#মেঘের_ওপারে_আলো
#পর্ব_২৪
#Tahmina_Akhter
কবরস্থান থেকে মেঘালয় এবং মাশফিসহ বাকি সবাই বাড়ি ফিরে এসে দেখল, আলোর মাথায় পানি ঢালছে। আলোর জ্ঞান নেই। মেঘালয় দৌঁড়ে যায় আলোর কাছে। মেঘালয়কে দেখে মাহরীন তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল,”আলোকে হসপিটালে নিয়ে যেতে”।
মাশফি দৌঁড়ে বাইরে চলে যায় গাড়ির কাছে। গতকালকের শাড়িটা এখনও আলোর গায়ে। পানির কারনে গা ভিজে গিয়ে শাড়িটা গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মেঘালয় অচেতন আলোকে কোলে তুলে নেয়। ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়৷ আলোর ছোট ঘরটায় ঢুকে আলোকে বিছানায় শুয়ে দেয়। তারপর, দরজা লাগিয়ে আলনা থেকে একটা থ্রি-পিস নিয়ে বদলে দিলো, মেঘালয় নিজ হাতে। তারপর, দরজা খুলে আলোকে আবারও কোলে তুলে বাইরের দিকে রওনা হলো। মাহরীনকে রেখে গেল নয়ত সিতারা বেগম একা হয়ে যাবেন।
আলোকে লেক ভিউ হসপিটালে ভর্তি করানো হলো। মাশফি এবং মেঘালয় অপেক্ষা করছিল। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এসে জানালো যে, “আলো, দুই মাসের অন্তঃসত্তা। এমন সময়ে খাওয়াদাওয়া ঠিকমত না করলে গর্ভের বাচ্চাসহ মায়ের সমস্যা হতে পারে। “
এদিকে মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে গেছে খবরটা জানার পর থেকে। মাশফি এগিয়ে এসে মেঘালয়কে একপাশে জড়িয়ে ধরে বলল,
— ফাইনালি আমার প্রমোশন হচ্ছে রে, মেঘালয়।
এত এত দুঃসংবাদের মাঝে এই একটা সুসংবাদের প্রয়োজনই যেন ছিল। কিন্তু, মেঘালয় যেন খুশী হয়েও হতে পারল না৷ আলোর লেখাপড়ার দিকটার কথা ভাবতে গিয়ে ওর মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। আলো ব্যাপারটা এখন কিভাবে নেবে কে জানে?
তিনঘণ্টা পর আলোকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেয়। তিন ঘন্টা সময়ের মধ্যে মেঘালয় একবারও আলোর সঙ্গে কথা বলেনি। আলো নিজের ভেতরকার পরিবর্তন টের পায়নি বোধহয়। পেলেও ওর বুঝতে পারার কথা না। বয়স কম। তাছাড়া, প্রথমবার মা হবার সময়কার শারিরীক পরিবর্তন কে বুঝতে পারে?
আলোকে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে মেঘালয় পাশে বসল। মাশফি গাড়ি স্টার্ট করল। মেঘালয় আলতো করে আলোর হাতটা ধরল। ধরণীতে তখন রাত নেমেছে। নিকষ কালো আঁধারের উপস্থিতি আলোর বুকটায় আবারও হাহাকার ভরিয়ে তুলল। মুখের ওপর দুইহাত রেখে হু হু করে কেঁদে ফেলল। মেঘালয় আলোকে একহাতে জড়িয়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। আলোর মাথার ওপর চুমু দিয়ে নিঃশব্দে বসে রইল সে।
আলোর বাবার বিয়োগান্তে মেঘালয় কি আসলেই আলোর দুঃখ, শোক অনুভব করতে পারছে? মোটেও না। যার যায় সে বোঝে৷ মুখে মুখে যতই লোকে বলুক তোমার দুঃখ আমি বুঝি, আদৌও তারা কিন্তু টেরও পায় না। কতটা বুক ভেঙে আসে? কতটা অসহায় লাগে? কতটা নিরুপায় হতে হয়? বাস্তবতার নির্মম মূহুর্তকে স্বপ্নকে ভেবে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে যে করে, সেটাও তার অনুভব করতে পারবে না।
আলোকে নিয়ে তার বাবার কোয়ার্টারের ফিরল মেঘালয়৷ মাশফিকে মাহরীন এবং আলোকে আপাতত আলোর প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে জানাতে নিষেধ করল মেঘালয়। মাশফি সম্মতি জানালো এই ব্যাপারে।
আলো হসপিটাল থেকে আসার পর থেকে নিজের ঘরে খাটের ওপর বসে আছে। আলোর মনে হচ্ছে একটু পরেই,বাবা ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে ঘরে আসবে। পরনের ঘর্মাক্ত শার্ট খুলে দড়িতে মেলে রাখবে। তারপর, এক গ্লাস ঠান্ডা পানির আবদার করবে।
এতটুকু দৃশ্য কল্পনা করার সময় আলোর চোখের জল গড়িয়ে পরল ।
মাহরীন, মাশফি এবং মেঘালয় আলোর ঘরে এলো। আলো হয়ত তাদের অনুপস্থিতি টের পায়নি। সে একইভাবে বসে রইল।
মাহরীন বিছানার ওপরে বসে আলোর মাথার হাত রাখল পরম মমতায়। আলো চোখ বন্ধ করে রইল। মাহরীনের হাতের স্পর্শের মাঝে তার বাবার হাতের স্পর্শকে অনুভব করতে চাইল। কিন্তু, বাবার মমতার সঙ্গে আর কারো দেয়া মমতাকে যে অনুভব করা যায় না। আলোর দু-চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পরছে।
মেঘালয় এবং মাশফি খাটের পাশে রাখা চেয়ার দুটোতে বসে রইল৷ মাহরীন মেঘালয়ের দিকে তাকালো অসহায় চোখে। এমন সময় আলোর বড় মামি খাবার নিয়ে এলো । মাহরীনের হাতে দিয়ে বলল,
— বেয়াইন আলোকে খাইয়ে দেন আপনার হাতে। মেয়েটা গতকাল থেকে না খাওয়া। ডাক্তার যতই ঔষধ দিক খাবার না খেলে শরীরে জোর আসবে কোত্থেকে?
— মামী, খাবার নিয়ে যাও। খাব না আমি।
আলো কথাটি বলে বিছানায় শুয়ে পরছিল। এমনসময় মাহরীন আলোর হাত টেনে ধরল। আলো মাহরীনের দিকে না তাকিয়ে বলল,
— আম্মু, আমি খাব না।
— খেতে হবে তোকে। ওঠে বস।
— কিছুই তো ভালো লাগে না। বাবা কই আছে আমার? এই অন্ধকারে রাতে আমার বাবা কই আছে, আম্মু?
আলোর আর্তনাদে উপস্থিত সবাই ভারাক্রান্ত। মাহরীনের চোখে পানি টলমল করছে। আলোর হাত ধরে বলল,
— আমি তো ভেবেছিলাম, তুই অনেক শক্ত ধাঁচের মেয়ে। তুই বাস্তবতাকে মেনে চলা মানুষ। কিন্তু, তুইও দেখছি সবার মত!
— এতদিন বাবার ছায়া মাথার ওপর ছিল তাই শক্ত ধাঁচের ছিলাম বোধহয়! বাবাকে হারিয়ে টের পেলাম, আমি সেই ছোট আলো রয়ে গেছি। যেই আলো বাবার অনুপস্থিতিতে ভয়ে কেঁদে ফেলত।
আলো নির্লিপ্ত ভাবে কথাটি বলল। মাশফি উঠে চলে গেল। আলোর কষ্টভরা চেহারা কেন জানি সে সহ্য করতে পারছে না।
মেঘালয় তাকিয়ে দেখছে, তার মিথ্যাবতীকে। যে মিথ্যাবতীকে কেবল স্ট্রং দেখে এসেছে এতদিন। সেই মিথ্যাবতী কতটা শিশুসূলভ আচরণ করছে তার বাবার প্রয়ানে!
–মানুষের জন্মলগ্ন সূচনা হলে, মৃত্যু হচ্ছে মানুষের সমাপ্তি। এমন চিরন্তন সত্য ভুলে যেতে নেই।
মাহরীনের কথা শুনে আলো মাহরীনের দিকে তাকিয়ে রইল। মাহরীন আলোর মামীর হাত থেকে প্লেট নিয়ে ভাত মাখিয়ে এক লোকমা আলোর মুখের সামনে তুলে ধরল।
— আমি কার ভরসা মেঘালয়কে ছেড়ে যাব রে, আলো? আমার অনুপস্থিতিতে তুই আমার মেঘালয় সামলে রাখবি, ভেবে বলেই তো তোকে আমার মেঘালয়ের জন্য নিলাম। তোরা সবাই দূর্বল হয়ে পরলে, তোদের সামলাবে কে?
মাহরীনের কথা শুনে আলো মাহরীনের হাত ধরে বলল,
— আপনি কোথায় যাবেন, আম্মু? আপনি চলে গেলে আমাকে কে দেখে রাখবে, বলুন? বাবা তো চলেই গেল!
মেঘালয় মাহরীনের দিকে তাকিয়ে ছিল, কোনো একফাঁকে তার চোখে অশ্রুরা এসে ভিড় জমিয়ে ফেলল। স্ত্রী এবং মায়ের কথার শ্রোতা হিসেবে মেঘালয় যেন সবচেয়ে বেশী কষ্ট পাচ্ছে। নারীরা তো কেঁদে বুক ভাসিয়ে মনের দুঃখ কমাতে পারে। কিন্তু, পুরুষ…
আলোকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দুই লোকমা ভাত খাওয়াতে পেরেছে মাহরীন। সিতারা বেগমকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে পাশের ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। মেঘালয় আলোর সঙ্গে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। মাশফি এবং মাহরীন চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন সকালে আবারও ফিরে আসবে তারা।
এই ঘরে তো আর আগুন জ্বলবে না। মাহরীন আগামীকালকের খাবার আয়োজন করে নিয়ে আসবে। এমন কথাই হলো মেঘালয় এবং মাশফির সঙ্গে। আলোর মামি এবং নানীদের কাছে কথাগুলো জানিয়ে চলে যায় মাশফি এবং মাহরীন।
_______________
দেখতে দেখতে কেটে গেছে তিনদিন। আজ আফসার সাহেবের কুলখানি। এলাকার মানুষসহ, আত্মীয় স্বজনদের জন্য কুলখানির আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে ব্যস্তসময় পার করছে,আলোর দুই মামা, তিন চাচা, মেঘালয় এবং মাশফি। মাহরীন, সিতারা বেগম এবং আলোর সঙ্গেই ঘরে বসে রইলেন। রোজ কত মানুষ আসে সিতারা বেগম এবং আলোকে দেখতে। আফসার সাহেবের আকস্মিক মৃত্যু যেন অনেকেই মেনে নিতে পারছে না।
কুলখানির অনুষ্ঠানে শেষে মেঘালয় সিতারা বেগমের ঘরে গিয়ে বসল। পাশেই মাহরীন এবং আলো বসে আছে। মাশফি জরুরি একটা কাজে রিয়াজ-উদ্দিন বাজারে গিয়েছে।
সিতারা বেগম মেয়ে জামাইকে দেখে মাথায় সাদা শাড়ির আঁচলটা টেনে বসল। মেঘালয় মাথা নীচু রেখে বলল,
— আম্মু, আপনার কাছে একটা আবদার ছিল?
সিতারা বেগম আতংকিত হয়ে গেলেন। মানুষটা মরল চারদিন হলো না, এখন কি মেয়ের কপাল ভাঙলো নাকি? কি আবদার করবে? সিতারা বেগমের কি সাধ্যি আছে আবদার পূরণ করার?
সিতারা বেগমের নিরবতা দেখেও মেঘালয় নিজের মত করে বলতে লাগল,
— আলোকে নিয়ে গেলে, আপনি একা বাড়িতে থাকতে পারবেন না? তাই আমি ভাবছিলাম, আপনি যদি আমাদের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে গিয়ে থাকতেন?
মেঘালয়ের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন সিতারা বেগম। চকিত নজরে তাকালেন আলোর দিকে। দেখলেন আলোও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সিতারা বেগম মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, “মেঘালয় কি হয় তার? সৎ মেয়ের স্বামী!শ্বশুর মরে গেছে তাই বলে স্ত্রীর সৎ মা’য়ের জন্য মেঘালয়ের চিন্তা করা জায়েজ?”
সিতারা বেগমের নিরবতা দেখে মাহরীন সিতারা বেগমের হাত ধরে বললেন,
— আপা, আপনি একা বাড়িতে থাকলে বরং আলো আপনার জন্য দুশ্চিন্তা করবে। আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন না?
— সরকার যতদিন এই বাড়িতে রাখবে ততদিন থাকব, বেয়াইন। এই বাড়িতে আপনার বেয়াইয়ের সকল স্মৃতি লেপ্টে আছে। যতদিন থাকতে পারব ততদিন তার স্মৃতিতে নিজেকে লেপ্টে রাখতে পারব। তাছাড়া, আমি একা কোথায়? আলোর নানীকে আমার কাছে রেখে দেব। আপনাদের কাছে আমার শুধু একটাই আবদার?
সিতারা বেগমের কথা শুনে আলো মাথা নীচু করে ফেলল। মেঘালয় চুপ করে রইল। মাহরীন সিতারা বেগমের হাত ধরে বলল,
— বলুন, আপনার আবদার কি?
— আলোকে দেখে রাখবেন। এতদিন ওর বাপ ছিল। মেয়ের ভালোমন্দ সে দেখেছে। আমি তো ওর বাপের মত খেয়াল রাখতে পারব না। তাই আপনারা আলোকে দেখে রাখবেন। আলোর আপনজন বলতে এখন আপনারাই আছেন।
ব্যস, এতটুকু ছিল সিতারা বেগমের সঙ্গে মাহরীনের কথোপকথন। সন্ধ্যায় নাগাদ আলোকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলো মাহরীন এবং মেঘালয়।
বাড়িতে ফেরার পর থেকে আলো অনবরত কান্না করেই যাচ্ছে। মেঘালয়ের আজ নাইট ডিউটি৷ ইন্টার্নি শেষ করতে পারলে যদি একটু শান্তি পায়! ভেবেছিল একেবারে ডাক্তার হয়ে বের হলে তবেই বিয়ে করবে। কিন্তু, সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা বুঝি অন্যকিছু ছিল।
মেঘালয় বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে দেখল, আলো একইভাবে বসে আছে খাটের ওপর। চোখের কার্নিশে জলের উপস্থিতি।
হাতের টাওয়াল বিছানার একপাশে রেখে বিছানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তারপর, আলোর একহাত ধরে টান দিলো। আলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকালো। আলোর অসহায় দৃষ্টি মেঘালয়কে টলাতে পারল না। আলোর হাত টেনে ধরে খাট থেকে নামালো। এরপর, আলোকে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে আলোকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আলো মাথা নীচু করে রেখেছিল। কিন্তু, মেঘালয়ের কান্ড দেখে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় । মেঘালয় আলোর হাতদুটো টেনে নিয়ে আলোর পেটের ওপরে রেখে ফিসফিস করে বলল,
—কি পিল খেয়েছো, বাবুর আম্মু?
বাবু তো অজান্তেই, তোমার গর্ভে এসে
নিঃশব্দে বুনে ফেলেছে তার থাকবার ঠিকানা।
আর মাত্র সাত মাস…
তারপর তোমার কোলে ফুটে থাকবে, তোমার আমার অংশ মিলে, আমাদের ছোট বেলিফুল।
চলবে…
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (১৫,১৬)
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৯