
“ঠিক আছে, করতে হবে না বিশ্বাস। জানেন কি? আপনাকে শিকদার পরিবারে আনা হয়েছিল একটা কারণে।”

“কি কারণ?”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বয়ে যায়।
তারপর লোকটা বলে,
“কারণটা বেশ জটিল। এখন বলার মুড নেই আমার।”

তৃণার নিঃশ্বাস আটকে যায়।
“প্লিজ বলুন!”

ওপাশের কণ্ঠ এবার একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়।
“মিসেস তৃণা শিকদার আপনি যতটা ভাবছেন তার থেকেও অনেক বেশি বিপজ্জনক এক খেলায় ঢুকে গেছেন।”

তৃণার হাত কাঁপছে।
সে ধীরে প্রশ্ন করে,
“আপনি কে?”

লোকটা এবার হালকা হেসে উত্তর দেয়,
“আজকে জানার দরকার নেই। সময় হলেই জানতে পারবেন।”

তৃণা কিছু বলার আগেই লাইনটা হঠাৎ কেটে যায়। ফোনের স্ক্রিন নিভে যায়।

রুমের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। এসির মৃদু শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।

তৃণা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে থাকে। ফোনটা এখনো তার কানে ধরা। ধীরে ধীরে ফোনটা কানে থেকে নামায় সে। তার বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিক দ্রুত উঠানামা করছে।
“আপনি নাম মাত্র স্ত্রী!”
কথাটা বারবার কানে বাজতে থাকে।

তৃণা চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকায়।
না। এসব বাজে কথা। সম্পূর্ণ মিথ্যা।
কিন্তু তবুও লোকটার বলা কিছু কথায় অদ্ভুত মিল আছে।
রওনকের আচরণ, তাদের মধ্যকার দূরত্ব, হঠাৎ করে রওনক তাকে বিয়ে করা; সব কিছু একটার সাথে অপরটা কানেক্টেড!

মাথার ভেতরটা আরও ভারী হয়ে ওঠে।
সে ধীরে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখে। কল লিস্টে নাম্বারটা দেখার চেষ্টা করে। বিদেশি একটা নাম্বার।

তৃণা তাড়াতাড়ি কল ব্যাক করে। কয়েক সেকেন্ড রিং হয়।
তারপর অপরপাশ থেকে ইংরেজিতে বলে,
“The number you are trying to call is currently switched off.”

তৃণার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে ওঠে।
সে ধীরে ফোনটা বিছানার ওপর রেখে দেয়। দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে। মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে।
“আপনাকে শিকদার পরিবারে আনা হয়েছিল একটা কারণে!”

প্রশ্নটা মাথার ভেতর চড়াও হয়। আলেই তাকে কিসের জন্য বিয়ে করেছে রওনক?
আর লোকটা এত কিছু জানলো কীভাবে?

তৃণার চোখ হঠাৎ দরজার দিকে যায়।
রওনক অনেকক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে।
মিটিং অ্যাটেন্ড করতে।

সে বুঝতে পারছে না এই মূহুর্তে কার সাথে এসব নিয়ে কথা বলবে। কিংবা আদোও কথা বলাটা ঠিক হবে কিনা। তৃণার মনে হলো জ্বরটা আবারো তাকে পেয়ে বসেছে। সে বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজে থাকে।

.

রাত অনেকটাই নেমে এসেছে। বাড়ির করিডোরে আলো জ্বললেও চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে।

মাহি দরজা ঠেলে তৃণার রুমে ঢোকে।

রুমটা আধো অন্ধকার। পর্দা টানা। বিছানায় তৃণা পাশ ফিরে শুয়ে আছে।

মাহি ধীরে দরজাটা বন্ধ করে ভাবে তৃণা ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।

সে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে দেয়াল হাতরে সুইচটা অন করে।

আলো জ্বলতেই বিছানার দিকে তাকিয়ে তার ভ্রু কুঁচকে যায়।

তৃণা চোখ বন্ধ করে শুয়ে নেই। বরং সোজা তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে স্থির।

মাহি একটু চমকে ওঠে।

“এই তুই ঘুমাসনি?”

তৃণা ধীরে তার দিকে তাকায়।

“না।”

গলার স্বরটা কেমন নিস্তেজ।
মাহি এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে। তার কপালে হাত দিতেই মুখ কুঁচকে যায়।

“এই তোর শরীর তো গরম! সারাদিন জ্বরটা নামেনি!”

তৃণা চোখ নামিয়ে নেয়।
“একটুখানি জ্বর। তেমন সিরিয়াস কিছু না।”

“কিছু না মানে?” মাহি বিরক্ত হয়।

“দুপুরে ঠিকমতো খাসনি। ভিজে এসেছিস। তারপর থেকে চুপচাপ শুয়ে আছিস। জ্বর হবেই তো।”

তৃণা কিছু বলে না।
মাহি উঠে দাঁড়ায়।

“তোর জন্য স্যুপ রান্না হচ্ছে। মা বানাচ্ছে। দুপুরে তো কিছু খেলি না। এখন খেয়ে নিবি।”

তৃণা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।

“খেতে ইচ্ছা করছে না।”

মাহি চোখ বড়ো করে তাকায়।

“ওটা তোর ইচ্ছার ব্যাপার না। আমি বলছি আমার কথা শুনবি। সারাদিন তুই তোর মতো কাটিয়েছিস এখন আর তোর কথা শুনবো না।”

“মাহি প্লিজ..”

“কোনো প্লিজ না।”

মাহি হাত তুলে থামিয়ে দেয় তাকে।

“আমি এখনই নিয়ে আসছি। বসে থাক।”

কথা শেষ করে সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

দরজা বন্ধ হতেই রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

তৃণা ধীরে চোখ বন্ধ করে।

মাথার ভেতর আবার সেই অচেনা লোকটার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হয়। সে শক্ত করে চাদরটা মুঠো করে ধরে।

কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ হয়।

“তৃণ?”

রিশানের কণ্ঠে পুরো রুমটা হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায়।

মাহি ট্রে হাতে ঢোকে। আর তার পিছনেই রিশান দৌড়ে আসে।

রিশান সরাসরি বিছানায় উঠে পড়ে।

“তৃণ তুমি অসুস্থ?”

তৃণা অবাক হয়ে তাকায়।

“কে বললো?”

রিশান গম্ভীর মুখে বলে,
“ড্যাডি বলেছে।”

মাহি ট্রেটা টেবিলে রেখে বলে,
“ভাইয়া যাওয়ার আগে বারবার রিশানকে বলে গেছে তুই অসুস্থ, তোকে একদম বিরক্ত না করতে। ভাইয়া তোর কত্ত কেয়ার করে দেখলি!”

কথাগুলো শুনে তৃণা চোখ নামিয়ে ফেলে।
সে বাটি তুলে তৃণার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

“এই নে। গরম থাকতে খা।”

তৃণা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলে,
“সত্যি খেতে ইচ্ছা করছে না মাহি।”

মাহি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

“তাহলে আমি কি এখানে সাজিয়ে রাখার জন্য আনলাম?”

রিশান তখন তৃণার হাত ধরে টান দেয়।

“তৃণ খাও না। তোমার খাওয়া হলে আমার গাড়ি দেখতে নিচে যাবা।”

মাহি চামচে স্যুপ তুলে মুখের সামনে ধরে।

“মুখ খোল জলদি। তুই রিশানের মতো অবাধ্য।”

রিশান সাথে সাথে প্রতিবাদ করে।
“মাহি তুই অবাধ্য। তৃণ আর আমি সব কথা শুনি।”

মাহি হেসে মাথায় আলতো চাপড় দেয় তাকে।

“তাই না? তাহলে তোর তৃণকে খেতে বল জলদি।”

রিশান চোখ মুখ খিঁচে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,
“তৃণ খাও প্লিজ। না খেলো মাহি তোমাকে পচা বলবে।”

রিশানের নাটকীয়তা দেখে মাহি হেসে ফেলে। তৃণারও ঠোঁটের ভাজ মলিন হয়।
“খাচ্ছি।”

মাহির কাছ থেকে এক চামচ মুখে দেয়। তারপর বাকিটা নিজে নিজে খেতে শুরু করে।

তৃণাকে খেতে দেখে মাহি আর রিশান একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে হাসে।

.

পরীক্ষা সেরে হল থেকে বেরিয়েছে তৃণা।

মাথাটা এখনো ভারী লাগছে। গা জুড়ে অদ্ভুত ক্লান্তি। শরীরের ভেতর জ্বরটা পুরোপুরি যায়নি। তবুও সে নিজেকে জোর করে টেনে বের করেছে।

বিগত তিনদিন ধরেই এই অবস্থা।
টানা জ্বর নিয়েই পরীক্ষা দিতে আসছে সে।

মেডিকেল কলেজের পরীক্ষা এমনিতেই কঠিন। একটা পরীক্ষাও মিস দিলে পরে কত ঝামেলা তৃণা সেটা ভালো করেই জানে। তাই শরীর যতই খারাপ থাকুক, পরীক্ষা ফাঁকি দেওয়ার কথা সে ভাবতেই পারেনি।

প্রথমদিন মাহি জোর করে তার সঙ্গে এসেছিল। কিন্তু নিজের ক্লাস থাকায় বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। শেষমেশ অনেক বকাঝকা করে তাকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়।

তারপর থেকে নিয়ম করে গাড়ি পাঠানো হচ্ছে। ড্রাইভার সমেত। সকালবেলা মেডিকেলে ড্রপ করা, আবার পরীক্ষা শেষ হলে নিয়ে যায় তাকে। সবটাই হয়েছে আকরাম শিকদারের কড়া নির্দেশে।

‘পরীক্ষা শেষ হলে সোজা বাসায় ফিরতে হবে। অকারণে কোথাও দাঁড়ানো যাবে না।’ এমনটাই সে বলেছেন।

তৃণা ধীরে ধীরে হল বিল্ডিং থেকে বের হয়।
মেডিকেল কলেজের করিডোরে এখনো ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। কেউ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছে।

বাইরে বের হতেই রোদ চোখে লাগে। গত রাতে বৃষ্টি নেমেছিলো কলেজের সামনে পুরোনো গাছগুলো বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া সবুজে চকচক করছে। ভেজা মাটির গন্ধ এখনো বাতাসে লেগে আছে।

তৃণা একটু থামে।
মাথাটা হালকা ঘুরে ওঠে।
সে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক তখনই তার ফোনটা কেঁপে ওঠে।

তৃণা ধীরে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে। অচেনা আরেকটা নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে।
সে মেসেজটা খুলতেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।

“পরীক্ষা শেষ? আশা করি আজও জ্বর নিয়েই এসেছেন, মিসেস শিকদার।”

তৃণার আঙুল শক্ত হয়ে যায় ফোনের চারপাশে।
এই নম্বরটা সে চেনে না।
কিন্তু এই ভঙ্গি, এই ভাষা! তার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে সেই ফোনকলটার কথা ভেসে ওঠে।

ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ আসে।

“আপনি খুব জেদি। শরীর খারাপ নিয়েও পরীক্ষা দিতে আসেন। অবশ্য মেডিকেল স্টুডেন্টদের এই জেদটা আলাদা।”

তৃণার গলা শুকিয়ে আসে।
সে ধীরে চারপাশে তাকায়।
কলেজ গেটের সামনে ভিড়। ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা।

কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে হয়, কেউ যেন তাকে লক্ষ্য করছে। খুব কাছ থেকে!

ফোনটা আবার কেঁপে ওঠে।

“চারপাশে তাকিয়ে লাভ নেই৷ আমি আপনাকে দেখছি কিন্তু আপনি আমায় দেখতে পারবেন না।”

তৃণার বুকের ভেতরে থাকা হৃদপিণ্ডটা দ্রুত গতিতে লাফাতে শুরু করে।

ঠিক তখনই তার সামনে এসে থামে পরিচিত কালো গাড়িটা। ড্রাইভার নেমে দরজা খুলে দেয়।

“ম্যাডাম, চলুন।”

তৃণা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। তার ফোনটা আবার কেঁপে ওঠে।

শেষ মেসেজটা ভেসে ওঠে,
“আজকে আাড়ি গিয়ে আপনার স্বামীকে একটা প্রশ্ন করবেন। তিনি আপনাকে কেনো বিয়ে করেছিলেন?”

তৃণার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে ওঠে। আর এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসে সে। সারা শরীর ঘেমে উঠেছে তার। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতেই জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে সে।

ফোন তুলে ডায়াল করে রওনকের নাম্বারে।

দু’বার রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হয়।

“হ্যালো?”

রওনকের গলা স্বাভাবিক।

তৃণা কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারে না। তার বুকের ভেতরটা এখনও দ্রুত উঠানামা করছে।

রওনক আবার বলে,
“তৃণলতা, শুনতে পাচ্ছো?”

“হ্যাঁ..”

রওনক একটু থেমে প্রশ্ন করে,
“পরীক্ষা শেষ?”

“হ্যাঁ।”

“গাড়িতে উঠেছ?”

তৃণা জানালার বাইরে তাকায়। কলেজ গেটটা ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে।

“হুম।”

রওনক শান্ত স্বরে বলে,
“সোজা বাসায় চলে যাও। বাইরে কোথাও দাঁড়াবে না। শরীর এমনিতেই খারাপ।”

সাধারণ কথাগুলো শুনেও তৃণার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মোচড় দেয়।

সে হঠাৎ বলে ফেলে,
“আপনি কোথায়?”

ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর রওনক বলে,
“ক্যাম্পে। কেনো?”

তৃণা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

লোকটার মেসেজটা আবার মনে পড়ে,
“আজকে বাড়ি গিয়ে আপনার স্বামীকে একটা প্রশ্ন করবেন।”

তৃণার আঙুল ফোনের চারপাশে শক্ত হয়ে যায়।

রওনক আবার ডাকে,
“কিছু বলবে?”

তৃণা ধীরে বলে,
“হ্যা।”

“আর্জেন্ট কিছু?”

“হুম।”

“এই মূহুর্তে আমি ভীষণ ব্যস্ত। বাসায় গিয়ে রেস্ট নাও। আমি রাতে কল করবো।”

তৃণা ধীরে মাথা নাড়ে, যদিও সে জানে রওনক সেটা দেখতে পাচ্ছে না।

“ঠিক আছে।”

কলটা কেটে যায়।
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা নেমে আসে।
তৃণা ধীরে ফোনটা নামিয়ে কোলে রাখে।

মাথার ভেতরটায় মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি পেটা করছে। এক্ষুনি ফেটে যাবে। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে সিটে গা এলিয়ে দু-চোখ বুজে।

….
(চলবে..)

(কোথাও বানান ভুল হলে কমেন্টে জানাবেন। এই পোস্টে আপনাদের রেসপন্স না এলে আমার পক্ষে নিয়মিত হওয়া সম্ভব না। পর্ব পড়ে লাইক কমেন্ট করে যাবেন অবশ্যই।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply