#মেঘের_ওপারে_আলো
#পর্ব_২৭
#Tahmina_Akhter
এমনসময় মেঘালয়ের মোবাইলে কল এলো। মেঘালয় কল রিসিভ করে কথা বলছিল। আলো এই ফাঁকে ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নাকফুলের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বেশ আনকমন একটা ডিজাইন! কোথায় পেয়েছে কে জানে?
মেঘালয় কথা শেষ করে এসে আলোর পেছনে দাঁড়িয়ে বলল,
— পছন্দ হয়েছে?
— হুম৷
আলো চিরুনি হাতে নিয়ে জবাব দিলো। মেঘালয় আলোর পেছন থেকে সরে এসে খাটের ওপরে গিয়ে বসল। তারপর, বারান্দার ওপর দৃষ্টি রেখে বলল,
— তোমার এই নাকফুলটা নিয়ে ছোট একটা গল্প আছে। অন্য একদিন বলব৷ তবে এটুকু জেনে রেখো, আজ একজন ভদ্র মশাইয়ের সঙ্গে সেই লেভেলের তর্কাতর্কির পর, তোমার জন্য এই নাকফুল আমি কিনতে পেরেছি।
আলো চুলের ওপর চিরুনি চালানো বন্ধ করে, পেছনে ফিরে মেঘালয়ের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— একটা নাকফুল নিয়ে কেন তর্ক করতে গেলেন?
— বললাম না, অন্য একদিন বলব। এখন, এসো তো নীচে। খাবার খেয়ে আসি। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি, পেটে খাবার নেই।
————-
মেঘালয় খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে রইল রুমে এসে। আলো তার বই নিয়ে বারান্দায় গিয়ে পড়তে বসল। পুরো একঘন্টা পড়াশোনা করার পর আলোর মাথা ধরে গেল। বই খাতা ঘরে এনে গুছিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। তারপর, গোসল সারল। আজ কেন জানি শাড়ি পরার ইচ্ছে জাগল আলোর । ধূসর রঙের শাড়ি ওয়্যারড্রব থেকে বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে পরল। শাড়ি পরতে পরতে হুট করে বিয়ের আগের একটা ঘটনা মনে পরল আলোর। মেঘালয়ের সঙ্গে তার তৃতীয়বার দেখার হবার দিনের কথা। ওরা দুজন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিল সেদিন। শাড়ির কুঁচি করার সময় আলো হেসে ফেলল আনমনে। সবগুলো কুঁচি সেদিন তার হাত থেকে বাঁধনহারা হয়ে মেঝেতে অনাদরে গড়াগড়ি খাচ্ছিল!
শাড়ি পরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো আলো। ড্রেসিংটেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। আয়নায় নিজেকে দেখল। চোখের কোলে কাজলরেখা টানল। তারপর, শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দিলো। মেঘালয়কে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আলো।
ড্রইংরুমে আসতেই আজ মাশফির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আলোর। মাশফি আলোকে দেখে হেসে বলল,
— কেমন আছো?
— ভালো আছি, ভাইয়া।
আলো মাশফির কথার জবাব দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। মাহরিনের হাত থেকে ভাতের বোল নিয়ে আলো বলল,
— আম্মু, আপনি গিয়ে টেবিলে বসুন। আমি নিয়ে আসছি।
মাহরীন আলোর থাকে ভাতের বোল কেড়ে নিয়ে বলল,
— তুই নিজেকেই তো সামলাতে পারছিস না। তুই গিয়ে চুপচাপ বস। আরেকটা কথা বললে আমার হাতের মাইর খাবি।
মাহরীনের রাগ চণ্ডী রুপ দেখে আলো মাথা নীচু করে হেসে ফেলল। তারপর, চুপচাপ টেবিলে গিয়ে বসল। মাহরীন আরও দু’জন হেল্পিং হ্যান্ডের সাহায্যে নিয়ে সবকিছু এনে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখল। মাশফি, আলোকে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দিয়ে তবেই মাহরীন খেতে বসল। খাওয়াদাওয়া শেষ হবার পর ওরা তিনজন মিলে ড্রইংরুমে গিয়ে সোফায় বসল। মাশফি মাহরীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— আম্মা, একটা খুশীর সংবাদ বলি?
মাহরীন অবাক হয়ে মাশফির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— বল?
— তানিয়া ইজ প্রেগন্যান্ট! ফাইভ মান্থস।
মাশফির কথা শোনার পর মাহরীন এবং আলো দুজনেই মুখে হাত রেখে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই, হাসি ফুটে উঠল তাদের ঠোঁটের কোণে। মাহরীন হাত বাড়িয়ে দিলো মাশফির দিকে। মাশফি উঠে এসে মাহরীনের হাত ধরে দাঁড়ালো। মাহরীনের চোখের জল টুপ করে পরল। মাশফি এবং আলো মাহরীনকে কিছু বলবে তার আগেই মাহরীন চোখের পানি একহাত দিয়ে মুছে বলল,
— আমার এত খুশি লাগছে কেন, আজ? মনে হচ্ছে মরে যাওয়ার আগে সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা আমার পূরণ হবে!
মাশফি মাহরীনের হাত ধরে নরম সুরে বলল,
— আপনার কিছু হবে না, আম্মা। আপনাকে ইন্ডিয়ায় যাওয়ার সকল ব্যবস্থা আমরা করছি। হসপিটাল থেকে ডাক এলে আমরা রওনা হবো। এরপর, দেখবেন আপনি আগের মত সুস্থ হয়ে গেছেন।
সেদিন দুপুরে মাহরীন কল করল তানিয়ার মায়ের কাছে। কল করার কারণ হচ্ছে, তানিয়াকে বুঝিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আনার জন্য। তানিয়ার মা সবটা শোনার পর জানালেন, তিনি অতি শীঘ্রই তানিয়ার বড় ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলবেন এই ব্যাপারে৷
কথা শেষ করে মাহরীন মাশফির মোবাইল ফিরিয়ে দিলো। মাশফি মোবাইল হাতে নিয়ে বলল,
— যে আসতে চাইছে না তাকে জোর ফিরিয়ে আনার কি প্রয়োজন আম্মা?
— প্রয়োজন আছে। তানিয়া অভিমান করে চলে গিয়েছে হয়ত! তাই বলে তুই হাত গুটিয়ে বসে থাকবি। তানিয়া তোর স্ত্রী। তানিয়া তোর দায়িত্ব।
— তানিয়া যদি আমার স্ত্রী হয়, তাহলে তানিয়ার উচিত তার স্বামীর অর্থাৎ আমার কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া। তানিয়া যদি আমার দায়িত্ব হয়, তাহলে তানিয়ার উচিত স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। গত চার বছর ধরে আমি একপাক্ষিক অর্থে বিয়েটাকে টিকিয়ে রেখেছি। তানিয়ার কোনো এফোর্ট নেই, দায়িত্ব নেই, সম্মান নেই।
মাশফিকে সবসময় শান্ত অবস্থায় দেখে অভ্যস্ত আলো। কিন্তু, হুট করে আজ মাশফিকে রেগে যাওয়া অবস্থায় দেখে আলো ভীষণ অবাক হলো। মাহরীন মাশফির কথাগুলো শুনে বেশ স্বাভাবিকভাবে বলল,
— ভালোবাসা আছে তো?
মায়ের মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে মাশফি নীরব হয়ে গেছে। গোটা চার বছরে তাদের মাঝে আদৌও কি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে? যদি ভালোবাসা তৈরি না হয়ে থাকে তাহলে তানিয়া মাশফির সন্তানকে কেন গর্ভে ঠাঁই দেবে? একজন নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় জড়িয়ে থাকে বাচ্চা কনসিভের ক্ষেত্রে। সেই হিসেবে তো তানিয়ার ইচ্ছার কারণে…
মাশফি হাল ছেড়ে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। তানিয়াকে নিয়ে ভাবতে বসলে তার মাথায় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তানিয়ার কিছু কিছু কাজে মনে হয় মাশফির জন্য তার অগাধ ভালোবাসা আছে। পরক্ষণেই মনে হয় সে মাশফিকে দু’চোখে দেখতে পারে না৷
— বিয়ের মত একটা সম্পর্কে ভালোবাসা থাকা জরুরি। ভালোবাসা থাকলে বাকি সবকিছু ম্যানেজ করা যায়। সম্পর্কে দুজন মানুষ কখনোই একই পরিমানে এফোর্ট দিতে পারে না। এখন যেই সঙ্গী এফোর্ট কম দিচ্ছে তাকে দেখে যদি অন্য সঙ্গী এফোর্ট দেয়া বন্ধ করে দেয় তাহলে সম্পর্ক টিকবে কি করে? একজনের এফোর্ট, যত্ন, ভালোবাসা, সম্মান দেখে অন্যজন শিখবে। ভালোবাসা পেতে হলে আগে ভালোবাসার মানুষের যত্ন নিতে হবে। ভালোবাসার মানুষকে অযত্ন, অবহেলা,অসম্মান করে আর যাই হোক ভালোবাসা চাওয়ার মত বোকামি করা যাবে না।
মাহরীনের কথা শুনে মাশফি রেগে যায়। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর, বাসা থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলে গেল,
— আমাকে ভালোবাসার ফিলোসোফি শেখানোর চেষ্টা করবেন না, আম্মা। তানিয়াকে শিখিয়ে পরিয়ে দেন। আমি একাই এই সম্পর্কের বোঝা টানতে পারব না।
মাশফি বের হয়ে গেল বাসা থেকে। মাহরীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে রইল। আলো মাথা নীচু করে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর পিঠ ধরে এসেছে বলে উঠে দাঁড়ালো।
— আলো?? এখানে বস।
মাহরীনের ডাক শুনে আলো আবারও আগের জায়গায় বসে পরল।
— তোর বড় ভাইয়ার ইগোতে লেগেছে ব্যাপারটা, বুঝতে পেরেছিস? একটা মানুষকে, একটা সম্পর্কে এবং একটা জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে ইগো যথেষ্ট।
শ্বাশুড়ির ভারি কথা বোধগম্য হচ্ছে না আলোর। তবুও আলো মাথা নাড়ায়।
মাহরীন চলে গেল নিজের ঘরে। আলো উঠে দাঁড়ালো। এবার ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত।
আলো যখন ঘরে ফিরে এলো তখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বাজছে। কোচিং-এ যেতে হবে আজ। কিন্তু, একা কি করে যাবে ভাবতে ভাবতেই দেখল, মেঘালয় ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। খাটের একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে আছে।
আলো খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই মেঘালয় আলোর হাত ধরে কাছে টেনে এনে দাঁড় করালো। আলো দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও মেঘালয়ের উচ্চতার সমান সমান মনে হচ্ছে। “বিধাতা তাকে আরেকটু লম্বা বানালে কি হতো?” ভাবতে ভাবতেই আলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ কোচিংয়ে যেতে হবে। টেস্ট পরীক্ষা নেবে।
— শাড়ি পরে যাবে নাকি?
প্রশ্নটি করেই উঠে দাঁড়ালো মেঘালয়। আলো জবাব দেয়ার আগেই মেঘালয় শাড়ির আঁচল টেনে আলোর মাথায় দিয়ে বলল,
— অবশ্য শাড়িতে বেশ লাগছে তোমাকে। আজ কোচিংয়ে যাওয়ার দরকার নেই। চলো, কোথাও ঘুরতে বের হই? কোথায় যাবে? পতেঙ্গায় নাকি?
মেঘালয়ের খামখেয়ালিপনা আবদার শুনে আলো বিস্মিত হয়ে যায়। মেঘালয়ের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব বাড়িয়ে বলল,
— স্যার বকবে।
— কোন স্যার বকবে? আমি কল করে জানিয়ে দেব তাকে?
— আরে,আপনি বুঝতে পারছেন না?
মেঘালয় হাত বাড়িয়ে আলোর ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বলল,
— তোমাকে নিয়ে আজ ঘুরতে বের হবো। আমি হসপিটালের ডিউটি ফাঁকি দেব। আর তুমি কোচিংয়ের ক্লাস ফাঁকি দেবে।
— আম্মু, বকুনি দেবে।
আলো মেঘালয়ের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল।
— তাহলে, চলো আজ মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে বের হই?
আলো অবাক হয়ে মেঘালয়ের কান্ড কারখানা দেখছিল! মানে মাঝে মানুষটার যে কি হয়? নিজের বিয়ে করা বউকে নিয়ে ঘুরতে বের হবার জন্য এমন ফন্দি বের করার কি আছে?
মাহরীন যখন নিজের ঘরে ঘুমে কাতর। ঠিক তখন মেঘালয় একটা কালো রঙের পাঞ্জাবি পরল। তারপর, মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে আলোর একহাতে তার সানগ্লাস ধরিয়ে দিয়ে অন্যহাত মুঠোয় আঁকড়ে ধরল। তারপর, চুপিচুপি বের হয়ে এলো বাড়ি থেকে।
গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই মেঘালয় আলোকে দাঁড় করিয়ে রেখে গ্যারেজের দিকে চলে গেল। মিনিট দুয়েক অতিক্রম হবার পর বাইকের শব্দ শুনে আলো পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলো, কাব্যর বাইক নিয়ে আসছে মেঘালয়। গেটের বাইরে বাইক দাঁড় করিয়ে মেঘালয় আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— সানগ্লাস দাও?
আলো মেঘালয়ের হাতে সানগ্লাস দিলো। সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে মেঘালয় আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— চলো, বাবুর আম্মু। আজ বাবুর আব্বু বাবুর আম্মুকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি চষে বেড়াবে।
আলো মুচকি হেসে মেঘালয়ের কাঁধে হাত রেখে বাইকে উঠে বসল। মেঘালয় লুকিং গ্লাসের আয়নায় ফুটে ওঠা আলোর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,
— চলো পালাই মিসেস মিথ্যাবতী। তোমার শ্বাশুড়ি তেড়ে আসছে।
মেঘালয় সাই করে বাইকের গতি বাড়িয়ে ছুটল অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। মাহরীন গেটের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখল এই দৃশ্য। মাহরীন দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
চলবে….
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (৮+৯+১০)
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭