Golpo romantic golpo মেঘের ওপারে আলো গল্পের লিংক

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৮


#মেঘের_ওপারে_আলো

#পর্ব_২৮

#Tahmina_Akhter

চট্টগ্রাম শহরের আনাচেকানাচে ঘোরাঘুরি করার পর রাত দশটার দিকে বাড়িতে ফিরে আসে ওরা দু’জন। মেঘালয় বাইক থেকে আলোকে নামিয়ে দেয় বাড়ির মূল ফটকের সামনে। আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ততক্ষণে মেঘালয় গ্যারেজে বাইক রেখে চলে এলো। আলোর হাতটা ধরে বলল,

তোমার শ্বাশুড়ি এখন আমাকে অনেক বকবে। বাট তুমি এসবে পরবে না। সোজা আমাদের রুমে চলে যাবে।

কথাগুলো বলতে বলতে মেঘালয় হেসে ফেলল। যেন সে দারুন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। আলো বোকার মত তাকিয়ে রইল। মানুষটার এত রুপ! যাকে কখনো কখনো মনে হয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। কখনো মনে হয় সে দুষ্টুমিতে মেতে থাকা একজন টিনএজ ছেলে।

ওরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।

আলো সামনে আর পেছনে মেঘালয়। মাহরীন এবং মাশফি ড্রইংরুমে বসে ছিল। ওদের দুজনের পায়ের প্রতিধ্বনি শুনে মাহরীন এবং মাশফি ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। আলো ঢোক গিলল তারপর মেঘালয়ের দিকে তাকালো। মেঘালয় চোখের ইশারায় আলোকে রিল্যাক্স থাকতে বলল এবং ঘরে চলে যেতে বলল। কিন্তু, আলো নাছোড়বান্দা। সে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো যে যাবে না। অগত্যা মেঘালয় কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেঁটে গিয়ে মাহরীনের পাশে গিয়ে বসল। মাহরীন মেঘালয়ের কান টান দিয়ে বলল,

—পাঁজি ছেলে! এমন অবস্থায় কেউ বাইকে উঠায় বউকে? আবার ছয়ঘন্টার মত বাইরে ছিলি! মানে তোর কি বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে, মেঘ?

মেঘালয় হাসতে হাসতে তার কান টেনে ধরে রাখা মাহরীনের হাতের ওপর হাত রেখে বলল,

— প্রেম তো কখনো করিনি! তাই মন চাচ্ছিল প্রেম প্রেম খেলা করি। তাও আবার তোমার মেঘালয়ের বউয়ের সঙ্গে।

মেঘালয়ের শেষ কথাটি শুনে মাহরীন, মাশফি হেসে ফেলল। আলো ঠোঁট কামড় দিয়ে হাসি চেপে রাখল। ঠোঁটকাটা মানুষ একটা! কখন কি বলতে হয়, এটাও জানে না!

—————-

দুদিন পর,,

মাহরীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্য বাসা থেকে বের হয় আলো। মেঘালয় হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরেনি এখনও। কলেজ ছুটি হবার সময় পেরিয়ে এখন প্রায় বিকেল তিনটা। মাহরীন আলোর নাম্বারে বেশ কয়েকবার কল করল। কিন্তু, আলো কল রিসিভ করছে না। মাহরীন দিশেহারা বোধ করছে। বাড়িতে মাশফি নেই। এদিকে মাহরীনের শরীর তেমন সুস্থ না। তবুও, আলোর খোঁজে বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হলো মাহরীন। কলেজের সামনে এসে গাড়ি থামার পর মাহরীন গাড়ি থেকে কলেজের ভেতরে গিয়ে আলোর খোঁজ খবর নিলো। অথচ, খবর পেলো আলো কলেজ থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় আধঘন্টা সময়ের আগে। এসব শুনে মাহরীনের যেন দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। মোবাইল ফোন ব্যাগ থেকে বের করে মেঘালয়ের কাছে কল করলো।

মেঘালয় তখন হসপিটালের করিডর ধরে দোতলার দিকে যাচ্ছিল। এমনসময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মেঘালয় রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর, এপ্রোনের পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,তার মায়ের কন্ঠস্বর।

—আলো, এখনও বাসায় ফেরেনি। আমি কলেজসহ আশেপাশের দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়েছি। আলো ছুটি হওয়ার আর আধঘন্টা আগে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি এখন কি করব মেঘালয়? আলো কল রিসিভ করছে না। আলোর মায়ের কাছে কল করেছিলাম। সিতারা আপা তো বললেন, আলো সেখানেও যায়নি।

মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে গেছে। মাহরীনকে কিছু বলার সাহস যেন নিজের মধ্যে সঞ্চয় করতে পারছে না। মেঘালয়ের দিক থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে মাহরীন কল কেটে দিলো। মেঘালয় এক হাত দিয়ে কপালের চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে পেছনে ঘুরে দাঁড়াতেই, কেউ মেঘালয়ের খুব সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

— ডাক্তার সাহেব, সঙ্গে আমার মোবাইল আনিনি। আপনাকে খুঁজে বের করতে আমার যে কি কসরত করতে হলো!

মেঘালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আলো অনবরত কথা বলেই যাচ্ছিল। মেঘালয় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আলোর দিকে। মানে সে বিশ্বাস করতে পারছে না যে, তার

সামনে আলো দাঁড়িয়ে আছে।

— কি হলো? কথা বলছেন না যে! আমি হসপিটালে আসাতে রাগ করলেন?

মেঘালয় আশেপাশে তাকালো। দেখল দুয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ নেই এখন এই দিকটায়। আলোর হাত ধরে খুব কাছে এনে দাঁড় করালো। তারপর, ফিসফিস করে বলল,

— পাব্লিক প্লেস যদি না হত তাহলে তোমাকে…

বাকি কথা বলতে পারল না মেঘালয় তার আগেই আলো মেঘালয়ের ডানহাত ধরে বলল,

—জন্মদিনের শুভেচ্ছা, আমার ডাক্তার সাহেব।

মেঘালয় অবাক হয়ে তাকালো আলোর মুখের দিকে। একের পর এক সারপ্রাইজ যে তার হজম হচ্ছে না। দুটো ঢোক গিলে আলোর হাতটা মুঠোয়ে নিয়ে বলল,

— তোমার অনুপস্থিতিতে আমি ভীষণ দূর্বলতা অনুভব করি, মিথ্যাবতী!

আলো মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার শুকনো মুখটা যেন তার অস্থিরতা সাক্ষী। আলোর ইদানিং নিজের ভাগ্যকে নিয়ে ঈর্ষা হয়! মেঘালয়ের মত মানুষ যে তার হবে কখনো, সে তো কল্পনাও করেনি। কারণ, মেঘালয়ের মত মানুষ তার যোগ্যতার বাইরে ছিল।

———–

আলো এবং মেঘালয়ের এর পরের দিনগুলো ভীষন ব্যস্ততায় কেটে যেতে লাগল। আলোর এইচএসসি পরীক্ষা সামনে। মেঘালয়ের ইন্টার্ণের প্রায় ছয়মাস অতিক্রম হয়ে গেছে। তাই সামনের মাসগুলোতে ব্যস্ততা ক্রমশ বাড়ছে। তানিয়া দেশে ফিরে এসেছে পনেরোদিন আগে। তানিয়া দেশের আসার একসপ্তাহ পর মাশফি মাহরীনকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যায়। সেখানে যাওয়ার পর মাহরীনের চিকিৎসা শুরু হয়ে গেছে। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। মেঘালয় যখন বাড়িতে না থাকে তখন একা বাড়িতে দু’জন গর্ভবতী নারী গুটুর গুটুর আলাপ করে। তানিয়া ইনিয়েবিনিয়ে তার বাবার বাড়িরর দিকে ঐশ্বর্য নিয়ে আলাপ করে। আলো নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করে তখন। আবার মাঝে মাঝে আলোর পড়াশোনায় সাহায্য করে তানিয়া। রান্নাবান্নার দিকটা কাজের মহিলা দুজন সামলায়। তানিয়া রান্নাবান্নার ধার কাছে যায় না। আর আলো বাধ্য হয়ে যেতে পারে না। তার মর্নিং সিকনেস এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, সে মেঘালয়কে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। মেঘালয় মাঝেমধ্যে আলোকে জোর করে বুকের মাঝে চেপে ধরে, আলো বাঁধন থেকে মুক্ত হতে চাইলে মেঘালয় আরও শক্ত করে আলোকে চেপে ধরল। তারপর, মৃদু হেসে বলে,

— নাকটা চেপে ধরো একমিনিটের জন্য। তুমি খালি নিজের দিকটা ভাবো! আমার দিকটা ভাববার জন্য কে আছে, আলো?

আলো মেঘালয়ের বুকের মাঝে সত্যি সত্যি নাক চেপে ঘাপটি মেরে রয়। মানুষটার কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য যে, সে সবসময় মুখিয়ে থাকে।

———-

ধীরে ধীরে পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসে। আগামীকাল এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। আলো সেই যে সন্ধ্যা থেকে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসেছে এখন রাত এগারোটা। এখনও আলো বসে আছে। মেঘালয় হসপিটাল থেকে ফিরে এসেছে। রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো আলো বই পড়ছে। মেঘালয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে আলো ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। দু’জনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। মেঘালয় মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,

— বাবুর আম্মু কি পড়াশোনার চাপে বাবুর কথা ভুলে যাচ্ছে নাকি?

মেঘালয়ের কথা শুনে ঘাড় ফিরিয়ে বইয়ের ওপর দৃষ্টি রেখে জিভ কাটল। কপালে একহাত রেখে চুপচাপ বই পড়ার ভান করে বসে রইল। মেঘালয় আলোর নির্লিপ্ততা দেখে বুঝতে পারল তার বোকা বউয়ের বোকামি। কোনোমতে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলো। তারপর, আলোর সামনে গিয়ে আলোর হাত টেনে ধরে বলল,

— চলো, এখন আমার সঙ্গে। খাওয়াদাওয়া আগে তারপর বাকি সবকিছু। তুমি এতটা হেয়ালি কেন?

আলো মাথা নীচু করে বলল,

— সরি।

— এই অবস্থায় সরি কি কাজে লাগবে, বলো? হসপিটালে আজ কি হয়েছে জানো? একটা গর্ভবতী নারীর গাফিলতির কারণে তার বাচ্চা পেটে মারা গেছে। অথচ, সেই নারী টেরও পায়নি তার বাচ্চা পেটে মারা গিয়েছে। একজন সাতমাসের গর্ভবতী মহিলা গর্ভে বাচ্চার নড়াচড়া নাকি টের পায় না! ফর গড সেইক আলো, আমাদের বাচ্চার কোনো সমস্যা যাতে না হয়। বি কেয়ারফুল। পড়াশোনা করো তবে রাত জেগে নয়। সময়মত খাওয়াদাওয়া করো। ঔষুধ খাবে, হাসিখুশি থাকবে। দ্যাটস ইনাফ ফর ইউ।

মেঘালয় কথাগুলো বলার সময় আলোর একগালে হাত রাখে। আলো মেঘালয়ের হাতের ওপর হাতটা রেখে বলল,

— আপনার বাবুর খেয়াল আমি রাখব৷ কারণ, বাবুর বাবা আপনি হলেও বাবুর মা কিন্তু আমি।

মেঘালয়ে দুরুদুরু বুকে আলো কপালে চুমু দিয়ে মেঘালয় বলল,

—চলো, রাতের খাবার খেয়ে আসি।

আলোকে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে রেখে মেঘালয় চলে রান্নাঘরে। ফ্রিজ খুলে খাবার বের করে, চুলায় গরম করল। তারপর,টেবিলে এনে রাখল। গরম করা খাবারের ভ্যাপসা গন্ধে আলোর গা গুলিয়ে উঠল। নাকের ওপর ওড়না চেপে উঠে দৌঁড় দিলো বেসিনের দিকে। মেঘালয় সবে চেয়ারে বসেছিল কিন্তু আলোর অবস্থা দেখে থম মেরে রইল কিছুক্ষণ। তারপর, আলোর কাছে এগিয়ে যায়। আলো ততক্ষণে বমি করে অবস্থা খারাপ। মুখে পানির ছিটা দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মেঘালয় আলোর পেছনে এসে দাঁড়ালো। আলো পেছনে ফিরল। মেঘালয়কে দেখে কোনোমতে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,

— আপনি আবার উঠে এলেন কেন?

মেঘালয়ের জবাব দিতে ইচ্ছে করে না। মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া যে সহজ বিষয় না ইদানীং টের পাচ্ছে মেঘালয়। বইয়ে যতটা পড়েছে তার চেয়েও বেশি অনুভব করতে পারছে আলোকে দেখে।

একজন মা সন্তান গর্ভে এলেই মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু, একজন পিতা সন্তান পৃথিবীর আলোর দেখার পর পিতৃত্বের স্বাদ পায়।

একজন মা যদি তার দেহে ক্ষয় করে সন্তানকে গর্ভে জায়গা দিতে পারে তাহলে একজন বাবা সেই সন্তানকে দুনিয়ার বুকে নিজের পায়ের দাঁড় করাতে,নিজের শরীরের ঘাম, রক্ত পানি করে পরিশ্রম করতে পারে।

মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আলো ভাত খেলো না। একগ্লাস দুধ এবং আপেল একটা খেয়ে ঘুমাতে চলে গেল।

সেই রাতে মেঘালয়ের ঘুম এলো না অকারণেই। মেঘালয়ের মনে কু ডাকছিল। ওর বারবার মনে হচ্ছিল যে, ওর মায়ের কিছু হয়েছে। মেঘালয় অস্থির হয়ে মাশফির নাম্বারে যখন কল করল তখন ইন্ডিয়ার স্থানীয় সময় রাত দুটো। এত রাতে মেঘালয়ের কল এসেছে দেখে মাশফি ধড়ফড়িয়ে উঠে। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো মেঘালয়ের চিন্তির সুরে বলা কথা,

— মা, কেমন আছে ভাইয়া? আমার এত অস্থির লাগছে কেন? মনে হচ্ছে আমার কলিজা কে যেন বের করে আনতে চাইছে?

মেঘালয়ের কথা শুনে মাশফি তাকে আস্বস্ত করতে বলল,

— আম্মা ঠিক আছে। তুই দুশ্চিন্তা না করে ঘুমিয়ে থাক।

— ঘুম আসছে না, ভাইয়া।

— আল্লাহ ভরসা৷ কিছুই হবে না। ঘুমিয়ে পর গিয়ে। ইনশাআল্লাহ আম্মা সুস্থ হয়ে যাবে। ডাক্তাররা আশা দিয়েছে।

মাশফি মেঘালয়কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কল কেটে দিলো। মেঘালয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। এমন অস্থিরতা এর আগে সে কখনো অনুভব করেনি!

মেঘালয় রুমে ফিরে আসে। বিছানায় গিয়ে বসল। বারান্দা দিয়ে চাঁদের আলো ঘরে আসছে। চাঁদের আলোয়ে মেঘালয়ের আলোর মুখটা স্পষ্ট হয়ে যায়। মেঘালয় আলোর মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর, দৃষ্টি যায় আলোর বাড়ন্ত গর্ভের দিকে। চারমাসের প্রেগন্যান্সি চলছে আলোর। হুট করে মনে এক ভয়ংকার খেয়াল এলো।

মেঘালয় অস্থির হয়ে যায়। অস্থিরতা কমাতে সে মরিয়া হয়ে যায়। কিন্তু, অস্থিরতা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply