মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_১৬
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
বিগত ঘন্টা খানেক ধরে ধারা এঘরেই আছে, কিন্তু ঘুমোয়নি। ওর ঘুম এসেও আসছে না। ও চুপচাপ কতক্ষণ বসে রইলো। ফোনে নেট অন করে ফেসবুকে মনোযোগ ঢেলেও লাভ হলোনা। এবার পিঠ সত্যি সত্যি বিছানার গদি দাবি করছে।সেই ভোর সকালে উঠে টিউশন এরপর কলেজের ঐ কঠিন কঠিন সাবজেক্টের ক্লাস সবকিছু মিলিয়ে শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে ধারার। ও একবার বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় উঁকি ঝুঁকি দিলো তবে বিশেষ লাভ হলোনা, কিছুই দেখা যায় না তারউপর ওয়াসিফ ওপাশ থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে।
ধারা ঘুরে এসে বিছানায় বসে, পা দুলিয়ে চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুরো ঘরটাতে নজর বুলায়। কি বোরিং একটা ঘর এটা? ওদের এই বাড়ির সবচেয়ে বোরিং একটা ঘর এটাই। জিনিস পত্র সবকিছু ই কেমন যেনো, না আছে তাতে কোনো আধুনিক কারুকাজ আর না আছে উজ্জ্বল কোনো রং। সবকিছুতে কেমন মেড়মেরে ভাব। অবশ্য তাতে ধারার কিছু যায় আসেনা। এই ঘরের মালিকের সঙ্গে এমন একটা ঘরই মানানসই।
আচমকা ধারার চোখ পড়ে ওয়ারড্রবের ওপাশের দেয়ালে কয়েকটা বাঁধিয়ে রাখা ছবির দিকে। এই ছবি গুলো ওদের পারিবারিক এ্যালবামেও অনেকবার দেখেছে ধারা। যেখানে একটা ছবি অন্যগুলোর তুলনায় একটু বড়ো আকারে বাঁধানো। আর ঐ ফ্রেমেই ওরা পাঁচজন। শাহেদ ওয়াসিফ, ওয়াসিফের দুই ভাই শাহীন, শহীদ, লুইপা আর ধারা। এখানে লোপা, মাহিন নেই। কারণ এই ছবিটা যখন তোলা হয়েছিলো তখন ঐ দুটো খুব ছোট,কোলে কোলে ঘোরার বয়স।
ধারা বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দাড়ায় ঐ ছবিটার দিকে। হাত বাড়িয়ে ছবির ফ্রেমটা খুলে এনে নিজের কাছাকাছি রেখে দেখতে দেখতে কখন যে চোখে পানি জমে গেলো টেরই পেলোনা। এই ছবিটা যখনকার তখন ওয়াসিফের বয়স ষোলো। শাহীন ভাইয়ের দশ, আপার আট।শহীদ ভাইয়ের বয়স ছয়, ধারার বয়স পাঁচ।
ঠিক শহীদ ভাইয়ের ছবিটার উপর গিয়ে হাতের আঙ্গুল গুলো থামে ধারার। এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলে ধারা। চোখের পানিটুকু টুপটাপ পড়তে থাকে ফ্রেমটার উপর। কান্নার তোপে অস্পষ্ট ধারা বলে।
“ তুমি অনেক বিচ্ছু ছিলে ছোট ভাইয়া, সেবার মেলা থেকে বাবার কিনে দেওয়া আমার শখের মাটির পুতুলটা এক আছাড়ে ভেঙে দিয়েছিলে বলে আমার সে কি কান্না। বড়ো আম্মার কাছে বিচার আর আমার কান্না দেখে বলেছিলে ওর চেয়ে ভালো পুতুল আমাকে এনে দেবে। কিন্তু তুমি কথা রাখোনি ছোট ভাইয়া, তুমি চলে গেছো আমাদের ফাঁকি দিয়ে”
আজ থেকে ঠিক চৌদ্দ বছর আগে ছবিতে উল্লেখিত ছয় বছরের শহীদ নামের ছেলেটি সকলের অগোচরে মায়ের কোল, ভাইবোনদের ফাঁকি দিয়ে পানিতে যে ডুবেছিলো,সেখান থেকে জীবিত আর ফিরতে পারেনি এই গোটা পরিবারে। পাঁচ বছরের সেই অস্পষ্ট দৃশ্য টুকু চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ধারা নিশ্বাস ভারি হয়। দম আঁটকে আসে। সেই থেকে সামান্য কূপের পানিও ওর কাছে এক ভয়ংকর আতংকের নাম। গ্রামের পরিবেশে এই উনিশটা বছর কাটিয়ে দিলেও সেই পাঁচ বছর বয়সের পর থেকে ধারা কখনো একটা পা ও পুকুরের পানিতে ভিজায়নি। ঐ পুকুর,দীঘি,খাল সবকিছু যেনো ধারার কাছে এক বিরাট আতংক। পুকুর,খাল,নদীর অথৈই পানি দেখলে ওর মস্তিষ্ক ওকে চেচিয়ে জানায়, ‘খবরদার যাবিনা, তোর এক ভাই কে খেয়ে ফেলেছে এই জল’
শহীদ মারা যাওয়ার পর থেকে টানা বছর খানেক ধারা ভুগেছে নানান অসুস্থতায়, ঐ যে পিঠোপিঠি হলে যা হয়, একটা চোখের আড়াল হলে অন্যটা ছটফট করে। সেদিনে সেই ছোট্ট ধারাও চোখের সামনে মেনে নিতে পারেনি ঘন্টা দুয়েক আগের জীবন্ত ভাই টাকে ঘন্টা দুয়েক পর ভেজাকাপড়ে দমহীন লাশে দেখতে।
একমাত্র ধারার জন্য ই শহীদের কোনো ছবি এ বাড়িতে চোখের সামনে না থাকলেও এই একটা ছবি ওয়াসিফের ঘরে রয়ে গেছে, তাও এমন একটা জায়গায় যেখানে সহজে কারো চোখ পড়বেনা। তবুও আজ ধারার চোখ পড়েছে। চোখে পড়তেই সেই চৌদ্দ বছর আগের অস্পষ্ট দৃশ্য গুলো অস্পষ্ট ভাবেই উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়ে।
আচমকা খট করে শব্দ হতেই কেঁপে উঠে ধারা পেছন ঘোরে, ততক্ষণে ছবির ফ্রেমটা ফ্লোরে পড়ে কাচটা তিন/চার খন্ড হয়।
ওয়াসিফ তাকিয়ে আছে ধারার দিকে। ধারা একবার ওয়াসিফ কে দেখে তো আরেকবার ভেঙে যাওয়া কাঁচের টুকরো গুলো দেখে। ওয়াসিফ কোনো কথা না বলে এগিয়ে এসে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে সেই কাঁচের ভাঙা টুকরো গুলো গুছিয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয়। ছবিটা কুড়িয়ে একটা ড্রয়ার টেনে রেখে দিয়ে তাকায় ধারার দিকে। ধারার চোখের পানি এখনো শুকোয়নি। ওয়াসিফ ওকে খেয়াল করে দেখেই বলে।
” সামান্য একটা ছবির ফ্রেম ভেঙেছে, এতে কান্না কাটির কি আছে? কাল আবার বাঁধিয়ে আনবো। একদম নতুন চকচক করবে দেখিস”
বিচক্ষণ ওয়াসিফ আজ ধরতে পারেনি এ কান্নার মানে। ধারা ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না থামিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে তবে শেষমেষ পেরে না উঠে ফুপিয়ে কেঁদে উঠতেই ওয়াসিফ হাতের কাজ ফেলে রেখে আবারও তাকায় ওর দিকে। কন্ঠে দৃঢ়তা বজায় রেখে জানতে চায়।
” তোকে বকেছি? তোকে মেরেছি”?
ধারা মুখে জবাব না দিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বোঝায়, যার অর্থ ” না”
ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে।
” তাহলে মাঝরাতে এভাবে নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলছিস কেনো”?
ধারা চুপচাপ বসে থাকে, মাঝে মধ্যে চেপে চেপে কান্না আটকানোর জন্য ওর গা মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে। ধারাকে চুপচাপ থাকতে দেখে ওয়াসিফ বলে।
” তোকে ঘুমিয়ে যেতে বলেছি কত আগে এখনো ঘুমাসনি কেনো”?
ধারা একহাতে চোখ মুছে নাক টেনে ভারি গলায় বলে।
” ঘুম আসেনি”
ওর কথা শুনে বিরক্তিকর দৃষ্টি সরিয়ে ওয়াসিফ নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। ও আসলে এতক্ষণ সামিরের সঙ্গে জরুরি কলে ছিলো। কথা শেষ করে ঘরে ঢুকে ওয়াসিফ খুঁজছে একটা সিম কার্ড এবং মেমোরি কার্ড। নিজের হাতে গতমাসে যাওয়ার আগে রেখে গিয়েছিলো কিন্তু তা সঠিক জায়গায় পাচ্ছে না দেখে হুট করেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে ওয়াসিফের। একে একে আলমারি, ওয়ারড্রবের ড্রয়ার গুলো ঘেটেঘুটেও যখন পেলোনা তখন ধারাকে জিজ্ঞেস করে।
” আমার ঘর থেকে কিছু নিয়েছিস”?
ওয়াসিফ জানে, ধারা ওর ঘর ঘাটাঘাটি করে না, তবুও মাথা কাজ করছেনা, সামনে পেলো ওকে সেভাবেই জিজ্ঞেস করলো। ধারা কান্নাকাটি থামিয়ে ওড়নায় নাক মুখ মুছতে মুছতে বলে।
” কি নেবো”?
ওয়াসিফ ওর কথার জবাবে কিছু না বলে আবারও আলমারি ঘাটে। একে একে সমস্ত জামা কাপড়, সবকিছু বিছানায় ফেলে রেখে হৈন্য হয়ে খুজতে থাকে। ধারা শুধু তাকিয়ে থেকে দেখে এই লোকের কর্ম।
ওয়াসিফ হতাশ, ভীষণ হতাশ হলো ও। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না ছোট দুটো জিনিস। অথচ ওর শিওর মনে আছে সাদা কাগজে মুড়িয়ে রেখেছিলো আলমারির ছোট্ট একটা কেবিনে। সেই জায়গাটা ফাঁকা, আলমারির চাবি ওর কাছেই থাকে। সহজে কেউ ওর আলমারি ঘাটে না। তাহলে গেলো কই জিনিস দুটো। ওয়াসিফকে অস্থির হতে দেখে ধারা জিজ্ঞেস করে।
” কিছু কি খুঁজছেন আপনি, কি পাচ্ছেন না কোনো জামা “?
ওয়াসিফ ঘুরে দাড়িয়ে ওকে বলে।
” তুই কি আমার আলমারি ঘেটেছিলি কখনো “?
” না তো, কেনো কি হয়েছে”?
” সত্যি করে বল আমি কিছু বলবোনা”
” আশ্চর্য, আমি আপনার ঘরের সীমানায় আজ এলাম বহুদিন পর, সেখানে আপনার আলমারিতে হাত দেওয়া তো অনেক দূরের কথা “
” তাহলে গেলো কই? পাচ্ছিনা কেনো”?
” কি কোথায় গেলো? কি পাচ্ছেন না”?
” জরুরি জিনিস “
” আমাকে বলুন”
” তোকে বললে কি হবে তুই কি ফু দিয়ে এনে দিবি”?
” আমি কি বলেছি আমি ফু জানি, ফু দিয়ে এনে দেবো”?
” তাহলে জিজ্ঞেস করছিস কেনো”?
” আমার কি দোষ? আপনি ই তো উল্টো আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন আপনার আলমারিতে হাত দিয়েছি কি না”
ওয়াসিফ স্থির হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মৃদু ধমকে বলে।
” পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে যাবি, অযথা পকপক করে আমার মাথা খাবিনা। মেজাজ এক দফা খারাপ হয়ে আছে, তোর জন্য আরেক দফা খারাপ হলে বাড়ির বাইরে ফেলে রেখে আসবো”
ধারা মিনিট খানেক চুপ থেকে বুঝলো আসলেই তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিছু একটা খুজতে খুজতে। ধারা পেছন থেকে আস্তে করে বলে।
” লাইট বন্ধ না করলে আমার ঘুম আসবেনা। আপনার যেহেতু অনেক কাজ আপনি কাজ করুন, আমি বরং আপার সঙ্গেই ঘুমাই”
কথা শেষ করেই ধারা যাওয়ার জন্য সবে দু কদম ফেলেছে এর মধ্যে খট করে সুইচ বন্ধ হতেই পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেলো। ধারা বুঝলোনা বিষয়টা ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই টের পেলো এক জোড়া শক্ত পোক্ত হাত ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছে নিজের সঙ্গে, ঐটুকু মুহূর্ত ধারা শক্ত হয়ে রইলো। ও টের পেলো লোকটার নিভে আসা কন্ঠস্বর ঠিক ওর কানের পাশ থেকে বলে উঠলো।
” এতো জ্বালাস কেনো আমাকে? একটু কি ভালো হওয়া যায় না মুমতাহিনা “?
ধারা আর কি বলবে, ও আপাতত আকস্মিক কাজে স্থির জমে গেছে। গা শক্ত করে রইলো। ওয়াসিফ ফের বলে।
” এমন শক্ত হচ্ছিস কেনো? গা ছাড়”
ধারা অস্ফুটস্বরে জানতে চাইলো।
” কারেন্ট কি চলে গেছে “?
” নাহ, আমি লাইট অফ করে দিয়েছি”
ধারা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সশব্দে ওয়াসিফের ফোন বেজে উঠতেই ওয়াসিফ ওকে ছেড়ে দিয়ে ফোনটা রিসিভ করে। ধারা কিছুটা সরে দাঁড়ায়। ঘর অন্ধকার কিছু ই দেখা যাচ্ছে না আপাতত। ওপাশ থেকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে সামির বলে।
” স্যার পেলেন?”
ওয়াসিফ গম্ভীর কণ্ঠে বলে।
” না, যেখানে রেখেছিলাম পাচ্ছি না “
” কোনো ভাবে কি হারিয়ে গেলো স্যার”
” মনে তো হচ্ছে না হারিয়ে গেছে বলে”
” তবে কি স্যার চুরি হলো”
” হতে পারে, শিওর নই, এখন রাখো, সকালে আপডেট জানাবো”
” আচ্ছা স্যার”
কলটা কেটে ফোনের ফ্লাশ অন ওয়াসিফ তাকায় পেছনে, দুইবার ডাকে।
” মুমতাহিনা “!
” মুমতাহিনা “!
দ্রুত গিয়ে ঘরের লাইট অন করে দেখে ঘরের কোথাও ধারা নেই। যা বোঝার বুঝলো ওয়াসিফ। এই মেয়ে সুযোগ বুঝে পালিয়েছে। দরজার কাছে দাড়িয়ে ওয়াসিফ নিজেই নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করে বলে।
” এই মেয়ে কত বড়ো ধুরন্ধর, এ তো আমাকে এক হাটে কিনে অন্য হাঁটে বেঁচে দেবে”
চলবে
নিয়মিত গল্প দেওয়া আমার দায়িত্ব অবশ্য নিয়মিত হবো। কিন্তু পাঠক হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব গল্পের পর্ব গুলো পড়ে রেসপন্স করা। যে বা যারা গল্প পড়ছেন অবশ্যই লাইক কমেন্ট করে যাবেন এতে আমার লেখার উৎসাহ বাড়ে।
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ২য় অংশ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৫
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১১
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১০