Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১


“ আমি বিয়ে করবোনা আপনাকে”
ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ধারা স্পষ্ট করে কথাটা ওয়াসিফকে বলে দেয়। সূঁচালো স্থির দৃষ্টি ফেলে ওয়াসিফ তাকিয়ে দেখে পাঁচ ফুট উচ্চতার মেয়েটিকে। পাতলা গড়নের শরীরটা যেখানে একটু হাওয়া লাগলেই ধপাস করে পড়ে যাবে সেখানে ওতোটুকু শরীরের রাগের ঝাঁঝ দেখে একটুও বিচলিত হয়না ওয়াসিফ। বরং গম্ভীরতা সহিত কঠোর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে।

“ সমস্যা কি? কোথায় সমস্যা? খুলে বল”?

ধারার মেজাজ বাড়ে হিড়হিড় করে, চোটপাট বলে দেয়।

“ কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন মনে করছিনা আপনাকে”

ধারার রাগ, মেজাজ আজ যতোটা তার বিপরীতে ওয়াসিফ ঠিক ততটাই নিজেকে শান্ত রেখেছে। কন্ঠে গম্ভীরতা খাদ মিশিয়ে বলে।

“ কিন্তু তোকে এখন আমি একটা চড় মারার প্রয়োজন মনে করছি”

“ মারলে মারুন। তবুও আপনাকে আমি বিয়ে করবোনা”

“ আমার হাতে সময় খুব কম মুমতাহিনা, তোর এই অহেতুক বকবক নিতে পারছিনা”

“ আপনাকে কেউ নিতে বলেনি, কেনো এসেছেন আপনি? দূরে থাকুন আমার থেকে, যেমন বিগত এক বছর ছিলেন। আমি খুব শান্তিতে ছিলাম। এসেছেন ভালো কথা আমার পিছনে লেগেছেন কেনো? আপনার মতো একজন মানুষের নিশ্চয় এই দুনিয়ায় বিয়ে করার জন্য মেয়ের অভাব পড়বে না। আমার মতো মুমতাহিনা সেখানে অযোগ্য, আপনার পাশে মানায় না। আপনি ফিরে যান শাহেদ ওয়াসিফ। আপনাকে বিয়ে আমি করবোনা”

ওয়াসিফ স্থির চোখে তাকিয়ে আছে ধারা দিকে। রাগ যে ভেতরে ভেতরে ওর হচ্ছে না ব্যাপারটা মোটেও এমন না। যথাসম্ভব চেষ্টা করছে নিজেকে সামলে রাখতে। সেই তখন থেকে মেয়েটা সমান তালে মুখে মুখে তর্ক করেই যাচ্ছে। ওয়াসিফ ধীর কন্ঠে প্রশ্ন ছোড়ে।

“ তাহলে বছর চারেক আগে আমাকে কেনো বলেছিলি ‘ আপনি আমার চাচাতো ভাই না হলে আপনাকেই আমি সাহস করে বলতাম, আপনাকে আমি ভালোবাসি’ বল কেনো বলেছিলি”?

“ বয়সের দোষে বলে ফেলেছিলাম, ছোট ছিলাম ওতো কিছু বুঝে বলিনি, হয়েছে? আপনিও তো আমাকে কতকিছু বলেছিলেন কই আমি তো কিছু মনে রাখিনি, সব ভুলে গেছি আপনিও ভুলে যান”

কথার এই পর্যায় এসে ওয়াসিফ সম্পূর্ণ মেজাজ হারিয়ে চেচিয়ে ওঠে।

“ যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন সেটাই হবে যেটা আমি চাইবো”

আজ যেনো ওমন গর্জে ওঠা ধমকে একটুও ভীতু হলোনা ধারা। বরং তাচ্ছিল্যের সুরে বললো।

“ আপনার অনেক ক্ষমতা, চাইলেই আমি রাজি না হওয়ার পরও আপনি পারেন বিয়ে করতে। তবে বিশ্বাস করুন এখন আমাকে বিয়ে করলে আপনি একটা কাঠের পুতুলকে বিয়ে করবেন। যেখানে আর কখনো কোনো অনুভূতিরা বাসা বাঁধবে না। ঐ যেমন বাজারে কিনতে পাওয়া কাঠের পুতুল গুলো, দেখতে শোভা পায় কিন্তু কোনো কাজের না”

“ দেখতে শোভা পেলেই হবে, কাজ পরে হলেও চলবে”


ঐ যে মানুষটা সেবার চলে গেলো। ফিরলো একটা বছর কাটিয়ে। ফিরলো এক নতুন উদ্যোমে। সেদিনের পর ধারা ভেবে নিয়েছিলো এই মানুষটা আর যাইহোক ওর মুখোমুখি বা এই বিষয়ে তাদের মধ্যে আর কখনো কোনোদিন ও কথা হবেনা। দুজনের জীবনে ভিন্ন দুটো পথ হবে। কিন্তু ওর সব চিন্তা ভাবনাকে তুড়িতে উড়িয়ে লোকটা ফিরলো, শুধু ফেরেনি, ঘটা করে পরিবারের কাছে তার বাবার কাছে এসে বিয়ের প্রস্তাব রাখলো। এমন প্রস্তাবে ধারার পাশাপাশি চমকেছে এবাড়ির প্রতিটা সদস্য। ‘ এমন এক প্রস্তাব যেনো কেউ কখনো কোনোদিন ঘুমের ঘোরেও ভুল করে দেখেনি, সেই প্রস্তাব সত্যি সত্যি পেয়ে এবাড়ির মানুষগুলো ভীষণ হতবাক হয়েছিলো কয়েক মুহূর্ত’ তাদের এই ঘোর কাটে শাহেনূর বেগমের কথায়। ধারার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন।
“ মেয়ে তো আমাদের ই, মেয়ে যখন হয়েছে বিয়ে একদিন না একদিন দিতেই হবে। তবে সেই পাত্র যদি ওয়াসিফ হয় সেখানে আপত্তি করো না, মেয়েটা আমাকে দেও, আমি শুধু ছেলের বৌ হিসেবে ধারাকে চাচ্ছিনা, নিজের মেয়ে হিসেবে চাচ্ছি। ও তো এবাড়িতেই তোমাদের মেয়ে হয়েই থাকবে,অমত করোনা।”
ধারা বাবা আর কি বা বলবেন, ওয়াসিফ তার আপন বড়ো ভাইয়ের ছেলে। তারপর পেশায় সেনাবাহিনীর মেজর, এখানে ‘না’ শব্দটা উচ্চারণ তার মুখে আসেনি। এখনকার দিনে এমন পাত্র নিজ ঘরের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া মানে বোকামি করা। ধারার আম্মা ও চাইলেন হোক তবে এই বিয়ে। আপত্তির কোনো কারণ নেই এখানে। নিজেদের বাড়ির এমন ছেলেকে কে না চাইবে মেয়ের জামাই হিসেবে।


ওঘর থেকে বের হতেই দেখে লুইপা ঘরে ঢুকছে। ওয়াসিফ ওকে ডাকে।

“ এই তুই, শুনে যা”

এই অসময় ভাইজানের ডাক শুনে ও ঘাবড়ে যায়, কি বলবে? ডাকছে কেনো?

লুইপা এসে দাঁড়াতেই ওয়াসিফ ওকে বলে।

“ মুনিবের সঙ্গে এখনও কথা হয় তোর”?

লুইপা ঢোক গেলে। এইবার বাড়িতে এসে লোকটা মিনিটে মিনিটে ওদের কেনো চমক দিচ্ছে। গতকাল ফিরে এসেই ধারাকে দিলো বিয়ের প্রস্তাব এখন আবার ওকে ডেকে মুনিবের কথা জিজ্ঞেস করছে। লুইপাকে চুপ করে থাকতে দেখে ওয়াসিফ বলে।

“ চাকরি হয়েছে কোনো”?

লুইপা সাহসে সাহসে বললো।

“ শুনেছিলাম হয়েছে”

“ ওটাকে বলে দিবি, আজ কালকের ভেতরে পরিবার নিয়ে এসে তোকে দেখেশুনে যেতে, প্রেম করে এবাড়ির বদনাম রটাতে পারবিনা।বুঝতে পেরেছিস?”

লুইপা চোখ পিটপিট করে চেয়ে আছে ভাইজানের দিকে। মনে মনে ও নিজেই নিজেকে বলে।
এই লোকের নিজের বিয়ের ভূত মাথায় চেপেছে বলে কি সবাই কে ধরে বেঁধে বিয়ে করিয়ে দেবে নাকি?

“ ওভাবে তাকিয়ে কি দেখছিস”?

“ কিছু না ভাইজান”

কিছুসময় চুপ থেকে ওয়াসিফ জিজ্ঞেস করে লুইপার কাছে।

“ কি সমস্যা ওর? বিয়ে করবেনা বলে জেদ ধরেছে কেনো? ওর কি কোনো ছেলে সাথে কিছু আছে”?

সঙ্গে সঙ্গে লুইপা দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলে।

“ না, না, ওর কেউ নেই। এই দিকটাতে সন্দেহ করলে তুমি ফেল খাবে”

হঠাৎ ওয়াসিফ একটা হাত আদর সুলভ লুইপার মাথায় রেখে বলে।

“ ছোট বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে মন খারাপ করিসনা। তোর আর মুনিবের বিষয় নিয়ে আমি চাচার সঙ্গে কথা বলবো। তোকে ওখানে বিয়ে দিতে না চাইলেও আমি দেখবো বিষয়টা। তুই মুনিবকে শুধু ওর ফ্যামিলি নিয়ে আসতে বল। বড়দের সঙ্গে বড়োরা কথা বলুক আগে”

“ আচ্ছা ভাইজান, তাহলে যাই”?

“ যা”

লুইপা উল্টো ঘুরে কদম ফেলতেই ওয়াসিফ ডাকে।

“ শোন! ওটাকে একটু বোঝা, আমার হাতে সময় খুব কম। ও যেনো নাটক একটু কম করে”


‘ মেজর ওয়াসিফ বলছি’

‘ তোমার ছুটির দরখাস্ত না হওয়ার পরও তুমি এভাবে ছুটি কাটাতে পারোনা ওয়াসিফ’

ফোনের ওপাশে থাকা কন্ঠস্বরের নিরুত্তাপ ফুটে উঠেছে তার কথায়। ওয়াসিফ লম্বা দম ফেলে ধীর কন্ঠ তবে গম্ভীর হয়ে বলে।

‘ আমি দুঃখিত! তবে আমি খুব শীঘ্রই ফিরবো’

‘ তোমার মতো একটা মানুষের কাছ থেকে এরকমটা কখনো আশা করিনা ওয়াসিফ। এই ধরনের মনোবল নিয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য থেকে পালিয়ে যেতে পারোনা’

‘ আমি পালিয়ে যাইনি স্যার, আমি পালাবার জন্য এ পেশায় যুক্ত হয়নি।’

‘ তুমি চেচিয়ে বললেও তোমার ডিপার্টমেন্টের সেনারা বুঝেছে মেজর শাহেদ ওয়াসিফ ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। তোমার এভাবে চলে যাওয়াটা ওরা মানতে পারছেনা’

‘ আমি ফিরবো স্যার’

‘ কবে? কখন’?

‘ আগামীকাল ফিল্ডে আমাকে পাবেন’

‘ আর যদি না পাই’

‘ তবে আপনাদের ধারণা সত্যি হবে, ওয়াসিফ সত্যি ই পালিয়েছে’

‘ আই হোপ! এরকম যেনো না হয়। তুমি জানো এই মিশনটা আমাদের জন্য দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ’

‘ ইয়েস স্যার’

‘ রাখছি’

‘ আল্লাহ হাফেজ’

ফোন কল কেটে ইজি চেয়ারটাতে গা এলিয়ে বসে ওয়াসিফ। ফোনের সাইড বাটন চেপে সময় দেখে রাত সোয়া দুটো।
ফোনের কল লিস্টে ঢুকে কল দিতেই ওপাশ থেকে কেউ কলটা রিসিভ করতেই ওয়াসিফ অন্যসব কথা বাদ দিয়ে বলে।

‘ কাজী নিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতে আয়’

ঘুমের মধ্যে আচমকা এমন জরুরি তলব দেখে ওপাশে থাকা সারহান হতবাক, চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো বেচারা। ঘটনা কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা। সারহানের গ্রামের বাড়ি আর ওয়াসিফের গ্রামের বাড়ি একই জেলার পাশাপাশি দুটো গ্রামে। বেচারা লম্বা ছুটি পেয়ে বৌ নিয়ে সবে এসেছে বেড়াতে। ও বলে।

‘ তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে ওয়াসিফ? এতো রাতে কাজী ডেকে কি করবি’

খুবই শান্ত কন্ঠে ওয়াসিফ জবাব দেয়।

‘ বিয়ে করবো’

‘ কাকে’?

‘ মুমতাহিনা কে’

এবার সারহান গা কাপিয়ে হো হো করে হেসে উঠে বলে।
‘ ভাই বিয়ে করবি তবে ধীরে সুস্থে কর, মেয়ে তো আর তোর বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে না। তোরই চাচাতো বোন..’

সারহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ওয়াসিফ চেচিয়ে ওঠে।

‘ আহাম্মক! আমার ছুটি কি তোর দাদা এসে দিয়ে যাবে? আমার হাতে সাত ঘন্টা সময় আছে সারহান। এর মধ্যে বিয়ের ঝামেলা মিটিয়ে আমাকে ফিরতেই হবে। যে কোনো মূল্যে’

সারহান নরম সুরে সাহস করে বলে বসলো।

‘ ভাই, পরের ছুটিতে বিয়েটা..’

‘ নো’

‘ ওকে, কিন্তু এতো রাতে কাজী কই পাবো আমি’?

‘ ম্যানেজ কর, এতোরাতে আসতে না চাইলে এমাউন্ট বাড়িয়ে দিস’

ওয়াসিফ কল কাটতেই সারহান জলদি বিছানা ছেড়ে উঠেই রেডি হয়। এতো রাতে সারহানকে রেডি হতে দেখে ওর ওয়াইফ ইরিনা বলে।

‘ কে কল করেছিলো? এতো রাতে কোথায় যাও তুমি ‘?

সারহান শার্টের বোতাম দিতে দিতে বলে।

‘ যাচ্ছি এক পাগলের সঙ্গে সায় দিয়ে নিজেও পাগল হতে’

ইরিনা বুঝলোনা হেয়ালি কথা।

‘ কিসব বলো’?

‘ ফিরে এসে বিস্তারিত বলছি, আপাতত হাতে সময় নেই। তবুও শুনো, মেজর শাহেদ ওয়াসিফের বিয়ে দিতে যাচ্ছি’

ইরিনা অবাক হয়,

‘ এতো রাতে কে বিয়ে করে ‘?

‘ ঐ পাগল করবে’
সারহান বিছানা থেকে ফোন তুলে পকেটে নিতে নিতে বলে।

‘ সাবধানে থেকো। আমি সকালের দিকে ফিরবো।’
বলেই হনহন করে বেরিয়ে যায় সারহান, তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ তাড়াহুড়ো তার মধ্যে। ইরিনা হাই তুলে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলে।

‘ এমন পাগল লোকও মেজর হতে পারে আগে তো জানা ছিলো না’


হুট করেই বলিষ্ঠ দেহ চেয়ারটা ছেড়ে উঠেই লম্বা কদমে পা ফেলে। মায়ের ঘরের সামনে দাড়িয়ে চওড়া গলায় ডাকে।

‘ আম্মা’
‘ আম্মা!’

দুটো ডাক কানে যেতেই ঘুম ভেঙে উঠে শাহেনূর দরজা খুলতেই ওয়াসিফ বলে।

‘ খুব বেশি আয়োজন করার মতো সময় তোমাদের দিতে পারছিনা বলে দুঃখিত। আমি বিয়েটা এখনই করবো। মুমতাহিনা কে ডেকে ওঠাও’

চলবে

মেজর_ওয়াসিফ

সূচনা_পর্ব

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply